মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

প্রেমেন্দ্র মিত্র'র গল্প : কলকাতার আরব্যরজনী



ঠিকানাটা বলে দিতে পারি। 
একদিন সেখানে যেতে পারেন মনমর্জি হলে। 
দল বেঁধে অবশ্যই নয়। একা। আর যখন তখনও নয়। 
ইস্পাহানী গির্জের ঘড়িতে ঠিক যখন সাড়ে এগারটার ঘন্টা বাজছে, তখন। 

ইপাহানী গির্জের ঘড়িটা একটু ক্লান্ত হয়ে পড়েছে একশো পোনেরো বছরের অবিরাম চলায়। সময়ের সঙ্গে আর ঠিক পাল্লা দিতে পারে না। একটু পিছিয়ে পড়ে। 

তার সাড়ে এগারটার ঘন্টা মানে তাই এগারটা পঁইত্রিশ। 

কিন্তু তখনই এসে ঢুকবেন ওই ছোট্ট তেকোণা পার্কটায়, পার্ক বললে যাকে ঠাট্টাই করা হয়, শহরের ঘূর্ণিবেগ নিজেকে সামলাতে কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে যে নগণ্য দ্বীপাভাসটি সষ্টি করেছে নগরপালদের অনুগ্রহে। 

রাত এগারটা পঁইত্রিশের সময়, শহরের ঘূর্ণিবেগের কোন চিহ্নই পাবেন না অবশ্য এখানে। সকাল ও বিকালের দুটি প্লাবনে তা নিঃশেষ হয়ে গেছে। বড় জোর একটা রিকসার ঠুং ঠাং কানে আসতে পারে কদাচিৎ। আর মাঝেমাঝে দ্রুত ধাবমান একটা-আধটা মোটরের শব্দ। 

ছোট পার্কটির পূব দিকের কোণটাই বেছে নিতে হবে। সেখানে বেশ তরল একটু অন্ধকার। মুখোমুখি পাতা দুটি লোহার বেঞ্চির একটিতে গিয়ে বসতে পারেন। 

আর একটিতে অবছায়া একটি মূর্তি আগে থাকতেই সেখানে বসে আছে দেখা যাবে। 

আপনার আগে থাকতে মূর্তিটি যদি বেঞ্চির পিঠে হেলান দিয়ে দুদিকে দুহাত ছড়িয়ে বসে না থাকে, তাহলে সেখানে যাওয়া বৃথা। একলা প্রথম যেদিন সেখানে গিয়ে উপস্থিত হবেন, সেদিন সামনের বেঞ্চিতে কেউ আর বসতে আসবে না। তা যতই আপনি অপেক্ষা করুন। 

ইস্পাহানী গির্জেয় বারোটার ঘন্টা বাজবে যেন হাঁফানি রোগীর শ্বাসকষ্টের মত টেনে টেনে। 

তার কিছুক্ষণ বাদেই পশ্চিম দিকে বড় রাস্তা থেকে একটা কানা গলি যেখানে ছিটকে পালাতে গিয়ে বাধা পেয়েছে, তার কোণের পানের দোকানটির আলোও হঠাৎ নিভে গিয়ে একটা ছমছমে অস্বস্তি ছড়িয়ে দেবে আপনার চারিদিকে। দৈত্যপুরীর মত বিরাট অন্ধ বাড়িগুলো যেন গায়ের ওপর হেলে পড়ছে মনে হবে। রাস্তায় তখনও আলো জলছে, কিন্তু মনে হবে সে আলো যেন রহস্যকটাক্ষে কি অশুভ ইঙ্গিত জানাতে চাইছে। 

তারপর বসে থাকা দায় হবে। কখন নিজের অগোচরেই উঠে পড়ে দ্রুতপদে পার্ক থেকে বেরিয়ে বড় রাস্তায় নিজের পদধ্বনিতেই সচকিত হয়ে দুরের একটি সঙ্কীর্ণ গলিপথে নগরের ঘিঞ্জি জনবহুল একটি অঞ্চলের নোংরা বাস্তবতার নাগাল পেয়ে হাঁফ ছেড়ে বাঁচবেন। 

আমি যেমন বেঁচেছিলাম। 

আগ্রহের আতিশয্যে নীলাম্বর অধিকারীর কথা ঠিক অক্ষরে অক্ষরে তা পালন না করে একটু সময় হাতে রেখে যাওয়ার মূর্খতার ওই শাস্তি। 

এ কাহিনী তাই নীলাম্বরের কাছে আমার শোনা। স্থান কালের নির্দেশও তারই।র 

নীলাম্বরকে অবিশবাস করবার কোন কারণ নেই। কারণ, সে কবি বা ভাবুক কিছুই নয়। নেহাত স্থির ধীর সুস্থমস্তিষ্ক কাগজের ব্যাপারী। বড়বাজারে তার কাগজের আড়ত। আড়তের সামনে তার ছোট্ট ঘুপচি দোকানঘরটিতে সারাদিন সে প্রায় টেলিফোন কানে নিয়ে রীম রীম টন টন কাগজের দর জানায়, অর্ডার নেয়, লরি ঠেলাগাড়ি রিকশাতে মাল পাঠাবার ব্যবস্থা করে। সে কাগজ কে কোথায় কি ভাবে রং লাগিয়ে কি কালির আঁচর কেটে নষ্ট করে তা নিয়ে তার মাথাব্যাথা নেই। 

রাত আটটায় দোকান বন্ধ করে, রাত নটা-দশটা পর্যন্ত হিসেবপত্র দেখে, দোকানঘরের ইস্পাতের খড়খড়ি-ঝাঁপ টেনে দিয়ে জবরদস্ত দুটো তালা লাগিয়ে দুবার তা টেনে পরীক্ষা করে ছাতাটি বগলে নিয়ে সে বরাদ্দ করা রিকশাটিতে চড়ে ধীরে-সুস্থে পোল পার হয়ে স্টেশনে যাবার জন্যে রওনা হয়। 

তার শেষ ট্রেন রাত এগারটা কুড়িতে। ট্রেন না পেলে তাকে নিরুপায় হয়ে ট্যাক্সি নিতে হয়। ট্যাক্সি খরচটা গায়ে বড় লাগে। জীবনে একবার কি দুবারের বেশী ট্যাক্সি নেয়নি। নীলাম্বর অধিকারী কৃপণ। মুখের সামনে তাকে সে কথা বলা যায়। বললে সে রাগ করে না, বরং সেটা তার গর্ব। 

নীলাম্বর ট্রেন ফেল বড় একটা করে না। 

একদিন করেছিল। শুধু ট্রেন ফেলই নয়, সেদিন ট্যাক্সি করেও মফস্বলের বাড়িতে যাওয়া তার হয় নি। স্টেশনের প্ল্যাটফর্মেই শুয়ে রাত কাটিয়েছিল। 

সেদিন বিকেল থেকে রাত নটা-দশটা পর্যন্ত মুষলধারে বৃষ্টি পড়েছে। শহর ভেসে গেছে জলে। যান-বাহন সব অচল। তার মাস-বরাদ্দ রিকশাও সেদিন আসেনি। 

নীলাম্বর কোন রকমে একটা রিকশা ডাকিয়ে জলময় রাস্তায় যখন বেরুতে পেরেছিল, তখন এগারটা বেজে গেছে। বৃষ্টি থেমে গেছে কিন্তু আকাশ ঘন মেঘে ঢাকা। শুক্লপক্ষের চাঁদ সেই মেঘলা অন্ধকারকে নেপথ্য থেকে আরো রহস্য-তরল করে তুলেছে। 

শেষ ট্রেন যে ধরতে পারবে না, নীলাম্বর তা বুঝেই নিয়েছিল। কোন রকমে পোল পেরিয়ে স্টেশনে পৌঁছলে যদি একটা ট্যাক্সি পাওয়া যায় এই আশা। 

কিন্তু স্টেশনে পৌঁছোনও হয় নি। জলে ভাসা রাস্তায় মদমন্দ গতিতে ছপ ছপ করে হেঁটে হেঁটে খানিকদূর যাবার পর রিকশাওয়ালা থেমে পড়েছিল। রিকশার একটা চাকা কি করে আলগা হয়ে নড়বড় করছে। ঠুকে ঠুকে মেরামত করে না নিলে আর এগুনো যাবে না। | নিলাম্বর রিকশা থেকে নেমেছিল। 


ইস্পাহানী গির্জার ঘড়িতে তখন সাড়ে এগারটার ঘন্টা বাজছে। নীলাম্বর নিজের হাতঘড়িটা তখনই মিলিয়েছিল, আর নিজের নির্ভুল ঘড়ির হিসেবে বুঝেছিল ইস্পাহানী গির্জের ঘড়িটা পাঁচ মিনিট পিছিয়ে আছে। 

নীলাম্বর টাকা-আনা-পাই-এর র নির্ভুল হিসেবের জগতের মানুষ। এমনিতে রসকষহীন। কিন্তু সেই চোরা জ্যোৎস্নার আবছা অন্ধকারে জলে ভাসা রাতের শহরের এক স্তব্ধ নির্জন আকাশ-ছোঁয়া সব ভ্রূকুটি-ভয়াল ইমারতের পাহারা দেওয়া ও পথিবীর মানুষের যেন ভুলে যাওয়া অঞ্চলটিতে দাঁড়িয়ে তার মনেও যেন কিসের একটা স্বপ্নগাঢ় আচ্ছন্নতা নেমেছিল। 

ছোট পার্কটা চোখে পড়েছিল, আর রিকশা না মেরামত হলে কোথাও রওনা হবার আশা নেই বুঝে, কখন সেই পাকের কব্জা দেওয়া লোহার গেট ঘুরিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়েছিল। 

পায়ে পায়ে এক কোণের বেঞ্চি দুটোর কাছে পৌঁছে একটায় বসবার পরও সামনের বেঞ্চির লোকটিকে ভালো করে খেয়াল করেনি। লোকটা এদিকের গাঢ়তর অন্ধকার থেকেই যেন আচমকা অস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছিল বেঞ্চির গায়ে। 

ফুটে উঠেছিল সশব্দেই। 

বিড়ি-টিড়ি একটা ছাড়ুন না স্যার। 

খাস আদি কলকাতার মার্কামারা উচ্চারণ। 

নীলাম্বর চমকে উঠে সে দিকে চেয়েছিল। পোশাকটা অন্ধকারে তখনও বোঝা যায় নি। শুধু দেখা গেছল, রোগাটে একটা মানুষ বেঞ্চিতে হেলান দিয়ে বেঞ্চির পিঠের দিকে হাত দুটো ছড়িয়ে গা এলিয়ে দেবার ভঙ্গিতে বসে আছে। 

বিড়ি-টিড়ি নেই। একটু অপ্রসন্ন স্বরেই বলেছিল নীলাম্বর। মনে হয়েছিল এই নির্জন পাররকটা ভেতর ও উপদ্রবটুকু না থাকলেই ভালো ছিল। 

লোকটা অনেকক্ষণ তারপর কিন্তু আর বিরক্ত করে নি। নীলাম্বরের জবাবটুকু শুনেই একেবারে চুপ করে গিয়েছিল। 

চারিদিক স্তব্ধ। রিকশাওয়ালার চাকা মেরামতের ঠুকঠাক শব্দ সে স্তব্ধতাকে আরো গাঢ় করে তুলছে। 

দূরে হঠাৎ একটা একটানা শব্দের স্রোত ক্রমশঃ প্রখর হয়ে উঠেছিল। নদীর আর রাস্তার শব্দ যেন মেলানো। বেগবান একটা মোটর রাস্তার জল কেটে যতদূর সাধ্য দ্রুত এগিয়ে আসছে। 

শব্দটা এগিয়ে এসে তীব্র আলোর হিংস্র রসনায় একবার স্তব্ধ অন্ধকারকে লেহন করে বড় রাস্তা থেকে পাশের একটা গলিতে মিলিয়ে গেছল। 

বুঝতে পারলেন স্যার!--বেঞ্চির ছায়ামূর্তিটা আবার সরব হয়ে উঠেছিল –শিউপরসাদজির আজও কামাই নেই। জল ঝড় পেরলয় হোক, শিউপরসাদজির মোটর রাত বারোটার আগে এসে ওই গলিটায় ঢুকবেই। ওখানে গিয়ে ঘাপটি মেরে যদি দাঁড়ান দেখতে পাবেন শিউপরসাদজি মোটর থেকে নেমে চোদ্দ নম্বর বাড়িটার সেকেলে দরজায় চারবার টোকা দেবে। একটা আস্তে যেন ভয়ে ভয়ে, পরেরটা আরেকটু সাহস করে, আর শেষের দুটো যেন বেপরোয়া হয়ে দরজা ভাঙার মত করে। টোকা দিয়ে একটু পেছিয়ে সে দাঁড়াবে, 

আর দোতালার খুপরি জানালার খড়খড়ি খোলর সঙ্গে ধমক আসবে, নিকাল যাও। ব্যস। শিউপরসাদজি এইটুকু শুনেই সুশীল সুবোধ ছেলেটি হয়ে আবার তার পেল্লয় মোটরে চেপে গলি থেকে যেন কুর্নিশ করতে করতে পিছু হেঁটে বেরিয়ে যাবে। 

এই বকবকানিতে নীলাম্বরের বিরক্তির বদলে একটু মজাই লেগেছিল এবার। 

কতকটা ভৎর্সনার ভঙ্গিতে বলেছিল,—তুমি সব জানো, না? একেবারে সব হাঁড়ির খবর! 

চোখটা অন্ধকারে সয়ে আসায় লোকটার পোশাক-পরিচ্ছদ চেহারা আরেকটু পষ্ট দেখতে পেয়েই তুমি বলে সম্বোধন করতে পেরেছিল নীলাম্বর। চেহারা পোশাক আখ্‌খুটে ইতর গোছেরই। মুখটা ভালো দেখা না যাওয়ায় বয়সটা অবশ্য বোঝা যায় নি। 

লোকটা নীলাম্বরের ভৎর্সনায় একটু শুধু হেসেছিল। সহিষ্ণুতার হাসি যেন। বলেছিল,-আমি জানব না তো জানবে কে স্যার! এই শহরের হাঁড়ির খবর নাড়ির খবর কি আমি না জানি! 

নীলাম্বরের এবার স্থির বিশ্বাস হয়েছিল লোকটা পাগল-টাগল হবে। তবে ভয় করবার কিছু নেই। নীলাম্বর গায়ে দস্তুরমত ক্ষমতা রাখে, টেরাবাকা হলে অমন একটা ফড়িংকে টুসকি মেরে উড়িয়ে দিতে পারে। আপাতত রিকশা না মেরামত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করার সময়টা পাগলের সঙ্গে কাটাতে মন্দ লাগছিল না। 

নীলাম্বর একটু, বিদ্রুপ করেই বলেছিল,—নাড়ির খবর হাঁড়ির খবর কি করে এত জানলে? 

এই আপনি যেমন করে কাগজের বাজারের হাঁড়ির নাড়ির খবর জানেন স্যার! নীলাম্বরকে চমকে দিয়ে লোকটা নিজে থেকেই এবার বলে গেছল,-- খবর কি একটা স্যার! আর, যেমন তেমনও নয়। সক্কালবেলা এই পার্কের দক্ষিণমুখো গিয়ে মশলাপটির মুখটায় গিয়ে দাঁড়িয়ে দেখবেন না স্যার। বাবুলালের পানের দোকান ওপরে আর তার নিচে ছাগলের খোঁয়াড়ের মত ঘুপচি একখানা গভর। বড়-সড় একটা সিন্দুক বললেই হয়। সেই সিন্দুক থেকে বেরিয়ে রাধু দাস তখন ছাতার বাঁট-শিক তেল-কাপড় ছুঁচ-সুতো সরঞ্জাম ঝোলায় পুরে টহলে বেরুবার জন্যে তৈরি হচ্ছে। শিউপরসাদজির মত অমন বাদশাই মোটর না হলেও ঝকঝকে তকতকে একটা নতুন গাড়ি ওখানে এসে থামবে। তা থেকে যে নামবে, তাকে দেখে আপনার চোখ যদি টেরা না হয়ে যায় তাহলে চোখের ডাক্তারের কাছে গিয়ে চোখ দেখাবেন। যেমন গয়নার ঝিলিক, তেমনি রূপের জৌলুসে রাস্তা ঝকমকিয়ে এক সুন্দরী এসে ওই রাধু দাসের সামনে দাঁড়াবে। আর, রাধু দাস করবে কি জানেন? ছেঁড়া কুর্তার পাকিট থেকে সওয়া পাঁচ আনা—ঠিক গোনাগুনতি সওয়া পাঁচ আনা বার করে দেবে সেই সুন্দরীর হাতে। বাবুলাল কোনদিন সকাল সকাল দোকান খুলতে এসে পড়ে থাকলে মুচকে মুচকে বাঁকা হাসি হাসবে। টিটকিরিও দেবে। কিন্তু সুন্দরী গোরহ্যিও না করে সেই সওয়া পাঁচ আনা চাঁদ মুখ করে নিয়ে আবার গাড়িতে গিয়ে উঠবে। 

নীলাম্বরের মনে হয়েছিল, লোকটা পাগল হলেও যেমন তেমন নয়, বেশ সেয়ানা পাগল। একবার ইচ্ছে হয়েছিল, গুল ঝাড়বার আর জায়গা পাওনি বলে ধমক দেয়। কিন্তু মজাটা মাটি করতে ইচ্ছে হয় নি। তার বদলে আরো একটু উসকানি দেবার জন্য বলছিল,-হুঁ, তোমার তো সত্যি অনেক মজার খবর জানা দেখছি। এ সব কথা ক'জনই বা আর জানে! 

জানবে কি করে স্যার।-- লোকটা গালাগাল দিয়ে বলেছিল,-ইস্তিরীর ভাইরা সব আরবী-ফারসী খোয়াব-খেয়ালের নবেল-নাটক পড়ে। আরে এই কলকাতা শহরের কলকে ধরবার মুরোদ যে বোগদাদ-সোগদাদের নেই তা জানে কোন বেটা! 

তা, শুনি না তোমার একটা বোগদাদী কলকাতার কিসসা। শিউপরসাদ কি রাধু দাসের হেঁয়ালিই শোনাও না হয়।--বলেছিল নীলাম্বর। 

লোকটা খানিকক্ষণ চুপ করে গেছল, ইস্পাহানী গির্জার বারোটার ঘন্টাগুলো বাজতে দেবার জন্যেই বুঝি। হাঁপ-ধরা ঘড়-ঘড়ে গলায় আওয়াজের মত ঘন্টাধ্বনিগুলো দৈত্যাকার ইমারতগুলোর গায়ে ধাক্কা খেয়ে চোরা জোৎস্নার থমথমে আকাশকে ব্যঙ্গ করতে যেন উর্ধে ছড়িয়ে গেছল। 

সে সব হেঁয়ালির গাঁট আজ খোলবার ফুরসত হবে না স্যার।—গির্জার ঘড়ি থামবার পর লোকটা নিজে থেকেই বলেছিল,আজ বরং শিউপরসাদের দামী হাত-ঘড়িটা এখনো যার কর্জিতে বাঁধা, আর বাবুলালের দোকানের বিড়ির যে সেরা জহরী, সেই বেচারামের ভগবান হওয়ার বিত্তান্তটা শুনুন। 

বেচারাম আবার কে?--জিজ্ঞাসা করেছিল নীলাম্বর একটু হেসে। 

আজ্ঞে, দাগী চোর স্যার। তবে চোরের মধ্যে বেজাত। যেমন ওস্তাদ তেমনি ওচা।--শুরু করেছিল লোকটা,-পাকা সিঁদেল বটে, কিন্তু ছিচকেমিতেও ঘেন্না নেই। কিছু না জুটলে পকেট পর্যন্ত কাটে। খানদানি চোরেদের মজলিশে তাই তার ঠাঁই নেই। নিজের স্বভাবের দোষে সে একঘরে। শুধু হাতের কসরত আর বুদ্ধির জোরে টিকে আছে। বেচারাম মুখ্য নয় স্যার। দুধে-দাঁত সব কটা পড়তে না পড়তে বিড়ি ফুঁকতে শিখে, আর গোঁফের রেখা দিতে না দিতেই নেশা ভাঙ কিছু আর বাদ না রেখে ইস্কুলের বেড়াটা আর বেরতে পারে নি, কিন্তু বেচারাম বাংলা খবরের কাগজ এপিঠওপিঠ পড়ে ফেলতে পারে স্যার, ইংরিজিও ফড়ফড় করে দু-চারটে বলে তাক লাগিয়ে দিতে পারে, যেমন দিয়েছিল পয়লা ধরা পড়ে আদালতে মামলা হবার সময় জজ-সাহেবকে। জজ-সাহেব তাই না শুনে ভাল ভাল মিষ্টি মিষ্টি সব উপদেশ দিয়ে বেকসুর খালাস করে দিয়েছিলেন। বেচারামের মুখটা তখনও কচি কচি ছিল কিনা। কিন্তু সব জজ তো আর সমান হয় না স্যার। পরের বার তার মুখে ইংরিজি বুলির ফড়ফড়ানি শুনে আরেক জজ-সাহেব উল্টে ক্ষেপেই গেছলেন। একেবারে দুটি মাস ঠাণ্ডা গারদের হুকুম ঠুকে দিয়েছিলেন। পুলিসের উকিল বেটা চুকলি খেয়ে আগের বারের কথা লাগিয়েছিল যে! 

বেচারামের এ বৃত্তান্তে বোগদাদী খোশবু তো কিছু পাচ্ছি না।—বিদ্রূপ করে বলেছিল নীলাম্বর। 

একটু সবুর করুন স্যার। বেচারামকে একট চিনিয়ে না দিলে তার বিত্তান্ত বুঝবেন কি করে?—আবার বলতে শুরু করেছিল লোকটা,বয়সকালে এই বেচারাম ঝানু চোর হয়ে উঠেছিল স্যার, যেমন সেয়ানা তেমনি হুশিয়ার। সিঁদ-কাঠি চালাত যেন মাখমে ছুরি চালাচ্ছে, জলের পাইপ বেয়ে পাঁচতলার ছাদে উঠত যেন কাঠবেড়ালী, আর বেগতিক দেখলে আলসে থেকে আলসেতে লাফ দিয়ে পগার পার হত যেন বুনো খটাশ। এই বেচারাম একদিন অমন সত্যিকার চোরদায়ে ধরা পড়বে তা কে জানত! 

লোকটা দম নেবার জন্যে একটু থেমে বললে,-একটা বিড়ি-টিড়ি হলে ভাল হত স্যার। গল্পের এবার চড়াই ভাঙতে হবে কিনা। 

বিড়ি-টিড়ি নেই। একটু করণাপরবশ হয়ে বলেছিল নীলাম্বর,তবে পান-জর্দা আছে আমার কৌটায়। চাও তো দিতে পারি। 

তাই দিন স্যার, খাটিয়া না জুটলে চ্যাটাই সই।--নীলাম্বরের জর্দা-দেওয়া পান মুখে দিয়ে বার কতক চিবিয়ে পিক ফেলে লোকটা বলেছিল,—এমন মেঘলা-টেঘলা নয় স্যার, ফুটফুটে জ্যোছনার রাত ছিল সেদিন। সিঁদেলদের পাঁজিতেতে জ্যোছনা মানেই অযাত্রা, আর পুন্নিমে তো তেরস্পর্শ। কিন্তু বেচারাম ও সব শাস্তর-টাস্তরের পরোয়া করত না স্যার। দিন দুপুরেই সে অমন কত বাড়ির সিন্দুক ভেঙেছে। এই কিছু দূরের কানা গলিটা দেখেছেন কিনা জানি না, সেই গলিটা ছাড়িয়ে আরেকটা গলি আছে স্যার, মেয়ে মানুষের চরিত্তিরের চেয়ে পেঁচালো! এখান থেকে শুরু করে হোই উত্তরের খলসের খাল পর্যন্ত ইনিয়ে-বিনিয়ে পাক খেতে খেতে গলিটা গড়িয়ে গেছে চপিসাড়ে। সেই গলিরই একটা বাড়িতে কাজ হাসিল করে সে সেদিন খোস মেজাজে ফিরছিল। কাম যখন ফতে হয়ে গেছে সেই শেষের দিকটায় একটু বাখড়া পড়েছিল। যে ঘরে কাজ সেরেছে তার পাশের ঘরেই একটা বাচ্চা মেয়ে কেঁদে উঠেছিল ঘুমের ঘোরে। তার মা-ই বোধ হয় জেগে উঠেছিল। ফ্যাসাদ বাধতে কতক্ষণ। বেচারাম তাই হাওয়া হয়ে গিয়েছিল তখুনি। গলিতে গলিতে নয়, ছাদ থেকে ছাদে, আলসে থেকে আলসেতে। হিম্মত থাকলে অমন তোফা নির্ভর রাস্তা আর নেই। 

ছাদ টপকে যেতে যেতে বেচারামকে এক জায়গায় এসে থমকে দাঁড়াতে হয়েছিল স্যার! --পানের ছিবড়েগুলো ফেলে দিয়ে লোকটা আবার শুরু করেছিল,--পুরোনো কোম্পানির আমলের বাড়ি, বুঝেছেন কিনা, বেচারামের হাল্কা পায়ের লাফেই যেন ভেঙে পড়ে। ঘেয়ো শ্যাওলাজমা আলসে আর ছাদ। একদিকটা খোলা আর একদিকে দুখানা টালিতে ছাওয়া খুপরিগোছের চিলকোঠার ঘর। একটা ঘরের দরজা হাট করে খোলা। ভেতরে একটা মিটমিটে লণ্ঠনের আলো জ্বলছে দেখা যায়। 

বেচারামের বেড়াল-পায়ের লাফেও নোনাধরা আলসে থেকে কিছু পলস্তারা আর ইঁটের কুচো বুঝি খসে পড়েছিল। ভেতর থেকে একটি মেয়ের গলয় শোনা গেছল,—কি একটা শব্দ হল না? 

যাই হোক না আমাদের কি আসে যায়।—পুরুষের গলা এবার, কিন্তু যেন ফাঁসির আসামী গলায় দড়িটা পরিয়ে দিয়ে বলছে দুনিয়াকে সেলাম। 

বেচারাম নট নড়নচড়ন হয়ে গেছল স্যার। ধরা পড়বার ভয়ে নয়, ওই দুটো গলার আওয়াজের কি জাদুতে। 

পা টিপে টিপে খোলা দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়েছিল। শুনেছিল দুনিয়ার দরিয়ায় দুটো বানচাল নৌকোর কাতরানি। সোয়ামী আর তার ইস্তিরী, বয়সও বেশী নয় বুঝেছিল গলার আওয়াজে। চৌকাঠ পেরিয়ে ক দিনই বা সংসারে ঢুকেছে, কিন্তু এর মধ্যেই হালে পানি না পেয়ে ফেঁসে গেছে পাথরে ডুবো ডাঙায়। তাই নিভিয়ে দিতে চাইছে নিজেদের হাতেই ভাঙা ডিবিয়ার তেল ফুরান সলতে। যা কিছু, রেস্ত ছিল, তাই দিয়ে শেষ বাসর সাজিয়েছে, ফুল কিনে এসেন্স-অতর ছড়িয়ে। 

সেই মামুলী গল্প স্যার। ছোকরা বলেছে,-আসুক কাল বাড়িওয়ালা আর পাওনাদার, করুক আমাদের সব কিছু নিলেম। বলে হেসেছে, ওসব কথা বলে যেমন করে হাসতে হয়। 

বেচারামের, ঝানু সেয়ানা দাগী সিঁদেল বেচারামের মতিচ্ছন্ন হয়েছে হঠাৎ। সে ভগবান হতে চেয়েছে। 

গয়নায় নগদে বেশ কিছু তখন তার কোমরে বাঁধা ঝুলিতে। গয়নাগুলো নিজের কাছে রেখে নগদ যা কিছু, একেবারে ঝুলি ঝেড়ে দরজার ওপাশে রেখে দিয়েছে চুপি চুপি। গয়নাগুলো দেয়নি সামলাতে পারবে না জেনে। শুধু নগদ টাকা-পয়সা রেখেই চলে যায়নি। দরজার একটা পাল্লায় জোরে একটা ধাক্কা দিয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে কি হয় দেখবার জন্যে। 

ভেতরে দুজনেই চমকে উঠেছে। তবু গোড়ায় কেউ উঠতে চায় নি। তবে মরতে বসেও মানুষের মনের চুলবুলুনি যায় না। শেষ পর্যন্ত মেয়েটাই উঠে এসেছে হ্যারিকেনটা নিয়ে। এসে থ হয়ে গেছে, মুখে তখন আর রা নেই। তারপর চিৎকার করে উঠেছে,-ওগো, দেখে যাও এ কি কাণ্ড! 

ছোকরাও উঠে এসেছে তখন। বেচারাম আড়ালে দাঁড়িয়ে দেখতে না পেলেও বুঝেছে, ছোকরা চোখ রগড়াচ্ছে নিশ্চয় জেগে আছে না খোয়াব দেখেছে পরখ করতে। 

মেয়েটা তখন চেঁচাচ্ছে,-এ যে অনেক টাকা গো। একশ, দশ, পাঁচশ! 

ছোকরা চাপা গলায় ধমক দিয়েছে,—চুপ! চুপ! 

বেচারাম আর দাঁড়ায়নি। নিঃসাড়ে সরে পড়েছে। 

লোকটা একটু থামায় নীলাম্বরের মনে হয়েছিল গল্প বুঝি এখানেই শেষ। কিন্তু তা নয়। লোকটা আবার বলেছে,-ভগবান হওয়ার বড় ঝামেলা স্যার। মাসখানেক বাদে বেচারামকে আবার যেতে হয়েছে স্যার ছাদ টপকে সেই চিলকোঠায়। ছাদের দরজা সেদিন বন্ধ। একটা জানালা শুধু খোলা। উঁকি দিয়ে বেচারাম বেশী কিছু দেখতে পায়নি, শুধু নতুন নেটের মশারি আর ঝকঝকে একটা টেবিল-লম্প। তাই দেখেই বুঝেছে হাওয়া ঘুরেছে। জানালা দিয়ে হাত গলিয়ে সেদিনকার রোজগার প্রায় সবই রেখে দিয়েছে ওদিকে। 

বেচারামের সেই এক নেশা লাগল স্যার। ভগবান হওয়ার নেশা, পঞ্চরংএর চেয়ে কড়া। কিছুদিন অন্তর অন্তর বেশ কিছু লুকিয়ে সেখানে ঢেলে আসে। রেখে আসতে হয় বড় হুশিয়ার হয়ে। আহম্মক দুটো কল্পতরু গাছটাই চায় ওপড়াতে। তক্কে তক্কে থাকে তাকে ধরবার। বেচারামের হয়রানি বাড়ে লুকিয়ে দাতাকর্ণ হয়ে আসতে। 

ওদিকে ঘর-দোর-সংসারের চেহারা তখন দিন দিন পাল্টাচ্ছে। ভাঙা তপোশের বদলে খুরো দেওয়া খাট, তোরঙ্গের বদলে সিসে-বসান আলমারি দেরাজ। আলনায় মেয়েটার ঝলমলে শাড়ি, ছোকরার নতুন নতুন পোশাকের বাহার। টেবিল-লম্পর জায়গায় হ্যাসাক বাতির আলোয় এই সবই দেখেছিল বেচারাম। 

ঘর-দোর পাল্টেছিল, শেষে পাল্টাল মানুষ। 

বেচারামের ভগবান একদিন মাঝরাতে গিয়ে প্রায় ধরা পড়ে আর কি। রাত একটা বাজে। মেয়েটা তখনও সিড়ির কাছে বসে কে জানত। 

কি ভাগ্যি, বেচারাম সেদিন পাইপ বেয়ে উঠেছিল। উঠে আলসের ওপর দিয়ে উঁকি দিয়ে মেয়েটাকে ওইভাবে দেখতে পেয়েই ঘাপটি মেরে বসে পড়েছিল আলসের কানাচে। 

রাত দেড়টার সময় ছোকরা এল স্যার। বুঝতেই পারছেন মদ খেয়ে এসেছে কোন হুরীর ঘর থেকে কে জানে! 

দুজনের তারপর কি চিল্লামিল্লি চুলোচুলি। নেহাত দুপুর রাত বলে কাক চিল ওড়ে নি। 

মেয়েটা বলে-- মানতাসার জন্যে টাকা রেখেছিলাম, তুমি তাই চুরি করে গিয়ে ফুর্তি করেছ। 

ছেলেটা বলে,—বেশ করেছি। মানতাসা গড়াবে! গয়নার লালচ আর মেটে না! 

সে কোঁদল থামতে রাত আড়াইটে বাজল। বেচারাম তখনও ঠায় বসে আলসের কানাচে। সব ঠাণ্ডা হবার পর পা টিপে টিপে গিয়ে জানলা গলিয়ে সেদিনের যা কিছু লুট সব রেখে এল তাদের ঘরে, টাকা-কড়ি গয়নাপত্র সব। একেবারে ঝুলি উজোর কবে। 

ওই ব্যাপার দেখেও রেখে এল! --সবিস্ময়ে প্রশ্ন করেছিল নীলাম্বর। 

হ্যাঁ স্যার, সব দেখে-শুনেই রেখে এল। 

তারপর?—জিজ্ঞাসা না করে পারে নি নীলাম্বর। 

তারপর আর বেশী কিছু নেই স্যার। ছোকরার জেল হল চোরাই গয়না বেচতে গিয়ে ধরা পড়ে। 

ইস্পাহনী গির্জেয় সাড়ে বারোটার ঘন্টা বাজল। 

আজ তবে উঠি স্যার। কখনো যদি আসেন বিড়ি আনবেন, ওই বাবুলালের দোকানের লাল সুতোর বিড়ি, একেবাবে ফাস্‌ কেলাস। 

লোকটা চলে গেল। নীলাম্বরের মনের ভুল হতে পারে, কিন্তু যাবার সময় তার হাতে যেন একটা ঘড়ির ঝিলিক দেখা গেল। শিউপরসাদের সেই ঘড়ি না কি? 

রিকশা সে রাতে আর মেরামত হয় নি। নীলাম্বরকে হেঁটেই যেতে হয়েছিল স্টেশনে। প্ল্যাটফর্মে শুয়েই রাত কাটিয়েছিল। 

তারপর রসকষহীন টাকা-আনা-পাই-এর নীলাম্বর আবার গেছল পার্কে। গিয়ে পড়েছিল ইস্পাহানী গির্জের ঘড়িতে সাড়ে এগারটার ঘন্টা বাজবার একটু আগে। গিয়ে কারুর দেখা আর পায় নি। 

পেয়েছিল পরে। ইস্পাহানী গির্জের ঘড়িতে হাঁপানো ঘড়ঘড়ে সাড়ে এগারটার ঘন্টা বাজবার পরে গিয়ে। 

আমরাও মর্জি হলে একদিন যেতে পারি তখন বাবুলালের দোকানের লাল সুতোর বিড়ি নিয়ে। 





লেখক পরিচিতি
প্রেমেন্দ্র মিত্র 
(জন্ম:৪ সেপ্টেম্বর,১৯০৪ - মৃত্যু: ৩ মে, ১৯৮৮) কল্লোল যুগের একজন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী বাঙালি কবি, ছোটগল্পকার, ঔপন্যাসিক এবং চিত্রপরিচালক। বাংলা সাহিত্যে তার সৃষ্ট জনপ্রিয় চরিত্রগুলি হল ঘনাদা, পরাশর বর্মা, মেজকর্তা এবং মামাবাবু।

প্রেমেন্দ্র মিত্র এক সময় কলকাতার ২৮ নম্বর গোবিন্দ ঘোষাল লেনের মেসবাড়িতে বাস করতেন৷ পরবর্তীকালে পড়াশোনার জন্য তিনি ঢাকাতে থাকতে শুরু করেন৷ একবার ১৯২৩ খ্রীষ্টাব্দের নভেম্বর মাসে ঢাকা থেকে কলকাতায় ফিরে এসে ওই মেসবাড়ির ঘরের জানলার ফাঁকে একটি পোস্টকার্ড আবিষ্কার করেন। চিঠিটা পড়তে পড়তে তার মনে দুটো গল্প আসে। সেই রাতেই গল্পদুটো লিখে পরদিন পাঠিয়ে দেন জনপ্রিয় পত্রিকা প্রবাসীতে। ১৯২৪ সালের মার্চে প্রবাসীতে 'শুধু কেরানী' আর এপ্রিল মাসে 'গোপনচারিণী' প্রকাশিত হয়, যদিও সেখানে তার নাম উল্লেখ করা ছিল না। সেই বছরেই কল্লোল পত্রিকায় 'সংক্রান্তি' নামে একটি গল্প বেরোয়। এরপর তার মিছিল(1928) এবং পাঁক(১৯২৬) নামে দুটি উপন্যাস বেরোয়। পরের বছর বিজলী পত্রিকায় গদ্যছন্দে লেখেন 'আজ এই রাস্তার গান গাইব' কবিতাটি।

প্রেমেন্দ্র মিত্রের প্রথম কবিতার বই ‌'প্রথমা' প্রকাশিত হয় ১৯৩২ সালে। বৈপ্লবিক চেতনাসিক্ত মানবিকতা তার কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য। প্রথম জীবনে তার ছোটোগল্পের তিনটি বই বেরোয় - 'পঞ্চশর', 'বেনামী বন্দর' আর 'পুতুল ও প্রতিমা'। মানুষের সম্পর্কের ভাঙ্গা গড়া, মনের জটিলতা, মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের ব্যথা বেদনার কথা প্রকাশে প্রেমেন্দ্র মিত্র ছিলেন স্বকীয়তায় অনন্য।

প্রেমেন্দ্র মিত্র প্রথম বাঙালি সাহিত্যিক যিনি নিয়মিত কল্পবিজ্ঞান বা বিজ্ঞান-ভিত্তিক গল্প-উপন্যাস রচনায় মনোনিবেশ করেন। তার বিজ্ঞান সাহিত্য রচনার শুরু ১৯৩০ সালে। রামধনু পত্রিকায় ক্ষিতীন্দ্রনারায়ন ভট্টাচার্য তাকে ছোটদের জন্যে লিখতে অনুরোধ করলে 'পিঁপড়ে পুরান' কাহিনীটি লেখেন। এটিই তার প্রথম কল্পবিজ্ঞান রচনা। 'কুহকের দেশে' গল্পে তার কল্পবিজ্ঞান ও এডভেঞ্চার কাহিনীর নায়ক মামাবাবুর আত্মপ্রকাশ। ১৯৪৮ সালে 'ড্র্যাগনের নিঃশ্বাস' বের হলে মামাবাবু পাঠক মহলে জনপ্রিয় হন। তার রচিত কয়েকটি বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান গল্প ও উপন্যাসের নাম নিচে দেওয়া হল:
ছোটোগল্প: "কালাপানির অতলে", "দুঃস্বপ্নের দ্বীপ", "যুদ্ধ কেন থামল", "মানুষের প্রতিদ্বন্দ্বী", "হিমালয়ের চূড়ায়", "আকাশের আতঙ্ক", "অবিশ্বাস্য", "লাইট হাউসে", "পৃথিবীর শত্রু", "মহাকাশের অতিথি", "শমনের রং সাদা"।
বড়ো গল্প ও উপন্যাস: পিঁপড়ে পুরাণ, পাতালে পাঁচ বছর, ময়দানবের দ্বীপ, শুক্রে যারা গিয়েছিল, মনুদ্বাদশ, সূর্য যেখানে নীল।

এছাড়া আকাশবাণীর উদ্যোগে লিখিত "সবুজ মানুষ" নামে একটি চার অধ্যায়ের বারোয়ারি কল্পবিজ্ঞান কাহিনির প্রথম অধ্যায় রচনা করেন প্রেমেন্দ্র মিত্র। অবশিষ্ট তিনটি অধ্যায় লিখেছিলেন অদ্রীশ বর্ধন, দিলীপ রায়চৌধুরী ও সত্যজিৎ রায়।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন