বুধবার, ১৭ মার্চ, ২০২১

শাহাব আহমেদ'এর ধারাবাহিক উপন্যাস : পেরেস্ত্রোইকা মস্কো ও মধু


১১ ম পর্ব

লাবণ্য যে চায়নি তা নয়, বরং উল্টো। খরা-পীড়িত চৌচির মাটি যেমন বৃষ্টির কোমল স্পর্শ চায়, তেমনি তার দেহ ও চেয়েছে। এবং সুদীপের স্পর্শে সে শিহরিত হয়েছে। অথচ সেই শেষ সিদ্ধান্তের দিনে সুদীপের কী যেন তার পছন্দ হয়নি। যদিও সে নিজেও কোনদিন বুঝে উঠতে পারেনি আসলে কী তার পছন্দ হয়নি। ( হয়তো কোন কিছুই নয়, সে ছিল আচ্ছন্ন ও বিভ্রান্ত )।

সুদীপকে সে কিছু বলেও নি। একজনকে বেছে নেয়ার দুর্বিসহ মানসিক অস্থিতির মধ্যে সে ছিল নি:সঙ্গ একটা দ্বীপে। জিজ্ঞেস করার কেউ ছিলনা। সঠিক বা বেঠিক তার সিদ্ধান্ত তাকেই নিতে হয়েছে। সুদীপের কি কোন স্পর্শ তার মধ্যেকার অস্থিতিটাকে ঝড়ে রূপান্তরিত করেছিল? এবং তার মনে হয়েছিল সুদীপটা ক্ষ্যাপা এবং ক্ষ্যাপা মানুষগুলোর হাত ধরে বেশি দূর এগুনো যায়না।
ফুল কি মানুষের স্পর্শ চায় না?
চায়।
ফুল কি মানুষের সব স্পর্শ পছন্দ করে?
না
ফুল কি জানে মানুষের কোন স্পর্শটি তার পছন্দ নয়?
সম্ভবত নয়।
এখানেই হল লাবণ্য ও সুদীপের মধ্যেকার কেমিস্ট্রির দুর্বোধ্যতা, কেউ জানেনা কেন এমন হল।
লাবণ্য হারিয়ে গেল সুদীপের জীবন থেকে চিরদিনের মত।

তখনও বাসস্থানের বেচা-কেনা করা যেতনা কিন্তু বদলা-বদলি করা যেতো। সুদীপের শাশুড়ি বহু ঘুরে তার কম্যুনাল কোয়ার্টারের ১টি কক্ষের বদলে অন্য কম্যুনাল কোয়ার্টারের ২ টি কক্ষে যাবার সুযোগের সন্ধান পায়। কিন্তু তাকে অতিরিক্ত ১০০০ রুবল দিতে হবে। সুবর্ণ সুযোগ যাকে বলে, কিন্তু সুদীপ টাকা পাবে কোথায়? ফোন করে মস্কো, অভ্রের কাছে। অভ্র ওর ১ বছরের জুনিয়র। খুব ভালো বন্ধু। ততদিনে ব্যবসায় বেশ অর্থ কামিয়েছে। বিষয়টি খুলে বলতেই ১৬০০ রুবল ধার দেয় শর্তহীনভাবে, বলে যখন পারবেন, তখনই দেবেন, না পারলে নাই।সুদীপরা নতুন বাসায় মুভ করে আসে।

ততদিনে সুদীপ তার ইন্টার্নশীপের কারণে ১ বছরের জন্য রাশিয়ায় থাকার অনুমতি পেয়েছে। তাই নিয়ে সে দাঁড়ায় ইংলন্ডের ভিসার জন্য।ভিসা পেয়ে যায়। ওরই এক বন্ধু লেনিনগ্রাদে পাশ করে ইংলন্ড চলে গিয়েছিল। সেখানেই থাকে, ইংরেজী ভাষা কোর্সে ভর্তি হয়ে ভিসা বাড়ানো যায়। কাজ করে রেস্টুরেন্ট। সুদীপ সিদ্ধান্ত নেয় লন্ডনে গিয়ে সেখানে থেকে যাবার কোন বন্দোবস্ত করা যায় কিনা। তারপরে পরিবার নিয়ে যাবে। অন্ত-অক্টোবরের এক ধূসর, ভেঁজা, কনকনে শীতের দিন-শেষে ওয়ারশ রেলস্টেশনে ট্রেনে চেপে বসে সুদীপ। ওর মেয়ে লাবণ্যের বয়েস তখন নয় মাস।
আলিওনা, লাবণ্য ও শাশুড়ি প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে হাত নাড়ে ট্রেনটি দৃষ্টির আড়ালে যাওয়া পর্যন্ত।তারপরে চোখ মুছতে মুছতে ঘরে ফিরে।

৮২ সালে মস্কোর শেরেমেতায়েভা এয়ারপোর্টে স্বপ্নময় চোখ নিয়ে এসে নেমেছিল সুদীপ। ১৯৮৯-তে সেই স্বপ্নের টুকরোগুলো পকেটে পুরে সে এখন যাচ্ছে ইংল্যন্ডে। এই ৭ বছরে অন্য অনেক ছাত্র-ছাত্রি সারা ইয়োরোপ ঘুরে সেয়ানা হয়েছে, কিন্তু সুদীপ পার্টির নিষেধাজ্ঞা মেনে কোথাও না গিয়ে রয়ে গিয়েছে দৃষ্টি-অন্ধ মার্জার শাবকের আনাড়ি শৈশবে।তাকে পথ একটা খুঁজে বের করতেই হবে। যদিও সামনে কি আছে জানা নেই, পেছনে আছে নগ্ন বাস্তবতার বুবুক্ষু দেয়াল, আর সেই দেয়ালে আঁকা প্রিয় মুখগুলো, আলিওনা, লাবণ্য ও শাশুড়ি।

দুলতে দুলতে ট্রেন চলছে দ্রুত, পোল্যান্ডের বুক চিরে। ইওরোপের একটি দেশ আর একটি দেশের মতই। সুন্দর ও পরিপাটি। সুদীপ ঘুমাচ্ছে । ঘুমাচ্ছে আর দেখছে একটি নদী। বিশাল সমুদ্রের মত। সে চরে দাঁড়িয়ে আছে হাটু জলে। তার সামনে জল আর জল, কূলহীন। পূবে নদী,পশ্চিমে নদী, পেছনে বালু ,নীচু নীচু গুল্মে ঢাকা। নদীতে পালের নৌকা, এক দুই তিন চার পাঁচ, অসংখ্য রঙ্গিন পাল, কোনোটা সাদা, কোনোটা লাল, কোনোটা ছেড়া, কোনোটায় তালি দেয়া। কিন্তু সবগুলোই হাওয়ায় ফুলে আছে পোয়াতি নারীর পেটের মত। একটাও থেমে নেই, সবাই এগিয়ে যাচ্ছে, সামনের দিকে, কেউ পূবে, কেউ পশ্চিমে। পূবে দীঘলী বাজার, পশ্চিমে ভাগ্যকূল। তারপরেও গন্তব্য আছে, কত কত গন্তব্য, সুদীপ জানেনা। কেউ পেছনের দিকে যায়না।
শুধু সামনে।
সুদীপের বয়স তখন কত? সাত কি আট।
তারপরেও সে বুঝতে পারে যে, দূরত্বের একটা মোহনীয় রূপ আছে, ওই পালের নৌকাগুলোর মত পথে না নামলে সেই রূপ ধরা দেয়না। সে এখন পথে। ভোরে সে পূর্ব বার্লিনে পৌঁছে। তারপরে দুই ইমিগ্রেশন পার হয়ে পশ্চিম বার্লিনে। প্রচুর ভীড় এই পূর্ব পশ্চিমের বর্ডারে। নাগরিকদের জন্য সদ্য উন্মুক্ত করা হয়েছে এই বর্ডার। মাত্র কিছুদিন আগে, অক্টোবরের ১ তারিখে, পূর্ব জার্মানির বৃদ্ধ নেতা এরিক হোনেকার ক্ষমতা ছেড়েছে। ক্ষমতায় এসেছে এগোন ক্রেন্জ। বার্লিন-দেয়াল তখনও বিলুপ্ত হয় নাই কিন্তু রাশিয়ার পেরেস্ত্রইকার সুনামি-স্রোত উন্মুক্ত ছিদ্র দিয়ে পূর্বজার্মানিকে ঠেলে নিতে শুরু করেছে পশ্চিমের দিকে। শিগগিরই চুরমার করে দেবে সব, সব দেয়াল ভেঙ্গে মানুষ ছুটে যাবে পূবের বিষ্ঠা ফেলে পশ্চিমের বিষের দিকে।

পশ্চিম বার্লিনের ট্রেন স্টেশনটির দিকে তাকালেই পার্থক্যটা দেখা যায়। যেন ঝলমলে পোষাক-পরা গালে রুজ, চোখে রং, নখে রক্ত-মাখা এক নারী। যে নারী অর্থের বিনিময়ে ভালোবাসা বিলায়।
সুদীপ চড়ে বসে হল্যান্ডের ট্রেনে। বসা ট্রেন। প্লেনের মত সিট। রাশিয়ান ট্রেনের মত ঘুমানোর আরামদায়ক বার্থ নয়। দিনের জার্নি। জানালার বাইরে দ্রুত পশ্চাতমুখী ধাবমান একটি দুনিয়া।
মনে হচ্ছে সব ছুটছে পেছনের দিকে, মানে পূর্ব জার্মানী, তারপরে পোল্যান্ড, তারপরে রাশিয়া, মানে সমাজতন্ত্রের দিকে। পুরোটা দুনিয়া, শহর, বন্দর, মাঠ! আশ্চর্য একটা সমান্তরালঃ সুদীপ যত দ্রুত সরে যাচ্ছে সমাজতন্ত্র থেকে, তত দ্রুতই জানালার বাইরের দুনিয়া ধাবিত হচ্ছে সমাজতন্ত্রের দিকে।
আচ্ছা ও যখন ফিরে আসবে, তখন কি উল্টোটা হবে? যত দ্রুত সে পালাতে চাইবে পুঁজিবাদ থেকে তত দ্রুতই কি বাইরের দুনিয়া ছুটবে পুঁজিবাদকে আলিঙ্গন করতে?
সুদীপ কেমন ধাঁধায় আটকা পড়ে যায়। সে সময়ের ট্রেনে-চড়া একজন সামান্য মানুষ। বাইরে সব ভুতুড়ে কাণ্ড ঘটে, মানুষ শুধু জানালায় তাকিয়ে তাকিয়ে অতিক্রান্ত হয়ে যায়। এই ভেল্কির দুনিয়ায় মানুষ কি আসলেই বিশেষ কোনো গুরুত্বপূর্ণ প্রাণি, যেখানে ক্রুর রাজনীতিবিদ, নিঠুর সমাজকর্তা, পাষাণ রাজা-রানী, সম্রাট-সম্রাজ্ঞী, পোপ, প্রেসিডেন্ট, তেঁতুল তৈল হুজুর, উদ্ধত রাজকন্যা, অজ্ঞ মন্ত্রী আমাত্য ভালো মন্দের মানদণ্ড তৈরি করে, শিক্ষার মূল্য নির্ধারণ করে, আর শত্রুকে মিত্র বলে, মিত্রকে শত্রু।

সুন্দর একটি দেশ হল্যান্ড ! ভ্যান গঁগের দেশ, কিন্তু সুদীপের তাতে কিচ্ছু এসে যায়না। ওর এখন রুজি রোজগারের চিন্তা। ভ্যান গঁগ অপূ্র্ব, পেটে ভাত থাকলে। তবে এই সুন্দর দেশেই ভ্যান গঁগেরও পেটে ভাত ছিলোনা। সৌন্দর্য আপেক্ষিক। ট্রেন সুদীপকে কানে ধরে টেনে এনে নামায় হুক- ভ্যান-হল্যান্ড নামের পোর্টে।
বিশাল এক ফেরিতে চড়ে বসে সে। সেই ফেরি চলে সারা রাত, হেলে দুলে হাতির মত। উত্তর সমুদ্র পার হয়ে পরের দিন পৌঁছে ইংল্যান্ডের এসেক্সের "হারউইচ" বন্দরে।যে বৃটিশ সাম্রাজ্যের সূর্য কখনও অস্ত যেতোনা, সুদীপ সেই দেশটিতে পা ফেলে। ইমিগ্রেশনের সাদা লোকটির কোনো মা বাপ নেই, সুদীপকে সে জেরা করছিল চোর জেরা করার মত।

ওর মুখের ইংরেজি বোঝাই যায়না, শব্দগুলো চিবিয়ে গিলে ফেলে।
তুমি যে আমাদের দেশে থেকে যাবেনা তার গ্যারান্টি কি?
বিদেশিরা রাশিয়ায় পড়তে এসেই এখানে চলে আসে, তুমি ৭ বছর সেই দেশে থেকেও আসো নাই কেন?
তুমি তো আমাদের দেশে কাজ করবে।
তুমি যার কাছে যাবে বলছো, তুমি তো আসলে তাকে চিনোই না। আমি এখন তাকে একটা কল দিলেই জেনে যেতে পারবো।
যাও ওখানে গিয়ে বসে থাকো, আমি পরে কথা বলবো।
সুদীপ বসে থাকে।
তার সাথে যারা এসেছে সেই বিশাল ফেরির পেটে গিজ গিজ করে তারা সবাই চলে গেছে।

খুব মাথা ঘুরাচ্ছে। বমি বমি লাগছে, এম্বুলেন্সে ঝাঁকুনিটা বেড়ে গেছে। সুদীপ আবার জ্ঞান ফিরে পেয়েছে। ওর এই কখনও অচেতন, কখনও সচেতন ভাবটা আলিওনার ভালো লাগেনা। ওর নারীর ইনটুইশন, সে জানেনা যে ব্রেইন ইনজুরির পরে চেতনার এই স্বচ্ছ-অস্বচ্ছ ভাবটা খুব খারাপ জিনিস। কিন্তু আশংকায় ওর প্রাণরস শুকিয়ে যায়। ও কি সুদীপকে হারাতে যাচ্ছে?
সুদীপ প্রশ্ন করে, "আমি কোথায়?"
"এম্বুলেন্সে, আর সামান্য দেরি, এক্ষুনি হাসপাতালে চলে আসবো।"
"লাবণ্য কোথায়?"
"বাসায়, মায়ের কাছে।"
"আলিওনা?"
"আমি তোমার পাশে, চিনতে পারছোনা?"
"লাবণ্য কোথায়?"
এম্বুলেন্স হাসপাতালে এসে থামে।
তাড়াহুড়ো করে সুদীপকে ভিতরে নেয়া হয়।
আলিওনা বসে থাকে ওয়েইটিং রুমে। বসে বসে চোখ মোছে। চোখগুলো এখন লাল, লাল লাল চেরি ফলের মত।
মাথার সিটি স্ক্যান করা হয়ে যায় অল্প সময়ের মধ্যে।
ম্যাসিভ "সাবডুরাল হেমাটোমা" ও "সাব আরাখ্নয়েড হেমোরেজ"। এক্ষুনি মাথার খুলিতে "বার হোল” করে রক্ত না সরালে "আন্কাল হার্নিয়েশন" ও জীবন সংশয় হবার সম্ভাবনা । আলিওনা প্রথম-বর্ষ মেডিকেল স্টুডেন্ট হলও এই টার্মগুলো তার অপরিচিত। তার বুকের ভেতর সাপের জিভের মত শির শির করে ভয়। অতিদ্রুত অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়া হয় সুদীপকে।



১২ তম পর্ব

নাস্তিয়া তাকিয়ে আছে ঘুমন্ত অভ্রের মুখের দিকে। রৌদ্রছায়ার মত অভিব্যক্তিগুলি, দ্রুত ধাবমান ট্রেনের জানালার বাইরের পৃথিবীর মত। মাত্রই ২৪ ঘন্টা কেটেছে একসাথে, প্লেনে পাশাপাশি বসে, একসাথে গল্প করে বা ঝিমিয়ে। কখনও কখনও ঝিমুতে ঝিমুতে ওর মাথা যেই হেলে পড়েছে অভ্রের কাঁধে, ও জেগে উঠেছে অস্বস্থি বোধ করে।
"ইজভিনি"( সরি ) ।
অভ্র বলেছে তুমি আমার কাঁধে মাথা রেখে ঘুমাও, কোন অসুবিধা নেই।
কিন্তু নাস্তিয়ার অসুবিধা ছিল, সে স্বাচ্ছন্দ বোধ করেনি।
সে তখনও ভাবেনি যে আলাদা বিছানা পাওয়া যাবেনা এবং একসাথে, একই বিছানায় তাদের রাত কাটাতে হবে পাশাপাশি বেতস লতার মত। সে অবশ্য আসার আগে জিজ্ঞেস করতেই ভুলে গিয়েছিল ওরা কোথায় কিভাবে থাকবে। প্রস্তাবটি পেয়ে আগ পাছও সে ভাবেনি, এমন কি নিরাপদ কিনা তাও। মেয়েদের একটা ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় থাকে যা তাদের বিপদ আপদের এন্টেনা হিসেবে কাজ করে। কিন্তু অভ্রের ব্যক্তিত্ব ওর সেই ইন্দ্রীয়কে অল্প সময়ের জন্য হলেও বিকল করে দিয়েছিল। সে হুট করে চলে এসেছে এতদূরে, একেবারে এক বিছানায়, সম্মোহিতের মত ।
আচ্ছা অভ্র যদি জোরাজোরি করতো ও কি থামাতে পারতো ওকে?
আর নিজে? নিজের ভেতরে কি কোন যৌন বোধ জাগতো না?
এমনিতেই তো জাগে, আঠারো বছর বয়সী শরীরে তীব্রতার দামাল দৈত্য দলাই মলাই করে, প্রতিটি কোষে হা করে জেগে ওঠে প্রাগৈতিহাসিকতার ক্ষুধিত ঘড়িয়াল। কিন্তু কাউকে ভালো না বেসে দৈহিক সম্পর্কে কি যাওয়া যায়?-আধুনিক যুগে এসেও তার মধ্যে ন্যাকামির আঁইবুড়ো প্রশ্ন জাগে।

অভ্র ঘুমোচ্ছেই।
কখনও কোন পুরুষকে সে এত কাছ থেকে এত নিবিষ্ট দৃষ্টিতে ঘুমাতে দেখেনি। ওর অদ্ভুত লাগে, হঠাৎই ওর মনে হয় ও যেন অভ্রের বৌ এবং অভ্রের নিরাপদ নিদ্রার দায়িত্বটা ওর ওপরে ন্যস্ত। ওর মধ্যে কী একটা বোধ খেলা করে। আকাশে ওড়া মেঘগুলো যেমন অনেক ধরনের প্রাণির রূপ নিতে যেতে যেতে আবার বদলে যায় এবং কখনই কোন পরিপূর্ণ রূপ নেয়না বা ইয়েসিনিনের কবিতায় বোধগুলো যেমন ছাড়া ছাড়া, ঠিক তেমন।
এই যে অভ্র ওর আপন দেশ, মা, আত্মীয় স্বজন সবাইকে ছেড়ে এতদূর একটা দেশে চলে এসেছে, এটা কেমন করে মানুষ পারে ? ওর কি কষ্ট হয়না ?
নাস্তিয়া কি পারতো তার রিজান ও "অকা" নদীর দেশ ছেড়ে চলে যেতে কোন দূর বিদেশে?
মস্কো মাত্র ১০০ মাইল দূরে, তাতেই ওর কেমন কেমন লাগে। রিজানের বিশাল মাঠের প্রাণের উদারতা মস্কোতে নেই। এখানে সব কিছু ছোট ছোট, সব কিছু সীমানায় আটা। সংকীর্ণতায় শুয়ে থাকা শহর। অথচ রিজানে মাঠ আর মাঠ, শস্যের খেত। শীতে দিগন্ত বিস্তীর্ণ তুষারের প্রলেপ আকাশের গাল ছুঁয়ে। দু’ চারটা ফার-ট্রি সবুজতা নিয়ে অন্তহীন মাঠের শুভ্রতায় যতি এনে দেয়।

তা নইলে যে দৃষ্টি ক্লান্ত হয়ে যেতো। অথচ বসন্তে বরফ গলে গলে কেমন উন্মত্তা হয়ে ওঠে 'অকা'। যেন পাগলিনী, সারা বছরের শান্ত নদী মার্চ মাসের বিড়ালের মত কামোত্তা ও বেপরোয়া !

নাস্তিয়ার একা লাগে। টিভি ছাড়লে ঘুম ভেঙে যাবে অভ্রের। একজন ছোট খাটো মানুষ, প্রায় ওর সমানই লম্বা। গালে দাড়ির গোড়াগুলো কালো হয়ে উঠেছে, সম্ভবত প্রতিদিনই শেভ করে। ওর মুখের যন্ত্রনার অভিব্যক্তিটা চলে গেছে, এখন কেমন একটা কোমলতা। এমনকি একটা মৃদু হাসি খেলা করছে রৌদ্রের ঝলকের মত।
মানুষের দৃষ্টিতে বিদ্ধকারী কিছু শক্তি আছে। কারো দিকে তাকালে, সেই দৃষ্টি কোথায় গিয়ে আঘাত করে কেউ জানেনা। কিন্তু যার দিকে তাকানো হয়, সে ঠিকই ফিরে তাকায়। টেলেপ্যাথির মত।
নাস্তিয়া যখন নিবিড়ভাবে অভ্রের মুখের দিকে তাকিয়েছিলো ওর দৃষ্টিনির্গত কোন অদৃশ্য রশ্মি অভ্রের ত্বকে গিয়ে সুড়সুড়ি দিয়েছিল হয়তোবা। অভ্র স্বপ্নের থেকে চোখ মেলে তাকায় এবং ওর দৃষ্টির আলো গিয়ে পড়ে নাস্তিয়ার মুখে। একজোড়া সুন্দর চোখ ওকে দেখছে খুব মনোযোগ দিয়ে।
একজোড়া আসমানি রংয়ের অদ্ভুত ঐশিয় চোখ!
ওর কেমন যেন লাগে।
হোস্টেলে ঘুম ভেঙে চোখ মেলে সে দেয়াল দেখে অভ্যস্ত। ছোট বয়সে কখনও কখনও মায়ের চোখ এসে মিশতো ওর চোখে, কিন্তু সে কত আগে! তারপরে এই জীবন যেন শুধু ভোরের কাকের ডাকে ভরা।
কি যেন একটা অনুভূতি ওর শিড়দাড়া বেয়ে সরীসৃপের মত মাথার কোনো গহীনে হারিয়ে যায়।
যে গহীনে হাওরের জলে ডোবা ধঞ্চে ও শোলার পাতা ঝির ঝির করে। যে গহীনে মা চেয়ে থাকে বড় বড় চোখে। বৈশাখের মঙ্গলযাত্রায় মুখোশ পরিহিত বাঙালির মত অভ্রের চোখে নাস্তিয়াকে মনে হয় অসম্ভব তাজা ও সুন্দর একটি চালতা ফুল!

"তুমি কখন উঠেছো? এ- তো অনেক বেলা হয়ে গেছে, আমাকে জাগাও নি কেন? একা বসে আছো।"
"তোমাকে দেখছিলাম।" কথাটা বলে ফেলেই নাস্তিয়া কেমন লজ্জা বোধ করে, "না মানে, তোমার দিকে তাকিয়ে ভাবছিলাম জাগাবো কি জাগাবোনা।"
কিন্তু ওর মুখে নেমে আসা লাল করমচার আভা অভ্রের চোখে ঠিকই আঁকা হয়ে যায়।
অভ্র খুব ঝটপট করে ওঠে, "ইস, তুমি বোধ হয় ক্ষুধায় কষ্ট পাচ্ছো, প্রাস্তি ( আমি দুঃখিত )।"
তাড়াতাড়ি হাতমুখ ধুয়ে রেডি হয়ে নেয়।

বাইরে গিয়ে নাস্তা করে।
তারপরে সামান্য হাঁটার দূরত্ব পার হয়ে চলে যায় সিমলিম স্কোয়ারের ৬ তলায় ফিউচার শপে । কম্পিউটার ফ্যাক্সগুলোর অর্ডার ও পেমেন্টের কাজ সেরে ফেলতে বেশি সময় লাগেনা। সচরাচর এই দোকানে রাশিয়া থেকে আসা লোকজনে গিজগিজ করে। লাইন ধরে বসে থাকতে হয়। কিন্তু নিয়মিত ও বড় কাস্টোমার হওয়ার কারণে ওকে বসতে হয়না। অল্প সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ। কাজ সেরেই ৬ তলা থেকে নিম্নগামি লিফটে ওঠে ওরা। লিফ্টটা খুবই প্রশস্ত এবং শব্দহীনভাবে উঠানামা করে দ্রুত। পিছনের দিকটা কাচের, সারা শপিং সেন্টারে চোখ বুলানো যায়। ভয়ও করে উন্মুক্ত লিফটে চড়তে। সিমলিম স্কোয়ার শপিং মলটি কাচের তৈরী, অত্যাধুনিক। এমন বিল্ডিং তখনও মস্কো বা সোভিয়েত ইউনিয়নের কোথাও ছিলোনা। এক তলায় অজস্র দোকান। জামা-কাপড়-জুতা কত কিছু। কত ভ্যারাইটি, কত রং! চোখ ঝলসে যায়। নাস্তিয়া এমন কখনও দেখেনি।
তার দেশে এই চাক-চিক্য নেই।

অভ্র ওকে নিয়ে বিশাল একটা স্টোরে ঢুকে মেয়েদের পারফিউম সেকশনে নিয়ে যায়। সুসজ্জিত দোকানের সেলসগার্ল হাসি মুখে এসে ছোট ছোট কাগজে পারফিউম স্প্রে করে অভ্র ও নাস্তিয়ার হাতে দেয়, ওরা নাকের কাছে নিয়ে ঘ্রাণ নেয়। নাস্তিয়া যা-ই শোঁকে তা-ই ভালো লাগে। নাকের শ্লেষ্মা ঝিল্লি দিয়ে ঘ্রাণগুলো মগজের মধ্যে গিয়ে কেমন একটা ঘোরের সৃষ্টি করে। সে অবশ্য জানেনা কার জন্য অভ্র পারফিউম খুঁজছে। কিন্তু ধাঁধায় পড়ে। সে এত বৈচিত্র্যের সাথে অভ্যস্ত নয়। অভস্ত্য নয় পণ্য নিজ হাতে ধরে দেখায়। ওদের দেশে পণ্য থাকে ছোঁয়ার বাইরে, শেলফের ভেতরে।ক্যাশিয়ারের কাছে গিয়ে দাম পরিশোধ করে রিসিট এনে দেয়ার পরেই শুধু খরিদকৃত জিনিসটি হাতে পাওয়া যায়। কিন্তু এখানে সব কিছু উল্টা। স্টোরের কর্মচারিদের হাসিমুখের বদান্যতা এবং ক্রেতাকে খুশি করার এত মনোযোগ ও প্রচেষ্টা কেমন যেন অস্বাভাবিক মনে হয়। মনে হয় যেন এরা ক্রেতাকে ঠকানোর জন্য ওঁত পেতে আছে। শেষ পর্যন্ত অভ্র পয়জন (poison) নামে একটা পারফিউম সিলেক্ট করে বলে, আমার এটা পছন্দ হয়, তোমার কেমন মনে হয়? নাস্তিয়ারও ভালো লাগে। কি সুন্দর ঘ্রাণ! তবে দাম কামড়ায়, উহ্। অভ্র পারফিউমটি কিনে নেয়। নাস্তিয়া মনে মনে রুবলে দাম হিসাব করে হুমড়ি খেয়ে পড়ে।

সুন্দর একটি ব্যাগে দেয়া পারফিউমটি হাতে নিয়ে অভ্র হাঁটে।

নাস্তিয়াকে নাইট গাউন ও নিম্ন বস্ত্রের সেকশনে নিয়ে যায়। বলে, এখানকার নাইট গাউন এবং আন্ডার গার্মেন্টসগুলো খুবই সুন্দর, ওখানে কখনই এ জিনিস পাবেনা, তুমি এখান থেকে কিছু পছন্দ করে নাও নিজের জন্য। নাস্তিয়া বিপদে পড়ে। প্রতিটা জিনিস অতুলনীয়, আগে সে কখনই এমন রং, এমন ডিজাইন, এমন সফট জিনিস দেখেনি, কিন্তু টাকা তার নাই, অভ্র বলেছে বলে আদেখলার মত ঝাঁপিয়ে পড়তেও সে রাজি নয়। বলে, "অভ্র ধন্যবাদ, আমার কিছুর দরকার নেই, চল বরং আমরা বেরিয়ে যাই এখান থেকে।"

কিন্তু অভ্র নাছোরবান্দা, সে কোন মতেই বের হবেনা। সে সেলসগার্লসকে ডেকে এনে অনুরোধ করে ওর জন্য নাইটি, ও আন্ডার গার্মেন্টস পছন্দ করে দিতে। নাস্তিয়ার ভীষণ লজ্জা লাগে। কোন পুরুষ মেয়েদের অন্তর্বাস কিনছে, ওদের দেশে এটা খুবই অস্বাভাবিক ব্যাপার।
ও খুবই পিড়াপিড়ি করে অভ্রকে ওখান থেকে অন্য কোথাও যেতে। কিন্তু অভ্র স্টোরের মেয়েটিকে

নিয়ে নিজেই সুন্দর কয়েকটি অন্তর্বাস, নাইট গাউন ও সুইমিং স্যুট পছন্দ করে নাস্তিয়াকে রীতিমত টানতে টানতে নিয়ে যায় ফিটিং রুমের কাছে। মেয়েটিকে বলে ওর সাথে থেকে মাপসই সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলো সিলেক্ট করে দিতে। নাস্তিয়া অনিচ্ছা সত্ত্বেও ফিটিং রুমে না গিয়ে পারেনা। সে যা-ই গায়ে চাপায়, আয়নায় নিজেকেই চিনতে পারেনা, অদ্ভুত লাগে তার নিজেকে। এতটাই মনটা উড়ু উড়ু হয়ে ওঠে যে, সে ভুলেই যায় অভ্র তার কাছের কেউ নয়, কিন্তু তার তীব্র ইচ্ছা হয় ওর ওই অপার্থিব ( ওর ঠিক এমনটাই মনে হয় ) সৌন্দর্য অভ্রকে দেখাতে। কী অর্থ এই রূপের তা যদি কারো চোখেই না পড়ে?




১৩ তম পর্ব

অভ্র কেনা উপহারগুলোর দাম পরিশোধ করে নিজেই শপিং ব্যাগ হাতে নিয়ে সিমলিম স্কোয়ার থেকে বের হয়ে আসে। নাস্তিয়ার মধ্যে একটা অজানা খুশির উদ্বেলতা দুলতে থাকে পেন্ডুলামের মত। মানুষের দিনগুলো কখনও উজ্জ্বল, কখনও ধূসর। শুধু উজ্জ্বল দিন কম। নাস্তিয়ার আজকের দিনটি সেই বিরল দিনগুলোর একটি।

তাতিয়ে রোদ উঠেছে, স্বর্ণরেণুর বৃষ্টির মত, ভীষণ গরমে গা পুড়ে যাচ্ছে। একটু হাঁটার পরেই নাস্তিয়ার মুখ লাল হয়ে ওঠে পাকা তেলাকুচের মত। গা ভিজে যায় ঘামে। তৃষ্ণার্ত হয়ে ওঠে সে। অভ্র ঠাণ্ডাজলের বোতল কেনে। তারপরে সিমলিমের পাশেই ট্রপিকাল ফলের মার্কেট দিয়ে হাঁটতে শুরু করে। ফলের মিষ্টি গন্ধে বাতাস মৌ মৌ করেছে। এ এক সম্পূর্ণ নতুন গন্ধ নাস্তিয়ার জন্য, ট্রু ট্রপিকাল।
সে অবাক হয় অসংখ্য ফলের বৈচিত্র্য দেখে।
অভ্র কিছুটা পরিচয় করিয়ে দেয়। মস্ত বড় একটা ফল, নাম তার জ্যাক ফ্রুট, সবুজ চামড়ায় ছোট ছোট কাঁটা, জীবনেও সে এতবড় ফল দেখেনি। কি তার ঘ্রাণ! অভ্র বুঝিয়ে দেয়, ওদের ভাষার "রুটি ফল" বলা হয় যাকে, এটা সেই ফল। আরও একটা ফল প্রায় কাঁঠালের মতই তবে একটু ছোট, কিন্তু তার গায়ের কাঁটাগুলো সজারুর কাঁটার মত, কাঁঠালের কাঁটার থেকে বড়, নাম ডুরিয়ান। এটা নাকি ফলের রাজা। অস্বাভাবিক, তীব্র একটা ঘ্রাণ! ময়ুরপঙ্খী বর্ণের লাল-বেগুনি রেমবুটাম ফলটি দরবেশের মত চুল দাড়িওয়ালা, ভেতরটা লিচুর মত সাদা ও মাংসল, মিষ্টি এবং স্বাদও অনেকটা লিচুর মতই। আর একটি ফল, নীল-বেগুনি শাড়ি-ব্লাউজ পরা, ম্যানগুস্টিন, তার অন্তর্বাসের নীচে ঘ্রাণময়,নরম ও সাদা, মিষ্টি সুস্বাদুতা ।

অভ্র কিছু আম, লিচু, কলা কিনে নেয়। নাস্তিয়া কলা আগে দেখেছে, খেয়েছেও এক দু 'বার কিন্তু আম বা লিচু তার কাছে সম্পূর্ণ অপরিচিত। ভ্যাপসা গরম। ঘামে ভেজা শরীর। বড় অস্বস্থি লাগে। ওরা একটি ম্যাকডোনাল্ডসে ঢোকে। ওদের দেশে ম্যাকডোনাল্ডস নেই। নাস্তিয়া নাম শুনেছে। জানে যে, পশ্চিমে খুব জনপ্রিয় কিন্তু কি ধরনের খাবার, কি তার স্বাদ এ সম্পর্কে তার বিন্দুমাত্র ধারণা নেই। অভ্র প্রয়োজনের বেশিই অর্ডার দেয়, "বিগ ম্যাক", "ফিলে ও ফিশ্", "ফ্রেন্চ ফ্রাইজ", "অ্যাপেল পাই", "চকোলেট সানডেই"। নাস্তিয়ার ভালো লাগে, সে খুব আনন্দ সহকারে খায়। সম্পূর্ণ নতুন ধরনের স্বাদ। আলু যে এত সুন্দর করে ফ্রাই করা যায় তা সে কোনদিন ভাবতেই পারেনি।
বিগ ম্যাক বা বার্গার জিনিসটা রুশ খাদ্য তালিকায় নেই। ‘চকোলেট সানডেই’ মুখে দিয়ে সে তাজ্জব বনে যায়। এত সুস্বাদুও আইসক্রিম হতে পারে! তার ধারণা ছিল ওদের "প্লমবির" হচ্ছে পৃথিবীর সেরা আইসক্রিম, অথচ এ তো মুখে গলে যায় বসন্তের তুষারের মত, আপনা আপনি। নাস্তিয়া শিশুর মত হয়ে যায়। নতুন অভিজ্ঞতা মানুষের মধ্যেকার শিশুটাকে জাগিয়ে তোলে, নতুনের আশ্লেষে তার দৈনন্দিন জীবনের অতিপরিচিত, এমনকি অতিসুন্দর জিনিসগুলোও খাটো মনে হয়।


তাই তো কীট্সের স্কটল্যান্ডে পালিয়ে যাওয়া দুষ্ট বালক আসলে দুষ্ট বালক নয়, সে সমস্ত মানব জাতির মনোজগতের জীবন্ত অভিব্যক্তি! এবং মানব জাতি আবার যখন একটি ন্যায় সমাজের নিরীক্ষা করবে, তারা মানুষকে মানুষের থেকে পৃথক করার জন্য চারিদিকে কোনো পরিখা, কোনো দেয়াল, কোনো সীমান্ত গড়ে তুলবেনা। মুক্ত মানুষের ধমনিতে পদ্মার চাপিলা মাছের পিঠের ঝিলিকের মত ঝিলিক মারবে আলবেরুনি, ইবনে বতুতা, ফা-হিয়েন ও হেরোডটাসের জিন।

গরুর খুঁটির মত ‘প্রপিসকা’ নামে যে শৃংখল আবিস্কার করা হয়েছিল রুশ মানুষের জন্য হাজার বছর আগে এবং সোভিয়েতিজমের ল্যাবরেটরিতে যার হয়েছিল কর্কট বিন্যাস তা দূর হয়ে যাবে মানব জাতির স্মৃতি হতে।

নাস্তিয়া খাওয়া শেষ করে কেমন লজ্জা বোধ করে। সে কখনই অতিরিক্ত খায়না কিন্তু আজ রিজানের মাঠে মাঠে দৌড়ানো ফ্রক-পরা তিতলীর মত ছোট্ট একটি মেয়ে তার মধ্যে ভর করেছিল, সে নিজেকে সামলাতে পারেনি। অভ্র বলে, "আর কিছু অর্ডার করবো?"
নাস্তিয়া ওর দিকে তাকিয়ে হাসে," আমি তো নড়তেই পারছিনা, এভাবে খেলে অচিরেই হাতি বনে যাবো।" অভ্রও হাসে।

“তুমি ঠিকই বলেছ, একেই বলে জাঙ্ক ফুড, শরীরের জন্য ভালো নয়, তবে ধারণাতো হলো।"

অভ্রের মনে হয় জঙ্গল থেকে শহরে নিয়ে আসা আদিম মানুষের মত বিশ্বাসী, সহজ, সরল ও জটিলতাহীন এই মানুষগুলো। তারা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের সামনে, জন্তু-জানোয়ারের সামনে, মঙ্গোল, নেপোলিয়ন, হিটলারের সামনে বুক চিতিয়ে দাঁড়াতে পারে কিন্তু পাশ্চাত্যের সভ্য (!) মানুষের সামনে তারা অস্বাভাবিক অসহায়। তারা অসহায় যখন সাম্য, শ্রেণি ও শোষণহীতার প্রতিশ্রুতি দিয়ে বুকে চেপে বসে থাকে একদলীয় স্বৈরশাসনের জগদ্দল পাথর।

বাংগালি কৃষক, শ্রমিক ও মেহনতি মানুষ যেমন অসহায় শহুরে শিক্ষিত (!), বুদ্ধিজীবী (!), ওয়াজ-নসিহতকারী মোল্লা ও রাজনীতিবিদদের সামনে।

তাদের ট্রাম্পেট বাজিয়ে শোনানো হয়েছে যে পুঁজিবাদ হচ্ছে পচনশীল ও মৃতপ্রায়। কিন্তু এরা

পরিখা উন্মুক্ত করার পরে বাইরে এসে দেখছে অন্যচিত্রঃ চারিদিকে আলো ঝলমল করছে,

লাল নীল আলো, জুয়া ও জোছনার উৎসব, ক্লেদ, কদর্যতা ও যৌনতার পিপিং হোল। ছিমছাম, ঝকঝকে তকতকে, পেশিবহুল, আপাত অগাধ সম্ভাবনাময় ও গতিশীল "সব পেয়েছির ইন্দ্রজাল”। যারা পুঁজিবাদে বাস করেনি তারা কী করে জানবে জোচ্ছুরি কোথায়, কোথায় পচন। কী করে জানবে যে, এখানে সবকিছু খুব সুক্ষ্ণ, হাসির নিচে পকেট মারার কাঁচি আর প্রশংসার নিচে প্রতারণার প্রসাদ।

সব কিছুই রংয়ের মোড়কে মোড়া। তাদের ওখানে যা জবরদস্তি, এখানে তা পরিবেশন করা হয়

এত সুন্দর, ভদ্র ও আপাত গণতান্ত্রিক দৃশ্যমানতায় যে, মানুষ তা খুশিমনে গ্রহণ করে এবং সিলেকসনের বৈচিত্র্যে নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করে। ওদের দেশে সক্রেটিস, সেনেকা ও বিওশিয়াসের মত মৃত্যঞ্জয়ী মানুষের দুই ঠোঁট জোর করে খুলে মুখে বিষ ঢেলে দেয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়, কিন্তু এখানে মানুষ নিজেই গলা ভরে গল গল করে বিষ পান করে জয়গান করে গণতন্ত্রের ।
ওরা ফাঁকিটা ধরতে পারেনা, এবং দ্রুতই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলে যে, তাদের দেশে এতদিন মিথ্যা বলা হয়েছে। তারা তখন মিথ্যার নাগপাশ থেকে বের হয়ে আসতে চায় এবং নিজের অজান্তেই আলিঙ্গন করে পশ্চিমের সুশোভিত মুখের অক্টোপাস ও অজগরদের। আর তখনই, এতকাল যে বরাহ বাহিনী স্ব স্ব দেশের সরল মানুষের টুটি চেপে ধরে শৃংখলকে সাম্য বলে ছেলে ভুলানো গান গেয়েছে, চিৎকার করে বলে, “এটা পুজিঁবাদ ও সাম্রাজ্যবাদের ষড়যন্ত্র!" তারা নিজেদের নিপীড়নকারী ও নিপীড়কের তোষামোদকারীর চেহারা দেখতে পায়না। তারাই যে স্বৈরতন্ত্রের যাঁতাকলে পিষে ‘পুজিঁবাদ ও সাম্রাজ্যবাদকে’ আলিঙ্গন করা ছাড়া মানুষের জন্য অন্য কোন বিকল্প রাখেনি সে কথা বেমালুম চেপে যায়।

বিপ্লবের পরেই ধ্বংসের যুদ্ধ নিয়ে আক্রমণ করেছিল ১৪ টি পুঁজিবাদী দেশ। তখন, সেই শৈশবে যদি বিপ্লব টিকে থাকতে পারে, তা পেরেছিল বিপ্লবীদের নিজেদের অন্তর্নিহিত শক্তির কারণেই। আজ পরাশক্তি হয়েও যদি বালুর প্রাসাদের মত ধ্বংস হয়ে যায়, তাও তাদের অন্তর্নিহিত দুর্বলতার কারণেই। তারা এই কথাটা বেমালুম ভুলে যায় যে, সোভিয়েত ইউনিয়নকে সাম্রাজ্যবাদ ভাঙ্গে নাই, ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির স্বার্থপর, অন্ধ, দেশ ও জাতির প্রতি অবিশ্বস্ত উটপাখি নেতৃত্বের

দ্বারা সুচিন্তিতভাবে শুরু করা ভাঙ্গনে সাহায্য করেছে। প্রতিটি জিনিসকে তার স্ব স্ব নামেই ডাকা দরকার। হিটলারের পার্টির নাম ছিল ‘জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল’ ( নাৎসী=ন্যাশনাল সোসালিস্ট পার্টি=জাসদ), কিন্তু আমরা হিটলারের জার্মানীকে সমাজতান্ত্রিক বলিনা। অথচ লেনিন যে

পার্টিতে গণতন্ত্রের চর্চা করে গেছেন, যে পার্টির বিশ্বস্ত নেতা-কর্মীদের নিয়ে অক্টোবর বিপ্লব করে গেছেন, তাদের প্রায় সবাইকে হত্যা বা পার্টি থেকে বহিস্কার করে যে দানব শক্তির পার্টি সে দেশে ক্ষমতার পিং পং খেলেছে তাদের আমরা সমাজতান্ত্রিক বলি প্রশ্নহীনভাবে। গোঁফ দেখে বেড়াল চেনা যায় বলে কি নাম শুনে সমাজ চেনা যায়?

রাশিয়ানদের নিয়ে যখন সিঙ্গাপুরে আসে, অভ্র অনেক সময় কাটায় তাদের নিয়ে ঘোরাঘুরি করে। তাদের অদেখা, অপরিচিত জিনিসগুলোর সাথে পরিচয় করিয়ে দেয় এবং ওদের চোখে মুখে যে বিস্ময় দেখতে পায় তা তাকে আনন্দ দেয়। সে এদের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে কসুর করেনা, সবটাই যে তার নিজের স্বার্থ আদায়ের জন্য করে তা বলা যাবেনা। সেই একমাত্র ব্যক্তি নয় যে সিঙ্গাপুরে "পাইলট" পাঠিয়ে কম্পিউটার আনায়।

"পাইলট" কথাটি সেই সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নে উঠতি খুচরা বাঙালি ব্যবসায়ি গোষ্ঠীর মধ্যে বহুল পরিচিত ছিল। “পাইলট” হল সেই সব সোভিয়েত নাগরিক যাকে টিকেট এবং থাকা খাওয়ার পয়সা দিয়ে সিঙ্গাপুরে পাঠিয়ে কম্পিউটার আনানো হত। টিকিট কেনা হতো রুবলে যার দাম ছিল, চোরা বাজারে শ খানেক ডলারের সমমানের, থাকা খাওয়া মিলিয়ে হয়তো সাকুল্যে খরচ হতো শ পাচেক ডলার। কিন্তু তাদের নিয়ে আসা কম্পিউটার বিক্রি করে লাভ হতো ২০০০-৪০০০ ডলারের মত।

এই পরিমাণ ডলারের মূল্যমান ছিল বিশাল। যেমন সেই সময়ে লেনিনগ্রাদে ইজরায়েলে ইমিগ্রেশন নিয়ে চলে যেতে ইচ্ছুক একজন ইহুদির কাছ থেকে গোপনে ২ বেডরুমের একটি এপার্টমেন্ট বা দাচা ( গ্রামের গ্রীষ্মকালীন বাড়ী) কেনা যেতো ২-৩ হাজার ডলারে। ১০ বছর পরে যার দাম হবে ৫০,০০০-১০০,০০০ । মস্কোতে হয়তো একটু বেশি। খুব স্বল্প সময়, মাত্র বছর ২ এমন একটা অবস্থা ছিল, যখন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে বের হয়ে যেতে ইচ্ছুক মানুষের ভীড় ছিলো প্রচুর। ইহুদিদের জন্য ইজরায়েল যাওয়া সহজ ছিলো বলে এসময়ে ইহুদি নারী পুরুষদের সাথে টাকার বিনিময়ে ফিকটিভ্ বিয়ের সংখ্যা ছিলো অনেক। তারা সোভিয়েত দেশ থেকে বের হবার পরেই বিয়ে ভেঙে যার যার পথে চলে যেতো।

সিঙ্গাপুরে পাইলট পাঠানো বেশীরভাগ ব্যবসায়ীর লক্ষ্য ছিলো এদের পেছনে যত কম খরচ করা যায়। কমদামি হোটেলে রাখা, এক-দুইদিনের মধ্যে ফিরিয়ে আনা নিশ্চিত করে মুনাফা বাড়ানো

হতো। কিন্তু অভ্র ছিলো ব্যতিক্রম। ব্যবহারেও সে ছিল অতি সচেতন এবং বন্ধুত্ব পরায়ণ।

আর বাইরে না ঘুরে ওরা ট্যাক্সি নিয়ে সোজা হোটেলে চলে যায়। রুমে গিয়ে স্নান সেরে নাস্তিয়া

কেনা কাটা খুলে দেখতে থাকে। ওর মুখে এক অনপনেয় খুশীর আলো ঝলমল করে ওঠে। সে অভ্রকে বার বার ধন্যবাদ দিয়ে বলতে থাকে যে, তার জন্য এতগুলো টাকা খরচ করার প্রয়োজন ছিলোনা।
অভ্র বলে, “তোমাকে ধন্যবাদ যে, তুমি আমার সাথে এসেছো। আমার খুব ভালো লাগছে। সব সময় একা একা আসি, তুমি আসায় এবারের ট্রিপটাই অন্যরকম লাগছে। তুমি এত সুন্দর এবং তোমাকে এই বসনগুলোতে যে আরও কত সুন্দর লাগবে একথা ভাবতেই আমার মন ভরে যায়। নাইট গাউন পরলে আমার বিশ্বাস তোমাকে যে কোন পরীও হিংসা করবে।”

"সত্যি বলছো?"
"পরবো? দেখবে?"
"আমার কি সেই সৌভাগ্য হবে?"
"দাঁড়াও", বলে এক দৌড়ে সে বাথরুমে গিয়ে দেহের সমস্ত বসন খুলে নতুন আন্ডারওয়্যার ও নাইট গাউন পরে বের হয়ে আসে। অভ্রর চোখ ঝলসে যায়।
চিরায়ত যৌবনের প্রতীক, আর্তেমিস দাঁড়িয়ে আছে ওর সামনে!

চোখ গেলো, চোখ গেলো! নাস্তিয়ার দেহ বিচ্ছুরিত আলো অভ্রের চোখের কনীনিকা পুড়িয়ে অপটিক নার্ভের তার ও কায়াজমার ল্যাবিরিন্থ পার হয়ে মগজের কোথায় গিয়ে যেন আগুন ধরিয়ে দেয়। দান্তে কি এমন কোনো মুহূর্তেই বলেছিলেন?

“আগুনের থেকে উত্তাপকে, অনাদি ও অনন্তের থেকে সৌন্দর্যকে পৃথক করা যায়না।”*

*(Heat cannot be separated from fire, or beauty from eternal-Dante.)




১৪ তম পর্ব


কিছু রূপ নৈর্ব্যক্তিক। এবং নাস্তিয়াকে ওর সৌন্দর্য থেকে আলাদা করা সম্ভব নয়। ওকে অভ্র ছাড়া অন্য কেউ দেখলেও এই মত বদলাবে না। যে চোখে নাস্তিয়াকে দেখছে অভ্র, চানক্য হলেও সেই একই চোখে দেখে বলতো :
“The world’s biggest power is the youth and beauty of a woman “

নাস্তিয়ার বুকে অন্তর্বাস নেই, রাতের গাউনে অন্তর্বাস অপ্রয়োজনীয়। ওর দুই স্তনের দুই অর্ধাংশ উন্মুক্ত, আর উন্মুক্ত মধ্য উরু থেকে নীচের সব কিছু। পায়ের সুন্দর আঙুল ও নখগুলো পর্যন্ত।

অদ্ভুত সুন্দর দেহলতা!

অদ্ভুত সুন্দর উর্ধ্ব ও নিম্নাংগের সমন্বয়, দীর্ঘ ও সোজা উরু, জংঘা ও পাদপদ্ম।

অভ্রের অভিজ্ঞ চোখ, নাস্তিয়াই একমাত্র নারী নয় যাকে সে এই বেশে প্রথম দেখেছে। কিন্তু ওরও মনে হয় যেন আসলেই প্রথম কোনো নারীকে দেখছে।

এমন রূপ আর দেখেনি ।

এত অল্প বয়সী আর কেউ তার সঙ্গী ছিলোনা কখনো।

অভুত সৌন্দর্য তার দৃষ্টির সম্মুখে, মুখে এক আদিগন্ত হেসে খেলে যায় ওর কিন্তু তারও চেয়ে লম্বা হাসি নাস্তিয়ার মুখে।

ও খুব কাছে এগিয়ে আসে।

প্রশ্ন করে, "নু কাক?" ( পছন্দ হয়?)
অভ্র উত্তর দেয়ার আগে নাস্তিয়ার দিকে এগিয়ে দেয় poison পারফিউমের বাক্সটি : "এটা আমি তোমার জন্যই কিনেছি, ইচ্ছা করলে ব্যবহার করে দেখতে পারো, তোমার আরো ভালো লাগবে, তবে খুব সামান্য, তোমার দেহের যে নিজস্ব গন্ধ আছে তা যেন ঢাকা পড়ে না যায়।"
নাস্তিয়া আর এক তরফা বিস্মিত হয়।

তার ধারণা হয়েছিল অভ্র হয়তো তার কোনো বান্ধবীর জন্য কিনেছে।

তুমি কি এটা তোমার কোনো বান্ধবীর জন্য কেনো নি? নাস্তিয়া অন্ধকারে ঢিল ছোড়ে।

তোমার মত এত সুন্দর কাউকে পাইনি, আমার কোনো বান্ধবী নেই। অভ্র ঢিলটা ফিরিয়ে দেয়।
নাস্তিয়া এবার পারফিউমটি তুলে নিয়ে গায়ে সামান্য স্প্রে করে। সারা ঘর মৌ মৌ করে ওঠে অষ্টাদশী কুমারীর দেহের গন্ধে।

সে এগিয়ে আসে খুব কাছে, একটু বেশিই কাছে, তারপরে অভ্রর গালে একটি চকিত চুম্বন দিয়ে বলে :"তোমাকে ধন্যবাদ, তুমি একটা অদ্ভুত মানুষ, আমি সত্যিই সুখী যে তুমি আমাকে এত সুন্দর একটা ভ্রমণে নিয়ে এসেছো"।

ওর বুক প্রায় ছুয়ে যায় অভ্রের বুক, ও মোমের মত গলে পড়তে চায় অভ্রের দেহের ওপর। ওর ঠোঁট দুটো প্রায় ছুঁয়ে ফেলে অভ্রের ঠোঁট। কিন্তু সম্বিত ফিরে পায় সে, বুঝতে পারে যে, সে নিজেরই সৃষ্ট পরিখা অতিক্রম করতে যাচ্ছে। তার ষষ্ঠ ইন্দ্রীয় কথা বলে ওঠে।
অভ্রও ওকে তীব্রভাবে আঁকড়ে ধরতে গিয়ে কেনই যেন থেমে যায়।

এমনটা হবার কথা নয়।

জীবনের প্রথম অভিজ্ঞতার মত অভ্র তার দুই কানে, সারা শরীরের চামড়ায় এক অসম্ভব উত্তাপ অনুভব করে। যেন নিউক্লিয়ার রি-এক্টরের বুকের অন্ত:স্থলে জ্বলে ওঠা লেলিহান আগুন ঝলসে দিয়েছে তাকে।

নাস্তিয়া একটি ফুলের মত। আগুনের ফুল।

এক অসামান্য সৌষ্ঠবের দেবকন্যা, আর্তিমিসের চোখের মত সুন্দর!

অভ্র সযত্নে মাকরসাড় মত জাল পেতে ছিল এই মুহূর্তটির জন্য ।

মুহূর্তটি স্পর্শের মধ্যে চলে এসেছে ।
কিন্তু অভ্র?

অভ্র লের্মন্তভের ডেমনের মত জীবনের কঠিনতম সিদ্ধান্তের সম্মুখীন।
ডেমন জানতো তার তপ্ত স্পর্শ ডেকে আনবে তামারার বিলয়।
সে কি ডেমন হবে?

ফুলকে যে অসময়ে ছিড়তে নেই।
ফুল তার আদি সত্তায়ই সবচেয়ে সতেজ, সুন্দর ও দীর্ঘস্থায়ী।
এবং সেখানেই ফুলের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ।

বৃন্তচ্যুত ফুল মলিন ও মৃত ।

অভ্রের মধ্যে কি একটা ভাঙ্গন, কি একটা অবয়বহীন অস্থিরতা দেখা দেয়।

মনে হয় সে একটা লোচ্চা, একটা নীচ,ইতর।
এবং কোনদিন যা সে অনুভব করেনি কোন নারীর জন্য, তাই অনুভব করে নাস্তিয়ার জন্য... কী যেন একটা অনুভূতি .... নাম না জানা...লের্মন্তভের ডেমনের অশ্রুর মত।

ও নিজেকে সংবরণ করে।
চিরাচরিত নির্দোষ ও মিষ্টি হাসে। তুমি জামা কাপড় পরে আসো, আমরা বাইরে যাই।"

নাস্তিয়া যেন হঠাৎ একটা ধাক্কা খায়। ওর বুকে হৃদপিণ্ড এমনিতেই ছুটছিল স্তেপের উন্মত্ত বাইসনের মত। সে থামতে চাইলেও অভ্র তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যাবে, সে নিশ্চিত ও প্রস্তুত ছিলো। হঠাৎ তাকে থেমে যেতে হয়েছে এক প্রচণ্ড আছাড়ের শক্তির রাশ টেনে ধরে। ও বাথরুমের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে চুপ করে, কিন্তু সমস্ত শরীরে মৃগীরোগের অবিচ্ছিন্ন ঝাঁকুনির মত একটা ঝাঁকুনি, নিঃশ্বাসে আগুন, মগজে পম্পেইয়ের প্রলয়।

সে কোনদিন নিজেকে নিবেদন করার মানসিক সায় পায়নি।
কিন্তু আজ কেমন যেন হয়ে গেল, ওর মনের সব বাঁধা যেন গেল উবে। মনে হল অভ্রই সেই মানুষটি যারা জন্য সে এতদিন সাজিয়ে রেখেছিল তার জীবন যৌবনের পুজার মন্দির। চরম মহূর্তটি ছিল এত কাছে। সে মন্দিরের দুয়ার খুলে দিয়েছিলো। ওর বুকের ভেতরটা কেমন খান খান হয়ে যায়। মনে হয় অভ্র ওকে ভীষণভাবে অবহেলা করলো। শুধু তাই নয় সে অপমান করলো। এগিয়ে আসতে পারতো সে, ওর সমস্ত দ্বিধা,সংশয় ও জড়তাকে দূর করে বুকে টেনে নিয়ে দেখাতে পারতো যে ওরও অনুভূতি আছে, সে ইট পাথর গাছ নয়। সে একহাতে দামী উপহার দেয় অন্যহাতে কালি

ছিটায়।
ওর কাঁদতে ইচ্ছা করে।
নিজেকে ভীষণ তুচ্ছ মনে হয় ।
অভ্র বলেছে ফুল, কিসের ফুল?

রিজানের মাঠে কোটি কোটি ঘাস ফুল ফোটে, কারোর চোখেই পড়েনা সেই ফুল ।
নাস্তিয়া কি ঘাসফুল? মাঠের পিউলী? এতই নগণ্য?

না, সে পঙ্গপালের দলের অসংখ্যের এক নয়, সে একটি স্বতন্ত্র সত্তা। তারও আত্মসম্মান আছে। সে শাওরারের নীচে দাঁড়িয়ে শীতল হয়, তারপরে পোষাক পরে বের হয়ে আসে।

অভ্র জানালায় দাঁড়িয়ে আছে আকাশের দিকে চেয়ে। আকাশটার কোনো সীমা পরিসীমা নেই, মানুষের মনের মত। মেঘগুলো মানুষের চিন্তার প্রতিফলন যেন।

নাস্তিয়া বের হতেই যেন কিছুই হয়নি এমন স্বরে বলে, “রেডি? চল, আমি তোমাকে এমন কিছু দেখাবো যা তুমি জীবনেও দেখোনি।”

কিন্ত নাস্তিয়ার নিহাস মুখ অভ্রর দৃষ্টি এড়ায়না। বৃক্ষ-কাণ্ডে জড়িয়ে থাকা আইভি লতার মত মলিনতা সেই মুখে।

হোটেলের বাইরেই বাস স্টপ। অভ্র ট্যাক্সি নিতে পারতো, কিন্তু চড়ে বাসে বসলো । সিঙ্গাপুরের বাসগুলো সুন্দর। চারিদিক ভালো দেখা যায়।

একটি শহর নিয়ে একটি দেশ।
দেশটা ছোট।
ছোট দেশ সাজিয়ে গুছিয়ে রাখা যায়।
গাছপালায় সবুজ। ট্রপিকাল ফুলে পুষ্পময় ।

অভ্র একটা চুম্বক। ওর অভিকর্ষ এত শক্তিশালি যে দূরে থাকার শক্তি নাস্তিয়ার নেই। পাশাপাশি বসে ওরা। কাছাকাছি। অভ্র শহরের বিভিন্ন জিনিস দেখিয়ে ওকে কিছুক্ষণের মধ্যেই এমন ব্যস্ত করে ফেলে যে, নাস্তিয়ার নিজস্ব মনোজগতের মেঘে হারিয়ে যাবার কোন উপায় থাকেনা। কোন দুঃখ, অভিমান, বঞ্চনা বা অপ্রাপ্তির খেদে বিচরণ করার পথ নেই। জানালার বাইরে যে বাস্তব জগত, তাকে সে দিকে মনোযোগ দিতে হয়। সিঙ্গাপুর বোটানিকাল গার্ডেনে পৌঁছে ওরা।

অর্কিড!
নাস্তিয়া মুহূর্তে জীবন্ত হয়ে ওঠে।

এই যাদুর ফুলটির কথা অনেক শুনেছে সে, পড়েছে, এমনকি মাত্র কিছুদিন আগে রুশ ভাষায় ডাবিং করা আমেরিকান ছবি “বুনো অর্কিড” নামে অদ্ভুত রোমান্টিক একটি ছবি দেখেছে। কিন্তু জীবন্ত অর্কিড সে কোনোদিন দেখেনি। ওর প্রাণ নেচে ওঠে খুশিতে।
একটা অদ্ভুত ইউফোরিয়া, প্রাক-ফাল্গুনের বাতাসের মত মনটাকে কেমন উড়ু উড়ু করে দেয়।

অভ্র এর আগেও বেশ কয়েকবার এসেছে। ফুলগুলো অদ্ভুত দাগ কেটেছে ওর মনে। বাংলাদেশে সুন্দর ফুলের অভাব নেই, কিন্তু অর্কিড নাই বললেই চলে, অন্তত সে দেখে নাই।

সুন্দর সুন্দর ফুল! কত বিচিত্র রংয়ের ! বিচিত্র ধরনের ! একটি ফুল আরেকটির মত নয়।

চোখ জুড়িয়ে যায়।

ইকোয়াডোর, কলাম্বিয়া, ভেনেজুয়েলা, ব্রাজিল, হিমালয়, মালয়েশিয়া, চীন, আফ্রিকা বিশেষ করে মাদাগাস্কার সারা পৃথিবী জুড়ে আছে এই ফুল। অপূ্র্ব ও ঐশ্বরীয়, অর্কিড পুনঃ পুনঃ ফুল দিতেই থাকে, তাই প্রাচীন চীনে নারীর নিয়মিত সন্তানের জন্মদেয়াকে তুলনা করা হতো অর্কিডের পুষ্পায়নের সাথে। নারী ও অর্কিড অবিচ্ছেদ্য।

এই ফুলগুলো কখনও এক রঙা, কখনও বহু রঙা, কখনও তীব্র ঘ্রাণের বা খুবই সামান্য নারী দেহের ঘ্রাণের মত। কখনও সম্পূর্ণ ঘ্রাণহীন। প্রেম ও স্নেহের প্রতীক এই ফুল। সে একান্ত পরিবেশ ছাড়া বাচঁতে পারেনা, দেখায়না তার সৌন্দর্য! তার চাই নির্দিষ্ট পরিমান আলো, নির্দিষ্ট তাপ, আর্দ্রতা, স্পর্শ ও ভালোবাসা।
অবিকল নারীর মতই।


১৫ তম পর্ব


“Pride, beauty, and profit blossom together on one delicate green spike, and it may be, even immortality.” (The Flowering of the Strange Orchid: H.G.Wells)


এইচ জি ওয়েলসের কল্প-কাহিনীতে অর্কিডকে রক্তপায়ী দানব হিসেবে দেখানো হলেও, তা সত্যিই অর্কিডের সৌন্দর্য ও সৌষ্ঠবের সাথে যায়না। ইতিহাসে কিছু সুন্দরী নারী আছে যাদের নাম অনেক রক্তপাত, লোভ এবং হিংসার সাথে জড়িত, লেখক তারই একটা প্যারালাল টানতে গিয়ে অর্কিড ফুলটি ব্যবহার করেছেন কিনা আমার জানা নেই ।

তিনি মধ্যযুগের অসামান্য সৌন্দর্য্যের নারী, প্রেম, গুপ্ত প্রণয়, যৌনতা, ক্ষমতা, খুন ও রক্তপাতের রানী ‘এলিওনোর অব একুইটেইনকে’ নিয়ে এই গল্পটি লিখতে পারতেন। তার ছিল গুপ্ত প্রণয়-প্রাসাদ যেখানে শুধুমাত্র নির্বাচিত প্রেমিকরাই যেতে পারতো, যাদের মানতে হতো ৩১টি কঠোর কোড : “যে গোপনতা রক্ষা করতে পারেনা সে ভালোবাসতে জানেনা”, “কৃপণতা ও প্রেম এক ঘরে বাস করতে পারেনা ”,“সত্যিকারের প্রেমিক সব সময় নম্র হয়”, ইত্যাদি ইত্যাদি। তার প্রেমিক বেরনার্ড ভেনতাদুর তাকে নিয়ে লিখে গেছে সর্বকালের শ্রেষ্ঠ একটি প্রেমের কবিতা।

“নার্সিসাস যেমন ঝর্নার জলে
তেমনি আমি তোমাতে…..
কষ্ট তিলে তিলে হত্যা করে চলেছে আমাকে ।”

অথচ অর্কিডের রক্তপানের চেয়েও নিষ্ঠুর ছিল তার জিঘাংসাঃ তার স্বামী কিং হেনরির গোপন প্রেমিকার নাম ছিল রোজামুন্ড বা “Rose of the world”. সে ছিল দ্বাদশ শতাব্দীর অন্যতম সুন্দরী নারী ।

এলিওনোর তাকে গোপনে বন্দী করে আনে, তারপরে নিজেকেই বেছে নিতে বলে কিভাবে সে মরতে চায়ঃ ছুরির আঘাতে, না বিষের পেয়ালা পান করে? সে বেছে নেয় বিষের পেয়ালা।

অর্কিড কোনোমতেই এত নিষ্ঠুর হতে পারেনা, এইচ জি ওয়েলস বললেও না। বরং অর্কিড হলো

ফিলিপিনো উপকথার এক নারীর ভালোবাসার মেটামরফোসিস। রাজা যুদ্ধে গিয়েছিল। আর তার অপূ্র্ব সুন্দরী ও প্রেমমুগ্ধা রানী ছিল পথ চেয়ে। রাজা আর আসেনা। দিন যায় রাত যায়। রানী উঁচু এক গাছে চড়ে বসে তাকিয়ে থাকে যতদূর দৃষ্টি যায়, সেই দিক-চক্রবালের দিকে, যদিই বা প্রিয়তমের ঘোড়ার ক্ষুরে উড্ডীয়মান ধুলোর মেঘ দেখা যায়। সময় বয়ে যায় সে তাকিয়েই থাকে। যৌবন মলিন হয়ে আসে, রাজা আসেনা।

তার দেহ আস্তে আস্তে প্রোথিত হয়ে যায় সেই গাছে এবং তাকাতে ….তাকাতে….তাকাতে সে পরিবর্তিত হয়ে যায় এক অপূর্ব সুন্দর অর্কিডে। তার ঘন সবুজ চকচকে পাতা, তার লম্বা একহারা শীর্ণ দেহ আর সবুজ-রূপালী বায়বীয় শিকড়। চেয়ে থাকে অপূ্র্ব তারই চোখের মত সুন্দর সুন্দর ফুল-ভান্দা। আহ্ ঈশ্বর! একেই বলে প্রেম! সেই থেকে অর্কিড ভালোবাসার ফুল।

অভ্র একবার সিঙ্গাপুরে এসে সারাদিন কাটিয়েছে এই অর্কিডের পেছনে। যে মেয়েরা অর্কিড ফলায়, যত্ন করে, তাদের প্রশ্ন করেছে খুটিয়ে খুটিয়ে। ওদের কাছ থেকেই জানতে পেয়েছে যে, অর্কিড হচ্ছে একটা নেশার মত। পৃথিবীকে সুন্দর করার নেশা!

ওরা হেঁটে হেঁটে ফুল দেখে আর অভ্র গল্প করে উপকথা, ইতিহাস, অর্কিড ফুলের বৈশিষ্ট্য নিয়ে। ১৮১৭ সালে বিশাল একটি অর্কিড আবিস্কার হয়েছিল ব্রাজিলে। কিন্তু অর্থলোভী বেনিয়ারা ফুলের স্থানটি গোপন রাখে এবং ভুলে যায় সত্তুর বছরের জন্য। ১৮১৮ সালে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো বোটানিকাল গার্ডেনে কয়েকটি বিশালাকৃতির অজানা ফুল আসে অন্য কোনো স্থান থেকে। প্ল্যান্ট সংগ্রাহক উইলিয়াম ক্যাটলি’র কাছে তারা কিছু প্ল্যান্ট পাঠায়। ক্যাটলি তাদের সংরক্ষণ করে শীততাপ নিয়ন্ত্রিত স্পেশাল সংগ্রহশালায়।

শরৎকালে একটি অপূ্র্ব ফুল ফোটে ক্যাটলির গ্রীনরুমে। পরের বছর আরও কিছু ফুল ফোটে গ্লাসগো বোটানিক্যাল গার্ডেনে। হর্টিকালচারাল জগতে আস্তে আস্তে ছড়িয়ে পড়ে এই অদ্ভুত সুন্দর ফুলের কথা। ক্যাটলি জন লিন্ডলি নামে ২২ বছরের এক যুবক বোটানিস্টকে নিয়োগ করে তার কালেকশনের নতুন প্ল্যান্ট সমূহের ছবি এঁকে তাদের বর্ণনা করার জন্য। ১৮২১ সালে লিন্ডলি Collectanea Botanica নামে বই লেখে এবং সে ক্যাটলি’র সন্মানে এই ফুলটির নাম দেয় “ক্যাটলিয়া ল্যাবিয়াটা”। ল্যাবিয়াটা শব্দটি আসে ল্যাবেলাম (বা ঠোঁট ) থেকে, কারণ প্রতিটি ফুলের একটি অপূ্র্ব সুন্দর ঠোঁট রয়েছে যে কোন নারীর ঠোঁটের চেয়েও সুন্দর বা সমকক্ষ।

ক্যাটলি’র সংগ্রহে অনেক ফুল ছিল কিন্তু “ক্যাটলিয়া ল্যাবিয়াটা” ছিল সুন্দরতম। আর লিন্ডলি সারাজীবনের মত মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে থাকে ক্যাটলিয়ার প্রেমে। অভ্র যেমন মন্ত্রমুগ্ধ নাস্তিয়ার দীপ্তিতে, লিন্ডলি তেমনি তার বইতে এই ফুলের যে বর্ণনা দেয়, পৃথিবীর কোন বোটানিষ্ট এত রোমান্টিক বর্ণনা তার প্রেমিকা সম্পর্কেও দিতে পেরেছে কিনা সন্দেহ। সেই থেকে ইওরোপে অর্কিডের যাত্রা ।

‘ক্যাটলিয়া ল্যাবিয়াটা’র পরে আসে আরো কত কত ফুল, ঈশ্বরের বাগান থেকে। বিভিন্ন সময়ে ফোটে এরা, বিভিন্ন হাসি, রং, ঘ্রাণ ও মাধুরী এদের। একটি ফুল আর একটি ফুলের মত নয়, যেমন নয় একজন নারী অন্য নারীর মত। একজন মানুষও তো দারুনভাবে ভিন্ন অন্য একজন মানুষের থেকে। এই হল পৃথিবীর অন্তর্নিহিত আইন। সব মানুষ সমান নয়, হতে পারেনা, শুধু অধিকারগুলো সমান মেনে নিলেই সব সহজ হয়ে যায়। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা, চিকিৎসা, প্রজনন -এই সব। কিন্তু ভুলে গেলে চলবেনা যে, “বেঁচে থাকা” ও “কথা বলার” অধিকার সব অধিকারের চেয়ে বড়। মার্কসের তাত্ত্বিক সমাজতন্ত্রে শেষের এই দুটি মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি

থাকলেও, নাস্তিয়ার দেশে বা অন্যত্র পরিবেশিত সমাজতন্ত্রে দৃষ্টি এড়িয়ে গেছে। এমনকি তাবৎ দুনিয়ার বিপ্লবীদের কাছে মানুষের মৌলিক অধিকারের যে তালিকা ছিল, আশ্চর্যজনকভাবে এই দুটি অধিকার ছিলো সবচেয়ে সস্তা ও অবহেলিত। জীবনের দাম ছিলো ন্যূনতম। “শ্রেণিশত্রুর গলা কাটো” বলশেভিক, চৈনিক, নকশাল, সর্বহারা….কার শ্লোগানে এ কথা ছিলোনা? শ্রেনিশত্রু কে? যে ভিন্নমত প্রকাশ করে।

অর্কিডের যে কত জাত-পাত তা কে বলবে?

ক্যাটলিয়া, ফিলানোপসিস, ডেনড্রোবিয়াম, সিম্বিডিয়াম, অনসেডিয়াম, মিল্টোনিয়া, ভান্দা, এমনকি ভানিলা, কত কত নাম। যে এই পৃথিবীর পাখির সংখ্যা জানেনা, সে অর্কিডের সংখ্যা জানবে কি করে?

নাস্তিয়া জানতোই না যে, ওর প্রিয় ‘প্লমবির’ আইসক্রিমের স্বাদ নির্ধারণকারী "ভানিলা" আর কিছু নয়, একটি অর্কিড। এবং এই অর্কিডটি একটু ভিন্ন রকম দেখতে, লতার মত এবং অন্যান্য অর্কিডের তুলনায় এর ফলন অত্যন্ত কষ্টসাধ্য। তাই ভানিলা এত দামি। পুঁজিবাদে দাম নির্ধারিত হয় বিনিয়োগকৃত শ্রম ও প্রফিটের মাধ্যমে, সমাজতন্ত্রে একজন আমলার ইচ্ছা, অনিচ্ছা ও তার স্ত্রী বা প্রেমিকার সাথে সম্পর্কের তিক্ত-মধুরতার দাড়ি-পাল্লায়।

অর্কিডের ছোট মুকুলগুলো আস্তে আস্তে বড় হতে হতে একসময় অদ্ভুত সুন্দর দৃষ্টি ঝলসানো ফুল বেড়িয়ে আসে। প্রথমে একটা, তারপরে আর একটা, তারপরে আরও একটা, এভাবেই চলতে থাকে যতদিন না শেষ হয় পুষ্পায়নের ঋতু। তিনটি বৃত্যাংশ (sepal ) ও তিনটি চ্যাপটা পাপড়ি ( petal) নিয়ে এই ফুল। আসলে ২টি পাপড়ি, তৃতীয়টি বদলে গিয়ে হয় ঠোঁট বা ল্যাবেলাম। নাস্তিয়ার ঠোঁটের মত।
ঠোঁট ভালোবাসার অমৃত পান করার পেয়ালা। সম্ভবত দেবতারা অর্কিডের মধু পান করতেন বলেই তাকে ঠোঁট দেয়া হয়েছে। অথবা কে জানে, হয়তো প্রতিটি অর্কিড এক একটি দেয়াসিনি, যাদের দেবতারা লুকিয়ে রেখেছে তাদের হিংসুটে স্ত্রীদের কাছ থেকে।

অর্কিডের পরাগায়ন হয় পোকা মাকড়ের মাধ্যমে, আবার কখন ও কখনও হয় আত্ম পরাগায়ন।

অর্কিডের একটি অদ্ভুত বৈশিষ্ট্য আছে। যদি সে অসুস্থ হয়ে পড়ে, যদি সে টের পায় সে মরে যাচ্ছে, সে নিজেকে নিঃশেষ করে দেয় নতুন নতুন মুকুলে, সে মরেনা বরং অমরত্ব লাভ করে নতুন প্রজন্মে।

একটা সামান্য ঘটনা ঘটে, ফুল নিয়ে কথা বলতে বলতে তন্ময় অভ্র নিজের অজান্তেই নাস্তিয়ার হাত তুলে নেয় নিজের হাতে। নাস্তিয়ার শরীরে একটা বিদ্যুতের চমক খেলে যায়, কিন্তু সে হাতটা সরিয়ে নেয়না।
হাঁটতে থাকে।

কুমারি বিধবার সাদা শাড়িতে সামান্য একটু নীল দিলে যে অনৈসর্গিক সৌষ্ঠবের সৃষ্টি হয়, সেই

সৌন্দর্য নিয়ে গোল গোল পাপড়ির একটা ফুল সরাসরি তাকিয়ে আছে ওদের দিকে। নাম তার আফ্রোদিতি (P.Aphrodite)। অনিন্দ্য আফ্রোদিতির গলার কাছে, যেখানে দেবতারা চুম্বন করে, রয়েছে এক অপূ্র্ব সবুজাভা, আর তার ঠোঁটে লাল হলুদের বিক্ষেপ! শীত-প্রিয় এই পুষ্পদেবী।

ম্যানিলা ও তাইওয়ানে জন্ম তার।

বাতাসে মৌ মৌ করছে ফুলের ঘ্রাণ, মাতাল করা, মিষ্টি ও লেবুর ঘ্রাণে ভরা, নাস্তিয়া এত ফুলের মধ্য থেকে কোনো মতেই ধরতে পারেনা কোথা থেকে ঘ্রাণটি আসছে। সে অনেকটা সহজাত রিফলেক্সে রুশ ভাষায় ফুলের পরিচর্যাকারি চীনা মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে। মেয়েটি বুঝতে পারেনা নাস্তিয়ার প্রশ্ন । অভ্র ইংরেজীতে বলে দেয়, “কোন ফুলের ঘ্রাণ এটি?”

মেয়েটি একটি প্রস্ফুটিত অর্কিডের টব তুলে এনে ওদের কাছে ধরে। প্রায় ২ ইঞ্চি বড় ফুলগুলো ক্রিম-আপেল -গ্রীন রংয়ের অপূ্র্ব সমন্বয়ের। মেয়েটি বলে, এটি মালয়েশিয়ায় জন্মায়। ল্যাটিন শব্দ Bellus, মানে সুন্দর থেকে ফুলটির নাম ফিলানোপসিস বেল্লিনা (P. Bellina)। পর্যায়ক্রমে ছোট ছোট গ্রুপ পুষ্পায়নে একেকবার ৩-৪ টি করে ফুল ফোটে। ফুলগুলো মোটা ও মোমের মত, দীর্ঘদিন থাকে। পাতাগুলো বেশ বড়, ঘন সবুজ ও চকচকে। সমস্ত ফিলানোপসিস প্রজাতির মধ্যে এই ফুলের সবচাইতে মিষ্টি ঘ্রাণ।

শেষ হতে চায়না এই পুষ্পবিহার কিন্তু শেষ হয়ে আসে। নাস্তিয়া ও অভ্রের যুগ্ম হাতের মাঝখানে আস্তে আস্তে নেমে আসে সন্ধ্যা। অজস্র অর্কিডের রং ঢেলে দেয় আকাশ। নাস্তিয়ার আসমানি চোখ, অভ্রের কালো।চোখগুলো অপূ্র্ব অর্কিড পাপড়ির মত।

নাস্তিয়ার হৃদয় আনন্দের ভরা কলসি। সত্যিই অভ্র তার প্রতিশ্রুতি রেখেছে। এমন কিছু সে দেখিয়েছে যা নাস্তিয়া সারাজীবনেও দেখেনি। অপরাহ্নের যে বেদনা তাকে বিমর্ষিত করেছিল তা উবে গেছে। সিঙ্গাপুরের গরম হাওয়া, অর্কিডের রূপ-রস-গন্ধ এবং তার হৃদয়ের অণু কণাগুলোতে অসংখ্য অদ্ভুত বুদ্বুদ তার সত্তাকে উড়িয়ে নিয়ে যায় কোন এক উপত্যকায় ।

সে অভ্রকে ভালোবেসে ফেলে।


চলবে

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন