মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

মল্লিকা ধরের গল্প: নীল চাঁদের গান



১.

আনন্দ অপেক্ষা করছিল শেষ বিকেল থেকেই । সূর্যাস্ত হল, আকাশ ভরে গেল গোধূলির অপরূপ বর্ণসুষমায়, এখন সেই রঙ মিলিয়ে গিয়েছে । চরাচর ভরে উঠছে শুক্লা দ্বাদশীর জ্যোৎস্নায় । আনন্দের ধৈর্য্যের অভাব নেই । সে জানে, কথা যখন দিয়েছে তখন আসবেই চন্দ্রলেখা ।

শুক্লা দ্বাদশী । পূর্ণিমার মাত্র কয়েক দিন বাকী । ভরা চাঁদ স্নিগ্ধ জ্যোৎস্নায় ভরিয়ে দিচ্ছে চরাচর । সেই জ্যোৎস্নায় রুপোর মতন চিকচিক করছে এক রূপ-ছলছল নদী । নদীর নাম তরঙ্গিনী । সেই নাম মুখে মুখে সহজ হয়ে এখন হয়ে দাঁড়িয়েছে তুরাই ।

এই তুরাই নদীর তীরে ছোট্টো গ্রাম চম্পা নাগেশ্বর । ছোট্টো গ্রাম হলে কী হবে, নামটি জম্পেশ । এই এত বড় নাম মুখে মুখে ছোটো হয়ে নাগচম্পা হয়েছে । গ্রামের মাঝখানে এক পবিত্র চম্পা নাগেশ্বর গাছ, সেই থেকেই গ্রামের নাম । এই গ্রামেই থাকে চন্দ্রলেখা । আনন্দ থাকে পাশের গ্রামে, গ্রামের নাম সন্ধ্যামণি । সে গ্রাম সন্ধ্যামণিফুলের গাছে একেবারে ভর্তি, সেই থেকেই নাম ।

শুক্লা দ্বাদশীর মায়াবী জ্যোৎস্নায় তুরাই নদীর তীরের এক নিভৃত বাঁকে আজ অপেক্ষা করে আছে কিশোর আনন্দ । সেখানে তার সঙ্গে দেখা করতে আসবে কিশোরী চন্দ্রলেখা, সবাই ডাকে চন্দ্রা বলে । ওই তো দূরে দেখা যায় চন্দ্রার আবছা চলন্ত অবয়ব ।

আরো কাছে এলে দেখা যায় তার মুখ, বৃষ্টিধৌত হিমচম্পার মতন স্নিগ্ধ । কোমল কৃষ্ণকেশ ঘিরে আছে সেই মুখ, যেন শ্যামল পত্রপল্লবের রাশি । বেণী বাঁধে নি চন্দ্রা আজ, খোলা চুলের রাশি ছড়িয়ে আছে পিঠে, শুধু কানের পাশ থেকে এক চিলতে চুল নিয়ে গিঁট দিয়ে রেখেছে সন্ধ্যায় বেরোবার আগে ।

দূর থেকে তাকে দেখেই গুনগুন করে গান গেয়ে ওঠে আনন্দ, আরো কাছে এসে গানের কলিগুলো স্পষ্ট শুনে চিনতে পারে চন্দ্রা । সেও ওই গানের পরের অংশ গেয়ে উত্তর দেয় ।

ওরা দু’জনেই গানে দক্ষ, গান গাইতেই শুধু না, গান রচনা করতেও । কত ছোটোবেলা থেকেই পরিচয় ওদের, একসঙ্গে খেলাধূলো করেছে, লেখাপড়া করেছে, গান গেয়েছে, গান রচনাও করেছে । তখন শুধু বন্ধুত্বের বাইরে আর কিছু ভাবে নি । তারপর একদিন কৈশোরে পৌঁছে দু'জনেই বুঝতে পারে তাদের মধ্যে বন্ধুত্ব ছাপিয়ে আরো গভীর টান দেখা দিয়েছে ।

এক শরতের ভোরবেলা দু'জনে মিলে বাগানে পুজোর ফুল তুলতে গিয়ে পরস্পরের চোখের দিকে চেয়ে অবাক হয়ে গেল তারা । গভীর অচিন রহস্য প্রদীপের শিখার মতন কাঁপছে দু'জনের চোখের তারায় । কথা বলতে পারল না, ফুলতোলার কথাও ভুলে গেল, ওভাবে পাথরের মূর্তির মতন হয়ে তাঁরা দাঁড়িয়ে রইল অনেক অনেকক্ষণ । তারপরে দূর থেকে চন্দ্রার মায়ের "চন্দ্রা –আ, ফুল তোলা হল রে তোদের ? পূজার বেলা যে যায় ! " শুনে চমক ভাঙল তাদের ।

চন্দ্রা সাড়া দিল, "যাই মা, এই তো আর একটু বাকী ।"

বাগান থেকে দ্রুত পুষ্পচয়ন করে তারা পুজোর ঘরে দিতে গেল ।

ভালোবাসার কথা, নরনারীর প্রণয়ের কথা তাদের অজানা ছিল না । গানে কবিতায় মহাকাব্যে পুরাণকথায় ভালোবাসার কথা তারা শুনেছে বহু বহুবার । কিন্তু সহসা নিজেদের মাঝখানে যে একদিন সে আশ্চর্যের অলৌকিক আবির্ভাব হবে সেটা তারা সেই ভোরবেলার আগে জানত না ।

সেদিনের পর থেকেই তাদের মধ্যে সরল সখ্যতার সম্পর্ক বদলে গেল । বাইরে থেকে তখনও তারা আগের মতই, একসঙ্গে লেখাপড়া, গান ও কাব্যরচনা করা ---এইসবে ব্যস্ত । কিন্তু ভেতরে ভেতরে গোপণ চিঠি চালাচালি শুরু হল তাদের মধ্যে । আজ যেমন এইখানে দেখা করার কথা, চন্দ্রাই চিঠি লিখে জানিয়েছিল আনন্দকে । সেই অনুসারেই এখানে অপেক্ষা করছে আনন্দ ।

জ্যোৎস্না-টলটল আকাশের নিচে চম্পাবরণী চন্দ্রলেখা আনন্দের কাছে এসে মুখোমুখি দাঁড়ায় । বলে, "আমার আসতে দেরি হয়ে গেল, না?"

আনন্দ কথা বলতে পারে না, তার চোখ সরে না চন্দ্রার দিক থেকে । সে শুধু নীরবে দু'দিকে মাথা দুলিয়ে জানায়, না দেরি হয় নি । মনে মনে বলে, চম্পাবরণী কন্যা, এই এত জ্যোৎস্নার মধ্যেই তো তোর আসার কথা ।

চন্দ্রা হাসে, বলে, "কথা বলতে ভুলে গেলি নাকি, আনন্দ? মাথা নেড়ে নেড়ে উত্তর দিস যে?"

আনন্দ তবুও স্বর ফিরে পায় না, নিঃশব্দে হাসে শুধু । চন্দ্রা হাত ধরে তাকে নিয়ে যায় নদীর কাছে । একেবারে জলের কাছে যেখানে পাড় থেকে ঝুঁকে পড়েছে কুসুমিত লতাগুল্মের রাশি, তারই পাশে কোমল দুর্বার আসনে বসে তারা পাশাপাশি ।

নদীর কুলকুল ধ্বনি শোনে দু'জনে । জ্যোৎস্না ততক্ষণে আরও তীব্র, আরও উজ্জ্বল ।

চন্দ্রা বলে, "নদীর গান শুনতে পাচ্ছিস আনন্দ?"

আনন্দ ততক্ষণে ওর স্বর ফিরে পেয়েছে । বলে, "হ্যাঁ । নদীর গান খুব মিঠে । কিন্তু ওর গানের ভাষা তো আমাদের জানা নেই । তাই শুধুই সুর শুনি, কী বলছে বুঝতে পারি না । "

চন্দ্রা হেসে বলে, "পারিস না বুঝি? আমি কিন্তু বুঝতে পারি ওর ভাষা । নদী কী বলছে জানিস?"

আনন্দ অবাক-চোখে চন্দ্রার দিকে চেয়ে বলে, "কী বলছে?"

চন্দ্রা বলে, "নদী বলছে, 'আনন্দ, আনন্দ, আনন্দ । সমুদ্রে যাচ্ছি কিনা, তাই বড় আনন্দ হচ্ছে আমার ।' "

আনন্দের মুখ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে, সে বলে, "এখন আমিও শুনতে পাচ্ছি । নদী বলছে, "চন্দ্রা, চন্দ্রা, চন্দ্রলেখা, আমার সঙ্গে যাবে চন্দ্রলেখা? এই দ্যাখো আমার বুকের মধ্যে আকাশের চন্দ্রলেখা, কিন্তু আমার সঙ্গে সঙ্গে সে সমুদ্রে যায় না । আমি ধারাস্রোতে বহে যাই, সে রয়ে যায় একই জায়গায় । নাগচম্পা গাঁয়ের চম্পাবরণী চন্দ্রলেখা, তুমি আমার সঙ্গে যাবে? ' "

চন্দ্রা বলে, "তাই বুঝি? কিন্তু আমি যে শুনছি নদী বলছে, 'আনন্দ আনন্দ আনন্দ, সমুদ্রে যেতে বড় আনন্দ । কে পাশে পড়ে রইল, কোন্‌ গাঁয়ের কোন্‌ চন্দ্রলেখা, তার কথা ভাবতে যাবো কেন? সমুদ্রে যাবার আগ্রহ থাকলে সে নিজেই যাবে, আমার ডাকের অপেক্ষায় থাকবে না ।' "

আনন্দ চেয়ে থাকে চন্দ্রার মুখের দিকে, তারপর আস্তে আস্তে বলে, "যদি তারা একসঙ্গে যায় সমুদ্রে? "

চন্দ্রা বলে, "কারা? কারা একসঙ্গে যাবে? "

ফিসফিস করে আনন্দ বলে, "আনন্দ আর চন্দ্রা ।"

চন্দ্রা তৎক্ষণাৎ বলে, “আনন্দ ডাকলে চন্দ্রা কখনো না গিয়ে পারে?"

তারপর কেজানে কেন দীর্ঘ্শ্বাস ফেলে সে । আস্তে আস্তে দৃষ্টি আকাশের চাঁদের দিকে ভাসিয়ে দিয়ে বলে, " কিন্তু আনন্দ হয়তো তাকে ডাকবে না, ভুলে যাবে । চন্দ্রলেখা একা রয়ে যাবে নীলকন্ঠের জটায়, আনন্দ তরী বেয়ে সমুদ্রে চলে যাবে ।"

হঠাৎ এত বিষাদাচ্ছন্ন শোনায় চন্দ্রার গলা, আনন্দ আকুল হয়ে ওঠে । চন্দ্রাকে জড়িয়ে ধরে ঠোঁটে ঠোঁট ছোঁয়ায় । তারপর আস্তে আস্তে বলে, "এত বিষাদময়ী কেন চন্দ্রা? কী হল তোর? আনন্দ কোনোদিন চন্দ্রাকে ভুলবে না । মৃত্যুও তাকে ভুলিয়ে দিতে পারবে না । এ জন্ম পার হয়ে সে পরজন্মেও মনে রাখবে তার চন্দ্রলেখাকে । "

চন্দ্রা চেয়ে থাকে আনন্দের চোখের দিকে । তার কালো চোখের ভিতর ছলছল করে আকাশের চাঁদের উজ্জ্বল শরীর । দেখে দেখে আশ মেটে না আনন্দের, কেবল মনে হয় এত সৌন্দর্য কি এই পৃথিবীর হতে পারে? ওই আকাশের চাঁদ থেকে নেমেছে এই কন্যা, হয়তো মিলিয়ে যাবে জ্যোৎস্নার মায়ার মতন ।

সে হাত বাড়িয়ে কাছে টানে চন্দ্রাকে, শক্ত করে জড়িয়ে ধরে রাখে বুকের মধ্যে । শান্ত কপোতীর মতন আনন্দের বুকে পড়ে থাকে চন্দ্রলেখা । একসময় কোমল তৃণাবৃত ভূমিতে শয়ন করে তারা দু'জন, আকাশের চন্দ্রতারাদের সাক্ষী রেখে পরস্পরকে গ্রহণ করতে প্রস্তুত হয় ।এমন সময় কোথায় যেন একটা রাতচরা পাখি ডেকে ওঠে বাতাস চিরে দিয়ে, আর্তনাদের মতন ।

চমকে উঠে সম্বিৎ ফিরে পায় কিশোর-কিশোরী । সংযত হয় তারা, আবৃত করে নিজেদের । শান্ত হয়ে পাশাপাশি শুয়ে চেয়ে থাকে আকাশের দিকে । আনন্দের হাত চন্দ্রার হাতে ধরা থাকে । রাত্রি শনশন বয়ে যায় তাদের চারপাশ দিয়ে ।

একসময় চন্দ্রা বলে, "জানিস আনন্দ, বাবা আমার নাম রেখেছিলেন ওই চাঁদের থেকে । ঝড়বৃষ্টির পর যখন মেঘ কেটে যাচ্ছিল, তখন তিনি দেখছিলেন চাঁদের উজ্জ্বল বাঁকা কাস্তের মতন ফালিটা আকাশে হাসছে । সেই মুহূর্তেই নাকি ধাইমা আঁতুড় ঘর থেকে বের হয়ে বলেছিল 'গীতিকার, আপনার মেয়ে হয়েছে' । অমনি বাবা সেই মেয়ের নাম রেখে দিলেন চন্দ্রলেখা । ভাব একবার, যদি ভোরবেলা সূর্যোদয়ের সময় জন্মাতাম, তাহলে কী নাম রাখতেন? সূর্যমুখী? হি হি হি ।" হাসতে থাকে চন্দ্রা । কিছুক্ষণ আগের বিষন্নতা কেটে গিয়েছে তার মন থেকে ।

আনন্দ চুপ করে শোনে, অল্প হাসে । সে শৈশবে পিতৃমাতৃহীন, মানুষ হয়েছে মামাবাড়িতে, দিদিমার কাছে । এখনও সেখানেই থাকে । দিদিমাও আর নেই, গত বৎসর হঠাৎ করে চলে গেলেন চিরকালের মতন । এখন আপন বলতে মামামামীরা আর মামাতো ভাইবোনেরা । কিন্তু তাদের কেন যেন খুব একটা কাছের মনে হয় না আনন্দের । বড় একা লাগে তার । শুধু চন্দ্রার কাছে সে একা নয়, এইখানে মনের দোসর মেলে তার ।


২.

নাগচম্পা গাঁয়ের লোকেরা চাষবাস করে, নদীতে মাছ ধরে । কেউ কেউ নদীতে নাও বেয়ে সোজা চলে যায় দক্ষিণসাগরে । তবে বেশিরভাগ লোকই গাঁয়ের বাইরে যায় না, গাঁয়েই তাদের জীবন, জীবিকানির্বাহ সব ।

এই গাঁয়ে অনেক কবি আর সঙ্গীতশিল্পীও থাকেন । তাঁরা নিজেরাই সঙ্গীত রচনা করেন, নিজেরাই সেই গান গেয়ে গেয়ে গৃহস্থের দুয়ারে দুয়ারে ঘোরেন । গৃহস্থেরা সেই গান শুনে ওঁদের চাল, ডাল, সব্জি, ফলমূল, অর্থ ইত্যাদি দেন পারিশ্রমিক হিসেবে । এঁদের গীতিকার সম্প্রদায় বলা হয় । কোনো গৃহে বিবাহ, অন্নপ্রাশন, পূজাপার্বণ ইত্যাদি শুভ অনুষ্ঠানে গীতিকারদের আমন্ত্রণ করে আনা হয় ।

এই গাঁয়ে মধুবংশী একজন বিখ্যাত গীতিকার । সেই কতকাল আগে তাঁর প্রপিতামহ-প্রপিতামহী এই গাঁয়ে এসে ঘর বেঁধেছিলেন, তারপর থেকেই এইখানেই তাঁদের পরিবারের স্থিতি । তাঁদের পরিবারে অনেক গীতিকার, এই তাদের কূলকর্ম । কিন্তু মধুবংশীর একেবারে অন্যরকম, তাঁর গান শুনলেই বোঝা যায় যে এ গান জগতে বিশেষ স্থান পাবার যোগ্য, এ গান মানুষের মনে রয়ে যাবে, এ গান কালজয়ী হবে ।

বালক বয়স থেকে গান রচনা করে মধুবংশী । মধুবংশীর বাবা ত্রিলোচনও গীতিকার ছিলেন, গান রচনা করতেন ও গাইতেন । নিজের ছেলের প্রতিভার প্রথম পরিচয় তিনিই পান । তিনি মুগ্ধ ও বিস্মিত হয়ে গিয়েছিলেন, কিন্তু প্রকাশ করেন নি বাইরে । তিনি বিশ্বাস করতেন ঈশ্বরের অসীম করুণায় মধুবংশী জন্মেছে তাঁর পুত্ররূপে ।

তরুণ মধুবংশীর বিবাহ হয় আরেক গীতিকারবংশীয়া মাল্যবতীর সঙ্গে । মাল্যবতীও গীত রচনা করতেন, গান গাইতেন । কিন্তু সংসারের অন্যান্য কাজকর্ম ও সব মাল্যবতীরই উপরে, তাই গানের সময় পেতেন না বেশি । তার উপর সংসারে নিত্য দারিদ্র, মধুবংশী তার গানের দল নিয়ে নগরে গান গেয়ে যা অর্থ পেতেন তা যথেষ্ট ছিল না, দুই তিনদিন পর পর তাদের একবেলা উপবাসে কাটতো ।

কিন্তু তাতেও কোনোদিন তাদের হাসিমুখ ম্লান হত না । যে বেলা আহার জুটত না, সেই বেলায় জলপান করে সবাই মিলে দাওয়ায় বসে ভক্তিগীতি গেয়ে কাটিয়ে দিতেন । কোনো কোনোদিন আবার প্রতিবেশীরা কেউ কেমন করে যেন জানতে পেরে নিজেরাই এসে সকলের জন্য অন্নব্যঞ্জন দিয়ে যেতেন ।

এই মধুবংশী-মাল্যবতীর দরিদ্র ঘরেই একদিন জন্মায় চন্দ্রা । সেইদিন দুপুর থেকে আকাশ ভেঙে বৃষ্টি পড়ছে, আঁতুড়্ঘরের চালের ফুটোফাটা দিয়ে বৃষ্টির জল পড়ে পড়ে ঘরের কোণ ভাসিয়ে দিচ্ছে । নালা খুঁড়ে খুঁড়ে সেই জল প্রাণপণে বাইরে বের করে দিতে চেষ্টা করছেন মাল্যবতীর শাশুড়ী-মা, মহামায়া ।

মাল্যবতী প্রসব যন্ত্রণায় ছটফট করছেন ঘরের মাঝে খড়বিছানো বিছানায়, মাটির হাঁড়িতে আগুন করে রাখা হয়েছে কাছেই । গাঁয়ের ধাত্রী পার্বতী মাল্যবতীর কাছেই বসে আছেন । আঁতুড়ঘরের দরজার বাইরে দাওয়ায় পায়চারী করছেন মধুবংশী ।

দিনের শেষে বৃষ্টি থেমে গেল, মেঘেরা সরে যেতে লাগলো জোর হাওয়ায় । সেই ছিন্নমেঘের ভিতর থেকে হেসে উঠল শুক্লাপঞ্চমীর উজ্জ্বল চাঁদের কলা । সেই মুহূর্তে জন্ম হল নবজাতিকার, আঁতুড়ঘরের ভেতর থেকে শোনা গেল শিশুর ক্রন্দন ।

বাইরে আকাশে তখন মেঘেরা আরো সরে গিয়েছে, চাঁদ আরও উজ্জ্বল । ধাত্রী যখন নবজাতিকাকে ধুয়ে পরিষ্কার করে শুকনো কাপড়ে জড়িয়ে মায়ের কোলে দিয়ে বাইরে এসে বললেন, "গীতিকার, অপূর্ব কন্যা এক হয়েছে আপনার", আনন্দিত মধুবংশী নবজাতিকার নাম রাখলেন চন্দ্রলেখা ।

দেখতে দেখতে শুক্লপক্ষের চন্দ্রকলার মতই বেড়ে উঠতে লাগল চন্দ্রলেখা । আর তার অনবদ্য মধুকন্ঠে গানেরা হয়ে উঠতে লাগল মধুরতর । কথা ফোটার সঙ্গে সঙ্গেই গানের সুরও এসেছিল তার গলায় । তারপরে আস্তে আস্তে বাবা মধুবংশীর কাছে শিখল লেখাপড়া, শিখল গীতরচনার কৌশল । একেবারে ছয় সাত বছর বয়স থেকেই গীত রচনা করে চন্দ্রলেখা । এখন তার গান হয়ে উঠেছে আরো মধুর, আরো ঐশ্বর্যময় ।

এখন সে পঞ্চদশী, অপরূপ যৌবনের উপহারে ভরে উঠেছে তার দেহমন । গান ও গীতরচনায় দিন দিনই তার দক্ষতা সাবলীল থেকে সাবলীলতর হয়ে উঠছে । গীতিকার মধুবংশী মেয়ের প্রতিভায় মুগ্ধ, গোপণে মাল্যবতীকে জানান, "জানো বৌ, আমাদের চন্দ্রা একদিন এমন কিছু গীত রচনা করবে যে ভাবীকালের মানুষ তাকে মনে রাখবে ।"

মাল্যবতী হাসেন, হাত জোড় করে কপালে ঠেকান অদৃশ্য ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে । বলেন, "ঈশ্বরের আশীর্বাদে তোমার কথা সত্যি হোক । কিন্তু সমাজ-সংসারের কথাও তো ভাবতে হয় গো । মেয়ের পনেরো বছর বয়স হল । বিবাহের উদ্যোগ আয়োজন তো করতে হয় এবার । লোকে পাঁচকথা বলতে শুরু করেছে । গাঁয়ের ওর বয়সী, ওর চেয়ে কমবয়সী মেয়েদেরও তো বিবাহ হয়ে গেল । কিছু ভেবেছ মেয়ের বিবাহ ব্যাপারে?"

মধুবংশী কেমন একটু বিহ্বল হয়ে পড়েন । সঙ্গীতলোকের আকাশ থেকে হঠাৎ বাস্তবের মাটিতে পড়ে হকচকিয়ে যান । তাই তো! এরই মধ্যে পনেরো বছর বয়স হয়ে গেল কন্যার? এবারে তো কন্যাকে পাত্রস্থ করতে হয়! কিন্তু এতদিন তো তিনি এই নিয়ে ভাবেন নি! গীত রচনা করছে কন্যা, গান গাইছে, কত অনুষ্ঠানে তাঁর দলের সঙ্গে গিয়ে গান করেছে... এখন এইসব ছেড়ে হঠাৎ ঘোমটা দিয়ে গৃহবধূ হয়ে চলে যাবে সে অচেনা ঘরে? তারপর থেকে শুধু রাঁধবে, বাড়বে, সন্তান জন্ম দেবে, গেরস্থালীর হাজারো কাজ করবে, শিশুপালন করবে? সংসারধর্ম করতে গিয়ে সঙ্গীতধর্ম থেকে বিচ্যুত হবে?

কেমন দিশাহারার মতন মাল্যবতীর দিকে চেয়ে মধুবংশী বলেন, "বিবাহ? চন্দ্রার বিবাহ দিতে হবে, না? কিন্তু বৌ, সে যে গীতিকারকন্যা, সে যে গীত রচনা করে, গীত গায় ---এইসব থেকে ছাড়িয়ে কোন্‌ পরের ঘরে পাঠিয়ে দেবো তাকে? তারা হয়তো তাকে বুঝবে না, তারা হয়তো তাকে কোনোদিন ..." এই পর্যন্ত বলে থেমে যান মধু, আর বলতে ভয় করে তাঁর ।

মাল্যবতী বলেন, "মেয়ের মনের খোঁজ কিছু রাখো? সে তোমার কাছে গীত শিখতে আসা ওই সন্ধ্যামণির আনন্দকে ভালোবাসে । আনন্দও তাকে ভালোবাসে । আনন্দকে বলো সে তার অভিভাবকদের কারুকে দিয়ে সম্বন্ধ পাঠাক তোমার কাছে । তাহলে আর কোনো অসুবিধাই থাকবে না । ওরা সম্বন্ধ আনলে তুমি রাজি হয়ে পাঁজিপুঁথি দেখে দিন তারিখ ঠিক করে ফেলবে । তারপর বিবাহ । আর আনন্দ যদি ওর অভিভাবকদের বলতে সঙ্কোচ করে তাহলে তুমিই সম্বন্ধ নিয়ে যাও সন্ধ্যামণিতে । আনন্দকে জামাই করার প্রস্তাব নিয়ে । "

বিস্ময়ে চোখ বড় বড় হয়ে ওঠে মধুবংশীর । "বৌ, তুমি বলছ কী? আমাদের চন্দ্রা আর আনন্দ পরস্পরকে ভালোবাসে? আমি তো ঘুণাক্ষরে টের পাই নি? তুমি ঠিক বলছ তো?"

মাল্যবতী হাসেন, বলেন, " আমি যে মা । তাই টের পাই । তুমি থাকো তোমার ভাবের ঘোরে, তুমি এসব ব্যাপার টের পেলে তো হয়েই যেত ।"

মধুবংশী খুব সন্তুষ্ট হন । এ যদি হয়, তবে খুবই সুখের কথা । আনন্দ প্রায় ঘরের ছেলের মতই, সে নিজেও গীত রচনা করে, গান গায় । বিবাহের পরেও চন্দ্রার গানের কোনো অসুবিধা হবে না ।

মধুবংশী স্মৃতিচারণ করতে থাকনে, "আনন্দের বাবা গগনও গীতিকার ছিল । কিন্তু সে বিয়ে করল বিষয়ী কৃষক ঘরের মেয়ে । আনন্দ জন্মাবার কিছুকাল পরেই অকালে মারা গেল হতভাগ্য গগন । ছেলে নিয়ে ওর মা চলে গেল বাপের বাড়ী । আনন্দের মামাবাড়ির লোকেরা বিষয়ী লোক, তারা গানের ধার ধারে না । আনন্দের মা ও তো আর বাঁচল না বেশিদিন তারপর । আর পিতৃমাতৃহীন দুঃখী ছেলেটার দিন কাটছে কিনা সেই বিষয়ীদের ঘরে! আহা, এতদিন কেন এসব ভুলে ছিলাম ! "

মাল্যবতী হেসে বলেন, "যাক, এখন তো মনে পড়েছে । এইবারে ওকে একদিন সব বলো । তারপরে উদ্যোগ-আয়োজন শুরু করতে হবে তো আমাদেরই । সাধ্য না হয় অল্প আমাদের, তবু যথাসাধ্য তো করতে হবে । একটিমাত্র সন্তান, সাধ হয় সোনায় মুড়ে দিই, ভগবান তো সেই ভাগ্য দেন নি ।" চোখে আঁচল তোলেন মাল্যবতী ।

বিব্রত হয়ে পড়েন মধুবংশী, বলেন, "আরে তুমি কেন কাঁদছো বৌ? দেখো সব ঠিক হয়ে যাবে । চন্দ্রলেখা তো আমাদের যে সে মেয়ে নয়, সে সত্যিই আকাশের চাঁদ, ভালোবেসে এসেছে আমাদের ঘরে । সব ঠিক হয়ে যাবে ।" বলতে বলতে নিজেই কেমন রুদ্ধকন্ঠ হয়ে পড়েন, দ্রুত চলে যান গানের ঘরে ।


৩.

চন্দ্রলেখার বিবাহের আয়োজন শুরু হয়ে গিয়েছে পুরোদমে । আনন্দকে মধুবংশী সব বলার পরে আনন্দ বলেছিল সে চন্দ্রাকে বিবাহ করতে পারলে ধন্য হবে কিন্তু কিছুতেই মামাদের বলতে পারবে না । তখন মধুবংশী নিজেই ঘটক পাঠিয়ে আনন্দের মামাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছেন । ওঁরা সম্মতি দিয়েছেন । তারপরই আয়োজন শুরু হয়েছে ।

আনন্দর এখন ঘন ঘন আসা বন্ধ । এলেও চন্দ্রলেখার সঙ্গে দেখা হয় না, নিয়ম নেই । এখন তারা বিবাহের পাত্র পাত্রী, এখন দেখা করা মানা । চন্দ্রলেখার সখীরা তাকে নিয়ে নানা আচার-অনুষ্ঠানে ব্যস্ত ।

বিবাহের দু'দিন আগে বিনামেঘে বজ্রাঘাত হল । শোনা গেল আনন্দ নিরুদ্দেশ । একেবারে কোনো চিহ্ন নেই । ওর মামাবাড়ির লোকেরা সেই কথাই বললেন । কানাঘুষোয় নানা কথা শোনা গেল । মামারা নাকি মোটা অর্থের বিনিময়ে বিদেশি সমুদ্রবণিকদের কাছে নৌদাস হিসেবে বিক্রয় করে দিয়েছে আনন্দকে । তারা আরো অনেক ক্রীতদাসের সঙ্গে তাকেও নিয়ে চলে গিয়েছে বন্দরনগরীতে । সেখান থেকে তারা জাহাজে করে ভেসে পড়বে অথৈ সমুদ্রে ।

আনন্দ মিলিয়ে গেল চন্দ্রলেখার জীবনের সমস্ত আনন্দ নিয়ে । প্রিয়জনবিচ্ছেদের গভীর শোক তার হৃদয়কে এত ছায়াচ্ছন্ন করে ফেললো যে আপনজনেরা চিন্তিত হয়ে পড়লেন আদরিণী কন্যার বুঝি জীবনসংশয় হয় ।

কিন্তু শোকেরও সীমা আছে । প্রথম কয়েকদিন অর্ধচেতনের মতন থাকার পর একসময় উঠে বসল চন্দ্রলেখা । আবার সে স্বাভাবিক জীবন আরম্ভ করল । তার গান হয়ে উঠল আরো মর্মস্পর্শী, আরো গভীর ঐশ্বর্যময় । শোকের গরল আকন্ঠ পান করে সে হয়ে উঠল নীল চাঁদের মতন রহস্যময়ী । তার রচিত গীতের ছত্রে ছত্রে গভীর ভালোবাসা, আকুল ভক্তি, ফুটন্ত প্রেম, জ্বলন্ত বিচ্ছেদ, মর্মস্পর্শী শোক, আকাশছোঁয়া প্রাপ্তি সব এমনভাবে মিশে যেতে লাগল যে তার তুলনা পাওয়া যায় না কোনোখানে। ।

বাবা-মা তার জন্য আবার পাত্র খোঁজার প্রস্তাব দিলে সে দৃঢ়ভাবে জানিয়ে দিল সংসার সে করবে না । সারা জীবন গীত রচনা করে আর গান গেয়েই কাটাবে ।

নদীতীরে শিবমন্দিরে আশ্রয় নিল সে । সিদ্ধান্ত নিল সেইখানে পূজারিণী হয়ে থাকবে আর গীত রচনা করবে ।

একসময় সে শুরু করল এক আশ্চর্য কাব্য রচনা । এক অপরূপ রূপকথার মতন সেই কাব্য । দুঃখী ধীবরের জালে উঠে আসে সোনার ডিম, তার ভেতরে সোনারবরণী এক কন্যা । কন্যাটিকে নিয়ে জেলে-জেলেনি দিয়ে আসে রাজা-রাণীর কাছে । রাজকন্যা বড় হতে থাকে, রূপে গুণে সে তুলনাহীনা । রাজা-রাণী তার নাম রাখেন সুবর্ণাক্ষী । ক্রমে বিবাহযোগ্য বয়সে পৌঁছয় সুবর্ণাক্ষী । স্বয়ম্বর-সভা আহ্বান করা হয় । সভাতে সমাগত এক নামকরা রাজপুত্রের সঙ্গে তার বিয়ে হয় । তার কিছুদিন পরই ঘটে যায় এক অভাবিত দুর্ঘটনা । রাজ্যের সর্বজনপ্রিয় সেই রাজপুত্র যে কিনা কিছুদিন বাদেই রাজা হবে, তাকে এক চক্রান্তের শিকার হয়ে যেতে হয় নির্বাসনে । তার সঙ্গে নির্বাসনে যায় সুবর্ণাক্ষীও । রাজ্য থেকে বহুদূরে অরণ্যে যখন তারা দিন কাটাচ্ছে তখন দূরদেশের এক ভয়ানক রাজা সুবর্ণাক্ষীকে হরণ করে নিয়ে যায় । ভীষণ যুদ্ধের পরে রাজপুত্র উদ্ধার করে স্ত্রীকে ।

তারা সগৌরবে রাজ্যে ফিরে আসে । রাজপুত্র রাজা হন, সুবর্ণাক্ষী রাণী হন । কিন্তু বেশিদিন সুখ কপালে ছিল না তাদের । সুবর্ণাক্ষীর নামে লোকের কাছে মিথ্যা অপবাদ শুনে ভুল বুঝে তাকে নির্বাসনে পাঠিয়ে দেয় রাজা । সুবর্ণাক্ষী অরণ্যে চলে যায় নির্বাসন কাটাতে । সেখানে কঠোর তপস্যা করে প্রাণত্যাগ করে । তার স্বামী যখন অনুসন্ধান করে জানতে পারল সুবর্ণাক্ষী নির্দোষ, তখন সে ছুটে গেল তাকে ফিরিয়ে আনতে । গিয়ে দেখল সব শেষ, পড়ে আছে শুধু সুবর্ণাক্ষীর গলার একটি হার, তার নশ্বর দেহ ভস্ম হয়ে মিলিয়ে গিয়েছে পঞ্চভূতে । হারটি বুকে তুলে নিয়ে শোকাভিভূত মানুষটি ফিরে আসে রাজধানীতে । ফিরে এসে সেও আর বেশিদিন বাঁচে নি । পরলোকে হয়তো আবার মিলন হল দু'জনের, সেখানে আর বিচ্ছেদ নেই, কোনো মিথ্যা অপবাদ নেই, ভুল-বোঝাবুঝি নেই ।

চন্দ্রলেখার কাব্য যেদিন শেষ হল সেইদিন ছিল পূর্ণিমা । বর্ষার তরঙ্গিনী তখন টইটম্বুর । জল উঠে এসেছে ঘাটের সব সিঁড়িগুলো ডুবিয়ে একেবারে উপরে । সবচেয়ে উপরের দু’ধাপ সিঁড়ি শুধু জেগে আছে ।

আগের সারাদিন সারারাত বৃষ্টি ছিল, কিন্তু সেইদিন আকাশ পরিষ্কার । সন্ধ্যায় পূর্ণ চন্দ্র উঠল, জ্যোৎস্নায় আস্তে আস্তে ভরে উঠল চরাচর ।


৪.

চন্দ্রলেখা ঘাটের সিঁড়ির ধাপে জলের একেবারে কাছে বসে চেয়ে থাকে চাঁদের দিকে । আজ তার জীবনের সব কাজ শেষ হয়েছে । এইবারে বেরিয়ে পড়তে তো বাধা নেই আর । ঘাটের পাশেই এক পুরাতন অশ্বত্থ গাছ । তারই গুঁড়ির সঙ্গে বাঁধা একটা ছোটো নৌকো ।

মধ্যরাতে চাঁদ যখন মাথার উপরে এসেছে, তখন অদ্ভুত এক কুয়াশা দেখা দিল । সেই কুয়াশায় জ্যোৎস্না নীলিম হয়ে উঠল, চাঁদ নীলচে । আর সেই নীলজ্যোৎস্নার ভিতর দিয়ে ভেসে আসতে লাগলো অদ্ভুত এক নেশাধরানো বাঁশির সুর, সঙ্গে গান, যদিও সেই গানের কথাগুলো স্পষ্ট হয় না কিছুতেই । যেন অন্য জগতের ভাষা, মাঝে মাঝে চেনা চেনা লাগে, আবার পরক্ষণেই অচেনা হয়ে যায় ।

উঠে দাঁড়াল চন্দ্রলেখা, সময় হয়েছে । ছোট্টো নৌকোটির বাঁধন খুলে সে উঠে বসল তাতে, প্রবল স্রোতে তরী ভেসে চলল দক্ষিণগামিনী নদীর সঙ্গে ।

চন্দ্রলেখার একটুও ভয় করছে না, কোনো উদ্বেগও নেই, কোনো বিষাদও আর নেই । নীল জ্যোৎস্নায় ভিজতে ভিজতে সে ভেসে চলেছে মোহনার দিকে । যেতে যেতে অনেক আগের এক রচনা করা এক গান সে গাইতে থাকে, বহু বছর আগে এই নদীর তীরেই সে আর আনন্দ যে গান গাইত, সেই গান । কতকাল পরে আবার ভুলে যাওয়া সেই গান মনে পড়ল তার! রহস্যময় নীলজ্যোৎস্নার মধ্য দিয়ে ভেসে আসা গানের সঙ্গে সে মিশিয়ে দিতে থাকে তার নিজের গান ।

নীলজ্যোৎস্নার ভিতর দিয়ে উড়ে চলে একঝাঁক বুনো হাঁস, ওরাও দক্ষিণের দিকে চলেছে । ওদের দেখতে দেখতে চন্দ্রলেখা ভাবে, সমুদ্র কত দূরে? এই নৌকো কি গিয়ে পৌঁছতে পারবে সেখানে?

দেখতে দেখতে হাঁসের দল দৃষ্টিসীমা পার হয়ে যায় । সেইদিকে দূরবিসর্পী দৃষ্টি মেলে রাখতে রাখতে হঠাৎ যেন আনন্দকে দেখতে পায় চন্দ্রলেখা, হ্যাঁ সেই অনেক বছর আগের কিশোর আনন্দ, যাকে চন্দ্রা শেষ দেখেছিল তার পনেরো বছর বয়সে । এখন এই ত্রিশ বছর পর সে মধ্যবয়সিনী নারী এক, চুলে অল্প অল্প সাদা রেখা দেখা দিতে শুরু করেছে, মুখে সময়ের ভাস্কর্য । আনন্দ কিন্তু এখনও একই আছে, সেই অমলীন কিশোরমুখ নিয়ে । সে তার স্মৃতির আনন্দ যে ....

বৃষ্টিধারার স্পর্শে ঘুম ভাঙে চন্দ্রার । সে জেগে উঠে বুঝতে পারে ঘাটের সিঁড়ির ধাপেই ঘুমিয়ে পড়েছিল সে, ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখছিল । কুয়াশায় নীল হয়ে যাওয়া জ্যোৎস্না, নৌকায় ভেসে চলা-সবই স্বপ্ন । কখন মেঘের আড়ালে হারিয়ে গিয়েছে চাঁদ, ফোঁটায় ফোঁটায় বৃষ্টি শুরু হয়েছে ।

সে অশ্বত্থের গুঁড়ির দিকে তাকায়, সেই ছোটো নৌকোটা বাধা আছে ঠিকই, স্রোতের ধাক্কায় দুলে দুলে উঠছে । কেউ ওর বাঁধন খোলেনি ।

উষ্ণ লবণাক্ত অশ্রু চন্দ্রলেখার দু'চোখের পুকুর ছাপিয়ে নেমে আসতে থাকে দু'গাল প্লাবিত করে । বহুদিন আগের সঞ্চিত অশ্রু, যে কান্না সে কাঁদতে পারে নি এতদিন, এই দীর্ঘ ত্রিশ বছর । আনন্দের নিরুদ্দিষ্ট হবার সংবাদে যে কান্না কঠিন তুষার হয়ে জমে ছিল তার বুকের ভিতরে ।

বহুকালরুদ্ধ অশ্রু মুক্ত করে দিয়ে হাল্কা হতে থাকে চন্দ্রলেখা । ততক্ষণে বৃষ্টিও ঝমঝম করে নেমেছে । খোলা আকাশের নিচে সে সিক্ত হতে থাকে শীতল বৃষ্টিতে ।

হ্যাঁ, তার নৌকো আসবে এবারে । এই ঘাটে বাঁধা নৌকোর দরকার হবে না । যে নৌকো তাকে নিতে আসবে তার রাজহংসের ডানার মতন সাদা পাল, শরতের সকালের নীল আকাশের নিচ দিয়ে সে আসছে কত দূর থেকে ! ওই তো আনন্দ দাঁড়িয়ে আছে নৌকোয় ।

জলে নামে চন্দ্রলেখা । আহ, কী স্নিগ্ধ স্পর্শ ! আস্তে আস্তে ডুবতে থাকে সে, আস্তে আস্তে ।


1 টি মন্তব্য:

  1. কেউ কেউ শুধুই লেখেন, মল্লিকা ধর কলমে আলো ভরে নিয়ে চিত্রপট রচনা করেন। প্রতিটি রূপচিত্র যেন এক রূপকথা বা একেই হয়তো বলা যায় জাদু বাস্তবতা। লেখকের কাছে পাঠক হিসাবে ঋণ ক্রমশই বেড়ে চলেছে।

    উত্তর দিনমুছুন