মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

বিপ্লব বিশ্বাস : গল্পের কাছে কী চাই

 
 

জ্যা- মুক্ত তিরসম প্রশ্নটি বুমেরাং করে আমি উলটে প্রশ্ন রাখতে চাই, গল্প আমাকে / আমাদের কী দিতে পারে? প্রথমেই বলি, এ প্রসঙ্গে আমি কোনও প্রচল - অপ্রচল উদ্ধৃতি - কণ্টকিত তত্ত্বকথার অবতারণা করব না। নিজস্ব ভাবনা নিজের মতো করেই বলব। সুতরাং সরাসরি সরল প্রশ্ন, গল্পের মতো কনিষ্ঠতম এক কথাসাহিত্য - মাধ্যম আমাদের কী দিতে পারে? এই ' আমাদের ' কারা? ব্যষ্টিমানুষ আর সমষ্টিমানুষ মিলিয়ে লেখক ও পাঠকের অপ্রতিসম সমাহার। অপ্রতিসম কেন? কেননা একজন মানুষ যখন হাতে কলম তুলে শাদা কাগজকে কলঙ্কিত করে অক্ষরের আঁকিবুকি কাটেন আবার সন্নত ঢঙে নিজেকে অক্ষর - শ্রমিক বলে বিনয়ের সুবেদী আড়াল গ্রহণ করেন তখন পাঠক - মানুষ হিসাবে প্রকৃত শ্রমিকের সঙ্গে কোনও সামঞ্জস্যই থাকে না। এখন কথা হল, কতজন গতরখাটা শ্রমিক সেই অক্ষর - শ্রমিকের সৃজনসম্ভারের সঙ্গে পরিচিত হন? বা পরিচিত হলেই কি একাত্ম সৌহৃদ্য গড়ে তুলতে পারেন সেই সৃজক মানুষটির সঙ্গে? বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই পারেন না। তাই রেলের মতোই সংযুত না হয়ে বিচ্ছেদ- বিহ্বল থেকে যান তারা। মূল খেড়িরূপে এই দুইয়ের আলিঙ্গিত - মিলন তেমন সম্ভব হয় না - তা কলমচির দল যতই নিজেদের ' শ্রমিক ' হিসেবে আখ্যায়িত করে তৃপ্তিপ্রসাদ লাভ করুন না কেন। দুইয়ে মিলন অসেতুসম্ভব রয়েই যায়।

 এবার সরাসরি যদি লেখকের কথায় আসি তাহলে প্রশ্ন ওঠে, গল্প- লিখনের মাধ্যমে তিনি কী প্রত্যাশা করেন বা লাভ করেন? লেখকের প্রথম প্রত্যাশা যদি হয় পাঠকের আনুকূল্য, তার অন্তর্গত প্রত্যাশার তালিকায় ব্যক্ত - অব্যক্ত থেকে যায় সৃজনের বাণিজ্যিক প্রচার, প্রসার। সরকারি অসরকারি পুরস্কার প্রাপ্তির ফল্গু আকাঙ্ক্ষাও কি তাকে পীড়িত করে না?! করে অবশ্যই তা টলস্টয়, শশী দেশপাণ্ডে মায় মণীন্দ্র গুপ্তও এর বিরুদ্ধাচারণ করে যাই বলে থাকুন না কেন। ইদানীংকালের নানাবিধ অন্যোন্য সংবর্ধনা বা পুরস্কার আদান-প্রদানের আবিল দৃষ্টান্তসমূহ লেখকের তরফে এই লালসাকেই প্রকট করে অবধারিতভাবে।  

সুতরাং লেখকের নিজস্ব কামনা - বাসনা সৃষ্টি - ফসল হয়ে সমাজজীবনে তেমন ইতিবাচক পদক্ষেপণ করতে না পারলেও তার ব্যক্তিক ক্ষেত্রে ফলদ পরিপুষ্টি ঘটায় বা ঘটানোর সুসন্নদ্ধ প্রচেষ্টায় রত থাকে, এ কথা অনস্বীকার্য যদি আমরা চোখকান বুজে না থাকি।  

এখানেই অনেকে প্রশ্ন তোলেন, গল্পকার তথা লেখক কি সমাজকর্মী নাকি রাজনীতির সামনের সারির সৈনিক যে তাকে সমাজ- শোধন বা উন্নয়নের কাজে ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে? না, তা হয়তো সর্বদা নয়, আবার কোনও কোনও কলমচি এ সমস্ত পারক্যচেতন কর্মে সরাসরি যুক্ত থাকেন, এ তথ্যও প্রামাণিক।  

যাই হোক, গল্পকার তবে কি শুধুই কলম- চাষ করে যাবেন - সমাজ - সম্পৃত্তির বৃহত্তর স্বার্থের কথা ভুলে থাকবেন, উটপাখির ঢঙে বা নেরোর মতো! তাহলে বৃহত্তর সমাজের বুদ্ধিজীবীজন হিসাবে তার কৃত্য কী? রাষ্ট্রকৃত্য না থাকলেও সমাজকৃত্য তো থাকতেই হবে। নইলে শুধুই কলমিক চর্চা কেন?সাহিত্যকৃত্য কি শুধু একমুখী সৃজনের সংকীর্ণ স্বার্থেই? সৃজিত ফসল কি সমাজের কোনও উপকারেই লাগবে না! লাগবে, লাগাতেই হবে। হয়তো প্রত্যক্ষত নয়, পরোক্ষত তো বটেই। লেখক লাঙল হাতে মাঠে নামবেন না, নিড়ানি হাতে জমির আগাছা উপড়ে ফেলবেন না, জাল হাতে জলফসল তুলবেন না কিংবা হাতাখুন্তি নিয়ে রান্না - লড়াই করবেন না যদিও এমনতরো লেখকের উদাহরণ সাহিত্যাঙ্গনে বিরল নয়। তাহলে তিনি কী করবেন? যে গল্পকারকে মানুষের অশ্রু- হিসাব রাখতে হবে, ছোটো ছোটো অকিঞ্চিৎকর শোকতাপের হদিশ রাখতে হবে, তার ওপর কিছু সমাজকৃত্য তো আবশ্যিকভাবেই অর্শায় - বর্তায়। গল্পকার অবশ্যই অসি হাতে যুদ্ধের ময়দানে নামবেন না ; কিন্তু তার মসীকে তো স্বানুকম্প হতেই হবে। সমাজ - শোধনের কাজে তিনি হয়তো সরাসরি যুক্ত হবেন না কিন্তু সেই শোধনের প্রভবিষ্ণু মন্ত্র তো তাকে জোগাতেই হবে - নইলে গল্পকার তথা কলমবাজ কীসের সমাজ - বিবেক! তাকে তো গতাসু হয়ে থাকলে চলবে না - জাগরণের মন্ত্রে উদ্দীপ্ত করতে হবে আপামর পাঠক তথা আম- মণ্ডলকে।  

এই সূত্রেই মধ্যেমাঝে প্রশ্ন জাগে, এমন গল্প কি লেখা হয়েছে যা পড়ে কোনও রত্নাকর - পাঠক বাল্মিকী হয়ে গেছে? দাঙ্গাবিরোধী সুতীব্র, সুতীক্ষ্ণ গল্পসব পড়ে দাঙ্গাবাজরা কি দাঙ্গাস্ত্র পরিত্যাগ করেছে? শব্দ - সমুদ্রের ফিরতি ঢেউ কি কোনও ডুবন্ত বেপথুকে সহজিয়া- পথে ফিরিয়ে এনেছে?
আজকাল এমত আউলঝাউল প্রশ্নেই পীড়িত হই আমি। শুধু মনে হয়, গল্প লিখে কোন উপকারটি করলাম এ সমাজের! কোন কাজে লাগলাম ছতিচ্ছন্ন সাধারণ মানুষের! এমন অচিন্ত্য- ভাবনা আজকাল আমাকে লজ্জারুণ করে তোলে, অপাঙ্গে ঘৃণা ছিটোতে চায় লিখনাস্ত্র।  

তাই মূল প্রশ্নে ফিরে গিয়ে বলি, আমি সেই গল্পই চাই যা হাজার হাজার উইলফ্রেড আওয়েনের জন্ম দেবে, যুদ্ধক্ষেত্রে যাঁর জীবনবেদ হয়েছিল রবীন্দ্রনাথের গীতাঞ্জলি। তবেই তো সার্থক হবে অক্ষরশ্রমিকরূপ গল্পকারের চর্চার সান্দ্র প্রচেষ্টা। নইলে সকলই ব্যর্থ, ছলনা মাত্র। 

--------------

 

লেখক  পরিচিতি:

বিপ্লব বিশ্বাস

গল্পকার। প্রাবন্ধিক। অনুবাদক। শিক্ষক

রঘুনাথপুর, কলকাতায় থাকেন।

প্রকাশিত গ্রন্থ: ছয়টি, প্রকাশিতব্য: তিনটি।

 

 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন