মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

সদ্য প্রয়াত কথাসাহিত্যিক রমানাথ রায়ের সাক্ষাৎকার

 

“বাস্তবতা আর বাস্তববাদ এক নয়” 

 
হিন্দি সাহিত্য পত্রিকা হংস-এর জন্য সাক্ষাৎকারটি নিয়েছিলেন ইন্দ্রজিৎ ঘোষ

 
রমানাথ রায় (জন্ম: ১৯৪০, কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ-মৃত্যু: ১৫ মার্চ ২০২১)

লেখক পরিচিতি: শরৎচন্দ্র পরবর্তি বাংলা সাহিত্যে বাস্তববাদের প্রাবল্য রমানাথকে বীতশ্রুদ্ধ করে তোলে। তার মতে বহু ব্যবহারে বাস্তববাদ জীর্ণ হয়ে গেছে; আজকের মানুষের কথা ফুটিয়ে তুলতে তা অক্ষম; তার জন্য নতুন ভাষা, নতুন শৈলির প্রয়োজন। ফলশ্রুতি: ষাটের দশকে ‘এই দশক’ লিটল ম্যাগাজিনকে কেন্দ্র করে শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের প্রবর্তন। ক্রমে কথা সাহিত্যিক রমানাথ বাংলা সাহিত্যে এক স্বতন্ত্র স্বর হয়ে ওঠেন। ১৯৮২ সালে প্রকাশিত তার প্রথম উপন্যাস ‘ছবির সঙ্গে দেখা’ –কে বাংলা সাহিত্যের প্রথম অ্যান্টি নভেল আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে। লিটল ম্যাগাজিন ও বাণিজ্যিক, দু’ধরণের পত্রিকাতেই রমানাথ অজস্র ছোটগল্প, উপন্যাস ও সাহিত্য বিষয়ক প্রবন্ধ লিখেছেন। তাঁর লেখা হিন্দি, ইংরাজী, মারাঠি ও কন্নড় ভাষায় অনুদিত হয়েছে।
 
প্রশ্ন: গল্পে এখন যারা কাহিনী খুঁজবে তাদের গুলি করা হবে- মার্ক টোয়েনের The Adventures of Huckleberry Finn উপন্যাসের শুরুতে ছাপা নোটিসের একটা অংশ এটি (…persons attempting to find a plot in it will be shot)। ষাটের দশকে আপনার পৌরহিত্যে করা শাস্ত্রবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম স্লোগান হয়ে উঠেছিল এই লাইন। পূর্ববর্তী বাংলা সাহিত্য কীভাবে এই আন্দোলনের প্রেক্ষাপট হয়ে উঠল আমাদের একটু বলুন। সেই সঙ্গে এটাও বলুন, গল্প থেকে কাহিনী বা প্লট বাদ দেওয়া বলতে কি বোঝাতে চেয়েছেন।

উত্তর: কারণ ছাড়া কার্য হয়না। এই নিয়মকে আমরা মানতে চাইনি। অনেক কাজ আছে যাদের কারণ আমরা সব সময় খুঁজে পাওয়া পাই না। আমাদের জীবনে এমন সব অদ্ভুত অদ্ভুত ঘটনা ঘটে, যার কারণ খুঁজে পাওয়া মুশকিল। অথচ প্লট কিন্তু কার্য-কারণ নিয়েই গঠিত হয়। সেই কারণেই আমরা প্লট নির্ভর গল্প বর্জন করে ছিলাম।

এই প্রসঙ্গে ফর্স্টারের ‘Aspects of the Novel’-এর কথা বলা যেতে পারে। সেখানে তিনি একটা চমৎকার উদাহরণ দিয়ে গল্পের (story) সঙ্গে কাহিনীর (plot) পার্থক্য বুঝিয়েছেন। রাজা মারা গেল। তারপর রানী মারা গেল। এটা গল্প। রাজা মারা গেল। শোকে রাণী মারা গেল। এটা কাহিনী বা প্লট।

আর গুলি করে মারা তো মজা করে বলা। কিন্তু দুঃখের কথা পাঠক মজাটা বুঝতে পারল না। পাঠক এটাও ধরতে পারল না লাইনটার জন্য আমরা মার্ক টোয়েনের কাছে ঋণী। এই ছিল পাঠকের ও সাহিত্যের অবস্থা!

আসলে, বাংলা সাহিত্যে তারাশঙ্কর, মানিক প্রমুখ লেখকদের হাতে তথাকথিত বাস্তববাদী সাহিত্যের যে ধারা তৈরি হয়েছিল তাকে বর্জন করাই ছিল শাস্ত্রবিরোধী সাহিত্যের উদ্দেশ্য। তারাশঙ্করের লেখা ছিল অতিনাটকীয়। আর মানিক মনে করেছিলেন জীবনের কাদার মধ্যেই জীবনের বাস্তবতা রয়েছে। আমরা এর থেকে বেরোতে চেয়েছিলাম।আমরা চেয়েছিলাম বাস্তবের সঙ্গে ফ্যান্টাসি মিশিয়ে নতুন সাহিত্য রচনা করতে। যেখানে বাস্তব ও স্বপ্নের ব্যবধান মুছে যাবে। আমাদের মনে হয়েছিল, বাস্তববাদী রীতিতে আজকের মানুষের জটিলতার প্রকাশ সম্ভব নয়। তার জন্য প্রয়োজন বাস্তব ও ফ্যান্টাসি মেশান নতুন রচনারীতি। এই নতুন রচনারীতির জন্যই আমরা প্লট বর্জন করতে চেয়েছিলাম। 
 
প্রশ্ন: আপনি বাস্তববাদকে অগ্রাহ্য করেছেন। মানে আপনি কি অবাস্তব গল্প লিখতে চাইছেন? আমাদের আরও স্পষ্ট করে বলুন বাস্তববাদী রীতির কোন কোন বৈশিষ্ট আপনারা মানতে চাননি? তার সঙ্গে এটাও বলুন যে আপনি কি মনে করেন বাস্তববাদী রীতি ছাড়া অন্য কোনও রীতিতে জীবনকে ফুটিয়ে তোলা সম্ভব?

উত্তর: বাস্তবতা আর বাস্তববাদ এক নয়। আমরা বাস্তববাদের বিরুদ্ধে। বাস্তববাদ একটা ক্ষয়ে যাওয়া জীর্ণ রীতি। এই রীতির লেখকরা, যেমন- মোঁপাসো, জোলা এক ফটোগ্রাফিক রিয়ালিজমের মধ্য দিয়ে তাঁদের কাহিনী বিবৃত করেছেন। আমরা তা চাইনি। আমাদের মনে হয়েছিল, বাইরের ঘটনার মধ্য দিয়ে মানুষের জীবনকে ধরা যায় না। জোলাদের রীতিতে আজকের সময়কে ফুটিয়ে তোলা যায় না। মানুষের ভেতরের জীবনের মধ্যে প্রকৃত বাস্তবতা রয়েছে। মোঁপাসো, জোলা এরা প্রত্যেকেই বড় লেখক, কিন্তু আজকের প্রেক্ষিতে অচল।

আমরা নতুন বাস্তবতার সন্ধান করতে চেয়েছিলাম। নতুন প্রকাশরীতিতে সেই নতুন বাস্তবতার সন্ধান করতে চেয়েছিলাম।
 
প্রশ্ন: তার মানে আপনারা মনস্তাতিক লেখা লিখতে চেয়েছিলেন, যার অন্যতম উদাহরণ চেতনা প্রবাহ বা stream of consciousness?

উত্তর: Stream of consciousness-টাও একটা রীতি। যার বড় উদাহরণ জয়েসের A Portrait of the Artist as a Young Man, Ulysses বা ভার্জিনিয়া উলফের To the Lighthouse. কিন্তু আমরা সেই রীতিতে হাঁটতে চাইনি। আমরা নৈর্ব্যক্তিক ভাবে (in an objective way) লিখতে চেয়েছিলাম। যেমন, কাফকার Metamorphosis। কেউ সকালবেল উঠে পোকা হয়ে যায় না। কিন্তু এই আবসার্ড পরিস্থতি তৈরি করে কাফকা যে পারিবারিক বাস্তবতা তুলে ধরেছেন, বিশ্ব সাহিত্যে তার তুলনা নেই।

এই প্রসঙ্গে রেমো কঁনোর (Raymond Queneau) কথা বলা যেতে পারে। তিনি তার Excercise in Style বইতে একটি সামান্য অকিঞ্চিতকর ঘটনাকে নিরানব্বই ভাবে লিখেছেন। এই ঘটনা আমাদের অনুপ্রাণিত করেছিল। আমাদেরও মনে হয়েছিল, একটা গল্প অনেক ভাবে লেখা যেতে পারে। 
 
প্রশ্ন: একটি প্রবন্ধে আপনি রবীন্দ্রনাথের নাটক ‘ডাকঘর’ নিয়ে আলোচনা করেছেন। আপনি বলেছেন ‘ডাকঘর’ ও ফ্রাঞ্জ কাফকার ‘মেটামরফোসিস’ আপনাকে খুব প্রভাবিত করেছে। সেই সূত্রেই আমার পরের প্রশ্ন। প্রখ্যাত নাট্য ব্যক্তিত্য গিরিশ কারনাড রবীন্দ্রনাথকে দ্বিতীয় শ্রেণীর নাট্যকার বলেছেন। তিনি বলেছেন, বাংলা বা বাংলার বাইরে অন্য কোনও নাট্যকার রবীন্দ্রনাথের পথে হাঁটেননি। রবীন্দ্রনাথের সময়ে বা পরবর্তিকালে রবীন্দ্রনাটক সেভাবে অভিনীত হয়নি। (শম্ভু মিত্রের রবীন্দ্রনাটকের সফল মঞ্চায়ন নিয়ে উনি কোনও মন্তব্য করেননি।) নাট্যকার হিসেবে রবীন্দ্রনাথ অপ্রাসঙ্গিক, তাঁর কোন প্রভাব নেই। তার ভাষা মেকি, জীবন থেকে দূরে। এ বিষয়ে আপনি কী বলতে চান?

উত্তর: নাটক সম্পর্কে সম্যক ধারণা না থাকলেই এরকম কথা বলা যায়। গিরিশ কারনাডের মত নাট্যকারেরা মনে করেন, নাটকে কিছু বাস্তববাদী সংলাপ লিখলেই বাস্তবকে প্রকাশ করা যায়। শেক্সপিয়ার বা বেকেটের নাটকে পাত্র পাত্রীরা যে ভাষায় কথা বলে আমরা কি বাস্তবে সেই ভাষায় কথা বলি? রবীন্দ্রনাথের নাটক ইউরোপে জনপ্রিয় হয়েছে। তাঁর ‘ডাকঘর’ ইউরোপের বহু দেশে অভিনীত হয়েছে। অন্দ্রে জিঁদ (André Gide) ফরাসীতে সেই নাটক অনুবাদ করেন। অন্দ্রে জিঁদ রবীন্দ্রনাথের নাটকে সারবত্তা খুঁজে পেলেন। গিরিশ কারনাড পেলেন না।

আসলে এরা (গিরিশ কারনাডের সমমনস্করা) ঐ সোসাল রিয়ালিজমের পদ্ধতিতেই লিখে গেলেন। নতুন কোনও ভাবনা চিন্তা তাদের লেখায় দেখা গেল না। রবীন্দ্রনাথের পর বাদল সরকার। এর মাঝে বা পরে কারও নাটকে নতুন কোনও ভাবনা পাওয়া গেল না।

প্রশ্ন: ১৯৮২ সালে প্রকাশিত আপনার প্রথম উপন্যাস ‘ছবির সঙ্গে দেখা’–কে বাংলা সাহিত্যের প্রথম অ্যান্টি নভেল আখ্যা দেওয়া হয়ে থাকে। আপনি আপনার এক প্রবন্ধে বলেছেন, আপনি একটা অসমাপ্ত উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলেন। আপনি এই প্রসঙ্গে বৈষ্ণব পদাবলীরও উল্লেখ করেছিলেন। এই অ্যান্টি নভেল, অসমাপ্ত উপন্যাস বা বৈষ্ণব পদাবলী… এই ব্যাপারগুলো একটু বুঝিয়ে বলুন।

উত্তর: অ্যান্টি নভেল মানে তখন যেভাবে উপন্যাস লেখা হত সেভাবে লেখা হয়নি। তাই সমালোচকরা ওটাকে অ্যান্টি নভেল বলেছিলেন। বেকেটের উপন্যাসকেও তাই বলা হয়েছিল। যেহেতু বেকেট সমসাময়িক উপন্যাস লেখার ধারা অনুসরণ করেননি। যেমন ধরো, কোর্তাজার-এর ‘হপস্কচ’। এই উপন্যাসটাকে বহুভাবে পড়া যায়। একটা পড়ায় ১০ এর পরে হয়ত ৫৩ নম্বর অধ্যায়, অন্যটায় আবার অন্যভাবে। ধর, ৭ নং অধ্যায়ের পর ৫২ নং পড়লে। কার পর কোন অধ্যায় পড়বে তার নির্দেশ বইয়ের শুরুতে দেওয়া আছে। এর আগে এভাবে উপন্যাস লেখার কথা কেউ ভাবতে পারেননি। তাই এটা হয়ে গেল অ্যান্টি নভেল। ব্রিটিশ লেখক বি এস জনসন-এর সম্পর্কেও সমালোচকরা একই কথা বলেছিলেন। জনসন প্রকাশ রীতি নিয়ে অনেক পরীক্ষা-নীরিক্ষা করেছিলেন।

আর অসমাপ্ত উপন্যাসের উদাহরণ বেশ কিছু আছে। যে লেখা পড়ার পর মনে হয়, ঠিক শেষ হল না, গল্প আরও এগোতে পারত। রবার্ট মিউসিলের ‘দ্য ম্যান উইদাউট কোয়ালিটিজ’ বা শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’ এর বড় উদাহরণ। ‘শ্রীকান্ত’ চার খণ্ডের পরেও লেখা যেতে পারত। শরৎচন্দ্র পঞ্চম খণ্ডের কথা ভেবেওছিলেন। কিন্তু শেষ পর্যন্ত লেখা হয়ে ওঠেনি। তবে এই সমস্ত উপন্যাসগুলো বিভিন্ন কারণে সম্পূর্ণ হয়ে উঠতে পারেনি। সম্পূর্ণ না হয়ে উঠলেও কোথাও রস হানি হয়নি। আর আমি সচেতন ভাবে অসমাপ্ত উপন্যাস লিখতে চেয়েছিলাম, এটাকে একটা ফর্ম হিসেবে ভাবতে চেয়েছিলাম।

‘ছবির সঙ্গে দেখা’র শেষে নায়ক নায়িকার সঙ্গে কথা বলতে বলতে পার্কে হাঁটতে থাকে। অথচ নায়িকা সেখানে সশরীরে ছিল না। এভাবেই নায়ক ও অনুপস্থিত নায়িকার মিলন হয়। এই মিলনের ভাবনাটা আমি পেয়েছিলাম বৈষ্ণব পদাবলীর ভাব সম্মিলন পর্ব থেকে যেখানে কৃষ্ণ সশরীরে না থাকা সত্তেও রাধা কৃষ্ণের মিলন হয়। 
 
প্রশ্ন: স্যাটায়ার বা বক্রোক্তি আপনার লেখার একটা বৈশিষ্ট। আপনার কি মনে হয় না এতে লেখার সিরিয়াসনেস কমে যায়? স্যাটায়ার বা হাস্যরসাশ্রিত বা হিউমারাস লেখা কি কখনও সিরিয়াস সাহিত্য হতে পারে?

উত্তর: তোমার কথা ঠিক ধরলে পৃথিবীর বহু সাহিত্য ফেলে দিতে হয়। ‘ডন কিহোটে’ (Don Quixote) বা ‘ট্রিস্ট্রাম স্ট্যান্ডি’-কে ফেলে দিতে হয়। মার্কেজের ‘লাভ ইন দ্য টাইম অফ কোলেরা’ পড়তে পড়তে পেটে খিল ধরে যায়। তা এটা কি সাহিত্য নয়? বঙ্কিমচন্দ্রের ‘মুচিরাম গুড়ের জীবনচরিত’ বা ‘কমলাকান্তের দপ্তর’ কি সাহিত্য নয়? শরৎচন্দ্রের ‘শ্রীকান্ত’তে ব্যাঙ্গ-হাস্যরস ছড়িয়ে আছে। প্রমথ চৌধুরীর ছোটগল্প হাস্যরসে উজ্জ্বল। আর ত্রৈলোক্যনাথ ও রাজশেখর বসু? বাংলা সাহিত্যে তাদের মত হিউমারাস লেখন কজন আছে! তারা কি সাহিত্যিক নন?

সিরিয়াস লেখা হাস্যরস বর্জিত, এই ধরণের কথা সাহিত্য সম্পর্কে ভুল ধারণার থেকে জন্ম নেয়। এই ভাবনার জন্য দায়ী শরৎচন্দ্র পরবর্তি লেখকরা। সিরিয়াস সাহিত্য মানে রসকসহীন এক ধরণের বস্তু, এই কথা প্রচার করলেন তাঁরা। 
 
প্রশ্ন: আপনার সব লেখাই উত্তম পুরুষে (ফার্স্ট পার্সন) লেখা? অনেকেই মনে করেন উত্তম পুরুষে কোনও বড় লেখা লেখা যায় না। একমাত্র তৃতীয় পরুষেই তা সম্ভব। এ বিষয়ে আপনার কী বক্তব্য?

উত্তর: পৃথিবীর বহু বিখ্যাত ও মোটা উপন্যাস উত্তম পুরুষে লেখা: ডেভিড কপারফিল্ড, ট্রিস্ট্রাম স্ট্যান্ডি, নোটস ফ্রম আণ্ডারগ্রাউণ্ড, শ্রীকান্ত। তাই তোমার এই প্রশ্নটার কোনও মানে হয় না। 
 
প্রশ্ন: আপনি সরল বাক্যে ও সহজ ভাষায় লেখেন। এভাবে কি সাহিত্য গুণাণ্বিত লেখা সম্ভব? এতে লেখার ধার কমে যায় না? গভীরতা হারিয়ে যায় না? সিরিয়াস লেখা তো সিরিয়াস ভাবেই লিখতে হয়, তাই না?

উত্তর: বাংলা ভাষায় তিন ধরণের বাক্য আছে: সরল, মিশ্র ও জটিল। জটিল বাক্যের চর্চা এদেশে বহুদিন হয়েছে। সে অর্থে সরল বাক্যের চর্চা হয়নি। সরল বাক্যের প্রতি আমার প্রথম অনুরাগ তৈরি হয় ‘সহজ পাঠ’ পড়তে গিয়ে। তারপর ‘বর্ণ পরিচয়’ পড়ে আমি মুগ্ধ হই। (এই দু’টি বইই শিশুদের অক্ষর পরিচয় করিয়ে দেবার বই। ‘সহজ পাঠ’-এর ছড়া ও গদ্যগুলি লেখেন রবীন্দ্রনাথ, ছবিগুলি আঁকেন নন্দলাল বসু। ‘বর্ণ পরিচয়’-এর লেখক বিদ্যাসাগর।) এই দু’টি বইয়ের প্রতিটা খণ্ডই আমি খুব মনযোগ সহকারে পড়েছি। সরল বাক্যের ছন্দে চমৎকৃত হয়েছি। তাতে সরল বাক্য দিয়ে এমন সব ছবি আঁকা হয়েছিল যা জটিল বাক্য দিয়ে করা সম্ভব নয়।

আর পাতার পর পাতা সরল বাক্য লেখা সহজ নয়। আমি চেষ্টা করেছি সরল বাক্যেই আমার রাগ, দুঃখ, শোক, আনন্দ, একাতীত্ব প্রকাশ করতে। তাতে যদি কেউ ভাবে আমার লেখা সাহিত্য হয়েছে, ভাল। যদি ভাবে হয়নি, আমার কিছু করার নেই। আমার যেটা দেখার ছিল তা হল, আমি যা প্রকাশ করতে চাইছি তা প্রকাশ করতে পারছি কি না।

আমি দেখেছিলাম, মানুষ সরল বাক্যে কথা বলে, সরল বাক্যে ভাবে। যে বাক্যে আমি ভাবছি, কথা বলছি, সেই বাক্যে আমি লিখতে পারব না কেন। তাকে তো অযথা জটিল করে লাভ নেই।

আর এখন কজন লেখক জটিল বাক্যে লেখেন? বেকেটের কথা ধর। তার ‘মলয়’, ‘ম্যালোনের মৃত্যু’ ও ‘নামহীন’ (Molloy, Malone meurt, L’Innomabble) তো সরল বাক্যে লেখা, কিন্তু তার ভাব সরল নয়। আসল কথা হচ্ছে, ছন্দ জ্ঞান চাই। ছন্দ বোধ না থাকলে ভাল গদ্য লেখা যায় না। 
 
প্রশ্ন: শরৎচন্দ্র পরবর্তি বাংলা সাহিত্য সম্পর্কে আপনি এত বীতশ্রুদ্ধ কেন?

উত্তর: তার কারণ শরৎচন্দ্রের পরে বাংলা সাহিত্যে কোনও পরিবর্তন আসেনি। একদল গ্রাম বাংলায় মুখ থুবড়ে পড়ে রইল, আর এক দল শহরতলিতে আটকে গেল। এর বাইরে যে একটা আধুনিক শহর, সেখানে জীবনের বোধ যে বদলে যাচ্ছে সেটা কেউ ধরতেই পারল না, সেই গল্পটা নতুন ভাবে বলার চেষ্টা করল না। অথচ ঈশ্বর গুপ্ত, মধুসূদন দত্ত, রবীন্দ্রনাথ এরা একে অন্যের থেকে কত আলাদা তাদের নিজস্ব ফর্ম দ্বারা। শরৎচন্দ্রের পরে সেই ব্যাপারটা দেখা গেল না। সেই পুরনো ধ্যান ধারণা নিয়েই তারা লিখে গেল।

ইউরোপীয় সাহিত্যে কিন্তু এটা হয়নি। ওখানকার উনবিংশ শতাব্দীর থেকে বিংশ শতাব্দীর সাহিত্য কত আলাদা। আমাদের এখানে এমনটা হল না। 
 
প্রশ্ন: প্রখ্যাত লেখক ও সমালোচক প্রমথ চৌধুরির একটি প্রবন্ধ আছে ‘সাহিত্যে খেলা’। যার একটা সরল বক্তব্য হচ্ছে, সাহিত্য এক আনন্দউদ্যান। লেখক লিখতে আনন্দ পান। পাঠক পড়তে আনন্দ পান। জ্ঞান দেওয়া বা মানুষকে শিক্ষিত করা সাহিত্যের কাজ নয়। আপনি সেই মতের বহুল সমর্থনও করেছেন। এই প্রসঙ্গে জানতে চাই, আপনি কি জীবনবিমুখ? পলায়নকারী? জীবনের সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চান? লেখকের কি কোনও সামাজিক দায়িত্ব নেই?

উত্তর: সাহিত্যে সমাজের কথা উঠে আসবে, মাটির গন্ধ থাকবে, এসব বামপন্থীদের কথা। সাহিত্য সম্পর্কে এই ধারণা ভুল। শুধু কৃষকের কথাই জীবনের কথা, আর শহুরে মধ্যবিত্ত মানুষের লড়াইয়ের কথা জীবনের কথা নয়? ‘ডন কিহোটে’তে কোন সমাজ জীবনের কথা আছে? এই মাপকাঠি ধরলে কালিদাসও জীবনবিমুখ। আর সামাজিক দায়িত্ব লেখকের কেন, সকলেরই আছে। যে কোন সমাজবদ্ধ মানুষেরই সামাজিক দায়িত্ব আছে।

আর সাহিত্য এক ধরণের খেলা তো বটেই। তবে সেটা হা-ডু-ডু খেলা নয়। শব্দ নিয়ে, ভাষা নিয়ে, ফর্ম নিয়ে খেলা। জয়েসের ‘ইউলিসিস’, ‘ফিনেগান্স ওয়েক’, বা ‘ডন কিহোটে’, ‘ট্রিস্ট্রাম স্ট্যান্ডি’— সব এক একটা খেলা। এখন এই খেলা ক’জন বুঝবে সেই ভেবে তো সাহিত্য করা যায় না। বুঝলে বুঝবে, না বুঝলে না বুঝবে। উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের রসিক সবাই না, তাতে কী আর করা যাবে! 
 
প্রশ্ন: যারা লেখক হতে চান তাদের জন্য আপনি কী উপদেশ দিতে চান?

উত্তর: যারা লেখক হতে চান তাদের প্রথম কাজ হল, দেশ-বিদেশের সাহিত্য নিবিড় ভাবে পাঠ করা। দ্বিতীয় কাজ হল, লেখা। কীভাবে লিখব সেটা ভাবা। কিভাবে লিখলে আরও জীবন্ত ভাবে প্রকাশ করা যাবে সে বিষয়ে গভীরভাবে ভাবা। আর লিখতে হবে মন-প্রাণ দিয়ে। কোথায় ছাপা হবে, বই বের হবে, এসব না ভেবে শুধু লেখার জন্য লেখা। লিখতে আনন্দ পাওয়াটাই মূল কথা।
 
সাক্ষাৎকার নেওয়ার তারিখ: ২৮ জানুয়ারি, ২০২০


ইন্দ্রজিৎ ঘোষ

কবি, গদ্যকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। জন্ম নদিয়া, বেড়ে ওঠা কলকাতা, আপাতত ঠিকানা দিল্লি। বিধিবদ্ধ পড়াশোনা জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয় ফরাসি ভাষা ও সাহিত্য নিয়ে। পেশা লেখালিখি, ভিডিও তৈরি ও অনুবাদ।

৪টি মন্তব্য: