মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

শ্যামলী আচার্য'এর গল্প : দাহ




খুব সকালেই আজকাল ঘুম ভেঙে যায়।

জানি, এখনও ছ’টা বাজেনি। এখানে ঘড়ি নেই। এই ঘরে কোনও জানালা নেই। একটা ঘুলঘুলি দিয়ে আলো আসে খুব সামান্য। একটু পরেই হাঁক পড়বে ‘গিনতিইইইই’-- সেপাই জমাদারের হাঁক। তার মানে ঠিক ছ’টা বাজে।

দফায় দফায় সারাদিন ধরে এমন গোনাগুনি চলে। সকাল ছ’টা আর সন্ধে ছ’টায় তো গুনতি হবেই... এই দুটো সময় মুখস্থ। বাকি সময়গুলো ঠিক জানি না। আমার এখনও মুখস্থ হয়নি।

গতকাল রাতে মায়ের কথা খুব মনে পড়ছিল। ভাইয়ের কথাও। মনে হচ্ছিল, মা’কে আমি তেমন করে পাত্তা দিইনি কখনও। অথচ আমার মা কিন্তু একদম বন্ধুর মতো। ভীষণ কাছের, আর দারুণ মজার।

অন্তরাকে যেদিন আমাদের বাড়িতে প্রথম নিয়ে এসেছিলাম, মায়ের মুখটা একদম ঝলমল করে উঠেছিল।

- ও তোমার বন্ধু?

- হ্যাঁ মা। ও আমার সঙ্গে পড়ে।

- ও। বাঃ। এসো এসো ভেতরে এসো। নাম কী তোমার?

আমাদের ছোট্ট বাড়ি। স্যাঁতসেঁতে নোনা ধরা দেওয়াল। রঙ করা হয় না বহুদিন। মাথার ওপরে অ্যাসবেস্টসের ছাদ। গরমের দুপুরে আমাদের বাড়িটা ফার্নেসের মতো তেতে থাকে। আমি যদিও সকালেই খেয়েদেয়ে কলেজে চলে যাই, সেখান থেকে টিউশনি কিংবা বন্ধুদের বাড়িতে গ্রুপ স্টাডি। ফিরতে ফিরতে অনেক রাত। মা খাবার সাজিয়ে নিয়ে আমার জন্য জেগে বসে থাকে। ভাই দিনের বেলা স্কুলে যায়, ফিরে এসে টিউশন ক্লাসে পড়তে যায়। ওরও ফিরতে সন্ধে হয়। মা’ও দুপুরে কাজে বেরোয়। কিন্তু বাবা বাড়িতে একা। বাবার গরমে সারাদিন খুব কষ্ট হয়। কাঠের চেয়ারে বসে বসে বাবা টিভি দেখে। মাঝে মাঝে ভিজে গামছা দিয়ে মুখ মোছে। মাথার ওপরের ফ্যান দিয়ে গরম হলকার মতো হাওয়া। চামড়া তেতেপুড়ে যায়।

বাবার খুব কষ্ট হচ্ছে।

মা পরশু আমার কাছে এসেছিল একবার। এসে শুধু বলল, বাবা কিচ্ছু খাচ্ছে না। বাবা খুব কাঁদছে।

অন্তরা যেদিন আমাদের বাড়িতে প্রথমদিন এসেছিল, অন্তরা সবকিছু জেনেই এসেছিল। অন্তরা জানত, আমার বাবা ছিলেন ইউনিভার্সিটির গোল্ড মেডালিস্ট। আমার বাবা ছিলেন এক বিশাল বহুজাতিক কোম্পানির চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট। আমার বাবা এখন প্রায় জড় পদার্থ। শুধু ওঠা-বসা-খাওয়া-স্নানটুকু করেন কোনওমতে। না দিলে খেতে পারেন না। স্নানে গেলে বাথরুমের দরজা বন্ধ করা বারণ। সব ওষুধ মনে করে তার হাতের কাছে এগিয়ে দিতে হয়। দিনে ষোলোটা ওষুধ। ট্যাবলেট-ক্যাপসুল সব মিলিয়ে। আর নিয়ম-বাঁধা জীবন। শুধু বেঁচে থাকার জন্য।

অন্তরা বলেছিল, আমাকে একদিন তোমাদের বাড়িতে নিয়ে চল। প্লিজ।

- তুমি তো বড়লোক অন্তরা। কেমন লাগবে তোমার? আমরা সাধারণ। খুবই সাধারণ।

- ডোন্ট টক ননসেন্স। তুমি জানো, এগুলো কোনও ইস্যু নয়।

অন্তরার অভ্যেস ছিল কথা বলতে বলতে বাঁহাত দিয়ে আমার গালের পাশে আঙুল বুলিয়ে দেওয়া। ওর বাঁহাতের তর্জনী আমার ডান গাল ছুঁয়ে বলল, কবে নিয়ে যাবে?

আমার বাড়ি ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাস থেকে খুব দূরে নয়। বললাম, আজই চলো।

মা অন্যদিনের মতো আলুথালু হয়ে বসে ছিল না। মা’কে ফোন করে বলেছিলাম, আমার এক বন্ধুকে বাড়িতে নিয়ে আসছি মা, আমার সঙ্গেই পড়ে। ওরা কিন্তু খুব বড়লোক।

মা একটা ভাল শাড়ি পরেছিল। চা করে রেখেছিল। ভাইকে দিয়ে চিকেন প্যাটিস আনিয়েছিল। আর রামকৃষ্ণ সুইটসের দামি মিষ্টি।

অন্তরা এসে জুতো খুলেই জড়িয়ে ধরল আমার মা’কে। আমার মা প্রথমে একটু থতমত খেল যেন। তারপর মা’ও ওকে জড়িয়ে ধরল।

- আন্টি, তোমাকে দেখে আমার রূপকথার গল্পে পড়া মায়ের মতো লাগছে! বিশ্বাস করো।

আমি জানতাম আমার সাদাসিধে মা ভেসে যাবে এইসব কথায়। এমনিতেই আমার মায়ের কাছে মেয়েরা বরাবরই খুব প্রিয়। নিজেও চেয়েছিল তার একটা মেয়ে হোক, অথচ হল পর পর দুটো ছেলে। খুব আফশোস মায়ের। আমি জানি। তার আর মেয়ের মা হওয়া হল না। বন্ধুদের মেয়েকে, আমার বা ভাইয়ের ক্লাসের মেয়েদের মা সারাক্ষণ আদর করে, আহ্লাদ দেয়। আমি আর ভাই মা’কে নিয়ে খুব হাসাহাসি করি।

ঠিক দেড়মাস আগে অন্তরা থানায় বসে ওর হাই হিল পরা পা দুটো সটান তুলে দিয়েছিল টেবিলের ওপরে। আমার মায়ের মুখের সামনেই। গলগল করে গাঁজা-ভর্তি সিগারেটের ধোঁওয়া বেরোচ্ছিল ওর মুখ থেকে। কে বলেছে, থানায় সিগারেট খাওয়া যায় না? রাত বাড়লে থানায় সব করা যায়। থানার অফিসাররা খুব দয়ালু হন। তাঁরা ব্যক্তিস্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করেন না।

- আজ তোর মুড অফ?

বিট্টু। ও আমার পাশে থাকে। সারাদিন। এখানে বিট্টুর মতো অনেক ছেলে রয়েছে। মোট উনিশ জন। সবার ট্রায়াল চলছে। বিট্টু এখানে আমার প্রথম বন্ধু। হয়ত একমাত্রও।

প্রথম আলাপেই বিট্টু বুঝেছিল, আমি ভুল করে চলে এসেছি এখানে।

- কীসে ফেঁসেছিস ভাই?

- ফাঁসিনি। ফাঁসিয়েছে।

- কে বে? মেয়েছেলে? না পার্টির লাফড়া?

এই কথাটার উত্তর হয় না কোনও। উকিল বলেছেন, কম কথা বলবে। যতটুকু না বললে নয়, ঠিক ততটুকু। তাই প্রথমদিন একদম চুপ করে ছিলাম।

- আচ্ছা বল, নাম কী তোর?

- আনন্দ।

- আনন্দ? হে হে হে ... তোর নাম আনন্দ? বেড়ে নাম মাইরি। তোকে এই দুঃখ কে দিল বে?

- দুঃখ? দুঃখ কোথায়? তোমার মনে হয় এখানে এসে আমার কোনও দুঃখ হচ্ছে?

বিট্টু আমার কথায় ভুরু কুঁচকে তাকায়।

- তোকে দেখে তো মনে হচ্ছে ভদ্রঘরের মাল। এইখানে এসে পড়লি কী করে?

- জানি না।

- যাসসালা! জানি না কী রে? হে হে হে ...। সিগারেট খাবি?

- এখানে? সিগারেট খাওয়া যায় বুঝি?

- হে হে হে। শোনো কথা! আ বে সব খাওয়া যায়। তুই কি খাবি শুধু বল একবার। তোকে মাইরি আবার হেব্বি লেগেছে।

- কেন?

- কেন? কেন জিগ্যেস করলে তো চাপ... ওই ধর তোর মুখের মধ্যে বেশ একটা ওই আছে। বেশ একটা ভগবান-টাইপ ব্যাপার। হিন্দি বইতে যেমন দেখায়...

আমি বিট্টুর কথা শুনে হাসি। ভগবান। ভগবানের মতো। ভগবানকে কেমন দেখতে হয়? ক্যালেন্ডারের ছবির মতো? মাথার পেছনে জ্যোতি বেরোয়, টকটকে ফর্সা রঙ, স্মিত হাসি, হাত তুলে বরাভয় দেন...। আমাকে সেই রকম দেখতে?

অন্তরা বলত, আমার একটা সেক্সি লুক আছে। কথাটা শুনে একটু ঘিনঘিনে লাগত। কিন্তু ও আমার ঠোঁট কামড়ে ধরলে আমার খারাপ লাগত না। আমি পালটা সাড়া দিতে পারতাম।

আমি গড়পড়তা ছেলেদের তুলনায় অনেকটা লম্বা। ফর্সা রঙ। গোলাপি ঠোঁট। মা ছোটবেলা বলত, আমাকে দেখতে রাজপুত্তুরের মতো। বড় হলেই আমাকে একটা পক্ষীরাজ ঘোড়া কিনে দেবে। হুট করে কবে যেন বড় হয়ে গেলাম। মনেই নেই। বাবার পর পর দুবার সেরিব্রাল স্ট্রোক হল, দিদা, দাদু, ঠাকুমা, বড়োপিসি সব্বাই হুড়মুড় করে চলে গেল একের পর এক। কীসের যে এত তাড়া ছিল কে জানে! তখন কত আর বয়স আমার! চোদ্দ কি পনেরো। হয় নার্সিংহোমে যাচ্ছি, বাবা অসুস্থ। নয় শ্মশানে। কেউ চলে গেছেন, আমাকেই যেতে হবে সৎকার করতে। বাড়ির ছেলে বলতে একা আমি। ভাই তখন কত ছোট। ভাই ছিল প্রিম্যাচিওর বেবি। ভীষণ ভুগত। রিউম্যাটয়েড ফিভার। স্কুল যেতে পারত না। পরীক্ষা দিতে পারত না। কথা বলার সময় কথা আটকাত ওর, সবাই তোতলা বলে খ্যাপাত। ও বাড়ি এসে কাঁদত। একা একাই কাঁদত। আমার রাগ হত। খুব রাগ হত। সব না-পাওয়াগুলো শুধু আমার জন্য কেন? আমাদের একটা ভাল বাড়ি নেই। আমার সাইকেলটা ভাঙা, লড়ঝড়ে। আমাদের বেড়াতে যাওয়া মানে শুধু মামাবাড়ি আর মাসিবাড়ি। আর কোত্থাও না। আমার কোনও আনন্দের ছোটবেলা নেই। অথচ, মা আমার নাম রেখেছে আনন্দ। কী হাস্যকর!

অন্তরাকে প্রথমদিনই আমার মা বলেছিল, জানো তো, ওদের দুজনের কোনও ছেলেবেলা নেই। ওরা দুই ভাই বাড়ির মধ্যে শুধু অভাব দেখেছে, অসুস্থতা দেখেছে আর অপ্রাপ্তি দেখেছে।

অন্তরা বলেছিল, আমারও কোনও ছেলেবেলা নেই আন্টি। আমি হয়ত টাকার অভাব দেখিনি, কিন্তু শান্তির অভাব দেখেছি। আমি শরীরের অসুস্থতা দেখিনি, মনের রোগ দেখেছি। ব্যাড এলিমেন্ট সব। আমার বাড়িতে বাবা মা সকলেই আছেন। তবু জানো, আমি পেয়িং গেস্ট হয়ে থাকি। নিজের মতো থাকি। আর, তোমাকে দেখে কেবল মনে হয়, তুমি যদি আমার মা হতে!

মনের রোগ কত রকম হয় আমি জানি না। আমাদের বাড়িতে অন্তত কারও মনের রোগ ছিল বলে শুনিনি। শহরের এই সবচেয়ে বড় নামী কলেজে পরীক্ষা দিয়ে যেদিন ভর্তি হয়েছিলাম, মা’র চোখে আমি জল দেখেছি। আমার সদা সর্বদা হইচই ফূর্তি করে বেড়ানো মা কেবল বলেছিল, এবার তো তোর পছন্দের সাবজেক্ট। ভাল রেজাল্ট করতে হবে কিন্তু। নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। আমরা তো সবাই তোর জন্য...

সেই থেকেই আমার ভাল নম্বরের পেছনে দৌড়। আর সেদিন থেকেই অন্তরা নিজেই এগিয়ে এসে হাত ধরে আমার। আগলে রাখতে শুরু করে। প্রতি মুহূর্তে গাইড করে। এইদিকে যেও না, ওইদিকে তাকিও না, ওর সঙ্গে মিশো না। আমি সেই প্রথম মেয়েদের শরীর চিনতে শুরু করি। একের পর এক অজানা পথের সন্ধান দিত অন্তরা। আনন্দ যে এত রকম হয়, আমি আগে জানতাম না।

কিন্তু সমস্যাও শুরু হল। অন্তরা আমাদের বাড়িতে আসে নিয়মিত। আমার ছোট্ট একচিলতে ঘরে আড্ডা দিই আমরা। মা কখনও থাকে, কখনও থাকে না। বাবা তো না-থাকার মতোই। কিন্তু অন্তরা বড্ড কর্তৃত্ব ফলাত। ওর কথা না শুনলেই কান্নাকাটি, হুলুস্থুল কান্ড।

- আমার চার নম্বর বয়ফ্রেন্ড কী করেছিল জান? সিগারেট দিয়ে ছ্যাঁকা দিয়েছিল আমায়।

বলেই অন্তরা মুহূর্তে ব্রায়ের স্ট্র্যাপ নামিয়ে দেখাল বুকের ওপর বেশ বড় একটা ছোপ। ফোসকার দাগ। অন্তত ও তাই বলেছিল। ওর চোখে দুঃখ আর যৌনতা এত ভালো মিশে যেত, ওইরকম বহু গোপন ক্ষতচিহ্নে জিভ ছোঁয়াতে আমাকে একটুও ভাবতে হত না।

এইরকম অনেক।

ওর শৈশব থেকেই নাকি শুধু যৌন নির্যাতনের অভিজ্ঞতা। দূরসম্পর্কের কাকা, প্রাইভেট টিউটর, খুড়তুতো দাদা, স্কুলের ক্লাসমেট... অনেকেই ওকে ব্যবহার করেছে, ঠকিয়েছে আর সকলের সঙ্গেই ওর কোনও না কোনওভাবে শারীরিক সম্পর্ক তৈরি হয়েছে।

একদিন কাঁদতে কাঁদতে বলল,

- আনন্দ, তুমি কি আমায় ঘেন্না করো?

- কোনও প্রশ্নই ওঠে না। তুমি তো নিজে থেকে সমস্যায় পড়োনি। বরং এইসব লোকগুলো তোমার সঙ্গে অসভ্যতা করেছে। তুমি তার দায় নাও কেন?

- তোমার কি মনে হয় আমি খুব খারাপ মেয়ে?

- খারাপ মেয়েরা কখনো নিজেদের অতীত স্বীকার করে না। তুমি মোটেই খারাপ নও। খারাপ ছিল তোমার চারপাশের পরিবেশ। আমি... আমরা সব ঠিক করে নেব, দেখো।

এইরকম ছোটোখাটো কথা দিয়েই শুরু হত। কথা ক্রমশ গড়িয়ে যেত শরীরে। আর শেষ হত চরম কোনও প্রতিশ্রুতিতে।

- বাংলা অনার্সের দেবাহুতির সঙ্গে তুমি একদম কথা বলবে না আনন্দ। ও কিন্তু খুব খারাপ। আমি তোমাকে বলছি।

কিংবা বলত, কাল তুমি ইউনিয়ন রুমে কী করছিলে? আমি বলেছি না, ওদের আমি একদম পছন্দ করি না! ওইসব রাজনীতি করা ছেলেপুলেদের দু’চক্ষে দেখতে পারি না আমি।

- শোনো আনন্দ, ডিবি স্যার কাল লিঙ্গুয়িস্টিক্সের ক্লাসের পরে তোমাকে যে স্পেশাল নোটসগুলো দিয়েছিলেন, সেগুলো কাল কলেজে জেরক্স করে নিয়ে আসবে, ক্লাসের কাউকে কিন্তু দেবে না। আমাকে দেবে শুধু।

আমি কিছুদিন শুনছিলাম। শুনতাম ওর সব কথা। অন্য কারও সঙ্গে কথা বলার সময়, ইউনিয়ন রুমের পাশ দিয়ে যাবার সময় আমি খুব সচেতন থাকতাম। কিন্তু হঠাৎ একদিন খটকা লাগল। আমি তো ওর কথামতো আমার বন্ধুদের সঙ্গেই আর মন খুলে আড্ডা মারতে পারছিলাম না। অথচ ও কলেজের পরেও এক-একদিন ক্যাম্পাসে বসে কতগুলো বখে যাওয়া ছেলের সঙ্গে আলুথালু পোশাকে গাঁজা খাচ্ছে, মদ খাচ্ছে। হেসে গড়িয়ে পড়ছে এর তার গায়ে। আমাকে দেখে তখন না দেখার ভান করছে। প্রসঙ্গ তুলতে গেলে কথা ঘুরিয়ে নিচ্ছে।

আমি ওর আচরণ নিয়ে আপত্তি করতেই সমস্যার শুরু।

- তুই তবে এখানে কী করতে এসেছিস বে? হাওয়া খেতে?

বিট্টুকে আমার বেশ ভাল লাগে। বিট্টু খুব খোলামেলা ছেলে। বিট্টুর কোনও রাখঢাক নেই। ও বলে, ওর নামে ছ’টা খুনের মামলা। আমি অবশ্য প্রথমে শুনে একদম বিশ্বাস করিনি। ও আমার থেকে কত আর বড় হবে? এই এত অল্প বয়সে কেউ এতগুলো খুনের প্ল্যানই করতে পারে না! নির্ঘাত বানিয়ে বলে। বাড়িয়ে বলে হিরো হতে চায়।

- নাঃ। আমাকে তো জোর করে এখানে পাঠিয়ে দিল। থানা থেকে জামিন হল না। বলল, সবকটা জামিন অযোগ্য ধারা। আমি রেপ করেছি, খুন করার চেষ্টা করেছি।

- উরিসসালা! তুই তো হেভি জিনিস ভাই! রেপও করে ফেলেছিস? তা একা করলি? না দল ছিল?

- পুলিশ বলছে, আমি একাই।

- তার মানে? তুই একা ছিলি না? বাকিরা পালিয়েছে? তুই একা মুরগি?

- আরে দূর! পালাবে কেন? কেউ ছিলই না। আর রেপ করবই বা কেন?

- যাব্বাবা! কী ভজঘট কেস মাইরি! তা’ রেপ করলি কাকে?

- প্রেমিকাকে।

- এই শোন, তুই কিন্তু বড্ড ফালতু বাওয়াল করছিস। নিজের লাভারকে কেউ রেপ করে নাকি? সে তো এমনিই চাইলে শোওয়া যায়।

- তা’ও আর আমি শুলাম কোথায়?

- উফ! তোর আংসাং কথায় সব নেশা ছুটে যাচ্ছে মাইরি।

নেশা আমি কোনওদিনই করি না। সেদিনও করিনি। অন্তরাকে শুধু একটা চড় মেরেছিলাম। ও তো আসলে ঠকাচ্ছিল আমাকে। ক্রমশ দেখছিলাম একের পর এক সম্পর্ক ওর। ক্লাসে, ক্লাসের বাইরে, অন্য ডিপার্টমেন্টে, কলেজের বাইরে, পাড়ায়...। অনেক সম্পর্ক। খুচরো সম্পর্ক। তারা ওর সঙ্গে আসে যায় থাকে। তারা ওর গুণমুগ্ধ। নেশাগ্রস্তের মতো ঘোরে ওর চারপাশে। আমাকে ও লুকিয়েছিল বহু কিছু। বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিল আমাকে আমার বন্ধু, আমার আত্মীয়, আমার জগত থেকে। আমি কেমন একলা হয়ে যাচ্ছিলাম। ভীষণ দমবন্ধ হয়ে যেত আমার। অসহ্য লাগত। প্রথমে ওকে বুঝিয়ে বললাম। শুনতে চাইল না। রাগ দেখালাম। পাত্তা দিল না। অভিমান করে কয়েকদিন দূরে সরে থাকার ভান করলাম। ও আরও ডোন্ট কেয়ার হয়ে গেল।

- অন্তরা, আমি সত্যিই বুঝতে পারছি না তুমি কি চাও...

এভাবেই কথা শুরু হয়েছিল। আমি সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছিলাম। নিজেকে আমার বড্ড প্রতারিত মনে হচ্ছিল। আমি তো বরাবর খুব সাধারণ। কিন্তু এই কলেজে আসার পর থেকে আমার ডিপার্টমেন্টের স্যারেরা আমাকে লক্ষ্য করছেন, উৎসাহ দিচ্ছেন। এখন আমি টপার। আমি ক্লাসের সেরা ছাত্র। আমি অনেক উঁচুতে উঠতে চাই। এইজন্য হিংসে? শুধু এইজন্য? অন্তরার পোশাকআশাক চালচলন এতদিন আমি খেয়াল করিনি তেমন করে। আচ্ছা, ও কি একটু বেশি খোলামেলা? সিডিউসিং?

- অন্তরা, তোমার হাবভাব আমার ভাল লাগছে না। আমাকে তুমি ডাম্প করার আগে আমিই ব্রেক আপে যেতে চাই। এই রিলেশন কন্টিনিউ করা আমার পক্ষে সম্ভব নয়।

- হাউ ডেয়ার ইউ আনন্দ? আমি তোমাকে শেষ করে দিতে পারি, জানো?

- শেষ? তুমি আমার কী ক্ষতি করবে শুনি?

- সেটা ঠিক সময়মতো আমি তোমায় বুঝিয়ে দেব।

আমার পৌরুষে লাগে। আমি ক্লাসের সেরা ছাত্র, স্যাররা ভালবাসেন আমায়। আমার ক্ষতি করবে অন্তরা? কাঁধে হাত রেখেছিলাম ওর। এক ঝটকায় ও হাত সরিয়ে দেয়।

নিজেকে সেদিন সংযত করতে পারিনি। চড় মেরেছিলাম। খুব জোরে। আর দাঁড়াইনি।

সারা রাত ধরে ভেবেছি, আমি তো কোনও ক্ষতি করিনি ওর। বরং ভাল চেয়েছি। ওকে সময় দিয়েছি, আদর করেছি...। ভালবেসেছি। তাহলে কি অন্তরা ভালোবাসায় থাকতে চায় না? আচ্ছা, কাল যদি আবার গিয়ে ক্ষমা চেয়ে নিই ওর কাছে? যদি গিয়ে বলি, আমি তো মারতে চাইনি তোমায়...। হঠাৎ ঝোঁকের মাথায়... রাগের বশে... ও কী আমায় বুঝবে না?

সেই সুযোগ আর আসেনি। আমাকে এড়িয়ে চলতে শুরু করে অন্তরা। তখনকার মতো স্বস্তি পেয়েছিলাম। আরও বেশি করে মন দিলাম পড়াশোনায়। আমাকে ভালো রেজাল্ট করতেই হবে।

কিন্তু আমি বুঝতেই পারিনি অন্তরা, অন্তরার মতো মেয়েরা নিজেরা সম্পর্ক ছুঁড়ে ফেলতে অভ্যস্ত। উলটো ঘটনাটা ঘটেনি কক্ষনও। ওদের ক্ষেত্রে পালটা প্রতিরোধ বা প্রতিবাদ কখনও কখনও মারাত্মক হয়ে ওঠে।

একে একে সব বন্ধুদের ও সরিয়ে দিল আমার চারপাশ থেকে। আমার ক্লাসের সব ছেলেমেয়েকে একটু একটু করে বোঝাল, আমি ভোগ করেছি ওকে। ব্যবহার করেছি। ওর আর পাঁচজন প্রাক্তন বয়ফ্রেন্ডের মতো... আমিও খুব বাজে ছেলে। খুবই বাজে। ভীষণ নোংরা।

হঠাৎ একদিন অন্তরা ফেসবুকের ওপেন ওয়ালে লিখে দিল আমার নামে। বিরাট একটা পোস্ট। তাতে আমার ছবি দিয়ে লিখে দিল কীভাবে দিনের পর দিন আমি ওকে ওর ইচ্ছের বিরুদ্ধে নিজের বাড়িতে ডেকে নিয়ে গিয়ে ধর্ষণ করেছি। খুন করার চেষ্টা করেছি ওকে। ওর একা থাকার সুযোগ নিয়েছি আমি, ওর সারা শরীরে সিগারেটের ছ্যাঁকা, ওকে দিনের পর দিন যৌন অত্যাচার...। নারকীয় বিবরণ। মানসিক নির্যাতন। আরও কত অভিযোগ। কী নিখুঁত বর্ণনা। প্রথমে ফেসবুকে। তারপর সরাসরি থানায় লিখিত অভিযোগ। আমি কিছু বোঝার আগেই, নিজেকে বাঁচিয়ে চলার আগেই বাড়িতে পুলিশ এল।

আমার সাদাসিধে মা কিচ্ছু না জেনে, শুধু ছেলের প্রতি অগাধ বিশ্বাসে, অন্তরার প্রতি অপত্যস্নেহে ওয়ারেন্ট পর্যন্ত না দেখেই আমাকে পাঠিয়ে দিল থানায়। মা তো জানত, তার ছেলে আনন্দ কোনও অন্যায় করতেই পারে না।

থানার কাস্টডি থেকে চলে এলাম এখানে। জেলের গারদের আড়ালে। যতদিন না জামিন হচ্ছে...। যতদিন না প্রমাণ হচ্ছে আমি সম্পূর্ণ নির্দোষ। সবই তো জামিন-অযোগ্য ধারা। মিটতে সময় লাগবে না?

বিট্টু মাঝে মাঝে সিগারেটে গাঁজা ভরে খায়। কোথা থেকে কীভাবে পায় আমি জানি না। তবে মা যখন এসেছিল, ওর সিগারেটের খরচ দিয়েছিল। আমি জানি। বিট্টু যাতে আমাকে দেখেশুনে রাখে, সেইজন্য ওর হাতে দুশো টাকা। অন্তরার গত জন্মদিনে এক বাটি পায়েস বানিয়েছিল আমার মা। পায়েসের ওপরে অনেক কাজু আর কিশমিশ সাজানো ছিল। অনেক রাতে অন্তরা বাড়ি ফিরে গেলে মা’কে জিগ্যেস করেছিলাম, কাজুর তো অনেক দাম মা। আমাদের পায়েসে তো দাও না কখনও। মা হেসে বলেছিল, আজ সবার পায়েসেই কাজু-কিশমিশ আছে রে। দুশো টাকা বাঁচিয়ে রেখেছিলাম... দুধ, ঘি, চাল। সব মিলিয়ে আমার বাজেটের মধ্যেই। মেয়েটা কত আনন্দ পেল বল?

অন্তরা খুব আনন্দেই আছে শুনেছি। আমার ডিপার্টমেন্টের স্যারেরা সবাই আমার পক্ষে। অনেকেই ফোন করেছেন আমার মা’কে। কিন্তু রেপ কেস, খুনের হুমকির মতো অনেকগুলো অভিযোগ তো। প্রমাণ হতে অনেক দিন লেগে যাবে। ততদিন আমি অনেক ক্রিমিনালদের মধ্যে রয়েছি। জেলের মধ্যে। জেলের বাইরের ক্রিমিনালদের আমি চিনতে পারিনি।

- এখান থেকে বেরিয়ে ওই রেন্ডিটাকে খুন করতে ইচ্ছে করবে না তোর? সত্যি বল?

- নাঃ বিট্টুদা।

- কেন বে? তুই কোন মন্দিরের সাধু?

- সাধু কেন হব? আমি একেবারেই সাধারণ মানুষ।

- এখান থেকে ফিরে আবার পড়তে যাবি ওই কলেজে?

- নাঃ। সে রাস্তা বন্ধ।

- তবে? গায়ে পুলিশের দাগ পড়েছে, জেলের ভাত খেয়েছিস, চাকরি পাবি?

- নাঃ। সরকারি চাকরি তো পাবোই না। এম এ পড়ার স্বপ্নটাও শেষ।

- পড়ার তো অন্য জায়গা আছে।

- তা’ আছে। সে তুমি বুঝবে না। আমি যেটা পড়তে চেয়েছিলাম, সেটা তো অন্য সব জায়গায় নেই। কাজেই এই পড়াশোনাটাও আর হবে না।

- তুই মাইরি আজব চিজ আছিস। আমি হলে ওই মেয়েছেলেটার খাল খিঁচে নিতাম একদম।


মা আমার নাম রেখেছিল আনন্দ। হয়ত এমনিই। কিছু না ভেবে। এখানে বসে বসে অনেক কিছু মনে হয় আমার। প্রতিশোধ, প্রতিকার, প্রতিফল। অন্তরা ভালই আছে। ওকে চড় মেরেছিলাম সেদিন। যেদিন ও চ্যালেঞ্জ করেছিল আমাকে, শেষ দেখে ছাড়বে। সেদিন কিন্তু আমি ওকে পালটা না মারলেও পারতাম।

এখানে আসার পরে এক একদিন রাগ হত। খুব রাগ। মাথা ঠুকতে ইচ্ছে করত। আমি মানুষ চিনতে পারিনি। আমি ভালোবাসা বিলিয়ে দিয়েছি। অপাত্রে। প্রথম প্রেম, প্রথম সম্পর্ক। স্বপ্ন, আশা... সব এত সহজে শেষ হয়ে গেল? শেষ হয়?

মনে মনে প্ল্যান করতাম, একবার বেরোই এখান থেকে, ঠিক হিসেব বুঝে নেব। রেপ কেস দিল আমার নামে? বেশ, রেপ কাকে বলে বুঝিয়ে দেব সময়মতো। বিট্টুকে বললে আমায় হেল্প করবে না? ঠিক করবে। ও জানে, আমি গুড বয়। বিট্টুকে পয়সা দেব। ধার করব। তারপর দেব। ছ’টার জায়গায় ওর নামে সাতটা খুনের মামলা ঝুলবে না হয়! কী এসে যায়!


- আমি ভাবছি এবার একটা হোম ডেলিভারি শুরু করব। রান্না করব। বাড়িতে বাড়িতে খাবার সাপ্লাই দেব।

- মা, তুমি শেষে...

- কেন রে? রান্না করে লোককে খাওয়ানো কি খারাপ কাজ? রেস্তোরাঁয় গিয়ে অন্যের রান্না খাস না তোরা?

- আমার জন্য কোর্টে আর থানায় তোমার অনেক খরচ হয়ে যাচ্ছে, তাই না মা?

- অসুখ করলে তো চিকিৎসা করতেই হয় বাবা। তখন রোগ সারানোটাই কাজ। পয়সার কথা ভাবলে প্রাণে বাঁচা যায়?

- আমি কবে বাড়ি যাব মা?

- খুব শিগগিরই নিয়ে যাব রে। অনেকগুলো কেস তো। একে একে মিটবে। জজসাহেব ঠিক বুঝবেন, দেখিস।

আমি কি খারাপ আছি? আমাকে কি সত্যিই খারাপ রাখতে পারবে অন্তরা? একদিন বিচার হবে, একদিন জামিন হবে, একদিন ঘরে ফিরে যাব। মায়ের কাছে, ছোট ভাইয়ের কাছে, অক্ষম অসহায় অসুস্থ বাবার কাছে, আত্মীয় পরিজন বন্ধুদের কাছে। ওরা আমায় বিশ্বাস করে, ভরসা করে। চাকরির পথ বন্ধ হলে ব্যবসা। ব্যবসায় পিছিয়ে যেতে হলে বাড়িতে বসে পড়াব ছাত্র-ছাত্রীদের। মায়ের দারুণ সব রান্না সাইকেলে করে নিয়ে যাব বাড়িতে বাড়িতে। কিছু তো করবই।

- অন্তরা রোজ থানায় বসে থাকে মা। তাই না? কোর্টেও আসে?

- বসে থাকতে দে বাবা। অন্যের গায়ে কালি লাগাতে গেলে নিজের হাতেও অনেক কালি লাগে। ওরা ওই কালিটুকু নিয়েই চলে। অন্তরার মতো মেয়েরা ওটাই শিখেছে।

- একটা কথা বলব মা?

- বল।

- আমি কিন্তু ওকে খুব ভালোবাসতাম।

- আমিও। নিজের মেয়ের মতো ভাবতাম। আমার ওকে করুণা হয়। ও তোর ভালোবাসার দাম দিল না।

মা বলেছিল, বুদ্ধদেবের প্রধান এক শিষ্য ছিলেন আনন্দ। তিনিও সন্ন্যাসী। মায়ের কথার মধ্যে থেকে আমি রাগ, অহংকার আর নিষ্ঠুরতাকে বাদ দিতে শুরু করি। মুছতে থাকি গ্লানি, অপরাধ, পাপ আর পাপবোধ। জেলের বাইরে বসে থাকা মুখোশপরা দুনিয়ার কাছ থেকে এসে দাঁড়াই বিট্টুদের কাছে। এখানে বিট্টুরা স্বচ্ছ, সৎ। অথচ অপরাধী। অন্তরা, অন্তরার মতো ছেলে-মেয়েরা আদ্যন্ত অসৎ। অথচ তারা কেমন বুক ফুলিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে গারদের বাইরে।

রাত বাড়লে একটুকরো আলো এসে পড়ে দেওয়ালের একটা নির্দিষ্ট কোনায়। শুধু ওইটুকু জায়গায়। ওই আলোর মধ্যে গিয়ে তর্জনী রাখি আমার একচিলতে নরম ভালোবাসার গায়ে। অন্তরা ওই ভালোবাসা ছুঁতে পারবে না আর কোনওদিন। ওটুকু আমার নিজস্ব। একান্তই আমার।

জেলারের কাছে একটা দরখাস্ত জমা দেব কাল। একটা মহাভারত চাই। বিট্টু মহাভারত পড়েনি। ওদের সবাইকে কাল থেকে মহাভারত পড়ে শোনাব। সংসারের সমস্ত সম্পর্ক, ভালবাসা, ঘৃণা আর ক্ষমার যাবতীয় সমীকরণ দিব্যি আঁকা রয়েছে এখানে। আবার নতুন করে খুঁজে দেখার অপেক্ষা।


লেখক পরিচিতি
শ্যামলী আচার্য
কলকাতায় থাকেন
গল্পকার। প্রবন্ধকার। 

৮টি মন্তব্য:

  1. বাঃ ভালো গল্প। এই তো চাই। আলো চাই। এ তো আলোর গল্প।

    উত্তরমুছুন
  2. ভালো গল্প। অনায়াস গতি। ডিটেলিং । মৃদু যৌনতা। সব উপাদানের এমন পরিমিতি গল্পটিকে আলাদা উচ্চতা দিয়েছে। এমন কলম দীর্ঘজীবী হোক।

    উত্তরমুছুন
  3. একটা যথার্থ ছোট গল্প। মানুষ হওয়ার শ্রেষ্ঠ উপকরণগুলো খুঁজে পেলাম।

    উত্তরমুছুন
  4. খুব ভাল লাগল অন্যস্বাদের এই গল্পটা

    উত্তরমুছুন