শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

তন্বী হালদারের গল্পঃ সুভদ্রা


হামি সুভদ্রা। সুভদ্রা হেমব্রম। ঘর পুরুলিয়া। জাতি সাঁওতাল। হামার খুব অবাক লাগে এরা হামাকে কুথায় আনিছে!

আসবার সময় চোখ বান্ধা ছিল। পথ চিনি লাই। তবে ইখন বুঝতে পারিছি ইটা একটা ঘর বটে। ছোপ ছোপ অন্ধকার গিলছে ঘরটাকে। স্যাঁতস্যাঁতে গন্ধে ম ম করছে ঘরটা।

হামি চিৎকার করি - হেই শুয়োরের বাচ্চারা, কুথায় আনিছিস মোকে।

ফাঁকা ঘরের ভিতর হামার কুথা ঘুরায়ে ফিরায়ে হামার গালেই ঠাস করে চড় মারে।

ঘরে হামার দুই সতিন আছে। মাঝে মাঝে হামরা চুলোচুলি করি। মগন কিলিয়ে ঠান্ডা রাখে হামাদের। তিন সতিনের মধ্যে হামি মেজো। কখনো-সখনো মিলও হয় হামাদের। তখন হামরা সাবুর পাঁপড় বানাই, লাচি। চিৎকার করে গান গাই – ‘উরুকাতে সিলাং কানা / ওয়াং সিলা হিজু মে’।

পরবের সময় মগন ভরপেট হাড়িয়া গিলে হামাদের তিনটাকে লন্ডভন্ড করে এক সঙ্গে।

নাঃ কেউ লাই ইখানে।

আবার চিল্লাই - হেই হারামি কই আনলি মোকে।

দপ করে সূর্য ওঠার মতো ঘরের হলুদ আলোটা জ্বলে ওঠে। হামি চোখ বুজে - ‘কেরা মা, কেরা মা’, বলে বিড়বিড় করি। হামার সামনে তিনটে খাকি পোশাকের মানুষ। শুধু একজনের পোশাকের উপর অনেকগুলো তারা বসানো আছে। লোকগুলো সামনে আসে। খুব সামনে। যতটা সামনে আসলে শরীরের বদবু পাওয়া যায়।

ডানদিকের খাকি বলে - এই, স্যার যা জিজ্ঞাসা করবে ঠিকঠাক বলবি।

বামদিকের খাকি বলে - নতুবা এই রুল তোর...।

তারাওয়ালা হাত তুলে থামিয়ে দেয়। তারপর হামার সামনে চেয়ারে বসে। আস্তে আস্তে জিজ্ঞাসা করে - জল খাবে?

নাক মুছে বলি - না। পেচ্ছাপ করবো।

তারাওয়ালা নিজের মাথাটাকে একবার ডাইনে একবার বামে কাত করে। তারপর আবার জিজ্ঞাসা করে -নাগপুরে আদালতে আক্কু যাদবকে হত্যা করবার সময় তুমি ছিলে সুভদ্রা?

হামি তাকিয়ে থাকি।

তারাওয়ালা হামার দিকে ঝুঁকে পড়ে।

- আমি তোমাকে বাঁচিয়ে দেব সুভদ্রা। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া অন্যায়। তবু তুমি রাজসাক্ষী হলে  কথা দিলাম আমি তোমাকে বাঁচিয়ে দেব।

হামি ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে থাকি - শুধোই।

- কে বটে আকু?

তারাওয়ালা কঠিন হয়।

- ন্যাকা হওয়ার ভান করো না। তোমার স্বামীকেও তুলে আনব কিন্তু। সঙ্গে দুই সতিনকেও।

মাথার ভিতর কাঁকড়াবিছা কুটকুট করে কামড়ায়।

- ই শালা হামার ঠিকুজি কুষ্ঠি সব জানে।

তারাওয়ালা চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালে, নোনা ধরা দেয়ালে টাঙানো রামকৃষ্ণ সারদামণির ক্যালেন্ডারের ওপর প্রমাণ সাইজের টিকটিকিটা টিক টিক করে ডেকে ওঠে।

মেঝেতে পা ঠুকে তারাওয়ালা বলে - ঠিক আছে সুভদ্রা তোমার বাড়ির গল্প বলো। তোমার বাচ্চাকাচ্চা কয়টি?

তড়বড়িয়ে বলি - লাই বাবু। হয়ে মরে গেল বটে। বড়ো সতিনের তিনটা, ছোটো সতিনের দুটা। সবচেয়ে ছোটো নুনুটা হামাকে মা ডাকে।

তারাওয়ালা ফের জিজ্ঞাসা করে - তোমার স্বামী মগন সবথেকে ভালো কী কাজ করতে পারে?

ঝটপট উত্তর করি - হ একরাতে তিন বউকে পুয়োতি করতে পারেক বটে।

হামার ডান ও বামদিকে দাঁড়ানো খাকি দুটো খ্যাক খ্যাক করে হেসে উঠলে তারাওয়ালা হুঙ্কার ছাড়ে।

- এই একে লক আপে রাখো। আটই মার্চ কোর্টে তুলবো।


‘টিংটং টিংটং’ - আমার চোখে-মুখে একরাশ বিরক্তি খেলে যায়। দুপুরে কাঁচা ঘুম ভেঙে গেলে কারই বা ভালো লাগে। আলগোছে হাই তুলে একটা বিশেষ মুদ্রায় নিজেকে তুলে ধরি। মনে মনে ভাবি, সেলসম্যানগুলো এত জ্বালায় ...।

আইহোলে চোখ রাখতে রাখতে সুরেলা কণ্ঠ বিস্তার করি – কে - এ...।

বন্ধ কপাটের ওপার থেকে সমবেত কণ্ঠে উত্তর আসে - আমরা।

একটু ঘাবড়ে যাই। আইহোলে টানটান চোখ রাখি। খাকি উর্দিপরা তিনজন লোক।

ভয় পেয়ে যাই আমি - আপনারা কারা?

দরজার ওপাশ থেকে কে যেন বলে - আমরা আপনাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করতে এসেছি। দরজাটা খুলুন।

এবার আমি সত্যি সত্যি ভয় পেয়ে যাই। ভেক্‌ধারী ডাকাত নয় তো। গরমকালের দুপুর বেলাগুলোতে ফ্ল্যাটবাড়িগুলো খুব অসহায় হয়ে পড়ে। বহুতল আবাসনগুলোতে মৌমাছির চাকের মতো অসংখ্য কোটরে যে যার মতো সেঁধিয়ে থাকে।

ওপার থেকে অনুরোধ আসে – প্লিজ দরজাটা খুলুন মিসেস সুভদ্রা বোস।

খুব অবাক হয়ে যাই - আশ্চর্য, এরা আমার নামও জানে।

দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকাই - টুবলুর স্কুল থেকে ফিরতে এখনও ঘণ্টা খানেক বাকি। তমোনাশ তো আটটার আগে ফিরতেই পারবে না।

আবার খসখসে কঠিন গলায় নির্দেশ আসে - সহযোগিতা না করলে আপনি নিজেই অসুবিধায় পড়বেন মিসেস বসু। আপনি আমাদের আই কার্ড দেখে নিতে পারেন।

আমি ধন্দে পড়ে যাই। খুব সন্তর্পণে ছিটকিনিতে হাত রাখি। আস্তে আস্তে দরজাটা একটু খুলি। আধফালি চাঁদের মতো মুখটা একটু বার করি। তারাওয়ালা খাকি পোশাকের লোকটা আই কার্ড দেখায়। আমি পুরোপুরি দরজার পাল্লা খুলে দিই। তিনজন খাকি পোশাক পরা মানুষ দরজা ঠেলে আমার ঘরে ঢোকে।

অফিসার স্মিত মুখে বলে - বাঃ, আপনার রুচি তো খুব পরিচ্ছন্ন।

অফিসারের কথায় ভালোলাগার বদলে আমার চরম বিরক্তি লাগে। মোবাইলের বোতামে হাত রেখে জিজ্ঞাসা করি - আমার কাছে আপনারা ঠিক কী দরকারে এসেছেন বলুন তো?

অফিসার একটু শাসনের কণ্ঠে বলে – তমোনাশ বাবুকে ফোন করবেন না সুভদ্রাদেবী। প্রয়োজন হলে আমরাই ওনাকে খবর দেব।

আমি এমন বিস্মিত হই যে আমার মাথার মধ্যে সবকিছু এলোমেলো হয়ে যায় - কী আশ্চর্য! এরা আমার ঠিকুজি কুষ্ঠি সব জানে দেখছি।

একজন খাকি পোশাকের লোক টিভি-র ওপর থেকে টুবলুর ছবিটা হাতে নিয়ে বলে - কী সুন্দর আপনাদের ছেলেটা।

আমার আর ধৈর্য্য থাকে না, চিৎকার করে উঠি - রেখে দিন টুবলুর ফোটো। কে আপনারা? কী চাই আপনাদের?

আমার চিৎকারে ব্যালকনিতে রাখা টিয়া পাখিটা ক্যাঁ ক্যাঁ করে ডেকে ওঠে।

অফিসার খাকিটিকে ধমক দেয় - আঃ সুরেন।

তারপর আরাম করে সোফায় হেলান দিয়ে বসে। আমাকে বলে - আপনিও বসুন না মিসেস বোস।

আমি উষ্মা প্রকাশ করি - প্লিজ, আপনাদের যা বলবার আছে চটপট বলুন। আমার ছেলের স্কুল থেকে ফেরবার সময় হয়ে গেছে।

অফিসার এদিক-ওদিক তাকায়।

আমি তখন আমাদের বেডরুমের শোকেসের ওপর রাখা গত বছর পণ্ডিচেরি বেড়াতে গিয়ে আরাভিলা সি বিচের সামনে দাঁড়িয়ে আমার, তমোনাশের এবং টুবলুর ফোটোটার দিকে তাকিয়ে আছি। নীল সফেন সমুদ্রের ধারে আমাদের তিনজনের হাসি মুখ। নিজের কাছে নিজেকে খুব অসহায় লাগে। দু-চোখ জলে ভরে যায়। কোনোরকমে বলি - কেন আমাকে বিরক্ত করছেন?

অফিসার সরাসরি আমার চোখের দিকে তাকায়।

- নাগপুর আদালতে আক্কু যাদবকে হত্যা করার সময় আপনি ছিলেন?

আমি, শ্রীমতী সুভদ্রা বসু, অফিসারের দিকে তাকিয়ে থাকি।

অফিসার ঝুঁকে পড়ে আমাকে বোঝানোর ভঙ্গিতে বলে - শুনুন মিসেস বোস আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া অন্যায় - আপনি যদি রাজসাক্ষী হতে রাজি থাকেন - কথা দিলাম আমি আপনাকে বাঁচিয়ে দেব। আপনার একটা সুন্দর সংসার আছে তো মিসেস বোস।

আমি আক্ষরিক অর্থেই ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকি।

অফিসারের মুখটা রাগে থমথম করে।

- আমি কিন্তু আপনার স্বামীকেও তুলে আনব। আচ্ছা, আপনার কলেজের বন্ধু সুকান্ত মাঝে মাঝে আসতো আপনার কাছে, সে এখন ফেরার কেন?

আমি পারি না, সত্যি আর নিজেকে ধরে রাখতে পারি না। চিৎকার করে উঠি - অফিসার আপনি আমার ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে কথা বলছেন।

অফিসার হুঙ্কার ছাড়ে - এই একে গাড়িতে তোলো। লক আপে রাখতে হবে। আটই মার্চ কোর্টে তুলব।


রাত বারোটা। কলকাতায় ধর্মতলার গ্লোব সিনেমা হলের সামনি সাজুগুজু করি দাঁড়ায়ে আছি। টিপটিপ করি বৃষ্টি পড়তিছে। ছাতা খুলি। আমার কোনো ভয় নেই। কেন-না যে কারণে মেয়েলোক ভয় খায় আমি সে কাজটা করতিই সন্ধ্যা সাতটা পঞ্চান্নর হাসনাবাদ লোকাল ধরি দমদম, তারপর সেখান থেকি মেট্রো ধরি ধর্মতলা এয়েচি। এইরম ‘আবগারি ওয়েদার’-এ আমাদের ভালো আয়পত্তর হয়। আমি একজন চলমান যৌনকর্মী। খারাপ কথায় ...। যাক্‌গে নিজের গুণকীর্তন নিজের মুখে আর নাই বা করলাম।

একটা জিপগাড়ি আমার সামনে এসে থামে। প্রথমটা ভয় খেয়ে যাই। হা ভগবান, খদ্দেরের বদলে পুলিশ! খাকি পোশাক পরা দুটো লোক নেমে আসে। একটা লোক আমারে অভয় দে বলে - তোমার ভয় নেই। কী নাম তোমার?

এ আবার কী রসিকতা। এ লাইনে নিজের নাম মায় বাপের নাম পর্যন্ত কতগুলো হয় তার ঠিক নেই। তবু বাপ-

মায়ের দেওয়া আসল নামটাই বলি।

- আজ্ঞে সুভদ্রা মণ্ডল।

লোকটা আনন্দে আটখানা হয়ি বলে - কী আনন্দ! সুভদ্রা, সুভদ্রা!

চোখ মটকে বলি - নাম শুনেই ভিড়মি খেলে।

অন্য খাকি তাড়া দেয়।

– আঃ সহদেব তাড়াতাড়ি করো।

খিলখিল করি হেসি উঠি আমি।

- বাবুর যে আর তর সয় না।

ধীরে সুস্থে জিপে গে উঠি। জিপগাড়ি হেলে দুলে চলতে শুরু করলে সহদেব লোকটা দূরে বসে।

সিগন্যালে গাড়িটা গোঁত্তা খেয়ি দাঁড়ালে সহদেবকে সরাসরি জিগেস করি - হ্যাঁ গো তোমাদের ঘর ফিট করা আচে?

সহদেব সামনে বসা খাকিটিকে ডাক দেয় - সুরেন, এ কী বলছে শোন।

সুরেন বেশ খেলিয়ে খেলিয়ে বলে - গিয়েই দেখো না তোমার জন্য কী ব্যবস্থা করে রেখেছি।

বুড়ো আঙুলে আঁচলের খুঁট প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে জিপগাড়ির জানলা দে ঐশ্বর্য রাইয়ের একটা সিনেমার পোস্টারের দিকে তাকিয়ে আদুরে গলায় বলি - আমি কিন্তু শেয়ালদা থেকি সকাল পাঁচটা আঠাশের হাসনাবাদ লোকাল ধরবো। ছেলেটারে তো পোলিও খাওয়াতে নে যেতি হবে।

জিপটা বদ্ধ মাতালের মতো টলতে টলতে গোঁত্তা খেয়ে একটা বাড়ির সামনে দাঁড়ায়।

সুরেন লোকটা বিশ্রীভাবে আমারে বলে - এই নেমে আয়।

তুই তোকারি এ লাইনে চলে। চুপচাপ নেমে এসি চমকে উঠি, ওম্মা এতো থানা। ডাক পেড়ি কেঁদি উঠি - এই হারামি তোরা আমায় থানায় আনলি।

অফিসারগোছের লোকটা টেলিফোনে কারে যেন কী সপ বলছিল। আমারে দেখি রিসিভার রেখে দেয়। আমি মরাকান্না জুড়ে দেই।

- আমারে ছেড়ে দিন ছার। ঘর নেই তাই রাস্তায় দাঁড়াই। ঘরে ছেলে আচে। মা-র কাছে থুয়ে আসি। কাল পোলিও খাওয়ানোর ডেট আচে।

অফিসার শান্তভাবে আমারে বুঝায়।

- কাঁদিস না। তোকে কয়েকটা প্রশ্ন করেই ছেড়ে দেব। চা খাবি?

বুকের উপর শাড়ির আঁচলটা গুছিয়ে নিয়ে ফ্যাঁৎ করি নাক ঝেড়ি বলি - খাব। সঙ্গে দুটো বিস্কুট হলি ভালো হয়। সেই কখন খেয়ে বেরিয়েচি। রাতে তো পার্টি খাওয়ায়।

অফিসার চা-বিস্কুট আনার আদেশ দেয়। একটু দূরে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞাসা করে - নাগপুর আদালতে আক্কু যাদবকে হত্যার সময় তুই ছিলিস সুভদ্রা?

বিষম খেয়ে উঠি।

- নাগপুর কোথায় ছার?

অফিসার দাঁতে দাঁত ঘষে বলে - ন্যাকা সাজছে। তুই আক্কু যাদবকে চিনিস না?

এবার আমার হাসিই পায়। তবু এট্টু ভেবি বলি - আমার কাছে কত লোক আসে সবার নাম কি মনে থাকে।

তাছাড়া কেউ সত্যি নাম বলে নাকি? তবু কারও কারও নাম মনে থেকি যায়। তবে মাইরি মনসার কিরা ওই নামে কেউ আসেনি আমার কাছে।

অফিসার সহানুভূতির সুরে বলে - তুই যদি সব বলে দিস আমাদের, আমি তোকে বাঁচিয়ে দেব সুভদ্রা। ফ্যালফ্যাল করি চেয়ে থাকি।

অফিসার মাটিতে রুল ঠুকে চিৎকার করে - আমি তোর ছেলেকে তুলে আনব কিন্তু।

আমার খুব মজা লাগে।

- তাইলে খুব ভালো হয় ছার। মায় পোয়ে দুজনে খেতি পাব, আর লাইনে দাঁড়াতি হবেনি।

অফিসার বাজখাঁই গলায় আদেশ দেয় - এই একে লক আপে ঢোকাও। আটই মার্চ কোর্টে তুলব।


অফিসার খুব ইতস্তত করে বলেন - কী যে বলব সুভদ্রা দেবী আপনাকে। আমার এত খারাপ লাগছে আপনাকে ডেকে আনার জন্য। আসলে জানেনই তো এটা আমাদের একটা রুটিন ওয়ার্ক।

আমি চোখ থেকে সানগ্লাসটা খুলে ব্যাগের ভেতর রাখতে রাখতে হাসিমুখে বলি - ঠিক আছে। আপনার কাজ আপনি করেছেন।

অফিসার আরও বিগলিত হয়ে ওঠেন।

- আসলে আপনার নামটা নিয়ে যত সমস্যার সৃষ্টি। জানেনই তো নাগপুর আদালতে আক্কু যাদবকে খুন করবার সময় যে সব মেয়েরা ছিল তার মধ্যে সুভদ্রা নামে একজন ছিল। আমরা গোপনসূত্রে জানতে পেরেছি ওই সুভদ্রা নামের মহিলা সাংঘাতিক। সেই লিড করেছিল পুরো দলটাকে।

আমি অফিসারের ঘরটার চারিদিকে তাকাই। খুব বড়ো সাইজের একটা ভারতবর্ষের ম্যাপ ঝোলানো। ধুলোয় ধুলোময় হয়ে আছে চারপাশ।

ঝুঁকে পড়ে জিজ্ঞাসা করি - আপনি কি শিয়োর ওই মেয়েটির নাম সুভদ্রাই ছিল?

অফিসার এবার তুতলে যান।

- ন্‌-না। মানে সোর্স মারফত খবর। হতে পারে মেয়েটির নাম ছিল – কুন্তলা অথবা শবনম কিংবা আলিশা।

আবার আমি জিজ্ঞাসা করি - তার সারনেম কী অফিসার?

অফিসার মাথাচুলকে মানচিত্রের দিকে তাকিয়ে উত্তর করে - দেখুন না ম্যাডাম আমরা সেটাও জানতে পারিনি।

আমি চাপা শব্দে হেসে উঠি।

- কিন্তু অফিসার, সুভদ্রা তো আমার অরিজিনাল নামই নয়, আমি তো ওই ছদ্মনামে লিখি।

অফিসার দু-হাত উপরে তুলে চৈতন্যের ভঙ্গিতে বলেন - ছি ছি, কী কাণ্ড দেখুন তো। আপনাদের মতো বিখ্যাত মানুষদের সান্নিধ্যে আসা মানে তো আমাদের ভাগ্যের ব্যাপার। সব সময় চোর-ছ্যাঁচোর, খুনি-মস্তানদের নিয়ে কারবার। এসেই যখন পড়েছেন একটু না হয় গল্প করেই যান।

ভ্রু কুঁচকে বলি - এই হাটের মাঝে?

অফিসার সুরেন আর সহদেবকে চলে যেতে নির্দেশ দেয়।

- কিছু নিন। গরম অথবা ঠান্ডা।

ঘাড় নেড়ে বলি - না। ধন্যবাদ।

অফিসার চেয়ারে হেলান দিয়ে জিজ্ঞাসা করেন - নতুন কী লিখছেন?

– লিখছি না, ভাবছি।

অফিসার শীতকালের খেজুর রসের মতো টুপটাপ ঝরে পড়ে - কী সব কাণ্ড বলুন তো। আদালত চত্বরে কিছু মেয়ে মিলে আক্কু যাদবকে মেরে ফেলল! তবে আমার কী মনে হয় জানেন, মেরে ঠিকই করেছে।

আমি চাপা কণ্ঠে সেতারের বোল তুলি।

- না না। এসব কী বলছেন। মানুষের ধৈর্য থাকবে না!

অফিসার হাত কচলায়।

– সে আপনারা বুদ্ধিজীবী মানুষ, আপনারা এ কথা বলতে পারেন কিন্তু যারা ভিক্টিম তারা কীভাবে ধৈর্য

রাখবে বলুন তো।

আমি ঠোঁট কামড়াই।

- না – আ - এটা ঠিক না। বিচার ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা থাকবে না?

- কিন্তু সুভদ্রা দেবী আক্কু যাদবের অপরাধটাও চিন্তা করুন। কত খুন-রেপের মতো জঘন্য অপরাধের দাগি আসামি।

আমি হাসি। আমার হাসিতে অসামান্য বুদ্ধিদীপ্ত শৌর্য প্রকাশ পায়।

- মানুষকে বোঝাতে হবে অফিসার। আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া অন্যায়।

আমি উঠে দাঁড়ালে অফিসার বলে - আপনার অনেক মূল্যবান সময় নষ্ট করলাম।

মোবাইলটা এতক্ষণ ভাইব্রেশনে দেওয়া ছিল। ওটাকে ঠিক করতে করতে বললাম - ঠিক আছে।

অফিসারের শরীরী ভাষায় কৃতজ্ঞতা ঝরে পড়ে - জিপ ডাকি আপনাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে বলি।
পূর্ণ দৃষ্টিতে অফিসারের দিকে চোখ মেলি।

- না। ধন্যবাদ, এখন আমি বাড়ি যাব না। কিছু দূরে আমার একটা সাহিত্য-সভা আছে, সেখানেই যাব।

অফিসার হাসি হাসি মুখ করে তাকিয়ে থাকেন।

আমি দু-পা এগিয়ে আবার পেছনে ফিরি।

- শুনছেন, সামনে আটই মার্চ নারীদিবস উপলক্ষ্যে টিভিতে আমার একটা সাক্ষাৎকার আছে। দেখবেন কিন্তু। ওখানে অবশ্য আমি আক্কু যাদবকে মেরে ফেলার ঘটনাটা সাপোর্টই করব।

অফিসার তাকিয়ে থাকেন। অফিসার তাকিয়ে থাকেন। তাকিয়েই থাকেন।

1 টি মন্তব্য:

  1. আরে বাঃ - বেশ অন্যরকম - আবার টিপিকাল তন্বীও বটে। মনস্তাত্ত্বিক মোচড়। দারুণ

    উত্তরমুছুন