মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

রমেশচন্দ্র সেনের গল্প: ডোমের চিতা


 


ধূ ধূ করে প্রকাণ্ড বিল। চারিদিকে জল আর জল। জলের বুকে কচুরিপানার গাদার মধ্যে মাঝে মাঝে রক্তশাপলা ও রক্ত-কমল। নানা রকম ঘাসের বুকে বিচিত্র রঙের ছোট ছোট ফুল ফুটিয়াছে। কোনোটা নীল কোনোটা বেগুনী, কোনোটা বা ধবধবে সাদা। উপরে পাখির দল উড়িতেছে – আকাশের গভীর নীলিমার বুকে একটা সুর জাগাইয়া। সমুদ্রের মধ্যে লাইটহাউসের মতো মাঝে মাঝে দুই একটা বাড়ি দেখা যায়।


এই জলরাশির মাঝখানটায় শুষ্ক প্রাণহীন মাদারের ভিটা যেন প্রকৃতির একটা অনিয়ম! ভিটার উপর পাতাহীন মৃতপ্রায় গাছগুলি বিকলাঙ্গ কুষ্ঠীর মতো দাঁড়াইয়া আছে। এখানে ওখানে ছড়ান রহিয়াছে কয়লা, অর্ধদদ্ধ অস্থি ও মানুষের মাথার খুলি।

এই ভিটায় দুটি ডোম থাকে হারু ও বদন। দুজনেই প্রৌঢ়, স্বাস্থ্যবান, কালো মিশমিশে তাদের গায়ের রং। হারুর মাথায় ছিল একটা বাবরি। বদনের চুল কদমফুলের মতো চারদিকে সমানভাবে ছাঁটা।

মাদারের ভিটা এই অঞ্চলের শ্মশান। দুধারে দশমাইল দূর হইতেও মড়া পোড়াইতে সকলে এখানে আসে। তাই হারু ও বদন সবারই পরিচিত। কোথায় তাদের বাড়ি ঘর কোথা হইতে তারা আসিয়াছে কেহ জানে না; যমদূতের মতো আকাশ হইতে তারা এই শ্মশানের বুকে আবিভূর্ত হইয়াছিল মড়ার–কাঠ জোগাইবার জন্যে। আজ বিশ বৎসর তাদের এই অধিকারে কেহ হস্তক্ষেপ করে নাই। তারাও বিলের মধ্যে পোড়ো ভিটা হইতে গাছ কাটিয়া আনিয়া মৃতদের সৎকারের ব্যবস্থা করিয়া দিয়াছে।

কাঠ বেচিয়া, মাছ ধরিয়া, মৃতের উদ্দেশে প্রদত্ত চাল, ডাল, ফল-ফলারি সিদ্ধ করিয়া তারা উদরান্নের সংস্থান করে। প্রায়ই উনান ধরাতে হয় না। চিতার উপর হাঁড়ি চড়াইয়া দেয় বা রুটি সেঁকিয়া লয়। তপ্ত অঙ্গার হাতে তুলিয়া কলিকায় তামাক সাজে।

মাদারের ভিটায় একটি কুঁড়ে বাঁধিয়া তারা থাকে। সমাজ সংসার সবই তাদের পরস্পরকে লইয়া। বাহিরের জগৎ এই ডোম দুটির কাছে অর্থহীন। জীবিত মানুষের কন্ঠস্বর অপেক্ষা মৃতদেহই যেন প্রাণবন্ত। তারাই তাদের জীবিকা। পরস্পরের সঙ্গেও তারা বড় একটা কথা বলে না, হাসে আরও কম। কোন্ মৃতদেহ কিরূপে পুড়িল, কোনটার হাড় কতখানি শক্ত এইই তাদের আলোচ্য বিষয়। মৃতদেহের অস্বাভাবিকতা মধ্যে মধ্যে তাদের হাসির উদ্রেক করে বটে কিন্তু সে হাসি হিংস্র জানোয়ারের ক্রুদ্ধ গর্জনের মত বিকট। তাই এই অঞ্চলে তাদের নামে নানা বিভৎস গল্প চলিয়া আসিতেছে।

হারু ও বদনের দুর্ভাগ্য ক্রমে আজ দুদিন পর্যন্ত কোনও মড়া আসে নাই। হাঁড়িতেও চাল ছিল না। চাল কিনিতে যাইতে হইবে প্রায় এক ক্রোশ দূরে। সমস্ত দিনটা মুষলধারে বৃষ্টি পড়িতেছিল। তারা চাল কিনিতে যায় নাই। শুকনা ছোলা চিবাইয়া দিনটা কাটাইয়া দিয়াছে। সন্ধ্যার সময় বদন বলিল, যে কটা পয়সা আছে দু’সেরের বেশি চাল হবে না। তাতে একবেলা চলবে। তারপর ? হারু বলিল, জুটে যাবে’খন।

বদন শূকরের মতো অব্যক্ত শব্দ করিয়া বলিল, ছাই, এ রাজ্যে দুদিনের মধ্যে এক বেটাও মরল না। মানুষগুলো দিন দিন যেন অমর হয়ে উঠেছে। সঙ্গে সঙ্গে মেঘ গর্জিয়া উঠিল, কড়…কড়াৎ…কড়। হারু বলিল, “কাল সকালে যা হয় করব। আজ এখন শোয়া যাক”। ঘুম তাদের হইল না। কিন্তু বিধাতা প্রার্থনা শুনিলেন। মধ্য রাত্রে একজন যুবক আসিয়া ডাকিল, “হারু, বদন”। কোলে তার একটি মৃত শিশু। নিজের স্নেহ পুত্তলি পুত্রকে সে একাই পোড়াতে আসিয়াছিল। লোকটি জাতিতে পদ্মরাজ। পাঁচ মাইলের মধ্যে আর পদ্মরাজ নাই। কাছে, জেলে, কোচ, ভুঁইমালী আছে বটে কিন্তু তারা পদ্মরাজের মরা ছুইবে না। তাই সে একাই নৌকো বাহিয়া আসিয়াছিল পুত্রের প্রতি শেষ কর্তব্য সম্পাদন করিতে।

তার ডাক শুনিয়া বদন বলিল, এত রাত্তিরে মড়া পুড়াতে বেশি দাম লাগিবে। যুবকের কাছে একটি মাত্র টাকা ছিল। সে বলিল, বড়ো গরীব আমি, এই একটি টাকা আছে।

বদন বলিল, এক টাকায় আর মড়া পোড়ে না।

যুবকটি অনেক কাকুতি মিনতি করিয়াও তাকে রাজী করাইতে পারিল না। বদন বলিল, একটি মড়া পোড়াবার মতো কাঠ আছে বটে। কিন্তু এক টাকায় তোমায় সেই কাঠ বেচলে তারপর যদি কেউ আসে, তখন যে ভিটের গাছ কাটতে হবে।

নিরুপায়ে দীর্ঘ-নিঃশ্বাস ত্যাগ করিয়া যুবকটি বলিল,তবে ছেলেটাকে জলেই ফেলে দিতে হবে দেখছি। শকুন কাছিমে ঠুকরে খাবে। এমন অদৃষ্ট করেছিলাম বলিয়াই সে হাউ হাউ করিয়া কাঁদিয়া ফেলিল। হারু বদন কে বলিল, দে ভাই, অমন করে কাঁদছে।

বদন তাকে কষিয়া ধমক দিল, বলিল, আরে না মরলে আমাদের কাছে কেউ আসে না। মড়ার দুখ্‌খু দেখে গললে চলবে কেন? হারু আরও দু’একবার বলিল। বদন কিছুতেই সম্মত হইল না। কিন্তু যখন দেখিল যে যুবকটি সত্যই শব লইয়া যাইতেছে তখন ভাবিল, লোকটিকে হাত ছাড়া করা উচিত নয়। এক টাকায় যাহাই হোক অন্তত আর কয়েক বেলা চালের সংস্থান হইবে। সে শেষটায় বলিল, আচ্ছা-কাঠ দিচ্ছি, দুদিন পরে দামটা দিয়ে যেও কিন্তু।

যুবকটি বলিল,- দুদিনের মধ্যে পারব না। সাতদিন সময় দাও। ছেলের ঋণ আমি রাখব না।

বদন বলিল,-আচ্ছা, পাঁচদিনের মধ্যে দিয়ে যেও।

যুবকটি পুত্রের দেহ ছুঁইয়া বসিয়া রহিল। তখন বৃষ্টি পড়িতেছে। চিতা যে জ্বলিবে না। পরদিন সকালে, শিশুটির চিতা তখন নিবিয়া আসিতেছে। বদন হারু কে একটা টাকা ও কয়েক আনা পয়সা দিয়া বলিল,-“ জলদি গিয়ে চাল নিয়ে আয়। চিতা নিবে যাওয়ার আগে ফিরবি। তা না হলে আবার জ্বালানি কাঠ লাগবে”। মৃতের পিতা ইহা শুনিয়া বদনের দিকে চাহিয়া রহিল।

চিতা নিবিয়া গেল, হারু আর ফিরিল না। বেলা বাড়িবার সঙ্গে সঙ্গে বদনের ক্ষুধা বাড়িতে লাগিল। সে হারুর উদ্দেশে গালি পাড়িতে আরম্ভ করিল।

চারিদিকে অসীম জলরাশির মধ্যে বদন একা বসিয়া আছে। ডিঙিখানা হারু লইয়া গিয়াছিল। সে না ফিরিলে বদনের এক পা নড়িবার সামর্থ্য নাই। আগের দিনে সে উপবাসী ছিল। তার আগেও কদিন পেট ভরিয়া খাইতে পায় নাই। হারু না ফিরিলে আরও কতকাল যে না খাইয়া থাকতে হইবে, একমাত্র বিধাতাই জানেন। সকাল হইতে বৃষ্টি পড়িতেছে। বাতাসের সোঁ সোঁ শব্দ, দু একটা কাকের ক্ক-ক্ক ভিন্ন আর কিছু শোনা যায় না। পিঞ্জরাবদ্ধ ক্ষুধিত হিংস্র পশুর মতো বদন মধ্যে মধ্যে নিস্ফলা গর্জন করিতে থাকে।

দুপুরের পর বৃষ্টি একটু কমিলে সে একটা ন্যাড়া গাছের উপর উঠিয়া চারিদিকে চাহিল। একটি জেলে বিলের মধ্যে নৌকোয় বসিয়া মাছ ধরিতেছে। আরও দূরে দেখা যায় কয়েকখানা বেদের নৌকো। বদন এদিক ওদিক চাহিয়া তাদের ডিঙিখানা দেখতে পায় না। তখন সে গলা ছাড়িয়া ডাকে, হা-রু।

সেই স্বরে ভীত হইয়া পাশের গাছ হইতে একটি কাক উড়িয়া যায়, ছানাগুলি চীৎকার করিতে থাকে, চিঁ-চিঁ।

বৈকালের দিকে বদন খুব দর্বল বোধ করিল। প্রত্যহ দু’সের ভাত খাওয়া তার অভ্যাস। দুদিন পেটে কিছু না পড়ায় সে একেবারেই ভাঙিয়া পড়িল। হারুর উপর তার রাগও কমিয়া গেল। ভয় হল হারুর কিছু হইয়াছে। কিন্তু নিজে সে নিরুপায়, খোঁজ করিবার সাধ্য তার নাই।

বৈকালে ভিটার পূর্বপ্রান্তে যাইয়া সে ডাকিল, হা-রু-উ। বাতাসের বুকে সে শব্দ মিশিয়া গেল। বদন তারপর গেল দক্ষিণ দিকে, সেখানে গিয়ে কানে হাত দিয়ে আরও উঁচু গলায় ডাকিল হা-রু-উ। এবার জবাব আসিল। দূর হইতে একটা শকূনি চীৎকার করিয়া উঠিল কর্‌-র-র-র-। বদন তার উদ্দেশে কুৎসিত গালি পাড়িল।

পরদিন প্রাতে একদল ভদ্রলোক আসিলেন একটি স্ত্রীলোকের শব লইয়া। বদনের তখন একখানাও কাঠ নাই। সে বলিল, তোমার নৌকাখানা একবার দাও তো কাঠ আনতে হবে।

সে তাঁদের কাছে হারুর কথা জিজ্ঞাসা করিল। তাঁহারা কোন জবাব দিতে পারিলেন না।

ঘন্টাখানেক পরে শবযাত্রীরা দেখিলেন, তাঁদের নৌকার সঙ্গে একটি ডিঙি বাঁধিয়া বদন ফিরিতেছে। কাঠ সে আনে নাই কিন্তু সে ফিরিয়াছে ডিঙির উপর একটি শব লইয়া।

বদন হারুর নীল বর্ণ ফুলা মৃতদেহটি ভিটার উপর তুলিল। একটি ভদ্রলোক জিজ্ঞাসা করিলেন, কোথায় পেলে?

বদন বলিল, পাতিয়ার বিলে। সাপে ওর হাত কামড়ে দিয়েছে। ডিঙির মধ্যে সের দশেক লাল মোটা চাল এবং কয়েকটা কই মাছ ছিল। কই মাছগুলি হারুর দেহের দুচার জায়গা খাইয়া ফেলিয়াছে, পাখিতে ঠোকরাইয়া শবটিকে ক্ষত বিক্ষত করিয়াছে।

বদন চাল ও মাছগুলি তুলিয়া কুড়াল লইয়া অগত্যা ভিটার একটি মরা গাছ কাটিয়া ফেলিল। কাটিতে সময় বেশী লাগিল না। ভদ্রলোকের প্রশ্নে সে হাঁ হাঁ করিয়া সংক্ষেপে জবাব দিল। স্ত্রীলোকটির শব সৎকার করিয়া ভদ্রলোকেরা চলে গেলেন। যাবার সময় একজন বলিলেন, থানায় খবর দাও, বদন বলিল, কাকে চিলেই যথেষ্ট ঠুকরেছে। আর দরকার কি?

তারা চলিয়া গেলে বদন ভালো করিয়া একটা চিতা সাজাইল। তারপর যত্নের সহিত হারুর শবটি চিতার উপর তুলিয়া দিল। চিতার ধোঁয়া সাপের মতো কুণ্ডলী পাকাইয়া আকাশে উঠিতে লাগিল। বর্ণে তার একটি নীল আভা। দীর্ঘ বিশ বৎসর ধরিয়া বদন মানুষ পোড়াইয়া আসিয়াছে, কিন্তু এ ধোঁয়া জীবনে আর কখনও দেখে নাই। এই ধোঁয়ার দৃষ্টি যেন ঝাপসা হইয়া আসে। সেদিন আকাশ ছিল পরিস্কার, গ্রীষ্মের প্রখর সূর্য আগুনের হল্কা ঢালিয়া দিতেছিল। হারুর চিতার ধোঁয়া সূর্যের জ্যোতিকে স্লান করিল। তারপর চিতার বুক হইতে উঠিতে লাগিল লোলজিহ্ব অগ্নিশিখা। যেন কতগুলি লাল সাপের ফণা; ক্রুদ্ধ তার গর্জন, অফুরন্ত তার হিংসাবৃত্ত।

চিতার দিকে চাহিয়া চাহিয়া বদন আপনা আপনি বলিয়া উঠিল, দূর ছাই, কিছু ভাল লাগে না। আগুনটা আবার নিবে যাবে। এর উপরই চাল চড়িয়ে দি।

হারুর চিতায় বদনের চাল চড়িল। বদন একদৃষ্টে হাঁড়ির দিকে চাহিয়া রইল। হাঁড়ির ভিতর চালের সঙ্গেই গোটা দুই মাছ সিদ্ধ হইতেছিল। ফুটন্ত ভাতের টগবগানি, চিতার চড়্‌,-চড়াৎ চড় শব্দ – তাছাড়া সবই নিস্তব্ধ।

ঊর্ধ্বে অনন্ত নীল আকাশ, – চারধারে সীমাহীন জলরাশি – তার মধ্যে বাতাসের তালে তালে ঘাসের পাগল নৃত্য, উচ্ছল জলের সাবলীল ভঙ্গী।

দূরে আকাশের বুকে বকের পাতি উড়িতেছে। বৈকালী সূর্য চিতার উপর ফাগের গোলা ঢালিয়া দিয়াছে। চিতার আগুন ও সূর্যের আলোয় মাদারের ভিটা একটা লাল আভা ধারণ করিল। চিতার দিকে চাহিয়া বদনের চোখ দিয়া জল গড়াইয়া পড়িতে লাগিল।






1 টি মন্তব্য: