মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

মিজানুর রহমান নাসিম'এর গল্প: সমাধি



যাই যাই করছিলাম। কেমন উড়ু– উড়ু করছিল মন।

মনটাকে মানানোর চেষ্টা করছিলাম, মানলোই না ! শেষতক বাবুল বলল, ‘ যাই ত !’ আমিও ভাবলাম, যাই ত! বাবুল আমাকে টার্মিনাল পর্যন্ত দিয়ে গেল। ছ’মাস পর বাসে উঠছি, একটু অস্বস্তি লাগলেও বাস চলতে শুরু করলে বেশ ভালো লাগছে। বেশ করেছি বেরিয়ে পড়ে। এত স্টে হোম স্টে হোম করে, হাত-মুখ ধুয়ে ধুয়ে কি জীবন চলে? চারপাশে দরদ একেবারে উতলে উঠেছে, মাছের মায়েদের পুত্রশোকের ঢল! ফন্দিবাজেরা!

কয়েকমাস থেকে রাস্তা প্রায় ফাঁকাই বলা চলে। বন্ধই তো ছিল, এখন একটু একটু করে চলছে। এমন একটা সময়ে আমি নিজেকে গতিময় করে তুললাম, যখন চারপাশে হামেশা গতিটাকে টেনে ধরছে অদৃশ্য কোনো হাত। আমি তার নাগাল থেকে বেরিয়ে এসেছি। কি চমৎকার ব্যাপার তাই না! হাইওয়েতে বাসটা গো ধরে ছুটছে। যেন একটি টগবগে কালো এরাবিয়ান হর্স। মাঝেমধ্যে মনে হচ্ছে তাতেও কম বলা হচ্ছে। আমি আসলে উড়ন্ত লাল ড্রাগনের পিঠে সওয়ার হয়েছি। অপ্রতিরোধ্য যাত্রা।

অনেকদিন পর, বেশ ক’মাস হবে সকালবেলার তরতাজা বাতাস বেশ উপভোগ করছি। উড়ন্ত এই বাতাসে আমাদের টিউবওয়েলপাড়ের শিশিরভেজা শিউলির ঘ্রাণ! কিভাবে এলো কে জানে! আমাদের টিউবওয়েলটির কথা মনে পড়তে ওর ছবি চোখে চোখে ভাসছে, ঢালাই করা PH লেখা - জনস্বাস্থ্য বিভাগের সরবরাহকৃত। টিউবওয়েলটির জন্ম নাইনটিন সেভেনটি ফোরে ও আমার ছ বছরের ছোট। দিন দিন জলের স্তর নেমে যাচ্ছে, ফাল্গুন-চোত-বোশেখ এই তিন মাসে টিউবওয়েলে জল আসে না। কষ্টটা হয় মায়ের। মাকে শেকড়ছাড়া হতে হয়। আগে বাড়ি বাড়ি ইঁদারা ছিল, ভরাট করে ফেলা হয়েছে। ইঁদারাগুলো থাকলে জলের অভাব হতো না। অথচ সেই তিন তিনটি মাস তিনি এখান থেকে ওখান করে দিন কাটাতে বাধ্য হয়েছিলেন। ভাবা যায়!

বাসটা এক দমে আগাচ্ছে। আমি এখন একটি পরিচ্ছন্ন ছন্দের মধ্যে আছি। পিছনের কোনোকিছুই আর আমাকে ভজাতে পারছে না - দুনিয়াদারীর পোক্ত শিকড়, বনসাঁই লাইফ, লিলিপুটিয়ান লাইফ - কোনোকিছু না। জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মুড এসে গেলে ঠোঁট থেকে আপনা-আপনি ঝড়ে পড়ছে কবিতার পঙ্ক্তি। বাহ্, জীবন সত্যিই অতুলনীয়! মাঝেমধ্যে মনে হয় জীবনের অপর নামই কবিতা!

২.

উঠোনে পা রাখতেই আর তাড়া রইল না। তাড়া থাকে না। এখানে অন্য জীবন। বাঁক নেয়া সময় যার ঢেউ নেই বললেই চলে। পূবদক্ষিণে পাশাপাশি দুটো সমাধি। এখানেই লুকিয়ে আছে জীবনসম্পর্কীত সব কৌতূহল ও জিজ্ঞাসার উত্তর। কেউ এসে জেনে নিতে পারেন। বাঁশের বেড়ার শিয়র বরাবর আড়া। ধূলিতে গা-পা আর অরণ্যের কোলে মাথা গুঁজে অনন্তের ঘুম ঘুমানো - এটা গাঁয়ের মানুষের রীতি। আপনা-আপনি এই রীতি গড়ে উঠেছে।

সমাধিদুটোর দক্ষিণ পাশ দিয়ে আড়া ভেদ করে মেঠো পথ চলে গেছে। যে পথে এককালে একাব্বর কানা লবনের ভার নিয়ে বাজারে আসতো। ঐ পথ দিয়ে খুব বেশিদূর না যেতেই জলে ভাসা বিল। বিল পেরিয়ে রাঙামাটি গ্রাম, তারও ওপাশে শরিফপুর, তার গলাধরা সখা বহ্মপুত্র তারও ওপারে চর পক্ষীমারীর বালু আর বাতাসের ঝাপটা ।

গাছপালা ঘেরা সমাধিপাড়ে পাখিরা যে যার মত করে কলরব করছে। আপনাআপনি ফুরফুরি ঝরছে পাখির ঠোঁট থেকে, এমনকি সুর চুইয়ে পড়ছে পাতায় ডালে মাখামাখি হয়ে। এসব কলকাকলীই নির্জনতা। পীতরাজের পাতার আড়াল থেকে একমনে গমগমে গলা তুলছে একটি নিঃসঙ্গ ঘুঘু। ঝরাপাতায় ঢেকে আছে সমাধি দুটোর উপরিভাগ - যেন পাতার গিলাফ। আলো-ছায়ার লুকোচুরি আছে তবে চারপাশটা কেমন শীতল! এমন শীতলতা জীবনের ভঙুরতার কথা মনে করিয়ে দেয়। তবু প্রতিবার ফিরতি বাসে উঠতে উঠতেই আবার সব ভুলে যাই এবং সারাটা পথ স্ত্রীসঙ্গের বাসনায় বিভোর হতে থাকি।

আড়াটা ফাঁকা করে ফেলা হয়েছে। এর হাড় জিরজিরে হাত-পা গুলো বেরিয়ে পড়েছে। আড়াটা ছেঁড়া বসনের নারীর মত চেষ্টা করছে আব্রু ঢেকে রাখতে। আড়াটা এখনও পাখিদের কলরবে, কাঠবিড়ালির হুটোপুটিতে কী সজীব! আড়ার উত্তর কোল ঘেঁষে সবুজ-হলদে বিল। তারও অনেক অনেক উত্তরে রেডক্লিফের টানা দাগ। এখন সেটিই মরণঘাতী বেড়া। দাগের ওপারে গারো বা জৈন্তা পাহাড়ের চূড়া নীল মেঘের মত লেপ্টে আছে আকাশে। এখান থেকে কোনটি মেঘ আর কোনটি পাহাড়চূড়া আন্দাজ করার উপায় নেই। নীল আকাশ ছাড়া আছে আরও অসীম শূন্য যেখানে মাথা গুঁজে আছে অগণিত নক্ষত্ররাজি আর অনন্ত শীতলতা। এইসব ব্যাপার-স্যাপার বেশ মনে করিয়ে দেয় আদিকালের জ্ঞানী গ্রিকদের কথা - যারা জীবন ও জগৎ নিয়ে খুবই আকর্ষণীয় ও হেয়ালী গল্প বলত। মানুষ তন্ময় হয়ে শুনতো ওদের কথা। সেই গল্পগুলো এখন গ্রাম, আড়া বা জীবনের মত জীর্ণ।

৩.

দুপুরের চড়া রোদে কোত্থেকে এত কালো মেঘ এসে জড়ো হল কে জানে? কেনি গ্রাহাম ভরাট সুরে গাইছে--- Ô Life is like a bubble on water, once it's there and then it's gone...Õ । হ্যাঁ বেশ অনুভব করতে পারছি। গানটির জন্যে সত্যিই উপযুক্ত জায়গা। সমাধিদুটো ধীরে ধীরে অর্থপূর্ণ হয়ে ওঠছে। এর বাঁশের বাতার খোঁপগুলোতে ইতিমধ্যে উঁইপোকা রাজত্ব শুরু করেছে... মাটির সাথে মিশে যেতে সময় লাগবে না। খানিক চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। বাঁ হাতের ঘড়ির কাঁটা ডান করতল দিয়ে খামচে ধরেছি। কাঁটাটা যেন ঘুরতে না পারে। মনে হচ্ছে আমি সফল হতে পেরেছি। থির হয়ে আছে সব। এমনকি পাশের রাস্তায় চলাচলকারী গাঁয়ের লোকজনও। কেউ আর নড়ছে না। এমনকি পীতরাজের ডালের ঘুঘুর ফুরফুরিও কি বন্ধ হয়ে গেল! শালিক-ফেসকুলদের চেঁচামেচি? সব তো থ হয়ে আছে! সবকিছু মিলে এই স্থান অদ্ভুত নির্জন ও সরল যেখানে শান্তায়ানার মত প্রসন্ন মনে আমি কাটিয়ে দিতে চাই কিছু প্রহর। বেশ হবে। মা আমাকে ফুটফরমাশ দিবেন আর আমি তা হাসিমুখে করতে থাকব। মা’কে বলে দেবো কোনোকিছু না ছুঁতে - তার শরীরটাতো ইদানিং ঠিকঠাক যাচ্ছে না। এটা মা’কে বুঝতে হবে। কিন্তু আমি আসলে আটকাতে পারব না। গুনগুন করে কোনো অস্পষ্ট সুর তুলতে তুলতে মা ঠিকই এঘর ওঘর করবেন। বাবা নিশ্চিন্ত থাকবেন আমি আছি বলে - ভেবে নিবেন এবার সবকিছু ঠিকঠাক চলবে। পান খেয়ে মুখ লাল করে এদিক সেদিক অনর্থক ঘুরে বেড়াবেন। হায়, তিনি তো এখন ভারমুক্ত। হায় অপার্থিব মুক্তি!

আস্তে আস্তে হাতের বাঁধন আলগা হয়ে এলে তন্ময় ভর করল অজান্তেই। সমাধি ! বিশ্রামেরও সামাজিক নিয়ম আছে তবে ! আছে পার্থিব সম্পর্কের রীতি - বাবার লিগ্যাল জীবনসঙ্গী হিসেবে মা তাঁর পাশে যেভাবে থাকার কথা আর কি! খেয়াল হল, স্নিগ্ধ এক ভালোবাসায় জড়িয়ে আছে ওরা। পাশাপাশি। কি অন্তহীন ভালবাসা, এমন এক ভালোবাসা, যার সমাপ্তি বা পথের শেষ নেই। যদিও, গ্লানি ও জরাগ্রস্ত দেহের কষ্টে দুনিয়াদারীর বেশির ভাগ সময় পার করতেন ওরা। পরস্পরের প্রতি ছিল কটাক্ষ, বিদ্রুপ। নিমেষেই আক্রমণ করতেন একে অপরকে। সব এখন এসে থির দাঁড়িয়েছে ভালোবাসার একক বিন্দুতে। ভালোবাসার কী অসীম আকর্ষণ! মরণকেও কী মমতায় জড়িয়ে থাকে! অবিনাশী। এই সব যখন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছি, মনে হল ঈর্ষা বা দুঃখ ভারাক্রান্ত মন নিয়ে পাশ থেকে উড়াল দিল এক দেবদূত - যেন পৃথিবী থেকে এই তার শেষ প্রস্থান। মাটিতে গড়া মানুষের ভালোবাসার কী মহত্ব! তবে আমার মুখে খানিকটা বিদ্রুপ মেশানো হাসিও ফুটে উঠল। এই ভালোবাসার ফুয়ারা শীতল জল ছড়াচ্ছে এমন এক সময়, যখন তাদের নিজ নিজ কক্ষের কবাট চিরতরে বন্ধ! আর আমরা স্বজনেরাও তা নিয়ে বেশ স্বস্তিতে আছি - এখন আমাদের কোনো দায় নেই!

৪.

অন্ধকার নামল আগেভাগেই। টিমটিমে দুটো বাল্ব দু’পাশে জ্বলছে - যতটুকু আলো ছড়িয়ে দেয়া যায় আর কী। কুপিবাতির ঘুটঘুটে দিনগুলোর কথা মনে পড়ে গেল। ভয়ানক রকমে চড়াও হওয়া অন্ধকার। দানেজ পাগলার আড়ার বাসিন্দারা এখন রাজত্ব করতে থাকবে রাতভর। ফসফরাসের মত জ্বলজ্বল করতে থাকবে ক্ষুধার্ত লোলুপ চোখগুলো।

আজ আর আমার কিছু করার নেই। বেশ একটু আগেই ঘুমানো যাবে। অনেক দিন কেউ আসেনি বলে মাকড়সা নিজের মত করে শান্তিতে জাল বুনছে। বোদলেয়ার খামোখাই ওদের দোষারোপ করেছেন। ওরা শান্তির জালই বুনে। আহ্ মাকড়সার কী শান্তিময় জীবন! বিছানায় শুয়েই চোখ বুজলাম। শিয়াল ও বনবিড়ালের সেই আদিম হাঁক শোনা গেল। বাজখাঁই আওয়াজ। অন্ধকার ভেদ করে তীরের ফলার মত শা শা ছুটে এল কয়েকবার। যেন সদর্পে ঘোষণা দেয়া হল, দিনের আইন অচল এখন/রাতের কানুন চলবে...!

চলুক। অন্ধকারে যে যার মত করে টিকে থাকার লড়াই করতে থাকুক। এমনকি ডোবার পাড়ের পুরনো বাস্তুসাপটিও খাবার যোগাড়ের আয়োজন করতে থাকুক। এখন আমার ঘুমটা এলে বাঁচি।

খুব ভোরে বিছানা ছাড়লাম। আকাশে এখনও রাতের খানিকটা ছায়া লেপ্টে আছে। এমন সাততাড়াতাড়ি ভোরে বিলটা ঘুমিয়েই থাকে। সময়টা শীত বা গরমকাল - যাই হোক না কেন। গাছপালার ফাঁকে উঁকি দিয়ে দেখি, কুয়াশায় ঘোলা বিল। অবশ্য সূর্যের আলো পড়তে শুরু করলেই এটা কেটে যাবে। আরও কিছুক্ষণ। তখন মন্ডলবাড়ির শিমুল গাছ থেকে পাখপাখালিরাও নেমে খাবারের সন্ধান শুরু করবে। এর পর সবুজ জমিনে চলবে বকের শাদা শাদা পাখার উড়াল খেলা।

ভোরের আলোয় ধানের হলদে সবুজ চারাগুলো ঝলমল করছে। কি প্রাণবন্ত হাসি! বিল আর বিল নেই, পুরোটাই সবুজ মখমল। মেহেরুন্নেসার তর সয় না। পায়ে পায়ে এগিয়ে যান বিলের ধারে। এই এক-দেড় মাস প্রতিদিন তিনি দু’চোখ ভরে দেখতে থাকবেন তারপর গুনে গুনে পার করবেন দিন। নাটাকুড়া বিলে আশ্বিনেও জল। এ বিলে প্রায় সারাটা বছর জল। জমির দাগ-নিশানা জলের তলে হাবুডুবু খাচ্ছে। তবু মেহেরুন্নেসা ঠিক চিনে ফেলেন তার জমিন। ঐ তো- দক্ষিণপশ্চিমের লাগালাগি সাত-সাতটি চক। জলকুমরীর হরিদ্রাভ শীষগুচ্ছ আকাশের দিকে পিঠ বাঁকিয়ে নুয়ে আছে। এবার পাখিতে বারো মণ ঘরে উঠবেই। তাঁর চোখদুটো খুশিতে ঝিলিক দিয়ে ওঠে। জলকুমরীর ডগা মানেই সব অভাবকে পরাস্ত করা।

৫.

দুনিয়াদারি ভালোই জেঁকে বসল। বাবা বাজারে গেলেন। তিনি যাবেনই, বারবার যাবেন, যতক্ষণ না এজমায় হাঁপিয়ে উঠছেন। তাঁর জীবনে গতি চাই, স্থানু হলেই তিনি নিজেকে অসহায় ভাবেন। এমনকি যৌবনকালেও, একদিন বাইরে যেতে না পারলে তাঁর চোখে অন্ধকার নেমে আসে। আর তার প্রয়োজন মায়ের শরীর। আমি জানি, ভালোবাসার চেয়েও অনেক বেশি জরুরি বাবার ভোগ। শুধু তাকেই বা দোষ দিই কেন? ভালোবাসার নামে আমরা সবাই কীই-না ভোগবাদী!

সূর্যটা তরমুজের বুকের মত টকটকে লাল। এমন তরতাজা যেন সৃষ্টির প্রথম প্রহর। যেন এইমাত্র বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে সূর্যটার জন্ম হল। গাঁয়ের সবচে উঁচু ডালগুলোর মাথায় সিঁদুরের মত তার গাঢ় লাল রেখা ফুটেছে। বাবা আর এক মুহূর্ত ঘরে থাকতে পারেন না। আজ সন্ধ্যা অব্দি কমপক্ষে আট-দশবার বাজারে যাবেন। মাসুমের চায়ের দোকানে বসে চা খাবেন আর নানা গল্প শুনবেন। তিনি ছাড়া আর ক’জনই বা আছেন এই গাঁয়ে! পাকা ফলের মত বৃদ্ধেরা টপাটপ খসে পড়ছে জীবন থেকে। দেখতে দেখতে এই পাঁচ-ছ বছরে গ্রামটা বৃদ্ধশূন্য হয়ে গেল। বাবাকে সেই জায়গাটা পূরণ করতে হবে। গ্রামবাসীরা চায় বাবা যেন গাঁয়ের পথটায় একটু হাঁটাহাঁটি করেন। গাঁয়ের মানুষদের একটু ধমক গমক দেখান। আর বাজারে বসে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা কাটিয়ে দেন আলাপেসালাপে। তিনি যাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই জমজমাট হয়ে যায় আসরটা। হবেই না বা কেন, এখনও গ্রাম-শহর-দেশ-দশের গল্পের ঝোলা প্রথমে খুলাই হয় বাজারে। পরিবেশনও করা হয় আকর্ষণীয় করে। এর পরে পূব পাড়া কি পশ্চিম পাড়া।

নিশ্চয় গেল মাসের নির্বাচন নিয়ে সবাই কথা বলছে। তামাশা করছে মুখ ভেংচিয়ে। কেউ কেউ কথা বলতে বলতে বেঞ্চ থেকে উঠে পড়ছে। এসব শুনে শুনে বাবা ঘন্টার পর ঘন্টা সময় পার করবেন। মন্তব্য করবেন হেয়ালি করে। সত্যিই তো তেরটি বছর...! এরই ফাঁকে খবরের সময় সবাইকে চুপ করিয়ে দিয়ে বাবা খবর শুনবেন - খুন-ধর্ষণে ছয়লাব দেশ... জনগণের নিরাপত্তা... টাকা মেরে, পাচার করে শেষ করে দিল সব! কবে যে ফের ‘তলাবিহীন ঝুড়ি’ নামে ডাকা হবে! ক্যাসিনো আর বাকি সব অপরাধজগতের সব খবর বেরিয়ে আসছে, এটা কি বাংলাদেশ! সব তিনি খুঁটে খুঁটে শুনবেন। অবশ্য একটু-আধটু স্টার জলসাও বাদ যাবে না। এরপর ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসবেন বাড়িতে।

দুপুরের রোদ বেশ চড়াও হয়েছে। রহমান মুল্লে হুঁকোয় ফুঁ দিয়ে খুক খুক করে কাঁশছে। জন্ম থেকেই সে শুধু কেশে যাচ্ছে। তামাক জলের গুড়গুড় শব্দ শোনা যাচ্ছে। রহমান মুল্লে মাঝেমধ্যে চিৎকার করে গরুর চাড়িতে পানি দিবার জন্যে তার ডাঙর ছেলে চান্দকে তাড়া দিচ্ছে। নইলে গরুবাছুরেরা তৃষ্ণায় ছাতি ফেটে মারা পড়বে। উঠানের ওপাশ থেকে ভেসে আসছে খালেক দাদার পুথি পড়ার সুর-- কারবালার কেচ্ছা। সেখানেও পিপাসা! আহ্ দুনিয়াটাই বুঝি পিপাসাময়, ছাতি ফেটে মরবে সবাই!

মাথায় লুঙি পেঁচিয়ে বয়াতি গানের সুর তোলে ইদি গা ধুতে যাচ্ছে সরকার বাড়ির পুকুরে। গত রাতে কি বাজারে কারও দোকানের হালখাতায় বয়াতি আনা হয়েছিল? বাজারটা তবে গতরাতে কী জমজমাটাই না গেল! আসরে চুপটি মেরে বসে একটু শুনলে কী হতো, কালঘুমের নহর নামলো দুইচোখে! এই বয়াতি যদি আর না আনে কেউ? কাছেপিঠে থেকেও এমন মিস কেউ করে! আহ্ কী গলা বয়াতীর! বাঁ হাতে একতারা, ডানহাতে বাজছে কোমরে গুজা ঢোল, পায়ে মল আর মুখে মিষ্টি সুরের নহর। ধেৎ,ওসব রেওয়াজ কবে বদলে গেছে! এখন মোবাইলে হিন্দি গান ছেড়ে দেয়া হবে সাউন্ড বক্সে।

৬.

দম বন্ধ হয়ে আসার আগেই শহরে দিলাম ছুট। ঘন্টাতিনেক কাটিয়ে এলে মন্দ হয় না, অন্তত একঘেয়েমীটা দূর করা যাবে। ছোট্ট শহরটা ভেজা কাগজের মত জবুথবু হয়ে আছে। রাস্তা, কালভার্টের খোঁড়াখুড়ি চলছে। দুইপাশের দোকানপাট শুধু পেছাচ্ছে। একসময় আবারও পেছানো হবে। আবার। আবার। এত মানুষ বাড়লে কি আর হবে! একসময় গোটা দেশটাই হয়ে যাবে সড়ক আর মানুষ হবে উদ্বাস্তু!

লম্বাগাছ দুটো কাটা পড়েছে। পাশের কফিশপে চা খেতে খেতে শুনলাম বেশ কয়েক বছর আগে লম্বাগাছ দুটো উপড়ে ফেলা হয়েছে। আহ্ রে, জিরাফের মত গলা বাড়ানো আমাদের আকাশছোঁয়া লম্বাগাছ, যা দিয়ে আমরা বোসপাড়ার কিশোরেরা আকাশ আর পানির ট্যাংকির উচ্চতা মাপতাম। ছোট্ট শহরটার উঁচু মাথার জন্যে কতই না গর্ব হত!

বায়ের গলিতে ঢুকে গেলাম। কিছুই চেনা যাচ্ছে না। এটা কি বোসপাড়া! রাস্তার মোড়েই একটা পুরনো দালান, দুপাশের নতুন স্থাপনা দিয়ে ঠেসে ধরা হয়েছে। উঁকি দিয়ে দেখলাম, হোসেন মঞ্জিল, স্থাপিত ১৯৬৪ ইং - বারান্দার কার্নিশে খোদাই করা ফলক। বেশিদিনের কথা না, অথচ ছোটবেলায় ভাবতাম কত আদ্যিকালের বাড়ি! হোসেন সাহেবের মা - অভিজাত বুড়ি মা। কী তাঁর হাঁকডাক। বাড়ির পিছনে পুকুর, পুকুরভরা বড় বড় মাছ। একদিন পঞ্চাশ টাকার কাতল উঠল জালে! পুকুরপাড়ের করমচা গাছে ঝুলে টকটকে লাল ফল হাতড়ানো শৈশব! তার ঠিক পিছনেই জলিল বখ্সের বাসা। একতলা দালানের গা ঘেষে মিষ্টি বরই গাছ। তার পাশেই আমাদের টিনের ভাড়া বাসা - ভাড়া আশি টাকা। জলিল কাকা ভাড়ার জন্যে দু’বার ঘুরে গেলেন। মা গজারির খড়ি শুকাতে দিয়েছেন রোদে। শোলাটোলাও শেষ। চুলায় ফুঁ দিতে দিতে মা’র চোখটা ফুলে রক্তজবা হয়ে আছে। মা মাসকালাইয়ের ডাল রান্না করবেন।

সোয়া তিন শ বছরের পুরনো দয়াময়ী মন্দির। ভেতরে শিব, কালি ও মনসার আলাদা আলাদা ঘরসংসার। নাচের জন্যেও খোলা জায়গা। পূজোয়, অষ্টমীতে কি সব খানদানী আয়োজন! চোখ ধাঁধিয়ে যেত দেখে। মন্দিরের গোলাপী চূড়া দেখা যাচ্ছে। রঙের গাঢ় পোঁছ দিয়ে কেমন যেন মলিনতা ঢেকে রাখা হয়েছে বলে মনে হয়। দিন দিন কেমন আঁটো হয়ে যাচ্ছে। দখলদারি কে থামায়! মন্দিরের প্যারা- কি অপূর্ব স্বাদ! মনোবসাকের স্টলে আগের মত লবঙ্গ হয়? অমন টুইটুম্বুর রসালো? ‘ঢুকলেই তো অয় ! আরে ব্যাঠা, আইছই যহন, এডা ঢু মার না ওইহানে? কতহন নাগবো!’ থাক গে। প্রশ্ন হয়ে ছবি হয়েই সযতনে থাক আমার দয়াময়ীর প্যারা আর মনোবসাকের লবঙ্গ। কাঞ্জিলাল এখন কোথায় কে জানে? মার্কসিস্ট পুরোহিত! কি দারুণ রোমান্টিক ব্যাপার! জিরো পয়েন্ট থেকে ডানপাশে কিছুটা গিয়ে হাতের বাঁয়ে যৌনপল্লী। এখন তো নেই, বছর বিশেক বুঝি হল, খরগোশের মত পালিয়েছিল। অনেকে হয়ত মাথা গুঁজেছে পথে। উদ্বাস্তুদের জন্যে পথও তো আশ্রয়। পথ থেকেই এখন একসময়ের হামলাকারীদের লালসা মিটিয়ে চলছে প্রতিরাতে। বাসাভাড়া নেয়া ছদ্মবেশী যৌনসেবীও আছে এই শহরে - ওরা অভিজাত, এদের মত উন্মূল না। নানা কায়দায় ওসব চলছে। যৌনতা আদিম এবং অনিবার।

শহীদ হারুণ সড়ক। একাত্তরের শহীদের নামে ছোট্ট এই গলির নামকরণ করে বেশ পবিত্র দায়িত্ব সম্পন্ন করা হয়েছে! দেবজ্যোতির বাসা এই গলিতেই। ওর বাসায় আসতেই হাঁপিয়ে গেলাম। দেবজ্যোতি নাটক ভুলে গেছে, এমনকি আবৃত্তিও। এখন ওর চেম্বারে আইনের নানা বই, ডিএলআর-এর কপি। আইনজীবী হিসেবে খানিকটা নামও করেছে। অনেককিছু কেমন অজান্তে হারিয়ে যায়! শুধু দেবজ্যোতির হাসিটা অবিকল আগের মতই। স্কুল থেকে ফেরার পথে ব্রহ্মপুত্র পারের বালুতট ধরে আমরা ছোঁয়াছুঁয়ি খেলে দৌঁড়াতাম। মনে আছে ছুঁতে না পারলে দেবজ্যোতি দরাজ গলায় ব্যঙ্গ করে হেসে উঠত। ফের দিত ছুট। মনে করিয়ে দিতেই সে গমগমে হাসি উপহার দিল।

চা খেতে খেতে বারী ভাই এলেন। শহীদ হারুণ সড়কের ও দিকটা আরও নর্দমাময়। কতদিনে ঠিকঠাক হবে কে জানে! কবি নর্দমায় বাস করেন। কবিদের বাসস্থান তো এমনই! ধুঁকে ধুঁকে দু’চারটি কবিতা লিখেছেন - সেই কথা হয়তো তুলবেন। বারী ভাই এক সময় লিখেছিলেন, ‘মৃত ফলের মত পড়ে আছে আমার ঘুম/ কাকে খাওয়া, পোকায় খাওয়া, পাখিতে খাওয়া...’ এখনও মনে আছে এটুকু। প্রথমবার তাঁর সামনে এ দু’লাইন আবৃত্তি করতেই বারী ভাইয়ের মুখটা আনন্দে ভরে গিয়েছিল। কবিরা কত অল্পে খুশি!


৭.

আর দেরি করা ঠিক হবে না। বিদ্যুত না থাকলে ওটা এখনও অন্ধকারের সমুদ্র। গেইটপার থেকে অটোরিক্সায় উঠে বসলাম। যেতে চল্লিশ মিনিট লাগবে। আগে একটা বেলাই লেগে যেত! কত সহজ হয়েছে চলাচল!

অন্ধকারে সমাধিদুটো বুঝা যাচ্ছে না। আড়ার সাথে মিশে গেছে। আহ্ রে সারাটা বছর এমন অন্ধকারেই থাকে! কে আর তেমন আসে এখানে। সমাধির জন্যে আলোই কি আর অন্ধকারই বা কি! কোনোটাতেই কিছু এসে যায় না। ঘরে ঢুকে বাল্ব জ্বালালাম। মনে হয় এক জীবনের আঁধার কেটে গেল!

দক্ষিণের বাড়িটা থেকে ঘোড়ার ডাক শুনা যাচ্ছে। অন্য সময় হলে ক্লিন্ট ইস্টউডের ‘গুড, ব্যাড এন্ড আগলি’র দৃশ্যগুলো মনে করার চেষ্টা করতাম। এখন না, এখন শমসের গাড়োয়ানের ছেলে জলি বাড়ি ফিরেছে। পরিশ্রান্ত ঘোড়াটা এখন শুকনো ঘাস বা খোসা চিবাচ্ছে। পেটে খেলে তবেই না পিঠে সয়! শমসের গাড়োয়ান গরুতেই এক জীবন কাটিয়ে দিল! মনে পড়ে তার গরুর গাড়িতে করেই শহর থেকে মায়ের সংসারটা ভেঙে আনা হয়েছিল গাঁয়ের এই পুরান ভিটায়। মা নাকি-কান্না আর অনিশ্চিত জীবনের আতঙ্কে সব জিনিসপত্র খামচে তুলে দিচ্ছিলেন গাড়িতে। বাবার ছিল বোবা-অপরাধী মুখ। চল্লিশ বছর হয়ে গেল! চাপা পড়ে গেল অনেককিছু। শমসের গাড়োয়ানের কোমর পড়ে গেছে, মুখ হা করে লাঠি ভর দিয়ে হাঁটেন। এখন জলি ঘোড়া জুড়েছে। অন্যকিছু না হোক, চলার গতিটা তো বেড়ে গেছে!

আরো দক্ষিণে কেরাণী বাড়ি মৃতবৎ পড়ে আছে। কেরাণীরা মরে সাফ। এ গাঁয়ে ওদের মত বড় গৃহস্থ আর কে ছিল? গনশু মন্ডল কামলাপাট নিয়ে মালকোছা মেরে লেগে গেছে? বড় গিরস্থি সামলাতে হলে নিজেকেও লেগে পড়তে হয়। গনশু দাদা লাউপাতায় করে একটু মাছ এনেও মাকে দিতে পারে। দিচ্ছে না তো! ওদের নামচিহ্ন আর গিরস্থির ফসিলটা পড়ে আছে ঐ পতিত ভিটায়। ও বাড়িতে এখন লোকজনের সাড়াই নেই এটা ভাবা যায়! মাঝেমধ্যে কি পৃথিবীতে এক একটা মড়কলাগা রাত নেমে আসে?

কুকুর দুটো দরজার পাশে শুয়ে লেজ নাড়াচ্ছে। দরজা খুলার সময়ই জানান দিয়েছে। ওদের জন্যে রুটি আনার একদম খেয়াল নেই কিন্তু কিছু একটা তো দিতে হবে? বাবা তরকারিমাখা ভাত কুকুরগুলোকে খাওয়াতেন। আশেপাশের বাড়ির লোকেরা বলে, এখনও নাকি অভিজাত চালচলন, যা তায় মুখ দেয় না! কুকুর দুটো সমাধিপাশে গিয়ে যখন তখন শুয়ে থাকে। ওরা কতই না মহান! জ্যাক লন্ডনের বাক্-এর কথা মনে পড়ছে খুব। যদি কুকুরমানুষ হওয়া যেত! এই ঘর-বাজার-শহর করেও দিন খারাপ কাটত না। বাবা ক্ষণে ক্ষণে বাজারে যেতেন। মা বাঁশঝাড়ের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিতেন পাকা ধানের শীষ দেখতে। আঁটিগুলো উঠানে রাখতেই জলকুমরীর ঘ্রাণে আঙিনা ম ম করত। মা পান মুখে ধান সিদ্ধ দেখতেন। জমেলা বুড়ি চিল্লিয়ে ডাকতেন - মিনামাও, অ মিনামাও!

সমাধিপাশের ফাঁকা জায়গাটায় রৌদ্রছায়ার লুকোচুরি চলছে। নক্ষত্রের মত নির্জনতা। ‘তুমি যা ভালবাস তা হারিয়ে যেতে পারে কিন্তু অবশেষে ভালোবাসা তোমার কাছেই ফিরে আসে, অন্যভাবে।’

মৃত্যুর বছরখানেক আগে কাফকা লিখে গিয়েছিলেন।




লেখক পরিচিতি:
মিজানুর রহমান নাসিম

গল্পকার। অধ্যাপনা করেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দর্শনশাস্ত্রে স্নাতক, স্নাতকোত্তর এবং পিএইচডি। প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ দুটি। মননরেখা নামে একটি প্রিন্ট পত্রিকার তিনি সম্পাদক।

 

1 টি মন্তব্য:

  1. অসাধারণ লিখেছেন নাসিম ভাই। 'Life is like a bubble on water, once it's there and then it's gone.' কেনি গ্রাহামের গানের এই দর্শনটি গল্পটিকে Dominate-করেছে এবং 'তুমি যা ভালোবাস তা হারিয়ে যেতে পারে কিন্তু অবশেষে ভালোবাসা তোমার কাছেই ফিরে আসে, অন্যভাবে।' গল্পটির শেষ পর্যায়ের আর একটি দর্শনজাত এই বাক্যটি গল্পটিকে বাঁচিয়ে রাখবে ব'লে আমার বিশ্বাস। উপমা উৎপ্রেক্ষা-ঋদ্ধ এ গল্পটিকে সবার পাঠ করা উচিত। গল্পটি রচনার জন্যে আপনাকে অভিনন্দন।

    উত্তর দিনমুছুন