মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

দেবেশ রায়ের উপন্যাস মফস্বলি বৃত্তান্ত: অভ্যস্ত ছকের বৃত্তভাঙা জীবনের বয়ান


 - নাহার তৃণা

সাহিত্যিক সন্তোষকুমার ঘোষ তাঁর একটি লেখায় উল্লেখ করেন, "পৃথিবীর সব গল্প বলা হয়ে গেছে, এখন কীভাবে বলতে হবে সেটাই জানা প্রয়োজন।" এ ব্যক্তব্যের পক্ষে বিপক্ষে যথেষ্ট যুক্তিতর্কের অবকাশ আছে। সে প্রসঙ্গে যাচ্ছি না। তবে বলে ফেলা গল্পগুলোকেও অন্যভাবে বলবার আকাঙ্ক্ষায় কেউ কেউ কলম ধরেন বৈকি। তখন জানা কাহিনি কিংবা জানাশোনা জনপদের চেহারা নতুনভাবে ধরা দেয় আমাদের চোখে। নইলে ক্ষুধার্ত জনজীবন কিংবা নিম্নবর্গের মানুষদের নিয়ে কাহিনি কী লেখা হয়নি সেভাবে? ঢের হয়েছে। কিন্তু কারো কারো লেখনীর কারণেই যেন সেটা অজানা কাহিনির মাদকতা নিয়ে ধরা দেয়।
 
আর তিনি যদি প্রচলিত নিয়ম ভেঙে "তাঁর সৃষ্ট আখ্যানের পর্বে পর্বে আঙ্গিক নিয়ে, ভাষা ও সংলাপ নিয়ে নতুন নতুন পরিক্ষা নিরিক্ষার মাধ্যমে খুঁজতে চেষ্টা করেন উপন্যাসের নতুন ধরন" তবে সেটি পাঠকের কাছে নতুনত্বের আদর নিয়েই উপস্হিত হয়। দেবেশ রায়ের কলম আমাদের সেই নতুনত্বের সন্ধান দেয়। যে কারণে তিনি বাংলা সাহিত্যে ছকভাঙা ঔপন্যাসিক হিসেবে পরিচিত ছিলেন। তিনি তাঁর রচনায় মঙ্গলগ্রহের বাসিন্দাদের তুলে আনেননি। তাঁর উপন্যাসের চরিত্রগুলো এই পৃথিবীরই বাসিন্দা- বলা ভালো প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। যাদের হাড় ভাঙা পরিশ্রম আমাদের উদর পূর্তির নিশ্চয়তা দিলেও নিজেদের অভ্যস্ত জীবনের ছক ভেঙে সে জীবন দেখার প্রয়োজন আমরা বোধ করি না। বরং সিনেমা নাটকে প্রান্তিক মানুষদের জীবন দেখেই তৃপ্ত থাকি। কেননা দেবেশ রায়দের মতো নিবিড়ভাবে প্রান্তিক মানুষের জীবন দেখার চোখ আমাদের অনেকেরই নেই। আমাদের অনভ্যস্ত মন তাই তাঁর রচনার সাথে পরিচয়ের প্রাথমিক পর্বে খানিকটা হোঁচট খায়। তাঁর গল্পের চরিত্রগুলো এ পৃথিবীর বাসিন্দা হয়েও আমাদের কাছে কেমন অপরিচিত ঠেকে। যোজন দূরত্বে দাঁড়িয়ে মানুষগুলো আখ্যানে আখ্যানে নিজের জীবনের চালচিত্র বয়ান করে যায়- হাসে, কাঁদে। নির্মম দারিদ্রতার ঘায়ে ন্যুব্জ জীবনগুলো ‘প্যাটের ভুক’ মিটাতে কী প্রাণান্তকর চেষ্টায় যুঝে যায়। দেবেশ রায় তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে বয়ান করেন সেসব গল্প। পরিচিতের বৃত্তে থেকেও যেন সেগুলো নতুন ঠেকে..অপরিচিতের ঘেরাটোপে আটকে থাকে।

দেবেশ রায়ের অনবদ্য রচনা “মফস্বলি বৃত্তান্ত” উপন্যাসে সে জীবনকে আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। বইটি পড়ার প্রাথমিক অনুভূতিটা ছিল খানিকটা এমন- এক পৃথিবীর মানুষ অন্য পৃথিবীতে চলে গেলে যেমন হতবাক, বোকা বোকা ভাবসাব.. ক্ষণে ক্ষণে ভিন্নমাত্রার চমকে মুগ্ধতা কিংবা বিমূঢ়তা ছড়িয়ে বেড়িয়ে পড়ে। দেবেশ রায়ের এই বই পড়তে পড়তে আমার হয়েছিল সে দশা। এই লেখকের সাথে মূলত "মফস্বলি বৃত্তান্ত" দিয়েই আমার প্রথম পরিচয়, উপন্যাসে ব্যবহৃত সম্পূর্ণ নতুন একভাষা, অতি জীবন্ত সব খুঁটিনাটির বর্ণনা পাঠক হিসেবে মুগ্ধ, ব্যাকুল। প্রথম পরিচয়ের ধাক্কাটা ঠিক বলে বোঝানো আমার পক্ষে সম্ভব না। তাঁর আরেক অবিস্মরণীয় সৃষ্টি “তিস্তাপারের বৃত্তান্ত” পাঠ জীবনের বিশেষ একটি অভিজ্ঞতা বলেই মানবেন সাহিত্য ভক্ত পাঠকেরা। ”শিল্প সাহিত্য শেষ পর্যন্ত মানুষেরই সৃষ্টি। ব্যক্তিপ্রতিভাই সেখানে অপূর্ব বস্তু নির্মাণক্ষম প্রজ্ঞা দেখায়, অসম্ভব কে সম্ভব করে, মানুষের সৃষ্টিক্ষমতার অপরিমেয়তা বার বার প্রমাণ করে।” দেবেশ রায়ের “উপন্যাস নিয়ে” গ্রন্থে উল্লেখিত এই উক্তির প্রমাণ তিনি তাঁর “মফস্বলি বৃত্তান্ত”, “তিস্তাপারের বিত্তান্ত”সহ অন্যান্য আরো বইতে দারুণ ভাবে রাখতে সক্ষম হয়েছেন বলে মনে করি। “মফস্বলি বৃত্তান্ত” দিয়ে দেবেশ রায়কে খুঁজে পাওয়া। আকাঠ পাঠকের কাঁচা মনের সে অভিজ্ঞতার উচ্ছ্বাসটুকু প্রয়াত প্রিয় লেখকের প্রতি সশ্রদ্ধায় নিবেদন করছি।

ভূমিকার আনুষ্ঠানিকতা পেরিয়ে মফস্বলি বৃত্তান্তের শুরুর লাইনে চোখ রেখে নড়েচড়ে বসতে হয় পাঠককে "এই শেষ রাতটাতে সারারাতের হিমের ভারে গোয়ালের চালের তিন সনের খড়েরও রঙ বদলায়।" পাঠক বুঝে যান যে আখ্যানের বর্ণনা দেয়া শুরু করলেন লেখক, তার সাথে লেখকের রয়েছে এক নিবিড় সম্পর্ক। গরু আর মানুষকৃত(উপন্যাসের মানুষটি চ্যারকেটু) পেশাবের তুলনামূলক গভীর অভিজ্ঞতামূলক বর্ণনা ছাড়িয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে উপন্যাসের বিস্তার ঘটে, বাড়ে পাঠকের বিস্ময়। যে জীবনের বা পরিবেশের গল্পটা লেখক বলছেন সে সম্পর্কে গভীরতম পর্যবেক্ষণ না থাকলে বা মিশে যাবার আন্তরিকতা না থাকলে এতটা বাস্তবমুখী করে লিখে যাওয়া কীভাবে সম্ভব! সম্ভব এ জন্যেই যে দেবেশ রায় এ বিদ্যায় সিদ্ধহস্ত, এবং তিনি ভাবেন, "লেখকের আড়াল দরকার। নিজের অস্তিত্বকে আড়ালে রেখে তার লিখে যাওয়া দরকার। এটা একজন লেখককে লালন করতে হয়। এটা যদি লালন না করা যায়, তাহলে লেখক তার লেখা তৈরি করে তুলতে পারবেন না। সেটিকে বানোয়াট গল্প মনে হবে।" মফস্বলি বৃত্তান্তে দেবেশ রায়ের লেখক সত্তা আড়ালে থেকে চরিত্রগুলোকে দিয়ে কথা বলিয়ে নেন নিপুণ কারিগরের মতো। একবারও চরিত্র ফুঁড়ে বানোয়াট কিছু উঁকি দিচ্ছে এমনটা মনে হয় না পাঠকের। অবশ্য সেরকম ত্রুটি বিচ্যুতি আমার নিরালম্ব আকাঠ পাঠকের পক্ষে বুঝে নেয়া দুঃসাহসিক এবং অসম্ভব বটে। কাজেই এই অনুভূতির প্রকাশ ভীষণভাবে পক্ষপাতদোষে দুষ্ট, দায়ভার স্বীকার করে নিয়েই লিখছি।

"মফস্বলি বৃত্তান্ত" উপন্যাসের পটভূমি জলপাইগুড়ি জেলার এক প্রত্যন্ত গ্রাম দ্বারিকামারি। সব রকম সুবিধাপ্রাপ্ত শহরের বাইরে বাসকরা যেসব মানুষ এখনও কাদামাটি মেখে দিনের অনেকটা সময় কাটিয়ে দেয় খেতে খামারে। তাদের শরীরের ঘামে উৎপন্ন হয় আমাদের প্রতিদিনকার খাদ্য। অথচ তাদের নিজেদের খাওয়া-পরার কোনো ঠিক ঠিকানা থাকে না। আশ্বিনের শেষ কটাদিন এ অঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষের আধাপেট ভাত জুটে। "তারপর শুরু হয়, চেয়ে চিনতে আনা, ধার করা। তারপর ঘটি বাটি বিক্রি। আর তারপর মাঠেঘাটে বুনো আলু আর কচু, নালায় ডোবায় মাছ।" এই স্তরপরম্পরার শৃঙ্খলায় বুনো আলু কিংবা কচু তুলে নেবার প্রতিযোগিতা চলে ‘প্যাটত ভুক’ থাকা মানুষগুলোর মধ্যে। দেশে ভোটবাক্সের জোরে সরকার যায়-আসে; ব্যক্তিগত খাতে জমির পরিমাণ কমে-বাড়ে- ক্ষেত্র বিশেষে জমির মালিকানার হাত বদল হয়। বদলায় না শুধু কৃষকের ভাগ্য। “সোনার ফসল ফলায় যে তার দুই বেলা জোটে না আহার”। আর সেটি জোটে না বলেই চলে খাদ্য সংগ্রহের অসহ্য প্রতিযোগিতা। খেতখেতুর বউ টুলটুলি সে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার যুদ্ধে অগ্রগামী থাকতে চায় জীবনের ঝুঁকি আর মর্মান্তিক যাতনা সয়েও। নাহ্ "মফস্বলি বৃত্তান্ত" দ্বারিকামারির গোটা গ্রামবাসীর উপোস থাকার গল্প নিয়ে বিশাল ক্যানভাসের বড়সড় উপন্যাস নয়। এর পরিসর বেশ ছোটো। এক রবিবারের মধ্য রাত থেকে পরের দিন মঙ্গলবারের মধ্যরাত পর্যন্ত এ উপন্যাসের বিস্তার। রিক্ত নিঃস্ব ভাগচাষী(আধিয়ার নামে যারা ঐ অঞ্চলে পরিচিত) খেতখেতু,"স্যানং স্যানং টাইমতো খেতখেতু রায় বর্মন" তার বউ টুলটুলি, তাদের তিন সন্তান যথাক্রমে বৈশাখু, বেঙ্গু এবং খেতশ্বরী; আর ভাইপো চ্যারকেটুর অভুক্ত থাকবার যাতনা, টানাপোড়েন নিয়ে এ উপন্যাস। বলা যায় খেতখেতু এবং তার পরিবার দ্বারিকামারি গ্রামটির দুর্দশাগ্রস্ত বাকি কৃষকদের প্রতিনিধি হিসেবে এখানে উপস্হাপিত হয়েছে। গ্রামের বাকি কৃষকদের অবস্হাও তথৈবচ। ঘরের ঘটিবাটি বিক্রি করে খেতখেতু ও পরিবারের বাকি সবাই গেল রবিবার ভাত খেয়েছে শেষবার। ভাতের ফেনের নুন গুলে মঙ্গলবার পর্যন্ত খাওয়া হয়েছে। এই নিঃস্ব পরিবারের প্রত্যেকের গত তিনদিনের বাসী খিদে এবং অনির্দিষ্ট আগামী কদিনের(ধানকাটার আগ পর্যন্ত) নিশ্চিত উপবাসের যন্ত্রণা থেকে মুক্তির একমাত্র উপায় খাদ্য সংগ্রহের এক প্রাণান্তকর চেষ্টার মর্মস্পর্শী চালচিত্র নির্মোহ ভঙ্গিতে বলে গেছেন দেবেশ রায়।

উপন্যাসে, খিদে মেটাবার জন্য খাদ্য সংগ্রহের আশায় পরিবারের শিশু সন্তান খেতস্বরী ছাড়া বাকিরা যে যার মতো বেরিয়ে পড়ে। খেতশ্বরী নিতান্তই শিশু হওয়ায় শূন্য ভাতের ফেনের গ্লাসটি নিয়েই ভুলে থাকতে চায় তার পেটের খিদে। যা দেখে তার নিঃস্ব অক্ষম জন্মদাতার ইচ্ছা হয় "এক লাথি মেরে মেয়েটার পেটের থলি ফাটিয়ে দেয়, শালা দিন রাত এক গেলাশ চুষিবার ধরোছে।" এমন মর্মান্তিক মনোভাবের ধাক্কা সামাল দিতে পাঠক হয়ত পালাবার পথ খুঁজতে চাইবেন, 'দ্বিধা হও ধরণী' প্রার্থনায়। কিন্তু টুলটুলির তো পালিয়ে বাঁচার উপায় নেই। তাকে অভুক্ত তিন সন্তানের মুখে অন্তত কিছু একটা তুলে দিতেই হবে। তাই টুলটুলিকে চলে যেতে হয় বুনো আলু কচু ইত্যাদির রুদ্ধশ্বাস অনুসন্ধানে। দুই পুত্র বৈশাখু আর বেঙ্গু দিগন্তব্যাপী ধানখেতের মাঝে খাল নালায় মাছ ধরার চেষ্টায় রত হয়। খাদ্য খোঁজার কাজে অবসন্ন বেঙ্গুর খিদের যন্ত্রণা ভুলিয়ে দেবার জন্য বড়ভাই বৈশাখু নানান কল্পিত গল্প বলে প্রবোধ দিয়ে যায়। দুই ভাইয়ের এই অংশে অনুভূতিশীল পাঠকের মন ডুকরে ওঠবে সন্দেহ নেই। খুব স্বাভাবিক, মানুষের কষ্টেই মানুষের মন কাঁদে। আর ওরা তো নিতান্ত ছোট্ট দুই অভুক্ত বালক, একমুঠো ভাত যাদের সমস্ত চিন্তা জুড়ে।

অন্যদিকে খেতখেতুর জন্য খাদ্য সংগ্রহের বৃত্তান্তটি একটু বেশিই জটিল। কারণ তার শরীরে আছে মারণ ব্যাধি আলসার। হেলথ্ সেন্টারের ডাক্তারের পরামর্শ খিদে পেটে থাকা বারণ। যদি ব্যথা উঠে মুখে রক্ত আসে, কালো কালো পায়খানা হয়, তবে তার মৃত্যুর সমূহ সম্ভাবনা। যদিও ডাক্তারের কাছ থেকে খেতখেতুর জেনে নেয়া হয়নি "আলসারিয়াফাটা মরণ কেনং করি আসিবার পারে?" গেলবার, “ ঐ নাকশালিয়া কার্তিক মাসেই খেতখেতু সপরিবারে দুইবেলা ভাত খেয়েছে”। কিন্তু নকশালদের হাঙ্গামা শেষ হলে জমির মালিক বাবুটি জমি বেচে দেয়ায় তার বিপত্তি বাড়ে। বর্তমানে যা সীমাহীন, এখন সপরিবারেই খেতখেতু ‘ভুকে’র যন্ত্রণায় কাতর। আর তাই একটা প্রায় মৃত্যু পরোয়ানা হাতে নিয়ে খেতখেতু রওনা হয় পঞ্চায়েতের কাছ থেকে ফ্রি রেশন পাবার আশায়। যদিও সে জানে “ফ্রি রেশন ত সে আইনেই পাবে না, আধিয়ারকে ফ্রি রেশন দেয়ার আইন নেই।” বিত্তশালীদের জন্য যখন তখন আইন ভাঙা-গড়া কোনো ব্যাপার না হলেও; খেতখেতুর জন্য যেন সেটিই একমাত্র অন্তরায়। তা সত্ত্বেও অনাহার থেকে উদ্ধার পেতে মরিয়া সে- নইলে যে- “খেতখেতু মরেও যেতে পারে, খিদে, আলসার ফেটে, রক্তবমি করে-এত বড়, এত না-ম্বা ভোখত ত কাউক্‌ মরিবার নাগিবেই, ঘরত সগায় কী করি বাচিবার পারে, বছরত্‌ একজনক্ ত ভোখত, মরিবার নাগিবেই।”

খেতখেতু এখনি মরতে চায় না। একই সাথে ভিখিরির মতো যার-তার কাছে হাত পেতে খাদ্য সংগ্রহেও তার যথেষ্ট দ্বিধা। বরং সে ‘কর্জ’ হিসেবে সাহায্য গ্রহন করে বর্তমান বিপদ থেকে উদ্ধার পেতে চায়। কার কাছ থেকে ধার হিসেবে সে বেঁচে থাকার রসদ সংগ্রহ করতে পারে পথে যেতে যেতে তা নিয়ে ভাবনা চিন্তার পর সিদ্ধান্ত নেয় রমণী পঞ্চায়েতের কাছে গিয়ে সে ধার চাইবে। অসুস্হ শরীরের ধকল সয়ে রমণী পঞ্চায়েতের বাড়ি পৌঁছায়; রমণী তার গিরি(মালিক) না হলেও গ্রামসভার অধ্যক্ষ, তার কাছে সে আর্জি জানাতেই পারে। কিন্তু সেটি জানাবে কোন পন্থায়-

“পাওয়া যাবে না জেনেও ফ্রি রেশনের স্লিপের কথা তুলবে, নাকি, পাওয়া যাবে না জেনেও ধান কর্জ দেয়ার কথা বলবে। ফ্রি-রেশনের শ্লিপ না পেয়ে ধান কর্জ চাইলে, কর্জ চাইবার জোরটা থাকে না। আবার কর্জ চেয়ে না পেয়ে ফ্রি-রেশনের শ্লিপ চাইতে গেলে ফ্রি-রেশন চাইবার জোরটা থাকে না। যাই চাক, সে ত এতটা এ কারণে হেঁটে আসে নি যে সে চাইবে, পঞ্চায়েত “না” করে দেবে আর সে উঠে চলে যাবে।”

রমণী পঞ্চায়েতের কাছ থেকে ফ্রি রেশন চাওয়ার মোক্ষম মুহুর্তটির অপেক্ষায় থাকা খেতখেতুকে তার আগেই রূঢ় এক সত্যের মুখেমুখি হতে হয়। সে জানতে পারে রমণী পঞ্চায়েত জমিচাষের বদলে মাছচাষের ব্যবসায় নামতে যাচ্ছে। তারই উদ্যোগ হিসেবে, “এ্যানাং বিশালিয়া পুকুর কাটিবার ধরিছেন।” পরিকল্পনাটি কার্যকরের সম্ভাবনা সম্পর্কে রমণী পঞ্চায়েতের কথায় আর সন্দেহ থাকে না- “ হয়, হয়। মাছ চাষ করিম। এইঠে।” বাস্তবতার পুরোটা ঠাওরে ব্যর্থ খেতখেতু তখন পর্যন্ত এটুকু বুঝে নেয়, এবং বলে ওঠে-, “এ্যালায় তোমরালা পচ্চিমে পুকুর কাটিবার ধইচছেন, পুবে পাঁছবাড়ি বানাছেন, মাছ চাষ ধরিবেন, চাষ-আবাদ ছাড়ি দিবেন--” ধুরন্ধর পঞ্চায়েত আইন অনুযায়ী জমির উপর আধিয়ারের অধিকার সংরক্ষণ নিয়মের মুখে ঝামা ঘষে দেবার নিমিত্তে তিন পুরুষের জমি চাষ-আবাদের পথ ছেড়ে মাছ চাষের দিকে ঝুঁকতে যাচ্ছে, তাই ঘোষণা দেয়- “ মুইও বেপারি হবা ধইচছু রে, মাছের ব্যাপারি--- ঐ সব গিরি আধিয়ারি আর নাই বাপা হে-”

খেতখেতুর মতো যারা শহরের চাকরিজীবী জমির মালিকের বর্গাচাষী তাদের অনিশ্চিত ভবিতব্যটাও জানান দেয় রমণী পঞ্চায়েত। ওইসব জমির মালিকেরা আর আধিয়ার(বর্গাচাষী) পুষতে আগ্রহী না। চাষের সময় আর ফসল তোলার সময় পয়সা দিয়ে লোক নিয়োগ করে কাজ হাসিল করা হবে। এই ঘোষণা খেতখেতুর জন্য বোঝার উপর শাকের আঁটি চেপে বসার মতো ভারবাহী। বসবাসের জন্য পাওয়া জমিটুকু হারালে সে কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে! ভাগচাষী থেকে দিন মজুর হয়ে যাওয়ার ললাট লেখনকে অস্বীকারে উপায়হীন খেতখেতুর মরিয়া প্রশ্ন-

“মুই, খেতখেতু, কোটত যাম ?"

কঠিন বাস্তবের মতো রমণী পঞ্চায়েত মুখ নাড়ে-
“তুই ত নাই রো খেতখেতু, তুই নাই রো। মুই ছিলে জোতদার, হম ব্যাপারি- ধানা-পাটা-মাছার ব্যাপারি। তুই ছিলো আধিয়ার হবি মানষি ধানা-পাটা-মাছার নগদ পাইসার মানষি। কাম করবু--পাইসা নিবু।"

খেতখেতু বুঝি মুহূর্তের জন্য শরীরের হাল, ক্ষিদের কামড় বিস্মৃত হয়। মাথার উপর থাকা ছাদটুকুও হারাতে হবে কিনা সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে চায়-
“মোর বাড়িখান-টাড়িখান ?'

তার উত্তরে উপহাসের মতো বলে ওঠে রমণী পঞ্চায়েত-
“তোর ত গিরির বাড়ি হে, গিরির টাড়ি হয় হে, গিরি কহিলে চলি যাবার নাগিবে।”

অচিরেই সহায় সম্বলহীন অধবাবিধবার দশায় পড়তে যাচ্ছে বুঝতে দেরি হয় না খেতখেতুর। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া মানুষ বাঁচার শেষ চেষ্টা হিসেবে কৌশলী হতে চায়- খেতখেতুও সে পথে হাঁটা দেয়-

“তা তোমার অঞ্চল অফিসৎ ত অধবা-বিধবার তানে ফ্রি রেশন মোক ফ্রি রেশনের একখান পুরুচি দাও ।

যেহেতু সে আধিয়ার কাজেই ওভাবে সাহায্য পাওয়ার অধিকার রাখে না। অন্যদিকে অধবা বিধবাদের রেশন দেবার কোটাও শেষ। এভাবে নানা কথার প্যাচে ফেলে রমণী পঞ্চায়েত খেতখেতুকে ধরাশায়ী করে। ফ্রি রেশনের শিকে ছিঁড়তে ব্যর্থ হলে, খেতখেতু ধার চায় পঞ্চায়েতের কাছে। সে তার গিরি(মালিক) না, এই বলে ধার দেবার আর্জিটিও পঞ্চায়েত নাকচ করে দেয়। গ্রামসভার মাথা বলেও মন গলাতে ব্যর্থ হয় খেতখেতু। ভুতপূর্ব জোতদার পদ্মনাথের মতো দরদী মনের নয় রমণী, যে কারণে তিন পুরুষ ধরে পরিচিত বিপাকে পড়া নিরন্ন খেতখেতুকে অবস্হাপন্ন পঞ্চায়েত রিক্ত হাতে ফিরিয়ে দিতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করে না। দিশেহারা খেতখেতু, গন্ধ শুঁকেই যে কিনা বেলা কত সেটা বলে দেবার ক্ষমতা রাখে, পথের দূরত্বের হিসাব না কষেই যে হাঁটতে জানে; তার যাবতীয় হিসাব নিকাশ কেমন উলট পালট হয়ে যায়। অনাহার, শারীরিক অসুস্হতার ভেতর অনাগত দুর্দিনের বাড়তি দুঃশ্চিতার প্রচণ্ড মানসিক চাপের মুখে, খেতখেতুর ধারণা হয় সে ভুলা মাসান(যে পথ ভুলিয়ে দিয়ে বেপথুকে হত্যা করে) দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। একে আলসার, তাতে ক্ষিদে, তার উপর ভুলা মাসান-- “অ্যালায় মোর বাঁচিবার কুনু আশা নাই। এই তিনোটার কোনো একটা হাতত মোক মরিবার নাগিবে” ত্রাসে-আতঙ্কে সে দিকভ্রান্ত হয়ে চিরচেনা আদিগন্ত ধানখেতে ঘুরপাক খেতে থাকে।

ভাইপো চ্যারকেটুর হাতে ঘরের একমাত্র সম্বল গরুটা বিক্রির জন্য দেয়া হয়, যেটি বিক্রি হলে চাল কেনা হবে, তাতে ‘প্যাটের ভুকে’ যুঝতে থাকা মানুষ ক'জনার মুখে ভাত উঠবে। ক্ষিদের কাছে সমর্পিত খেতখেতু ভাবতে ব্যর্থ হয়- “ তিনমাস চারিমাস পর ত চাষ দিবার নাগিবে, সেলায় গরু কুনঠে মিলিবে!” অনিচ্ছা সত্বে গরু নিয়ে চ্যারকেটু গৌরীহাটের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেও পথে যুক্তফ্রন্ট, কংগ্রেসে দুটি ভাগ(একটি দলীয় নীতির বিরুদ্ধপক্ষ এবং অন্যটি সমর্থিত)সহ আরো রাজনৈতিক দল মোর্চা নিয়ে শহরমুখী হওয়ার গন্তব্যে সামিল হবার ডামাডোলে পড়ে যায়। বলা ভালো তাকে প্ররোচিত করা হয়। কংগ্রেসের বিভক্ত দুটি দলের একই স্লোগান, অভিন্ন প্রতীক থাকায় জোতদার বাহেবাবুর পক্ষের করিৎকর্ম, সবদিকে তাল দেয়া নেংগু খুড়োর মনে হয় আলাদা প্রতীক থাকলে তাদের জন্য ভালো। বাহেবাবুর সবুজ সংকেত পেয়ে সে প্রতীকের খোঁজে নামে এবং গরুসহ চ্যারকেটুকে দেখে তার মাথায় বুদ্ধি খেলে যায়- “ যেইঠে গাই, সেইঠে যাই”, এটিই তাদের মিছিলের মোক্ষম প্রতীক হওয়ার যোগ্য। মিছিলের মাথা হতে রাজী হয় না চ্যারকেটু- ‘নেংগু বা হাত দিয়ে চ্যারকেটুকে ঠেলে দিয়ে বকে, “চল কেনে, তোর গরু আর তুই হামার ট্রাকত, উঠি চিহ্ন দিবি, সরকারি কংগ্রেসের চিহ্ন আলগ্ চিহ্ন, যা গরুটাক্‌ ঠেল কেনে-”

গরু বিক্রির টাকায় চাল কিনে নিয়ে গেলে তবে তাদের খাওয়া হবে, এমন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা চ্যারকেটু স্বভাবতই বাধা দেয় নেংগু খুড়োকে -“হে-এ ছোটখুড়া,হামাক ছাড়ি দেও কেনে, হে-এ-ছোটখুড়া, হামাক গৌরীহাটত যাবা নাগে,হে-এ ছোটখুড়া, হামাক গরুট বেচা নাগে, ছে-এ ছোটখুড়া, হামাক ছাড়ি দেও কেনে।”

সমর্থিত পক্ষের জন্য প্রতীক খুঁজে পাওয়ার বাহাদুরি হাতছাড়া না করার জন্য নেংগু খুড়ো তখন কৌশলের আশ্রয় নেয়; বলে পার্টির মিছিল তো আর আকাশ পথে যাবে না, গৌরীহাটের পথ ধরেই যাবে। কাজেই গরু সহ তাকে জায়গা মতো ঠিক নামিয়ে দেয়া হবে। সবদিক বিবেচনা করে চ্যারকেটু শেষমেষ গরু লাঙ্গলসহ ট্রাকে উঠতে রাজী হয়। সেটিই তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। কারণ নিজেদের জন্য প্রতীক পাওয়ার পর নেংগু খুড়ো আর তার প্রতিশ্রুতি রক্ষার তাগিদ দেখায়নি। জানতেও চায়নি চ্যাটকেতু এমন হৈহট্টগোলের মাঝে হাল-গরু নিয়ে কেন এসেছিল। অন্যদের মতো সেও নিজের আখের নিয়েই ভাবিত ছিল। অথচ তাদের পাকে পড়ে চ্যারকেটুর সব ভাবনাগুলো ওলট-পালট হয়ে যায়। নইলে সে গরুর সাথে কাঁধে করে লাঙ্গলটা নিয়ে এসেছিল এই আশায়-- যে কার্তিক মাসের এই সময়টাতে অনেক বাড়িতে তরকারির বাগান তৈরি করা হয়, সেরকম সুযোগ পেলে গরুতে হাল জুড়ে বাগান চষে পয়সা পাওয়ার চেষ্টা করবে, তাহলে হয়ত একমাত্র সম্বল গরুটি এ যাত্রা বিক্রির হাত থেকে রুক্ষা পাবে।

এইসব মিছিল কেন, কী তার কার্যকারণ, মিছিলের শরীরকে পুষ্ট করার কাজে আসা অধিকাংশ মানুষের মতো চ্যারকেটুরও জানা নাই। রাজনীতি না বুঝেও সে যেমন সব ধরনের পোস্টার সংগ্রহ করে নিজের থাকার জায়গায় সেগুলো লাগিয়ে, রোদ-বৃষ্টি-হিম থেকে বাঁচার তাগিদে। একই ভাবে গরু নিয়ে ট্রাকে চেপে হাটে যাওয়াটা সুবিধার হবে ভেবেই মিছিলের গাড়িতে উঠে পড়া। আদতে ভোটের রাজনীতি তার মতো ভুখা নাঙ্গা মানুষেরা বোঝে না। কিন্তু তা সত্বেও চ্যারকেটুকে সেই রাজনীতির চক্রেই মিছিলের গাড়িতে প্রতীকী চিহ্নের মডেল হতে হয়। তার আর গৌরীহাটে গরু বিক্রি করতে যাওয়ার কোনো উপায় হয় না। শেষ পর্যন্ত মিছিল শহরে পৌঁছালে গরু-লাঙ্গল প্রতীকী চরিত্রটিরও আর কোনো প্রাসঙ্গিকতা থাকে না। হাজারে বিজারে মানুষের ভিড়বাট্টার মাঝে চ্যারকেটু একা হয়ে যায়। শেষমেশ একাএকাই তাকে আবার ধানখেতে ফিরে আসতে হয়।

“মফস্বলি বৃত্তান্ত” উপন্যাসের আখ্যান যেন হঠাৎই শুরু হয়, থেমেও যায় পরিপূর্ণ একটা সমাপ্তি না টেনেই। এ বিষয়ে দেবেশ রায় মনে করেন -” একটা উপন্যাস আরম্ভই বা হবে কেন, শেষই বা হবে কেন? আরম্ভ হওয়ারও কিছু নেই, শেষও হবার কিছু নেই। দরকার শুধু আখ্যানের একটা গতিপথ নির্মাণ করা।” বলাই বাহুল্য ”মফস্বলি বৃত্তান্ত”তেও সেটির ব্যত্যয় ঘটেনি। ভাষা, বর্ণনা ও কাহিনির গুণে দেবেশ রায়ের আলোচিত উপন্যাস “মফস্বলি বৃত্তান্ত” বাজার চলতি আর দশটি লেখার চেয়ে আলাদা- নিবিড় পাঠে সেটি পাঠক মাত্রই বুঝতে সক্ষম হবেন। সেই সত্যের অনুসন্ধান এবং মাটির কাছাকাছি থাকা জীবনকে জানার আগ্রহ আমাদের দেবেশ রায় পড়তে বাধ্য করবে বলেই বিশ্বাস।

সেই কবে পূর্ণিমার চাঁদকে ঝলসানো রুটি বলে আমাদের চমকে দিয়েছিলেন সুকান্ত ভট্টাচার্য। দেবেশ রায়ও তেমনি তাঁর নির্মোহ শব্দের জাদুর বিন্যাসে খাদ্যহীন, বস্ত্রহীন, আশ্রয় হারিয়ে ফেলার ঝুঁকিতে থাকা মানুষের বৃত্তান্ত শুনিয়ে আমাদের চমকে দেন--

"এই জোছনার আলোর নাখান ভাতখান এ্যানং কিছু হবা পারে" কিংবা " এই ধানত্ চাইল নাই, এই জ্যোছনাত আইল নাই, এই পেটত ভাত নাই" ...কী অপরিমেয় ক্ষুধায় এমন উচ্চারণ বেরিয়ে আসে।

খাদ্যহীন মানুষের কষ্ট, ক্ষিদের সাথে যুঝতে থাকা মানুষ.. যারা আমাদের অনেকের নিশ্চিত অন্নবস্ত্র পেয়ে যাওয়া পৃথিবীর কেউ না। বড্ড অচেনা সেই সমাজ অথচ কত সত্যি সে জীবনের গল্প! সমাজের সুবিধাভোগী সদস্য হিসেবে এই ভয়ানক দারিদ্র আশ্রিত মানুষের গল্প পড়তে পড়তে সংবদেনশীল পাঠক অপরাধবোধে জর্জরিত হতে বাধ্য। জীবনের অনেক দেনা শোধ না করার দায়ে পাঠকের দিকে আঙুল তোলে “মফস্বলী বৃত্তান্ত”। এক অর্থে “মফস্বলী বৃত্তান্ত” আমাদের এই বিপুল বৈষ্যমের শ্রেণী বিভাজিত সমাজের অপরিশোধ্য দায় দেনার খতিয়ান। যে দায় থেকে আমরা কেউ মুক্ত নই।




কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন