মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

উপল মুখোপাধ্যায়'এর গল্প: ধূমাবতী


                                        

ধূম অতীব রূপ পরিগ্রহ করেছে। বিষয়টা ঘটবেই এ এক রকম নিশ্চিতই ছিল। সে ঘটবেই কিন্ত তাহারা ছায়া দেখাতে থাকবে এ কী রকম কথাবার্তা। তিমিরকে দেখলেই বোঝা গিয়েছিল ওর ছায়ার পাশে পাশে মৃত্যু হাঁটছে। যে মৃত্যু হাঁটছে তাকে নারী বলে চেনা যাচ্ছিল। যখনই ও আসছে, চলছে, কথা বলছে, নেশা করছে তখন ওর ছায়া সরে সরে সেই মৃত্যু দেখাচ্ছে। নিজেকে দেখাচ্ছে মৃত্যু। দেখা যাচ্ছে সে এক স্ত্রীলোক।


বাপ্পাদিত্য বলল,“আমি তখনই সন্দেহ করেছিলাম!”
—— কী সন্দেহ করেছিস ?
—— সবাই যা করে। 
—— কী করে ?
—— ও খুন করেছে। 
—— খুন ?
—— হ্যাঁ । 
—— কী জন্য?
—— এ রকম হলেও হতে পারে। 
—— হলেও হতে পারে মার্কা কথাবার্তা বললে চলবে না। 
বাপ্পাদিত্য চুপ করে গেল। তাকে আর প্রশ্নও করা হল না। সবাই তিমিরকে নিয়ে মাতামাতি করছে বোঝা গেল। কেন তারা তিমিরকে নিয়ে মাতামাতি করছে তার অনেক কারণ আছে। তিমির নেশা করতে পারে। তিমির প্রচুর পয়সা খরচ করতে পারে। তিমির প্রচুর টাকা রোজগার করতে পারে। তিমির প্রচুর কথা বলতে পারে। তিমির যেখানে সেখানে চলে যেতে পারে। তিমির রেগে উঠলে তখন তাকে থামানো মুশকিল হতে পারে। এই সব কারণ ছাড়াও তিমির চললে যে যে ছায়ার আসপাশে কেউ চলছে এটাও মাতামাতির একটা কারণ। তিমির কিন্তু বেশ ভক্ত। এমন এক জনকে নিয়ে যদি কাজ করা হয় যে বেশ ভক্ত তা হলে বড় বাধা সৃষ্টি হতে পারে, বিঘ্নেরা এসে তখন ভক্তি নিয়েই কথাবার্তা চালাবে আর কাজ কোথায় যাবে কে জানে? কোন ভক্তের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা না থাকলে তো কথাই নেই। মাতামাতিই সার হবে লোকে বুঝবেই না আসল কারণ। তিমিরকেও কেউ বোঝে না। সে যে বেশ ঈশ্বর নিয়ে ঘোরাফেরা করে সে কেউ বুঝতেই পারেনি। কেউ বোঝেইনি দেবতাটি কে। সে কি যোনি সম্বল কিছু বা লিঙ্গ সম্বল নাকি সে ক্ষুধার দেবতা, একাকীত্বের। তার বাহন তখন কে কে? এ ভাবে কেউ তিমিরকে ধরতেই পাচ্ছে না। তাতে অবশ্য তিমিরের কিছু এসে যাচ্ছে না। সকালে উঠে তিমির দেখল অসংখ্য কাক। সে কাকেদের খাবার দিলে তারা নিলো, চলে গেল আবার ঘুরতে ফিরতে একই জানলা দিয়ে এসে গেল। তিমির আবারো খাবার দিতে গেলে তারা নিলো বটে কিন্তু দক্ষিণ দিক হতে, পূর্ব দিক হতে, উত্তর দিক হতে, পশ্চিম দিক হতে মন্ত্রের মতো উড়তে লাগল, আসতে লাগল। খটখট দিনে শত শত কাকেদের দেখে তিমির দেখে আকাশ অদ্ভূত রঙ পরিবর্তন করছে। নানান দিক হতে নানান রঙ , নানান কোণ হতে নানান শব্দ হচ্ছে। সবই আকাশের কিনা সন্দেহ। অজস্র যে টিভিরা, অজস্র যে মায়েরা, অজস্র যে প্রেমিকারা তাদের সিরিয়াল ও স্বামী নিয়ে বসবাস করছে —এই শেষ হয়ে আসা ডাঙার দিক থেকে তাদের নানান আওয়াজও আসতে পারে। আকাশ যে রূপে আকাশের ছিল তা পরিবর্তন করেছে- তিমির বুঝতে পারল। কিন্ত কাকেদের খটখট তার মধ্যে অস্বস্তি তৈরি করে। সে তার দেবতার মন্ত্র জপ করে। ছায়ার পেছনে যে মৃত্যু নিয়ে সে সর্বদা ঘোরে অথচ বুঝতে দেয় না সেই ছায়ার ভেতর থেকে নারীর মতো কেউ এসে তার বিঘ্ন ঘটায়। সে চমকে উঠে বলে,“ কে কে কে কে কে। কাকেরা সমস্বরে বলে উঠল,“ কা কা কা কা কা। তিমির বুঝল এরা খাবার খেতে আসে নি। তার জপমন্ত্র বিঘ্নিত হয়েছে। সে বড় আতান্তরে পড়ে গেল। এ খুব খারাপ এক দেবতা। যাকে পুজোই করা যায় না, যে পুজো দিতে গেলে কাক পাঠিয়ে দেয়। কেমন সে দেবতা? একমাত্র নেশাই এ সময় ঈশ্বরের থেকে মানুষকে আলাদা করতে পারে। একমাত্র নেশাই এ সময় ভেদাভেদকারী, একমাত্র নেশাই এ সময় ঈশ্বরের কাছে মানুষকে নিয়ে যেতে পারে। মিতু নামক এক টেনিয়া তার জন্য পুরিয়া তৈরি করছিল। তিমির বলল,“ দে।” মিতু পুরিয়া দেওয়ায় সেই শুখনো গাঁজার ধূম চারদিক আচ্ছন্ন করে ফেলে। কাকেরা চলে যায়, ছায়ার পেছনে যারা বিঘ্ন সৃষ্টি করতে আসে সব ব্যর্থ হয়ে ধোঁয়ায় উড়তে থাকে যেন আর কোন দিন তারা বিঘ্ন সৃষ্টি করবে না। খারাপ ঈশ্বর তার লিঙ্গ , যোনি নিয়ে খারাপ খবর শোনাতে বাড়ি বাড়ি পালিয়ে বাঁচে। ঝরঝরে আলো আসায় তিমিরের মনে পড়ে যায় জঙ্গলের হাসিল ওই ডিসপিউটেড জমির কথা। ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের জমির লাগোয়া তাদের জমিদারি মহালটি একটু একটু করে বাড়ানোর কাজটা করে এসেছে তারা। বাবা বলেছিল,“ সব সময় জঙ্গল হাসিল করবি বাবা। আমি করেছি। আমার বাবা করেছে। তার বাবা করেছে। এ ভাবে না হলে জমি বাড়বে না।”

—— কিন্তু ঝামেলা করছে বাবা। 
—— কে? মেরে গাঁড় ভেঙে দে। ডাক তো। 
—— এ ঝামেলা সে ঝামেলা নয়। ডিসপিউট বাবা। 
—— ডিসপিউট ? 
—— হ্যাঁ । ফরেস্ট ডিপার্টমেন্ট বাবা। 
—— তাতে কী ?
তিমির বোঝে বাবাকে বলে লাভ নেই। সে বিট অফিসারকে বলে,“ঠিক আছে- আমার সীমানায় খোঁটা পুঁতে ছিলাম কিনা ?
—— হ্যাঁ, সেটাই তো ঘোরতর অন্যায় করেছেন। 
—— অন্যায় ?
—— হ্যাঁ । ফৌজদারি খাবেন বাবু। 
—— খাব?
—— মানে কেস হয়ে যাবে বাবু। 
—— কেস হবে না। 
—— হবে না! অনেকখানি জমি। হ্যাঁ তা দশ কাঠা তো হবেই। 
—— খোঁটা যদি তুলে নিই?
—— তা হলে তো ঠিক আছে বাবু। 
—— আছেই তো । আপনি রেঞ্জার সাহেবকে বলুন ডিএফও অফিসে রিপোর্ট পাঠাতে খোঁটা তুলে নিয়েছি। 

তিমিরের লোকেরা খোঁটা তুলে নেয়। আর জঙ্গল ও তাদের মহালের সীমানা চিহ্নিত থাকে না। এবার মহাল অবাধ হয় আর জঙ্গল লজ্জা পেতে পেতে আরো দূরে সরে যাচ্ছে। এটাই বুঝতে দিন কেটে যেতে থাকে। জলেরা পালায়। জমি ক্রমশ হাসিল হচ্ছে আর জঙ্গল যেন কাকে কাকে কাকে কাকে অধিকার দিয়ে রেখেছিল? তারা তিমিরের সামনে আসতে পারে না, আসতে দেওয়া হয় না। ডিসপিউট আরো কাটানোর মানে হল ডিসপিউট আরো বাড়ানো। খোঁটাটা আরো দূরে দূরে পুঁতে দিয়ে আসতে যায় তিমির, পাশে সশস্ত্র রাখাল নিয়ে যায় বলে মাটিতে আওয়াজ উঠল - ধপ ধপ ধপ ধপ ধপ । মাটি কেঁপে উঠল কারণ সে সন্তান সম্ভবা হয়ে, ঈশ্বরের মহিলা হয়ে নিশ্চুপ আছে বহু দিন — আসন্ন প্রসবা বলে তার ক্ষমতা কী বেশি নড়াচড়ার। লোকেরা ধুপ ধাপ আওয়াজ তুলে সিমেন্টের অজস্র খোঁটা পুঁতছিল আর তিমির সেগুন গাছটির তলায় - হয়ত হতে পারে সেটা পিয়ালও, শুয়ে শুয়ে মদ খাচ্ছিল। পাতারা এসে পড়ছিল তার ওপর, মাছি নেই কোথাও। এ জমি লাল রঙের, জল ধারণ ক্ষমতা এদের অনেক তাই এই পতঝড় সময়ে এর রস ভাব ওপর ওপর বোঝা যায় নি, সে তার আদ্র্রতা নিয়ে অনেক তলায় চলে গেছে। আর এখানের সমস্যা হল অন্য রূপ জলের সমস্যা। গাঁজার শট নিতে নিতে তিমির বাপ্পাদিত্যকে ফোন করে। 
—— হ্যালো । চলে আয়। 
—— আজ পারব না। 
—— তবে রবিবার যাব। 
—— কোথায় ?
—— খবর দিয়েছে। 
—— কোথায় ? 
—— গঙ্গার ধারের জমি। 
—— পোর্টের?
—— না না রায়তি জমি। 
—— পোর্টের নয়?
—— না পোর্টের নয়। 
—— পাড় বাধাঁনো?
—— বাঁধ দেওয়া আছে বলছে। 
—— আচ্ছা। 
—— রবিবার । আমি তুলে নেব। 
—— কটায়?

কথা তো অনেক বলা যেতে পারে। কথার পিঠে কথা। তাতে কী কী হয়? কাঠামো তৈরি করতে করতে,ক্লান্ত হতে হতে তিমির বেশ বুঁদ হয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে বসে জুত করে শট নিচ্ছিল। শেষ হতে বোতলের দিকে হাত বাড়ালে সেটা কেউ কি সরিয়ে নেয়? কে নেয়? তিমির আঙুল তুলে চোখ ঠাহর করতে করতে বোতল পাবার চেষ্টা করে । সে দেখল অনেক ক্ষণ চেষ্টা করতে হবে কারণ বোতলটা কী ভাবে যেন খাটের তলায় অনেকটা ঢুকে। কে ঢোকাল এটা ভাবার কোন দরকার নেই তাই তিমির বলে,“ দে।” তার নেশারা বড্ড নেশা পেয়ে বসতে চায়। তাদের পেয়ে বসতে না দিলে মুশকিল। তখন তারা আবার যদি কাক পাঠিয়ে দেয়। এইভাবে তার চোখ বুজে আসতে লাগল। যতই বোজে তার চোখ আবার খুলবেই কারণ এ আটকানো তার কম্ম নয়। এই চোখ খোলার প্রলোভন যাতে আকাশ দেখা যায় । এই তিনতলা বাড়ির শুহুরে নিঘিন্নে আকাশ যার তলায় জল শুখিয়ে আসছে বলে সমুদ্র নাকি একটু একটু করে উঠে পুরো শহর আস্তে আস্তে খেয়ে ফেলার কথা ভাবছে। কখন খায় সেই সেই আশংকায় তিমির আবার তাদের মহালে, জঙ্গলের কোলে ডিসপিউটেড সব জমির আনাচে কানাচে যাবার কথা ভাবছিল। এ সময় তার পেছন থেকে সব সময় ছায়ার পাশে উঁকি দিয়ে থাকা মৃত্যু বলে উঠল,“ শুনছ।” তিমির নিঃসাড়ে মুততে মুততে সব নেশা বার করতে করতে বলল,“ হ্যাঁ , আমিই করেছি কি? খুনটা?” বাপ্পাদিত্য বলেছে,“ বলেছিলাম না! ওটা ওরই কাজ! নিজের বউটাকে!”


পাড় ফাঁকা হয় বলে গঙ্গা হয়েছে না গঙ্গা হয়েছে বলে পাড় ফাঁকা হয়েছে। তিমির দেখে গঙ্গার পাড়ের জমি পোর্ট ট্রাস্টের জমি করে না রেখে নিজের করেছে। প্রশ্ন হল পোর্ট বলছে না কেন - যেমন ফরেস্টের অফিসার বলেছিল? এ ভাবনার বিষয়। ও দেখল নদীর পাড় দ্রুত ভাঙছে। জল ভেসে ভেসে মাটির অন্ধকার দিয়ে আরো অন্ধকারের দিকে চলে গেছে। সেখানে কুউউউউউ ডাক দিলে সেই ডাক ফিরবে কিনা সন্দেহ, এতো দূরই চলে গেছে জল। বাইরেতে মাটি দেখাচ্ছে সে কতখানি প্রবল, বিরাট প্রতিরোধ দিয়ে অল্প মাত্র খোঁদল তৈরি করেছে। আসলে জলের ওপরই তার নির্ভর ও জেগে থাকা দেখে তিমির বোঝে এ জমি নেওয়া মানে জলেরই মালিক হওয়া। জলের মালিক আবার কে কবে হতে পারল?
সামনে বড় বড় খোঁদল দেখে বাপ্পাদিত্য উত্তেজিত হল। সেও তো তিমিরের সঙ্গে এসেছে। তাকে নিয়ে মাতামাতি না করে তিমিরকে নিয়ে মাতামাতি করায় তার উত্তেজনা খানিক বা স্তিমিত। তবু সে বলে,“ দেখেছিস! পাড় ভেঙে যাবে যে কোন সময়ে!”
—— তাতে?
—— নদী ভেঙেছে আরো নিশ্চয়ই। 
—— তাতে?
—— এটা ওদেরই জমি ছিল। 
—— না পোর্টের। 
—— পোর্টের জমি অনেক আগে নদীতে চলে গেছে। 
—— এই জন্য পোর্ট কিছু বলে না। 
—— হ্যাঁ , ওই জন্য বলে না। 

একজন দালাল বলল,“ এ জমি নিতে পারেন স্যার। তবে পাড় বাধাতে হবে। তিমির বলল,“ দেখতে হবে মা গঙ্গা ইতিমধ্যে কতটা ঢুকে এসেছেন।” এই বলে সে পেন্নাম ঠুকলো আর তার মাথার ওপর দিয়ে এক কাক ডেকে ডেকে চলে যেতে সে চমকে তাকিয়ে দেখে— সে এক কাক যে গঙ্গার অপর পারে যাবে বলে উড়ান দিয়েছে। সেখানে গিয়ে সে কী মনস্থ করবে? সেকি দলে দলে কাকদের ডেকে এনে মাথার ওপর ওড়াউড়ি করবে বলে মনস্থ করেছে? এ কাক এক খারাপ দেবতার কিনা ভাবতে ভাবতে তিমির আর বাপ্পাদিত্য জমি দেখছিল। বাঁধের ওপরে উঠল ওরা। বাঁধের ওপরে বাধা পড়ে, রাস্তা দিয়ে এক বেড়াল টপকায়। তবে সে রাস্তা সরু হলেও বেশ নতুন। দালালরা বলছে,“ এ রাস্তা চওড়া হবে স্যার। দেখছেন না ব্রীজ তৈরি হচ্ছে?” বাঁধের ওপারে ইলিশ বসেছিল বলে মনে হচ্ছিল। বাপ্পাদিত্য বলল,“ ইলিশ।” তিমির বলল,“ ইলিশ। ”
—— এখন ইলিশ বসে নেই স্যার। 
—— কখন বসবে ইলিশ?
—— ধরা হবে স্যার। দেখছেন না জোয়ার এসেছে। 
—— কখন ধরা হবে?
—— ওরা তো সারাদিনই জলে আছে। দেখছেন না জলের ধারেই বাড়ি সব। 
—— ওদের কি জেলে বলে?
—— ওরা তো জেলেই স্যার। 
—— হিন্দু না মুসলমান?
—— মিলেমিশে আছে স্যার। 
বাপ্পাদিত্য বলল,“ তবে,আমার মনে হয় বেশির ভাগই মুসলমান।”
—— না স্যার,ইলিশ নিয়ে কথা হচ্ছিল।
—— হ্যাঁ । 
—— চারটের সময় ধরা দেবে স্যার। তখন রাস্তার ধারে ধারে বিক্রি করে দেবে দিনে দিনেই। 
জমি দেখাদেখি করতে করতে ওরা ক্লান্ত হয়েছে। তারপর দেখল নদীর ধারে ধারে একটি ফ্ল্যাট বাড়ি তৈরি হচ্ছে। বেশ উঁচু । তিমির বলল,“ এখানে ফ্ল্যাট হয়ে গেছে?”
—— হ্যাঁ স্যার। তিন হাজার টাকা স্কোয়ার ফিট। 
—— কত?
—— তিন। 
তিমির বলে,“ আমি ফ্ল্যাট দেখব। ” বাপ্পাদিত্য বলল,“ সেকি! তুই তো জমি দেখতে এসেছিলি!”
—— এখানে ফ্ল্যাট চলবে। জমি চলবে না।
তিমির বললে সবাই চুপ করতে হয়। সবাই চুপ করে গেল। তিমির বলতে লাগল,“ এখানে ফ্ল্যাট চলবে। এতদিন যা চলেছে - চলেছে এবার 
—— এবার কী স্যার?
—— ফ্ল্যাট । 
—— তা হলে তো ভালোই হয়। আপনি অফিসে চলুন। কথা হবে। 
—— না। ফ্ল্যাট দেখব।

সবাই ফ্ল্যাট দেখতে গেল। বাপ্পাদিত্য শুধু মন খারাপ করে গঙ্গার ধারে বসে থাকে। সে জমি দেখতে এসেছিল। গঙ্গার পাড়ে পাড়ে ফ্ল্যাট তৈরি হলে। এই দূর অঞ্চলে বাড়িই নেই অথচ ফ্ল্যাট তৈরি করবে কী করে কে জানে। এই ভাবতে ভাবতে সে গঙ্গার জল দেখে দুলছিল জলের মতো করে আর সূর্যের আলো এহে তার শরীর এ ফোঁড় ও ফোঁড় করতে ঠাণ্ডা হাওয়া পাঠিয়ে দেয়। বাপ্পাদিত্য বলে,“ আঃ!”
এখানে একটি ফ্ল্যাট বানিয়েছে। সাদা সাদা বাড়ি নিঃঝুম ভূতের মতো দাঁড়িয়ে। তিমির জিজ্ঞেস করল,“ লিফট আছে?” —— সব আছে স্যার। সুইমিং পুলও আছে। গঙ্গার পাশে সুইমিং পুল। 

সিঁড়ি ততো খাড়াই নয়। বাড়িটিও খালি,কোন আব্রু নেই। ফ্ল্যাটের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে উঠতে তিমির হাঁফায় না। সবাই হাঁফিয়ে পেছিয়ে পড়ল। তিমির এক এক করে সিঁড়ি ভাঙছে। অনেক ওপরে ওঠার পর তিমিরের মনে হল তার বেশ কষ্ট হচ্ছে। সে প্রশ্ন করল,“ আমার কি কষ্ট হচ্ছে?” বাপ্পাদিত্য একলা গঙ্গার পাড়ে বসে বলে,“সেকি! তা হলে!” তিমির বলল,“ একটা সরবিট্রেট পেলে হত।” তার সঙ্গে সঙ্গে যে মৃত্যুর মতো ছায়ার পেছনে পেছনে চলে সে এখন সামনে এগিয়ে যায় আর ও তাকে অনুসরণ করবার মতো কিছু একটা করে। এতো নারীর মতোই লাগে বরাবর। এখানে আব্রু নেই বলে আরো নারীর মতোই লাগছে। তিমির ভাবছিল — এতো অতি খারাপ এক দেবতা। যাকে পুজো করা যায় না। যার মন্দিরও বড় একটা নেই। সে দেবতা অতি অসুন্দর। তার গায়ের রঙটি বিষের জ্বালায় নীল হয়ে তারপর সবুজ আকার হয়ে রঙের দিশাই হারিয়েছে। তবু এ রঙের এক আকার আছে যা কিছু অসুন্দর তার মতো। তিমির বলল,“ তুমি কি লিঙ্গের দেবতা না যোনির?” সে উত্তর না পেয়ে অনুসরণ করে। অনেক ওপরে সিঁড়ি শেষ হয়, এতো ওপর যে গঙ্গাও আর দেখা যায় না। তিমির তবু গঙ্গার উদ্দেশ্যে প্রণাম করে। গঙ্গা দেখতে না পেলেও প্রণাম করার কসরত করতে থাকে। আপাতত মা গঙ্গাই তার শেষ ভরসা। তখনই সেই নারীর মতোটি যেন উঁচু ছাদের পাঁচিলে ওঠার চেষ্টা করছে। তিমির বলল,“ পাঁচিলে ওঠার কী দরকার। ” সে থামেনি অনেক কষ্টে উঠে নিঃশব্দে পাঁচিলের ওপর থেকে পড়ে যেতে থাকে। তিমির ছুটে যাবার চেষ্টা করে পাঁচিলের ধারে যায়। সে দেখতে পায় না। সামনে ধোঁয়া ধোঁয়া মা গঙ্গা দেখা যায়। পড়লে শব্দ হয় কি? এ পড়ে অথচ শব্দ নেই। কখন সে পড়ল আর কী ভাবেই বা সে পড়বে বলে ঠিক করেছে ভাবছিল তিমির,“ পড়ল কী করে — আসলে আমিই কি?” বাপ্পাদিত্য জোর পেয়ে গেছে, সে বলল,“ বলেছিলাম না! ও-ই করেছে! খুন - বউটাকে!”

আর তিমির বুঝতে পারে এক অত্যন্ত খারাপ দেবতা তাকে গ্রাস করছে তো করছেই। তার হাঁ মুখের ভেতর সে আস্তে আস্তে ঢুকতে থাকে। চার পাশে সুগন্ধি লালা । সে লালা খেতে লাগল। এই লালা তাকে খাবেই অথচ সারা গায়ে মেখে এখন সে লালাই খাচ্ছে। তাতে তার নেশা ধরে যায় কিন্তু খিদে মিটবে কি? এ দেবতাটি কিন্তু বড্ড ক্ষুধার্ত ও দারিদ্র্য পীড়িত , একলাটি একজন। এ গিলে নিল বটে তবে উগরোতে পারবে কি? অনুরোধ করিলে উগরোবে কিনা এ এক বিবেচনা । যদিও সে প্রশ্ন অন্ধকারে উহ্য থেকে গেল। দেখা গেল দেবতার গ্রাসে ও প্রভাবে, ক্ষুধার প্রভাবে তিমিরও ঘুমিয়ে পড়েছে। এ কী ঘুমেরও দেবতা বটে ?

------------
 
 
 
লেখক পরিচিতি:
উপল মুখোপাধ্যায়
কথাসাহিত্যিক।

বর্তমান আবাস - মুখার্জিগেট,মহেশতলা। দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা ,পশ্চিম বঙ্গ , ভারত। 

প্রকাশিত গল্প গ্রন্থ - চারটি।

 

 

২টি মন্তব্য:

  1. ভালো লেগেছে। এইভাবে বন নদী সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। বন নদী পাব্লিক নিজের সম্পত্তি করে তুলতে চাইছে, এমনকি এ আমালে করেওছে। নিজের চোখেই এইসব দেখে চলেছি। সব ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে, সব দখল হয়ে যাচ্ছে। ভালো লিখেছেন।

    উত্তরমুছুন
  2. এ কি ঘুমের দেবতা বটে!অপূর্ব লেখা

    উত্তরমুছুন