মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

শিপা সুলতানা'র গল্প : বিষশ্বাস

কিছুক্ষণের ভেতর বৃষ্টি হবে। বাতাস দম ধরে আছে কিন্তু দ্রুত দৌড়ে যাচ্ছে কালো কালো মেঘ, যেন একেকটা মৈনাক পাহাড়। আমি এমন মেঘ কখনো দেখি নাই শহরে, যা দেখেছি তা ছেঁড়া ছেঁড়া, অগোছালো। অবশ্য দেখার সুযোগও ছিলোনা, শহরে আকাশ নেই।

বাড়ির এত কাছে এমন একটি পদ্মের বাগান আছে আমি জানতাম না, অবশ্য আমি ঘর থেকেও তেমন একটা বের হই নাই। ঘর থেকে বের হলেই বাড়ির সামনে মায়ের কবর, আমার পরীর মত মা এভাবে মাটিতে শুয়ে আছেন দেখতে ভাল লাগে না আমার।

মাকে শুইয়ে তিন দিনের দিন বাবা চলে গেছেন ঢাকায়। আমাকে নিতে আসবেন, যদি কোনো মহিলা পাওয়া যায় ঘর এবং আমাকে দেখে রাখার জন্য। কাউকে পেলে বাবাকে যেনো ফোন করা হয়, উনি এসে নিয়ে যাবেন। আমি কিছুই বলি নাই, তবে চিৎকার করছিলাম আমি মাকে এমনভাবে শুয়ে থাকতে দেখতে চাই না বাবা, আমাকে সাথে নিয়ে যাও, আমি কোনো যন্ত্রণা করব না, তোমার অফিসের ওয়েটিংরুমে বসে থাকব সারাদিন...

এখানে কি লক্ষ লক্ষ পদ্ম! মনে হচ্ছে সমস্ত গ্রামের উপর লালরঙের বিশাল একটি জামদানী বিছিয়ে রেখেছে কেউ, গত ঈদের মায়ের জামদানীর মতো। গাঢ় গোলাপী শাড়িটি মা আমার পছন্দে কিনেছিলেন। অত গাঢ় রং মায়ের ভাল লাগে না। কিনতে কিনতে বলছিলেন ‘আমি শুধু ঈদের দিন পরব লীলা, এরপর তুমি বড় হলে পরবে এই শাড়ি, জামদানির কিন্তু চল যায় না, বুঝছো?’

পদ্মফুলের ফাঁকে ফাঁকে বিশাল সব পাতা। আরেকটু বড় হলে আমাজনের জায়ান্ট লিলির পাতার মত হতো। অসংখ্য পাতা, একা একা তিরতির করে কাঁপছে। বেশি বাতাস হলে হয়ত একে অন্যের উপর গড়িয়ে পড়ে! সেইসব সবুজ পাতার ফাঁকে, মাথা ছাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটি সাপ। কালো, লিকলিকে। এতো ভয়ঙ্কর কালো যে  হঠাৎ চোখে পড়ায় কেঁপে উঠেছিলাম আমি, কিন্তু বাবার কথা মনে হলো, সব সাপ বিষাক্ত নয়, বেশিরভাগ সাপই নির্বিষ। আমি তবু দূরত্ব রেখে অন্যদিকে হাঁটতে লাগলাম, আরো গভীরের দিকে, অথবা দূর থেকে সামনের ফুলগুলোকে আরো বেশি সুন্দর লাগে, মনে হয় ঐখানে আরো বেশি বেশি ফুল, আরো রঙ্গীন ফুল! তখন আবার সাপটাকে দেখলাম এবং আমার আধহাত দূরে। বাবার কথা মনে পড়ল না, মায়ের কথা মনে পড়ল, ‘ আমরা জানি না কোন সাপ বিষাক্ত, কোন সাপ নির্বিষ, সুতরাং সাপ থেকে অনেক অনেক দূরে থাকাই উত্তম, বুঝছ লীলা?’ আমি অবশ্য দূরে যাবার সময় পেলাম না...

আমার যখন জ্ঞান ফিরল, অথবা বেঁচে আছি মনে হলো, আমি বাবার কাছে যেতে চাইলাম। ভীড়ের ভেতর থেকে কেউ চিৎকার করে আমার বাবাকে জানাতে নিষেধ করল, বলল এটা জানলে আমার বাবা বাড়িতে আসার আগেই হার্ট এট্যাক করবেন। আমি চোখ বন্ধ করে দেখলাম এই কাদামাটি থেকে বাবা আমাকে পিঠে করে বাড়িতে নিয়ে যাচ্ছেন, মাকে খাবার বানাতে বলে শাওয়ার করিয়ে দিতে দিতে বলছেন ‘সামনের মাস থেকে তুমি ক্লাস সিক্সে যাবে, তখন থেকে নিজে নিজে শাওয়ার করতে হবে মা...’।

ঝুম বৃষ্টি হচ্ছে, কিন্তু দাদাবাড়ির টিনের চালের মত শব্দ পাচ্ছি না আমি, আমাকে শুইয়ে রাখা হয়েছে নিরিবিলি একটি রুমে, ঢালাই করা ছাদের ঘর। এই ঘরে শুইয়ে রেখে যাবার সময় খোদ আমার দাদাজান নীচু নীচু কণ্ঠে কাউকে বলছিলেন, বলছিলেন তিনি সুবিচার চান, মা মরা মেয়ে আমি, সুবিচার পেলে আমার বাবাকে কিছুই জানানো হবে না। কেউ যেনো বলছিল, ‘আমি দাদাবাড়িতে নিরাপদ না, যতদিন সমাধান না হচ্ছে আমি এইবাড়িতে থাকব, ইনশাল্লাহ আমি সুবিচার পাবো’

আমি কি আবার মরে গেছিলাম! দেখলাম যেভাবে বসে টিভিতে নাটক দেখতেন মা, আর আমি তার কোলে বসে যন্ত্রণা করতাম, সেভাবেই কোলে বসে ঘুমাচ্ছি আর মা চিৎকার করে বলছিলেন-- ওঠো লীলা, ওঠো...দ্রুত ওঠো, দৌড় দাও বুঝছ...সাপ সাপ...

আমি এবারও দৌড়াতে পারলাম না, এই সাপটা আরো বিশাল, আমাজানের এনাকোন্ডার মত, অন্ধকার ঘর, তবু বিষাক্ত একজোড়া চোখ, দেখলাম দরজায় দাঁড়িয়ে আছেন আমার মা, একই সাথে হাসছেন আর কাঁদছেন, আমাকে অভয় দিচ্ছেন, ইশারায় বলছেন চিৎকার দিতে। অথচ আমি মাকে ইশারা করছিলাম আমাকে নিয়ে যেতে...

আমাকে ঠিক মায়ের পাশে শুইয়ে রাখা হয়েছে, বাবাই শুইয়ে রেখেছেন বরাবরের মত, যেনো ঘুম না ভাঙ্গে। ধীরে ধীরে দরজাও লাগিয়ে নিচ্ছেন যেন পাশের রুমের আলো না আসে, শব্দ না আসে, যেনো আমি নিশ্চিন্তে ঘুমাই! তবু আমি টের পেলাম নরম মাটি সরিয়ে গর্ত করে করে পিল পিল করে সাপেরা আসতে শুরু করেছে অন্ধকার কবরে...

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন