শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

মিলান কুন্দেরার সাক্ষাৎকার অনুবাদঃ প্রবাল দাশগুপ্ত




অনুবাদ: প্রবাল দাশগুপ্ত

প্রয়াত মার্কিন ঔপন্যাসিক ও গল্পকার ফিলিপ রথ, মিলান কুন্দেরার লেখা “বুক অফ লাফটার এন্ড ফরগেটিং” এর অনূদিত পাণ্ডুলিপি পড়ার পরে মিলানের দুটি সাক্ষাৎকার গ্রহণ করেছিলেন। একটি তাঁর লন্ডনে প্রথম সফরকালীন সময়ে, অপরটি প্রথম আমেরিকা ভ্রমণের সময়; বর্তমান সাক্ষাৎকারটি সেই দুই সাক্ষাৎকারের ঘণীকৃত রূপ। দু’টি ভ্রমণই মিলান ফ্রান্স থেকে সেরেছিলেন। ১৯৭৫ সন থেকেই কুন্দেরা দম্পতি খ্রেন শহরের অভিবাসী, মিলান ওখানকার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন। বর্তমানে তাঁরা প্যারিসে থাকেন। 
 
এই কথোপকথনে মিলান ইতস্তত ফ্রেঞ্চ বললেও, বেশিরভাগ সময়ই চেক ভাষায় দিয়েছেন এবং তাঁর স্ত্রী ভেরা দোভাষীর কাজটি সম্পন্ন করেছেন। চেকে রচিত কথোপকথনের সর্বশেষ রূপটি ইংরেজিতে তর্জমা করেছেন পিটার কুসি।


রথ: 
 আপনি কি মনে করেন খুব শিগগিরই জগতের বিনাশ আসছে?

মিলান:
 সেটা নির্ভর করছে 'শিগগির' বলতে আপনি কী বোঝাচ্ছেন, তার ওপর।

রথ: 
কাল, বা পরশু?

মিলান: 
পৃথিবী ধ্বংসের দিকে ছুটে চলেছে এই ভাবনাটি অতি প্রাচীন।

রথ: 
তাহলে চিন্তার কিছু নেই।

মিলান:
 ঠিক উল্টো। মানব-মনে একটা ভয় দীর্ঘ সময় জিইয়ে রাখলে, সেটায় কিছু একটা ব্যাপার তো থাকেই।

রথ:  
আপনার সাম্প্রতিক গল্পগুলো পড়ে আমার মনে হয়েছে, যে কোনো ঘটনার পটভূমিতে ওই আশঙ্কাটা বিদ্যমান, এমনকি নিশ্চিতরূপে কৌতুককর গল্পগুলোর পেছনেও।

মিলান: 
কোনো বালক যদি আমায় বলত: একদিন তোমার দেশটা পৃথিবী থেকে উবে যাবে, আমি তো সেটাকে ছাইপাঁশই ভাবতুম, অমন একটা ব্যাপার তো কল্পনা করা যায় না। একটা লোক জানে যে সে মরবে অথচ ধরেই নেয় তার দেশটা অমর। কিন্তু ১৯৬৮ তে রাশান আক্রমণের পর প্রত্যেক চেক নাগরিক ভেবেছিল তার দেশটা ইউরোপ থেকে নিঃশব্দে মুছে দেওয়া হতে পারে, ঠিক যেমন গত পাঁচ দশক ধরে ৪ কোটি ইউক্রেনিয়ান নিঃশব্দে উবে যাচ্ছে পৃথিবী থেকে, পৃথিবী তোয়াক্কা করছে না। অথবা লিথুয়ানিয়ানরা। আপনি কী জানেন ১৭ শতাব্দে লিথুয়ানিয়া ইয়োরোপের এক শক্তিশালী দেশ ছিল? আজ রাশিয়া লিথুয়ানিয়ানদের এক অর্ধবিলুপ্ত উপজাতি হিসেবে এমনভাবে অধীন করে রেখেছে যাতে বহিরাগতরা তাদের খোঁজ না-পায় ফলত বাকি বিশ্বের কাছে তাঁদের অস্তিত্বই অজানা রয়ে যাবে। আমার নিজের দেশের জন্য কী ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে তা আমার জানা নেই। তবে এটা নিশ্চিত যে নিজেদের সভ্যতার সঙ্গে একে ক্রমশ মিশিয়ে দিতে যা যা করবার তার সবই রাশানরা করবে। এবং এতে তারা সমর্থ হবে কিনা নিশ্চিত না -জানলেও এই সম্ভাবনাটি বাতিল করা যায় না । এবং এমন একটা সম্ভাবনার হঠাৎ-উপলব্ধি জীবন সম্বন্ধে যে কারো ধারণা পাল্টে দেবার পক্ষে যথেষ্ট। এমনকি ইয়োরোপকেও ইদানিং আমার ভঙ্গুর, মরণশীল বলে মনে হয়।

রথ: 
তবুও, পূর্ব এবং পশ্চিম ইয়োরোপের ভাগ্য দারুণ ভাবে আলাদা নয় কি?

মিলান: 
সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ধারণায় পূর্ব ইয়োরোপ হলো রাশিয়া, যার সুনির্দিষ্ট ইতিহাস বাইজেন্টাইন দুনিয়াতে প্রোথিত। অস্ট্রিয়ার মতোই বোহেমিয়া, পোল্যান্ড, হাঙ্গেরি এরা কোনোদিনই পূর্ব ইয়োরোপের অংশ ছিল না। বরং পশ্চিমী সভ্যতার দুঃসাহসিক অভিযানগুলির পুরোধা এরা। পশ্চিমের বর্বরতা, রেনেসাঁস, পরিমার্জন এসবকিছুর সূতিকাগার তো এখানেই । এখানে, এই মধ্য ইয়োরোপেই সেই আধুনিক সংস্কৃতি সর্বোচ্চ প্রেরণা পেয়েছিল; মনোবিজ্ঞান, কাঠামোতন্ত্ৰ, সুরের ঠাট, বার্টকের সঙ্গীত, কাফকা এবং মুসিলের নবনান্দনিকতায় মোড়া উপন্যাস – সবকিছুর উত্থান এখানেই। মধ্য ইয়োরোপের (বা তার সিংহভাগের) রাশান সভ্যতা কর্তৃক যুদ্ধোত্তর সংযুক্তির প্রেক্ষিতেই এই পশ্চিমী সভ্যতার অত্যাবশ্যক ভরকেন্দ্রটি হারিয়ে যায়। আমাদের শতাব্দে পশ্চিমী ইতিহাসের এটিই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা এবং মধ্য ইওরোপের এই লোপ পাওয়াকে সমগ্র ইউরোপের লোপ পাওয়ার সূচনা- এমন সম্ভাবনাকেও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

রথ: 
প্রাগের বসন্তে আপনার উপন্যাস 'দি জোক' এবং গল্পগুচ্ছ 'লাফেবল লাভস' এর বিবিধ সংস্করণে ১৫০,০০০ কপি ছাপা হয়েছে । রাশিয়ার আক্রমণের পর আপনার ফিল্ম একাডেমির শিক্ষকতার চাকরিটি চলে যায় এবং আপনার সমস্ত বই পাবলিক লাইব্রেরির তাক থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়। এর সাত বছর পর গাড়ির পেছনে কিছু বই আর জামাকাপড় ছুঁড়ে আপনি ও আপনার স্ত্রী ফ্রান্সে চলে আসেন আর আজ এখানে আপনি সবচেয়ে বেশি পঠিত বিদেশি লেখকদের একজন। অভিবাসী হিসেবে কেমন লাগছে?

মিলান: 
একজন লেখক হিসেবে বিভিন্ন দেশে বাস করতে পারাটা কিন্তু বিশাল আশীর্বাদ । বিভিন্ন কোণ থেকে জগতকে দেখতে পেলেই তবে তাকে বোঝা যায়। ফ্রান্সে প্রকাশিত আমার সাম্প্রতিক বইটির ঘটনাপ্রবাহ এক বিশেষ ভৌগলিক মাত্রায় বিস্তৃত হয়েছে : প্রাগের ঘটনাসমূহ দেখা হয়েছে পশ্চিম ইয়োরোপীয় চোখ দিয়ে, অন্যদিকে ফ্রান্সে যা ঘটছে তা চাক্ষুষ করছে প্রাগের চোখ। এ যেন দুই পৃথিবীর সাক্ষাৎ। একদিকে আমার স্বদেশ যেখানে মাত্র অর্ধশতাব্দের মধ্যেই গণতন্ত্র, একনায়কতন্ত্র, বিপ্লব, স্তালিনীয় সন্ত্রাস একইভাবে স্তালিনবাদের পতন, জার্মান এবং রাশান অধিকরণ, গণনির্বাসন, অতঃপর নিজভূমে পশ্চিমের মৃত্যু: এভাবেই ইতিহাসের ভারে ডুবে যেতে যেতে সে পৃথিবীর দিকে অপরিমেয় সংশয়ে তাকিয়ে আছে। অন্যদিকে ফ্রান্স: বহু শতাব্দব্যাপী বিশ্বের কেন্দ্রে থেকেও কোনো বৃহৎ ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী নয় আর। আর সেই কারণেই কট্টর আদর্শবাদী ভঙিতেই তার স্ফূর্তি। অথচ ওদের নিজেদেরই মহৎ কীর্তির কাব্যিক, স্নায়বিক স্ফুরণ হতে পারতো। হচ্ছে না। আর হবেও না কোনোদিন।

রথ: 
ফ্রান্সে নিজেকে আগন্তুক মনে হয় নাকি সাংস্কৃতিক স্বাচ্ছন্দ্য উপভোগ করেন?

মিলান: 
ফরাসী সংস্কৃতি আমার দারুণ প্রিয়, এই সংস্কৃতির কাছে আমার অনেক ঋণ। বিশেষত অতীতের সাহিত্যেকর্মগুলির কাছে। সাহিত্যিকদের মধ্যে রাবলে আমার প্রিয়তম। এবং ডিডরো। ওঁর 'জ্যাক লা ফ্যাটালিস্ট' আমার দারুণ পছন্দের। ঠিক ততটাই ভালো লাগে লরেন্স স্টার্নকে। এগুলো হলো উপন্যাসের আদলে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ নিরীক্ষা। এবং তাঁদের এই নিরীক্ষাগুলি,এককথায় বলা যায় মজাদার এবং আনন্দে ঠাসা। এই রসবোধ এখন ফরাসী সাহিত্য থেকে উবে গেছে আর এদের অনুপস্থিতিতে শিল্পের প্রতিটি ক্ষেত্রই তার তাৎপর্য হারিয়ে ফেলে। স্টার্ন এবং ডিডরো উপন্যাসকে ‘গুরুত্বপূর্ণ খেলা’ হিসেবে বিবেচনা করতেন। তাঁরা উপন্যাসের কাঠামোর ভেতরকার কৌতুকরস আবিষ্কার করতেন। আজকাল যখন বিদগ্ধজনেরা মত দেন উপন্যাস তার সম্ভাবনার নির্যাসটুকু নিঃশেষ করে ফেলেছে তখন আমি অবিকল, উল্টো মতটিই পোষণ করি: উপন্যাস তার গতির পথে অতীতের অযুত-সম্ভাবনাকে আপ্ত করতেই ব্যর্থ হয়েছে । উদাহরণ হিসেবে বলি, স্টার্ন এবং ডিডরো'র উপন্যাসকে গড়িয়ে নেওয়ার যে গুপ্ত-কৌশল সেইসব তাঁদের উত্তরসুরীরা ইস্তেমালই করেননি।

রথ: 
আপনার সাম্প্রতিক বইটিকে উপন্যাস বলা হচ্ছে না অথচ আপনি ওখানেই উল্লেখ করেছেন: এটি রূপান্তরের আদলে মোড়া উপন্যাস। তো এটি উপন্যাস নাকি উপন্যাস নয়?

মিলান: 
আমার ব্যক্তিগত নান্দনিক বিচারে এটি উপন্যাসই। কিন্তু সেই মত আমি জোর করে কারো উপর চাপিয়ে দিতে চাই না। উপন্যাসের কাঠামোর ভেতরেই প্রভূত স্বাধীনতা অন্তর্লীন। গৎবাঁধা কোনো বিশেষ -কাঠামোকে উপন্যাসের অলঙ্ঘ্য উপাদান ভাবাটাই ভুল।

রথ: 
তারপরেও কিছু একটা তো থাকে যা উপন্যাসকে একইসংগে উপন্যাস যেমন করে তোলে আবার তার স্বাধীনতাও খর্ব করে।

মিলান: 
একটি উপন্যাস কিছু কল্পিত চরিত্রের নাট্যের ওপর ভিত্তি করা এক দীর্ঘ সমন্বয়ী গদ্য। সীমানা ঐটুকুই। সমন্বয়ী বলতে বোঝাতে চাইছি বিষয়টিকে সমস্ত দিক থেকে এবং যতটা সম্ভব পূর্ণ সম্পন্নতায় ঔপন্যাসিকের উপলব্ধি করার বাসনা। ব্যাজস্তুতি, বিবৃতি, আত্মজৈবনিক ভগ্নাংশ, ঐতিহাসিক সত্য, কল্পনার উড়ান: উপন্যাসের সমন্বয়ী শক্তি। এই সমস্তকে একীভূত করার ক্ষমতা থাকে উপন্যাসের ঠিক পলিফোনিক সঙ্গীতের বহুস্বরের মতোই। একটি বইয়ের সমগ্রতা বা একতা কাহিনীকেন্দ্রিকই হতে হবে এমন কোনো মানে নেই, বিষয়কেন্দ্রিকও হতে পারে। আমার সাম্প্রতিক বইটিতে দুটি এমন বিষয় আছে: হাস্য এবং বিস্মৃতি।

রথ: 
হাস্যের সঙ্গে সবসময়ই আপনার সখ্য। আপনার বইগুলিতে বিদ্রূপ কিংবা কৌতুকের প্রভাব হাসতে প্ররোচিত করে। চরিত্ররা তখনই বিমর্ষ হয় যখন তারা এমন জগতে এসে পড়ে যেখানে কৌতুক নেই।

মিলান: 
স্তালিনীয় সন্ত্রাসের সময় আমি কৌতুকের মর্ম বুঝেছিলাম। আমার বয়স তখন কুড়ি। একটা লোক যে স্তালিনিস্ট নয়, তার থেকে যে ভয় পাওয়ার যে কিছু নেই, তা আমি তার হাসির ধরন দেখেই বুঝতে পারতাম। চিনে নেবার একটা বিশ্বাসযোগ্য চিহ্ন ছিল মানুষের এই রসবোধ। সেই থেকে রসবোধহীন হতে থাকা পৃথিবী আমার কাছে আতঙ্কের।

রথ: 
 আপনার শেষ বইটি কিন্ত অন্য বিষয়ে। ছোট্ট একটা নীতিকথামূলক গল্পে আপনি এক ফেরেশতার হাসির সঙ্গে শয়তানের হাসির তুলনা করেছেন। শয়তান হাসে, কারণ ঈশ্বরসৃষ্ট জগৎ তার অর্থহীন লাগে। দেবদূতরা হাসে, কারণ ঈশ্বরসৃষ্ট জগতের প্রত্যেকটি জিনিসই তাদের কাছে অর্থপূর্ণ।

মিলান: 
হ্যাঁ, মানুষ দুই ভিন্ন বিমূর্ত-ভঙি প্রকাশে একই শারীরবৃত্তীয় ভাষা – ‘হাসি’ - ব্যবহার করে। সদ্য খোঁড়া কবরে পাতা কফিনের ওপর যদি কারো টুপি উড়ে পড়ে – শবানুগমনের শোকাবহ গাম্ভীর্য খসে পড়ে এবং হাসির জন্ম হয়। আবার প্রেমিকযুগল খোলা প্রান্তরে হাসতে হাসতে হাতে হাত রেখে ছুটছে- সেই হাসি কিন্তু রসিকতা বা কৌতুকপ্রসূত নয়। এই হাসি দেবদূতদের ঐকান্তিক হাসি, নিজেদের অস্তিত্বের আনন্দের হাসি। এই দুই হাসিই জীবনের আনন্দ-উদযাপনে বর্তমান কিন্তু সেটা দ্বৈত সর্বনাশ সূচিত করে: দেবদূত-ধর্মান্ধদের উদ্যমী হাসি - তাঁরা তাঁদের বিশ্বাসের গুরুত্বে এতটাই প্রত্যয়ী থাকেন যে তাঁদের উল্লাসের অনুগামী না -হলে যে কাউকে ফাঁসিতে ঝোলাতেও দ্বিধা করেন না এরা। আর অন্য হাসিটি, যেটি উলটো দিক থেকে প্রকাশিত হয় তার বাহকরা ঘোষণা করেন সবকিছুই অর্থহীন, এমনকি শবানুগমনও উপহাস ছাড়া কিছু নয় এবং পুঞ্জ-সহবাস এক হাস্যকর মূকাভিনয় মাত্র। মনুষ্যজীবন দুই গহীন খাদে ঘেরা: একদিকে অন্ধ গোঁড়ামি, অন্যদিকে চূড়ান্ত সন্দেহবাদ।

রথ: 
আপনার এই ‘ফেরেশতার হাসি’ নতুন শব্দবন্ধটি আগের উপন্যাসগুলিতে 'জীবনের প্রতি কাব্যিক দৃষ্টিভঙ্গি' হিসেবে উল্লেখ করতেন। আপনার একটা বইয়ে স্তালিনীয় সন্ত্রাসের সময়কে জল্লাদ আর কবিদের রাজ বলে চিহ্নিত করেছিলেন।

মিলান: 
সমগ্রতাবাদ কেবল নরক নয়, একটি স্বর্গেরও স্বপ্ন বটে – এটি জগতের প্রাচীন সেই নাটক যেখানে সবাই একতানে থাকবে, একই ইচ্ছে, একই বিশ্বাসে একে অন্যের সঙ্গে জুড়ে রইবে, কোনো গোপনীয়তা থাকবে না পরস্পরের মধ্যে। অন্দ্রে ব্রেটনও ঠিক এমন এক বেহেস্তের স্বপ্ন দেখেছিলেন যখন তিনি সেই কাচ-ঘরে বসবাসের সাধের কথা জানাচ্ছিলেন। সর্বগ্রাসীতা যদি সেইসব আদিপ্রতিমা - যা আমাদের প্রত্যেকের এবং প্রত্যেক ধর্মের গভীরে প্রোথিত – তাদের এমনভাবে ব্যবহার না-করত, তবে এত মানুষ এর প্রতি আকৃষ্ট হতো না, বিশেষ করে, একদম প্রাথমিক পর্যায়ে যখন কেবল মাত্র এরা অস্তিত্বে আসছে। যেই মাত্র স্বর্গের স্বপ্নটা বাস্তব হতে শুরু করলো, তখনই এর পথের এধারে-ওধারে লোকজন গজিয়ে উঠতে লাগল কাজেই স্বর্গের শাসকদের ইডেনের দিকে একটা বাধ্যতামূলক শ্রমশিবির বানাতেই হলো। সময়ের সঙ্গে ওই শিবির বড় হতে লাগল, হতে লাগল নিখুঁতও, অন্যদিকে সংলগ্ন স্বর্গটি ক্রমশ ক্ষুদ্রতর এবং দরিদ্রতর হতে থাকল।

রথ: 
আপনার বইতে মহান ফরাসী কবি এলুয়ার্ড গাইতে গাইতে স্বর্গ আর শ্রমশিবিরের ওপর উড়ে বেড়ান। বইতে বিধৃত ইতিহাসের এই টুকরো কি খাঁটি?

মিলান: 
যুদ্ধের পর, পল এলুয়ার্ড অধিবাস্তববাদ ত্যাগ করে, যাকে বলতে পারি 'সর্বগ্রাসীতা কাব্য', তার বিরাট প্রবক্তা হয়ে ওঠেন। তিনি ভ্রাতৃত্বের গান- শান্তি, ন্যায্যতার, আগামী ভালোদিনের গান গাইতে শুরু করেন। গাইলেন কমরেডীয় গানও। সুর ধরলেন বিছিন্নতার বিপক্ষে, আনন্দের পক্ষে, অন্ধকারের বিপক্ষে, নির্মলের সপক্ষে এবং অসূয়ার বিপক্ষে। ১৯৫০ সালে এলুয়ার্ডের প্রাগের বন্ধু, অধিবাস্তববাদী জাভিস কালানড্রাকে বেহেস্তের শাসকরা যখন ফাঁসির হুকুম দিলেন, এলুয়ার্ড তাঁর ব্যক্তিগত সম্পর্কটিকে তাঁর রাজনৈতিক আদর্শের নিচে চাপা দিয়ে তাঁর এককালীন সহযোদ্ধার ফাঁসির আদেশকে জনসমক্ষে সমর্থন করেছিলেন। জল্লাদ যখন ফাঁসির দড়িতে টান দিচ্ছিল তখন এই কবি গান গাইছিলেন।

এবং কেবল কবি নন- স্তালিনীয় সন্ত্রাসের পুরো সময়টাই ছিল সমষ্টিগত কাব্যিক বিকারের। এটা এখন সম্পূর্ণ বিস্মৃত কিন্তু এটাই বিষয়ের মূল। মানুষ বলতে ভালোবাসে: বিপ্লব সুন্দর, শুধু এর থেকে উত্থিত সন্ত্রাসটাই খারাপ। এটা সত্য নয়। এই খারাপটা সেই সুন্দরের মধ্যেই বর্তমান ছিল, যেমন স্বর্গের স্বপ্নের গর্ভে নরক আছে এবং এই নরকের স্বাদ বুঝতে হলে স্বর্গের স্বাদটি পরীক্ষা করতে হবে কারণ স্বর্গই নরকের সূতিকাগার। শ্রমশিবিরের নিন্দে করা খুব সহজ কিন্তু সর্বগ্রাসীতার কাব্য, যা থেকে আমরা স্বর্গ আঁকড়ে শ্রমশিবিরে পৌঁছে যাই, সেটি বর্জন করা বরাবরই কঠিন। ইদানিং বিশ্বের মানুষ দ্ব্যর্থহীনভাবে শ্রমশিবিরের ভাবনা বর্জন করছে। অথচ সর্বগ্রাসীতা-কাব্যে সম্মোহিত হতে তারা এখনও উদ্গ্রীব এবং , এলুয়ার্ডের সুরে এখনও তারা নব শ্রমশিবিরের দিকেই হাঁটতে থাকবেন। সেই সুর যা কি না এলুয়ার্ড প্রাগের আকাশে দেবদূতের মতো উড্ডীন হয়ে তাঁর বিণে বাজাচ্ছিলেন যখন কালান্ডরার দেহভস্মের ধোঁয়াও চিতার চিমনি বেয়ে সেই একই আকাশে উত্থিত হচ্ছিল।

রথ: 
আপনার গদ্যের বিশেষত্ব প্রাতিজনিক আর সর্বজনীকের দ্বন্দ্ব। কিন্ত এমন নয় যে কোনো রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে গড়ে উঠছে ব্যক্তিগত আখ্যান বা এমনও নয় যে রাজনৈতিক ঘটনাসমূহ ব্যক্তিগত পরিসরে ঢুকে পড়ছে। বরঞ্চ নিরলসভাবে আপনি দেখাতে থাকেন যে রাজনৈতিক ঘটনাবলী এবং ব্যক্তিগত ঘটনাস্রোত একই নিয়মের অধীন। আপনার গদ্য যেন একটা রাজনীতির মনঃসমীক্ষণ হয়ে ওঠে।

মিলান: 
মানুষের দর্শনশাস্ত্র ব্যক্তিগত ও সর্বজনীন পরিসরে একই। বইটার অন্য বিষয়টা ধরুন- বিস্মৃতি। এটা মানুষের একটা বিরাট ব্যক্তিগত সমস্যা: মৃত্যু হলো আত্মবিয়োগ। কিন্তু এই আত্মটা কী? আত্ম হলো আমরা যা যা মনে রেখেছি তার যোগফল। তাই আমাদের মৃত্যুভয় কিন্তু অতীত হারিয়ে ফেলার জন্য নয়। বিস্মৃতিও মৃত্যুর একটা রূপ যা জীবনের সঙ্গে পা মিলিয়ে চলে। আমার নায়িকার এটাই সমস্যা, তার মৃত প্রিয় স্বামীর উবে যেতে থাকা স্মৃতিগুলোর প্রাণপণ সংরক্ষণের চেষ্টাটাই ছিল তার সমস্যা। আবার রাজনীতিরও বিরাট সমস্যা এই ‘বিস্মৃতি’। কোনো বৃহৎ শক্তি যখন একটা ছোট দেশের জাতীয়তাবোধ বিলুপ্ত করতে চায় তখন ‘সংগঠিত বিস্মৃতির’ অস্ত্র প্রয়োগ করে। এটাই এখন হচ্ছে বোহেমিয়াতে। সমকালীন চেক সাহিত্য, অন্তত যে অংশের মূল্য আছে, গত ১২ বছর ধরে তা ছাপানো হয়নি; ২০০ চেক লেখক নির্বাসিত, তার মধ্যে মৃত ফ্রাঞ্জ কাফকা আছেন; ১৪৫ জন চেক ঐতিহাসিক জীবিকা খুইয়েছেন, ইতিহাসের পুনর্লিখন হয়েছে, সৌধগুলি ধ্বংস করা হয়েছে। একটা দেশ যখন অতীত-সচেতনতা হারায়, তখন তার সত্ত্বাও ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়। এইভাবেই রাজনৈতিক কৌশল নির্মমভাবে বিস্মৃতির এই সাধারণ আধ্যাত্মিক ভাবটিকে জাগিয়ে তোলে যা আমরা প্রত্যেকদিন, সর্বসময়ই মুখোমুখি হই; আনমনে। রাজনীতি ব্যক্তিজীবনের দর্শনের মুখোশ খোলে, ব্যক্তিজীবন খোলে রাজনীতির দর্শনের।

রথ: 
আপনার ভিন্ন পাঠ বইয়ের ষষ্ঠ অংশে তামিনা, মুখ্য নায়িকা, একটা দ্বীপে পৌঁছোয় যেখানে শুধু কচিকাঁচারা আছে। অন্তিমে তাদের তাড়ায় নায়িকার মৃত্যু ঘটে। এ কী স্বপ্ন না রূপকথা না রূপক?

মিলান: 
লেখক তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে গল্প আবিষ্কার করছেন এমন রূপকের ধারণাই আমার কাছে বরং অসঙ্গত। ঘটনা, বাস্তব বা কল্পিত, আবশ্যিকভাবে স্বতঃতাৎপর্যপূর্ণ হবে এবং পাঠক সরলভাবে তার গদ্য বা কাব্যের ক্ষমতায় বিমোহিত হবে। এই দৃশ্য আমায় তাড়া করে ফিরেছে দীর্ঘদিন এবং একটা সময়ে বারবার আমার স্বপ্নে এসেছে: একজন মানুষ শিশুপরিবৃত হয়ে পড়ছে, পালাতে পারছে না। এবং হঠাতই শৈশব, যা আমরা সবাই কাব্যিক করে তুলি, ভালোবাসি তা চরম আতঙ্কের মতো দেখা দিচ্ছে; যেন এক ফাঁদ। এটি কোনো রূপক-আশ্রয়ী গল্প নয় । কিন্তু আমার বইটি বহুস্বরিক যেখানে বিভিন্ন গল্প পরস্পরকে বুঝিয়ে দেয়, উজ্জ্বল করে, এবং একে অন্যের পরিপূরক হয়ে জূড়ে থাকে। বইয়ের মূল বিষয় হলো সর্বগ্রাসীতা যা মানুষকে স্মৃতিবিহীন করে এক শিশু-দেশের উপাদানে পরিণত করে। সকল সর্বগ্রাসীতার পরিণাম এমনই। এবং আমাদের পুরো কারিগরী যুগ সম্ভবত ভবিষ্যতের প্রতি প্রবল শ্রদ্ধায়, অতীতের প্রতি উদাসীনতায় এবং চেতনার অবিশ্বাসে এরই পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে যাচ্ছে। এক অবিরাম কিশোর সমাজের মধ্যে একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষ, যার স্মৃতি রয়ে গেছে, তার অবস্থা গল্পের দ্বীপ-শিশুদের মাঝে তনিমার মতনই বিড়ম্বনাময় হবে।

রথ: 
আপনার প্রত্যেকটা উপন্যাস, সত্যি বলতে কী আপনার সাম্প্রতিকতম বইয়ের সব অংশেরই অন্তিমে আছে দুর্দান্ত মৈথুন-দৃশ্য । এমনকি সেই অংশটি যার নির্দোষ নাম 'মা' তাতেও ত্রিমুখী যৌনমিলনের দীর্ঘ এক দৃশ্য আছে যা মুখবন্ধ এবং উপসংহারে গাঁথা। ঔপন্যাসিক হিসেবে যৌনতার অর্থ আপনার কাছে কী?

মিলান: 
আজকের দিনে, যৌনতা যখন আর অচ্ছুৎ নয়, শুধুমাত্র বিবরণ, তখন যৌন স্বীকারোক্তি দৃশ্যত একঘেয়েই। লরেন্স কিংবা হেনরি মিলার তাঁদের কাব্যিক অশ্লীলতা নিয়েও কী ভীষণ প্রাচীন! তৎসত্ত্বেও জর্জ বাতাইয়ের কিছু শরীরী আখ্যান আমার মধ্যে গভীর ছাপ ফেলেছে। হয়ত ওগুলো কাব্যিক নয়, দার্শনিক - সেই কারণেই। আপনি ঠিকই বলেছেন যে আমার বেলায় সবকিছু দুর্দান্ত যৌনউদ্রেককারী দৃশ্যে শেষ হয়। আমার এরকম মনে হয় যে দেহজ প্রেমের দৃশ্য অত্যন্ত তীক্ষ্ণ আলোর সৃষ্টি করে যা কিনা চরিত্রদের সারাংশ দেখিয়ে দিয়ে তাদের জীবনের হাল বুঝিয়ে দেয়। হুগো তামিনায় উপগত হয় ঠিক সেই সময়ে যখন তামিনা প্রাণপণে তার মৃত স্বামীর সঙ্গে হারানো ছুটিগুলির কথা ভাবতে চেষ্টা করছিল। যৌনকামনার দৃশ্য হলো সেই ফোকাস যেখানে গল্পের সমস্ত ভাবনা কেন্দ্রীভূত এবং যেখানে গল্পের গভীরতম গোপনীয়তা স্থিত।

রথ: 
শেষ অংশ, অর্থাৎ সপ্তম অংশে শুধু যৌনতা নিয়েই কথা। তো এই অংশেই বই সমাপ্ত হয় কেন, অন্য অংশে কেন নয়? যেমন ধরুন ষষ্ঠ অংশে, যেখানে নায়িকা মারা যায়?

মিলান: 
রূপকার্থে বললে দেবদূতদের হাসির ভেতরেই তামিনার মৃত্যু ঘটেছে । অন্যদিকে, বইয়ের শেষ অংশ বিরুদ্ধ হাসির কথা বলে – সেই সময়ের হাসি যখন বিষয়টি আর তার অর্থসংলগ্ন থাকছে না। একটা কল্পিত বিভেদরেখা আছে যার ওপারের জিনিসগুলি মনে হয় অর্থহীন, হাস্যকর। একজন নিজেকে জিজ্ঞাসা করে: সকালে ঘুম থেকে ওঠা কেমন কিম্ভূত নয়? কাজে যাওয়া? কোনো কিছুর জন্য সংগ্রাম করা? একটা দেশের নাগরিক হওয়া শুধুমাত্র আমি সেখানে জন্মেছি বলে? মানুষ এই গণ্ডীর সন্নিকটেই বসবাস করে এবং খুব সহজেই অন্য পারে নিজেকে খুঁজে পেতে পারে। এমন সীমারেখা সর্বত্রই, জীবনের সর্বক্ষেত্রে এমনকি খুব গভীরে, সর্বাপেক্ষা জৈবিক ক্ষেত্রটিতেও- যার নাম যৌনতা। এবং সঠিকভাবে বলতে গেলে জীবনের গভীরতম ক্ষেত্রে যৌনতার প্রশ্নই সবচেয়ে গভীর প্রশ্ন। সেই কারণেই আমার ভিন্ন পাঠের বইটির সমাপ্তির এমন ‘ভিন্নতা’ অনিবার্যই।

রথ: 
তাহলে হতাশাবাদ নিয়ে এটিই আপনার দূরতম অবস্থানে পৌঁছানো?

মিলান:
 আশাবাদ ও হতাশাবাদ শব্দদুটির ব্যাপারে আমি সতর্ক। উপন্যাস কিছুই জাহির করে না; বরং উপন্যাস প্রশ্ন খোঁজে, প্রশ্ন তোলে। আমার দেশ ধ্বংস হবে কিনা আমি জানি না, আমি জানি না আমার কোন চরিত্র সঠিক। আমি গল্প আবিষ্কার করি, একটার সঙ্গে অন্য গল্প লড়িয়ে দিই আর এইভাবে প্রশ্ন তুলি। সবকিছুতেই প্রশ্ন তোলা মানুষের নির্বুদ্ধিতা। ডন কহটি বিশ্বে বেরিয়ে দেখলেন সেটি রহস্যে মোড়া। প্রথম ইয়োরোপীয় উপন্যাসের সেটাই ছিল উপন্যাসটির বাকি ইতিহাসের উত্তরাধিকার। জগৎকে এক প্রশ্ন হিসেবে বুঝতে শেখান ঔপন্যাসিক। সেই ভঙ্গিমায় জ্ঞান আর সহিষ্ণুতা ছিল। পবিত্র নিশ্চয়তার জগতে উপন্যাসের মৃত্যু ঘটে। সর্বগ্রাসীতার জগৎ, সে মার্ক্স, ইসলাম অথবা যার ওপরেই গড়ে উঠুক না কেন, প্রশ্নের চাইতে উত্তরের জগৎ। সেখানে উপন্যাসের কোনো জায়গা নেই। যে কোনো রকমেই হোক, আমার মনে হয় জগৎ জুড়ে মানুষ আজকাল উপন্যাস বোঝার বদলে বিচার করতে চায়, প্রশ্ন না তুলে উত্তর দিতে চায় তাতে করে মনুষ্য নির্ধারিত অবশ্যম্ভাবীতার মূর্খ কোলাহলে উপন্যাসের স্বর ক্ষীণ হয়ে যায়।


অনুবাদক পরিচিতি
প্রবাল দাশগুপ্ত
কলকাতায় থাকেন।
অনুবাদক। 

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন