মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

সাদিয়া সুলতানা'র গল্প : যেমন খুশি তেমন সাজো



    পার্টিতে এমন অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটবে তা কেউ ধারণাই করতে পারেনি। যেখানে এই বাড়িতে গুস্তাভ’র জন্মদিনের পার্টিও নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা বলয়ে নিখুঁতভাবে উদযাপিত হয় সেখানে আজকের এমন গুরুত্বপূর্ণ একটা আয়োজন এভাবে পণ্ড হয়ে যাবে তা কারো ভাবনাতেই আসেনি।

    একজন উঁচুমানের কনট্রাক্টরের উঁচুদরের কন্ট্রাক্ট পাবার ‘সেলিব্রেশন পার্টি’ হওয়া উচিত একেবারে জাঁকজমকপূর্ণ আর বিপত্তিহীন। এমনিতে শুরু হবার কিছুক্ষণের মধ্যেই পার্টি জমে উঠেছিল। ফরিদ আহমেদের আহ্বানে সাড়া দিয়ে তার ঘনিষ্ট বন্ধুবান্ধব, শুভাকাঙ্ক্ষীরা সময়মতোই উপস্থিত হয়েছিলেন। নিজের বাড়িতে সরকারের পদস্থ কর্মকর্তাগণসহ এলিট শ্রেণির মানুষের পদচারণা দেখে ফরিদ আহমেদ এবং মিসেস ফরিদ মানে মিসেস শাবা বেশ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছিলেন। সারাদিন পর্যাপ্ত সংখ্যক গৃহপরিচারিকা দিয়ে এই বাড়ি সাজিয়ে গুছিয়ে তুলতে তাকে তো আর মুখ কম খরচ করতে হয়নি। আদতে সুন্দরকে আরও সুন্দর করে তুলতে মিসেস শাবার কোনো জুড়ি নেই।

    মিস্টার ফরিদের এই অপূর্ব সুন্দর দোতলা বাড়ির বাইরের আঙিনার ঘাসগুলো সমান উচ্চতায় ছেঁটে রাখা। সবুজ মখমল ঘাসের কার্পেট ঘিরে সমদূরত্বে লাগানো গাছগুলো বাড়ির মালিকের মতোই বিত্তশালী। সাদা-নীল অপরাজিতার লতা সুডৌল পাম গাছের কোমর জড়িয়ে ধরেছে। কাঠগোলাপ, অলকানন্দা, পাপড়ি টগর, হাজারি বেলির পাশাপাশি দুর্লভ রঙের গোলাপের বাহার বাগানটিকে স্বর্গীয় সৌন্দর্য দিয়েছে। বাড়ির সীমানাপ্রাচীর ঘিরে রয়েছে সমউচ্চতার সারি সারি নারিকেল গাছ। এসব গাছগাছালির পরিচর্যা করার জন্য এই বাড়িতে দুজন মালি রয়েছে। তাদের গত দুই সপ্তাহের সার্বক্ষণিক প্রচেষ্টায় বাগানটি আরও মোহনীয় হয়ে উঠেছে।

    প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সঙ্গে স্নিগ্ধতা ছড়িয়ে দিতে বুফে টেবিলের কাছাকাছি অদৃশ্য কোনো স্থান থেকে পিয়ানোর ঘোরলাগা সুর ভেসে আসছে। এই প্রাঙ্গনের কোথাও এক টুকরো ময়লা নেই, এমনকি গাছের একটা ঝরা পাতাও পড়ে নেই কোনো জায়গায়। পাশ্চাত্যের অভিজাত ফ্রেমে আটকে দেওয়া আছে এই বাড়ির সার্বিক সৌন্দর্য। এর পুরো কৃতিত্ব মিসেস শাবার যার পুরো নাম শাবানা আক্তার।
    
    নিজের নাম যুগের সঙ্গে মানানসই করতে অনেক আগেই মিসেস শাবা নামের বাড়তি বর্ণ ছেঁটে ফেলেছেন, যেমনভাবে তিনি সেকেলে আসবাবপত্র ছেঁটে ফেলে আধুনিক নকশায় অন্দরমহল সাজিয়েছেন। তার মনে হয় শাবানা নামটি শুনলেই নামের মালিককে সবাই ছিঁচকাঁদুনে ভাববে। কে যেন শাবাকে বলেছিল, শাবানা নামের অধিকারী মানেই অশ্রুসজল মুখ আর সেলাই মেশিনের খটখটানি।শাবা জানে, তার নামের সঙ্গে এখন একেবারে ভাবা যায় না বিষয়গুলো। নিজেকে নতুনরূপে আর ব্যক্তিত্ত্বে সাজিয়ে তোলার পাশাপাশি নিজের নামটিও সাজিয়ে তোলা জরুরি। সত্যি একটা অত্যাধুনিক নাম না থাকলে তার মতো আধুনিক নারীকে মানাবে কেন! এখন কেউ যখন তাকে ‘শাবা’ নামে ডাকে, তিনি মরালীর গ্রীবা উঁচিয়ে জবাব দিতে দিতে প্রতিবার নতুন করে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠেন। যদিও আজ পার্টির শেষ দশ-পনেরো মিনিটে যতবার কেউ ‘শাবা’ নামটি উচ্চারণ করেছে ততবার তিনি আতংকে নীল হয়ে উঠেছেন।

    এমনিতে শুরু থেকে পার্টি চলছিল তরল পানীয়ের মতো সাবলীল গতিতে। ঘনিষ্ট বন্ধুবান্ধবদের জন্য পার্টির ‘লেট নাইট’ অংশে বিশেষ জলপানের ব্যবস্থা ছিল। বিয়ার, শ্যাম্পেন, হোয়াইট লেভেল, রেড ওয়াইন, টাকিলা, ফরাসি ভদকার আকর্ষণীয় সব আয়োজন এখন বিশৃঙ্খলভাবে পড়ে আছে।

    পার্টির শুরুর দিকে চোখ ফেরানো যাক। পার্টি সবে জমেছে তখন। বিশিষ্ট ব্যবসায়ী মিস্টার খন্দকার বাঙালির জাত তুলে রসালো সব উদাহরণ দিচ্ছেন। কালো রঙের কমপ্লিট স্যুটআর সাদো-কালো চেক টাই পরিহিত ফরিদ আহমেদকে পরিতৃপ্ত দেখাচ্ছে। প্রশান্তির হাসি ঠোঁটে ছড়িয়ে তিনি মিস্টার খন্দকারের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘পুওর পিপল কি ইকুয়েশন করেছে দ্যাখেন, ১১ মণ ধান=১টি বালিশ। ক্লাস ওয়ান পিপলের শোবার বালিশ সম্পর্কে কোনো ধারণা আছে এদের? আর সরকারি অফিসের কেনাকাটা, এসবে পাবলিকের মাথা ঢোকানোর কাজ কী! যখনই ফেসবুকে ঢুকছি এই নিয়ে ট্রল চোখে পড়ছে। যত্তসব রাবিশ!’

    দৈনিক ভোরের পাতা পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ছাপা হওয়া টাঙ্গাইলের কৃষক মালেক সিকদারের নিজের হাতে নিজের ধানী জমিতে পেট্রোল ঢেলে আগুন দেবার সংবাদটি জোরে পড়া শেষ হতে না হতেই কণা মুৎসুদ্দি মাখোমাখো কণ্ঠে বলেন, ‘ও ফ্যারিড, প্লিজ স্টপ দিজ বুলশিট নিউজ। পুওর সেন্টিমেন্টাল পিপল।’

    কণা মুৎসুদ্দির পরনে আড়ঙের আইবরি হাফসিল্ক জামদানি শাড়ি। শাবার মুখে নিজের আটাত্তর হাজার মূল্যমানের শাড়িটির প্রশংসার সঙ্গে ‘সো রিজনেবল’ শব্দটা শুনে এমনিতেই তার মেজাজ চটে আছে। তার ওপর বুকের কাছটায় শাড়ির অনেকটা জুড়ে অসাবধানতাবশত পানীয় ছলকে পড়ায় তিনি খুব রুষ্ট। ভ্রু কুঁচকে বসে আছেন। মিসেস শাবা স্লিভলেস ব্লাউজের উপচানো কাঁধ উঁচু করে বিশেষ ভঙ্গিতে বারকয়েক বলে গেছেন, ‘ওহ সরি কণা, এক্সট্রিমলি সরি।’

    কণা খেয়াল করেছে কোনো অজ্ঞাত কারণে শাবা ওকে পছন্দ করে না। প্রতিবার এই বাড়িতে এলে সে গুস্তাভকে কণার পেছনে লেলিয়ে দেয়। গুস্তাভ কণার শাড়ির কোণা ধরে ঝোলার চেষ্টা করে, অতর্কিতে লাফিয়ে গায়ে পড়ে, পায়ের দিকে লম্বালম্বি দাঁড়িয়ে ওর কোলে ওঠার চেষ্টা করে।

    গুস্তাভকে নিজের দিকে আসতে দেখে কণা মুৎসুদ্দি সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়ান। কাছেই গ্লাস হাতে সাংবাদিক নুরে আলম দাঁড়িয়ে আছেন। তিনি ফরিদ আহমেদের বাল্যবন্ধু। সম্প্রতি ফরিদ আহমেদের ব্যবসায়িক অংশীদার হবার ইচ্ছাপোষণ করেছেন। ফরিদ আহমেদের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ‘শাবা এন্টারপ্রাই’ এ বছর একটি হাসপাতালের নির্মাণ কাজসহ বেশ কয়েকটি সরকারি প্রতিষ্ঠান, বাংলো, কোয়ার্টারের সংস্কার কাজের ঠিকাদারি পেয়েছে। এসব কাজের সমাপ্তি যেভাবেই হোক না কেন শতভাগ কাজ সম্পন্ন হয়েছে মর্মে প্রত্যয়নপত্র পেতে তার কোনো বেগ পেতে হয়নি। একবারই কেবল বিপত্তি ঘটেছে।

    এক ঘাড়ত্যাড়া কর্মকর্তার কারণে একটা হাসপাতালের সংস্কার কাজ প্রকল্প বাস্তবায়ন প্রতিবেদনে মাত্র দশ শতাংশ কাজ সম্পন্ন করে বিল উত্তোলন করা হয়েছে উল্লেখ করায় পত্র-পত্রিকাগুলো ফরিদ আহমেদের পেছনে একেবারে উঠেপড়ে লেগেছিল।এসব ক্ষেত্রে পাল্টাপাল্টি সংবাদ প্রকাশ করতে সাংবাদিক নুরে আলমের কোনো জুড়ি নেই। এই বন্ধুকে তাই বিশেষভাবে খাতির করেন ফরিদ আহমেদ। যদিও ছোটোখাটো গড়নের নুরে আলম এ ধরনের পার্টিতে মাঝেমাঝে মাতাল হয়ে যায়। আজ ইতোমধ্যে সে যা পান করেছে তার মাতাল হবার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। বন্ধুকে কানে কানে একটু সতর্ক করতেই নুরে আলম ফরিদ আহমেদের গলা জড়িয়ে ফিসফিসিয়ে বলে, ‘দোস্ত, নো টেনশন, চিয়ার্স।’ বন্ধুর কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে ফরিদ আহমেদ অন্যান্য অতিথিদের দিকে এগিয়ে যান।

    চেম্বার অফ কমার্সের সাধারণ সম্পাদক রায়হান টার্কিস কাবাবের প্লেটটা নিজের দিকে টানতে টানতে ধানে আগুন দেওয়ার খবরে আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করেন। রায়হানের মনমেজাজও ভালো নেই। হাইকোর্টের আদেশের পর গোল্ডেন ব্লিসিং ভেজিটেবল অয়েল মিলের লাইসেন্স স্থগিত হওয়ায় তিনি খুব দুশ্চিন্তাতে আছেন। পার্টিতে যোগ দেয়ার কোনো ইচ্ছা না থাকলেও তার কোনো উপায় ছিল না। ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা সাখাওয়াত সাহেবের সঙ্গে তার একটা ফলপ্রসু আলোচনা হয়েছে। সেটাকে অগ্রগামী করতেই আজ এখানে আসা জরুরি ছিল।

    মোবাইল স্ক্রল করতে করতে ভারতের নির্বাচনের খবর চোখে পড়তেই রায়হান ধানচাষীসহ নিজের দুঃখের প্রসঙ্গ ভুলে গেছেন।

‘হাহাহা, নিউজটা দেখেছেন ফরিদ ভাই, ভারতের নির্বাচনকে সামনে রেখে মোদি দাদাজান কেদারনাথের কাঁথা বালিশ নিয়ে বিছানা পেতে ধ্যানে বসেছেন।’

    ফরিদ আহমেদ উৎসুক হয়ে ওঠেন, ‘না তো ভাই, নিউজ লিংকটা মেসেঞ্জারে সেন্ড করুন তো আমাকে। ভেরি ইন্ট্রেসটিং নিউজ।’

    গুস্তাভ শাবার পায়ের কাছে এসে নিচের পা দুটো ঠেলে তার কোলে ওঠার চেষ্টা করছে, আদুরে ভঙ্গিতে বারকয়েক ওকে সরিয়ে দিলেও ও যাচ্ছে না, এখন খামচাচ্ছে শাবার আমেরিকান জর্জেটের মাখনরঙা শাড়ি। খানিকটা বিরক্ত হয়ে শাবা আয়াকে ডাক দেন, ‘চুমকি, ওকে নিয়ে যাও, খেতে দাও।’

    পার্টি থেকে মনোযোগ সরিয়ে গুস্তাভর দিকে মনোযোগ দিলে শাবা হয়তো বুঝতে পারতেন, মালিকের বিপদের সম্ভাবনা দেখে নিরীহ প্রাণিটি পূর্ব সতর্কতা জানাতে এসেছিল। গুস্তাভ বিদায় নিতে না নিতেই ঘটনাটি ঘটে যায়।

    সে এক অভাবনীয় ঘটনা। জাদুবাস্তব গল্পের মতো মুহূর্তের মধ্যে এক অবস্থা থেকে পার্টির ভিন্ন এক অবস্থায় রূপান্তর ঘটে যায়। বাজ পড়া মানুষের মতো সকলে যে যার জায়গায় থির হয়ে থাকে। মিনিটখানেকের মধ্যে আবার পট পরিবর্তন ঘটে। এ কেমন জাদু-বুঝে উঠতে না পেরে অতিথিরা এদিকে-সেদিকে ছুটতে শুরু করেন।


    মিস্টার ফরিদের হাতে থাকা ফরাসি ভদকার সুদৃশ্য গ্লাসটি ফ্লোরে পড়ে যায়। প্রাথমিক ধাক্কা কেটে গেলে সবাই টের পান বাগানবাড়ির প্রবেশদ্বার কে যেন বাইরে থেকে বন্ধ করে দিয়েছে। আতংক আর বিস্ময়ে সবার চোখের মণি কোটর থেকে বেরিয়ে আসে, এ কী! কী দেখছেন তারা! সীমানাপ্রাচীর ডিঙিয়ে ঝাঁকে ঝাঁকে বানর লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে ফরিদ আহমেদের বাগান বাড়ির ভেতরে ঢুকে পড়েছে।

    ঢাকা শহরে বানরের আদি বসতি বংশাল, আলাউদ্দিন রোড, নবাবপুর রোড, রথখোলা, টিপু সুলতান, ভুতের গলি, নাজিরাবাজার-গুগোলে এসব তথ্য পাওয়া গেলেও এই এলাকায় বহু বছর হলো এদের দেখা যায়নি। নগরায়নের চাপে এরা বহু পূর্বে এলাকা ছেড়েছে। পাড়াটিও এখন সম্ভ্রান্ত হয়েছে। কিন্তু ফরিদ আহমেদের বাড়ির এই লেট নাইট পার্টিতে আজ তাদের এই অতর্কিতে আক্রমণের কোনো হেতু পাওয়া যায় না।

    পরিস্থিতি বেগতিক দেখে ফরিদ আহমেদ গর্জন করে গৃহপরিচারকদের ডাকতে থাকেন। আশেপাশে এরা কেউ নেই। ছত্রভঙ্গ অতিথিদের দিকে কাতর দৃষ্টিতে তাকাতে তাকাতে তিনি সম্ভাব্য ক্ষয়ক্ষতির আংশকায় অনুনয় করতে থাকেন, ‘প্লিজ ডোন্ট বি প্যানিকড...উইদিন ফাইভ মিনিটস... আই উইল কন্ট্রোল দ্যা সিচুয়েশন।’ অতিথিদের কেউ তার কথায় তার কথায় ভরসা পায় বলে মনে হয় না। তারা যে যার মতো পালাবার পথ খুঁজতে থাকেন।

    শহীদুল জহিরের ‘মহল্লায় বান্দর, আবদুল হালিমের মা এবং আমরা’ গল্পটির কথা মনে পড়তেই ফরিদ আহমেদের পাশে দাঁড়ানো মিস্টার রায়হান উৎসুক হয়ে ওঠেন। এদের উদ্দেশ্য কী বুঝে উঠতে না পারলেও অসীম কৌতূহলে তিনি অভিনব এই পরিস্থিতির ভিডিও করতে শুরু করেন। দুই মিনিটের মাথায় রায়হানের হাত থেকে তার প্রিয় আইফোনটি পড়ে যায়। সাত-আটটি ফিঁচকে ধরনের বানর বিচিত্র কায়দায় তাদের লাল লাল পশ্চাৎদেশ প্রদর্শন করতে করতে রায়হানকে ঘিরে ধরে। আতংকে রায়হান সর্বশক্তি দিয়ে চিৎকার করেন।

    আতংকে নীল হয়ে যাওয়া নুরে আলম চিৎকার করতেও পারছেন না। তিনি একটা নারিকেল গাছ বেয়ে অনেকটা উঠে গাছের সঙ্গে লেপ্টে আছেন, তাকে দেখে মনে হচ্ছে তিনি বানরের লাঠি বেয়ে ওঠার পাটিগণিতের সমাধানের জন্য ব্যবহারিক পদ্ধতি বেছে নিয়েছেন। আর ওদিকে নিচে দাঁড়ানো এক মাস্টারমশাই বানর লাঠি দিয়ে ছাত্রের পশ্চাৎদেশে খোঁচা দিচ্ছে।

    সাদা রঙের মখমল কভারের সোফার ওপরে দাঁড়ানো ‘ও মাই গড, ও মাই গড..’ বলে গর্জনশীল কণা মুৎসুদ্দিকে দেখতে দেখতে সোফার উল্টোদিকে বসে থাকা একটা ধাড়ি বানর দুই হাত তুলে তালি দেয়। কৌতুকাক্রান্ত বানরটি কণার মুখোমুখি দাঁড়ায়। এরপর সে গম্ভীরমুখে কণার আটাত্তর হাজার টাকা মূল্যের আড়ঙের আইবরি হাফসিল্ক জামদানি শাড়ির আঁচল ধরে টানতে থাকে। ওদিকে অনেকক্ষণ ধরে স্ত্রীকে খুঁজে না পেয়ে দিশেহারা ফরিদ আহমেদ সোফার উল্টোদিকে শাবাকে খুঁজে পান। সেখানে মিসেস শাবা বাংলা চলচিত্রের কিংবদন্তী নায়িকা শাবানা হয়ে সিনেমার শেষদৃশ্যের মতো ‘আল্লাহ তুমি রহম করো...’ বলতে বলতে হেঁচকি তুলছিলেন। স্বামীকে দেখে তিনি আভিজাত্য ভুলে হাউমাউ করে কাঁদেন, ‘তুমি আইছো, আমারে মাইরা ফেললো গো।’

    ঠিক তখনই বাড়ির ভেতর থেকে একদল বানর দুদ্দাড় করে বেরিয়ে আসে। এরা বয়সে নবীন। এদের প্রত্যেকের হাতে একটি করে বালিশ। নরমনরম বালিশগুলোকে ঘাসের গালিচায় বিছিয়ে এরা রাজকীয় কায়দায় শুয়ে পড়ে। কয়েকজন শুয়ে শুয়েই হাতে কায়দা করে ধরা চিকেন টিক্কা খেতে শুরু করে।

    বুফে টেবিল ঘিরে থাকা কয়েকটি বানর অবিকল সাহেবী কায়দায় প্লেটে টুনা ফিস কারি, ভেটকি মাছের ফ্রাই তুলে কাঁটাচামচ লাগিয়ে খেতে থাকে। কেউ কেউ চামচ প্লেটের ধার ধারে না, হাত দিয়ে খাবলে খাবলে মাছ-মাংস তুলে খায়। ওদের উচ্ছৃঙ্খলতা দেখতে দেখতে শেভনিং স্কলার সাখাওয়াত হোসেন বিমূঢ় হয়ে ভাবেন, এরা নির্ঘাৎ ওল্ট টেস্টামেন্টে বর্ণিত সেন্ট লুইস ডেভিডের সময়ের বানরের উত্তরসূরী, যারা ডেভিডের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে পবিত্র দিনে মাছ শিকার করায় মানুষ থেকে অভিশপ্ত বানরে পরিণত হয়েছিল। ভাবতে ভাবতে তার মাথায় জট পাকিয়ে যায়, তিনি কিছুতেই মনে করতে পারেন না, ঠিক কী বারে এই ঘটনাটি ঘটছে-আজ কি শনিবার? অফিস ছুটি? আজ কি পবিত্র দিন?

    অপেক্ষাকৃত তাগড়া বানরগুলো ডান্স ফ্লোরে ফরাসি বাজনার সঙ্গে সঙ্গে বিচিত্র ভঙ্গিতে নাচছে, এদের সবার হাতের গ্লাস উপচে পড়ছে নানান রঙের পানীয়। পার্টিতে উপস্থিত মানুষদের অবাক হওয়ার পালা তখনো শেষ হয়নি। বালিশে মাথা আর পায়ের ওপর পা তুলে যেই বানরগুলো শুয়েছিল তারা আচমকা একেঅন্যের মাথায় চাটি মারতে শুরু করে। এদের মধ্যে নেতাগোছের একজন আন্দোলনের ডাক দিয়ে দুর্বোধ্য ভাষায় বক্তৃতাবাজি করতে থাকে। বক্তৃতা সেরে সে ইশারা করতেই দলের অন্যান্য সদস্য বালিশগুলোকে ছিঁড়েখুঁড়ে সফেদ তুলো হাওয়ায় উড়াতে থাকে।

    পরের দিন সকালে যখন পার্টির আয়োজক ও অতিথিদের উদ্ধার করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী আসে তখন তাদের কেউ চিনতে পারে না। উপস্থিত প্রাণিদের প্রত্যেকের গায়ে মানুষের পোশাক থাকলেও তাদের চালচলন একেবারে বানরসদৃশ দেখায়। এদের দেখে মনে হয় তারা স্কুলের বার্ষিক ক্রীড়া প্রতিযোগিতার পুরস্কার বিতরণীর দিনে যেমন খুশি তেমন সাজ সেজে শুয়ে, বসে আছেন।

    কালো রঙের ব্লেজার পরা, গলায় আধছেঁড়া সাদা-কালো চেক টাই পরা প্রাণিটিকে দেখে আন্দাজ করা যায় তিনি আয়োজক ফরিদ আহমেদ। হাতের স্ক্রিনভাঙা মোবাইলের দিকে তাকিয়ে তিনি ডুকরে কেঁদে ওঠেন। পার্টির ঘটনার ভিডিওচিত্র ধারণ করে কেউ একজন ফেসবুকে ছেড়ে দিয়েছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটি থেকে চোখ ফিরিয়ে তিনি ক্রোধে চিৎকার করে ওঠেন, ‘সব শালা নচ্ছার বান্দরের কাজ।’ একমাথা তুলো জড়ানো ভাঙাচোরা শরীরের ফরিদ আহমেদকে রাগত চেহারায় একেবারে ‘যেমন খুশি যেমন সাজো’তে মেকাপ নেয়া ধাড়ি বানরের মতো দেখায়। আবেগের চাপে তার মনে দিশেহারা ভাব জাগে। বুক ভরে শ্বাস টেনে ওপরে তাকিয়ে দৃশ্যটা দেখে তিনি চমকে যান।

    ছাদের ওপরে এক ঝাঁক বানর দাঁড়িয়ে আছে, ওদের ডান পাশে দাঁড়ানো গুস্তাভ আয়েশি ভঙ্গিতে হাই তুলছে। ফরিদ আহমেদ বিস্ফূরিত চোখে দেখেন, গুস্তাভর হাত ধরে দাঁড়ানো বানরটির পরনে আমেরিকান জর্জেটের মাখনরঙা শাড়ি যেটি তিনি গত বিবাহবার্ষিকীতে শাবাকে উপহার দিয়েছিলেন।

২টি মন্তব্য: