মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

সোমালিয়ার কথাসাহিত্যিক নুরুদ্দিন ফারাহ্'র সাক্ষাৎকার

‘আফ্রিকার অধিকাংশ লেখকই উচ্চাকাঙ্ক্ষা করতে পারেন না - আমরা নিজেদের সংর্কীণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখি’ -
অনুবাদক : মাজহার জীবন

আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিমান সোমালিয়ার উপন্যাসিক নুরুদ্দিন ফারাহ রাজনৈতিক সচেতন লেখার জন্য অধিক পরিচিত। সামরিক শাসক স্যাইয়িদ বারীর বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ায় তিনি যুবক বয়সে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। তাঁর তিন তিনটি ট্রিলজি উপন্যাসে সোমালিয়ার ইতিহাস নিবিড়ভাবে তুলে ধরেছেন।
সোমালি জীবনযাত্রায় স্বৈরশাসন, পরিবার এবং ঐতিহ্য ও ধর্মের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক ব্যবচ্ছেদ করে তা তুলে ধরেছেন উপন্যাসগুলিতে। লেখক জীবনের শুরুতে বিখ্যাত হেইনম্যান লেখক সিরিজ-এ তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়। তাঁকে আফ্রিকান দ্বিতীয় প্রজন্মের নেতৃস্থানীয় লেখক হিসেবে গণ্য করা হয়। জোহানেসবার্গ রিভিউ অব বুকস (জেআরবি) এর পক্ষে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন কবি, গবেষক ও সম্পাদক লেবোহাঙ্গ মোজাপেলো। ১০ এপ্রিল ২০২০ সালে এটি জেআরবিতে প্রকাশিত হয়। সাক্ষাতকারটি অনুবাদ করেছেন মাজহার জীবন


লেবোহাঙ্গ মোজাপেলো: 
আপনার উপন্যাস From a Crooked Rib প্রকাশের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে নাইরোবির চেচে বুকশপে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে আমি অংশগ্রহণ করেছি। অভিনন্দন আপনাকে। এর আগে বলেছেন এ উপন্যাসটি লেখার সময় ভারতে আপনি ছাত্র ছিলেন। উপন্যাসটি লেখার কারণে আপনি কি সোমালিয়ার সরকারের বিরূপ মনোভাবের সম্মুুখীন হয়েছিলেন?


নুরুদ্দিন ফারাহ:
যখন আমি দ্বিতীয় উপন্যাস A Naked Needle লিখি তখন সমস্যায় পড়েছিলাম। আর যখন Sweet and Sour Milk প্রকাশ করি তখন আরো বেশি সমস্যা- সত্যিকার অর্থে ভয়ঙ্কর সমস্যায় পড়েছিলাম। আমি যদি কখনো সোমালিয়ায় ফিরি তাহলে আমাকে মেরে ফেলা হবে এমন হুমকি দেয়া হয়। তাই আমি দেশে না ফেরার সিদ্ধান্ত নিই। সেটা ছিল ১৯৭৬ সাল। যেকারণে ১৯৯৬ সালের আগে আমার আর ফেরা হয়নি। আমি দুনিয়াব্যাপি ঘুরে বেড়িয়েছি আর পুরো দুনিয়াকেই আমার ছোট্ট গ্রাম ভেবেছি। আমার ধারণা দূরে থাকার কারণেই আমি হয়ত সোমালিয়া সম্পর্কে ভালোো লিখতে পেরেছি। 


লেবোহাঙ্গ মোজাপেলো: 
কিভাবে?

নুরুদ্দিন ফারাহ:
আপনার সামনে যখন কিছু ঘটে তখন আপনাকে অনেক কিছুই আত্মস্থ করে নিতে হয়। তখন আপনার আবেগ থাকে জীবন্ত। আপনি যদি মোগাদিসুতে বাস করেন আর আপনার ঘনিষ্ঠ বন্ধু যদি আটক হয়, তাহলে আপনি নিজের সম্পর্কে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়বেন। এমনিকি যদি নিজের সম্পর্কে উদ্বিগ্ন নাও হন, তবে আপনার মা, বাবা, স্ত্রী - যদি তাদের কেউ আপনার থাকে - তাদের নিয়ে দুশ্চিন্তা করবেন। ফলে সবকিছুর সাথে আবেগ জড়িয়ে পড়ে। আপনি নিরাপদ বোধ করছেন এমন একটা দেশে বাস করলেও, আর সোমালিয়ার সাথে তার বিস্তর দূরত্ব থাকলেও, সেখানেও আপনি মুক্তভাবে ভাবতে পারবেন না - অথচ সেটা আপনার পারার কথা। 


লেবোহাঙ্গ মোজাপেলো: 
আপনি বলেছেন সোমালিয়া থেকে দূরে থাকার কারণে আপনি বেশ কিছু বিষয়ে পরিষ্কার হতে পেরেছেন। কিন্তু সেটা তো ১৯৭৬ সালের ব্যাপার। কিন্তু কিছু সময় পার হওয়ার পর আপনার দেশের সাথে দূরত্ব তৈরি হয়েছে - এমনটি কি আপনার মনে হয়েছে?

নুরুদ্দিন ফারাহ:
এটা ঠিক না। কারণ আমি আফ্রিকাতেই ছিলাম। সোমালিয়ার মতো অন্যান্য দেশেও [আফ্রিকার] একই ধরনের ঘটনা ঘটছিল। আমার মনে আছে ১৯৮৩ সালে জিম্বাবুয়ে গিয়েছিলাম। সেখানে আমি প্রেসের নেতিবাচক খপ্পরে পড়েছিলাম কারণ সেখানে আমার কিছু স্হানীয় লেখক সহকর্মীকে বলেছিলাম দেশটা একনায়কতন্ত্রের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। চেঞ্জেরাই হোভ সহ কয়েকজন লেখক আমাকে তিরস্কার করেছিলেন। তিনি আমাকে একজন অসন্তুষ্ট লেখক বলেছিলেন। আর তাই আমি নাকি অসুখী। আর একারণেই আমি জিম্বাবুয়ের লেখকদের মাঝে অসন্তুষ্টি ছড়াচ্ছি, কারণ প্রেসিডেন্ট মুগাবে তাদের দেশের একজন মহান ব্যক্তি। যখন কোন বাস্তবতাই ছিল না তখন নাকি আমি এই কল্পকাহিনি বানিয়েছিলাম। আর এভাবেই আমার ষ্পষ্টবাদিতার কারণে আমি সোমালিয়ায় শত্রু বানিয়েছি আর অন্যান্য দেশ থেকেও বহিস্কৃত হয়েছি।


লেবোহাঙ্গ মোজাপেলো: 
তাহলে তো দেখা যাচ্ছে একনায়কতন্ত্র নিয়ে আপনার লেখালেখি কেবল সোমালিয়াতেই সীমাবদ্ধ নয়? আপনি কি অন্যান্য জায়গাতেও তা প্রত্যক্ষ করেছেন আর এ বিষয়ে সোচ্চারও হয়েছেন?

নুরুদ্দিন ফারাহ:
একনায়কতন্ত্রের উপর অধ্যয়ন, লেখালেখি এবং তার বিশ্লেষণের জন্য আপনার এক ধরনের সাহসকিতা অথবা পাগলামো থাকা জরুরি। আমি এমন কোন লেখককে জানি না যিনি তার দেশের ইতিহাস নিরলসভাবে চর্চা করেছেন। অন্যভাবে বলা যায়, কেউ যদি আমার লেখা বই একের পর এক পড়ে যায়, তাহলে তিনি দেখবেন আমার প্রতিটি বই সোমালিয়ার প্রধান প্রধান ঐতিহাসিক ঘটনাবলীর সাথে সম্পৃক্ত। 

আমাকে গাম্বিয়া থেকেও বের করে দেয়া হয়েছে কারণ আমি সাহসের সাথে বলেছিলাম যে,তৎকালিন প্রেসিডেন্ট তার জনগণের দিকে নজর দেয়া থেকে গল্ফ খেলাতে বেশি আগ্রহী। ১৯৯১ সালে উগান্ডায় সে দেশের রাষ্ট্রপ্রধান (ইয়োভেরি) মুসেভেনির সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েছিলাম। সে সময় তিনি দেশের বাইরে ছিলেন। দেশে ফিরে এক প্রেস কনফারেন্সে বলেন, “ফারাহ নামে এক ব্যক্তি আছে, অধ্যাপক ফারাহ। তিনি একজন অতিথি। তিনি তার নিজের ভালো বোঝেন না। আর তিনি যদি তার নিজের ভালো নাই বোঝেন তবে আমরা তাকে তা বুঝিয়ে দেবো।” 

অবশ্য এর পর আমি তেমন কিছু করিনি। কারণ আমাকে অনেক দেশ থেকে বের করে দেয়া হয়েছিল। এখন আমি বুড়ো দাদুর মতো আচরণ করি: আমার স্বাস্থের দিকে নজর দিই, আমার কাজ করি। নতুনরা আমার দায়িত্ব পালন করুক এখন। 


লেবোহাঙ্গ মোজাপেলো:
From a Crooked Rib বইটির একটি দিক বারবার আলোচনায় আসে, যেমনটি পঞ্চাশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠানেও কয়েকবার উঠে এসেছে বিষয়টি, যে এটি একটি ফেমিনিস্ট বই। যখন আফ্রিকার অধিকাংশ পুরুষ লেখক অবিচ্ছিন্নভাবে পুরুষকে প্রধান করে লিখেছে তখন আপনি আফ্রিকার বালিকা/যুবতী আর নারীদের প্রাধান্য দিয়ে লিখেছেন। বই কি ফেমিনিস্ট হতে পারে?

নুরুদ্দিন ফারাহ: 
আমার বইকে আমি কখনই ফেমিনিস্ট বই বলি না। আমি শুধু এটুকুই বলতে পারি যে, সমাজ আমার মায়ের সাথে কেমন আচরণ করেছে, সমাজ আমার বোনের সাথে কেমন আচরণ করেছে - এ বিষয়ে আমার যথেষ্ট অভিজ্ঞতা আছে। পুরুষ হিসেবে আমরা নানা সুযোগসুবিধা পেয়েছি, আর সেখানে নারীরা কোন ধরনের বিনোদনেরই সুযোগ পায়নি। কীভাবে আমার পিঠাপিঠি বোনটিকে রান্নাঘরে পাঠিয়ে দেয়া হয়েছে । আবার ঠিক বোনটির পরের ভাইটিকে দেরি না করে স্কুলে পাঠানো হয়েছে। বোনের শিক্ষার জন্য আমার অর্থ ব্যয় করা উচিত কি না তা নিয়ে কীভাবে আমি আর আমার বাবা গণ্ডগোল করেছি। কারণ বাবা বলতেন, একটা মেয়ের জন্য অর্থ ব্যয়ের বদলে তা আমাকে দাও। এখন কথা হলো, আমি তা করিনি কারণ ফেমিনিস্ট ছিলাম বলে না বরং যা ন্যায্য তা ন্যায্য বলেই করেছি। আর যা ন্যায্য তা ন্যায্যই বলে মানেন বলে কি আপনি একজন ফেমিনিস্ট ? আপনার বরং অন্যকে জিজ্ঞাসা করা উচিত।


লেবোহাঙ্গ মোজাপেলো:
আপনার উপন্যাসগুলোর মধ্যে আমার প্রিয় Sardines আর প্রিয় চরিত্র হলো মদিনা। এই বইটিতে অন্যান্য বইয়ের তুলনায় সরাসরি ফেমিনিজম সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে। মেয়েকে লালনপালনে সে খুব আত্মপ্রত্যয়ী আর ফেমিনিজম অনুশীলন করেই সে টিকে থাকে। যদিও মনে হয়, তার আদর্শ চর্চা জেনারেলের (সাইয়্যিদ বারীর সাথে সাজুয্য) মতো। আপনি দুজনকে একে অপরকে সমান কাতারে দাঁড় করিয়েছেন যারা শেষ পর্যন্ত দাবা খেলা শেষে তাদের আদর্শকেই আকঁড়ে ধরে তার পরিণতি চিন্তা না করেই ।

নুরুদ্দিন ফারাহ: 
দেখুন, আমি বরং সারসংক্ষেপে এটুকু বলতে পারি সাধারণভাবে আমি আমার কোন টেক্সটের যৌক্তিকতা প্রমাণের চেষ্টা করি না। কারণ টেক্সট নিজেই তার কথা বলে। তবে এই মাত্র যে কথাটি বললেন সেটা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। কারণ উপন্যাসটিতে জেনারেলের সামান্যতম বক্তব্যও নেই বরং মদিনার বক্তব্যে শক্তি আছে। জেনারেল যা করেন তা হলো তিনি অন্যান্য চরিত্রের ব্যাপারে বাধা সৃষ্টি করেন যারা পক্ষে কথা বলে তারা অঙ্গিকার করে যে, তারা জেনারেলের প্রতি তাদের বিবেকের চেয়ে বেশি আনুগত। দেখুন মদিনার শাশুড়ি ঐতিহ্য বিষয়ে সব ধারণার প্রতিনিধিত্ব করে এবং তিনি মদিনার কন্যার খতনা করাতে চান যা মদিনা প্রত্যাখ্যান করে। এটাকে কি একনায়কতন্ত্রের সাথে তুলনা করা যায়? পিতৃতন্ত্রের অনুপস্থিতিতে মাতৃতন্ত্র জেঁকে বসে আর তখন তিনি ঐতিহ্য বহনকারী নির্যাতনমূলক ব্যবস্থারই প্রতিনিধিত্ব করেন। আর আমি আপনাকে বলি পুরো সোমালী পরিবার পদ্ধতি কর্তৃত্ববাদী। আর তাই সাধারণ নিয়মানুযায়ী সোমালীরা এবং তাদের পরিবার কর্তৃত্ববাদী। আপনি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাবেন, আপনাকে বের করে দেয়া হবে, সমাজচ্যুত করা হবে আপনার বিশ্বাস থেকে, আপনার পরিবার থেকে যদি আপনি আপনার পা দুটো আপনার নিজস্ব গোষ্ঠী, পরিবার আর বিশ্বাস থেকে বিচ্যুত করেন।


লেবোহাঙ্গ মোজাপেলো: 
তাহলে আপনার কথা মতো পরিবার আর রাষ্ট্র একে অপরের আয়না। রাষ্ট্রের অস্তিত্বেই কর্তৃত্ববাদী পুরুষতান্ত্রিক পরিবার টিকিয়ে রাখে। আর পুরুষতান্ত্রিক পরিবার একনায়কোচিত রাষ্ট্র টিকিয়ে রাখে।

নুরুদ্দিন ফারাহ: 
একদম ঠিক। দেখুন আমি যখন Sweet and Sour Milk লিখলাম, আমাকে না পেয়ে স্যাইয়িদ বারী কি করলেন? তিনি আমার বাবাকে ডেকে পাঠালেন। তিনি আমার বাবাকে বললেন, “ও আপনার খতনা না করা ছেলে (এর চেয়ে খারাপ শব্দ ছিল সেগুলো)। তার সাথে সোমালিয়া বিষয়ে আলাপ করি এমন কোন প্লাটফর্ম নাই। আপনার যতটা অর্থ লাগে আমি দেবো, আপনি আপনার ছেলের সাথে কথা বলুন।” যখন আমার বাবা আমাকে সংবাদটি পাঠালেন আমি তাকে জানালাম, “আমাকে আপনার কিছুই বলার নাই।” এখন বলুন আমি কি পিতৃতন্ত্রের সাথে সংগ্রাম করেছিলাম? আমি ঠিক জানি না। কিন্ত আমি জানতাম আমি আমার চিন্তার বাধা সৃষ্টির বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলাম। এই বাধা সৃষ্টির বিরুদ্ধে সংগ্রামকে তখন ‘পিতৃতন্ত্র’ আখ্যা দেয়া হয়নি। তখন শুধু জানতাম এর শারীরিক আর আদর্শগত বাস্তবতা এবং তাই আমাকে এ দুটোর বিরুদ্ধেই সংগ্রাম করতে হয়েছে। আমার বাবার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়েছে যিনি স্বৈরশাসনের প্রতিনিধিত্ব করেন আর এভাবেই পিতৃতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র আর কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে হয়েছে।

লেবোহাঙ্গ মোজাপেলো: 
একইভাবে Sardines এ যখন এক যুবতী অপহৃত হয় এবং জোর করে তার খতনা দেয়া হয় যা তার বাবার কাছে একটা বার্তা - একটা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য হাসিলের জন্য নারীর শরীরে একান্ত ব্যক্তিগত এবং অন্তরঙ্গ অপরাধ সংগঠিত করা হয়। এটা একদিক থেকে অত্যাচারের জেন্ডার রূপ।

নুরুদ্দিন ফারাহ: 
Variations on the theme of an African Dictatorship ট্রিলজিতে Sweet and Sour Milk, Sardines এবং Close Sesame তিনটি উপন্যাসই শারীরবৃত্তিক। ব্যাপার হলো কেউ মানুষের মনের উপর অত্যাচার করতে পারে না, তাই তখন সে শারীরিক নির্যাতন করে। তারা কন্যা শিশুদের অপহরণ করে এবং তাদের উপর ভয়ঙ্কর সব নির্যাতন চালায় এই ভেবে যে, সেই বিশেষ ব্যক্তি কর্তৃপক্ষের কাছে দাসানুদাস হয়ে যাবে। এটাই হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

আমি আপনাকে এটুকু বলতে পারি, আমি প্রায়শই ট্রিলজি লিখি। এর প্রথম অংশে থাকে পুরুষালী মানসিকতাসম্পন্ন এক পুরুষ। দ্বিতীয় অংশে সাধারণভাবে থাকে নারী চরিত্র আর তৃতীয় অংশ কোন সুনির্দিষ্ট বিষয় থাকে না। যদিও

Maps Gifts এবং Secrets এ এর অদলবদল হয়েছে [যদিও] এর কেন্দ্রীয় সচেতনতা নারী না পুরুষ তা পরিস্কার না। আর এই সব বিষয়গুলোর কারণে আমার ট্রিলজি লেখা সহজ হয়।


লেবোহাঙ্গ মোজাপেলো: 
বর্ষপুর্তির অনুষ্ঠানে ভাষা প্রসঙ্গে একটা প্রশ্ন এসেছিল আপনি সোমালী ভাষার পরিবর্তে ইংরেজি ভাষায় লিখতে পছন্দ করেছেন। এর উত্তরে আপনি ভাষা বিষয়ে নগুজি ওয়া থিয়ঙ্গ’ও -এর আইডিয়া তুলে ধরেছেন। এটি আবার আপনার কাছ থেকে শুনতে চাই।

নুরুদ্দিন ফারাহ: 
দেখুন সোমালিয়া এমন একটি দেশ যার ভাষা একটি আর কেনিয়ার ভাষা কুড়ি থেকে তিরিশটির মতো। আমার মতে আপনি যদি কেনিয়ান হন তাহলে আপনাকে এমন একটা ভাষায় লিখতে হবে, সে ভাষা যেটাই হোক না কেন, যা সকলের প্রতিনিধিত্ব করে এবং সকলে তা বুঝতে পারে। এ ধরনের কোন ভাষা নেই। তাই একটা কলোনিয়াল এলিট ভাষা বেছে নেয়া আর এথনিক কিকুয়ুর মতো একটা ভাষা বেছে নেয়ার মধ্যে কোন পার্থক্য নেই।

শেষ পর্যন্ত আমাদের মনোযোগ দিতে হবে বইয়ের বিষয়বস্তুর উপর। কোন ভাষায় লেখা সেটা নিয়ে নিজেরা সময় নষ্ট না করে, দেখতে হবে এটা প্রগতিশীল ধারণা আর আদর্শগতভাবে যুক্তিসিদ্ধ কি না। ইংরেজি এখন আমার চতুর্থ ভাষা। আমি অন্য তিন ভাষাতেও লিখতে পারতাম কিন্তু লিখিনি। কেন আমি সোমালী ভাষায় লিখিনি? সোমালী ভাষার বানান-পদ্ধতি ঠিক হওয়ার আগ থেকে আমি ইংরেজিতে লেখা শুরু করেছিলাম। আমি যখন লেখা শুরু করি সে সময়ে আপনি সোমালীতে লিখতে পারতেন না। সোমালী লিখিত ভাষায় রূপ নেয়ার আগেই আমি আমার From a Crooked Rib প্রকাশ করেছি [সোমালিয়া ১৯৭২ সালে সরকারিভাবে ল্যাটিন বর্ণমালা গ্রহণ করে]। তাহলে কখন আমার সোমালী ভাষায় লেখা শুরু করা উচিত? তাই আমি সোমালী না ইংরেজিতে লিখবো সেটা কোন প্রশ্ন না বরং আমি লিখবো কি লিখবো না এটাই প্রশ্ন?

আমি আগে যা বলেছি, আমার প্রথম উপন্যাস লেখার পর আমাকে লেখালেখির ক্ষেত্রে সমস্যার মধ্যে দিয়ে যেতে হয়েছে। সে সময় আমি সোমালীতে লিখতে পারিনি কারণ সোমালিয়ায় তখন আমি একজন পরিচিত ব্যক্তি - আমার নাম কোন পত্রিকায় লেখা যেতো না এবং আমার কোন বক্তব্য সোমালিয়ার কোন পত্রিকায় উদ্ধৃত করা যেতো না। তাই ইংরেজি ছাড়া অন্য কোন ভাষায় আমার লেখা চালিয়ে যাওয়া ভিন্ন কোন সুযোগই ছিল না।



লেবোহাঙ্গ মোজাপেলো: 
কিকুয়ু কেনিয়াতে অভিজাত ভাষা হতে পারে বলে আপনি মনে করেন কি?

নুরুদ্দিন ফারাহ: 
না। এটা একটি এথনিক ভাষা। কিছু মানুষ মনে করে যে, তাদের একটা সাধারণ ভাষা এবং সংস্কৃতি আছে আর তাই তারা লুয়ো, কালেনজিন ও অন্যভাষাভাষীদের উপেক্ষা করে। যদি তিনি [নগুজি] সোয়াহেলিতে লিখতেন এবং সোহায়েলিকে জাতীয় ভাষা হিসেবে প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা চালাতেন, তাহলে অন্য ব্যাপার হতো। তার এই আইডিয়া হয়তোবা কার্যকর হতো। তবে আমি এ বিষয়ে বেশি জড়াতে চাই না। আপনি তো জানেন, নগুজি আমার বন্ধু!


লেবোহাঙ্গ মোজাপেলো: 
আপনি আগে বলেছেন যে, বর্তমানে আপনি এমন কোন লেখক পান না তারা তাদের দেশের ইতিহাস নিয়ে চর্চা করবে বিশেষ করে একনায়কতন্ত্র নিয়ে - যেটা আপনি করেছেন -----

নুরুদ্দিন ফারাহ: 
জিম্বাবুয়েতে দামবুদজো মারেছেরা [কবি, নাট্যকার ও উপন্যাসিক] ছিলেন। আমার ধারণা তিনি বেঁচে থাকলে স্বৈরাচার শাসন নিয়ে লিখতেন এবং তাঁর বইগুলো হতো খুবই আকর্ষণীয়। ইদানীং আমার কোন জিম্বাবুয়ের লেখকের লেখা পড়া হয়নি। তাই সেখানকার কোন কোন লেখক একনায়কতন্ত্র নিয়ে লিখছেন তা আমার জানা নেই। আফ্রিকার অধিকাংশ লেখকই উচ্চাকাঙ্ক্ষা করতে পারেন না - আমরা সংর্কীণ গণ্ডির মধ্যে আবদ্ধ রাখি নিজেদের। আর তার ফলে বিষয়টা প্রজন্মে ছাপ ফেলে। মনে হয় আমার প্রজন্ম একনায়কতন্ত্র নিয়ে আগ্রহী ছিল তা পরবর্তী প্রজন্মে আর নেই।


লেবোহাঙ্গ মোজাপেলো:  
আপনি কোন প্রজন্মের?

নুরুদ্দিন ফারাহ: 
আমার কোন বিষয়ে মহৎ কিছু নেই যা আমি তুলে ধরতে পারি। আমি নগুজি, আচেবে বা সোয়েঙ্কা প্রজন্মের উত্তরাধিকার নই। এমনকি সেনজেরাই হোব ও অন্যান্য প্রজন্মেরও উত্তরাধিকারও নই। তাই আমি নিজেই এককভাবে আমার প্রজন্ম। আমাকে অন্যদের থেকে পৃথক করেছে এটাই যে, আমি অন্যদের কাজ আমি জানি। তারা প্রায়ই ঐতিহ্য আর অবস্থান নিয়ে ভাবে। তাদের কাছে মানুষের জীবনযাপনের মাঝেই রয়েছে ঐতিহ্য। আমি এমন এক জায়গা থেকে এসেছি যেখানে আমি ঐতিহ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি। আমি এমন এক জায়গা থেকে এসেছি যেখানে আমি বলেছি বয়স্করা সবকিছুকে তালগোল পাকিয়ে ফেলেছে। আমি একজন বিপথগামী।

আরেকটি বিষয়ে আমি অন্যান্য আফ্রিকান লেখকদের থেকে আলাদা। আমার জীবনের অধিকাংশ সময় আমি নির্বাসিত জীবন কাটিয়েছি। আর অপরদিকে অধিকাংশ আফ্রিকান লেখক ইউরোপের ইতিহাস আর জাতিগত পরিচয়ের সীমাবদ্ধ সজ্ঞা ধারণ করে। তাই একজন নাইজেরিয়ান ইংরেজি ভাষায় কথা বলতে পারেন এবং জাতিগতভাবে ইরুবা হতে পারেন। অন্যদিকে আমি বহু-সংস্কৃতি আর বহু-ভাষায় ঋদ্ধ। কারণ আমি ইংরেজি এবং ইতালিয়ান কিংবা ইরেজি ও সোমালি ভাষায় কথা বলি। কারণ আমি আরবি আর ইথিওপিয়ান আমহারিকে কথা বলতে পারি। আমি অনেকগুলো বিষয় এক করে মিশ্রণ করেছি। আচিবে ইগবো ও ইংরেজি জানে আর নগুচি কিকুয়ু আর ইংরেজি জানে। আর সোয়েঙ্কা ইরুবা আর ইংরেজি জানে। আমি এসব থেকে অনেক বিষয় ধার করেছি আর সাথে সাথে আমাদের নিজস্ব সাধারণ ঐতিহ্যকেও চ্যালেঞ্জ করেছি। যার ফলে আমি ব্র্যাত্য হয়ে গেছি।

এ কারণে উত্তর আফ্রিকার ঐতিহ্যকে আমার প্রশংসা করার অন্যতম একটা কারণ এটা। কারণ এই কদিন আগ পর্যন্ত আমার কোন বই দক্ষিণ আফ্রিকার দেশগুলোতে আলোচিত হয়নি। আমার নাম ছড়িয়ে পড়ার আগ পর্যন্ত From a Crooked Rib প্রকাশের এতো বছর পরও আলোচনায় আসেনি।


লেবোহাঙ্গ মোজাপেলো: 
মজার যে এটা আপনি উল্লেখ করলেন। উইটস বিশ্ববিদ্যালয়ে [ জোহানেসবার্গ, দক্ষিণ আফ্রিকা] আফ্রিকান সাহিত্য পড়ার সুবাদে আমি কেবল স্নাতকোত্তরে ‘নুরুদ্দিন ফারাহ’ কোর্সে আপনার সাহিত্যকর্ম পড়ার সুযোগ পেয়েছি। কিন্তু অন্য লেখকদের বেলায় বিভিন্ন থিমের আওতায় একটা করে বই অধ্যয়নের সুযোগ পেয়েছি।

নুরুদ্দিন ফারাহ: 
কারণ তারা জানে না আমার সাহিত্যকর্ম নিয়ে কি করতে হবে। আপনি কি জানেন কোন বিভাগে ম্যাকারেরে বিশ্ববিদ্যালয়ে [উগান্ডা] আমার বই পড়ানো হয়? ধর্ম বিভাগে। আর পশ্চিম আফ্রিকায়? দর্শন বিভাগে। এটা একটা নীতিভ্রষ্টতা। আমার নানামুখী পরিচিতির কারণে একটা প্রশ্ন উঠে আসে কোন বিষয়ে আমি উপযুক্ত। আমার নানামুখী পরিচিতিতে তারা বিরক্ত হয়। আমি মুসলিম দার্শনিক, হিন্দু দার্শনিক, জার্মান দার্শনিকের উদ্ধৃতি দিতে পারি। এতে অধিকাংশ মানুষ অস্বস্তি বোধ করে। কারণ তাদের এসবের উৎস খুঁজে বের করতে হয়। আর তারা জানে না সে উৎস কোথায়। আফ্রিকার বেশ কয়েকটি দেশে একজন করে ব্যক্তি আছেন যিনি আমার ব্যাপার জানেন- শোনেন এবং পড়ান। এটা স্বাভাবিক না। আর যখন মানুষ আমার নাম উল্লেখ করে, তখন শ্রদ্ধার সাথেই করে, কিন্তু তাদের অনেকেই আমার লেখা সম্পর্কে তেমন কিছু জানে না।

আমি অভিযোগ করতে পারি না। বইগুলো সম্মান অর্জন করতে পেরেছে কিন্তু জনপ্রিয় হয়নি। কেউ বলতেই পারেন, “ও কি আসলেই আফ্রিকান?” এটা এ কারণে হয়েছে যে, আফ্রিকানরা দ্বৈতসত্ত্বার উত্তরাধিকার বহন করে। সহজভাবে বললে এ রকম দাঁড়ায় - আপনি যদি আফ্রিকান ট্রাডিশন বোঝেন তার মানে আপনি এর সাথে খৃস্টান বিষয়টিও বোঝেন। কারণ নগুজি এবং আচেবে খুবই সুনির্দিষ্ট ঐতিহ্যবাহী ’“ভূমিজ” আফ্রিকান সংস্কৃতি আর আইডিয়াকে ধারণ করে তাদের কাজ করেছেন। কিন্তু যখন ফারাহের প্রসঙ্গ আসবে তখন আপনাকে এর বাইরেও অনেক জানতে হবে।


জেআরবি: 
নাইরোবির উদযাপন অনুষ্ঠানে কিছু সোমালি আপনার রচিত সাহিত্যকর্মে সোমালিয়ার ধর্ম নিয়ে আপনি উপহাস করেছেন বলে অভিযোগ করেছেন। ধর্ম সম্পর্কে তাদের অভিজ্ঞতা নিয়ে আপনি সমালোচনামুখর।

নুরুদ্দিন ফারাহ: 
আমার সত্যিকার অনুভূতি হলো সোমালিয়ার মানুষ দুনিয়ার মধ্যে সব চেয়ে কম ধার্মিক। একজন সোমালী কীভাবে অন্য সোমালীর উপর ধ্বংসাত্মক হয়ে উঠে? হত্যাকাণ্ড সংগঠিত হয়, দেশের মধ্যে গণহত্যা হয়। যদি তারা ঈশ্বরেই বিশ্বাস করতো, তাদের যে রকম হওয়া উচিত সে রকম যদি হতো, তবে তারা একে অপরের উপর এরকম হত্যাযজ্ঞ চালাতে পারতো না বিশেষ করে সমগোত্রীয় মুসলমানদের উপর। তাই তারা যখন ধর্ম নিয়ে কথা বলে তাদের সততা নিয়ে আমার প্রশ্ন আছে। আসলে এটা তাদের কথার কথা যা তারা বিশ্বাস বলে চালিয়ে দেয়।

এটা আরো মজার ব্যাপার যে, আমার এ যাবতকালের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ধর্মীয় উপন্যাস হলো Close Sesame। বিশ্বাস নিয়ে প্রশ্ন তোলে যে চরিত্রগুলো মানুষ কেন কেবল তাদেরই মনে রাখে, আর যেসব চরিত্র প্রশ্ন করে না তাদের কথা ভুলে যায়?

আমার শেষ কথা হলো যদি কোন চরিত্র কিছু বলে থাকে, তবে আমি সেই ব্যক্তি না যে কথা আমি বলেছি!

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন