মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

জোসেফ ক্যাম্পবেল এবং তাঁর অতিপ্রাকৃত দুনিয়া


আদনান সৈয়দ

একবার লেখক এবং সাংবাদিক বিল ময়ার্স মিথ গবেষক জোসেফ ক্যাম্পবেলকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘মিথ তা হলে কীসের সংকেত দেয়? ক্যাম্পবেলের উত্তর ছিল, ‘মানুষের জীবনে আত্মিক সংযোজন ঘটাতে যে সংকেতের প্রয়োজন তা হলো মিথ।’

সন্দেহ নেই আমাদের জীবনের গভীর বিশ্বাসের সঙ্গে মিথ জড়িয়ে আছে। আমাদের জীবনের প্রতিটা ধাপ অর্থাৎ জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত প্রতিটা ধাপই বিচিত্র। আমাদের বিশ্বাস, আচার, যাপন, ধর্ম সবখানেই একটা রহস্য জড়িয়ে আছে।

সেই রহস্য কখনো আমাদের কাছে উন্মোচিত আবার বেশিরভাগ সময়ই তা রহস্যের চাঁদরে ঢাকা। মিথ যেখানে শেষ ধর্ম সেখানে শুরু। কিন্তু দেখা যায় আপনি যে ধর্মেরেই হন না কেন, বিশ্বাস আপনার যা-ই থাকুক না কেন আমরা কি কেউ মিথের বাইরে নই। প্রশ্ন আসতে পারে তাহলে মিথের উৎপত্তি কীভাবে হল? মিথের জন্ম রহস্যটাই বা কী? জোসেফ ক্যাম্পবেলের মনে করেন মিথের জন্ম তখনই যখন আমাদের পূর্বপুরুষেরা জঙ্গলে গিয়ে দল বেঁধে শিকার করতে যেত এবং শিকার করে ঘরে ফিরে তারা আগুনের চারপাশে গোল হয়ে বসে নানা রকম গল্পের জন্ম দিত।
 সেই গল্পগুলো ছিল সত্যমিথ্যার উপাদানে ঠাসা। কল্পনার আশ্রয় নিয়ে তার সেই শিকারকে কেন্দ্র করে নানা রকম মুখরোচক গল্প বানাতো। তাদের কেউ কেউ বলতেন কোন মৃত শিকার ধরতে যেয়েও আবার জঙ্গলে হারিয়ে গেছে। সেই শিকারটি আবার তাদের হাতে ধরা পরেছে কোন অদৃশ্য বনদেবতাকে তুষ্ঠ করে। তাদের ধারনা কোন বনদেবতা নিশ্চয়ই অদৃশ্যলোকে বাস করেন। এসবই তার কাজ। তা না হলে ঘাড়ে তীরের ফলা ঝুলিয়ে শিকার করা প্রাণীটা কোথায় হারিয়ে গেল! নিশ্চয়ই বনদেবতা কাউকে তুষ্ট করতে চায়? আবার সে মানুষই একদিন আবিষ্কার করল সৃষ্টির আরেক রহস্য!

সৃষ্টির কোন বিনাশ নেই। সবকিছু কোনো এক অদৃশ্য ইশারায় একই জায়গায় থেকে আরেক জায়গায় ভীন্ন নামে আবির্ভাব হয় মাত্র। অর্থাৎ নতুন কওে আরেক জীবন পাওয়া। ধরা যাক একটা ভুট্টাগাছে ভুট্টা হয় মানুষ বা অন্য কোনো প্রাণীর জীবনকে তুষ্ট করার জন্য। আবার এই ভুট্টা যখন মাটিতে পড়ে যায় তখন সে মিশে যায় মাটির সঙ্গে। মাটি থেকে তখন সূচনা হয় নতুন এক জীবনের। তা হলে দেখা যাচ্ছে গোটা পৃথিবী সৃষ্টিশীল চলমান এক রহস্য!

সৃষ্টিরহস্য কোথায়? এ নিয়েও রয়েছে প্রচুর মিথ।

মিথ নিয়ে ধারনা দিতে যেয়ে জোসেফ ক্যাম্পবেল এই গল্পটি বিভিন্ন সময়ে তার লেখায় উল্লেখ করতেন। একবার জাপানে ধর্মবিষয়ক আন্তর্জাতিক এক সভায় এক আমেরিকান সাংবাদিক প্রশ্ন করলেন সেখানকার এক জাপানিজ পুরোহিতকে, ‘আমরা তো এ যাবৎ আপনাদের অনেক অনুষ্ঠানে গেলাম এবং আপনাদের অনেক তীর্থস্থান দর্শন করেছি। আমরা কিন্তু এ পর্যন্ত আপনাদের কোনো আদর্শ খুঁজে পেলাম না।’ 

কথাটা শুনে জাপানিজ পুরোহিত নির্বিকার হয়ে আমেরিকান প্রশ্নকর্তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধিরে ধিরে বললেন, ‘না, আমাদের সত্যি আপনাদের মত কোনো আদর্শ নেই। আমাদের এত তত্ত্ব জ্ঞানও নেই। কারণ আমরা শুধু নেচেই বেড়াই।’

সত্যি, আমরা শুধু নেচেই চলেছি! কিন্তু এই নাচ কীসের নাচ? প্রকৃতির সঙ্গে নাচ কজন নাচতে পারে বলুন? বনের আদিবাসীরা সে নাচ জানে, প্রান্তিক মানুষজন সে নাচের মুদ্রা ঠিক ভালো করেই জানে, সাধারণ খেটে-খাওয়া মানুষও সে নাচ জানে কিন্তু শহুরে অতি শিক্ষিত অতি বিজ্ঞান মনস্করা সে নাচের মুদ্রা সম্পর্কে কেন জানে না? আমেরিকান সাংবাদিক অবশ্য সেই নাচের গূঢ় রহস্য বুঝতে পারেননি। তাই রক্ষে। তথাকথিত উন্নত বিশ্ব বলে দাবিদারদেও পক্ষে সে নাচের রহস্য জানা বা বোঝার ক্ষমতা শূণ্যের কোটায়, সন্দেহ নেই।

কথা হল সৃষ্টির সব রহস্যই কি উন্মোচন করা যায়? নাকি তা সম্ভব? মানুষ সৃষ্টির এক অংশ। অথচ প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের যে সম্পর্কটা স্থাপন করা জরুরি ছিল মানুষ তা কি করতে পেরেছে? সম্পর্কটা কেমন হওয়া উচিত ছিল?

সম্পর্কটা হওয়া উচিত ছিল প্রেমের, ভালোবাসার। প্রকৃতিরও নিজস্ব একটা আইন আছে। সে আইনকে কেউ লঙ্ঘন করলে তার জন্য শাস্তি পেতে হবে বইকি? প্রকৃতিরও একটা ধৈর্যশক্তি আছে। প্রকৃতির দেবী আছে, দেবতাও আছে।

তাদের ইচ্ছা-অনিচ্ছায় আপনি বাগড়া বসাবেন আর তারা চুপ করে বসে থাকবে এ কথা আপনি ভাবলেন কীভাবে? প্রকৃতিরও প্রতিশোধ আছে। প্রকৃতিও মাঝেমাঝে ফুসে ওঠে। প্রকৃতিও সুনামি হয়, দাবানল হয়ে গ্রাম-শহর সব উজাড় করে করে দেয়। ভুলে যাবেন না আপনি, আমি আমরা সবাই কিন্তু প্রকৃতির একটা অংশ। অতএব প্রকৃতির সরল সুন্দর রূপ নিয়ে যাচ্ছেতাইভাবে খেলা করা চলবে না। তা হলে দেবতা রুষ্ট হবে এ-ই স্বাভাবিক! জোসেফ ক্যাম্পবেল একটা গল্প বলতে ভালোবাসতেন। গল্পটা ছিল এমনÑ এক জঙ্গলবাসী সন্ন্যাসী এক আধুনিক শহুরে মিশনারি পাদরিকে জিজ্ঞেস করলেন, ‘আপনাদের ঈশ্বর তো সারা দিন ঘরেই তালাবদ্ধ হয়ে আবদ্ধ থাকে। আর দেখুন আমার ঈশ্বর থাকে জঙ্গলে, বৃষ্টিতে, মাঠেঘাটে, বৃষ্টির ফোটায়, সর্বত্র।’ এবার বুঝুন! প্রকৃতিকে বলবেন না আমি বিজ্ঞানের বাইরে কিছু বিশ্বাস করি না, আমি তোমাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করব।

বরং প্রকৃতির কাছ থেকে শিক্ষা নিন। প্রকৃতির যে চিরায়ত গানটি আমাদের কানে বার বার বাজার কথা ছিল তা নিজের আত্মায় স্থান দিন। জোসেফ ক্যাম্ববেল মিথ নিয়ে অজ¯্র আলোচনার মধ্যে প্রকৃতির এই বিষয়টিকেই সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।

আফ্রিকার কঙ্গো এলাকার পিগমি আদিবাসী মানুষদের মধ্যে একটি খুব জনপ্রিয় মিথ চালু আছে। মিথটা হলো এমন এক বালক বনের মধ্যে শিকার করতে যেয়ে সুন্দর একটি পাখি খুঁজে পেল। সেই পাখিটি সুন্দর করে গান গায়, শিষ দেয়। বালকটি অনেক উৎসাহে গানের পাখিটাকে বাড়ি নিয়ে এলো। বাড়িতে এনে সে তার বাবাকে বলল পাখিটির যতœ-আত্তি করতে, তার জন্য খাবার জোগাড় করতে। কিন্তু বাবা ছিল ভীষন কিপটে। সে পাখির কোনো দেখভাল তো করলই না বরং পাখিটাকে গলা টিপে মেরে ফেলল। সেই থেকে গানের পাখিটির মৃত্যুর সাথে মেওে ফেলা হল পাখির গানকেও। বনদেবতা এতে খুব রুষ্ট হলেন। তিনি পৃথিবী থেকে গানকে উঠিয়ে নিল। পৃথিবী গানশূন্য হলো। পৃথিবী রুষ্ট হলো, পৃথিবী থেকে ভালোবাসা উঠে গেল!

পিগমিরা বিশ্বাস করে পৃথিবীর সাথে বাড়াবাড়ি করার ফল খুব নির্মম। তারা যখন দল বেঁধে শিকার করতে যায় তখন তারা প্রকৃতির কাছ থেকে অনুমতি প্রার্থনা করে। তারপর সব রকম অনুমতি চাওয়ার আয়োজন শেষ হলে তখনই সবাই মিলে শিকার ধরতে যায়। প্রকৃতিকে রুষ্ট করে নয় বরং তার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্ক তৈরি করেই তারা তাদের প্রতিদিনের জীবন শুরু করে। কিন্তু এই বন্য পিগমিদের কাছ থেকে আমরা তথাকথিত আধুনিক মানুষরা কোনো শিক্ষা নিচ্ছি কী?

বিল ময়ার্স-এর এক প্রশ্নের উত্তরে মিথ বিশেষজ্ঞ জোসেফ ক্যাম্পবেল বলেন, ‘যতই মানুষ অথবা ফেরেশতাদের ভাষায় আপনি কথা বলুন না কেন যদি অন্তরে ভালোবাসা না থাকে তা হলে সেটি পিতলের আওয়াজ অথবা মন্দিরা ধ্বনির মতোই নশ্বর শোনাবে।’ তার মানে এখানে নিখাদ ভালোবাসার কথা বলা হয়েছে। যে ভালোবাসা প্রকৃতি নিত্যই লালন করে। আর মানুষের আত্মায় নিখাদ ভালোবাসা তৈরি করতে প্রয়োজন আধ্যাত্মিকতার। মিথকে বুঝতে হলেও প্রয়োজন সে গভীর উপলব্ধির।

আবার যেখানে কোনো খাদ নেই সেখানে কিন্তু ভালোবাসাও কঠিন। জোসেফ ক্যাম্পবেলের বলছেন, ‘কোনো খাদ নেই তেমন কিছুর উপর ভালোবাসা জন্মানো কঠিন! যিশুকে কিন্তু ক্রুশবিদ্ধ অবস্থাতেই বেশি ভালোবাসা যায়।’

‘আচ্ছা, মিথ আর স্বপ্নের মধ্যে পার্থক্যটা কী?’ মিথ তাত্ত্বিক এবং বিশেষজ্ঞ জোসেফ ক্যাম্পবেলকে একবার এই প্রশ্নটা করেছিলেন আরেক মিথ চিন্তক এবং প-িত বিল ময়ার্স। ক্যাম্পবেলের উত্তর ছিল, ‘মিথ হলো সম্মিলিতভাবে মানুষ যে স্বপ্নটা দেখেন আর স্বপ্ন হলো ব্যাক্তিগতভাবে মানুষ যখন কোনো স্বপ্ন দেখে।’

অতএব মিথকে আমরা সব মানুষের অন্তরে লালন করা স্বপ্ন বলতে পারি। যে স্বপ্ন মানুষ দেখে এসেছে অনাদিকাল ধরে। মানুষের বিশ্বাস, তার কল্পজগৎ, হতাশা, জয়, বীরত্ব সবকিছু মিলিয়ে মানুষকে একটা মিথরাজ্যের বাসিন্দা করে দেয়।

এবার মিথ নিয়ে প্রাচীনকাল থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত নানারকম গল্প নিয়ে জোসেফ ক্যাম্পবেলের বিখ্যাত গ্রন্থ The hero with a thousand faces  গ্রন্থে সন্নিবেশিত গল্পগুলোর উপর চোখ রাখা যেতে পারে। গল্পগুলো নিছক মিথকে ঘিরে শুধু কিছু কিংবদন্তি নয় বরং এই পৃথিবীর রক্তমাংসের মানুষের দৈনন্দিন যাপিত জীবনে মিথ কীভাবে জড়িয়ে আছে এবং একই সঙ্গে মানুষ সে মিথকে লালন করে কীভাবে প্রতিদিনের জীবনে পথ চলছে সে নিয়ে একটি দিগনির্দেশনাও রয়েছে এ গ্রন্থে। বলার অপেক্ষা রাখে, না আমরা কেউই কিন্তু এ মিথের জগতের বাইরের কেউ নই। আমাদের সবারই রয়েছে কিছু অদেখা এবং অতিপ্রাকৃত বিশ্বাসের কিছু গল্প আর কিছু অভিজ্ঞতাও।

১৯৪৯ সালের শেষের দিকে জোসেফ ক্যাম্পবেলের এ বইটি প্রকাশিত হয়েছিল।

সন্দেহ নেই গ্রন্থটি মিথের শক্তির পাশাপাশি সময়ের বিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ কীভাবে তার সংস্কৃতি, আধ্যাত্মিকতার পরিবর্তন ঘটিয়ে নতুন আরেক জগৎ নির্মাণ করেছে তার বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে। জোসেফ ক্যাম্পবেল সময়ের সাথে সাথে পৌরণিক বীরদের জীবনগাথাগুলো কীভাবে মানুষের আত্মা এবং শরীরে মিশে যেতে পারে তাও নিখুঁতভাবে নির্মাণ করেছেন এ গ্রন্থটিতে। লেখক সময়ের মাপকাঠিতে মানুষের অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞানকে তুলে এনেছেন এবং পাশাপাশি মানুষের জীবনের সাথে প্রকৃতি এবং মিথের ঐকতানকে প্রতীকীভাবে তুলে ধরেছেন।

গ্রন্থের শুরুতেই লেখক মিথ নিয়ে আমাদের আত্মায় গেঁথে থাকা কিছু বদ্ধমূল ধারণার বিষয় নিয়ে অবতারণা করেছেন। তিনি তুলে ধরেছেন আমাদের বদ্ধমূল এ ধারণাগুলো মূলত তিন ধরনের আধ্যাত্মিক এবং মনস্তাত্ত্বিক অবস্থানের উপর দাঁড়িয়ে আছে। প্রথম অবস্থানটি হলো আমাদের বিশ্বাসের সঙ্গে দীর্ঘদিন আমাদের আত্মায় লালন করা সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং বিশ্বাস। দ্বিতীয়ত মানুষের শারীরিক উপস্থিতির সঙ্গে আধ্যাত্মিক জগতের সম্পর্ক স্থাপন এবং তৃতীয়ত মিথের আলোকে মানুষের আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব এবং শারীরিক অস্তিত্বের প্রকাশ।

ক্যাম্পবেল গ্রন্থের শুরুতেই কবুল করেছেন যে এ গ্রন্থটি লেখার মূল উদ্দেশ্য হলো পৃথিবীর আধ্যাত্মিক জগৎকে আবিষ্কার করা। মিথের দুনিয়ার সঙ্গে বর্তমান এ দুনিয়ার একটি যোগসূত্র তৈরি করে দেওয়া এবং পাশাপাশি এই দুটোতে একটি আত্মিক সম্পর্ক তৈরি করা। এ কাজগুলো সম্পাদন করতে গিয়ে লেখক মিথে উল্লেখিত বীরদের জীবন এবং তাদের কাজগুলোকে তুলে এনেছেন। তাদের আলোকিত জীবন, শারীরিক এবং আত্মিক শক্তির খোঁজকেও তিনি সমানভাবে এ গ্রন্থে ব্যবহার করেছেন। এ গ্রন্থটির বেশির ভাগ পাতাজুড়েই রয়েছে মিথের বীরদের বাণী, তাদের বীরত্বগাথার গল্প। ক্যাম্পবেল কবুল করছেন যে মানুষের শক্তি সীমাহীন কিন্তু পাশাপাশি মিথের শক্তিও অসীম।

ক্যাম্পবেল তাঁর এ গ্রন্থে পরিষ্কারভাবেই জানিয়ে দিয়েছেন যে বর্তমান এ বিশ্বের মানুষ তাদের মূল সংস্কৃতি এবং বিশ্বাস থেকে অনেকটুকু দূরে সরে গেছে। প্রকৃতি আর মিথের শক্তির সঙ্গে একাত্ম হয়ে মানুষের শক্তি আর অভিজ্ঞতা ধিরে ধিরে গৌণ আর ফ্যাকাসে হয়ে পড়েছে। এ দূরত্ব হওয়ার কারণে মানুষ এখন প্রকৃতির সাথে মানুষের গোপন রহস্যটিই আর বুঝতে পারে না। আর সে কারণে মানুষ এখন প্রকৃতির ইশারা এবং রূপক বাণীকে তার আত্মায় আর স্থান দিতে পারছে না।

The hero's adventure গ্রন্থটির একটি জনপ্রিয় অধ্যায়। একজন মানুষের যাত্রা শুরু হয় এক সাধারণ পৃথিবী থেকেই। সে মানুষটি ধিরে ধিরে প্রকৃতির শক্তিতে বলিয়ান হয় এবং পরবর্তীতে মিথে পরিণত তার অদেখা শক্তিগুলো।

গ্রিক পুরাণের স্কাইলার কথা মনে আছে নিশ্চয়ই! সে কিন্তু ভয়ংকর এক দানব!

কোনো রকম ঝামেলা সে পছন্দ করেন না। হোমারের ‘অডিসি’তে অডেসিয়াস সমুদ্রে ঝড়ে এ ভয়ংকর দানবকে সামলে ছিলেন। কিন্তু মানুষ মানেই সর্বভুক। সে প্রকৃতিকে ধ্বংস করতে চায়। সবকিছু অধিকার করে সে নিজের হাতের তালুতে নিয়ে রাখতে চায়। তারা নিজের শক্তির মাধ্যমে আরেক জাতিগোষ্ঠীকে ধ্বংস করতে ব্যস্ত। আমেরিকানদের দিকে তাকিয়েই দেখুন। আমরা জানি আমেরিকার আদিবাসীদের কথা। তাদের জমি দখল করে এই আদিবাসীদেরকে জাদুঘরে স্থান দিয়ে এখন আমেরিকা বিশাল সাম্রাজ্যের অধিকারী। অথচ আমেরিকানদের প্রতিটা দখলকৃত সম্পদ, গাছপালা, মাটিতে রয়েছে আমেরিকার সাম্রাজ্যবাদীদের হিং¯্রতার ছাপ। ১৮৫৫ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্টি ফ্রাঙ্কলিন রেড ইন্ডিয়ানদের জমি কিনতে ইন্ডিয়ানদের নেতা সিয়াটলকে এক চিঠি লিখেন। যদিও পরবর্তীতে আমেরিকানদের নথিতে এ চিঠি সংরক্ষণ করার কোনো প্রয়োজন তারা মনে করেনি। জোসেফ ক্যাম্পবেল বিল ময়ার্সের এক প্রশ্নের উত্তরে নেটিভ দলনেতা চিফ সিয়াটলের সেই ঐতিহাসিক চিঠির কিছুটা অংশ তুলে ধরেছেন।

সিয়াটল আমেরিকান প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিনকে লেখা চিঠিতে বলেন, ‘আকাশ কি কখনো কেনাবেচা করা যায়? জমি কি কখনো কেনাবেচা করা হয়? বায়ু, পানির স্বচ্ছ রূপ এসব তো আমাদের কারো ব্যাক্তিগত সম্পদ নয়। তা হলে? কী করে তাদের কিনবেন আপনি? এ পৃথিবীর প্রতিটা ধূলিকণা আমাদের কাছে পবিত্র, প্রতিটা পাইনপাতার কাঁটা, প্রতিটা বালুকণা, ঘন অন্ধকারে প্রতিটা শিশিরকণা, মাঠ, পতঙ্গ সবকিছু আমাদের কাছে খুব পবিত্র।’

জোসেফ ক্যাম্পবেলের দর্শনে আবার ফিরে যাই। আমাদের জীবন কি মিথের বাইরে? পৃথিবীর সেই আদিকাল থেকে কিছু বিশ্বাস আমাদের চারপাশে সবসময় ঘিরে রেখেছে। আর সবকিছু কি বিজ্ঞান দিয়ে প্রমাণ করা সম্ভব? আমাদের প্রতিদিনের জীবনে যে আচার সে সবের উৎস নিয়ে আমরা কি কখনো ভেবেছি?

আমরা কি প্রতিনয়ত আমাদের জীবনাচরণের মধ্য দিয়ে মিথকে লালন করি না? গাছে একটা শালিক বসে থাকতে দেখলে মনটা খারাপ হয়ে যায় না? কেন খারাপ হয়ে যায়? আপনাদের নিশ্চয় মনে আছে ছেলেবেলায় ঘর থেকে বের হওয়ার সময় কোনো কারণে দরজার চৌকাঠে পা ফসকে পরে গেলে আমাদের মুরুব্বিগণ বলতেন আবার ঘরে ভেতরে ফিরে আস, একটু খানি বসে তারপর আবার ঘর থেকে বের হও। আচ্ছা আমরা কেন বাসা থেকে বের হওয়ার সময় বলি ‘আসি’। কেন বলি না ‘আমি গেলাম বা যাই’। অবাক হয়ে লক্ষ্য করলে দেখা যায় ঠিক একই রকমভাবে উত্তর-

পশ্চিম মেক্সিকোর আদিবাসীরা যখন এক বিশেষ জাতীয় ফণিমনসা (চবুড়ঃব) তুলতে যেত তখন তারা ঠিক এমন আচরণটিই করত। ঘর থেকে বের হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তারা বলত ‘আমরা আসছি’। তারা সে সময় এটি করত তাদের উৎসবের বিশেষ আংশ হিসাবে। যদি কোনো কাজ করতে তাদের ‘হ্যাঁ’ বলতে হতো তখন তারা বলত ‘না’। আবার ‘না’-এর জায়গায় তারা বলত ‘হ্যাঁ’। এ ছিল তাদের বিশ্বাস। দেখুন তাদের এ সাধারণ রিচুয়াল বা বিশ্বাসের সঙ্গে আমাদের জীবনের কত মিল রয়েছে!

মিথের বাইরে কি আমাদের জীবন? প্রকৃতির বাইরে কি আমরা? ক্যাম্পবেল তাঁর মিথ দর্শনের মধ্য দিয়ে অতিপ্রাকৃত দুনিয়ার সে খবরটিই আমাদের আত্মায় রোপণ করে দিতে চান।






লেখক পরিচিতি
আদনান সৈয়দ
প্রবন্ধকার। গল্পকার। অনুবাদক।
নিউ ইয়র্কে থাকেন। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন