মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

মনিজা রহমান'এর গল্প : ফেরারী আগন্তুক



ট্রেন স্টেশন থেকে নামার পরে মোতাহের হোসেনের কেমন মধ্যাকর্ষনীয় অনুভূতি হল। এটা তার মাঝেমধ্যে হয়। বিষয়টাকে ব্যাখ্যাহীন বলা যাবে না। ট্রেন স্টেশন পিছনে রেখে চললে শুধু এমন মনে হয়। আজকে যেমন ডিটমার্স বুলভার্ড স্টেশনকে পিছনে রেখে চলছেন তিনি এস্টোরিয়া পার্কের দিকে। গন্তব্য এক গ্রীক রেস্টুরেন্টে । 

মধ্যকর্ষনীয় অনুভূতির অনুরণন মোতাহের হোসেনের মনকে অস্থির করে দিতে চাইছে। শীতল নাতিশীতোষ্ণ বাতাসে লম্বা নি:শ্বাস নিয়ে দীর্ঘ সময় ধরে সেটা ধরে রাখার চেষ্টা করেন তিনি। তারপর আস্তে আস্তে দম ছাড়েন। মনটাকে যেভাবে হোক শান্ত রাখতে হবে। তার আজকের এই যাত্রা, চারপাশের বায়ুমন্ডলে ঘটে যাওয়া সূক্ষ্নাতিসূক্ষ্ন ঘটনা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে কোন উপায়ে তাকে আজ স্বাভাবিক থাকতে হবে। নিপুণ শিল্পীর মতো দক্ষভাবে প্রতিটি বিষয় তুলে ধরতে হবে। ডাক্তার মাসুদ আহমেদ যাতে বুঝতে পারেন আসলেই কি হয়েছিল সেদিন। বহু বছর আগে জীবনে ঘটে যাওয়া একটা ভয়ংকর ঘটনার ব্যাখ্যা পাওযা দরকার। দীর্ঘদিন ধরে মস্তিস্কে কোষে জমে থাকা বিভৎস ক্লেদ যেভাবে হোক মুছে ফেলতে চান তিনি। 

মাসুদ আহমেদের নাগাল পেতে মোতাহের হোসেনের দীর্ঘ সময় লেগেছে। ওনার নম্বর ছিল না তার কাছে। ফেসবুকে বন্ধু হবার অনুরোধ পাঠিয়েছিলেন, উনি সেটা অনুমোদন দেননি। মেসেঞ্জারেও একই অবস্থা। পরে মোতাহের হোসেন খেয়াল করে দেখলেন, মাসুদ আহমেদ নামমাত্র ফেসবুক এ্যাকাউন্ট খুলে রেখেছেন। কোন ধরনের তৎপরতা নেই। পরে এক পরিচিত ব্যাক্তির বাসার পার্টিতে ওনার ছবি দেখে নানাভাবে চেষ্টা করে অবশেষে যোগাযোগ করতে পেরেছেন। তারপর আজ বিকাল চারটায় উনি সময় দিয়েছেন এস্টোরিয়া ডিটমারসের এক গ্রীক রেস্টুরেন্টে। 

ট্রাফিক পুলিশের কাজের সূত্রে এই এলাকায় কাজ করতে গিয়ে মোতাহের হোসেন দেখেছেন, গ্রীক রেস্টুরেন্টের নামের শেষে ট্রাভের্না শব্দটা থাকে। তাদের আজকের রেস্টুরেন্টের নাম ট্রাভের্না কাইক্লাডেস। সামনে হ্যালোউইন উৎসবের কারণে যেতে যেতে চারদিকে বিশেষভাবে সাজানো দেখতে পান। ভুত-প্রেত নিয়ে এদেশের মানুষের এত মাতামাতি মোতাহের হোসেনকে বিরক্ত করে। । যত্তসব। তবে এসব বিরক্তি সত্ত্বেও মনের মধ্যে চাপা উত্তেজনা কমাতে পারছিলেন না মোতাহের হোসেন। পায়ের নীচে পরে থাকা প্রতিটি শুকনো পাতার মচমচ শব্দ কানের মধ্যে তীব্র অনুভূতির জন্ম দিচ্ছিল। 

ট্রাভের্না কাইক্লাডেসের সামনে পৌছাতেই মাথা ভর্তি কাঁচা পাকা চুলের একজন এগিয়ে এলেন। ‘ আপনি মোতাহের হোসেন?’ 

মোতাহের হোসেন মাথা নেড়ে সায় দেবার পরে উনি হাত মেলালেন। ভদ্রলোকের সারা শরীর থেকে মনে হল এক ধরনের উষ্ণ উত্তাপ বের হচ্ছে। মোতাহের হোসেন শুরুতেই যেন সম্মোহিত হয়ে গেলেন। তার বয়স এখন বায়ান্নো চলছে। ‘ভদ্রলোক মনে হয় আমার চেয়ে পাঁচ-সাত বছরের ছোট হবেন। তবে জীবনের অভিজ্ঞতায় বহু মাইল এগিয়ে তিনি আমার চেয়ে।’- মনে মনে ভাবলেন মোতাহের হোসেন। 

’এই রেস্টুরেন্টের কফি খুব ভালো। আপনার জন্য বলি?’ মুখোমুখি দুটি চেয়ারে বসার পরে বললেন মাসুদ আহমেদ। 

’জি আমি চা-কফি খাই না।’ আদতে কি খাবেন মোতাহের হোসেন বুঝতে পারছিলেন না। বিদেশী রেস্টুরেন্টে খেতে এলে তার এই সমস্যা হয়। মাসুদ আহমেদ নিজের জন্য ফেটা চীজ সালাদ দিতে বললেন। তারপর গ্রীকদের কাছে অতি প্রিয় এই চীজের ওপর ছোট খাট বক্তৃতা দেয়া ‍শুরু করলেন। মোতাহের হোসেন বুঝতে পারছিলেন, তাকে স্বাভাবিক করার চেষ্টার প্রক্রিয়া মাত্র। সৌজন্যপর্ব শেষ হলে মাসুদ আহমেদ তাকে অনুরোধ করলেন- ওই দিনের ঘটনার বর্ণনায় যাবার জন্য। বার বার বলে দিলেন বিস্তারিতভাবে সব কিছু জানাতে। 

মোতাহের হোসেন শুরু করলেন 

….”আমার জন্ম ও বেড়ে ওঠা ময়মনসিংহ শহরে। তবে শহরে থাকলেও গ্রামের সঙ্গে সম্পর্ক ছিল নিবিড়। দাদাবাড়ি আর নানাবাড়িতে নিয়মিত যাওয়া হত। বিশেষ করে নানা ও নানী জীবিত থাকায় ওখানে যাওয়া হত বেশী। 

ময়মনসিংহ শহর থেকে আশি কিলোমিটার দূরে আমার নানাবাড়ি। আজ থেকে পঁয়ত্রিশ বছর আগের ঘটনা বলছি। তখন স্বাভাবিকভাবে যাতায়ত ব্যবস্থা এখনকার মতো ভালো ছিল না। 

তিনভাবে যাওয়া যেত নানার বাড়িতে। 

প্রথমে ময়মনসিংহ থেকে ব্রক্ষ্মপুত্র নদ পার হয়ে লোকাল বাসে বা ট্রেনে ইশ্বরগঞ্জে। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে নানাবাড়ির গ্রাম আমুদপুর। প্রায় বারো কিলোমিটার হাঁটতে হত। কাঁচা রাস্তায় রিক্সা চলতো। তবে রাস্তা ভালো না হওয়ায় রিক্সায় প্রচুর ঝাঁকি খেতে হত বলে হেঁটে যেত সবাই। 

দ্বিতীয় পথ হল নৌকায়। ব্রক্ষ্মপুত্র নদে নৌকায় উচাটিলা বাজার পর্যন্ত। ওখানে ঘাটে নেমে দেড় কিলোমিটার হাঁটলেই নানাবাড়ির গ্রাম। 

তৃতীয় পথটা একটু জটিল। ঢাকা-ময়মনসিংহ ট্রেনে চড়ে আহম্মদবাড়ি স্টেশনে নামতে হবে। তারপর ব্রক্ষ্মপুত্র নদ পার হতে হবে। এরপর পড়বে একটা বিশাল চর। সেখানে কয়েক কিলোমিটার হাঁটা কিংবা সাইকেল চালালে কাঁচামাটিয়া নদী। সেই নদী পার হলে উচাকৈলা বাজার। 

তৃতীয় পথটি জটিল হলেও সাইকেল থাকলে বেশ আরামদায়ক ও সময় কম লাগে। ওই দিন ‍তৃতীয় পথে নানাবাড়ি রওনা হই আমি। 

ম্যাট্রিক পরীক্ষা শেষ হয়েছে তিন দিন আগে। মার্চ মাসের শেষভাগ চলছে। অর্থাৎ বাংলা চৈত্র মাসের শুরু। এইটুকু ভালোভাবে মনে আছে। 

নানাবাড়ির গ্রাম আমুদপুরের প্রতি শৈশব থেকে অন্যরকম টান আমার। এমন কোন গাছ নেই যে ওই গ্রামে নেই। শান বাঁধানো পুকুর। বিশাল বিল। সেই বিলে দিনভর মাছ ধরতাম আমরা। নানার অবাধ প্রশ্রয়, নানীর বানানো পিঠাপুলি সব মিলে প্রচন্ড আকর্ষণ বোধ করতাম নানাবাড়ির প্রতি। 

ট্রেনে সাইকেল বেঁধে নিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। তখন অনেকেই এভাবে যেত। ময়মনসিংহ শহর থেকে বেলা তিনটায় সাধারণত ট্রেন ছাড়ে। লোকাল ট্রেন। জামালপুর থেকে আসে। ঐদিন কোন কারণে ট্রেন আসতে দেরী করেছিল। তিনটার ট্রেন ছাড়ল চারটা দশ মিনিটে। যথারীতি ট্রেনের সঙ্গে সাইকেল বেঁধে রওনা দিলাম। চল্লিশ মিনিটের মধ্যে পৌছে গেলাম আহম্মদবাড়ি স্টেশনে। 

তখন নতুন সিগারেট খাওয়া শুরু করেছি। চায়ের দোকানে ঢুকে পাঁচটা গোল্ডলিফ সিগারেট কিনলাম। তারমধ্যে একটা ধরালাম। ধোয়া ছাড়তে ছাড়তে গেলাম জিলকি ঘাটে। ওখানে সব সময় দুটি ডিঙি নৌকা বাঁধা থাকে। ওপারের ঘাটের নাম বটতলা।…………. এতটুকু বলার পরে থামলেন মোতাহের হোসেন। প্রশ্ন করলেন, ‘বর্ণনা বেশি দিচ্ছি বলে বিরক্ত হচ্ছেন নাতো?’ 

’না না আপনার মতো করে বলুন। আর এসব কাহিনীতে বর্ণনা বেশী থাকা জরুরী। তাহলে আমার বুঝতে সুবিধা হবে।’ মাসুদ আহমেদ জানালেন। ‘তখন কটা বাজে মনে আছে? ভৌতিক গল্পে সময়টা জানা খুব জরুরী। আপনার আগের বলা সময় অনুযায়ী তখন পাঁচটার বেশী হওয়ার কথা।’ 

’ঠিক বলেছেন।’ মোতাহের হোসেন একটু ভেবে বললেন। ‘ তখন ওই রকমই বাজে। তো ঘাটে এসেছি। ওই সময়ে ঘাটে টোল দিতে হত চার আনা। তবে সাইকেল নিয়ে গেলে এক টাকা। তো এক টাকা দিয়ে নৌকায় উঠলাম। 

নৌকায় ওঠার পরে চারদিক কেমন অন্ধকার হয়ে এসেছে। আকাশে সূরযর দেখা নাই। মাঝিরা আল্লাহর নাম নিয়ে নৌকা বাইতে লাগল। বটতলা ঘাটে নৌকা ভিড়িয়ে আর ছাড়ল না। নদীতে ঝড় উঠলে মহাবিপদ। 

আমি দুশ্চিন্তার মধ্যে পড়লাম। যে জায়গায় নেমেছি সেটা একটা বিশাল চর। আশেপাশে কোন বাড়ি ঘর নাই। একের পর এক ক্ষেত। কোনটাতে ক্ষিরা, কোনটায় তরমুজ কিংবা বাঙ্গি লাগানো আছে। 

ঝড় ওঠার শুরুতে প্রচন্ড বাতাস বইতে লাগলো। সেই সঙ্গে বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি। দ্রুত সাইকেল চালিয়ে আশ্রয় খুঁজতে লাগলাম। মাঠের এক প্রান্তে একটা ছোট ঘর ছিল। বেড়ার ঘর। ওপরে শনের ছাদ। ওই ঘরে বসে মাঠের ফসল পাহাড়া দিত খোরশেদ নামে নানার পরিচিত এক লোক। লোকটাকে আমি মামু ডাকতাম। 

এই পথে যাবার সময় খোরশেদ মামুর ওখানে প্রতিবারেই থামতাম। পানি খেতে খেতে কিছুক্ষণ বিশ্রাম নিতাম। টুকটাক কথা হত। 

আমার নানা নামী লোক ছিলেন। উনি উচাখিলা হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। পাশাপাশি কাজিগীরিও করতেন। আশেপাশে দশ-বারো গ্রামের মধ্যে এমন কোন কেউ নেই যে নানাকে চিনতো না! আমার মামা রাজনীতি করতেন। একবার এমপি হয়েছিলেন এলাকায়। আমার নানাবাড়ির সদস্যরা বেশ সম্মানিত ছিলেন পুরো এলাকায়। 

ঘাট পার হলে বটতলা। সেখান থেকে দ্রুত সাইকেল চালিয়ে ওই ঘরে এলাম। ঘরের সামনে একটা দরজা আর পিছনে আরেকটা। সামনে এক চিলতে জায়গা বারান্দার মতো। সেই বারান্দায় দুইটা টুল আছে। সাইকেল বাইরে রেখে আমি টুলে বসলাম। 

পকেট থেকে রুমাল বের করে মাথা মুছলাম। ঘরের ভিতরে অন্ধকার। দরজা দিয়ে ভিতরে উঁকি দিলাম ‘মামু আছেন নাকি?’ 

চোখে অন্ধকার সয়ে এলে দেখি ভিতরে একজন মানুষ শুয়ে আছে। গায়ে একটা চাদর। এই গরমের মধ্যে গায়ে চাদর দিয়ে শুয়ে থাকার কারণ বুঝতে পারলাম না। ‘মামু নাকি?’ আস্তে করে বললাম। চাদর না সরিয়ে ‘হু’ বলে উত্তর দিল লোকটি। 

আমার কেমন যেন সন্দেহ হল। ব্যাপার কি? খোরশেদ মামুর কি হল? জ্বর নাকি! ‘মামু ম্যাচ আছে? ম্যাচ দেন। আসেন বিড়ি খাই।’ 

আমার কথা শুনে চাদর গায়ে মোচড় দিয়ে উঠল লোকটা। গোঙানির মতো একটা আওয়াজ হল। অনেকটা কুকুরের আওয়াজের মতো। তখনও বুঝিনি এটা অন্য কিছু হতে পারে। 

একটা কথা শুধু মনে হতে লাগলো, মামু তো এমন কখনও করে না। নানার কারণে আমাকে অনেক খাতির করেন। এখানে এলে নাড়ু, পিঠা, মুড়ি কিছু একটা দিয়ে সমাদর করবেনই। আজ এমন করছেন কেন? 

ভাবতে ভাবতে আমি বারান্দায় চলে এলাম। মিনিট খানেক পরে আবার ঘরের ভিতরে উঁকি দিয়ে দেখি কেউ নেই ভিতরে। এত দ্রুত ঘর থেকে বের হয়ে গেল কিভাবে? আমার মাথায় কিছু ঢুকছিল না। ভাবলাম, পিছনের দরজা দিয়ে মনে হয় ক্ষেতে গেছে। পিছনের দরজার কপাটদুটি আলগা করে লাগানো ছিল। হালকা ধাক্কা দিয়ে দরজা খুলে মাঠের দিকে তাকিয়েও কাউকে দেখতে পেলাম না। ঘরের পাশে বেড়া দেয়া একটা জায়গা আছে প্রাকৃতিক কাজ সারার জন্য। সেখানেও দেখতে পেলাম না কাউকে। 

এতক্ষণে চারদিক পুরোপুরি অন্ধকার হয়ে গেছে। দূরের কিছু দেখা যাচ্ছে না। প্রচন্ড বাতাসের সঙ্গে বৃষ্টিও তখন ঝরছে। 

আমি আবার পিছনের দরজা দিয়ে বাইরে ক্ষেতের দিকে তাকালাম। লোকটা গেল কোথায়? উনি কি আসলেই খোরশেদ মামু? কিন্তু তাহলে রুমের মধ্যে এমন অদ্ভূত ব্যবহার কেন করলেন? 

কেমন একটা অস্বস্তিবোধ শুরু হতে লাগল। আশেপাশের তিন কিলোমিটারের মধ্যে কোন ঘরবাড়ি নেই। চারদিক অন্ধকার হয়ে গেছে। নিজেকে কখনও এত অসহায় লাগেনি জীবনে। 

হঠাৎ দেখি ষাট-সত্তর গজ দূরে চাদর গাযে দিযে লোকটা দৌড়াচ্ছে। আমাকে দেখে সে তাকাল। ঠিক ওই সময়ে বাজ পড়ার শব্দের সঙ্গে বিজলি চমকাল। সেই বিজলির আলোয় স্পষ্ট দেখলাম এক মুখ। সেই মুখ না দেখলে ভালো হতো। ভয়ংকর বীভৎস এক চেহারা। কোন মানুষের চেহারায় এমন অশুভ ছাপ থাকতে পারে ভাবতে পারিনি। মনে হল মানুষ নয়, পিশাচের চেহারা…….. ” এই পর্যন্ত্য বলে থামলেন মোতাহের হোসেন। 

যাকে বলে রীতিমত নাটকীয় বিরতি নিলেন তিনি। 

গ্রীক রেস্টুরেন্টের মালিক ভদ্রমহিলার দেয়া বিরাট আকারের ঠান্ডা পানির গ্লাসের গায়ে ফোটায় ফোটায় জল জমেছে। মোতাহের হোসেন আঙ্গুল দিয়ে সেই বিন্দু জল মিলিযে দিলেন গ্লাসের সঙ্গে। তারপর বড় করে নি:শ্বাস নিয়ে পুরো গ্লাসের পানিটা ঢকঢক করে পান করেন। তার চোখ মুখে কেমন একটা বিহ্বল ভাব। সেদিকে চোখ রেখে মাসুদ আহমেদ একটা সিগারেট ধরাতে গেলেন। পরে আবার কি মনে করে রেখে দিলেন। মোতাহের হোসেনের ধুমপান বিষয়ক বর্তমান স্ট্যাটাসটা জানা হয়নি। 

মাসুদ আহমেদ সিগারেট প্যাকেটটা বের করে সামনে রাখলেন। মোতাহের হোসেনের মনোযোগ অন্যদিকে। দেয়ালে মা মেরির কোলে যীশুর একটা ছবি, সেদিকে তাকিয়ে আছেন। মনে মনে কি কোন আধ্যাত্নিক যোগসূত্র খুঁজছেন? 

মোতাহের হোসেন শার্টের হাতা গুটিয়ে ইশারায় দুই হাত দেখালেন। ’ দেখুন কত বছর আগের ঘটনা। তবু এখনও ঘটনাটা বলতে গিয়ে শরীরে কেমন কাঁটা দিয়ে উঠছে।’ 

’পরে কি ঘটেছিল সেটা বলুন?’ মাসুদ আহমেদ মৃদু স্বরে জানতে চাইলেন। 

’হ্যা বলছি…’ ভয়ংকর চেহারার লোকটাকে দেখার পরে আমি আর ওখানে এক মুহূর্ত থাকার সাহস পেলাম না। প্রবল বৃষ্টির মধ্যে সাইকেল চালিয়ে রওনা হলাম ঘাটের উদ্দেশ্যে। সমস্ত শক্তি দিয়ে প্যাডেল ঘোরাতে লাগলাম। ভয় হচ্ছিল যে কোন সময়ে পিছন থেকে ভয়ংকর চেহারার লোকটা আমাকে ধরে ফেলবে। এক সময়ে ঘাটে গিয়ে পৌঁছালাম। ওখানে কিছু লোকজন ছিল। তাদের সাহায্য নিয়ে কাঁচামাটি নদী পার হলাম ডিঙ্গিতে। অবশেষে যখন নানাবাড়ির উঠানে পা রাখলাম তখন পাশের মসজিদে এশার আজান দিচ্ছে। 

ওই রাতে আর কাউকে কিছু বললাম না। বলব কি, আমি নিজেই তখন স্বাভাবিক হতে পারিনি। নানা-নানী ভাবলেন, ঝড় বৃষ্টির মধ্যে এসেছি তাই হয়ত ঠিক স্বাভাবিক হতে পারছি না। 

পরদিন সকালে নানাবাড়িতে কাজ করতে এলেন আকবর আলী। নানাবাড়ির দীর্ঘদিনের কামলা। আগ দুপুরে ওনাকে বললাম পুরো ঘটনা। 

’কও কি তুমি জানো না খোরশেদের কি হইছে?’ আকবর আলী উত্তেজিত মুখে বলেন। 

’কি হয়েছে ওনার? আমি কিভাবে জানবো! আমি কি এখানে থাকি নাকি! বলো না, কি হয়েছে?’ আমি উদ্বিগ্ন কণ্ঠে জানতে চাই। 

’খোরশেদকে ডাকাতরা খুন করেছে। মাস খানেক আগের ঘটনা। ওর কাছে ফসল বিক্রির টাকা ছিল। ডাকাতরা ওকে খুন করে সব টাকা নিয়ে চলে যায়।’ 

আগের দিন সন্ধ্যার মতো প্রচন্ড ভয় ঘিরে ধরল আমাকে। কেমন যেন অসুস্থ বোধ করতে লাগলাম। ওখানে পরে সাত-আট দিন ছিলাম। এই কদিন সন্ধ্যার পরে আর ঘর থেকে বের হইনি। নানা-নানীকে যে ঘটনাটা বলব সেই সাহস হয়নি। 

ময়মনসিংহ ফেরার সময় আর ওই পথে আসিনি। নানা ঈশ্বরগঞ্জ পর্যন্ত এগিয়ে দেন। সেখান থেকে বাসে করে বাড়ি ফিরি। 

মোতাহের হোসেন তার কাহিনী শেষ করে সামনে রাখা প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নেন। মাসুদ আহমেদ ধরিয়ে দেন সিগারেটটা। নীরবে কিছুক্ষণ ধুমপান করেন দুজন। নীরবতা ভেঙ্গে মাসুদ আহমেদ প্রশ্ন করেন, ‘আপনি কি শুনতে চাইছেন আমার কাছ থেকে?’ 

’আপনারা মনোচিকিৎসকরা সব সময় বলেন, পৃথিবীতে ভুত-প্রেত বলে কিছু নেই। পুরোটাই মানুষের কল্পনা। আমার একটা ব্যাখ্যা দরকার।’ 

’আপনি এই ঘটনাটা নিশ্চয়ই আগে অনেককে বলেছেন?’ মাসুদ আহমেদ প্রশ্ন করেন। 

’আকবর আলী ছাড়া আর কাউকে বলিনি। নানাবাড়ি থেকে আসার দুই সপ্তাহ পরে আকবর আলীর বজ্রপাতে মৃত্যু হয়। ’ 

’আপনি তখন আবার ভয় পেয়েছেন। মনে মনে ভেবেছেন ওই ঘটনা বলার সঙ্গে আকবর আলী বজ্রপাতে মৃত্যুর কোন যোগসূত্র আছে।’ 

’হ্যা সেটাই ভেবেছি। যদিও কোন ব্যাখ্যা নেই। তাছাড়া আকবর আলী বলেছিল, মাঠের ধারে লোকটা খোরশেদ মামুই ছিল। অপঘাতে মৃত্যু হলে তার প্রেতাত্না ওই জায়গায় আবার ফিরে আসে।’ 

ঠান্ডা কফির কাপে চুমুক দিয়ে হেসে ওঠেন মাসুদ আহমেদ। ’কিন্তু আপনি ওর কথায় বিশ্বাস করেননি! করলে আমাকে খুঁজে বেড়াতেন না!’ 

মোতাহের হোসেন শুধু মাথা নাড়েন। মুখে কিছু বলেন না। 

’আসলে ওই লোকটা আপনার খোরশেদ মামু ছিল না। আপনি অকারণে একটা আতংক এতদিন বয়ে বেড়িয়েছেন।’ 

’তাহলে কে ছিল? কেন সে একটা নির্জন ঘরে চাদর গায়ে শুয়ে ছিল?’ মোতাহের হোসেন জানতে চান। 

’ যে ডাকাত দল খোরশেদকে খুন করেছিল, সেই দলে সম্ভবত তার কোন নিকট আত্নীয় ছিল। খুন করার পরে তার মধ্যে প্রচন্ড অনুশোচনার সৃষ্টি হয়। অনেকের মধ্যে এমন হয়। একটা বড় অপরাধ করার পরে কেউ কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে। নিজেকে কোনভাবে ক্ষমা করতে পারছিল না। বারবার সেই অপরাধের জায়গায় যে কারণে ফিরে আসে। ওই লোকটাও যে কারণে খোরশেদের ঘরে এসে থাকতো।’ মাসুদ আহমেদ বলেন। 

’কিন্তু লোকটার চেহারার বিভৎসতা…. তার কি ব্যাখ্যা দেবেন?’ জানতে চান মোতাহের হোসেন। 

’হ্যা লোকটার চেহারা হয়ত ভালো ছিল না। লোকটা ডাকাত, খুনী, নিষ্ঠুর প্রকৃতির মানুষ। তবে আপনি যতখানি ভয়ংকর দেখেছেন, ততটা নাও হতে পারে। আপনার মনের মধ্যে জমে থাকা আতঙ্কের কারণেও লোকটাকে আপনার এমন বীভৎস মনে হতে পারে।’ 

মোতাহের হোসেনের মস্তিস্কের নতুন পাওয়া তথ্যের ভার নিতে সময় লাগে। তিনি কতক্ষণ স্তব্ধ হয়ে বসে থাকেন। হঠাৎ খেয়াল করেন জোরে হাওয়া বইছে। সেই সঙ্গে বড় বড় ফোটায় বৃষ্টি । কোন ধরনের পূর্বাভাষ ছাড়াই ঝড় বৃষ্টি আরম্ভ হয়ে গেছে। 

মোতাহের হোসেন ভয়ার্ত চেহারায় মাসুদ আহমেদের দিকে তাকান। তাঁর ভয় যত না নিজের জন্য, তার চেয়ে বেশী মাসুদ আহমেদের জন্য। 



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন