শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

সিলভিয়া প্লাথ'এর গল্প: প্রেসকট সাহেব যেদিন মারা গেলেন



অনুবাদ : রোখসানা চৌধুরী
 
চোখধাঁধানো এক রোদের দিনে প্রেসকট সাহেবের মৃত্যু ঘটল। খবর পেয়ে মা আমাকে নিয়ে তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে বাস স্টপেজের দিকে রওনা দিলেন। প্রায় দৌড়াতে দৌড়াতে একটা বাসে উঠে কোনার দিকে সিটও পেয়ে গেলাম আমরা।
 
টের পাচ্ছিলাম ততক্ষণে আমার পিঠ বেয়ে দরদর করে ঘাম পড়ছে।কালো লিলেন জামাটা ঘেমে গিয়ে সিটের সাথে আটকে যাচ্ছিল।বারবার সিট থেকে কাপড় টেনে তোলার আওয়াজ হচ্ছে আর আমি রাগান্বিত চোখে মায়ের দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছি যেন এটা মায়েরই দোষ। মা কিন্তু দিব্যি কোলের ওপর হাত রেখে এমনভাবে বসেছিল যেন বাসের মৃদু ঝাঁকুনি ছাড়া কোথাও কিছু ঘটেনি। আসলে সে সবকিছু মেনে নিয়ে ভাগ্যের হাতে ছেড়ে দেয় ভবিতব্যকে,সবসময় তাই করে। এই মুহূর্তে অবশ্য তার মুখে অসন্তোষের ছাপ স্পষ্ট হয়ে ফুটে আছে। সকালে মিসেস মেফেয়ারের ফোনটা আসার পরই আমি বলেছিলাম আমার এসব অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার রীতিনীতিতে কোন বিশ্বাস নাই।শুধু তোমার কথা রাখতেই যাওয়া আর সবার দিকে তাকিয়ে থাকা।
 
"তোমার কাছের কেউ যখন মারা যাবে তখনই তুমি বুঝবে।তার আগে না।তাদের জন্য এটা দুঃসময়।"
"হ্যাঁ নিশ্চয়ই, কিন্তু আমাদের কি করার আছে এতে।এমনকি লিজ আর বেন,যাদের সাথে বছরে একবার দেখা হতো,যখন মিসেস মেফেয়ার ক্রিসমাসের উপহার নিতে ডাকতেন।"
 
যা হোক,এই মুহূর্তে গরম আর ঘাম ছাড়া কিছু মাথায় আসছে না,আবার মায়ের ভয়ে আর কিছু ভাবারও সাহস নাই,মা আমাকে ছোটবেলায় খুব শাসনে রাখত, যদিও মারতে পারত না।অগত্যা অনন্যোপায় হয়ে সিটের সাথে লেপ্টে রইলাম।পরনের কাপড় নিয়েও মন খচখচ করছে।আচ্ছা, লিলেনের কালো গাউন,ছোট্ট হ্যাট সব মিলে তো একদম ডিনার নাইটের পোশাক বলে মনে হচ্ছে আমার। হঠাৎ বাসটা একটা স্টপেজে বিকট শব্দে দাঁড়ায় আর আমি পরিচিত সেই এলাকার দিকে অভিভূত হয়ে তাকিয়ে থাকি।আমরা অনেক আগে এই এলাকা থেকে মীরা আন্টির সাথে চলে গিয়েছিলাম। যদিও এই জায়গার জন্য আমার কখনোই মন পোড়েনি কেবল সমুদ্রতীরটুকু ছাড়া। এমনকি বাসটা দাঁড়াতেই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠল প্রথম দেখা সমুদ্রের গভীর নীল রেখাটুকু। মাকে ডেকে বললামও,"মা,দেখো,ঐ যে সেই সি বিচটা দেখা যাচ্ছে।"
 
মা মৃদু হেসে আমার মনোযোগ মূল বিষয়ে ফেরাতে চাইল, "আমি চাই তুমি আজ লক্ষ্মী মেয়ের মতো সবার সাথে মিশবে,কথা বলবে ভদ্র আর নরম গলায়। খামোখাই কারো ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে নাক গলাতে যেও না, ওটা অসভ্যতা।"
"মা,আর কিছু বলা লাগবে না তো, আমি তো ভালোই বুঝি এখানে শুধু মি. প্রেসকটের জন্যই আসা।আসলে তো তার মরাতে কারো কিছু আসে যায় না। কেউ এখানে দুঃখিত না।তুমি চিন্তা করো না, আমি ঠিকঠাকই থাকব।"
 
চারপাশটা একবার দেখে নিয়ে মা আমার দিকে তাকিয়ে ক্রুদ্ধ চাপা স্বরে হিসহিসিয়ে বলল, "কি বলছো এইসব? কে শিখাইছে এরকম অভদ্রভাবে কথা বলা? তুমি কেমনে জানো কেউ দুঃখ পায় নাই?"
 
"ওহ মা,তুমিও জানো, সবাই জানে মিসেস প্রেসকট উনার চেয়ে বিশ বছরের ছোট ছিলেন।সত্যি কথা বলতে উনি হয়তো অপেক্ষাই করছিলেন তার মরার জন্য। আর উনার হাতে যে বিদঘুটে চর্মরোগ ছিল। মাগো,কি ঘেন্না!"
"আহা,এটা তো উনার অসহায়ত্ব। অসুখ বিসুখ নিয়ে এভাবে বলতে নেই। তাছাড়া এটা উনার খামখেয়ালিও ছিল, সারাক্ষণ হাত চুলকানো।"
 
"মনে আছে মা গতবারের ক্রিসমাস ডিনারের কথা?-- আমি কঠিন গলায় বলতেই থাকলাম,উনি ডাইনিং টেবিলে বসে হাত চুলকাচ্ছিলেন আর বালির মতো গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে হাতের চামড়া খোসার মতো উড়ছিল।কেমনে সম্ভব এরকম একটা লোকের সাথে এক বাড়িতে থাকা!এতে কোন সন্দেহ থাকার কথা না যে তার অনুপস্থিতিতে শোক না,বরং স্বস্তি বিরাজ করবে সবার মধ্যে।"
 
মা হড়বড় করে বলতে থাকল,আচ্ছা যা হোক,এটা তো বরং ভালোই হলো যে উনি বিছানায় শুয়ে শুয়ে রোগভোগ না করে সুন্দরভাবে যেতে পারলেন।আমার সময় হলে আমিও এরকম সহজ মরণ কামনা করব।"
 
বাজারের শোরগোল শোনা যাচ্ছিল,আমাদের স্টপেজ এসে পড়েছে।এখান থেকে ডেভনশায়ারের গলিটা দেখা যায়। বাসের চিপাচাপা দরজা দিয়ে বের হওয়াটা একটা অনাসৃষ্টি কাণ্ড বটে। হেলপার মশাই সাহায্য করার জন্য এগিয়ে এলে আমি অতীব ঠাণ্ডা গলায় তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে নেমে পড়লাম।মানুষজনের ভিড়ভাট্টা তো আছেই, তার ওপর সামনে পড়েছে বিপজ্জনক ড্রেনেজ।এর মধ্যেও মা জরুরি ভঙ্গিতে বলে চলেছে,"শোনো,আমাদের অত আলাপে দরকার নাই। যতটুকু সময় না থাকলে না ততক্ষণ থাকলাম। ওদের কাজেকর্মে হাত লাগালাম, তুমি লিজ আর বেনের সাথে গল্পসল্প করে সময় কাটালে,কেমন?"
"কিন্তু মা,আমি কীভাবে মি. প্রেসকটের জন্য দুঃখিত বলব,যেখানে আমি সত্যি সত্যি কোন দুঃখ পাচ্ছি না?উল্টো এটাকেই মন্দের ভালো বলে মনে করছি।"
"তুমি এভাবে বলবে এটা ঈশ্বরের দয়া যে উনি খুব শান্তির সাথে পরপারে চলে যেতে পেরেছেন। এটাই তোমার দিক থেকে সত্য বলা হবে।"
 
মায়ের কথায় মনোযোগ দিতে গিয়ে আরেকটু হলে প্রেসকটদের গেটের বাইরে বিছানো নুড়ি পাথরে হোঁচট খেয়েছিলাম আর কি। আমি আসলে বিন্দুমাত্র শোক অনুভব করতে পারছিলাম না, এটাই সত্যি। গেটের ভেতর ঢুকতেই দু পাশে দুটো পপলার গাছ চোখে পড়ে। বাড়ির চাতালের পাশে টানানো কমলা সবুজ শামিয়ানা দশ বছর আগের মতোই আছে। মাকে আমি চাতালের ওপর উঠতে সাহায্য করতে করতে বাগান থেকে আসা ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দ খেয়াল করছিলাম। আমি মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম বেন বাগানে ঝুলানো দোলনার মতো আরাম কেদারায় বসে দুলছে আর সব দিনের মতন, যেন কোথাও কিছু ঘটে নি। সবচেয়ে বিস্মিত হচ্ছিলাম দোলনার পাশে রাখা গিটারটা দেখে, যেন মাত্রই কোন রক মিউজিকের সুর বাজিয়ে পাশে রেখে দিয়েছে ওটাকে।
"হ্যালো বেন,কি খবর?"
 
মা যথাসম্ভব কন্ঠকে শোকগ্রস্ত রেখে বেনকে সমবেদনা জানাল,আর তাতেই তাকে যথেষ্ট অপ্রস্তুত দেখাচ্ছিল।নিজেকে সামলে নিয়ে সে তড়িঘড়ি মাকে ভেতরে থাকা আত্মীয় স্বজনদের খবর দিল যাতে এসব পরিস্থিতিকে দ্রুত পাশ কাটিয়ে যাওয়া যায়। আমি মায়ের পেছনে যেতে যেতে বেনের দিকে তাকিয়ে হাসলাম। ঠিক জানি না, হাসিটা কি তার পিতার মৃত্যুজনিত সমবেদনার জন্য ছিল নাকি এই মুহূর্তের অপ্রস্তুত অবস্থা থেকে কিছুটা রেহাই দিতে।
 
বাড়ির ভেতরটা আবছায়া অন্ধকারে ঝাপসা। জানলাঘেরা সবুজ পর্দার সারি আজ নামানো ছিল। হয়তো আজকের খররোদ থেকে বাঁচতে, নাকি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার জন্য, কে জানে। মা লিভিং রুমের পর্দা সরিয়ে মিসেস প্রেসকটকে ডাকলেন,"লিডিয়া?"
"এ্যাগনেস!"
 
লিভিং রুমের ছোট দুই তিন ধাপ সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে মিসেস প্রেসকট আমাদের অভ্যর্থনা জানালেন। তাকে এর আগে কখনো এতটা ভালো থাকতে দেখিনি আমি। যদিও চোখের পানিতে তার গালের ফেস পাউডার গলে মাখামাখি হয়ে ছিল। আমি তাদের আন্তরিক কোলাকুলি আর গলাগলি শেষ হওয়ার অপেক্ষায় ছিলাম কারণ পরের সিরিয়ালই ছিল আমার। তিনি আমার দিকে ঘুরতেই আমি আলিঙ্গনের জন্য হাত বাড়িয়ে দিলাম। আমি কিছুতেই মুখের ওপর শোকের ছায়া আনতে না পেরে শুধু বলে উঠলাম,"আপনি বিশ্বাসই করতে পারবেন না আমরা কতটা অবাক হয়েছি খবরটা শুনে।"
আসলে ওখানে কেউই ছিল না অবাক হওয়ার মতো, তার আরেকটা হার্ট অ্যাটাকের অপেক্ষায় ছিল সবাই, আর সেটাই ঘটেছিল। কিন্তু আমার পক্ষে এরচেয়ে বেশি কিছু বলবার মতো ছিল না সত্যিই।
"আমিও ভাবিনি এমন একটা দিন আমাকে দেখতে হবে।"
 
দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে বললেন তিনি। আমরা তার সাথে লিভিং রুমে গেলাম। এতক্ষণে ঘরের স্বল্প আলো চোখে সয়ে এসেছিল। ভালমতো তাকিয়ে দেখলাম ঘরের ভেতর অনেক মানুষ। একদম কর্নারে পিয়ানোর কাছে বসেছিলেন মিসেস মেফেয়ার, প্রেসকট সাহেবের তুতো বোন। আমার দেখা সবচেয়ে পেল্লায় সাইজের মহিলা। তার কাছাকাছি বসে ছিল লিজ,প্রেসকটের কন্যা।আমার সাথে তার খুব কমই হাই হ্যালো হয়েছে। সে একটা শার্ট আর থ্রি কোয়ার্টার প্যান্ট পরে একের পর এক সিগারেট খেয়ে যাচ্ছিল,মুখের সামান্য ফ্যাকাশে ভাবটুকু ছাড়া তাকে দেখে মনেই হচ্ছিল না ঐ দিন সকালে তার বাবা মারা গেছে। সবার আসন গ্রহণ শেষ হলে আকস্মিক নীরবতা নেমে এলো, যেন মূল অনুষ্ঠান শুরুর আগে একটা ভূমিকা দেয়ার অপেক্ষায় সবাই। ব্যতিক্রম শুধু চর্বিতে গলদঘর্ম মিসেস প্রেসকট। তার কান্নার মৃদু ফোঁসফোঁসানি শোনা যাচ্ছিল। রুমালে চোখের পানি মুছতে দেখা গেলেও আমি নিশ্চিত ওটা আজকের প্রচণ্ড গরমের কারণে বেয়ে পড়া ঘাম ছাড়া কিছু না।
 
মা-ই শুরু করল,"এটা দুঃখজনক লিডিয়া। খুবই মর্মাহত যে এমনভাবে ঘটনাটা ঘটল। আমি তো শুনে প্রায় দৌড়ে আসছি। কিন্তু এখনো জানি না তাঁকে প্রথম ঐ অবস্থায় প্রথম কে খুঁজে পেয়েছিল।"
মা যেভাবে তাকে অতি সম্মানের সাথে উপস্থাপন করল এতটা দরকার ছিল না। ঐ বদমেজাজি, চর্মরোগওয়ালা প্রেসকট সাহেবের এখন আর এসবে কিছু যায় আসে না। যা হোক, এটা আসলে একটা প্রারম্ভিকা ছিল যার জন্য মিসেস প্রেসকট প্রস্তুত ছিলেন,বলা চলে অপেক্ষাই করছিলেন।
"ওহ,এ্যাগনেস,আর বলো না গো"
একটা উজ্জ্বল আলো তার মুখে খেলা করছিল।
"আমি সেখানে ছিলামও না।লিজ ছিল, বেচারি!"
 
"আহারে বাচ্চাটা!" বিকটাকার তরমুজের মতো বলিরেখায় ভরা মুখ নিয়ে বলে উঠলেন মিসেস মেফেয়ার। "সে বলতে পারো মেয়েটার হাতের ওপর মারা গেছে। "লিজ কিছুই বলল না। হাতের অর্ধ সমাপ্ত সিগারেটটা নিভিয়ে দিয়ে আরেকটা ধরালো শুধু। আমি অবাক হয়ে দেখছিলাম তার হাতটা এতটুকু কাঁপল না পর্যন্ত।
"আমি গেছিলাম ' র‍্যাবাইয়ে কাছে।"( rabbi- র‍্যাবাই, ইহুদি ধর্মীয় নেতা)।
 
উনি ফের বলতে শুরু করলেন। তার অভ্যাসই ছিল নিয়মিতভাবে কাউকে না কাউকে ধরে এনে ডিনার করানো। কখনো নতুন পদে আসীন হওয়া মন্ত্রী আবার কখনো গীর্জার পাদ্রি। এখন তাহলে 'র‍্যাবাই পর্ব' চলছে।
" আমি ছিলাম বাইরে, তাই লিজ ডিনার রেডি করছিল যাতে তার বাবা সাঁতার কেটে ফিরেই ডিনারে বসতে পারে। তুমি তো জানোই এ্যাগনেস পপ সাঁতার কতটা পছন্দ করতেন। "
মুখে শোকের চিহ্ন ধরে রেখে মৃদু ঘাড় নাড়ালো মা।
 
"তারপর হলো কি আনুমানিক তখন সাড়ে এগারোটা বাজে। সে সবসময় সকাল সকাল সাঁতারে যেতে পছন্দ করত,পানি বরফ ঠাণ্ডা হলেও। মাত্রই পুল থেকে উঠে শরীর মুছতে মুছতে বাড়ির সামনে লাগোয়া বেড়ার ওপাশে পড়শির সাথে কথা বলছিলেন তিনি।"...
" বেড়াটা উনিই লাগিয়েছিলেন, এক বছরও হয় নি" -- মাঝখান দিয়ে মিসেস মেফেয়ার জানিয়ে দিলেন বিষয়টা, যেন এটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ তথ্য।
 
"আর প্রতিবেশী মি. গ্রোভ উনার দিকে হা করে তাকিয়েছিলেন কারণ পপের চেহারাটা তখন জোকারের মতো দেখাচ্ছিল। পুরো চেহারাটা নীল,মুখটা হাসি হাসি আবার চোখ দুটা যেন ফেটে বের হয়ে যাচ্ছে।"
লিজ সামনের জানালার দিকে ভাবলেশহীন ভঙ্গিতে তাকিয়ে ছিল, যেখান থেকে এখনো ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দটা ভেসে আসছে।
পুরো সময়টা সে একটা কথাও বলেনি, কেবল ধোঁয়ার কুন্ডলি বানানো ছাড়া।
"অবস্থা দেখে মি গ্রোভ চিৎকার করে লিজকে ডাকেন। নিজে ছুটে যান ঘরের ভেতর ব্রান্ডি আনতে। লিজ পৌঁছাতে পৌঁছাতে পপ ওখানেই পড়ে যান, স্রেফ একটা কাটা গাছের মতো। লিজ এসে তার বাবার মাথাটা কোলে তুলে নেয়।"
"তারপর কি হলো?"
আমার প্রশ্নটা যেন ছোটবেলায় মা আমাকে ডাকাতের গল্প শোনাচ্ছেন সেরকম শিশুর কৌতুহলের মত হয়ে গেল, যা হোক।
"তারপর... উনি আমাদের ছেড়ে চলে গেলেন। লিজের সেই হাতের ওপরেই। এমনকি ব্র্যান্ডির একটা ফোঁটাও তার গলা দিয়ে নামেনি।"
"ওহ লিডিয়া, কিসের ভেতর দিয়ে গেছ তুমি, আর কীভাবেই বা তোমার দিন কাটছে।" মা এবার সত্যি সত্যি কেঁদে ফেললো। আমার অবশ্য মনে হলো না মিসেস প্রেসকট খুব বড় রকমের বিপর্যয়গ্রস্ত হয়েছেন।
"হে ঈশ্বর, তুমি আমাদের পাপমুক্ত করো।" মিসেস মেফেয়ার ফোঁপাতে ফোপাঁতে দামি রুমালে নাক মুছছিলেন আর ঈশ্বরের কাছে এমনভাবে প্রার্থনা করছিলেন যেন তিনিই মি. প্রেসকটকে খুন করেছেন।
"আমরাও যাব খুব শীঘ্রই, পপ যে পথে গেছেন, তিনি শুধু আমাদের পথ দেখিয়ে দিয়ে গেলেন।"
"আমরা এর বেশি কীই বা করতে পারি আর চাইতে পারি।"
দীর্ঘশ্বাস ফেলতে ফেলতে মা বললেন।
 
"আমি শুধু চাই সময় এলে যেন উনার মতো সহজভাবে মরতে পারি।" মিসেস প্রেসকটের আশা। আর মিসেস মেফেয়ার নির্দিষ্ট কারো নামোল্লেখ না করে কেবলি কৃতকর্মের জন্য ঈশ্বরের দরবারে ক্ষমাপ্রার্থনা করে যাচ্ছিলেন।এমন সময় বাগানের দোলনাটার অনবরত ক্যাঁচ ক্যাঁচ শব্দটা হঠাৎ থেমে গেল। বেন দরজায় এসে ঘরের ভেতরকার ঝাপসা অন্ধকারের দিকে পিটপিট করে তাকিয়ে মাকে খু্ঁজল। জানালো তার খিদে পেয়েছে।
 
"আমার মনে হয় সবারই খাবারের সময় হয়েছে। প্রতিবেশীরা অনেকেই খাবার পাঠিয়েছে। সেগুলোর ব্যবস্থা করা দরকার।" মৃদু হেসে জানালেন মিসেস প্রেসকট।
"হাঁসের মাংস, সুপ আর সালাদ। আমি শুধু জানি না ওগুলো কোথায় রাখা আছে।" হোটেলের বেয়ারার স্টাইলে একঘেঁয়ে স্বরে যেন মেনু পড়ে শোনালো লিজ।
"ওহ,লিডিয়া,চলো আমরা সবাই মিলে হাত লাগাই। এটা কোন সমস্যা হলো?"
"আরে না,সমস্যা তো না,তবে আমি চাই ছোটোরা এইসব দায়িত্ব নিক এখন থেকে।" মা আমার দিকে তাকিয়ে কড়া চোখের ইশারা দিতেই আমি শক খেয়ে উঠে দাঁড়ালাম।
"চলো লিজ,কোথায় কি আছে আমাকে দেখিয়ে দাও। সবাই মিলে হাত লাগালে সময় লাগবে না আশা করি। "
বেন আমাদের সাথে ওখান থেকে প্রায় পালিয়ে এলো আর কি। পুরনো রঙচটা গ্যাস স্টোভের পাশে ছিল আধোয়া নোংরা প্লেটভর্তি সিঙ্ক।
 
প্রথমেই আমি প্রায় দৌড়ে গিয়ে সেই নোংরা সিঙ্ক থেকে বিশাল একটা মগ তুলে নিয়ে জলের খোঁজে গেলাম।
"আগে গলা ভিজাই, তারপর অন্য কথা।" তড়িঘড়ি করে গ্লাস ভর্তি করে চুমুক দিতেই টের পেলাম পানিতে কেমন আজব ধরনের স্বাদ। ওদিকে বেন আর লিজ আমার দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে, আমি এতক্ষণ খেয়ালই করিনি। আমি সম্ভবত গ্লাসটা তাড়াহুড়ায় ভালভাবে ধুয়ে নিইনি, তাই তলানিতে কিছু জমে ছিল। সিগারেটের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে লিজ সহজ গলায় জানালো, "কিছু মনে করো না, ওটা বাবার চুমুক দেয়া শেষ গ্লাস।"
 
"হায় ঈশ্বর,আমার কী হবে?" তাড়াতাড়ি গ্লাসটা নামিয়ে রেখেও কেমন যেন গা গুলিয়ে উঠে অসুস্থ বোধ করতে লাগলাম আমি। আমার চোখের সামনে যেন ভাসছিল মি. প্রেসকট ঐ গ্লাসে চুমুক দিচ্ছেন আর তার সারা শরীর নীল হয়ে যাচ্ছে।
"আমি সত্যি সত্যি দুঃখিত,আর লজ্জিতও।"
বেন বিষয়টা পাত্তাই দিল না।
 
"আরে কেউ না কেউ কখনো না কখনো তো গ্লাসটা ব্যবহার করতই,এইটা কোন ব্যাপার?এজন্যই বেনকে ভালো লাগে। সবরকম পরিস্থিতিতে সে কত সহজ থাকতে পারে। লিজ খাবার দাবার বের করতে গেল। বেন আমার কাছে গিটার বাজানোর অনুমতি চাইল। আমি বললাম, "আমার তো ভালোই লাগবে। কিন্তু লোকজন আবার না এটা নিয়ে কথা ওঠায়।"
 
বেন বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,"ওদের কথা নিয়ে ওরা থাকুক। আমার বাজানো শুনে উল্টো পয়সা দিতে যেন না আসে।"
আমি কাজ করছিলাম আর বেন তার গিটারে এলোমেলো সুর তুলছিল যা শুনে হাসিও পাচ্ছিল আবার মন খারাপও হয়ে যাচ্ছিল। আমি হাঁসের মাংস রেডি করতে করতে ইতস্তত ভঙ্গিতে তাকে জিজ্ঞেস করলাম, বেন, "তুমি কি সত্যিই এতটুকু দুঃখ পাওনি?"
 
বেন তার স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে হাসল আর বলল,"ঠিক দুঃখ না। তবে আরো একটু ভালো থাকতে পারতাম আর কি, আরেকটু ভালো। এটুকুই।"
আমি মায়ের কথা ভাবছিলাম, আর সারাটা দিন ধরে যে শোকের অংশটুকু আমার নজরে আসে নি সেটুকু দেখতে পেলাম যেন।
"আমরা আগের চাইতে আরো বেশি ভালো থাকার চেষ্টা করব, আর সেজন্য আমাদের উচিত সবাই মিলে যার যার জায়গা থেকে সর্বোচ্চটুকু করে যাওয়া।" ঠিক অবিকল মায়ের ভঙ্গিতে কথাগুলো বলে উঠলাম,যা আমি কখনো স্বপ্নেও ভাবিনি।
 
"কি অদ্ভুত তাই না, কীভাবে ভাবা যায়, কেউ মারা যাবে আর সাথে সাথে আমি স্বাধীন হয়ে যাব সেই সম্পর্ক থেকে? উল্টো সেই চিন্তা জেঁকে বসে আমার দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে। এই দেখো না, পপ মারা গেছে, আমি এখনো বিশ্বাস করতে পারছি না, মনে হচ্ছে সে আমার অন্তরের কোথাও বাস করছে আর আমার কর্মকাণ্ড দেখে বাঁকা হাসি হাসছে।"
আমি অবাক হয়ে শুনছিলাম, বললাম, "এটা তো খুব ভালো ব্যাপার। তুমি পরিস্থিতি ছেড়ে পালিয়ে যাচ্ছ না। এরকম একটা বিষয় হঠাৎ করে হজম করাও কঠিন কাজ। বরং ভালো যে তুমি এটা থেকে পালাতে চাইছ না। তুমি জানো তোমাকে এই নতুন অবস্থার সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েই চলতে হবে। তুমি যেখানে যাও না কেন,যতদূরে এই অনুভব তোমাকে ছেড়ে যাবে না,বরং বাড়তে থাকবে।
 
বেন মিষ্টি হাসল। আমি মটরশুঁটির স্যুপ চুলা থেকে নামিয়ে সবাইকে খাবার ঘরে ডাকলাম। ডাইনিং টেবিলে রীতিমতো আনন্দঘন পরিবেশ তৈরি হলো। হাঁস আর হ্যামসহ প্রচুর খাবার ছিল। আমি আমার অফিসের বস মি. মারে ও তার সিগারেটের গল্প করতে গিয়ে মিসেস মেফেয়ারকেও হাসিয়ে ছাড়লাম। লিজও অবশেষে যোগ দিল আমাদের সাথে। মিসেস মেফেয়ার গাণ্ডেপিণ্ডে খেয়েও ডেজার্টে চকলেট কেকের জন্য আবদার করতে লাগলেন। জনৈকা হেনরিয়েটার পেটুক স্বভাব মানসিক রোগের পর্যায়ে চলে গেছে বলে মিসেস প্রেসকট জানালেন। লিজের বানানো ধূমায়িত সুগন্ধি কফি দিয়ে ডাইনিং পর্ব শেষ হলো। লিজ আবার যথানিয়মে সিগারেট ধরালো,আর বেন পেপার ন্যাপকিন দিয়ে গ্লাইডার বিমান বানাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
 
মায়েরা আলাদাভাবে বসতে চাচ্ছিলেন। লিজের সঙ্গে আমি এবার বিনাবাক্য ব্যয়ে কাজে হাত লাগাতে উঠে পড়লাম। মায়ের দিকে ভ্রূক্ষেপ না করেই বেনকে বললাম আমাকে সাহায্য করতে।
 
আবারও ছোটদের হাতে কিচেন সামলানোর ভার দিয়ে উজ্জ্বল-উচ্ছল মহিলারা তাদের নিজস্ব বৈঠকখানায় কূটকচাল বিষয়ক আড্ডায় ঢুকে পড়লেন। আর এভাবেই একটি অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া দিবস সমাপ্ত হয়েছিল।

--------------
 
 
লেখক পরিচিতি:
সিলভিয়া প্লাথ একাধারে কবি, গল্পকার এবং ঔপন্যাসিক। তিনি ১৯৩২ সালে ২৭শে অক্টোবর আমেরিকার মাসাচুসেটসে জন্মগ্রহণ করেন। বাবা পেশায় ছিলেন অধ্যাপক, মা গৃহিনী।সিলভিয়া খুব অল্প বয়স থেকেই বিষণ্নতায় আক্রান্ত ছিলেন।মাত্র আট বছর বয়সে কবিতা লিখতে শুরু করেন তিনি।বিয়ে করেন ইংরেজ কবি টেড হিউজকে।দুটি সন্তানের জন্ম দেন।স্বামীর একাধিক সম্পর্কের কারণে পৃথক বসবাস করতে শুরু করার এক বছরের মাথায় সিলভিয়া মাত্র ৩১ বছর বয়সে আত্মহত্যা করেন।তাঁর রচনাবলী পাঠকের কাছে তাঁকে অমর করে রেখেছে।



অনুবাদক পরিচিতি:
রোখসানা চৌধুরী
প্রবন্ধকার এবং অনুবাদক
বাংলাদেশের সুনামগঞ্জে থাকেন।


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন