মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

শামীম আজাদের গল্প: মেশক আম্বর

 

মুখগহ্বরে কুসুম গরম পানি গলিয়ে পড়তেই সাঈফুদ্দিনের অষ্টঅঙ্গ জেগে ওঠে। আধোবোঁজা চোখ কেতুর টেনে ওঠে। খোয়াবের ঘায়ে মরে থাকা খয়েরি পুরুষ্টু জিহ্বা রাত্রির শ্লেষ্মা ছাড়ে। মলম দিতে হইবো - মলম চাই স্মুদ মলম। বাথরুমের টাইলের ফাঁকে ফাঁকে যে অন্ধকার বসেছিলো তার গলার খাঁকারিতে সরে যায়। শরীরের গিরাগুলো আতশবাজির শব্দে ফুটতে থাকে। সূর্যমুখী প্রিমরুজ ওয়েল লাগবে। এই শীতে গিঁটগুলান জল করতে হবে জেলি দিয়া। প্রভাত তার মনোবাঞ্ছা শোনে। 

ওজুর দোয়ায় আরাফাতের ময়দান ভেঙে তৈরী হয় সেই ডানা দেখা কইতরের ভাস্কর্য। যদিও এর বয়স খুব একটা কম হবেনা আন্দাজ হয়। বয়স্ক কইতরের গলার কেশর আর হাড্ডির ঘ্রাণই আলাদা। রাজহাঁসের ভুনার মতো। তবে কইতর ধরার খেলা কম চমৎকার নয়। বিলেতে জ্যান্ত কইতরের খোপ নাই। কইতর ধরার উপায় নাই। সুপারমার্কেটে কেবল ফ্রোজেন মাংস আর গ্রিলে আস্ত রোস্ট। সাইফুদ্দিন এটা মিস করে।

অথচ তিন দশক আগে কত সহজে সে উনপঞ্চাশ মাইল বেগে অন্ধকারে হাত চালিয়ে, কবুতরের খোপে তাদের উষ্ণ শরীরগুলোয় থাবা বসিয়েছে ! সে হাত ভরে গেছে ঘ্রাণে। সে কইতরকে লুঙ্গির ভেতরে ভরে শীত সন্ধ্যায় সে তামাক নিয়ে বসেছে। সালিশী করতে করতে লুঙ্গির ভেতরে বন্দী কইতরের কুট কুট তার অঙ্গ প্রজ্বলিত রেখেছে। 

আজ সাঈফুদ্দিনের জিহ্বার হাতের, চোখের এবং নাকের তকদির ভালো হলেও হতে পারে। দিল্ এরও জিয়াফত হতে পারে। জিহ্বার রোঁয়াগুলো সারাদিন অজস্র ক্রিমি প্রসব করে সূতিকাগৃহে ত্যানার মত পড়েছিলো। ওজুর পানি তাতে ভিটামিনের কাজ করে। সাঈফুদ্দিন মুখ গহব্বরে আশি মাইল বেগে জল চালাচালি করে প্রায় হলকুম থেকে শ্লেষ্মা বের করে আনে। গত রাতের তন্দুরী চিকেন এর একখন্ড তার ফিলিং-ওঠা দাঁতের গর্ত থেকে ছুটে বেরিয়ে আসে। কিছু চিন্তা ভাবনার আগেই তার বাঁধানো সোনা দাঁত তা চেপে ধরে। এখনো তন্দুরীর রস বরফ হয় নাই।



২.

ওজুর পানি এ রকম কুসুম গরমই ভালো। সিঙ্কের ওপরে সাঈফুদ্দিনের কুলি কলকলিয়ে পড়ে গির্জাচূড়ার সবুজ সিলহোয়েটের গায়ে এপ্রিলের বৃষ্টির ধারার মতো, কিন্তু তার সেই জাফলং এর কালো গর্তের কথা মনে আসে। আসলে সেই কন্যার কাছে তার যেতেই হবে। আজকে ওরা আসবে বলেছে। গা ভাসানো স্মৃতিরসে তার সকল তামাদি অপরাধ জবজবে হয়ে ওঠে। খুঁটিগুলো উপড়ে কীভাবে কতগুলো যৌবনবতীরে শান্তি শিবিরের রহিম মোল্লার মোরাকাবায় নিয়ে গেছিল তার সব মনে এসে যায়! 

আঙ্গুলের অনামিকায় ঘোলাচোখা আকিক পাথরের আংটিটির দিকে চেয়ে চোখ বন্ধ করে সাইফুদ্দিন।এখন নিজের ত্বক এর ক্ষেতে আর কোনো সব্জি ফলানোর সুযোগ সহসা আসে না। আফসোস ! কি আম আনারস আর তরমুজই না ফলতো এক সময়। এই ফজরের সময়ই ইটখোলার পাশ দিয়ে আমপারা সিপারা বুকে নিয়ে কি সুন্দর সুন্দর নাবালিকা ছাত্রীরা এসে রেহাল নামাতো। আর সে আতর মেখে তাদের ওড়নার কুয়াশা সরিয়ে কত রকমের যে ছবক দিতো। আহা সেইসব ছাত্রী-কবুতর ঘ্রাণ এখন শীতের ভাপাপিঠার মত উষ্ণ সোনালী খোয়াব আজ!



৩.

নিউ হামের ফরেস্ট গেইট থেকে তিনজন টুপিহীন যুবক তাকে নিতে এসেছিল দুইদিন আগে। আনেক বাঙালি মৌলভী থাকলেও তারা তার মতো না। এসব কঠিন কাজে কেবল তারই ডাক পড়ে। পূর্ব লন্ডনে থাকলেও বিলেতে নিজ উম্মাহ্ এর জন্য কত কী করতে হয় তার! আফগানিস্তান ইরাকের যুদ্ধ যা করতে পারে নাই, তাই পারতে হবে অত্যন্ত সূক্ষ চালে। ব্রিক আর মর্টার হয়েছে এখন পুরো উম্মাহর চিন্তাটা তার মনের মিনারে মিনারে ক্যানারী ওর্য়াফের মাথার মতো সারাক্ষণ ধোঁয়া ছাড়ে। বরাত ভালো বলেই সাত জুলাইর বোমাগুলো এবং সামান্য কয়টা মানুষের মৃত্যু কী সুন্দর করে তার এমন প্রমোশন এনে দিলো। এখন তাকে প্রায়ই আতর সুরমা নিয়ে, সৌদী ঘোমটায় ডাউনিং স্ট্রিটে অনেকের এর সঙ্গে চা খেতে হয়, টিভিতে চ্যারিটি করতে হয়, নিজস্ব কমিউনিটির বিবাহ পড়াতে হয়। 

’মেয়েটি সেয়ানা কইতর। ছেলেদের অত্যাচারেও লড়েনা। গতকালও কবুল বলে নাই। আজকে এই কন্যার বিষয়ে আবার যাইতে হবে। ঝামেলা আছে।’ কিন্তু মনে তার কেমন খুশি খুশি লাগে। আজ নিশ্চয়ই তার মুখখান সে দেখতে পারবে। আর কবুল করিয়েই ছাড়বে।



৪.

সাবান-গোলা- পানিতে যত্নের সঙ্গে আকিকের আংটিটা চুবিয়ে পুরোনো দাঁতের ব্রাশ দিয়ে ঘষা দেবার সময় বাথরুমের খোলা দরোজা দিয়ে জিটিভির শব্দ আসে। সঙ্গে ছোট মেয়ে রাজিয়ার নড়াচড়াও। বাথরুমে টানানো বেহেস্তী হরফের দিকে চেয়ে সাঈফুদ্দিনের মনে পড়ে, সেবার হজ্জে আকিক কেনার সময় যত সোনা কিনেছিলো তাতে কি আরামেই না পুত্র নেসজাদ ও কন্যা আসমার বিবাহ দিয়েছিলো! মেওয়া আর বাদাম ও পেস্তা ঢোকানো খেজুর দিয়ে সুন্দর করে আকদ হয়েছিলো। তার জানা মতে বিলেতে এমন করে মক্কার খেজুরে আকদ কেউ করতে পারে নাই। রাজিয়া তো ভ্যানিটি ব্যাগে নিয়ে কুইন মেরী কলেজে পরীক্ষা দিতে যেতো। সাইবার ক্যাফেতে যেতো কলেজের উমেলগুলো খুলতে। রাজিয়ার গানের গলায় নাথ খুব মানাতো। কিন্তু সে আছে জিটিভি নিয়ে। মমতায় ঘাড় ঘোরাতেই চোখে পড়ে হিটারের সামনে পাতা তার জায়নামাজ। মিনারের ছবিগুলো মাটিতে অপেক্ষায়। দেখে সে রেগে মুখের জল ওয়াক থু শব্দে সিঙ্কের ওপরে ছিটিয়ে চিৎকার দেয়

-”কতবার না কইছি নামাজের অনেক আগে জায়নামাজ পাইতা রাখা হারাম। তোরা কি মুরগী মাছ কাটনের এক ঘন্টা আগে কাউরে দাও পাইত্তা রাখতে দেখছস? দেখস নাই। আমিতো রেডি হই নাই।” জিটিভির নাচ থামিয়ে দৌড়ে আসে রাজিয়া।

মনে মনে বলে ’একটু আরাম কইরা ওজু করবো, দাঁতগুলো রেডি করবো মিঠা-খাট্টা, মাংস-মশলা খাওয়ার জন্য। জিহ্বাটারে ধুইয়া সারাদিনের জন্য চালাক চতুর করবো তার আর উপায় নাই। তা না আগেই জায়নামাজ পাতে। যেন আমার নামাজ ছাড়া আর কোনো কাজ নাই। তবে এইটাও ঠিক অবশ্য জায়নামাজে বসলেই আল্লার রহমত নাজেল হয়। সকল প্ল্যান পরিকল্পনাগুলান- জিয়াফত থাইক্কা তরক্কি তরিকত সব’।



৫.

সন্ধ্যায় মুখে ভ্যাসেলিন মেখে, মাথায় ইসলামী ঘোমটা পরে, তার সেই বিখ্যাত আতর মেখে রেডি হতে না হতেই সেই তিন যুবক বিএম ডাব্লিউ নিয়ে এসে উইভার্স ফিল্ড রোডের ফ্ল্যাটের সামনে হাল্কা হর্ণ দেয়। বেরুবার আগে হঠাৎ তার মনে পড়ে প্রতিবার বিজয় দিবস পালন করতে তার বাড়িতেই না একটা ভালো আয়োজন হয়! হোয়াইট চ্যাপেল সেইন্সবেরীতে রাজহাঁস পাওয়া যাবে না বলে হরিণের মাংস আনাবার জন্য স্ত্রী কুলসুমকে কুড়ি পাউন্ড দিয়ে ঘরের বাইরে পা দিতেই ডিসেম্বরের শীত যেনো মোজার ভেতর ঢুকে যায়! আহ্ হারে কি ঠান্ডা! দেশের কথা মনে হয়। দেশের রোদ যেনো সোনালী মখমলের আলোয়ান। ইনশাআল্লাহ এবার ইলেকশনে দেশে যেতে পারবে সে। তারা এবার আরো পাওয়ারফুল হবে। এবার আর দুই আড়াইটা মিনিস্ট্রিতে হবেনা। কমপক্ষে পাঁচজন চাই। আর করতে হবে ব্লাসফেমী আইন। গাড়ীর ভেতরে ঢুকে পা দুখানা কোলেই নিয়ে নেয় সাঈফুদ্দিন। ফরেস্ট গেটের লাইট পোস্টে সাদা দাড়ির সান্তা ক্লজ দুলে উঠলে সাঈফুদ্দিন বিব্রত বোধ করে। এখন মাল্টি কালচারের যুগ। এখন আর দাড়িওলা ফাদার ক্রিসমাস কেনো, আকাশে সোনার গাড়িতে হরিণবিহারে যাবো এখন আমরা। সাঁইত্রিশ বছর দেশে না গেলেও কোনো আফসোস নাই। এখানেও আসিতেছে সুযোগ। তারই সেলিব্রেশন করবো আজ রাতে।



৬.

খোসা ছাড়া উসকো-খুসকো একটি কর্ণারশপের ওপরে প্রায় বাথরুম সমান ছোট্ট সেই ফ্লাটে তারা তাকে নিয়ে আসে। ’ছেলেরা চালাক আছে। কী করে যে মেয়েটাকে এই বিলাতী পুলিশ ফাঁকি দিয়ে ঠিকই উঠিয়ে নিয়ে এসেছে’। একটি ছোট্ট প্লস্টিক কাপে চা ধরিয়ে ওরা বলে, ”হুজুর আজকে যেমনে হউক কবুল বলাতে হবে। আপনি না পারলে আর কুনু আলিমের দ্বারা হবেনা। তাই আপনাকে আইজ আবার আনলাম। পাবেন পঞ্চাশ পাউন্ড।”

সাঈফদ্দিন মুখে কিছু বলেনা- বলে মনে মনে ” বাবা তোমরা আমাকে এই দ্বিতীয়বার আনলে কি হবে। গত রাতে মনে মনে আমি অন্তত উনপঞ্চাশ বার এসেছি আর গিয়েছি, এসেছি আর গিয়েছি আর আমার উরগ ক্লান্ত হয়ে গেলে আজকের খোয়াবে আবার চাঙ্গা হয়ে উঠেছি”। সাইফিুদ্দিন হাসে আর ভাবে। আসলে তারা তাকে পঁচিশ পাউন্ড দিলেও সে আসতো। বয়স্ক এ কন্যার এ্যাপ্রিকটের রঙা দুইখানা ডানার একখানা উদলা হয়ে পরেছিলো গতকাল। তাতেই তার স্নায়ুমূলে শ্রাবণ জেগে গেছিল। তার আয়না সড়কের খেজুর গাছ সরে জ্বর এসেছিলো আর সারা গা ভেঙ্গে দাউ দাউ আগুন জ্বলেছিলো। ক্রিসমাসের আলোক মালার বলগুলো চোখের সুরমায় ঢুকে পাপড়িকে রক্তাক্ত করেছিলো। 

এ কি হল তার। সে দৌড়ে বেরিয়ে বলে, ”বাবাজি বাথরুম যাবো। পকেটে হাত দিয়ে দেখে ইনজেকশনের বাক্সটা ঠিক আছেতো?” মোটা তাজা গোঁফওলা ছেলেটি তার এভাবে বেরিয়ে আসায় অঙ্ক মিলে যাবার মতো আনন্দে বলে, ” নিশ্চয় নিশ্চয়, সুগার বাড়ছে? যান ঐ যে বাথরুম”! সাইফুদ্দিন ভেতরে ঢুকলে কি ওরা ওকে নিয়ে হাসাহাসি করে? যেনো একটি নারী কন্ঠও পান মশলার মত মিষ্টি দানা তুল্লো! আরো একটি মেয়ে কি? যাক্ গে, রেডি হওয়াই বড় কথা।


৭.

এইসব খোঁয়াড়ের মত ফ্ল্যাটে কি কেউ থাকে? এত বিরান কেন এখানটা আর ঘরটা তে একটা হিমের সিন্দুক। দেয়ালে কি সব আঁকা। টেলিফোন বুথের সমান বাথরুমে কোনোমতে ইনসুলিন নিয়ে বোঝে, নড়ে চড়ে উঠেছে তার এতদিনের তেলেসমাৎ! আবার কি আসিতেছে ফিরিয়া? ভুলতে পারেনা সে ঘোমটা দেয়া এজিন সমস্যাক্রান্ত মেয়েটির কথা। যেন এপিং ফরেস্টের সোনার ময়ূর। জল বিয়োগে মাথা পাতলা হয়ে এলে সেই ঘোমটার ভেতরে তার সফর শুরু হয়। আচ্ছা মেয়েটির শরীরের সকল রোমই কি সোনালী! ভাবা মাত্রই বার্ধক্যের দড়ি ছিঁড়ে কলিজা বেরিয়ে আসতে চায়। জিহাদী ভঙ্গি নিয়ে বাথরুম থেকে সোজা গিয়ে কনের পাশে বসে। পোক্ত কইতরের ঘ্রাণে তার নিজের রোমরাজি বাক বাকুম বাক বাকুম করে। 

উচ্চ স্বরে পাট যাজনদারের কণ্ঠে হাঁকে, ” .. . আউশপাড়ার আবলুশ মিঞার পুত্র হামিদউদ্দিনের সঙ্গে দশ হাজার এক পাউন্ড মোহরানা.. রাজি থাকলে বলেন কবুল..। বলেন মা, বলেন তো দেখি সোনা”। বলে সে গতকালের চেয়ে আরো ঘন হয়ে বসে। ”আপনে আমার মেয়ের মত।” সাঈফুদ্দিনের পিচ্ছিল নখর মেয়েটির ঘোমটার আলে সুরুত সুরুত করে। ’আহা কি মসৃণ মার্বেল!’ তার মাথা নুয়ে আসে মেয়েটির চরণের কাছে। দাড়ি থেকে মেশক আম্বরের গন্ধ সামনে মাথা মুখ ঢেকে রাখা কন্যার ঘোমটা কাটতে থাকে ফালি ফালি। ময়লা ফ্লোরে ক্রিস্প এর খালি প্যাকেটে পা পরে সেই তিনটি টুপিহীন যুবকের। ঘরে খসে পড়ে অনেক অনেক পাতা। 

সাঈফুদ্দিন একটু মেঘলা হাসিতে তাকায়। হ্যাটওলা যুবকটি ইংলিশ ছায়াছবির নায়কদের মতো। কানে মোবাইলের ফিতে। এই শীতে হাতা কাটা টি শার্ট। সেই কি বিবাহ করছে? কিন্তু এরা সবাইতো কন্যার চাইতে কম বয়সের। এই মেয়েটির জন্যই বা তাদের কেন এই জোরাজুরি। আশ্চর্য ঘরে আর কোনো নারী নাই। একটা বিয়ের কাণ্ড অথচ কোনো শিশু নাই। ঘরের রান্না নাই। দোকানের তন্দুরী চিকেন, টেকএ্যাওয়ের বিরিয়ানী আর কাবাবের গন্ধে ঘর ভরা। তারা কি রাত্রে থাইক্কা ঐসব খাইছে নাকি! হ্যাটওলা তাকে চোখ টেপে। সর্মথন পেয়ে আরো ঘন হয়ে বসে।


৮.

রমণীটি ঘোমটার ভেতরে চোখের পাতায় বারো মন ওজনের তালা ঝুলিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করে। ধ্যান করে তার ঘ্রাণ জাল পাতে। ঐ ঘ্রাণ ছাড়া তার আর কোনো প্রমাণ নেই। ঘ্রাণের হাত পা ও মগজ নিয়ে ভাবতে ভাবতে ভাবতে সে ক্ষীণ হয়ে যায়। বাতাসি হয়ে যায়। প্রচন্ড একাগ্রতায় সে তেরো বছরের হেলেঞ্চা শাকের ডগা হয়ে যায়। সাঁঈত্রিশ বছর আগের দূর্দান্ত দুপুরের কাঠ মালতী হয়ে যায়! ডসপারা হাতে কবুতর বুকে ইট খোলার পেছনে পড়ে যায়। হেলেঞ্চা ডগা থেকে ”আম্মাগো আল্লাগো আম্মাগো আল্লাগো ” চিৎকারে নদী দ্বিখণ্ডিত হয়। কিন্তু আল্লা বা আম্মা কেউ আসেনা। তার ব্লাউস ছিঁড়ে বাহুর বকুলগুলো খসে পড়তে থাকে। সেগুলো বাতাসে উড়তে উড়তে এজিদের চোখে মুখে স্বরে কচি সুস্বাদু মাংস হয়ে যায়। ধাতব আকাশ কাটে না। নালিয়া ক্ষেতের ইটগুলো তার বুকে শ্মশান হয়ে যায়। চোখ বেঁধে তার মোহনার গহীণ শুভ্রতায় কারা যেন চালাতে থাকে কিরিচ, বাটালী, কোদাল। নরম দেহের বহিরাঙ্গ খেজুর কাঁটা দিয়ে করে মোরব্বাকেঁচা। ঘাসের মধ্যে, জলের মধ্যে জোঁকে আর ইদুঁরে তার কুমারীত্ব নিয়ে মোচ্ছব করে। পরম্পরায় তার নাকে সিগারেট, পান বাহার আর মদের গন্ধ আসে আর যায়। জ্ঞান হারাবার আগে আসে উৎকট এক আতরের গন্ধ। তার রেহালের কথা মনে পড়ে যায়। কিন্তু সে গন্ধেরও ছিলো একই লোহার নখ, জিহ্বার থাবা।


৯.

”বলো মা, বলো কবুল”। হাতে সেই কইন্যার কেশ এসে লাগলো, কি লাগে নাই তার নিজের হাত চাটতে ইচ্ছা হয়।

”হুজুর আপনার হাত ধুইবেন?” তিনটি যুবক এক সঙ্গে জিজ্ঞেস করে। কিন্তু ওরা এই ঘরে কি করে।

- ”আরে নাহ্।” কেমন যেনো লাগে সাইফুদ্দিনের। ’বাড়ির হরিণের মাংস না এ্যাপ্রিকট বাহু। কিন্তু ওরা বেশ ঘন হয়ে সে বসে গেছে তার পাশে। এত খায়েশ!’

হ্যাটওলা আবার চোখ টেপে। সাইফুদ্দিনের কানে সূঁচের ভেতর দিয়ে গরম ভাপ আসে। ঘোমটার একেবারে সন্নিকটে দাড়িতে হাত বুলিয়ে সে দুহাত ঘোমটার ভেতর নিয়ে তার থুতনি স্পর্শ করে, ”বলো মা, কবুল”। তীব্র মেশক আম্বরের গন্ধ সনাক্ত করে লু হাওয়ার মত সে নারী ঘোমটা ছুঁড়ে ঘুরে দাঁড়ায় ঘূর্ণিঝড়ের মতো।


১০.

সাঁইত্রিশ বছর পর সুশক্ত হাড়ের মিনারে উঠে দাঁড়ায় সে নারী। উঁচু ঐ গম্বুজ থেকে লাখো আযানের তরবারি আকাশকে ফালি ফালি করে। তার চোখের পাপড়ির তালাগুলো ঝুরঝুর করে ভেঙে পড়ে পড়ে তেলাওতে তেলাওতে। তার চরণে সেই তিনটি যুবক আছড়ে পড়ে- মা!


১১.

নুয়ে পড়া নরম হেলেঞ্চা দেওদার বৃক্ষ হয়ে যায়। সে বৃক্ষের নিচে স্লুইস গেট খুলে তিনখন্ড ইস্পাতের তিনটি ব্লেড গেঁথে যায় সাইফুদ্দিনের ঘাড়ে।

------------


 

লেখক পরিচিতি:

শামীম আজাদ

একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি সাহিত্যিক। দীর্ঘদিন যাবত যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনে বসবাস করছেন। তাঁর কবিতায় বাংলাদেশের প্রকৃতির ভাষিক রূপ ফুটে ওঠেছে।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন