মঙ্গলবার, ১৬ মার্চ, ২০২১

কবীর রানার গল্প, যা আসলে কোনো গল্প না: নজরুল সৈয়দ





’মানচিত্রকর’ দিয়ে আমার কবীর রানার গল্প পড়া শুরু। বেশ মনে আছে, খুব চমকে গিয়েছিলাম গল্পগুলো পড়ে। আমাদের গল্পগুলো যেরকম লেখা হয় সেরকম না মোটেও। এমনকি গল্পগুলোতে ঠিক কাহিনীর বিন্যাসও নেই। ভিন্ন একটা গল্পভাষা তিনি তৈরি করেছেন।

একঘেয়ে রিপিটেশনে ভর্তি বাক্য অনুচ্ছেদগুলো পড়তে পড়তে কেমন একটা ঘোর তৈরি হয়। কবীর রানা পাঠককে একটি ঘোরের বা চক্রের ভেতর ঢুকিয়ে দেন। ভিন্ন একটা জগৎ তৈরি হয় পাঠকের মগজের ভেতরে। কবীর রানা তখন পাঠকের মগজে তৈরি করেন নতুন বোধ, নতুন চিন্তা।  
কবীর রানার গল্প পাঠের আগের পাঠক আর গল্প পাঠের পরের পাঠকের চিন্তাজগৎ সম্পূর্ণ আলাদা। কবীর রানা ভাবিয়ে ছাড়েন। মানচিত্রকর থেকেই একটা গল্পের ছোট্ট একটু অংশ দিয়ে ব্যাপারটা বোঝানোর চেষ্টা করা যেতে পারে। যদিও একটা অনুচ্ছেদ পড়ে কবীর রানা বুঝতে পারাটা অসম্ভব।

”শিশুটি জানালা দিয়ে বাইরে বের হতে থাকলে আমাদের ভেতর নিরাপত্তাহীনতা জাগে। তার কাছে নিয়ে যায় আমাদের সঞ্চিত সকল ভীতি। তাকে লিখিত বই দিয়ে বলি বনের ভেতর ছিলো বাঘ। সে হাসে। তাকে লিখিত বই দিয়ে বলি আকাশের ভেতর ছিলো বিদ্যুৎ। সে হাসে। তাকে লিখিত বই দিয়ে বলি জলের ভেতর ছিলো কুমির। সে হাসে। তখন আমরা বুঝি বইয়ের ভেতর সে এখনো প্রবেশ করেনি। বইয়ের ভেতর তাকে প্রবেশ না করালে চলবে কেনো। আমরা বই আনি বাজার থেকে। আমরা ভয় আমদানি করি নানা জায়গা থেকে যাতে আমাদের শিশুটি জানালা বন্ধ করা শিখে ফেলে। ভয়ের বর্ণমালা, জানালা বন্ধ করার বর্ণমালা যেনো সে শেখে তাড়াতাড়ি। আমরা এই প্রার্থণা করতে থাকি।” 

সেই যে কবীর রানার গল্পের ভেতর ঢুকে গেলাম। একে একে পড়ে গেলাম ‘জল আসে মানুষের দীঘিতে’, ‘আমাদের গ্রামে একটা পাখিচোর আছে,’ ’বিড়াল পোশা প্রতিবেশিনীরা’। আর গত একবছর ধরে পড়ছি ‘কোথায় কোথায় ঘুমিয়েছিলাম’। হ্যাঁ, কবীর রানার গল্পগুলো আসলে গোগ্রাসে গিলে ফেলা যায় না, এক বসায় পড়ে ওঠা যায় না। একটা গল্প পড়ার পর সেই ঘোর থেকে বের হতেই অনেকটা সময় চলে যায়। ঘোর কাটলে নতুন গল্প না পড়ে পুরনো গল্পটাই আবার পড়তে ইচ্ছে করে। ফিতে আটকে যাওয়া ক্যাসেটের মতো একই গল্প বারবার বারবার পড়ে যাই। কখনো পুরোটা গল্প পড়ি না, একটা দুটো অনুচ্ছেদ পড়ি। সেভাবেই ‘কোথায় কোথায় ঘুমিয়েছিলাম’ পড়ছি এক বছর ধরে। গত বইমেলায় বইটি প্রকাশিত হয়েছিলো।  

কবীর রানার গল্পের ঘটনাগুলো এই পৃথিবীর, কিন্তু কোথাও যেন মনে হয় এ এক অন্য জগৎ। পরাবাস্তব কিংবা জাদুবাস্তব যেন। আমাদের চারপাশে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলোই আমাদের কাছে অচেনা করে তোলেন। এমনকি কবীর রানার গল্পের চরিত্ররাও। আমাদের বাস্তব জগতের চারপাশের মানুষগুলোই ভিন্ন ভিন্ন আচরণ নিয়ে হাজির হয় কবীর রানার গল্পে। ঠিক যেন বাস্তব না, হয়তো পরাবাস্তব কিংবা জাদুবাস্তব।  

খুব দুর্বোধ্য ভাষায় তিনি লেখেন না মোটেও। বরং বলা যায় বেশ সাবলীল ভাষাতেই লেখেন তিনি। পাঠকের সুবিধার্তে বইয়ের দ্বিতীয় গল্প ‘গ্রামটা বিক্রি হয়ে গেল’ থেকে একটুখানি অংশ তুলে দেই। 

”জান্নাতুল ফেরদৌস আসলে একজন পুরুষ। পুরুষ ছাড়া কারো গ্রাম কেনার শখ থাকে না। সে জানায় তার জীবনী। আত্মজীবনী। সে প্রথমে কবি ছিল। আমাদের গ্রাম নিয়ে সে লিখেছে অনেক কবিতা। গ্রামপ্রেম নিয়ে তার মতো কবিতা আর কেউ লেখেনি। সে জানায় সে কবিতার সাহায্যে পুরো গ্রামকে ভালোবাসতে চেয়েছে, দখল করতে চেয়েছে। দখল না করতে পারলে কাউকে ভালোবাসা যায় না পুরোপুরি। গ্রামের সকল কিছু নিয়ে তার কবিতা আছে। এই যে এ গ্রামের একটা ব্যাঙ, এই গ্রামের এক ফোঁটা শিশির সবই তার কবিতায় জমা আছে। এক সময় সে বোঝে শুধু কবিতা দিয়ে এ গ্রামকে সে দখল করতে পারছে না, আয়ত্বে আনতে পারছে না। তখন সে গ্রাম দখলের আধুনিক পদ্ধতি নিয়ে পড়াশোনা করে। গ্রাম দখলের আধুনিক পদ্ধতি গ্রাম উন্নয়ন হলে সে গ্রাম দখলের জন্য, গ্রাম আয়ত্বের জন্য, গ্রামের উন্নতির জন্য খুলে ফেলে একটি বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা। তার মনে আসে গ্রামের ধনী লোকেরা দরিদ্র মানুষদেরকে টাকা দিয়ে তাদের সুন্দরী মেয়েদের সঙ্গে বিয়ে করত। এই পদ্ধতি তার কাছে খুবই আধুনিক ও বিজ্ঞান সম্মত মনে হয়। সে আমাদের সঙ্গে এসব কথা বলতে বলতে আমাদেরকে নিয়ে আমাদের বিক্রি করে দেয়া ও তার কেনা গ্রামে প্রবেশ করে।”
কিংবা ‘ভিখারিদের শহর’ গল্প থেকে আমরা পড়তে পারি কিছুটা অংশ- 

“একটা গাছ। প্রাচীন পাহাড়ের এত উঁচু। আমাদের শহরের ভেতর কোথা থেকে এল। আমি তার দয়ার নিকটে গিয়ে বলি, আমাকে খুঁজে দাও। গাছ উত্তর দিল, কিংবা ছায়া উত্তর দিল কিংবা কিছুই দিল না উত্তর। আমার তো শরীর ফেরত পেতে হবে। নতুবা কীভাবে যাব আমি আমার ছেলের কাছে। আমি তো এখন ভীষন ক্রন্দন। আমি কীভাবে একটা মানুষ থেকে ভিখারি মানুষ, ভিখারি মানুষ থেকে ক্রন্দন হয়ে যাই জানি না। তবে কি আমার ভিক্ষা দেবার সকল কিছু নিঃশেষ হয়ে গেছে। ভিক্ষা দেবার ক্ষমতা না থাকলে কি একজন ব্যক্তি শরীর হারিয়ে রুপান্তরিত হয় একবিন্দু অশ্রুতে, এক বিন্দু ক্রন্দনে। আমাকে অশ্রু থেকে, ক্রন্দন থেকে ফিরে আসতেই হবে। আমার তো ছেলে আছে; তার জন্য তার সঙ্গে দেখা করার জন্য আমার শরীরকে ফিরে পেতে হবে। আমার ছেলেতো চেয়েছে পৃষ্ঠিায় পৃষ্ঠায়, তার বাবা পৃষ্ঠা থেকে বই থেকে একবার, অন্তত একবার শরীর হোক।” 

’কোথায় কোথায় ঘুমিয়েছিলাম’ বইতে মোট ৯ টি গল্প- কোথায় কোথায় ঘুমিয়েছিলাম, গ্রামটা বিক্রি হয়ে গেল, কলোনি, ভিখারীদের শহর, খেলনা বিক্রেতারা, কোথায়, ছুরি, ঘাস আর লিপস্টিক।প্রতিটি গল্পই পাঠককে নিয়ে যায় ভিন্ন ভিন্ন চিন্তার জগতে, নতুন সব চিন্তা ভীড় করে আসে মনে। আমাদের প্রচলিত জীবন, পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, শহর, গ্রাম, নগর, পরিবেশ, পৃথিবী সবকিছু আমাদের সামনে নতুন হয়ে ওঠে, নতুন 

ভাবনার খোড়াক হয়ে ওঠে। আমরা সেই ভাবনাকে ঠেলে সরিয়ে জ্যামের রাস্তায় নামি, মানুষের শব্দের ভীড়ে হারাতে চেষ্টা করি, নরম তুলোর মতো বিছানায় লুকোতে চেষ্টা করি, কিন্তু তবু আমাদের বার বার মনে প্রশ্ন জাগে ‘কোথায় কোথায় ঘুমিয়েছিলাম?’

বইটির প্রচ্ছদ করেছেন বিধান সাহা। প্রকাশিত হয়েছে দেশ পাবলিকেশন্স থেকে। 





লেখক পরিচিতি:

নজরুল সৈয়দ

লেখক। প্রাবন্ধিক। সাহিত্য সমালোচক

ঢাকায় বসবাস করেন।

1 টি মন্তব্য: