মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

বিপুল জামান'এর গল্প : মায়াকানন



আমার বড়ভাই যেদিন জন্মালো সেদিন বাড়ির উঠোনে আব্বা একটা আমগাছ লাগিয়েছিলেন। বহুবছর পর আম ধরলে জানা গেল আম খুব টক। এমন টকের আমগাছ আমাদের ভিটেয় আর ছিল না। বাড়ি থেকে একটু দূরে পুকুরের পাশের মেশিনের জমিতে যে আমগাছটা ছিল সেটা অবশ্য এর থেকেও টক, আম পেকে লাল হয়ে থাকলেও কোন পাখি ঠোকর দিত না। আব্বার লাগানো আমগাছ বড়ভাই প্রতিদিন পানি দিত যখন সে জানলো তার জন্মের দিন এই গাছ লাগানো। সে সেটার চারপাশে বেড়া দেয়। নানান যত্নআত্তি। আমি একদিন আব্বাকে জিজ্ঞেস করলাম, আমার জন্মের পরে কোন গাছ লাগান নাই? আব্বা হাসি হাসি মুখে বললেন, লাগাইছি না! একটা দুইটা না, একশটা। আলুর বেড়ার জমিতে মেহগনি গাছ লাগাইছি না!

আব্বার কাছে ঘ্যান ঘ্যান করে একদিন সেই জমি দেখে আসলাম। একশ গাছ মাথা উঁচু করে গর্বিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। শক্ত, দৃঢ়, কর্কশ তাদের চামড়া। আশেপাশের ক্ষেতের ফসল আর বাড়িঘর আঁধার করা তাদের গাম্ভীর্য, ভয় করে দেখলে, অস্বস্তি উৎপাদন করে। মনে মনে ভাবলাম, উপযুক্ত বটে! আমিও বিকেলে খেলার ফাঁকে সময় পেলে মেহগনি বাগানে যাওয়া শুরু করি। ভয় লাগে, অস্বস্তি লাগে, কিন্তু কি করার -এদের সাথে যে আমার জন্মের সম্পর্ক।

একদিন আমাদের একটা বোনও হল। আমি তক্কে তক্কে থাকি, লক্ষ্য করি ওর জন্মের সময় কী করা হল। তেমন কিছু চোখে পড়ল না। একদিন খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলাম, 'আব্বা, বুনুর জন্মের সময় কী লাগাইছেন?' আব্বা উত্তর দিলেন, 'টাকার গাছ লাগাইছি।' আমি বললাম, 'তাইলে আপনি আর দোকানে না যান আজ থেকে। আমার বইয়ে মলাট লাগায়ে দিয়েন।'

আমার কথা শুনে আব্বা এমন হাসতে থাকলেন যে বিষম খাচ্ছিলেন। মাও হেসে ফেললেন। বড়ভাই বিরক্ত হইছিলেন, বললেন, গাধা!

আব্বার হাসি থামানোর জন্যে মা বললেন, আস্তে, আস্তে, বুনুর ঘুম ভেঙে যাবে।'

বুনুর ঘুম পাতলা। কোন কোন দিন সে সারারাত জেগে থাকে। মাকে ঘুমুতে দেয় না। ভোরের দিকে ঘুমায় কিন্তু ঘুম পুরো হয় না। দিনের বেলায় নানান শব্দে তার ঘুম ভেঙে যায়। সে কাঁনতে থাকে। আমি স্কুল থেকে এসে দোলনায় দোল দিই। দোল দিলে বুনু ঘুম পাড়ে, আর মুখে বুড়ো আঙুল দিয়ে চুষে আর হাসে। তখন তাকে খুব সুন্দর লাগে। আমি বুনুর দিকে তাকিয়ে থাকি, তাকিয়ে থাকি, দেখতে থাকি, দেখতেই থাকি। একদিন মা আমাকে তাকিয়ে থাকতে দেখে আমাকে বললেন, 'এভাবে দেখতে হয় না। বুনুর শরীর খারাপ হবে আব্বা। দেখ না, আমিও ভালো করে দেখি না নজর লাগার ভয়ে। আপনজনের নজর সবচেয়ে খারাপ।'

আমি আম্মাকে জিজ্ঞেস করি, 'আম্মা তুমি কি খেয়াল করছো যে বুনু একদম আমার মত দেখতে?' আম্মা হেসে ফেলেন, রহস্য করে বলেন, 'কই নাতো? আমি তো একদম খেয়াল করিনি।'

এমন একটা ঘটনা আম্মা দেখে নাই শুনে আমি ব্যস্ত হয়ে উঠি। তাড়াতাড়ি বলি, 'এই দেখ, মুখ একদম আমার মতো গোল।' উত্তেজনায় আমি জোরে কথা বলে উঠি। আম্মা তাড়াতাড়ি আমাকে কাছে টেনে কোলে নিয়ে বলে, চুপ চুপ, বুনু উঠে যাবে। আমি তখন আস্তে করে বলি, 'তুমি খেয়াল করে দেখই না।' আম্মা তখন খেয়াল করে দেখার ভান করে বলে, 'আরে তাই তো! একদম আমার আব্বা হুজুরের মতো দেখি।'

আমি একটু মনমরা হই। সবাই বলে আমি নাকি নানার মতো দেখতে, আম্মা আমাকে তাই আব্বা হুজুর বলে। বুনু তাইলে কার মত দেখতে? আমার মত না নানার মত। বড়ভাই স্কুল থেকে আসলে আমি জিজ্ঞেস করি, ভাই, বুনু কার মত দেখতে? বড়ভাই আমার দিকে তাকায়, হেসে বলে, ক্যান তোর মত! আমি বলি, নাকি নানার মত?

বড়ভাই তখন সদ্য আমার বয়স ছাড়াইছেন। তিনি আমার মনের কথা,ব্যথা, অনুভূতি বেশি বুঝে থাকবেন। বললেন, দূর নানার মত হবে কেন? নানা তো বুড়া, মুখে দাড়ি। বুনুর কি মুখে দাড়ি?

বড়ভাইয়ের কট্টর যুক্তি শুনে আমি বুকে হাতির বল পাই। আমি বুনুর দোলনায় দোল দিতে যাই। বড়ভাই কুড়াল বের করে, গোসলের আগে সে প্রতিদিন রান্নার কাঠ ফাঁড়ে। একটা বিরাট বাতাবি লেবু গাছ কাটা হইছিল, শুঁয়োপোকার জ্বালায়। হঠাৎ ভাইয়ের চিৎকার শুনে আমি দৌড়ে বাইরে আসি, আম্মা আসে রান্নাঘর থেকে। কাঠের চলটা উড়ে ভাইয়ের চোখের কোনে লাগছে। রক্ত বের হচ্ছে। আম্মা আমাকে বলে স্যাভলন-টন আনতে। স্যাভলন থাকে আলমারির উপরের ড্রয়ারে। ড্রেসিং টেবিলের উপর পা দিয়ে আমি আলমারির সেই ড্রয়ারে ঠেঁই পাই। তাড়াতাড়ি করতে গিয়ে পা হড়কে পড়ে যায়। ড্রয়ারের ডালা আমার হাতে ছিল ধরা। আমি ডালাধরে ঝুলতে থাকি। সেই ভারে আলমারি পড়ে যেতে থাকে।আলমারি পড়লে তো আমি নিচে পড়বই, বুনুর দোলনাও এর নিচে যাবে। আমি চিৎকার করে উঠি (নাকি চিৎকার করব বলে ভাবি?) সেই সময় বুড়ো-গেঞ্জি পরা, দাড়িয়ালা এক লোক এসে তাড়াতাড়ি আলমারিটা ধরে, আমাকে নামায়, ড্রয়ার হাতড়ায়ে স্যাভলন ক্রিম এনে হাতে দেয়, আমাকে তাড়া দেয়, 'যা তাড়াতাড়ি যা, রক্তে বড়র কপাল ভেসে যায়।'

আমি ঘর থেকে ছুটে বের হওয়ার সময় শুনি বুনুর খিল খিল হাসি। ড্রয়ার খোলার শব্দ জোরে হইছিল নাকি, বুনুর ঘুম ভেঙে গেছে। আম্মা শাড়ির পাড় ছিড়ে ভাইয়ের কপাল বেধে দিছে, কিন্তু কাটাটা ঠিক কপালে না বলে তেমম সুবিধা হচ্ছে না। আম্মা চিৎকার করে ডাকেন, মনিরুল, মনিরুলরে, ভ্যান বের কর। মনিরুল ভাই এসে ঘটনা দেখে তাড়াতাড়ি ভ্যান বের করে। ভাইকে নিয়ে যায় মোড়ের সাইদুল ডাক্তারের কাছে। আমি ফিচফিচ করে কানতে থাকি। বড়ভাই ধমক দেয়, তুই কান্দিস ক্যান? গাধা! আম্মা যাওয়ার সময় বলে, দুই ভাইবোন থাকো একটু, ঠিক আছে? যাব আর আসব আমরা। আমি বলি, আচ্ছা! সেই দুপুরে, ভরদুপুরে খোলাবাড়িতে আমরা মাত্র দু'জন। আমি ভয় পেয়ে ঘরে বুনুর কাছে যায়। গিয়ে দেখি বুনু ঘুমায়। আশ্চর্য এর ভিতরে আবার ঘুমায়ে গেছে? তবু আমি দোল দেই। আমার করার কিছু ছিল না। এই ঘরে আমার গা শির শির করতেছিল। কিন্তু এই ঘরে বুনুকে ফেলে রেখে আমি যাইতে পারি না। আবার চুপচাপ একা ঘরে থাকাও সম্ভব না। আমি বুনুকে গল্প বলতে শুরু করি। গল্পটা আসলে গল্প না। একটা কবিতা। স্কুলের বইয়ের। স্কুলের স্যার কবিতাটার ঘটনা প্রথমে গল্প আকারে বলছিলেন, তারপর সুর করে কিভাবে পড়তে হয় সেটা শিখায়ে মুখস্ত করাইছিলেন। একটা রাখাল ছেলের গল্প এটা। সে ঘাস কাটতে যায়, ঘাস কেটে সেই ঘাস বিক্রি করবে হাটে। সেই টাকায় মার জন্যে সে শাড়ি কিনবে। স্যার যখন গল্পটা বলতেছিলেন, তখন আমি ঠিক করে ফেলি আমিও ঘাস কাটতে যাবো। আমারও একটা শাড়ি কেনা দরকার, মাকে দেয়ার জন্যে। শুধু আব্বা দিলেই কি হবে? রাখাল ছেলেটা মাকে শাড়ি কিনে দেয়, আমিও দিব। সমস্যা হলো কবিতাটা শেষ হয় নাই। প্রথম আট লাইন সেদিন পড়াইছিল, ওই আটলাইনের গল্পই স্যার বলছেন। ‘জঙ্গলে একটা বাঘের সামনে সে পড়ছে ঘাস কাটতে গিয়ে, বাঘ তারে ঘাস কাটতে দেবে না। রাখাল অনুনয় বিনয় করতেছে। শেষে বাঘ বলে তার একটা শর্ত আছে।’ এই পর্যন্ত গল্প আমার জানা আছে। বাকিটুকু শুনতে চাইলে স্যার বলছিলেন, প্রথম আট লাইন সবার মুখস্ত হইলে আগামিকাল তিনি পুরো গল্প বলবেন। আমি গল্পটা নিজের মতো বুনুকে বলি, বানায়ে বানায়ে।

--তারপর হলো কি জানিস?

--উ, বুনো উত্তর দেয়(আমার ভুলও হতে পারে)।

'তারপর বাঘ বলল, আমার একটা শর্ত আছে। রাখাল বালক বলে, কি শর্ত? বাঘ বলে, আমার গলায় হাড় বেধে গেছে। এই হাড় তুলতে পারে বক ডাক্তার। তুমি বাজারে যখন ঘাস বেঁচতে যাবা তখন শাড়ি কেনার সাথে ডাক্তাররেও সাথে করে নিয়ে আসবা। রাখাল বলে, আচ্ছা। বলে সে ঘাস কাটতে শুরু করতে গেলেই বাঘ আকাশ বাতাস তুলে ডাক দেয় 'হালুম'। রাখাল ভয় পায়, কিছুটা বিরক্ত হয়ে বলে, আবার কী হলো?
বাঘ বলে, 'কিন্তু তুমি যদি ফিরে না আসো?',
' আসবো না ক্যান?',
'এই পর্যন্ত দুইজন লোক ডাক্তার নিয়ে আসবে বলে আর আসে নাই।'
'তাইলে?'
' তুমি ঘাস কাটতে পারবা না। ঘাস নিয়ে একবার গেলে আর তুমি আসবা না।'
'না, আমি আসব।'
'বিশ্বাস করি না। তুমি তোমার প্রিয় কিছু রেখে যাও আমার কাছে, যার টানে তুমি আসবা।'

রাখাল বলল, ঠিক আছে, আগে তো কাটি। তারপর ঘাস নিয়ে যাওয়ার সময় প্রিয় কিছু রেখে ঘাস নিয়ে বাজারে যাবো নে।

অনেক কথা বলে বাঘ ছিল ক্লান্ত তাছাড়া গলায় বেধা ছিল হাড়। বাঘটা আর কথা বাড়ালো না। রাখাল ঘাস কাটতেছিল আর ভাবতেছিল তার প্রিয় জিনিস কী? মা। কিন্তু মা তো গেছে দূর উজানে। ধান ভানতে। তাছাড়া ধান ভানা বাদ দিয়ে কি আর একদিন বাঘের কাছে মা থাকবে? তাইলে তো ওইদিন না খেয়ে থাকা লাগবে? আর কী আছে প্রিয় তার? হ্যাঁ, রাখাল ছেলেরও একটা ছোট্ট বুনু ছিল। এই কথা শুনে আমার বুনু হেসে ফেলে।

আমি বলি, সত্যি, মিছা কথা বলব ক্যান। তবে তোর থেকে বড়; হাঁটে,দৌড়াই, কথা বলে।

বুনু বলে, উ।

'তো রাখাল করলো কি, ঘাস কাটা শেষে বাড়ি আসল, বুনুরে খাওয়ায়ে গোসল দিয়ে কাঁধে করে বাঘের কাছে নিয়ে চলল। সেই বুনুও খুব দুষ্টু, তোর মতো।'

এই কথা শুনে আমার বুনু আবার বলে, উ।

সেও তোর মতো খালি কতা বলে। সে তার ভাইজানরে জিজ্ঞেস করলো, ভাইজান আমরা কই যাই? রাখাল বালক বলল, মেলার মাঠে বাঘের পুতুল চাইছিলি না, সেই পুতুল কিনতে। ঘাসের বনে ঢুকলে রাখালের বুনু খুব খুশি হয়। বলে ভাইজান, আমারে নামায়ে দেও। আমি খেলবো। রাখাল তারে বাঘের কাছে এনে নামায়ে দেয়। বলে, নে বাঘের সাথে খেল। বুনু বাঘ দেখে খুব খুশি হয়। বাঘের গায়ে সুন্দর ডোরা কাটা পশম। আর কি শান্ত! তাদের গরু আহ্লাদির মতো। রাখালের বুনু বাঘের গলায় হাত বুলায়ে দেয়। বাঘ আহ্লাদির মতো চোখ বন্ধ করে। তার গলায় এতক্ষণে আরাম লাগে। আরামেএএএ তার চোখ বন্ধ হয়ে আসে। '


--কই তোরা? বাইরে আম্মার কন্ঠ শুনে আমি দৌড়ে বের হয়ে আসি। উঠোনে আম্মা, বাইরে ভ্যান থেকে মনিরুল ভাই বড়ভাইকে নামায়।

আম্মা জিজ্ঞেস করে, বুনু কই?
আমি বলি, ঘরে, ঘুমায়।

আম্মা তাড়াতাড়ি ঘরে গিয়ে দেখে তারপর বের হয়ে বড়ভাইকে ধরে ঘরে আনে। আমি পিছু পিছু আসি। ভয়ে ভয়ে। আম্মা বলে, দুইটা সিলাই লাগছে।

আমার হঠাৎ খিদে পায়। খিদে পাওয়ার সাথে সাথে নাকে পোড়া গন্ধ লাগে। তখনই আম্মাও গন্ধ পায়। দৌড়ে রান্নাঘরে গিয়ে আম্মা ভাতের হাড়ি চুলা থেকে ঠেলা দিয়ে ফেলে দেয়। সব ভাত পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। বলবে না, বলবে না করেও আম্মা রাগে বলেই ফেলে, 'আর ছেলেটাও এমন-কোন বুদ্ধি নেই, ক্যান ভাতের হাঁড়িটা একটু নামায়ে রাখা যায় না?

আম্মার রাগ দেখে, কথা শুনে আমি কেঁদে দিই। আমি কোনদিন রান্নাঘরে চুলার কোন কাজ করিনি। আমার কান্না দেখে আম্মার মনে দয়া হয়, রাগ কমে, একটু অপ্রস্তুত হন।

আমারে কাছে ডেকে বলেন, আহারে, অযথা বকাঝকা করতেছি। তুই ভাত রান্নার কিছু জানিস যে চুলার তে ভাত নামাবি। চুলার কাছে আসিস নাই ভালো হইছে। যদি ফ্যান পড়ে পা পুড়ে যেত।

চিল্লাচিল্লি শুনে বড়ভাই বাইরে আসে। আম্মা বড়ভাইরে বলে, আবার রানতে হবে। খিদে লাগছে?

বড়ভাই আম্মাকে বলে, সমস্যা নাই। আমরা দু'ভাই মুড়ি মাখাই। ভাত চুলায় দিয়ে তুমিও খাইতে আসো।

রাতে আব্বার ফিরলে বড়ভাইয়ের মাথায় ব্যান্ডেজ দেখে জিজ্ঞেস করলো, কি হইছে? আম্মা বলেন, হাত মুখ ধুয়ে খাইতে আসো। বলছি।

রাত অনেক হইছিল। আব্বা আমাদের মুখ দেখে বুঝলেন আমরা রাতে না খাওয়া। তার অপেক্ষায় বসে আছি। খাইতে খাইতে আম্মা বললেন বিত্তান্ত। আব্বা বাম হাত দিয়ে বড়ভাইয়ের মুখ ঘুরায়ে ফিরায়ে দেখলেন। সব শুনে চুপ করে খেতে থাকলেন। তারপর আবার বড়ভাইয়ের মুখ ধরে-দেখে বললেন, আল্লাহ মালিক, চোখটা বাঁচায়ে দিছে।

বড়ভাই, আমার বড়ভাই যে দুপুর থেকে একপলের তরেও রা রু করে নাই সে এবার শিউরে উঠলো, যেন বা তার গায়ে কাটা দিছে। আমি হরহর করে কেঁদে ফেললাম, আমি নানারে দেখছি। আব্বা আম্মা আমার দিকে অবাক হয়ে তাকালো। আমি বললাম, স্যাভলন নিতে যখন ঘরে আসছি, তখন ড্রেসিং টেবিল থেকে পা হড়কায়ে পড়ে গেছিলাম, ড্রয়ার ধরে ঝুলতেছিলাম। আলমারি আমার আর বুনুর উপর যখন পড়তে ধরছিল তখন নানা আসছিল। আলমারি ঠেকা দিয়ে আমারে নামায়ে দিয়ে স্যাভলন খুঁজে হাতে দিছিল। আর আমি স্যাভলন নিয়ে বাইরে আসার সময় শুনি উনি বুনুর সাথে খেলতেছেন।

আম্মা দোলনার দিকে তাকালেন, সেখানে বুনু ঘুমায়ে আছে, পাশ ফিরে শুয়ে আছে তাই মুখ দেয়া যায় না।

সবাই খাওয়া বন্ধ করে বসে আছে চুপচাপ, শুধু বড়ভাই আস্তে আস্তে ভাত মুখে দিচ্ছে। আব্বা অনেকক্ষণ পরে বললেন, শুক্কুরবারে একটা মিলাদ দিতে হবে। এত আগাবিগে গেল। তাও অল্পের উপর দিয়ে। আব্বা আবার বড়ভাইয়ের মুখ বাম হাতে নিয়ে আবার দেখলেন। বললেন, চোখটা বাঁচায়ে দিছে আল্লা মালিক।

অন্যরা যখন হাঁটে বুনু তখন দৌড়ায়। অন্যরা যখন দৌঁড়ায় বুনু যেন তখন ওড়ে। সারাবাড়ি চক্কর দেয় নিমিষে। অগোছালো জিনিস গোছায়, গোছালো জিনিস করে অগোছালো। আম্মা তাকে থির রাখতে পারে না। আব্বা তাকে বলে টইটই বেগম। বড়ভাইয়ের ন্যাওটা সে। আমগাছ তখন অনেক বড় হইছে। বড়ভাই একদিন বললেন, বুনু আয় তোরে দোলনা করে দিই।

সুন্দর একটা দোলনা তৈরি হয়ে গেল। বুনু দোল খায়। যত জোরে হয় তত বুনুর আনন্দ হয়। বুনু আমাকে আরো জোরে ঝুল দিতে বলে। আমার খুব ভয় হয়, আনন্দও হয়। জোরে দোল দিলে বুনু খিল খিল করে হাসে। বুনু সব সময় হাসে। আর অদ্ভুত সব কথা বলে। ওদের বইয়ে বাঘ আর বকের গল্প আছে। সেটা দেখিয়ে একদিন বলে, বাঘের গলায় হাড় ফুটেছে তাই নাকি বক ডাকতে হবে। বক তুলে দেবে হাড়? বক কি ডাক্তার নাকি? বলেই কি হাসি। আব্বা শুনে হাসে,' তাই তো আমার মা ঠিকই বলেছে। বক ডাক্তার নাকি?'

আব্বার কথা শুনে বুনু হাসে হাসতে গড়ায়ে পড়ে? বড়ভাই নিজেও হাসতে হাসতে সে বলে, তাইলে কি উপায় বুনু, জঙ্গলে তো ডাক্তার নেই। বাঘের গলার হাড় বের করা যাবে কি করে তাহলে?

বুনু উত্তর দেবে কি, হাসতে হাসতে হেচকি তুলছে। আম্মা হাসতে হাসতে একটু নিজেকে সংবরন করে, তারপর বলে, থাম, এতো হাসি ভালো না।

বুনু একটু হাসি থামায়ে বলে, উপায় আর কি, আমি ডাক্তার হই তারপর বাঘের গলার চিকিৎসা করবো। বড়ভাই খুব খুশি হয় উত্তর শুনে। আমি চমকাই। চমকে প্রশ্ন করি, তুমি ডাক্তার হবে? বুনু ফট করে হাসি থামায়, কেন আমি পারবো না? তারপর একদম হাসি থামায়ে, গম্ভীর গলায় বলে, আমি বড় হয়ে ডাক্তার হবো। নিশ্চয় হবো।

বুনু পড়াশোনায় খুব ব্যস্ত। বড়ভাইয়ের কাছে পড়ে। বড়ভাই মানসাংক করায় গল্প বলে বলে। বুনু খুব মজা পায়। বিকেলে বাড়িতে তেমন কেউ থাকে না। আমি বিকেল বেলায় বুনুর আশেপাশে থাকি। একটা গল্পের বই নিয়ে মুখের সামনে ধরে থাকি। আম্মা অবশ্য রাগ করে। বিকেলে বই পড়তে নেই। চোখের ক্ষতি হয়। আম্মা বাড়িতে নেই। তাই বই সামনে ধরে বসে আছি। না, আম্মার কথা অবাধ্য হয় না আমি। আমি তো পড়ছি না। শুধু চোখের সামনে ধরে আছি। বিকেলবেলা বুনু থালাবাটি রান্নাবাটি খেলে। ওর বয়সী মেয়েরা আর এমন থালাবাটি খেলে না। কার্টুন দেখে। কিন্তু ও থালাবাটি খেলে, আর একা একা পুতুলের সাথে কথা বলে। তাদের গল্প শোনায়। আমি চোখের সামনে বই ধরে কানখাড়া করে থাকি, বুনুর গল্প শুনি। বুনুর প্রতিদিনের বিকেলের খেলা হলো একটি বাড়ির গৃহিনীর প্রতিদিনের কাজ; সকাল থেকে সন্ধ্যে পর্যন্ত। বুনু তার পুতুল ছেলে মেয়েদের রাতে গল্প বলে ঘুম পাড়ায়। সে তাদের তাড়াতাড়ি ঘুম পাড়াতে চেষ্টা করে। তাড়াতাড়ি ঘুম পড়লে বুনুর সুবিধা হল এই ঘরকন্না খেলার পরে সে একটু সময় পাবে দোলনায় দোলার। এটা তার ফেভারিট। কিন্তু দোলনার দোলার লোভে সে কখনও ঘরের কাজ (পুতুলের ঘরকন্না) বাদ দেয় না। বুনুর গল্প শুনে আমি বুঝতে পারি তার ছেলেপিলেরা ঘুমিয়ে গেছে। সে আস্তে আস্তে ঘর বন্ধ করে ( একটা বড় মোটা কাগজের বিস্কুটের কার্টুন)। এইবার আমার ডাক পড়বে দোল দেয়ার জন্যে।

--ভাই, তুমি বিকেলে পড়ো কেন?

--পড়লে কি হয়?

--চোখ নষ্ট হয়ে যাবে।

--হবে না। আমি লাল শাক খাই।

--লাল শাক খেলে কী হয়?

--চোখের জ্যোতি বাড়ে।

--লালশাকে গায়ে শক্তি হয় না মনে হয়, তাই না ভাই?

--ক্যান? কি দেখে মনে হলো?

--জোরে ঝুল দিতে পার না তুমি একদম।

--জোরে ঝুল দিব।

--হু।

আমি জোরে ঝুল দিই।
--আরো দিব?

--হু।

আমি আরো জোরে ঝুল দিই।
--আরো জোরে দিব?

--হু।
বুনু খুশি হয়ে ওঠে।

--আরো জোরে?

বুনু বলে, হ্যাঁ।

আমি জোরে একটা ঝুল দিয়ে সরে আসি। এতেই অনেকক্ষণ দুলবে দোলনাটা। বুনু খুব খুশি হয়। বলে, আমি দেখ উড়ছি। বুনু হাততালি দিতে যায়। আর উড়ে ছুটে সামনে পড়ে। আমি দৌড়ে যায় বুনুর কাছে। বুনু এক গড়া দিয়ে উঠে দাঁড়িয়েছে। জামায় ধুলোয় ধুলো। আমার হতভম্ব ভাব দেখে বলে, আমার একদম লাগেনি। লাগে যে নি তা বোঝাতে নিজের জামা থেকে ধুলো ঝাড়তে শুরু করে।

লাগেনি ঠিক না। জামা খুলে দিয়ে, হাত পা ধোয়াতে গিয়ে দেখি দু-হাতের কনুই, তালু ছিলে গেছে। পানির স্পর্শ পেয়ে শিউরে শিউরে উঠছে।

স্যাভলন লাগানোর সময় বুনু বলল, ভাই জানো, মাটিতে পড়ার আগে কে যেন আমাকে লুফে নিয়েছিল। তারপর আস্তে করে মাটিতে নামায়ে দিসে। আমি অবাক হয়ে তাকালাম ওর দিকে। বুনু বলল, সত্যি!

একশ মেহগনি গাছ বিক্রি করে আমাদের মানুষ সমান উঁচু মাটির বাড়ি সরায়ে সেখানে পাকা ছাদ দেয়া বাড়ি করা হল। বুনুর জন্মের সময় আব্বা টাকার গাছই লাগাইছিলেন। বাজারে জমি কিনছিলেন। সেই জমির কিছুটা বিক্রি করে চালকল করলেন, সেই চালকল থেকে হু হু করে টাকা আসতে থাকল। সেই টাকায় বড়ভাইয়ের, আমার, বুনুর পড়াশোনা, বিয়ে ঘর সংসার। আব্বা সবার বিয়ে দিয়ে যেতে পারছিলেন। বুনুর একটা ফুটফুটে মেয়ে হইছে। খুব কথা বলে। আম্মা তারে ডাকেন, 'টরটরা বুড়ি'। টরটরা বুড়ির ইচ্ছা সে টিচার হবে৷ তার রেজিনা মিসের মতো। বাড়িটা আগের মতই আছে। বুনু অবশ্য প্রত্যেকবার বাড়িতে পা দিয়ে বলে, ভাই দেখেছ বাড়িটা আরো সুন্দর হয়ে গেছে।

বুনুটা এখনও এত পাগল! বাড়িটা একই আছে। সেই আমগাছ। আমগাছে প্রতিবার একটা দোলনা ঝুলানো হয়। বড়ভাইয়ের ছেলে এবার আসার সময় বলল, সে নাকি দোলনার জন্যেই যাচ্ছে। এই দোলনা তাদের ফ্লাটের দোলনার মতো না, এই দোলনাতে করে নাকি আকাশে ল্যান্ড করা যায়। মজার সব কথা বলে এই ছেলে। বারান্দা থেকে আমি দেখছি এই মজার ছেলে আর টরটরি বুড়ির মধ্যে একটা চুক্তি হচ্ছে। একজন দোলনায় উঠলে আরেকজনকে ঝুল দিতে হবে।

টরটরি বুড়ি দোলনায় উঠে বলল ভাইয়া তুমি খাওয়া দাওয়া করো না, না?

--কেন বলছ একথা?

--গায়ে জোরই নাই। তুমি একটুও জোরে ঝুল দিতে পার না।

--তাই, দেখাচ্ছি মজা। দেখ কেমন জোরে ঝুল দিই।

আমি বারান্দা থেকে নামি। টরটরি বুড়ির দোলনার সামনের দিকে গিয়ে দাঁড়াতে হবে । দোলনা থেকে ছিটকে উড়ে এলে তাকে লুফে নিতে হবে





লেখক পরিচিতি
বিপুল জামান 
জন্মস্থান--যশোর। বর্তমান আবাস--ঢাকা।
জন্ম সাল--১৯৯২।
কবি, গল্পকার, সাংবাদিক। 
প্রকাশিত বই নেই।

২টি মন্তব্য:

  1. 'মায়াকানন' দিয়ে এবারের গল্পপাঠ সংখ্যা পড়া শুরু করলাম। শুরুটা দারুণ হলো। আপনার গল্পটা খুব চমৎকার। শুভকামনা।

    উত্তর দিনমুছুন
  2. নিবেদিতা আইচ১৭ মার্চ, ২০২১ ৯:৩৪ PM

    সমাপ্তিটা অপ্রত্যাশিত ছিল। ভাল লেগেছে গল্পটা।

    উত্তর দিনমুছুন