বুধবার, ১৭ মার্চ, ২০২১

ডোনাল্ড বার্থেলমি'র গল্প: পিয়ানো বাদক



অনুবাদ: দিলশাদ চৌধুরী

তার জানালার বাইরে পাঁচ বছর বয়সী প্রিসিলা হেস, যাকে কিনা মোটাসোটা আয়াতাকার একটা চিঠির বাক্সের মত দেখাচ্ছিল (লাল সোয়েটার আর নীল রঙের ঢলঢলে কর্ডের প্যান্ট পরার কারণে), তীব্রভাবে এমন কাউকে চারিদিকে খুঁজছিল যে কিনা তার নাকের উপচে পড়া তরল মুছে দিতে পারে। নিশ্চিতভাবে, ওই প্রিসিলারূপী চিঠির বাক্সটির মধ্যে একটা প্রজাপতি আটকে আছে। ওটা কি কোনদিন ছাড়া পাবে? নাকি ভেতরে থাকতে থাকতে ওই চিঠির বাক্সের বৈশিষ্ট্যগুলো তার মধ্যে চলে আসবে? সারাজীবনের জন্য, তার বাবা মা কিংবা তার নামের মতো? নীলরঙা ঝলমলে আকাশের দিনটায় একটা বোকা বোকা সবুজ আঠার দলা মোটা প্রিসিলা হেসের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেলো। সেটা দেখতে দেখতে সে তার স্ত্রীকে স্বাগত জানাতে পেছন ফিরল যে কিনা চার হাত পায়ে হামাগুড়ি দিতে দিতে দরজা দিয়ে ঢুকছিল।

"হ্যা, কি হলো আবার?", সে বলল।
" আমি দেখতে মোটেও ভালো নই", নিতম্বে ভর দিয়ে বসে ও বলল, "আমাদের বাচ্চাগুলোও কুৎসিত"।
" অর্থহীন কথাবার্তা যত", ব্রায়ান তীক্ষ্ণভাবে বলে, " আমাদের বাচ্চারা অপূর্ব। অপূর্ব এবং অত্যন্ত সুন্দর। অন্য লোকের বাচ্চারা কুৎসিত হতে পারে, আমাদের বাচ্চারা নয়। এখন ওঠো আর রান্নাঘরে ফিরে যাও। তোমার তো শুয়োরটাকে সারিয়ে তোলার কথা।"
"শুয়োরটা মরে গেছে, সারাতে পারিনি। সবটুকু দিয়ে চেষ্টা করেছিলাম," ও বলল, " তুমি আর আমাকে ভালোবাসো না। পেনিসিলিনটাও পুরনো ছিল। আমি দেখতে কুৎসিত, সাথে বাচ্চাগুলোও। ওটা তোমাকে বিদায় জানাতে বলেছে।"
" কোনটা?"
" শুয়োরটা। আচ্ছা, আমব্রোস নামে আমাদের কোন সন্তান আছে কি? এই নামের কেউ একজন টেলিগ্রাম পাঠাচ্ছে অনেকদিন ধরে। এখন কয়টা সন্তান আছে আমাদের? চারটা নাকি পাঁচটা? তোমার কি মনে হয়? ওরা বিষমকামী?"
বলতে বলতে ও মুখটাকে চোখা করে ফেলল আর ওর আর্টিকোক কাট দেয়া চুলে হাত বোলাতে লাগল।
" বাড়িটাতে মরিচা ধরে যাচ্ছে। তোমার এমন লোহার বাড়িতে থাকার শখ হলো কেন? আমারই বা কেন মনে হলো যে আমি কানেক্টিকাটে থাকতে চাই? কে জানে।"
" উঠে দাঁড়াও", সে নরমভাবে বলল। "দাঁড়িয়ে পড়ো, প্রিয়তমা। দাঁড়াও আর গান গাইতে শুরু করো। পার্সিফল অপেরা গাও।"
" আমার একটা ট্রায়াম্ফ কোম্পানির গাড়ি চাই", মেঝের দিকে তাকিয়ে ও বলল। "একটা টিআর ৪, স্টামফোর্ডে আমার বাদে সবারই আছে বলা চলে। তুমি যদি আমায় একটা টিআর ৪ দাও, আমি আমাদের কুৎসিত বাচ্চাগুলোকে গাড়িটায় তুলব আর চালিয়ে চলে যাব দূরে কোথাও। ওয়ালফিটে চলে যাব, যা কিছু কুৎসিত সব তোমার জীবন থেকে দূরে নিয়ে যাব।"
" সবুজ রঙের?"
" লাল রঙের। লাল গাড়ি, সাথে লাল চামড়ার সিট", কিছুটা ভয় দেখানোর ভঙ্গিতে বলল ও।

" তোমার না পেইন্টচিপ করার কথা? আমরা তো ইলেকট্রনিক ডাটা প্রসেসিং কিনলাম, আইবিএম কিনলাম।"
" আমি ওয়ালফিটে যেতে চাই। এডমন্ড উইলসনের সাথে কথা বলতে চাই, তাকে আমার লাল টিআর ৪ এ বসিয়ে ঘোরাতে চাই, বাচ্চারা একটু চেপে বসতেই পারবে। আমাদের অনেক কথা বলার আছে, বানি আর আমার।"

" কাঁধের প্যাডগুলো সরাও", ব্রায়ান কোমলভাবে বলল, "শুয়োরের ব্যাপারটা খারাপ হলো।"
" শুয়োরটাকে ভালোবেসেছিলাম।" ও ধীরে ধীরে বলল, "তুমি যখন তোমার লাল রঙের ভলভোতে চড়ে ইউনিভার্সিটি অফ টেক্সাসে আসতে, ভেবেছিলাম তুমি একজন কেউকেটা কেউ হবে। তোমার হাতে হাত রেখেছিলাম, তুমি তাতে আংটি পরিয়ে দিলে, সেই আংটি যেটা আমার মা দিয়েছিল। ভেবেছিলাম তুমি বিখ্যাত হবে, বানির মত।"

সে পেছন ফিরে ওকে প্রশস্ত কাঁধ আর পিঠ দেখালো।
"সবকিছু খুব তাড়াতাড়ি হয়ে যাচ্ছে," সে বলল, "পিয়ানোটা কি বাজাবে?"

"তুমি সবসময়ই আমার পিয়ানোটাকে ভয় পেতে। আমার চারটা না যেন পাঁচটা সন্তান, ওদেরকেও তুমি ভয় পেতে শিখিয়েছো। জিরাফটার গায়ে আগুন লেগে গেছে, কিন্তু মনে হয়না তোমার কিছু আসে যায়," ও বলল।

"এখন কি খাব? শুয়োরটা তো নেই", সে বলল।
" ডিপফ্রিজে কিছু সিলিপুটি রাখা আছে", নিরাসক্ত গলায় ও বলল।
"বৃষ্টি পড়ছে", সে বলল, " বৃষ্টিই হয়ত"।

"যখন তুমি ওহারটন স্কুল অব বিজনেস থেকে স্নাতক শেষ করলে, আমি ভাবলাম 'অবশেষে!'।
ভেবেছিলাম এখন হয়ত আমরা স্টামফোর্ডে গিয়ে কিছু ভালো প্রতিবেশীদের সাথে থাকা শুরু করতে পারি। কিন্তু এরা কেউ তেমন নয়। জিরাফটা আকর্ষণীয়, কিন্তু ওটা বেশিরভাগ সময়ই ঘুমিয়ে কাটায়। চিঠির বাক্সটা বেশ ভালো। কিন্তু চিঠি নিতে আসা লোকটা ঠিক ৩ঃ৩১ মিনিটে বাক্সটা খুললোনা তো। পাঁচ মিনিট দেরী হয়েছে। সরকার আবার মিথ্যে আশ্বাস দিলো", ও হতাশ হয়ে বলল।

কিছুটা অধৈর্য ভঙ্গিতে ব্রায়ান ঘরের আলো জ্বেলে দিলো। বিদ্যুতের হঠাৎ চমকে তার স্ত্রীর ঊর্ধ্বমুখী ছোট্ট মুখটা আলোকিত হয়ে উঠল। বরফের দানার মতো চোখ, সে ভাবল। তামার নৃত্য যেন। আমার নাম অভিধানের পেছন দিকটায়। দ্বিপাক্ষিক সৌভাগ্যের আইন। পিয়ানোই জীবিকা সম্ভবত। এক মৃদু যন্ত্রণা পুরো পশ্চিমা বিশ্বে দৌঁড়ে বেড়াচ্ছে। কোরিওলনাস।

" হা ঈশ্বর! আমার হাঁটুটা দেখো", ও মেঝে বসেই বলল।
ব্রায়ান তাকালো, ওর হাঁটুটা লালচে হয়ে আছে।
" এটা অনুভূতিহীন পুরো। অসাড়, অসাড়, অসাড়। আমি ওষুধের আলমারি বন্ধ করে রেখেছি। কিসের জন্য? জানিনা। তোমার আমাকে আরও কিছু টাকা দিতেই হবে। বেন রক্তাক্ত। বেসি এসএস ম্যান হতে চায়, ও 'দ্যা রাইজ এন্ড ফল' পড়ছে। ওকে কিছুটা হিমলারের মতই দেখতে। ওটাই তো ওর নাম? তাইনা? বেসি?", ও বলতে থাকল।
"হ্যা, বেসি"।
"আরেকটা যে আছে, ওটার নাম কি? ওইযে ব্লন্ড চুলের?"
"বিলি। তোমার বাবার নামে নাম। তোমার বাবা।"
" তোমার আমাকে একটা এয়ার হ্যামার কিনে দিতেই হবে। বাচ্চাদের দাঁত পরিষ্কার করব ওটা দিয়ে। কি যেন নাম রোগটার? ওদের সবগুলোর ওটা হবে যদি তুমি আমায় এয়ার হ্যামার না কিনে দাও।"
"আর একটা কমপ্রেসর। আর একটা পাইনটপ স্মিথ রেকর্ড, মনে আছে", ব্রায়ান বলল।

তার স্ত্রী চিৎ হয়ে শুয়ে পড়ল। মোজাইকে ঘষা খেয়ে শোল্ডার প্যাড ঝঙ্কার তুলল। ওর নম্বর, ১৭, বুকে বড় করে লেখা ছিলো। ওর চোখ শক্ত করে বোজা ছিলো।
" অল্টম্যানে মূল্যছাড় চলছে। আমার বোধহয় যাওয়া উচিত", ও বলল।
" শোনো, তুমি আঙুরের বাগানে যাও। আমি চাকা লাগিয়ে পিয়ানোটাকে টেনে ওখানে নিয়ে যাচ্ছি। তুমি খুব বেশি পলেস্তারা খসিয়ে ফেলছ।"
" তুমি পিয়ানোটা ছোঁবে না, মরে গেলেও না ", ও বলল।
"তুমি সত্যি ভাবো আমি ওটাকে ভয় পাই?", সে বলল।
" বললাম তো মরে গেলেও পারবেনা, মিথ্যুক", ও আবার বলল।
"ঠিক আছে", ব্রায়ান আস্তে করে বলল। একটা হেস্তনেস্তের ইচ্ছায় সে বড় বড় পা ফেলে পিয়ানোটার কাছে গিয়ে কালো বার্নিশের অংশটা শক্ত হাতে ধরল। তারপর কক্ষের বাইরের দিকে পিয়ানোটাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল, আর তখনই, তার সামান্য দ্বিধার সুযোগে পেয়ানো তাকে আঘাত করলো এবং সে মৃত্যুর কোলে ঢোলে পড়লো।




লেখক পরিচিতি:
ডোনাল্ড বার্থেলমি (১৯৩১-১৯৮৯) একজন আমেরিকান ছোটগল্প লেখক এবং ঔপন্যাসিক যে কিনা উত্তরাধুনিক ধারায় লেখালেখির ক্ষেত্রে জনপ্রিয়। 'পিয়ানো বাদক' গল্পটি তার "কাম ব্যাক ডঃ ক্যালিগরি (১৯৬৪) বইটি থেকে সংগৃহিত এবং অনুদিত। গল্পটি গতানুগতিক ধারার ছোটগল্পের চেয়ে অনেকটাই আলাদা। বাক্যগুলো অনেকটাই বিভ্রান্তিকর যেটা ডোনাল্ড বার্থেলমির লেখার অন্যতম পরিচায়ক হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সম্পূর্ণ গল্পটি পড়ার পর নিজস্ব চিন্তার অনেকগুলো জানালা খুলে যায়। তাই পাঠকের কাছে নতুন স্বাদের গল্পটি তুলে ধরার এই প্রয়াস।



অনুবাদক পরিচিতি:
দিলশাদ চৌধুরী
অনুবাদক। প্রাবন্ধিক।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠরত।
গল্পকার। অনুবাদক। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন