মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারী, ২০২১

মোজাফ্ফর হোসেন'এর প্রবন্ধ : সাহিত্যের মানচিত্রে সৈয়দ হকের জলেশ্বরী

কবিতা-গল্প-উপন্যাস-নাটক-চিত্রনাট্য সবমিলে বাংলাদেশের প্রধানতম লেখক সৈয়দ শামসুল হক (১৯৩৫-২০১৬)। সমগ্র বাংলা সাহিত্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম ও বুদ্ধদেব বসুর পরে তাঁর মতো সব্যসাচী লেখক আর কেউ আসেননি। সাহিত্যের বিচিত্র বিভাগে দুইশর বেশি বই লিখেছেন। আরো এক বিবেচনায় তিনি সমগ্র বাংলা সাহিত্যেই একটা দৃষ্টান্ত তৈরি করে গেছেন। বাংলা সাহিত্যে একটা কল্পিত চরিত্র fictional character)-কে বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসের প্রধান চরিত্র হিসেবে দাঁড় করিয়ে বাস্তবের চরিত্রের মতোই প্রতিষ্ঠা করেছেন অনেক লেখক। হুমায়ূন আহমেদের হিমু কিংবা মিশির আলীকে কার না চেনা! সাহিত্যের পাঠক-অপাঠক মাত্রেই ফেলুদার নাম জানেন। ফেলুদা নামে সত্যি সত্যি কেউ কোনোদিন ছিল বলে কেউ মনে করে থাকলে তাকে দোষ দেওয়া যাবে না। রোমেনা আফাজের দস্যু বনহুরের কথা একসময় মানুষের মুখে মুখে ছিল। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের ব্যোমকেশ বক্সী, নীহাররঞ্জন গুপ্তের কিরীটি রায়, কাজী আনোয়ার হোসেনের মাসুদ রানার নাম আমরা ভুলতে পারিনি। কিন্তু বাংলা সাহিত্যে সৈয়দ শামসুল হক ছাড়া কেউ সার্থকভাবে একটি অঞ্চলকে নির্মাণ করতে পারেননি। কে বলবে আজ যে রংপুরের কুড়িগ্রাম জেলার ধরলা নদীর তীরবর্তী জলেশ্বরী বলে কোনো শহর নেই? সাহিত্যের মানচিত্রে জলেশ্বরী ভীষণ বাস্তব হয়ে আবির্ভুত হয়েছে। সৈয়দ হকের গল্প-উপন্যাস-নাটক যারা পড়েছেন তাদের কাছে এই শহরের বাসিন্দারাও অচেনা নয়। 

সৈয়দ হক তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘নিষিদ্ধ লোবান’, ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’সহ বেশ কিছু উপন্যাস-গল্পে জলেশ্বরীর পটভূমি ব্যবহার করেছেন। নদীমাতৃক বাংলার কোনো অঞ্চল যেন নদীছাড়া অসম্পূর্ণ! এই কারণে তিনি এর সঙ্গে একটি নদীও তৈরি করেছেন- আধকোষা নদী। কুড়িগ্রামের ধরলা নদীকেই লেখকের এই আধকোষা নদী বলে আমরা ভেবে নিতে পারি। কাল্পনিক আধকোষা নদীর ওপরেই কল্পশহর জলেশ্বরী অবস্থিত। জলেশ্বরীতে একটি ট্রেন স্টেশন আছে, জলেশ্বরীভিত্তিক বিভিন্ন গল্প-উপন্যাসে সেই স্টেশনের কথা বারবার এসেছে। নিজের কল্পশহর সৃষ্টি নিয়ে সৈয়দ হক এক সাক্ষাৎকারে কৈফিয়ত দিয়েছেন এই বলে- 

‘যারা বিশাল বাংলায় থাকেন (আমি মফস্বল শব্দটি পছন্দ করি না), তাদের নিয়ে যখন গল্প, কবিতা, নাটক লিখতে যাই, তো প্রতিবারই একটি নতুন শহর বা গ্রামের কথা ভাবাটা পণ্ডশ্রম। সেজন্য আমি একটি কল্পনার ভূগোল জগৎ তৈরি করে নিয়েছি। এটির শুরু ১৯৭৪ সালে, যখন আমি ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’ নামে উপন্যাসটি লিখি। আরেকটি কথা এখানে বলা দরকার, বিশেষ করে জলেশ্বরীর পটভূমিতে যেসব গল্প-উপন্যাস লিখেছি, তার কোনো কোনো চরিত্র এ-গল্প থেকে ও-গল্পে এসেছে। এ গল্পে যখন অপ্রধান চরিত্রটি আরেক গল্পে প্রধান চরিত্র হয়েছে; কিংবা কোনো উপন্যাসে আগের চার-পাঁচটি গল্পের তিন-চারটি চরিত্র এখানে প্রবেশ করেছে। অর্থাৎ আমি একটি পরিমণ্ডল গড়ে তুলতে চেয়েছি। সমালোচনার ভাষায় যাকে এপিক বলে শনাক্ত করা হচ্ছে।’ 



২ 

সৈয়দ শামসুল হকের অধিকাংশ গল্প জলেশ্বরীর গল্প- হয় জলেশ্বরীর প্রেক্ষাপটে লিখিত অথবা কোনো না কোনো ভাবে জলেশ্বরীর কথা এসেছে। গল্পগুলো একসঙ্গে করে জনতা প্রকাশন থেকে প্রকাশিত হয়েছে গল্পংকলন ‘জলেশ্বরীর গল্পগুলো’। প্রকাশকাল ২০০৮। এই সংকলনে ২৩টি গল্প স্থান পেয়েছে। এর বাইরেও সৈয়দ হকের বেশ কিছু গল্প আছে যা জলেশ্বরীর প্রেক্ষাপটে লিখিত। লেখক অন্তীম শয্যায় থেকে বেশ কয়েকটি ছোটগল্প লিখে যান, যার অধিকাংশই জলেশ্বরীর প্রেক্ষাপটে লিখিত। 

জলেশ্বরীর গল্পগুলোর বেশিরভাগই ব্যক্তি-ক্রেন্দ্রিক হয়ে শুরু হলেও শেষে গিয়ে ঘটনা-ক্রেন্দ্রিক হয়ে উঠেছে। অর্থাৎ ব্যক্তিপ্রধান গল্প ধীরে ধীরে ঘটনা প্রধান হয়ে উঠেছে। যেমন- নেয়ামত (নেয়ামতকে নিয়ে গল্প নয়), সলিম (জলেশ্বরীর দুই সলিম), মনোহর (মনোহরকে পাওয়া যাচ্ছে না বলে), আজহার (আজহারের মাতৃশোক), শরবতি (শরবতির পাশ ফেরা), করিমন বেওয়া (কোথায় ঘুমোবে করিমন বেওয়া), সাহেবচান্দ (সাহেবচান্দের ঈদ-ভোজন), বর্গুনবিবি (সোনার মা বর্গুনবিবি), সমিরন (সমিরন), জমিরুদ্দিন (জমিরুদ্দিনের মৃত্যু বিবরণ) প্রভৃতি। 

সৈয়দ শামসুল হক নিজের নিরীক্ষাধর্মী গল্পগুলোকে ‘গল্পপ্রবন্ধ' নাম পরিয়েছেন। এ ধরনের বেশ কিছু গল্প স্থান পেয়েছে ‘জলেশ্বরীর গল্পগুলো’ গ্রন্থে। আত্মকথা বলার রীতি অবলম্বন করে এগুলো লেখা। চরিত্রগুলো মনে হয় যেন সত্যি সত্যি লেখকের দেখা। গল্পের যিনি কথক তিনি গল্পের একজন বেনামি চরিত্রও বটে। কোনো কোনো গল্পে মনে হয়েছে তিনি ঠিক একজন নন, সমষ্টির কণ্ঠস্বর। বর্ণনাকৌশলে প্রবন্ধের ঢং কিছুটা থাকলেও গল্পের আমেজ পুরোপুরি বিদ্যমান। গল্পগুলো উপস্থাপন শৈলিতে গল্পকার শুরুর দিকে একেবারে সিরিয়াস নন, পরে মৃদু সিরিয়াস হয়ে উঠেছেন। যেমন- ‘জলেশ্বরীর দুই সলিম’ গল্পের শুরুটা খুব সাদামাটা। শুরুটা হচ্ছে এভাবে- ‘একই নামের দুটি লোক, সলিম, আমাদের খুব অচেনা নয়, কে ভেবেছিল তাদের নিয়ে গল্প হবে? আমরা এখন তাদের গল্প বলবো।’ এক-প্যারা পরে লেখক বলছেন-‘জলেশ্বরীতে আমরা সকলেই দুই সলিমকে চিনি, আমরা এটাও লক্ষ্য করেছি, নামের মিল ছাড়া তাদের আরো একটি মিল আছে। তারা দুজনেই বেকার। বাংলাদেশে পাঁচ-সাত বছরের বেকারকে গণাই হয় না। এই যে সলিম- কেউ মনেও করতে পারে না এরা কবে থেকে বেকার।’ এরপর লেখক একনামের একাধিক ব্যক্তি থাকলে যে মজার মজার কাণ্ড ঘটতে পারে তার দুয়েকটি উদাহরণ টেনেছেন। অর্থাৎ পাঠক ধরে নিতে পারেন এই গল্পেও তেমন মজার কোনো কাণ্ড ঘটবে। কাণ্ড একটা ঘটে বটে এবং সেটি নিয়ে কিঞ্চিৎ হাসি-ঠাট্টা হলেও শেষ পর্যন্ত আর তা নিয়ে মজা করা চলে না। জলেশ্বরীতে পাকিস্তানপন্থী এক রাজনৈতিক নেতা ভাষণের শেষে বলে বসলেন- ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’। সেই সভায় সবার মাঝখান থেকে একজন তেড়ে উঠে বলে বসেন- ‘ধর, শালারে ধর?’ পাশের জন বলেন, ‘ঐ সলিম, চুপ কর।’ এই উচ্চারণ থেকেই এই গল্পে সলিম দ্বয়ের প্রবেশ। জানা যায় না, এই সলিম কোন সলিম। এখন তাদের আলাদা করার চেষ্টা করা হয়। তখন ক্ষমতায় যেহেতু পাকিস্তানপন্থী সরকার, তাই তাদের জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়। তাদের পাশে এসে দাঁড়ায় গাঁয়ের মানুষ। সৈয়দ হক হালকা মেজাজেই কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি আমাদের দাঁড় করান। সেই সঙ্গে তিনি মুক্তির বার্তাও দিয়ে দেন। 

গল্পে তাহের-মজহার-হাসনার অংশটা মূল কাহিনি হিসেবে সৈয়দ হকের শক্তিশালী মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস ‘দ্বিতীয় দিনের কাহিনী’তে আছে। ওরাই সেখানে মূলচরিত্র। সৈয়দ শামসুল হকের জলেশ্বরীর প্রেক্ষাপটে রচিত গল্প-উপন্যাসে একই চরিত্র বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেফিরে এসেছে। একই চরিত্র কোথাও গৌণ, কোথাও গুরুত্বপূর্ণ। ‘জলেশ্বরীর দুই সলিম’ গল্পে কথাপ্রসঙ্গে এসেছে তাহের-মজহার-হাসনার গল্পটা। মজহারের মৃত্যুর পর, হাসনা গ্রামে থেকে যায়। স্কুলশিক্ষক তাহেরের সঙ্গে মেশা নিয়ে গ্রামে রটনা রটাই সুবিধাভোগী চক্র। ওরাই মজহারকে খুন করেছে। এখন ওর স্ত্রীকে গ্রামছাড়া করতে চায়। তাহের-হাসনার সম্পর্কটা যেভাবে রটানো হচ্ছে তেমন নয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত রটনাকারীদের পূর্বপরিকল্পিত প্লটে পা দিচ্ছেন তারা। তারা একইসঙ্গে একই ট্রেনে গাঁছাড়া হওয়ার ভেতর দিয়ে রটনাকারীদের কথায় সত্য প্রমাণিত হচ্ছে এবং তারা যেমনটি চেয়েছিল, গাঁছাড়া হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের শক্তি তাহের-হাসনা। গল্পের এই সাইডস্টোরিতে এখানে উঠিয়ে আনার উদ্দেশ্য হলো- পাঠককে এখান থেকে আমি কাফকার সাহিত্যে নিয়ে যেতে চাই। কাফকার সাহিত্যে দণ্ডপ্রাপ্ত লোকটি জানে না তার অপরাধ কি। কিন্তু শাস্তির উদ্ভটতা এতই অসহনীয় হয়ে ওঠে যে এ থেকে মুক্তি পেতে শেষপর্যন্ত শাস্তিপ্রাপ্ত লোকটি তাঁর দণ্ডের একটি ন্যায্যতা খোঁজেন; অর্থাৎ অপরাধী তার অপরাধকে খুঁজে নিচ্ছেন। আগে যে অপরাধের কথা বলা হচ্ছে, পরে অপরাধী সেই অপরাধ করে তার উপর চাপানো দায়ের ন্যায্যতা তিনি দিয়ে দিচ্ছেন। এটা তিনি এমনি এমনি করছেন না। তাকে পরিস্থিতির জালে জড়িয়ে সেটা করানো হচ্ছে। তাহের-হাসনাও এখানে সেটা করছে। তাদের নামে যে কুৎসা রটানো হলো, পরে তারা সেই কাজটি করেই এই কুৎসা থেকে মুক্তি খুঁজছে। 

সৈয়দ শামসুল হকের মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী বাস্তবতার আরেকটি গল্প ‘নেয়ামতকে নিয়ে গল্প নয়’। এটি জলেশ্বরীর ভবিষ্যৎদ্রষ্টা নেয়ামতের গল্প। নেয়ামত গাঁয়ের তরুণ মোতাহারের ভবিষ্যৎবাণী করেছিল- সে লাল ইটের দালানের সামনের ফুলের বাগানে পানি দিবে। কয়েকবছর পর ১৯৭৫ সালে স্বপরিবারে জাতির জনক বঙ্গবন্ধুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলে মোতাহার জলেশ্বরী থেকে তরুণদের নিয়ে শহরমুখী প্রতিবাদ মিছিল বের করে। এ জন্যে তাকে গ্রেফতার করা হয়, জেল হয় তার। জেলখানার সুপারের পরিপাটি বাগানে পানি দিত মোতাহার। এভাবেই পরোক্ষভাবে নেয়ামতের ভবিষ্যৎবাণী ফলে যায়। সবার ভবিষ্যৎ বলা নেয়ামতকে স্বাধীনতা-বিরোধী শক্তি মান্নান গ্রুপ অপমানিত করে নেয়ামতের ভবিষ্যৎ কি জানতে চাইলে নেয়ামত উত্তরে বলে ‘আমি মারা যাবো’। নেয়ামতকে শেষ পর্যন্ত খুন করা হয়। 

এভাবে সৈয়দ শামসুল হকের সৃষ্ট-চরিত্রগুলো জলেশ্বরীর আলো-বাতাসে নানাভাবে বিকশিত হয়েছে। দেশের বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে সাড়া দিয়েছে। গল্পগুলো লেখকের একান্ত ব্যক্তিক বীক্ষণ থেকে বের হয়ে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় চালচিত্রের মুখপাত্র হয়ে ওঠে। জলেশ্বরী বাংলাদেশের কোনো এক প্রান্তের আর ছোট্ট শহর হয়ে থাকেনি। সমগ্র দেশেরই সারৎসার হয়ে উঠেছে যেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন