শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

অভিজিৎ সেন'এর গল্প : শেয়াল



যতদূর চোখ যায় শুধু বেনাবন। ঢালু জমিটা পশ্চিম দিকে উঁচু হয়ে উঠে গেছে টিলার মতো। রুক্ষ্ম কর্কশ মাটি অন্যদিকে মিশেছে একটা নালার সঙ্গে। এদেশে বলে খাড়ি। নালাটা এখন প্রায় জলশূন্যই বলা যায়। বর্ষার সময় প্লাবন হয়, সমস্ত এলাকাটা তখন জলে ডুবে যায়। জমিটার নাম তাই ডুবো। বেনাবন সার্বভৌমত্ব মানেনি, এদেশ পেরিয়ে সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া অগ্রাহ্য করে ওপারে চলে গেছে মাইলের পর। মাইল। ওপার অর্থাৎ বাংলাদেশ।

উঁচু এবং বিস্তৃত এই ঘাসের জঙ্গলের চারপাশ জুড়ে কিছু কিছু ফাঁকা জায়গাও আছে। সহদেব বিশ্বাস সেই ফাঁকা জায়গায় ঘুরছে। ঘুরছে তো ঘুরছেই। কাঁধের উপরে একটা কোদাল ঝুলে রয়েছে তার। রোদ বেশ চড়া। সহদেব বেনাবনের অন্তরঙ্গ জায়গাটায় পৌঁছতে চেষ্টা করছিল। ঢুকবার মতো একটা গলিপথ পেয়ে সে উঁচু জায়গা থেকে নেমে এল।

দেখে শুনে পা ফেলছিল সে। জায়গাটা সাপের আড্ডা। তাদের দেশে যাকে বলে জাতিসাপ, এদেশে মাচেলাচ, সেই দুর্দান্ত কেউটেরা এখানে থাকে। ঘাস নড়তে দেখলেও ছোবল মারে, এমনই খ্যাতি এই সব সাপের। যমের দক্ষিণদুয়ার এই বেনাবনের বা বিন্নখাড়ির জলা বর্ষার পুরোটা সময়ই জলে ডুবে থাকে। শীত শেষ হয়ে বসন্তকালও অর্ধেক পার হয়ে গেছে। চারদিকের ধূসর মাটির উপরে, গাছের ডালে সরীসৃপের পরিত্যক্ত খোলস। শীতঘুমের নিরাপদ সুড়ঙ্গ ছেড়ে সাপেরা বেরিয়ে পড়েছে। সন্তর্পণে পা ফেলে সহদেব জঙ্গলের মাঝখানে চলে এল। অনেকটা পরিধি জুড়ে একটা অগভীর গর্তের মতো। গর্তটা এত বড় যেন মনে হয় একটা ডোবা, এখন শুকিয়ে বর্ষার অপেক্ষায় আছে।।

এই নির্জন ঝাঁ ঝাঁ দুপুরে জঙ্গলের অন্তরঙ্গে কেমন গা ছমছম করে তার। গর্তটার ভিতরে নামতে সাহস হয় না সহদেবের। চারধারে শুধু ফাল্গুনি হাওয়ায় প্রায় মানুষসমান বিন্নাঘাসের ভিতর দিয়ে বয়ে যাওয়া সোঁ সোঁ শব্দ, যা নির্জনতাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। চারদিকের ঘাসের জঙ্গল যেন ঘন হয়ে তার মাথার উপরে ঝুঁকে

রয়েছে। মাথার উপরে আকাশের নীলিমা এত ঘন যে সহদেবের মতো শক্ত দেহ ও মনের, ভীষণ কাজের মানুষেরও সে দিকে তাকিয়ে বিস্ময় লাগে।

ঠিক কোন জায়গায় এই মুহূর্তে তার অবস্থান সেটা ভালো করে বোঝবার জন্য একটা উঁচু টিলা সে খুঁজে বার করল। টিলাটার উপর উঠে ঘাসের ঘেরাটোপ ছাড়িয়ে সে বাইরের দিকে তাকাল।।

দক্ষিণ দিকে বাংলাদেশ সীমান্ত এখান থেকে এক কিলোমিটার দূরত্বেরও কম। এই পুরো জায়গাটা বর্ষার সময় কমবেশি জলমগ্ন থাকে। সেদিকে তারকাটার বেড়া তৈরি হচ্ছে, সহদেব সে কথা জানে। তারকাটার বেড়া ধরে এপাশে পিচঢালা রাস্তাও তৈরি হচ্ছে। ঠিক এই জায়গাটায় এখনও না হলেও সামনে এবং পিছনে রাস্তার কাজ অনেকটাই শেষ হয়েছে। সবথেকে কাছের বর্ডার আউটপোস্ট পারিলা এই বিন্নাখাড়ির অবস্থান থেকে তিন কিলোমিটারের মতো। পারিলার পুবে-পশ্চিমে রাস্তা অনেক দূর এগিয়েছে। শুধু এই জায়গাটায় হলিদানাখাড়ি, তিলনের খাড়ি এবং লস্করের খাড়ি বা তাদের শাখাপ্রশাখা মিলে একটা জটিল এবং বিস্তীর্ণ ঢালু জলাজমি তৈরি করে স্থানীয় মানুষের ব্যবহার থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন রেখেছে। স্থানীয়রা জলাভূমি, বিশেষ করে যেখানে প্রতি বর্ষায় প্লাবন হয়, পছন্দ করে না।

কিন্তু পৃথিবীতে এমন মনুষ্যগোষ্ঠী আছে, যারা এরকম পছন্দ করে। সহদেব বিশ্বাসের গোষ্ঠীর মানুষ বাংলাদেশ থেকে বিতাড়িত হয়ে এদিক সেদিক নানা জায়গায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। জল ছাড়া মানুষ বাঁচে নাকি? জল ছাড়া মানুষ বাঁচে না। জ্ঞাতি ছাড়া মানুষ বাঁচে না। গোষ্ঠীর বিভিন্ন শক্তপোক্ত, বুদ্ধিবিবেচনা নির্ভরযোগ্য, এমন মানুষ চারদিকে খোঁজখবর নিচ্ছে, কোথায় তাদের পছন্দমতো জমি পাওয়া যায়। খানিকটা কিনে, খানিকটা অনুমতি দখল করে একবার বসে তো পড়, তারপর সুযোগ বুঝে জমি দখলের হাল এবং সাবেকি যত রকমের কৌশল আছে, সব কাজে লাগাও।

বিন্নাখাড়ির এই জায়গাটা সহদেব বিশ্বাসের পছন্দ হয়েছে। এ জমি কেউ নেবে না, কেউ এ জায়গায় বসত করতে আসবে না। স্থানীয় রাজনৈতিক দলকে ধরে অনেক মেহনত করার পর এখানে এক একর জমি সহদেব পাট্টা পেয়েছে। অনেকটা ভেস্ট জমি আছে এই বিন্নাখাড়ির সংলগ্ন এলাকায়। একবার বসতে পারলে তখন দেখা যাবে।

টিলাটার উপরে উঠে চারদিকে তাকিয়ে দেখল সহদেব। কাছেপিঠে কোনো বসত নেই। দক্ষিণে কাঁটাতারের বেড়ার কাছে দুজন অশ্বারোহী সৈনিক মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। এ জায়গা থেকে তাদের দুজনকে ছবির মতো লাগছে দেখতে। বি এস এফের সৈনিক তারা। এত দূর থেকেও তাদের দেখে সহদেবের মনে হল মরদ বটে। কী সুন্দর চেহারা! কী সুন্দর স্বাস্থ্য! বিস্তীর্ণ সমতলভূমির উপরে, নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে দুজন অশ্বারোহীকে খুব বীর মনে হয় তার। উঁচু জায়গাটা থেকে নীচে নেমে এল সহদেব। নীচে এলে হাওয়ার শনশন শব্দটা

তীব্র হয়। কেমন যেন একটা শব্দ, এই বিন্নাবনের ভিতরে যেন সে হারিয়ে গেছে,এমন মনে হয়, নিঃসঙ্গ মনে হয় নিজেকে। যে দেশ গাঁ তাদের ছেড়ে আসতে হয়েছে দূঃখে, অপমানে, নির্যাতিত হয়ে, সেই সব কথা মনে পড়ে যায় হঠাৎ। স্বাভাবিক হওয়ার তাগিদে নিজেকে শুনিয়েই সে জোরে গলাখাঁকারি দিল।

সহদেবের গলাখাকারির শব্দের সঙ্গে আর একটা শব্দ, একটা অবরুদ্ধ গরগর ধ্বনি মিশতেই সে সতর্ক হল, গর্তটার ভিতরে চোখ রাখল সে। ছায়াচ্ছন্ন অল্প আলোয় গর্তটার পশ্চিম কোণে একটা কিংবা একাধিক সুড়ঙ্গ মুখ আছে এমন সন্দেহ হল তার। সূর্যের আলো ঢোকে না সেখানে। সহদেব স্থিরদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে রইল। সব চুপচাপ।

ভালো করে দেখার জন্য দু-পা এগিয়ে আবার সে থমকে দাঁড়াল। গরগর শব্দ এবার আরও অসহিষ্ণু। সহদেব কোদালের হাতলটা শক্ত করে ধরে রাখল। সুড়ঙ্গের অন্ধকার মুখ থেকে দুটো সবুজ আগুনে চোখ নজর রাখছে তাকে। নির্নিমেষ চোখ কোনো জানোয়ার হবে। চোখাচোখি হতে জন্তুটা আবার আওয়াজ করল। ক্রুদ্ধ অসহিষ্ণু আওয়াজ, যার পরিষ্কার অর্থ খবরদার!

সহদেব আর নড়ল না। কী জানোয়ার এটা? চিতা নয়তো? এ রকম ছাড়া নির্জন। জায়গায় চিতা থাকে অনেক সময়। বর্ষার সময় জলজঙ্গল পাটের খেত পেরিয়ে চলে আসে। বর্ষা শেষ হলে আটকে পড়ে অনেকসময়। বহুকাল আগে তার যখন বছর দশেক বয়স, বাবার সঙ্গে মাঠ থেকে কাটা ধান নিয়ে ফিরে আসছিল সে। গোরুর গাড়ি বোঝাই করতে সন্ধে হয়ে গিয়েছিল। গাড়ি বোঝাই করে মজুরেরা যে যার মতো চলে গিয়েছে। মাঘের শেষের মাঠ শূন্য, আল কেটে গোরুর গাড়ি চলার সংক্ষিপ্ত রাস্তা বার করা হয়েছে। খানিকক্ষণের মধ্যে অন্ধকার ঘন হয়ে আসতে একফালি চাঁদের আবছা আলো পড়ল মাঠের উপর, চলতে চলতে তার বাবার সম্ভবত পায়খানায় যাওয়ার প্রয়োজন হয়েছিল। একটা আগাছা ঘেরা ডোবার কাছে গাড়ি থেকে নেমে বাবা বলল, গাড়ি চালাতে হবে না, এমনি যাক আস্তে আস্তে। আমি আসছি। ভয় নেই, ধরে নেব তোকে।

সেই নির্জন মাঠের মধ্য দিয়ে পাঁচ-সাত মিনিট গাড়ি চলার পর সহদেব সভয়ে দেখল দুটো সাদা মতো জানোয়ার গাড়ির দুইপাশে তার সঙ্গে এক রেখায় হেঁটে যাচ্ছে। সে প্রথমে ভেবেছিল শেয়াল। কিন্তু তার এ কাণ্ডজ্ঞান ছিল না যে শেয়ালের গায়ের রং অমন সাদাটে বা মেঘলা হবে না। তাছাড়া জানোয়ার দুটো শেয়ালের থেকে আকারে বড়। তার এ কাণ্ডজ্ঞানও ছিল যে শেয়াল দশ-এগারো বছর বয়সি ছেলের উপর ঝাঁপাবে না। সে ভয় পেয়ে গিয়েছিল। পিছনে ধানের পাহাড় পেরিয়ে বাবার হদিশ করা সম্ভব নয়। সে টের পেয়ে গিয়েছিল যে বলদদুটো সামান্য চঞ্চল হয়েছে। জানোয়ার দুটো আরও কাছাকাছি আসতে বলদদুটো জোরে চলতে শুরু করল এবং আতঙ্কে সে ‘বাবা’ বলে চিৎকার করে উঠল।

তার বাবা দূর থেকে ‘হাঁ’ বলে সাড়া দিতে জানোয়ার দুটো তার কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরে গেল কিন্তু একেবারে চলে গেল না।

তার বাবা দৌড়ে কাছে আসতে জানোয়ার দুটো অন্ধকারে অদৃশ্য হয়ে গেল। তার বাবা বলেছিল হুড়ার হবে। কিন্তু খুব আশ্চর্য হয়েছিল। বলেছিল, হুড়ার তো আজকাল আর দেখা যায় না এদিকে! কী জানি! |

তাদের দেশে নেকড়েকে হুড়ার বলে।।

সেই কথা হঠাৎ মনে পড়ল তার। মানুষকে স্থান ছেড়ে দিতে দিতে জানোয়ার একসময় বোধহয় নিঃশেষই হয়ে যাবে পৃথিবী থেকে।

কাঁধ থেকে কোদালটা নামাতে গেলে আবার সেই অবরুদ্ধ আওয়াজ উচ্চকিত হল। সহদেব বুঝল, জানোয়ার তাকে নড়তে দিতে চায় না। অনেকটা শাসানির মতো আওয়াজ। দু-হাতে কোদালটা চেপে ধরে এক পা পিছিয়ে আসার চেষ্টা করতেই জানোয়ারটা লাফ দিয়ে গর্তের বাইরে এল। তীব্র একটানা জান্তব আওয়াজে সমস্ত ঘাসের জঙ্গল কাঁপতে থাকে যেন। সহদেব ভয় পেয়ে দৌড়ে কয়েক পা পিছিয়ে গেল। তারপর দাঁড়িয়ে ভালো করে দেখে হো হো করে হেসে উঠল সে।

একটা শেয়াল!

বাঘ নয়, চিতা নয়, একটা শেয়াল মাত্র!

শেয়াল বটে কিন্তু মোটেই হাসার মতো নয়। আকৃতিতে নেকড়ের থেকেও যেন। বড়, ছোটখাটো একটা গুলবাঘার মতোই। দাঁড়াবার ভঙ্গিতে, দাঁতের মুখের হিংস্রতায় ভয়াল একটা জানোয়ার। সহদেবকে দাঁড়াতে দেখে যথার্থই একটা শেয়ালের মতোই খ্যাক খ্যাক আওয়াজ করে কয়েক হাত তেড়ে এল জন্তুটা। তারপর যেন প্রতিপক্ষের শক্তি পরীক্ষা করবার জন্য আবার দাঁড়িয়ে দেখতে লাগল, সহদেব কোদালের হাতলের উপর ভর দিয়ে তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল।

শেয়ালের চোখেমুখে হিংসা আর ঘৃণা, এই অনধিকার প্রবেশাধিকারীর দিকে স্থির তার কপিশ চোখ দুটোর ভিতরে আক্রোশ যেন বিদ্যুৎচমকের মতো প্রতিফলিত হচ্ছে।

সহদেব তবু নিশ্চিত ভঙ্গিতে বলল, না শেগল, এ ভুঁই আমি বন্দোবস্ত নিইছি। তোমার এবার যেতে হবে।।

সে শেয়ালের দৈহিক আকৃতিক এবং সাহসের কারণে শ্রদ্ধাবান হয়ে পড়েছিল। সে শ্যাল না বলে বলল শেগল। এ জন্তুটা যথার্থই একটা শৃগাল, যাচ্ছেতাই রকমের একটা শ্যাল নয়।

সহদেবের কথার উত্তরেই যেন বিকট মুখব্যাদান করে শেয়াল আরও খানিকটা এগিয়ে এল অর্থাৎ খবরদার! এ জায়গা আমার, খবরদার!

সহদেব এবার বেশ অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে বলল, না ভাই, এ জমি আমার। সরকার আমাকে বন্দোবস্ত দিয়েছে। বলে পা ঘুরে মাটির উপরে সজোরে কোদালের একটা কোপ বসায় সে। যেন দাবি প্রতিষ্ঠা করল সে এইভাবে।।

মাটিতে আঘাত করে কোদাল ছিটকে ফিরে এল। অহল্যা মাটি, কোনোকালেই লাঙ্গল কিংবা কোদালের ফলা ভিতরে নেয়নি সে।

কোদাল ছিটকে আসার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই সহদেবও তিন-চার হাত দুরে আছড়ে পড়ল। কোদাল দিয়ে কোপ বসাবার অন্যমনস্কতার সুযোগে শেয়াল ঝাঁপিয়ে পড়েছে তার উপর। এই আক্রমণের জন্য সে একেবারেই প্রস্তুত ছিল না। সে কোনোদিনই শোনেনি যে শেয়াল কোনো বয়স্ক পুরুষ মানুষকে আক্রমণ করে।

হাত থেকে কোদাল ছিটকে পড়ে গেল তার এবং ঘাড়ের উপরে শেয়ালের মত বসে যাওয়ার তীক্ষ্ণ যন্ত্রণায় সে চিৎকার করে উঠল। নরুনের মতো শক্ত এবং তীক্ষ্ণ শেয়ালের শ্বাদন্ত তার ঘাড়ের পেশির ভিতরে, আরও ভিতরে বসে যাচ্ছে। যতটা শক্তিশালী জানোয়ারটাকে সহদেব মনে করেছিল, শেয়াল তার থেকে ঢের বেশি শক্তি রাখে। এই বিন্নার জঙ্গলের একচ্ছত্র অধিপতি ছিল সে।

সহদেব হাত দিয়ে ঠেলে জানোয়ারটাকে সরাতে চাইলে শেয়াল সঙ্গে সঙ্গে তার হাতের কবজি কামড়ে ধরল। একটু আগে শেয়ালকে সে ভাই বলে সম্বোধন করেছিল। এখন মুহূর্তে জিঘাংসা তাকেও অধিকার করল, শেয়ালের চোয়ালের দাঁত অসম্ভব শক্তিশালী, দেরি করলে ভেঙে যেতে পারে হাতের হাড়। শেয়ালের তলপেটে প্রাণপণ শক্তিতে একটা লাথি কষাল সে। শেয়াল দূরে ছিটকে পড়ল।

সহদেব এবার প্রস্তুত হবার চেষ্টা করে। কয়েক হাত দূরে জানোয়ার আবার আক্রমণের সুযোগ খুঁজছে। আর সেই মুহূর্তে চারদিকে তাকিয়ে সহদেব আতঙ্কে হতবুদ্ধি হয়ে গেল।

গর্তটার ভিতর থেকে অনেকগুলো ছোট-বড় শেয়াল প্রায় নিঃশব্দে বেরিয়ে এসেছে। সবকটাই সহদেবের কাছ থেকে মাত্র পনেরো-বিশ হাত দূরে। বড়গুলোর প্রত্যেকটার আকৃতিই প্রায় সমান। প্রত্যেকের মুখে একই জিঘাংসা। প্রত্যেকেই আক্রমণোদ্যত।।

সহদেব প্রায় ঝাঁপ দিয়ে পড়ল তার কোদালটার উপর। কোদাল ধরবার আগেই গোদা জানোয়ারটা তেড়ে এসে তার পায়ের ডিমের উপর দাঁত বসাল। সহদেব ভূক্ষেপ না করে কোদালের উলটো দিক দিয়ে শেয়ালের পাছার উপর আঘাত করল। মারটা তেমন জুতসই না হওয়ায় জানোয়ারটা শুধু পিছু হটে গেল কিছুটা।

সোজা হয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সহদেব এবার চারপাশটা ভালো করে দেখল। সবকটা জানোয়ার একযোগে তাকে তিন দিক থেকে ঘিরে ফেলেছে। নিমেষে সে বুঝতে পারে তাকে একটা বাচন-মরণ লড়াই করতে হবে। প্রথমত, জমিটা তার চাই। গোষ্ঠীর বহু মানুষ তার উপরে ভরসা করে, তার মুখের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করে আছে। তাছাড়াও, এখন এই মুহূর্তে তাকে ঘিরে দাঁড়ানো দাঁতাল শত্রু। পালিয়ে যাওয়ার রাস্তাও বোধহয় নেই।

সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল, শেয়াল, এই ভুঁই আমার।।

তার আওয়াজ এবার আর উপহাস ছিল না। ছিল ক্রোধ, ঘৃণা এবং জিঘাংসা। হাত, পা এবং কাঁধের পেশি থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছিল। আচমকা কেউ এখন তাকে দেখলে পাগল বা খুন-খেপা মনে করত।

এবারে সে প্রতি আক্রমণ করল, ছুটে গিয়ে সামনের জানোয়ারটার মাথাটা কোদাল চালিয়ে দু-ফাঁক করে দিল। তারপর ডাইনে, বাঁয়ে, সামনে, পিছনে পাগলের মতো হাত-পা চালাল সে।

জানোয়ারগুলো এমন প্রবল আক্রমণের সামনে পিছিয়ে গেল। গোঙানি, জান্তব চিৎকার আর মুমূর্ষ পশুর আর্তনাদে যথার্থই একটা যুদ্ধক্ষেত্র যেন। রক্ত, ধুলো আর ঘামে মিশে সহদেবের শরীর চটচটে, ক্লান্ত এবং ভারী হয়ে উঠল। আক্রমণের সঙ্গে সঙ্গে স্বাভাবিক জিঘাংসায় কণ্ঠ থেকে উৎসারিত রণধ্বনি স্তিমিত। অবশেষে কাছাকাছি আর কোনো আক্রমণোদ্যত জানোয়ার না দেখে সে থামল, মৃত এবং অর্ধমৃত পাঁচ-ছ-টা জানোয়ারকে ফেলে বাকিগুলো পালিয়ে যাচ্ছে।

অবসন্ন, আহত দেহকে টানতে কষ্ট হচ্ছিল সহদেবের। কষ্ট হলেও উঁচুতে উঠে অপেক্ষাকৃত পরিচ্ছন্ন একটা জায়গা বেছে সে বসল। তারপর গামছার সঙ্গে বাঁধা বিডি-দেশলাই খুঁজে বের করে দেখল সবকটা বিড়িই মাঝ বরাবর ভেঙে গেছে। একটা ভাঙা বিড়িই ঠোঁটে চেপে ধরে দেশলাই জ্বেলে ধরাল সহদেব। জ্বলন্ত কাঠিটা নীচের ঘাসের জঙ্গলে ছুড়ে দিতেই আগুন জ্বলে উঠল। বিড়ি টানতে টানতে সে আগুনের ছড়িয়ে পড়া দেখতে লাগল।

আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়তে সহদেব উঠে দাঁড়াল। ছাই আর ধোঁয়া পিছনে ফেলে আগুন ক্রমশ বৃত্তাকারে ছড়িয়ে যাচ্ছে উত্তরের দিকে।

শেয়ালগুলোকে যেতে দেখে সহদেব হঠাৎ বিষন্ন হয়ে গেল। কোথায় যেন নিজেদের সঙ্গে একটা সাদৃশ্য খুঁজে পেল সে। শেয়ালগুলো পালাতে থাকলেও বার বার পিছন ফিরে দেখছিল, নিরাপদ দূরত্বে পৌছে তারা দাঁড়িয়ে পড়ে এদিকে তাকিয়ে রইল, তারপর ধীরে ধীরে ফের এগিয়ে গেল তারা। খাড়ি পার হয়ে ওপারে উঠে ফের পিছনে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল তারা।।

সহদেব বিশ্বাসের বুকের মধ্যে হু হু করে উঠল। অনধিকার দখলকারী মনে করতে লাগল সে নিজেকে। কোনো একটা জায়গায় তার খটকা লাগতে লাগল। এই শেয়ালগুলো আরও একটু সাহসী হলে খতম করে ফেলতে পারত তাকে আজ। ফিরে আয় রে শেগল! খতম কর আমাকে। সে বিড়বিড় করতে লাগল।

পিছন থেকে দীর্ঘ এবং স্থুল ছায়া তাকে ঢেকে ফেলতে সে চমকে পিছন ফিরে তাকাল। ঘোড়সওয়ার দুই সৈনিক হাত দশেক দূরে নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়েছে। চওড়া বারান্দাওয়ালা খাকি টুপি তাদের মাথায়। পায়ের অনেকটা উঁচু পর্যন্ত ঢাকা জুতো রেকাবে আটকানো সশস্ত্র বীরমূর্তি তাদের। সহদেব এত বড় ঘোড়া এত কাছ থেকে আগে কখনো দেখেনি। এত নিঃশব্দে তারা এসেছে যে সে টেরও পায়নি।

তারা আরও এগিয়ে এসে তাকে ভালো করে দেখল, তারপর আহত ও নিহত শেয়ালগুলো।

তুমনে মারা? তারা ভারি আশ্চর্য হল।

সহদেব মাথা নাড়ল।

কাহে?

সরকার এ জমি আমাকে পাট্টা দিয়েছে, সে হিন্দি বলতে জানে না।

ইস জমিনসে কেয়া হোগা? তারা এখনও বিস্মিত।

ঘর হোগা, খেতি হোগা, চেষ্টা করে এবার সে হিন্দি বলল।।

পাগলা হ্যায় কেয়া! যাও, যাও, ঘর যাও। হাসপাতাল যাও, সুঁইয়া লাগাও।

তাদের বিস্ময় কাটে না। এমন টাঁড় জমিতে খেতি হবে? ঘর হবে? পাগল নাকি! সহদেব ফিরে চলল, অনেক কাজ বাকি আছে তার।।




লেখক পরিচিতি
অভিজিৎ সেন
ভিজিৎ সেনের জন্ম অবিভক্ত বঙ্গের বরিশাল জেলার কেওড়া গ্রামে। পাঁচের দশকের একেবারে গোড়ায় আসেন কলকাতায়। কলকাতা, ঝাড়গ্রাম, পুরুলিয়া হয়ে পুনরায় কলকাতা, এইভাবে ঘুরে ঘুরে স্কুল-কলেজের পড়াশোনা শেষ করেন। কলকাতায় উচ্চশিক্ষার সঙ্গে সঙ্গে চাকরিও করতেন। ইতিহাসে স্নাতকোত্তর হন। সেই সময়কার নকশালপন্থী বিপ্লবী আন্দোলনে জড়িয়ে চাকরি, ঘর ও কলকাতা ত্যাগ করেন। থাকতেন বালুরঘাটে। পরে মালদহে। এখন কলকাতায়। 

তাঁর উল্লেখযোগ্য উপন্যাস ও গল্পগ্রন্থের মধ্যে রয়েছে : ‘রহু চণ্ডালের হাড়’, ‘অন্ধকারের নদী’, ‘ছায়ার পাখি’, ‘আঁধার মহিষ’, ‘ঝড়’, ‘বিদ্যাধরী ও বিবাগী লখিন্দর’, ‘হলুদ রঙের সূর্য’, ‘রাজপাট ধর্মপাট’, ‘এই সাতখানি উপন্যাস এবং দেবাংশী’, ‘ব্রাহ্মণ্য ও অন্যান্য গল্প’, ‘অভিজিৎ সেনের গল্প’, ‘দশটি গল্প’, ‘পঞ্চাশটি গল্প’, ‘কিশোর গল্প’ ইত্যাদি। 

নিউ ইয়র্কের FACET BOOKS INTERNATIONAL এবং দিল্লির ABHINAV PUBLICATIONS যৌথভাবে তাঁর ‘রহু চণ্ডালের হাড়’ উপন্যাসের ইংরেজি অনুবাদ ‘Magic Bones’ প্রকাশ করেছে। পেয়েছেন বঙ্কিমচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন