মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

করোনাকালের গল্প : লকডাউন


মূল: নজিউই সিন্থিয়া জেলে 
অনুবাদ : ফজল হাসান


১৪ জুন ২০২০ 

গত নব্বই দিন ধরে ভদ্রলোক এখানে আছেন এবং তিনি তা ভালো করেই জানেন । কারণ রাষ্ট্রপতি যেদিন জাতীর উদ্দেশ্যে ভাষণ দেওয়ার কথা ঘোষণা করেছেন, সেদিনের কথা মনে করে ভদ্রলোক নিশ্চিত হন যে তিনি সেই সময় টেলিভিশনের সামনে বসা ছিলেন এবং টেলিভিশনের পর্দার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়েছিলেন । রাষ্ট্রপতি পুরো দেশ লকডাউনে থাকার হুকুম জারি করেছেন । কেননা ভাইরাস উদ্বেগজনক হারে বেড়ে যাচ্ছিল । 

রাষ্ট্রপতির ভাষণ শেষ হওয়ার পরমুহূর্তেই হোটেলের রিসেপশন থেকে ফোন আসে । 

‘স্যার, আমি নোমা, রিসেপশন থেকে বলছি । আপনি কী ভাষণ দেখেছেন?’ 

‘হ্যাঁ । আমাকে বাড়ি ফিরে যেতে হবে ।’ 

‘আমার মনে হয় আপনি যেতে পারবেন না, স্যার । সব এয়ারপোর্টৈ বন্ধ করে দিয়েছে । চলাফেরার কোন অনুমতি নেই । ইতোমধ্যে রাস্তায় সেনাবাহিনীর নেমে গেছে । লকডাউন তুলে নেওয়া পর্যন্ত আপনার আরাম আয়েশের জন্য আমরা সর্বাত্বক ব্যবস্থা করবো ।’ 

‘কতদিন এমন অবস্থা থাকবে?’ 

‘আমরা জানি না । স্যার, আপনার নিজের সুরক্ষার জন্য আপনাকে কক্ষেই থাকতে হবে । আমি কী আপনার জন্য অন্য কিছু করতে পারি?’ 

ভদ্রলোক মাথা নাড়েন । 

‘স্যার?’ 

‘না ।’ 

বলেই ভদ্রলোক ফোন কেটে দেন । তারপর তিনি জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ান । যখন সময় অনুকূল হবে, তখন তিনি সমুদ্রের ধারে হাঁটবেন এবং তাকে গিলে খাওয়ার জন্য সমু্দ্রকে সুযোগ দেবেন । 

তিনি একটা চেয়ার টেনে বসেন এবং ল্যাপটপ অন করেন । তারপর লিখতে শুরু করেন--

১৫ মার্চ ২০২০ 

লকডাউন । 


২১ মার্চ ২০২০ 

বাইরে থেকে দরজায় একটা টোকার শব্দ তার দুপুরের খাবারের কথা জানান দিয়ে যায় । তিনি দরজা খুলে দেখেন মেঝেতে খাবারের ট্রে রাখা আছে । 

হোটেলের লোকজন তার কক্ষের নিরাপত্তামূলক সাদা কাপড়ে ঢাকা জিনিসপত্র পরিস্কার করে দিয়ে যায় । কিন্তু তিনি ওদের মুখ দেখতে পারেন না । প্রতিদিন তিনি তার মা এবং মেয়ের সঙ্গে ফোনে কথা বলেন । না, আমি ভয় পাই না । শীঘ্রই ফিরে আসছি । 


৩ মে ২০২০ 

টেলিভিশনের পর্দায় খবরের আলোর ঝলকানি । ভাইরাস, আইসোলেট, টেস্ট, ট্রীট, ট্রেইস । নতুন সংক্রমণ চার গুণ হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে, এমনকি মৃত্যুও । তিনি খবর দেখা ছেড়ে দিয়েছেন । মাস্ক পরিহিত সৈনিকেরা রাস্তায় টহল দিচ্ছে । 


২৯ মে ২০২০ 

বিদ্যুৎ যায় এবং আসে । তিনি কেটলি গরম রাখেন । 

ভদ্রলোক মনে করতে পারেন না এখানে তিনি কেন আছেন । সমুদ্রের তরঙ্গে সুরের মুর্ছনা । যোগাযোগের নেটওয়ার্ক অচল । তিনি রিসেপশনে ডায়াল করেন । 

ভদ্রলোক জেগে উঠেন এবং একবার নড়েচড়ে উঠে বসেন । তার কানে শব্দ ভেসে আসে । তিনি দাঁড়ান এবং প্রচন্ড শক্তি দিয়ে জানালার পর্দা সরিয়ে দেন । কাঁচের মতো স্বচ্ছ এক ডজন চোখ তার দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে । তৎক্ষণাৎ তিনি হোঁচট খাওয়ার ভঙ্গিতে পেছনে সরে আসেন । উড়ে যাওয়ার আগে এক ঝাঁক কবুতর মলিন চোখে তাকে দেখছিল । যতক্ষণ পর্যন্ত কবুতরগুলোর তার দৃষ্টির সীমানার ভেতরে ছিল, ততক্ষণ তিনি পাখিগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিলেন । 

তারপর তিনি দৃষ্টি ঘুরিয়ে নিয়ে সমুদ্রের দিকে মেলে ধরেন এবং দেখতে থাকেন ঢেউয়ের তালে উপরে-নিচে সাঁতার কাটা শরীরগুলোকে । একসময় তিনি সৈকতের দূরের পানে তাকান । সেখানে সারিবদ্ধ ভাবে মাছ ধরার ছিপ রাখা হয়েছে । জগিং করা লোকেরা পাশ কেটে চলে যায় । তিনি একবার চোখের পাতা বন্ধ করেন এবং পুনরায় খোলেন । 

হঠাৎ ফোন বেজে উঠে । তিনি চমকে উঠেন । 

‘মিষ্টার মাখআনয়া, আপনাকে সজাগ করার জন্য ফোন করেছি । এখন থেকে যে কোন সময়ে রাষ্ট্রপতি ভাষণ শুরু করবেন ।’ 

ভদ্রলোক নিশ্চুপ । 

‘স্যার?’ 

‘আমি কোথায়?’ 

‘লেজেন্ডস্ হোটেলে, স্যার ।’ 

‘আমি কখন চেক-ইন করেছি?’ 

‘দু’ঘন্টা আগে ।’ 

ভদ্রলোক টেলিভিশনের সুইচ অন করেন । 


১৫ মার্চ ২০২০ 

টেলিভিশনের পর্দায় ভেসে ওঠে: লকডাউনের জন্য সবাই প্রস্তুতি নিন । সীমান্ত বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা । সান্ধ্য-আইন । দেশ অবরুদ্ধ । ভাইরাস এখানে । 

‘স্যার?’


লেখক পরিচিতি

দক্ষিণ আফ্রিকার ঔপন্যাসিকা, গল্পকার এবং ম্যানেজমেন্ট কন্সালটেন্ট নজিউই সিন্থিয়া জেলের জন্ম মুমালাঙ্গায় । তিনি আন্তর্জাতিক বিজনেসে ব্যাচেলার ডিগ্রীর অর্জণ করেন । তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘হ্যাপিনেস ইজ এ ফোর-লেটার ওয়ার্ড’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে । এই উপন্যাসের জন্য তিনি ২০১১ সালে আফ্রিকা অঞ্চলের বেস্ট ফার্ষ্ট বুক শাখায় ‘কমনওয়েলথ রাইটার্স্ প্রাইজ’ এবং ‘এম-নেট লিটারেরী’ পুরস্কার লাভ করেন । পরবর্তীতে তাঁর এই উপন্যাসের কাহিনী নিয়ে একই শিরোনামে চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয় । তিনি ২০১৮ সালে তাঁর পুরস্কারের ঝুলিতে ‘উ্যইমেন ইন দ্য আর্টস’-এর ‘মোকোডো অ্যাওয়ার্ড’ যুক্ত করেন । এছাড়া ছোটগল্পের জন্য তিনি ২০০৮ সালে ‘বিটিএ অ্যাংলো-প্লাটিনাম শর্ট স্টোরিজ’ প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান লাভ করেন । তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস ‘দ্য ওয়ানস উইথ পারপাস’ ২০১৮ সালে প্রকাশিত হয় । বর্তমানে নজিউই তৃতীয় উপন্যাস লেখায় ব্যস্ত এবং এক কন্যা নিয়ে জোহানসবার্গে বসবাস করেন ।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন