মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর গল্প: পুরুষোত্তম সিংহ



                                            

 

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী (১৯৬৬) হুগলী জেলার নবগ্রামের সন্তান। কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদস্থ কর্মচারী ছিলেন বেশ কিছুদিন। পরে বিদেশে পাড়ি দেন। বহুজাতিক সংস্থার তথ্যপ্রযুক্তি দপ্তরের আধিকারিক। আমেরিকার অ্যান আরবার, মিশিগানে তাঁর অবস্থান। ইতিমধ্যেই দুটি গল্প গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে—‘যে বার পেলে এসেছিল’, ‘বাবলি বাবলি বাবলি’। ‘পরিচয়’ পত্রিকায় গল্প লিখে আত্মপ্রকাশ। গল্পের পাশাপাশি নাটকও লেখেন। বাংলা গল্পবলয়ে ভিন্ন সুর বহন করে এনেছেন বিশ্বদীপ চক্রবর্তী। বাংলা গল্পের ভূগোল কীভাবে প্রসারিত হয়ে যাচ্ছে সময়ের ব্যবধানে তা জানতে পড়তে হবে বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর গল্প।



‘বাদুড় ও অন্যান্য প্রাণীরা’ (কথাসোপান, ২০১৭) গল্পটি গড়ে উঠেছে বৈঠকী ঢঙে। গল্পের প্রেক্ষাপট বিদেশ, স্থান নামের উল্লেখ নেই। তবে শীত প্রধান দেশ বা শীতের কাল। প্রবল শীতের এক রাতে কয়েকজন জীবজন্তু সম্পর্কে নিজেদের অভিজ্ঞতার কথা জানাতে জানাতে গল্প উপনীত হয়েছে অন্তিমে। ইনা পৌঁছেছে জুলিয়ার বাড়ি। শহর থেকে একটু দূরে নির্জন স্থলে জুলিয়ার বাস। নির্জন জঙ্গলে আছে নানা কীটপতঙ্গ। ইনা, জুলিয়া, আরলিন, রোসা, সিমোন ও নিশি জীবজন্তু সম্পর্কে প্রত্যেকেই নিজেদের দর্শনজাত অভিজ্ঞতার কথা শুনিয়েছে আমাদের। বাদুড় দিয়ে গল্প শুরু হয়েছে, শেষ সাপ দিয়ে। তবে রোসা ও সিমোনের অভিজ্ঞতার বৈচিত্র বেশি। রোসা বন্ধু মিগুয়েলের হাতে ট্যুরে গিয়ে যৌন হেনস্তার শিকার হতে চলেছিল। কিন্তু রক্ষা করেছে টারান্টুলাটা। সিমোনের গল্প গিরগিটি নিয়ে। সিমোন যে গিরগিটিকে ভালোবাসতো কিন্তু প্রজাপতির প্রতি আক্রমণে আর মেনে নিতে পারেনি গিরগিটিটিকে। বই দিয়ে আঘাত করে প্রজাপতিটিকে বাঁচিয়েছে। তবে গিরগিটিটির লেজ খসে গেছে। জুলিয়ার গল্পে আছে সাপ। সে সাপকে আঘাত করেনি বরং নিজেই সে ঘর ছেড়ে দিয়েছে। ব্যক্তি মানুষের জীবজন্তু সম্পর্কে বিচিত্র অভিজ্ঞতার গল্প শুনিয়েছেন লেখক আমাদের। গল্পের পরিবেশে রয়েছে এক রোমাঞ্চিত অনুভূতি। ইংরেজি সংলাপ ও অভিজ্ঞতার ঝুরি নিয়ে গল্প এগিয়ে যায়। বিদেশের জনজীবনের খানিকটা আভাস পেয়ে যাই গল্প থেকে আমরাও। বিজ্ঞান প্রযুক্তি আমাদের কত এগিয়ে দিয়েছে তা প্রতিপন্ন হয়েছে ‘খোঁজ’(বর্তমান, ২০১৪) গল্পে। তথ্য প্রযুক্তি গোটা বিশ্বকে হাতের মুঠোয় এনে দিয়েছে। দূরত্বের বিভাজন যেন এক লহমায় উড়ে যায়। এই গল্পটিতে রয়েছে কন্যার জন্য পিতা-মাতার আর্তনাদের কথা। তেমনি বিশ্বের মানুষ কীভাবে এক সরলরেখায় এসে দাঁড়াচ্ছে তা প্রতিপন্ন হয়। ভারতের জিতেন চৌধুরী, চিনের লিউ গুয়াংজিউ বা জেরী, মেলবোর্নের পল। সবাই একটি বহুজাতিক সংস্থায় চাকুরিরত। কোম্পানির কাজে গিয়েছে সাংহাই। কাজের শেষে রেস্তোরায় বসে খাওয়া ও গল্প চলছে। উঠে এসেছে তিন দেশের জনজীবনের নানা বিচ্ছিন্ন সত্য। বিদেশে সন্তান কীভাবে স্বাধীন হয়ে উঠছে সে সত্যও আছে। পলের কন্যা নিজেই সম্পর্কে জড়িয়ে গেছে। সে গল্প শুনতে শুনতে জেরীর শিশুকন্যা ও পারিবারিক প্রসঙ্গ এসেছে। জিতেনের কন্যা থাকে নিউ ইয়র্কে। চিনে যখন দুপুর নিউ ইয়র্কে তখন প্রায় মধ্যরাত। কন্যার সামান্য কণ্ঠ শুনতে পেয়েই ফোন কেটে যায়। স্ত্রী মেঘনা স্বামী জিতেনকে ফোন করে। পিতাও ফোনে যোগাযোগ করতে পারে না। শুরু হয় আত্মচিন্তা। কেননা কিছুক্ষণ আগেও রিন নাইট ক্লাবে ছিল। জেরী গুগল ম্যাপের মধ্য দিয়ে স্ট্রীট ভিউ এর কথা বলে। শুরু হয় গুগল সার্চ। সাংহাইয়ে বসেই পলের আইপ্যাডে ভেসে ওঠে নিউ ওয়ার্কের রাস্তার চিত্র। ছয়টি চোখ নিবিষ্ট হয়ে রাস্তায় কিছু ঘটেছে কিনা সেই চিত্র খুঁজতে থাকে। গল্পের বয়ানে উঠে আসে—

“ঠিক আছে। আমরা নিউ ইয়র্ক স্টেট ইউনিভার্সিটির থেকে শুরু করবো, সেভেন টোয়েন্টি ব্রডওয়ে-তারপর রাস্তা ধরে চলতে থাকব ওর কাছাকাছি যত পাব অথবা রেস্তরাঁর দিকে।

পলের যন্ত্রে নিউ ইয়র্কের রাস্তা। রাত সাড়ে বারোটার চলমান ছবি। সেই রাস্তা ধরে দেখতে দেখতে এগোল পল—যদি কিছু পাওয়া যায়, কোন গাড়ি অথবা—অস্বাভাবিক কিছু।

প্রচন্ড উত্তেজনায় জেরী জিতেনের চোখও পলের আইপ্যাডের উপর—যদি কিছু দেখা যায়। প্ল্যাটফর্মে নাচের সঙ্গে রং মুখোশের খেলার জমাট উত্তেজনা।“ (খোঁজ, যে বার পেলে এসেছিল, সোপান, প্রথম প্রকাশ ২০১৯, পৃ. ৪৫)

এমন গল্প বিশ্বদীপ চক্রবর্তী বা যারা বিদেশে থাকে তাদের পক্ষেই লেখা সম্ভব। বঙ্গপ্রদেশে থেকে বাঙালি লেখকের পক্ষে এমন গল্প লেখা সম্ভব নয়। কেননা সেই জীবনযাত্রা ও জীবনপ্রণালী থেকে আমরা বহুদূরে অবস্থান করি। তথ্য প্রযুক্তি কীভাবে এক নিঃশ্বাসে পৃথিবীর সমস্ত সত্য হাতের কাছে উপস্থিত হচ্ছে তা লেখক আমাদের দেখিয়েছেন। এইসব পরিসর বাংলা গল্পে নতুন। বাংলা গল্পের পরিসর বৃ্দ্ধির ক্ষেত্রে এইসব গল্প যে ভিন্ন ভূমিকা গ্রহণ করেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। ভারতবর্ষ তন্ত্র-মন্ত্র কুসংস্কারের বশবর্তী দেশ। বিশেষ করে বাঙালি জনজীবনে নানা কুসংস্কার, লোকাচার-লোকবিশ্বাস প্রচলিত আছে। শিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে কুসংস্কার, লোকসংস্কার ও বিশ্বাস দূর হলেও গ্রামীণ জীবনে এখনও তা বর্তমান। হস্তরেখা বিশ্বাস, কোষ্ঠী গণনাকে সামনে রেখে গড়ে উঠেছে বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর ‘বাচ্চুমামার মৃত্যুযোগ’(দেশ, ২০১৬) গল্পটি। পিতা হাত দেখে জানিয়েছিল পুত্র বাচ্চুর মৃত্যু ঘটবে উনত্রিশ বছর বয়সে। এই বিশ্বাস ও বিশ্বাসহীনতা একটি জীবনে কীভাবে ট্র্যাজেডি ডেকে এনেছিল তা এই গল্প প্রতিপন্ন হয়েছে। এক অমোঘ নিয়তি যেন বাল্যকাল থেকে বয়ে বেরিয়েছে একটি সন্তান। একদিকে পিতার হস্তরেখা বিদ্যায় বিশ্বাস, অন্যদিক পুত্রের বিশ্বাসহীনতা। এই বিশ্বাস-বিশ্বাসহীনতার দ্বন্দ্বে বাচ্চু শেষ পর্যন্ত আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। পিতার হস্তরেখা বিদ্যাকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতে তার এই আত্মবিসর্জন। গল্প শুরু হয়েছে এইভাবে—“উনত্রিশ বছর বয়সে বাচ্চুমামা মারা যাবে। সবাই জানতাম।“ এই অমোঘ নিয়তিই একটি চরিত্রের পতন ডেকে এনেছে। এই পতনের জন্য ব্যক্তিমানুষ যতটা না দায়ী, তার থেকে পরিবার বিশেষ করে পিতা দায়ী অনেকখানি। পিতা হাত দেখে এই সত্য জেনেছিল। ফলে বাচ্চুর জাহাজে চাকরি বা প্লেনের পাইলট হওয়া হয়নি। সে হয়েছে স্কুল শিক্ষক। মৃত্যুর সত্য জেনে সে নিজের প্রেমকেও বিসর্জন দিয়েছে। তবে অবশেষে বিবাহ করেছে। বাঙালি ঘরের কন্যাদায়গ্রস্ত অভাবী পিতা বিবাহ দিয়েছে। বিশ্বদীপ চক্রবর্তী গল্প বলতে বলতে গল্পের অনেকগুলি স্তর রচনা করেন। গল্পের অনেকগুলি অভিমুখ নির্দেশ করে দেন। যেখান থেকে সচেতন পাঠক ভিন্ন সত্যে পৌঁছে যেতে পারে কিংবা গল্পের বহুকৌণিক বিশ্লেষণে নিজেকে অবতীর্ণ করতে পারেন। উনত্রিশ বছর কেটে গেছে। মৃত্যুযোগ এসে উপস্থিত হয়নি। পিতা প্রচার করেছে নানা গ্রহ নক্ষত্রের যোগে, কোষ্ঠী গণনা ও প্রয়োগে সন্তানকে রক্ষা করেছেন। পিতার এই ঢপবাজ কীর্তন পুত্রের অসহ্য মনে হয়েছে। দুজনের দ্বন্দ্বে কে জয়ী যেন তা প্রতিপন্নের রণক্ষেত্র গড়ে উঠেছে—

“বাবা খুব রেগে ওঠে, মুখ সামলে কথা বল, আজ যে বেঁচে আছিস সে আমার হাতযশে, ভুলিস না বেটা। কিন্তু তাতে বাচ্চু আরও রেগে গেছিল। নমামা নীচু স্বরে বলে যাচ্ছিল। বাচ্চু তারস্বরে চেঁচাল, কে বলেছে তোমার হাত যশে? আমার কোন অসুখ হয়েছিল যে তুমি আমাকে বাঁচিয়েছ? কি প্রমাণ আছে তোমার কাছে?

সেই শুনে বুঝলি বড়দি, বাবা কাঁপতে কাঁপতে গিয়ে অত বড় ছেলেকে চড় মেরে বলেছিল, অনেক শুনেছি তোর কুবাক্য, আর নয়। মনে রাখবি তুই বেঁচে আছিস সেটাই বড় প্রমাণ।

সেই চড় খেয়ে বাচ্চু আরও জ্বলে উঠল, তাহলে আমি মরে গিয়ে প্রমাণ করব তুমি ভুল, তুমি ভণ্ড। বলে ছুটতে ছুটতে সিঁড়ি দিয়ে তিনতলার ছাদের দিকে দৌড়াল।“ (বাচ্চুমামার মৃত্যুযোগ, তদেব, পৃ. ৫৬)

শুধু কি পিতার বিরুদ্ধে অভিমান না অন্যকিছু? পিতার বুজরুকিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন তো অবশ্যই, সেই সঙ্গে জীবনের ব্যর্থতার গ্লানি কি নেই? মিথ্যা হলফনামা কীভাবে একটি জীবনস্বপ্নের সমস্ত কিছু ধ্বংস করে দিল সেই বেদনাবোধ কি নেই? বড় চাকুরি, প্রেমিকাকে না পাওয়া, খিটখিটে কন্যাকে বিবাহ করা এসব কি কোন বেদনাবোধের জন্ম দেয়নি? সবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করে বাচ্চু মৃত্যুর মধ্য দিয়ে। কুসংস্কারচ্ছন্ন সমাজজীবন ব্যক্তি মানুষকে কীভাবে আত্মগ্লানির চোরাবালিতে ডুবিয়ে দেয়, ব্যক্তি মানুষের পতন ডেকে আনে সেই সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাচ্চুর উনত্রিশ বছর অতিক্রমের পর পিতার হস্তরেখা বিদ্যার পসার বৃদ্ধি পেয়েছিল, কিন্তু মৃত্যুর পর কী হয়েছিল তা আমাদের জানা নেই। ছোটোগল্প সে অবকাশ দেয় না। খণ্ড সত্যকেই সে বৃহৎ সত্যে পৌঁছে দেয়। বিশ্বদীপ চক্রবর্তী এক্ষেত্রে যে সফল হয়েছেন তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।

‘হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা’ (বুক পকেট, ২০১৪) উচ্চবিত্তের গল্প। লোভ, রিপু, ক্ষমতা মানুষকে কোন পর্যায় থেকে কোন পর্যায়ে নিয়ে যায় তা দেখিয়েছেন লেখক। সেই সঙ্গে এই গল্প তথ্য প্রযুক্তির সর্বত্র দখলদারির কায়েমিতন্ত্রের গল্প। আজকের জগতকে দখল করেছে তথ্য প্রযুক্তি। এর নানা সুবিধা আছে, তবে অসুবিধাও আছে। দুটি দাম্পত্য জীবনের কাহিনি এই গল্প। আছে পরস্পরকে অর্থ পরাজিত করার বাসনা। উচ্চবিত্ত ব্যক্তিমানুষ নিজের অবস্থানে সুখি নয়। আরও চাই আরও চাই। অল্পতে খুশি নয় দামোদর সেটকি টাইপের। এই লোভই ব্যক্তি মানুষকে ধ্বংসের পথে নিয়ে যায়। অতনু-মণিকা, সুপ্রকাশ-সুমিতা দুটি দাম্পত্য জীবন রয়েছে গল্পের আখ্যানে। অতনু মগ্ন সুমিতায়, সুপ্রকাশ মগ্ন মণিকায়। বিদেশে এই সম্পর্ক অতি সহজ। আছে পরস্পরকে পরাজিত করার বাসনা, ঈর্ষা। সুমিতায় গয়নায় মণিকার ঈর্ষা। সুপ্রকাশের রোজগার বেশি। অতনুরা চায় সুপ্রকাশকে ছাড়িয়ে যেতে। মিলে যায়। পেয়ে যায় লাকি ড্র। ফিউচুরা গাড়ি পায় অতনু। এই গাড়ি রিমোর্টযুক্ত। ড্রাইভার ছাড়াই চলে। সংসারে আছে নিত্য কলহ। ভোগ সুখের চূড়ান্ত শীর্ষে উপনীত হতে গিয়ে নিত্য কলহ চলে স্বামী-স্ত্রীতে। একদিন ফিউচুরা গাড়িতে বেরিয়ে পড়ে অতনু-সুমিতা। সেদিনই হ্যামলিন ভাইরাস আক্রমণ করে গাড়িকে। কোম্পানির কোন অ্যান্টিভাইরাস নেই। জীবনকে শূন্যে বাজি রেখে সারিসারি ফিউচুরা গাড়ি এগিয়ে যায়। যেকোন মুহূর্তেই মৃত্যু ঘটতে পারে। ব্যক্তি মানুষের ভোগাকাঙ্ক্ষা ও লোভই এই পতনের দিকে এগিয়ে নিয়ে গেছে। গল্পের বয়ানে পাই—

“দেখতে দেখতে তাদের গাড়ি উঠল স্টেট হাইওয়ে ছাড়িয়ে ন্যাশনাল হাইওয়েতে। সেখানে তাদের গাড়ি আরও অন্য শহর থেকে আসা ফিউচুরার মিছিলে যোগ দিল। লাইন করে বিভিন্ন রঙের ফিউচুরা গাড়ির মিছিল হাইওয়ে ধরে চলছিল। কেউ জানে না কোথায় যাচ্ছে। কিসের টান। কোন গন্তব্যে। জানে হয়তো শুধু হ্যামলিন ভাইরাস।

দূরের আকাশে সূর্যাস্তের লালিমা ছড়িয়ে যাচ্ছে। এক ঝাঁক পাখি ঘরে ফিরছে, দল বেঁধে। ঠিক যেন দল বেঁধে চলা ফিউচুরা গাড়িগুলোর মত। শুধু ওরা জানে ফেরার ঠিকানা, অতনুরা জানে না।“ (হ্যামলিনের বাঁশিওয়ালা, তদেব, পৃ. ৬৮)

গল্পটি অন্তিমে এসে রূপকে পরিণত হয়। পাখিদের ঘরে ফেরার স্থান আছে, অতনু-সুমিতার নেই। অতিরিক্ত লোভই এই মর্মান্তিক সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। তবে এর জন্য কোন গ্লানি নেই। বিদেশের মানুষ তথ্য প্রযুক্তি সত্যকে মেনে নিয়েছে। প্রযুক্তিকে ব্যবহার করে পৃথিবীর সমস্ত সুখ ভোগ করেছে, দখল করতে চেয়েছে। জীবন সেখানে তুচ্ছ। জীবনে বাঁচা-মরা নিছকই এক নিমিত্ত মাত্র। ভোগাকাঙ্ক্ষাই প্রধান। আমাদের দেশের তুলনায় বিদেশে সে সত্য আরও বড় আকারে দেখা দিয়েছে। বিশ্বদীপ চক্রবর্তী সেই সত্যগুলিকেই ধরতে চেয়েছেন। আমরাও পরিচিত হয়ে যাই সেই জীবনের সঙ্গে। বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর ‘ভয়’ (সাগরী, ২০১৩) অসাধারণ গল্প। ভারতীয় জনজীবনের গল্প, ভারততীর্থের গল্প। ব্যক্তির ওপর রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাস কীভাবে নেমে আসে সেই চেতনার গল্প। রাষ্ট্রের থার্ড ডিগ্রি পুলিশ মানুষকে কীভাবে প্রতি পদে পদে অপদস্ত করে সেই বোধের গল্প। এদেশে টেররিস্ট আক্রমণ হলেই সব দোষ নেমে আসে মুসলিমদের ওপর। সংখ্যালঘু মুসলিম পশ্চিমবঙ্গে অনেকটাই যেন কোণঠাসা। টেররিস্ট আক্রমণের সমস্ত দায় যেন সে জাতির। এই প্রশ্ন যে কত ভুল তা লেখক এই গল্প প্রতিপন্ন করেছেন। সমাজের একটা বড় অংশ প্রশ্নের তীর ছুড়ে দেয় মুসলিমদের দিকে। এই সংশয়, প্রশ্নে ব্যক্তি মানুষ পরাজিত হয়। এই গল্পের দুটি স্তর, দুটি পরিচ্ছেদ। গল্পের আখ্যান ট্রেনের মধ্যে। ইমানুল্লা মাদ্রাসার শিক্ষক। ভদ্র, সচেতন মানুষ। দীর্ঘদিন বাদে প্রাক্তন ছাত্র আফজল মিঞার সঙ্গে দেখা হয়েছে। ছাত্র-শিক্ষকের যে সম্পর্ক সেদিক থেকে কিছু কথা হয়েছে। ইতিমধ্যেই দিল্লিতে ঘটেছে টেররিস্ট আক্রমণ। পুলিশ গ্রেফতার করে ইমানুল্লাকে। একটাই সন্দেহ সে কেন আফজল মিঞার সঙ্গে সেদিন গল্প করেছিল। শিক্ষক-ছাত্রের সম্পর্ককে পুলিশ দেখেছে সন্দেহের দৃষ্টিতে। এমনকি জানানো হয়েছে মাদ্রাসাগুলিই টেররিস্ট তৈরির কারখানা। ইমানুল্লার কাছ থেকে কোন তথ্য পাওয়া যায়নি। পুলিশ কর্তৃক অত্যাচারিত হয়েছে সে। দুই বছর জেল হয়েছে। এই জেলই পাল্টে দিয়েছে তার জীবনভাবনা, জীবনচেতনা। ইমানুল্লার একটাই অনুরোধ ছিল সন্তানের সামনে যেন প্রহার না করা হয়। অমানবিক পুলিশ সে অনুরোধ শোনেনি। সন্তান আজাহার মারা গেছে। দীর্ঘদিন পর ট্রেনে ইমানুল্লা ও স্ত্রী দিল্লির উদ্দেশ্যে চলেছে। ট্রেনে একই কামরায় রয়েছে অত্যাচারিত পুলিশ অফিসার সুবিমল। সুবিমল চিনতে না পারলেও ইমানুল্লা চিনতে পারেছে। আজ আর তার কোন ভয় নেই। সংগত ভাবেই প্রশ্ন তোলে—

“আজাহারের ইন্তেকামের সঙ্গেই তার শেষ হয়ে গেছে। তবে আর কিসের ভয়? কেন সালমাকে একা একা কাঁদতে ছেড়ে দেবে ইমান? মাঝখানের বার্থ থেকে নড়েচড়ে ওঠে ইমানুল্লা। দেশের শত্রু কে বানাল ওদের সার? কেন নিজের দেশটাকে দেশ বলে ভাবতে পারেনা এই নওজোয়ানেরা আর?” (ভয়, তদেব, পৃ. ৭৯)

অত্যাচারই যেন পৃথক ভাবনার জন্ম দেয়। এদেশে থাকা মুসলিমকে যেন ভাবতে দেওয়া হয় না এদেশ তারও। এদেশ রক্ষার দায়িত্ব তারও। যে ভয় ইমানুল্লা পেয়েছিল সন্তানের মৃত্যুতে তা কেটে গেছে। সব শূন্য হয়ে গেছে। ট্রেনে সুবিমলকে লক্ষ্য করে ইমানুল্লা একাধিক প্রশ্ন তোলে। সুবিমল ভেবেছিল পুত্র বুড়ুন যেন এইসব তথ্য ও সত্য থেকে দূরে থাকে। থেকেও ছিল। যখন এসব আলোচনা চলছিল তখন বুড়ুন বাথরুমে ছিল। কিন্তু দূরে থাকতে পারেনি ইমানুল্লার সন্তান আজাহার। পুলিশ যেন তার মৃত্যুর বীজ বুনে দিয়েছিল—

“অন্য কারোর হদিশ নেবার ছিল, তো আমার জিন্দেগিটা যে বরবাদ হয়ে গেল সার। আমার বেটার জিন্দেগিটাও যে আপনি নিয়ে নিলেন। ওর টেররিস্ট ট্রেনিং তো মাদ্রাসায় হয়নি স্যার, সেটা দিয়েছেন আপনি। ওর সিনায় আজ যে গুলি ঢুকেছে, সেটা তো দশ সাল আগে আপনার বন্দুক থেকেই বেরিয়েছিল না এস আই সাব?” (তদেব, পৃ. ৮০)

সংখ্যালঘু মানুষ এভাবেই অত্যাচারিত হয়। সব মুসলিম খারাপ নয় আবার সব হিন্দু ভালো নয়। প্রত্যেক জাতির মধ্যেই আছে ভালো-মন্দ। অথচ আক্রমণ হলেই মুসলিমদের ওপর দোষ চাপিয়ে দেওয়া এক রীতি হয়ে দাঁড়িয়েছে আমাদের। এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করেছে ইমানুল্লা। শান্ত ভদ্র অংকের শিক্ষকের চোখ খুলে দিয়েছে পুত্রের মৃত্যু। রাষ্ট্র, প্রশাসন সহ পুলিশের দিকে সে তীর বিদ্ধ করেছে—“বেটার সামনে আমার কি ইজ্জত রইল? দেশের, পুলিশের কি ইজ্জত রইল? ও যে টেররিস্ট হয়ে গেল সেটা কি মাদ্রাসায় করল, ওর মজব করল, না আপনি করলেন এস আই সাব?” (তদেব, পৃ.৮০) ভয়ংকর ও রুক্ষ্ম সত্যের মধ্য দিয়ে লেখক গল্পের উপসংহারে পৌঁছেছেন। শিল্পমূল্যের বিচারে এই গল্প উঁচুদরের। জনজীবনের বিচ্ছিন্নতা কীভাবে বড় হয়ে ওঠে, মানুষে মানুষে বিভেদের রেখা পুলিশ কীভাবে এঁকে দেয়, রাষ্ট্র সম্পর্কে মানুষের মনে কীভাবে বিরূপ ধারণার জন্ম হয়, সেইসব সত্য গুলি লেখক অত্যন্ত সচেতনভাবে দেখিয়েছেন। ‘বাড়ির পাশের এ টি এম’ (সুখী গৃহকোন, ২০১৫) গল্পেও তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার ঘটিয়েছেন চমৎকারভাবে। তথ্য প্রযুক্তি ধীরে ধীরে গ্রাম বাংলাতেও ছড়িয়ে পড়ছে। গ্রাম বাংলার সাধারণ মানুষের প্রথমে দ্বিধা-দ্বিধাহীনতা ও ধীরে ধীরে গ্রহণের মধ্য দিয়ে তা বিস্তার লাভ করেছে। এই গল্প যেমন তথ্য প্রযুক্তির গল্প তেমনি মাতা-পুত্রের সম্পর্কের গল্প। গল্পটি পড়তে গিয়ে বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা মনে পড়ে। বিভূতিভূষণ যে শান্ত, নীরব গ্রাম বাংলার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন এই গল্পও তেমন। শুধু সময়ের ব্যবধানে গল্পের পরিসর বৃদ্ধি পেয়েছে। পুত্র সুরেশ থাকে আরবে। সে বৃদ্ধ মাতাকে টাকা পাঠায়। কিন্তু ব্যাংক থেকে রমার টাকা তোলার সাধ্য নেই। এমনকি ব্যাংক শহরে অবস্থিত। ফলে টাকা তুলে এনে দেয় গোপাল বা নিতাই। আজ গ্রামে এ.টি.এম স্থাপিত হয়েছে। গোপাল, নিতাইদের কাজ ফুরিয়েছে। মাতা রমার একাকী সংসার। হাঁস মুরগি দিয়ে দিন কাটে। মনে সর্বদাই সন্তানের কথা অনুরণন তোলে। কিন্তু সন্তান থাকে বিদেশে। স্মৃতি রোমন্থন ছাড়া ভিন্ন পন্থা নেই। আজ মাতা-পুত্রের ব্যবধান ঘুচিয়ে দিয়েছে এ.টি.এম। এ.টি. এমের শব্দে মাতার মনে হয়েছে এ যেন সুরেশের কণ্ঠস্বর—“আজ কি আনন্দ! কান্নার স্রোত সারা শরীরে ছেয়ে আসে, আর এক হাত এ টি এমের সারা গায়ে বোলাতে থাকে রমা। ফোঁপাতে ফোঁপাতে নিজের মাথাটা রাখে মেশিনের কাঁধে। এতদিন পরে এলি বাবা, এতদিনে? নিজের মাকে এভাবে ভুলে থাকতে হয়?” (বাড়ির পাশে এ টি এম, তদেব, পৃ. ৮৫) এক শান্ত সমাহিত জীবনের ক্যানভাসে তিনি গল্পটি পরিবেশন করেছেন। বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর জীবনের বিস্তৃত পরিসরের কথা বলেছেন। বাঙালি জনজীবন থেকে ভুবনগ্রাম হয়ে বিদেশ ও তথ্য প্রযুক্তির ব্যবহার—সবেতেই তিনি সিদ্ধহস্ত। গল্প সৃজনে এক সহজাত মুন্সিয়ানা চোখে পড়ে। তিনি গল্পকে করে তোলেন নিটোল। কেন্দ্র থেকে কখনোই বিচ্যুত হয়ে যায় না তার আখ্যান।

‘ডানা’ (দুকুল, ২০১৪) গল্পের অন্তিমে শুনতে পাই—“ওড়ার অতৃপ্ত আকাঙ্ক্ষা নিয়ে গোটানো ডানা চন্দন বাসে চাপে। ব্যাঙ্গ করে রঞ্জিত স্যার বলেছিলেন মানুষের ডানা পুড়ে গেছে। তা নয়, গোটানো। হয়তো সবারই। অন্তত থাকলেও সে ডানা মেলার ক্ষমতা নেই। অগত্যা ঝড়ের অপেক্ষায় বসে থাকা।“ (ডানা, তদেব, পৃ. ৯৪) এই কয়েকটি বাক্যের মধ্যেই গল্পের সারমর্ম লুকিয়ে আছে। অন্তর্বিশ্বে মানুষ নিজেকে বড় গুটিয়ে নিয়েছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত শ্রেণি সমস্ত আকাঙ্ক্ষা বিসর্জন দিয়ে আটপ্রৌঢ় জীবনে সুখ খুঁজে নিয়েছে। পৃথিবীতে রয়েছে বিস্তৃত পরিসর। সেই পরিসরের সত্যে, পৃথিবীর রূপ সৌন্দর্যের খোঁজে মধ্যবিত্ত এগিয়ে যায় নি। এমনকি কোন মিছিল, প্রতিবাদেও অংশ নেয়নি। তবে যখন নিজের প্রয়োজন হয়েছে, নিজে যখন কোন কাজে বাধা পেয়েছে তখন এগিয়ে এসেছে। এইভাবে আমাদের গোটা সমাজ ব্যবস্থাটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। বিশ্বদীপ চক্রবর্তী খুব সূক্ষ্মভাবে ব্যক্তি মানুষের এই অন্তলীন স্বভাব ও আবিষ্কৃত চোরাবালির পথটিকে ব্যঙ্গ করেছেন। অফিসে চন্দন বসের কাছে ধিক্কার শুনেছে। বাইরে প্রবল ঝড় বৃষ্টি। চন্দনের মনে হয়েছিল সে যেন এক ডানা পেয়েছে। ডানাতে ভর দিয়েই বাড়ি পৌঁছেছে। আপাত দৃষ্টিতে পাঠকের মনে হতে পারে গল্পে অলীক বাস্তব, ফ্যান্টাসির প্রাধান্য। আসলে বাঙালির জীবনস্বপ্নের মৃত্যু ঘটেছে। অ্যাডভেঞ্চার ভুলে গেছে। পরের দিন আবার অফিসে গেছে চন্দন। আজ আর সে স্বপ্ন জাগেনি। ছাদ থেকে উড়ে চলার আকাঙ্ক্ষা নিয়েও নেমে এসেছে। এক ভয় কাজ করেছে। মধ্যবিত্ত মানুষ সর্বদা নিজেকে গুটিয়ে নেয়। তেমনি এও হতে পারে বসের কাছে ধিক্কার শুনেই বাস্তব জগত থেকে পালাতে চেয়েছিল। নিজের মুক্তি খুঁজেছিল। বিশ্বদীপ চক্রবর্তী গল্পের বাইরের পরিবেশ যেমন গড়ে তোলেন তেমনি ব্যক্তিমানুষের ভেতরের ক্ষতকেও চিহ্নিত করেন। তবে গল্প কখনোই কৃত্তিম হয়ে ওঠে না। এক সহজাত মুন্সিয়ানাতেই গল্পের উড়ান দেন।

‘যে বার পেলে এসেছিল’ (বাতায়ন, ২০১৭) অসাধারণ গল্প। অনবদ্য ক্যানভাসে লেখক গল্পটিকে পরিবেশন করেছেন। গল্পটি আসলে ছায়াপিসির জীবনের উত্থান-পতনের গল্প। জীবনের জয়-পরাজয়ের আখ্যান। পেলেই যেন ছায়াপিসির জীবন পাল্টিয়ে দিয়েছে। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে কলকাতায় পেলে এসেছিল। পেলেকে নিয়ে ছিল বাঙালির বিশেষ উন্মাদনা। এই পেলে আসার বছরটিকে সামনে রেখে ছায়াপিসি বিভিন্ন সময় পর্ব নির্ণয় করে। ছায়াপিসির চারভাইবোনের মধ্যে ছায়াপিসি পড়াশোনায় যেমন মেধাহীন তেমনি দেখতে খারাপ। বোন আলোর আগেই বিবাহ হয়ে গিয়েছিল। দেখতে খারাপ, সে কারণে ছায়াপিসিকে নানা ব্যঙ্গ শুনতে হতো। কিন্তু একটি মেয়ে আর কত নিন্দা শুনতে পারে? ছায়াপিসি আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছিল। ট্রেন লাইনে আত্মবিসর্জন দিতে চেয়েছিল। কিন্তু সেদিনই ছিল পেলের খেলা। ভাই ভেবেছিল দিদিও বুঝি পেলের খেলা দেখতে যাচ্ছে। ভাইয়ের সামনে তো আর আত্মহত্যার পথে এগিয়ে যাওয়া যায় না। ফলে খেলা দেখতেই হয়। পেলের খেলা দেখাই তার জীবনবৃত্তান্ত পাল্টিয়ে দেয়। গল্পের বয়ানে পাই—

“আমি দেখলাম অতগুলো লালমুখো সোনালী চুলের সাহেবকে ছেড়ে সবাই শুধু কৃষ্ণ নাম জপের মত পেলে পেলে করে গেল। পেলে সেদিন কেমন খেলেছিল, কী করেছিল আমি জানিও না, বুঝিওনি। শুধু এইটুকু বুঝেছিলাম যে শুধু নিজের কেরামতিতে তার চারপাশের যত তাবড় তাবড় হিরোদের মাথা ছাড়িয়ে কোথায় উঠে গেছে লোকটা। তাকে কেউ কালো-কুচ্ছিত ভাবছে না আর, উল্টে সুন্দরের সংজ্ঞাটাই যেন বদলে দিয়েছে। ভাবলাম, তাহলে আমি নই কেন? আমি কেন গুমরে মরছি, কেন খেলা শুরুর আগেই নিজেকে হারিয়ে বসে আছি? আত্মহত্যা আর করা হল না, তবে বোকা ছায়াটা মরেছিল সেদিন। আর তোদের এই ছায়াপিসির আসল জীবনটারও সেই শুরু।“ (যে বার পেলে এসেছিল, তদেব, পৃ. ১১৩)

ছায়াপিসির দিন কাটে আজ অনাথ শিশুদের পরিচর্চায়। এক অনন্ত সুখ পেয়েছে এখানে। তবে দাদা অধীর, ভাই সুধীর আত্মসুখে মগ্ন। মধ্যবিত্তের গতানুগতিক জীবন স্বপ্নে বিভোর। লেখক এখানে জীবনের বিন্যাসকে অদ্ভুত ভাবে বুনন করে চলেন। আমাদের সমাজে রয়েছে বর্ণবৈষম্য। নারী দেখতে কুৎসিত হলে আর রাস্তা নেই। এমনকি মাতাও কুৎসিত কন্যাকে বিরূপ চোখে দেখেন। কিন্তু রূপের জন্য মানুষ তো দায়ী নয়। ব্যক্তিমানুষের এখানে কোন অধিকার নেই। তবে ব্যক্তি মানুষ নিজের দক্ষতায় সমস্ত বাধাকে অতিক্রম করে যেতে পারে। যা পেলে পেরেছিল। কালোও যে জগতের আলো হতে পারে তা দেখিয়েছিল। সে সুন্দরের ধারণাটাই পাল্টে দিয়েছিল। কুৎসিত কালো হয়েও দক্ষতার গুণে পৃথিবীর সকল মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিল। ছায়াপিসির কাছে এই পেলেই রোল মডেল। পেলে দর্শনই যেন তার জীবনের সমস্ত দ্বিধা দ্বন্দ্বের অবসান ঘটিয়েছে। ফলে তিনি সমস্ত ঘটনাকেই পেলে আসার সঙ্গে মিলিয়ে দেন বা পেলে আসার সময়কে কেন্দ্র করে বিচার করতে চান। এক উচ্চকৃত আদর্শবোধ ও মূল্যবোধের ধারণা নিয়ে লেখক এই আখ্যানে প্রবেশ করেছেন। তেমনি রয়েছে সমাজের পঙ্কিল ঘুণধরা মূল্যবোধহীনতা। ভ্রষ্ট মূল্যবোধটাই প্রবল। যা ব্যক্তি মানুষকে প্রতিনিয়ত ধ্বংসের পথে এগিয়ে নিয়ে যায়। তবে সব ধ্বংস হয়ে যেতে পারে না। কেউ কেউ নতুন করে জীবনস্বপ্ন গড়ে তুলবে। যেমন তুলেছিল ছায়াপিসি। ‘সুবোধ সেনের নতুন জীবন’ (দেশ, ২০১৭) গল্পও ভ্রষ্ট মূল্যবোধের গল্প। বিবেক বর্জিত মানুষের আকাঙ্ক্ষা কোন সীমা থেকে কোন সীমায় পৌঁছে গেলে এমন চাওয়া-পাওয়া কাম্য হয়ে ওঠে তা আমাদের ভাবিত করে। তেমনি সুবোধ পেয়েছে নতুন জীবন, নতুন জীবনবোধ। পৃথিবীর সৌন্দর্য দুচোখ ভরে দেখার আনন্দ পেয়েছে। সুবোধ সেন চাকরি থেকে অবসরের পথে। লোভী স্ত্রী মহামায়া জানিয়েছে ছেলের যতদিন চাকরি না হচ্ছে ততদিন অবসর নেওয়া যাবে না। স্ত্রীর এই অন্যায় আবদার কীভাবে রক্ষা করবে সুবোধ? সারাজীবন টিটির চাকরি করে বহু অন্যায় অর্থ রোজগার করেছে। সব অর্থই স্ত্রীর হাতে এসে জমা হয়েছে। স্ত্রীর চিন্তা সংসার চলবে কেমন করে। ভিন্ন পথ খুঁজে নেয় সে। অবসর নিয়েও বাড়িতে বলে না। চাকরির জন্য যেহেতু সারাজীবন টিকিট ফ্রি, তাই পাস নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে চলে। জনজীবনের বহুরূপ প্রত্যক্ষ করে। এক নতুন জীবন যেন লাভ করে। হঠাৎই একদিন সন্তান মধুসূদনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায় গ্রামে। সে স্কুলে জয়েন করতে চলেছে। পুত্রের কাছে পিতা আজ সব সত্য জানিয়েছে। স্ত্রী চায় স্বামী এবার বিশ্রাম নিক, কিন্তু সুবোধ বলে ভিন্ন কথা—

“দুদিন বাদেই ছেলের চাকরির খবরের পুজোর মিষ্টি মুখে দিয়ে মহামায়া বলেছিল, মধুটা তো এবার চাকরিতে ঢুকে গেল, তোমার এক্সটেনশনের আর দরকার নেই। বড্ড খাটাচ্ছে ওরা তোমায় আজকাল, তার চেয়ে বাড়িতে বসো, আমার শান্তি।

ঘনঘন মাথা নাড়ল সুবোধ। তা হয় না মায়া। যখন আমার দরকার ছিল সাহেবের পায়ে ধরে এক্সটেনশন করিয়েছি। এখন লোকজন বড় কম, তাই সাহেব আমাকে আরও দু বছর এক্সটেন্ড করতে বলেছে। না করি কি করে বলতো?” (সুবোধ সেনের নতুন জীবন, তদেব, পৃ. ১২১)

সেদিন সুবোধ বিশ্রাম চেয়েছিল, স্ত্রী বাধা দিয়েছে। আজ স্ত্রী চেয়েছে কিন্তু সুবোধ অনিচ্ছুক। চাকুরি জীবনে সে শুধু অর্থই রোজগার করেছে জনজীবনের কিছুই দেখা হয়ে ওঠেনি। অবসরের পর জনজীবনের সঙ্গে সে মিশেছে, পেয়েছে তৃপ্তির স্বাদ। এই জীবন তাঁকে ভীষণভাবে আকর্ষণ করেছে। ফলে এবারও সে স্ত্রীকে ফাঁকি দিতে চায়। মধ্যবিত্ত মানুষকে জীবনে বেঁচে থাকতে নানাভাবে মিথ্যার আশ্রয় নিতে হয়। ফাঁকির নানা ফাঁদ আবিষ্কার করতে হয়। সুবোধও করেছে স্ত্রীর হাত থেকে বাঁচতে। ‘চিনিমাসি’ (দেশ, ২০১৭) গল্পের পটভূমি শিকাগো শহর। গল্পকথকের মাসি চিনিমাসি। মাতা বলেছিল আমেরিকা গিয়ে মাসির সঙ্গে দেখা করতে। মাসির দুই সন্তান ভিন্ন ভিন্ন দেশে থাকে। মাসি কলকাতা শহর থেকে আমেরিকায় পাড়ি দিয়েছে, কিন্তু আর কোথাও যায়নি। মাসি নানা রান্না করে গল্পকথককে খাইয়েছে, জীবনের নানা গল্প করেছে। আমরাও বাংলায় বসে থেকে বিদেশের জীবনের সঙ্গে পরিচিত হই। মিশিগানের পটভূমিকায় লেখা ‘ডাক’ (সাপ্তাহিক বর্তমান, ২০১৭) গল্প। হোটেল ম্যানেজমেন্ট পড়ে বহু মানুষ সেদেশে পাড়ি দিয়েছে। সেদেশেও কি অত্যাচার নেই? সেই সত্যের ওপর জোর দিয়েছেন লেখক। মিলন, সালিম, রনবীর সবাই ভারত থেকে কর্মের সন্ধানে ওদেশের অধিবাসী হয়ে গেছে। কেউ নাগরিকত্ব পেয়েছে, কেউ-বা খুব তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবে। স্বাধীন জীবনযাপন তো আছেই সেইসঙ্গে ভয়ও বিরাজ করে। যে ভয় কাজ করেছে মিলনের মধ্যে। চাকরি থাকবে কি না। তেমনি সালিম ও তার কন্যা জিনাতকে অত্যাচারিত হতে হয়েছে মুসলিম হবার জন্য। মিলনের জীবনবৃত্তান্ত দিয়ে লেখক গল্প শুরু করলেও প্রবাসী ভারতীয়দের মনোগত অবস্থার দিকে জোর দিয়েছেন। মিলন ভেবেছে দেশে পাড়ি দেবে কন্যা ওদেশে কলেজে ভর্তি হলেই। উমাকান্তর আত্মচিন্তা ডিপোর্ট করলে চলে যাবে অস্ট্রেলিয়া বা জার্মানি। হোটেলে গিয়ে মিলন আজ কাবাব বানিয়েছে। কাস্টোমার ডেকেছে। ভেবেছে এবার বুঝি চাকরিটা যাবে। কিন্তু যায়নি। বরং উল্টো হয়েছে। নিন্দার বদলে প্রশংসা জুটেছে। এক অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে সেদেশে ভারতীয়দের জীবনযাত্রা বুঝি কাটাতে হয়। সেই সত্যেরই আভাস দিয়ে যান লেখক। ‘ভালবাসার স্বাদ’ (সাপ্তাহিক বর্তমান, ২০১৮) ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডের গল্প। তবে সে ভুবনগ্রাম থেকে বাস্তবের মাটিতে পদার্পণ ঘটেছে। ভালোবেসে মিলিছে নোনাজল। ফেসবুকীয় জগতে ভালোবাসা অনেকটাই ঠুনকো হয়ে গেছে। মানুষ খুব তাড়াতাড়ি পরস্পরের কাছে আসতে পেরেছে। হৃদয়ের কথা উজাড় করে দিয়েছে। এখানে আছে প্রতিশ্রুতির গোলকধাঁধা। আমেরিকা প্রবাসী পুপু। বিবাহ বিচ্ছেদ আগেই ঘটেছে। মাতা বারবার বিবাহের কথা বললেও সে পাত্তা দেয়নি। অবশেষে ফেসবুকে সম্পর্কে জড়িয়েছে দেবেশের সঙ্গে। দেবেশ কলকাতায় থাকে। পুপু ভেবেছে না জানিয়ে এসে চমকে দেবে। কিন্তু সে নিজেই চমকে গেছে। এসে দেখে দেবেশ রিমার সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়ে আছে, এমনকি এক ঘরে তাদের অবস্থান। এই ভুবনগ্রামে মানুষ প্রতি নিয়ত প্রতারিত হয়ে চলছে। সেই সময় বহ্নিকেই লেখক চিহ্নিত করে তোলেন।

বিশ্বদীপ চক্রবর্তী গল্পভূমিতে বিদেশকে যেমন ব্যবহার করেন তেমনি স্বদেশের চিহ্নও বহন করে চলেন। দুই জগতের গল্প নির্মাণেই তিনি সিদ্ধহস্ত। সেই সঙ্গে ব্যবহার করেন প্রযুক্তির জগতকে। এই প্রযুক্তির ব্যবহার বিশ্বদীপ চক্রবর্তীর বড় শক্তি। ফলে গল্পভূমিতে পৃথক এক জীবনচিত্র গড়ে ওঠে। বিদেশে বসবাসের ফলে প্রবাসী বাঙালির জীবনযন্ত্রণা তিনি যেমন উপলব্ধি করেন তেমনি বিদেশে বাঙালির যাপনচিত্রে কীভাবে পরিবর্তন ঘটে যাচ্ছে তা নির্মাণ করেন। আবার সুদূর বিদেশ থেকে পশ্চিমবঙ্গের গ্রাম বাংলার জীবনচিত্রে উঁকি দেন। সামান্য ঘটনা নিয়েই গল্প নির্মাণ করে নেন। ঘটনার পরতে পরতে জীবনজিজ্ঞসা, কখনও অনিশ্চিত জীবন, সময়ের দ্রুততা, ব্যক্তি মানুষের আকাঙ্ক্ষা ও ভোগবাদসর্বস্ব জীবনকে তিনি এমনভাবে বুনে চলেন যা মুন্সিয়ানার দাবি করে। 

 

 

                                      

 

 

লেখক পরিচিতি
পুরুষোত্তম সিংহ
পেশা শিক্ষতা। 
সাহিত্যের গবেষক। প্রন্ধকার। পশ্চিমবঙ্গে থাকেন। 

৮টি মন্তব্য: