মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

রঞ্জনা ব্যানার্জীর দুইটি অনুগল্প

                                                                     

                                                                         
                                                                       পরিচয়


ফরাসিতে 'ডেজা ভ্যু' বলে একটা কথা আছে। কোথাও যেন পড়েছিলাম, ‘ডেজা ভ্যু’ ব্যাপারটা আসলে নিউরনের একধরনের তথ্য সংরক্ষণের বিভ্রাট। আজ এমনই কিছু ঘটলো আমার জীবনে, আর তেমনই এক 'ঘটেছে-ঘটেনি’র ধূসর খোপে আটকে গেলাম আমি।

নিউমার্কেটে গ্যাস বিলের টাকা জমা করে বাড়ি ফিরছিলাম দুপুরে। বাড়ির কাছে এসে দেখি বিশাল জ্যাম। দশ মিনিট ঠায় বসে রইলাম রিকশায়। আমার তাড়া আছে। বাথরুমের পাইপে কোথাও ঝামেলা হয়েছে। জল সরছে ধীরে। কলের মিস্ত্রিকে আসতে বলেছি। ঘুরপথ একটা আছে। কিন্তু এরইমধ্যে আরও গাড়ি জমেছে, রিকশা বার করতেও সময় লাগবে। ভাড়া মিটিয়ে আমিই নেমে গেলাম।

শর্টকাট হলেও এদিকে আসা-যাওয়া কম। কারণ এই রাস্তায় খানাখন্দে ভরা ভাঙা একটা জায়গা পেরোতে হয়---বিচ্ছিরি গন্ধ। একটু ছুটেই হাঁটছিলাম; হঠাৎ মনে হলো কেউ আমার ডাকনাম ধরে ডাকছে---'ছুট্টি'! গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো! পেছন ফিরে দেখি কেউ নেই। নির্ঘাত মনের ভুল। এই নামে আমাকে যারা ডাকতো এখন তাঁরা 'আকাশের তারা'। আমি শ্বশুর-শাশুড়ির বৌমা, ননদদের বৌদি। অদ্রীশের কাছে নামহীন 'শুনছো', 'শোনো'। দু’পা এগোতেই আবার ডাক, 'ছুট্টি'! দেখি বাঁদিকের পুরোনো দালানটার সিঁড়িতে পা মেলে বসে আছে মেয়েটা। পরনে সাদা-সবুজ পলকা-ডট ফ্রক। বললো, 'কেমন আছো?' আচ্ছা ফাজিল তো! চেহারাটা ভালো বোঝা যাচ্ছে না। সূর্য ওর পেছনে। পাশেই একটা ঝাঁকড়া গাছ। লম্বা ছায়া লুটিয়ে পড়েছে সামনে। আমি উত্তর না-দিয়ে হাঁটছিলাম। 'আরে দাঁড়াও না; এত তাড়া কিসের?' এবার আমাকে থামতে হলো। বেশ কড়া গলায় জানতে চাইলাম, 'এই মেয়ে, তুমি আমায় চেনো?' কাচের চুড়ির মতো রিনরিন করে হাসলো মেয়েটা। আবছা ছায়ায় ওর সাদা দাঁত ঝিকমিকিয়ে উঠলো

---তুমি আমায় চেনোনি? আচ্ছা তুমি কি এখনো হোম-মেকার?

---মানে?

---সেই যে তোমার বর পার্টিতে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল, 'শি ইস মাই হোম মেকার।' মনে নেই? তোমার মন খারাপ হয়েছিল। এখনো কি হোম মেইক কর?

আমি হেসে দিলাম---কেইক-পেস্ট্রির দোকানের খদ্দেরের প্রশ্ন যেন। পরক্ষণে মনে হলো, আরে এই ঘটনা ও জানলো কীভাবে? মেয়েটা বেশ গম্ভীর গলায় বললো, 'তুমি বেহুদা সময় নষ্ট করলে। বাড়ি হয় ইট-কাঠ-সিমেন্টের। ঘর অন্য জিনিস। তোমারটা বাড়িই।'

আমার মাথার দু’পাশের রগ লাফাতে থাকে। ঠিক সেই সময়ে খালি রিকশাটা উদয় হয়েছিল। রিকশায় উঠে মাথা ঘোরাতেই দেখি মেয়েটা উধাও।

ফ্ল্যাটে ঢুকেই অদ্রীশের অফিসে ফোন দিলাম। রিসেপশনিস্ট বললো, 'প্লিজ, হোল্ড অন এ মোমেন্ট মিসেস মজুমদার।' কানে কেউ গরম লোহা ঢেলে দিলো যেন! লাইন কেটে দিলাম। নাইটস্ট্যান্ডের নিচে পুরোনো অ্যালবামটায় চোখ গেল। আজকাল অ্যালবামে নয়, ছবি ভাসে ইথারে। পাতা উল্টাতেই চমকাই। পলকা-ডট জামা পরা মেয়েটা ঝিকিমিকি হাসছে! ওর হাতে শ্রেষ্ঠ বক্তার ক্রেস্ট। আহা! ও কি জানতো 'মিসেস মজুমদার' হওয়ার জন্যই বাড়ছিল ও?

ফোন বাজছে। আমার ধরতে ইচ্ছে হচ্ছে না।

আমি ছুট্টিকে দেখছি...




                                                                       বারকোশ



সকাল থেকেই যমে মানুষে টানাটানি চলছিল! দুপুরের পরেই ডাক্তার স্যালাইন খুলে দিলেন। ‘কিছুই করার নেই আর’।

বম্মাকে বসার ঘরে শোয়ানো হয়েছিল। এদিক থেকেই দেহ বার করা সহজ। কিন্তু বিকেল গিয়ে রাত ক্রমে গভীর হলো- বম্মা একইভাবে মুখ খুলে, চোখ বুজে, প্রাণ আঁকড়ে রইলেন ।

বম্মা মিমির বাবা কাকাদের জ্যাঠিমা।

মেজ জ্যাঠার ফোন পেয়েই সিদ্ধান্তটা নিয়েছিল মিমি। অলোক চেঁচাচ্ছিলো, ‘তিনি তো হুঁশেও নাই। কে এলো কে গেলো কিচ্ছু বুঝতেছেন না। শ্রাদ্ধের সময় যাও’।

সারা বাড়িতে নিস্তব্ধতা যেন ঝিঁঝিঁর পাখায় ঘুরছে। যে যার মত শুয়ে পড়েছে। বম্মাও কি ঘুমাচ্ছে? গা কাঁটা দেয় মিমির। ভালো করে দেখে। নাঃ প্রাণ আছে এখনো। হঠাৎ কে যেন বলে ‘বারকোশ’। বম্মার মাথার পাশে মেজ জ্যাঠা গীতা পাঠ করতে করতে ঝিমাচ্ছিলেন। মিমি ডাকে তাঁকে। অপ্রস্তুত জ্যাঠা মন্ত্র আওড়ান, ' নৈনং ছিন্দন্তি ,--- আর মিমির মনে পড়ে যায় সব।

সেদিন থিল দুপুরে বম্মা সিন্দুক খুলেছিলেন আর মিমির সামনে খুলে গিয়েছিল ন্যাপথালিনের গন্ধমাখা অন্য এক পৃথিবী - একটা হলদেটে গানের খাতা, তাতে অপটু হাতে লেখা, ‘মণিকুন্তলা’। দীর্ঘদিনের ভাঁজের চিহ্ন ধরে ফেঁসে যাওয়া একটা গরদের শাড়ি। আর সেই ‘বারকোশ’। বাক্সের ভেতরের প্লাস্টিকের লাল চুড়ি। তারপরেই বম্মা শুনিয়েছিলেন অদ্ভুত সেই গল্প।

রথের মেলা থেকে মণিকুন্তলার জন্যে লাল চুড়ি কিনেছিলেন মণীন্দ্রনাথ। কী খুশি বৌয়ের! শাশুড়ি বলেছিলেন ‘কাইল গুরুবার। স্নান সাইরা ঠাকুরের সামনে বইসা পরাইয়ে দিমুনে। শাঁখা, লাল চুড়ি, আর নতুন সিন্দুর মা লক্ষ্মীর অনুমতি নিয়া পরলে চির-অক্ষয় থাকে।’

পরদিন ভোরে উঠেই তড়িঘড়ি স্নান সেরেছিল বালিকা। গরদের পাটভাঙা শাড়িও পরেছিল। কিন্তু শাশুড়ি মা আটকে গেলেন। রহিম গাছী এসেছে। নারকেল গাছ সাফ হবে।

জমি নিয়ে একটা ঝামেলা মিটাতে শহরে যেতে হচ্ছিলো মণীন্দ্রনাথকে। বেরোবার সময় পেছন ফিরে দেখলেন। হাতে চুড়ি নিয়ে শাশুড়ির অপেক্ষায় বসে আছে বৌ। মাথা নাড়েন মণীন্দ্রনাথ, সিদুঁর দেয়াটা শিখলোনা বালিকা। সারা সিঁথি লেপ্টে আছে লালে।

বালিকার প্রতীক্ষা সেদিন যেন ফুরাচ্ছিল না। রহিম গাছী নারকেল পাড়ছে তো পাড়ছেই। হঠাৎ বাইরে শোরগোল, বাবুদের গাড়ি উল্টেছে। কোন বাবু? খুড়িমা ছুটলেন। শাশুড়ি্মা ছুটলেন। ছুটলো অন্যরাও।

অতঃপর হতভম্ব বালিকা সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বলার আগেই শ্মশান ঘাটে সিঁথির সকল লাল মুছে ফিরেছিল ঘরে।

ছোট মিমি জগৎসংসারের জটীলতা শেখেনি তখনো, তাই গল্পও বোঝেনি। ‘তুমারে আমি চুড়িগুলান পরায়ে দি বম্মা?’ বম্মা চোখ মুছে হেসেছিলেন, ‘চিতায় তুইলবার সুময় দিও’ ।

সিন্দুকটা এখন কাকিমার ঘরের এ্যান্টিক পিস। কিন্তু ভেতরের জিনিস? মিমির কান্নাকাটিতে মা, জ্যাঠিমা ছোটেন বসার ঘরে। ‘না এহোনো শ্বাস আছে’। মা ধমকান, ‘কাঁন্দস ক্যান’। মিমি বাচ্চাদের মত ফোঁপায়।‘বম্মার চুড়ি?’ ‘চুড়ি আমি তুইলা রাখছি। দিতাসি’।

গায়ের কম্বল সরিয়ে মিমি বম্মার হাতের ওপর রাখে চুড়িগুলো। ‘বম্মা তোমার চুড়ি’। ছোট কাকা পাশ থেকে নাড়ি দেখেন। বলেন, ‘গেসে গা!’

অবাক মিমি দেখে বম্মার মুখ বন্ধ, ঠোঁটের কোণে হাসি।




৩টি মন্তব্য:

  1. কী চমৎকার, কী হার্দিক! আর ছোট কাকা যখন বললেন "গেসে গা," মনে পড়ল আমার ছোট কাকার কথা, এভাবেই কথা বলতেন। দীপেন ভট্টাচার্য

    উত্তর দিনমুছুন
  2. দুটোই আগেও পড়েছি, তবুও আবার আগের মতোই ভালো লাগায় মন ভরল। Sutapa Barua

    উত্তর দিনমুছুন