শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

হোর্হে ভোলপি এস্ক্যালেট'এর গল্প: মহাসঙ্গীত


Avianca en Revista - “La otra mejor manera de llamar a la ficción es la  mentira”: Jorge Volpi
 

বাংলায় রূপান্তর : দোলা সেন

উচ্ছ্বসিত প্রশংসা আর হাততালির বন্যায় মেয়েটির ভেসে যাবার কথা। স্টেজের উজ্জ্বল আলোর বৃত্তে দাঁড়িয়ে থাকার জন্য সে কারো মুখ দেখতে না পেলেও, শ্রোতাদের আনন্দিত গুঞ্জন তার কানে আছড়ে পড়ছিল। কিন্তু কি আশ্চর্য! এসব কিছুই তাকে স্পর্শ করতে পারছিল না।

 
কোনোমতে আনন্দিত অভিব্যক্তির একটা আভাস ফুটিয়ে সে প্রাণপণে পরিস্থিতির সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নেবার চেষ্টা করে যাচ্ছিল। অথচ এই কিছুদিন আগেও – শ্রোতাদের এই বাঁধনহারা উচ্ছ্বাসে তার হৃৎপিণ্ডের গতি বেড়ে যেত, গালদুটিতে ডালিমের রঙ লাগত। একটা সুন্দর সুর নির্ভুল পরিবেশন করার আনন্দের মতোই শ্রোতাদের উৎফুল্ল অভিবাদনেও সে সমান খুশি হতো। আর এখন? এসব তার মনে আর কোনো প্রভাবই ফেলে না। বরং সে ভারি বিরক্ত হয়। সর্বাঙ্গসুন্দর কনসার্টের পরে সমঝদার শ্রোতাদের পিনপতন নিস্তব্ধতাই তার কাম্য। তার মনে হয়, এক অমূল্য সুরে অবগাহন করার এটাই যথাযথ প্রতিক্রিয়া হওয়া উচিত। মুখ হাসি হাসি রেখে দর্শকদের প্রত্যাভিবাদন করতে গিয়ে নিজের শুকনো গাল, উদাসীন শিথিল অবয়ব আর হতাশাকে সে অনুভব করতে পারছিল। সে দেখল, তার সাধনসঙ্গী হার্পের ওপর কেউ ফুলের বোকে রেখে গেছে। একটা তেতো বিতৃষ্ণা তার বুকের ভেতর থেকে উঠে এসে তাকেই চমকে দিল। কি হয়েছে তার? তার তো এখন ভালোলাগায় বুঁদ হয়ে থাকার কথা। তাহলে? তবে কি সে সাফল্যের সাথে এতোটাই অভ্যস্ত হয়ে পড়ল যে দর্শকদের সোৎসাহ প্রশংসার প্রকাশও তাকে অনুরণিত করতে পারছে না? তার মেরুদণ্ড দিয়ে একটা হিমেল স্রোত নেমে গেল। অনুরাগীদের বন্দনায় যদি শিল্পী আপ্লুত না হয়, তাহলে সেই শিল্পীর ভবিষ্যৎ কি? ভয়ে, উত্তেজনায় সে ঘেমে উঠল। আনন্দে নয়, নিদারুণ যন্ত্রণায় তার চোখ দিয়ে জলের ধারা নেমে এলো।

দর্শকের দল তার চোখের জলকে তার আনন্দাশ্রু ভেবে পাগলের মতো করতালিতে তাকে আবারও অভিনন্দিত করল। এই প্রতিক্রিয়ায় তার বিষণ্ণতা ও তিক্ততা বাড়লো বই কমলো না। তবুও সে নিয়মমাফিক পরিচালকের সঙ্গে স্টেজের সামনে এসে দর্শকদের অভিবাদন গ্রহণ করল। অর্কেস্ট্রা ও দর্শকদের সশ্রদ্ধ আলোকবৃত্ত ছেড়ে সে এবার নিজের সঙ্গে একা হতে চাইছিল। কিন্তু দর্শকেরা তালে তালে তালির সঙ্গে এনকোর এনকোর ধ্বনি তুলেই যাচ্ছিল। আর মেয়েটি বারবার বাও করে তাদের ধন্যবাদ জানিয়ে অব্যাহতি চাইছিল। এমন নয় যে দ্বিতীয়বার হার্প বাজাতে তার খারাপ লাগে। এর আগে এই এনকোরে সাড়া দিয়ে সে দুই, তিন, এমনকি চারবারও বাজিয়েছে। কিন্তু আজ এই মুহূর্তে, তার নিজেকে নিঃস্ব মনে হচ্ছে। নিজের মনের অতলে ডুব দিয়ে সে একবিন্দু সুরও খুঁজে পাচ্ছিল না। এক অসহায় কান্নাকে সঙ্গী করে সে স্টেজ ছেড়ে নেমে এলো। অর্কেস্ট্রার লোকজনদের কোনোমতে ছুটি দিয়ে, নিজের ড্রেসিং রুমের আয়নার সামনের আসনে সে, একান্ত অসহায়ভাবে আত্মসমর্পণ করল।

একটা বিষয়ে সে স্থিরনিশ্চিত। আজকের মতো করে রেইনিকে সে আগে কখনো বাজায়নি। আজ তার হাতদুটি যেন দুটি পাখির মতো হার্পের তারের উপর দিয়ে তাদের প্রণয়কূজন শোনাচ্ছিল। সুরের আকাশে তারা উঁচু থেকে আরো উঁচুতে উড়ে যাচ্ছিল। খাঁচার শলাকার দুই দিকে দুটি পাখির ভালোবাসার বেদনা সেই বাজনায় মূর্ত হয়েছিল। তার সমস্ত সাধনা, তার আবেগ, শিক্ষা – তার পরিবেশনায় সে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলেছিল। সঙ্গীতের সত্যরূপ নগ্ন অগ্নিশিখার মতোই জ্বলে উঠেছিল আজ। তাহলে এমন কেন হলো? আজ তো তার অ্যালেগ্রো মোদোরাতোর লয়ে প্রেমিকের গদগদ অস্ফুট হাসি, আদাজোর – বিলম্বিত লয়ে ছিন্নভিন্ন হবার যন্ত্রণা, হতাশা আর বিস্মৃতি – সব, সবকিছু স্পষ্ট হয়ে ফুটে উঠছিল। সে যেন তাদের চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছিল। তারপর যখন সে স্কেটজো বাজালো – তখন তার অতি দ্রুত তালে পৌরুষের গভীর অক্ষমতা, গহন অন্ধকার থেকে উঠে আসা মানসিক বিকলন, নোংরা ঘিনঘিনে হাসি যেভাবে তাদের রূপ নিয়ে সামনে এসে দাঁড়াল – এমনটি আগে কখনো সে কল্পনাই করতে পারেনি। তার আজকের উপস্থাপনা এক অনবদ্য শৈল্পিক সৃষ্টি। অথচ কি আশ্চর্য! আর এখন নিজেই সে এর প্রতি কি ভয়ঙ্কর রকম নিস্পৃহ বোধ করছে! এই দ্বন্দ্বে ক্ষতবিক্ষত হতে হতে সহসাই তার সমনে এক নিষ্ঠুর সত্য উদ্ভাসিত হলো। তার নিখাদ অতৃপ্তি তাকে চিৎকার করে বলছে – কোথাও একটা ভুল হচ্ছে। মস্ত বড়ো ভুল। এই গজিয়ে ওঠা তীব্র অসন্তোষ তারই বিশ্বাসযোগ্য প্রমাণ।

আলো দিয়ে সাজানো আয়নার সামনে বসা মেয়েটির চোখ থেকে কাজলকালো জলের ধারা বয়ে চলে। এর চেয়ে বেশি হতাশ কি হওয়া যায় আদৌ? সে জানে না। সেই ছোট্ট বয়েস থেকেই তো সে সঙ্গীতের প্রতি নিবেদিত প্রাণ। সেলো হোক বা ভায়োলিন, কিংবা বাঁশি – সে সর্বদাই সবার সেরা হতে চেয়েছে। তার বাবা বলতেন তার জন্মের সময় হার্প বেজেছিল। সেই সুরের ধারাস্নানে অবগাহন করেই তার জন্ম। তাই বুঝি সুরের প্রতি তার এতো আকর্ষণ? সে বাবার কথায় হাসতো। তারপর সে যখন দশ বছরেরটি – তখন একদিন সে হার্পের অলৌকিক মহিমময় ধ্বনিকে যেন হঠাৎই আবিষ্কার করে ফেলে। তারপরে সে আর কখনো পিছন ফিরে তাকায়নি। বিদায় হে বন্ধুর দল, আলমারি ভরা খেলনা, পার্টি, বয়ঃসন্ধির ছেলেমানুষি প্রেম। এখন থেকে তার জগতে শুধু সে আর তার হার্প। গান শেখার জন্য বাবা তাকে কনজারভেতোয়ায় ভরতি করে দিলেন। সেও গানের স্কুলের শিক্ষায় মনপ্রাণ ঢেলে দিলো। তার দিনের অধিকাংশ সময় এখন হার্পের সাধনায় কাটে। সহজাত নৈপুণ্যে, শিগগিরই সে তার সহশিক্ষার্থীদের অতিক্রম করে গেল। নয় বছর, হ্যাঁ নয় বছর ধরে মানে এগারো থেকে কুড়ি বছর বয়েস পর্যন্ত, তার জীবন ছিল একেবারে ছকে বাঁধা। ভোরে ওঠার পর বাবা-মায়ের চাপে তাকে স্কুলে যেতেই হতো। স্কুলশেষের ঘণ্টা বাজলেই সেখান থেকে একদৌড়ে গানের স্কুল। সেখানে শুধু সে আর তার হার্প। সুর, তাল, ছন্দের দোলায় তার খাওয়া দাওয়ার প্রতিও হুঁশ থাকত না। বাড়ি ফিরতে ফিরতে রোজই রাত দশটা সাড়ে দশটা বেজে যেত। তারপর একটাই স্বপ্ন দেখবে বলে, সে বিছানায় যেত – পূর্ণ অডিটোরিয়ামে তার কনসার্ট চলছে – আর সেই হলো পৃথিবীর সবার সেরা বাজিয়ে।

তার বন্ধুরা তাকে ঠাট্টা করতো, একটি ছোট মেয়ের স্বাভাবিক জীবনযাপনে তাকে ফিরিয়ে আনতে চাইত। কিন্তু সে শুধু একটা কথাই বলত – তার সাধনার ফল একদিন ফলবেই। সেই খ্যাতি ও প্রাপ্তির দিনে এই বন্ধুরাই তাকে করুণার বদলে ঈর্ষার চোখে দেখবে।

আর আজ? আজ যখন সার্থকতার সেই মহেন্দ্রক্ষণ সমাগত, তখন সে এই স্বর্গীয় আনন্দে ভেসে যেতে পারছে না! এখন তার বাজনা সারা বিশ্বে সমাদৃত। ইউরোপ এবং আমেরিকার প্রায় সর্বত্র সে পরম বিখ্যাত বাজিয়েদের সঙ্গে কনসার্ট করেছে। মিউনিখে বাজিয়েছে চেলিবিদাকের সঙ্গে, আমস্টারডামে হাইজিঙ্ক, লন্ডনে মেরিনার – কে নয়? তার একক অনুষ্ঠানও সমালোচকদের কাছ থেকে অকুণ্ঠ প্রশংসা আদায় করে নেয়। তবুও আজ তার মনে হচ্ছে এই উচ্চতাই শেষ কথা নয়। তাকে আবার ফিরে যেতে হবে প্রারম্ভের সময়টুকুতে। নতুন করে শুরু করতে হবে পথচলা। একমাত্র তখনই সে আজকের ফাঁকটুকু বুঝতে পারবে। অনুভূতি ও দক্ষতার একটা পর্যায়ে পৌঁছানোর পরেও, অতীতকে সম্পূর্ণ ভুলে, আবার এমনভাবে শুরু করতে হবে যেন আগে কিচ্ছু ঘটে নি। সমস্ত ত্রুটি-বিচ্যুতি, সাফল্য – সব সরিয়ে রেখে নতুন আবেগে সঙ্গীতকে নতুন করে আবিষ্কার করতে হবে। আর তার জন্য চাই পূর্ণ একাগ্রতা, সীমাহীন আত্মনিবেদন। জগতের সমস্ত কিছু ছেড়ে সঙ্গীতের হাত ধরতে হবে। তাকে সব দিয়ে দিতে হবে। তার পরিবার, হাতে গোনা বন্ধু, এমনকি যে সাফল্যের জন্য তার এই পথচলা, তার দিন, তার রাত – সব সঙ্গীতের পায়ে নিবেদন করতে হবে। একমাত্র তাহলেই সে তার কাছে ধরা দেবে।

সে এতদিনে উপলব্ধি করতে পারল, তার কোথায় ভুল হয়েছে। খ্যাতির মোহে সে নিত্যের হাত ছেড়ে নিজেকে বাইরের শক্তির স্রোতে ভেসে যেতে দিয়েছে। বড়ো দুঃখের সাথে তার মনে পড়ল, বাইশ বছর বয়েসে তার জীবনে প্রেম এসেছিল। দুই থেকে এক হবার আবেগে পরের বছরেই তারা বিয়ে করে নেয়। কিন্তু মাত্র দু বছর পর থেকেই সে আবার একা। তার জীবনের পাঁচটা বছর এই যন্ত্রণা, বিচ্ছিন্নতা আর পুনর্মিলনের দোলাচলে ছিন্নভিন্ন হযে গিয়েছিল। তার সঙ্গীকে সে কিছুতেই বোঝাতে পারেনি যে, সঙ্গীতই তার জীবনের পরম প্রেয়। তাকে ভালোবাসতে হলে, ভালোবাসার চেয়ে সঙ্গীতকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। স্বাভাবিকভাবেই ছেলেটি সেটা মেনে নিতে পারেনি। সে তাকে উন্মাদ, বাতিকগ্রস্ত, অসুস্থ বলে অপমান করে। সে যখন চলে যাচ্ছিল, তখন মেয়েটি অন্য ঘরে, চোখের জলে ভাসতে ভাসতে, পাগলের মতো মোজার্ট বাজাচ্ছিল। এমনকি ছেলেটি চলে যাবার মুহূর্তেও সে বাজনা ছেড়ে একবারের জন্যেও ওঠেনি। অথচ দরজা বন্ধ হবার শব্দে তার হৃদয় তীব্র বেদনায় খানখান হয়ে গেল। সে তো বুঝতেই পারেনি যে তার এতো কষ্ট হবে! এরপর থেকে তারের উপর প্রতিটি ছোঁয়া তার কাছে দয়িতের স্পর্শানুভূতি, তার দেওয়া আদর বয়ে আনে। সে অবাক হয়ে দেখে – সেই মানুষটি তার প্রাণে এমনভাবে জড়িয়ে আছে, যে তাকে সে জীবনেও ভুলতে পারবে না। শুধু এই কথাটি তাকে কখনও মুখ ফুটে বলা হলো না! তার শ্রেষ্ঠ পরিবেশনার দিনগুলোতে সে আজও সেই বিশেষজনের জন্যই চোখের জল ঝরায়। গানের সুরের সাথে, নৈঃশব্দ্যের সাথে লোনাজল মিলে মিশে যায়।

অতীত তার মনের পর্দায় বারবার আছড়ে পড়ছিল। স্মৃতির সরণি বেয়ে নানা দিনের টুকরো টুকরো ছায়াছবিরা সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আসছিল আর আঘাত করে যাচ্ছিল। ক্ষতবিক্ষত হতে হতে একসময় সে মনস্থির করে উঠে দাঁড়ালো। এবার সে তার অতীত, বর্তমান, সাফল্য, ব্যর্থতা সব কিছু মুছে ফেলে তার জীবনের লক্ষ্যের দিকে একমনা হয়ে এগিয়ে যাবে। যতদিন পর্যন্ত না সে ইতিহাসের শ্রেষ্ঠতম হার্প বাজিয়ে হবে, আত্মার মতো তার মেদমজ্জাও হার্পের সঙ্গীতের অংশ হয়ে উঠবে, ততদিন পর্যন্ত সে আর জনসমক্ষে বাজাবে না। সিদ্ধান্তটা নিয়ে ফেলে, সে এতক্ষণে ঘড়ির দিকে তাকালো। ভোর তিনটে বেজে গেছে। কাপড় বদলে ড্রেসিংরুম ছেড়ে রাস্তায় নামতেই, স্বর্ণাভ চাঁদ তার চোখের জলের উপর ঝিকমিকিয়ে উঠলো। তার দীর্ঘ চুলের রাশি পিঠের ওপর অবহেলায় ছড়ানো রইলো।

পরদিন সে অনেকটা দেরি করে উঠল। আজকের দিনটা তার পরবর্তী দিনগুলির প্রস্তুতির জন্য প্রয়োজন। বোধহয় সে অনুভব করতে পারছিল সামনে অনেকগুলি বিনিদ্র রাত তার অপেক্ষায় রয়েছে। সে একটা লম্বা স্নান সেরে তার বাজনার ঘরে ঢুকল। সে ঘরে আছে তার বই, তার সাফল্যের স্মারকেরা, আর এক সবুজ চাদরের নীচে ঘুমিয়ে থাকা নীরব বাদ্যযন্ত্রটি। সে সস্নেহে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল। মনে হচ্ছিল যেন সে তার হার্পের চেহারাটা অনুভব করতে চাইছে। পর্দার গা বেয়ে চুঁইয়ে আসা আলোর ধারায় স্নাত ঘরের মাঝখানটিতে, সে যেন কিসের আশায় উন্মুখ হয়ে রইলো। অনেকটা সময় পরে, সহসা সচেতন হয়ে সে দৌড়ে গিয়ে ফোন তুলল। কোনোরকম কারণ না দেখিয়েই সে তার সমস্ত অনুষ্ঠান – তার মধ্যে হ্যান্ডল কনসার্টে হার্নোকোটের সঙ্গে বাজানো, ভিয়েনার বিখ্যাত কনসার্টেরাও ছিল – সব বাতিল করে দিল। তারপর সে ধীরে ধীরে ঘরটিকে খালি করতে শুরু করল।

তার কাজের শেষে রৌদ্রোজ্জ্বল ঘরটিতে থাকল শুধু সে আর তার হার্প।

এবার সে খুব ধীরে ধীরে পরম যত্নে আবরণ সরিয়ে হার্পটিকে মাটিতে বসাল। তার কাঠের গায়ে সোনালী ফুল, লতাপাতার কারুকাজ – যেন এক বিশাল জাহাজের মাস্তুলের অবশেষ – কেমন বিনীত ভঙ্গিমায় এই মেয়েটির ঘরে আশ্রয় নিয়েছে! মেয়েটি সতর্কভাবে তাকে কয়েকবার প্রদক্ষিণ করল। খুব মন দিয়ে দেখল তার প্রতিটি দেহাংশ – তার, কাঠ, পাদপীঠ – সমস্ত কিছু। যেন স্পর্শ করার আগে সে তার চেহারা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে মনে গেঁথে নিতে চাইছিল। নবপ্রণয়িনীর মতো সে তাকে সরস স্তাবকতায় প্রলুব্ধ করছিল। একান্ত অনুগতার মতো সে তাকে পরিষ্কার করে চকচকে করে তুলল। তারগুলোকে সঠিক সুরে না বাঁধা পর্যন্ত সে বিশ্রাম নিলো না। একসময়, সন্তর্পণে ওদের দুজনকে ঘিরে রাত নামল। সে উঠল এবার। ঘুমোতে যাবার আগে সে ফোনের তার, দরজার ঘণ্টা খুলে ফেলল। সে চায় না তার আর হার্পের মধ্যে কোনো তৃতীয় ব্যক্তি আসুক।

এই নির্জনবাসে তার নতুন করে পথচলা – শিক্ষানবিশী শুরু হলো আরো একবার। পরদিন ভোরে সে যখন এসে তার হার্পের সামনে বসল, তখন তার শান্ত পবিত্র মুখমণ্ডলে ফুটে উঠেছে নিষ্ঠা ও বৈরাগ্য। হার্পের লুকিয়ে থাকা স্বর, তার অন্তহীন বৈচিত্র্য, তাদের মিলিত নতুন গমক তাকে অভিভূত করে দিচ্ছিল। তার এই আবিষ্কার কখনো তাকে সাগরের ঢেউয়ের মাথায় তুলে দিচ্ছিল, আবার কখনো বা এক অতলস্পর্শী অনতিক্রম্য খাদের কিনারায় এনে দাঁড় করিয়ে দিচ্ছিল। তীব্র হতাশায় সে ঘেমে উঠছিল। তার সাফল্য আর ব্যর্থতা, রাগে, দুঃখে চোখের জলে মিলেমিশে যাচ্ছিল। সে জানতে চাইছিল – যন্ত্রের সঙ্গে আরও কতখানি একাত্ম হওয়া যায়? আরো কতোদূর পর্যন্ত? একসময় তার মনই এর উত্তর দিল – দুটি মানুষ একে অপরের সঙ্গে যতদূর পর্যন্ত মিলতে পারে, ততদূরই। এরপর থেকে বাদ্যযন্ত্রটি যেন তার দয়িতের প্রতিভূ হয়ে উঠল। ছোট ছোট সাফল্য তাকে অপরিমিত আনন্দ দিত। কিন্তু দীর্ঘ পরাজয়ের স্রোতে সে আনন্দ, তীব্র হতাশায় বদলে যেতেও দেরি হতো না। প্রতিটি পরাজয় তার জয়ের তৃষ্ণা বাড়িয়ে দিত। তারের উপর দিয়ে মেয়েটি তাই বিরামবিহীন আঙুল চালনা করতেই থাকত, যতক্ষণ পর্যন্ত না তারা ক্লান্ত হয়ে তারের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়ে থেমে যেত। মানসিক বিকলনের ভয় করছিল তার। তা থেকে রক্ষা পাবার জন্যে সে তার একমাত্র অবলম্বন হার্পকেই আরও বেশি করে জড়িয়ে ধরছিল।

একদিন সকালে উঠে সে ঠিক করল, তার আর হার্পের মধ্যে সময়ের ব্যবধানটুকুও মিটিয়ে ফেলতে হবে। সে সব ঘরের ঘড়িগুলোকে বন্ধ করে দিল। বাইরের আলো আটকানোর জন্যে ভারি পর্দা এমনভাবে টাঙিয়ে দিল, যেন ভিতর থেকে সময়ের আন্দাজ কিছুতেই না পাওয়া যায়। ঘরের ইলেক্ট্রিক বাতিটিই এখন তার আলোর একমাত্র উৎস। তীব্রভাবে সে চাইছিল যে, তার শরীর ও মন হার্পের ছন্দে আবর্তিত হোক। এরপর থেকে, আক্ষরিক অর্থেই তার খাওয়া-শোওয়ার কোনো ঠিক রইলো না। তার রান্নাঘরের রসদ কম থেকে প্রায় শূন্যে পৌঁছে যাচ্ছিল। এক সময়ে তার সময়ের বোধও হারিয়ে গেল। সে তার প্রিয়তমকে অনন্ত সময় ধরে আঙুলের আদরে ভরিয়ে রাখল, তার খেয়ালখুশির কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করল। প্রিয়মিলনের আনন্দে সে ক্রমেই আত্মহারা হয়ে উঠছিল। উত্তেজনা শিখরে পৌঁছালে সে একসময় তার সমস্ত কাপড় খুলে ফেলে। তার আর শিল্পের মধ্যে এটুকু বাধাও সে রাখতে চাইছিল না। এইবার সে উৎসুক আনন্দে হার্পের সামনে এসে বসল। তার মনে হচ্ছিল, সে এখুনি এই নগ্নিকার সমস্ত কামনা পূর্ণ করবে। নিবিড় আলিঙ্গনে তার দেহের রঙের সাথে কাঠের রঙ মিলেমিশে একাকার হয়ে গেল। শুধু তার মুখ আর চোখদুটি হার্পের কালচে গেরুয়া রঙের উপর দিয়ে জেগে রইল। সে হার্পকে তার দুই ঊড়ুর মাঝে টেনে নিল। তার নগ্ন পায়ের পাতারা শীতল পাদপীঠের স্পর্শে শিউরে উঠল। তার কড়া পড়া আঙুলগুলো আরো একবার তারে ঝংকার তুলল। বিরাম বিহীনভাবে সে বাজিয়ে গেল – মোজার্ট, হ্যান্ডল, রডরিগো, বাখ, বোয়লডিউ, ডেবিউসি, গোসেক......। সে তাদের হাত ধরে এককে অন্যের সাথে পরিচয় করিয়ে দিল। তাদের মিলিত কলতানে যে অনন্যপূর্ব শব্দতরঙ্গের সৃষ্টি হলো, তার অসীম বিশালতায় সে ভেসে গেল। আজ অবধি যত সুর, যত গান বেজেছে, তারা সবাই যেন এই বিপুল সাগরে মিশে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। ক্ষুধিত কৃষ্ণগহ্বরের মতো সেই তরঙ্গ সমস্ত জটিল সুরলহরী, সরলতম স্বর – সব, সব আত্মস্থ করে নিল। হার্প আর তার যৌথ শরীর জুড়ে একটিমাত্র সঙ্গীত তার বিশুদ্ধতম রূপ নিয়ে প্রকাশিত হলো।

একটি আনন্দিত মানবীকণ্ঠ এই অপরূপ সঙ্গীতে মিশে যাচ্ছিল। সেই স্বরের খুশি ও যন্ত্রণা, তৃপ্তি ও ক্লান্তি, আনন্দ ও বেদনা হার্পের সপ্তসুরের রামধনু রঙের সঙ্গে মিলে এক ঐকতান সৃষ্টি করল। এই উন্মাদনার চরম মুহূর্তে লাভার মতো উষ্ণ ঘন তরল তার বেয়ে, নারীটির দৃঢ় আর্দ্র ত্বক ভিজিয়ে দিয়ে, পাদপীঠ পেরিয়ে তার পায়ের পাতায় জমা হচ্ছিল। এই বেদনা ওকে থামালো না কিন্তু! বরং দ্বিগুণ উৎসাহ ও আনন্দে সে বাজিয়ে চলল। ধীরে ধীরে তার বাজনার গতি কমে এল। মনে হলো, সে যেন খুব আদর করে নানান সুরের মিলন ঘটাচ্ছে। তার হার্প তাকে কিছুতেই থামতে দিচ্ছিল না। সে বুঝতে পারছিল, তাকে আমৃত্যু বাজিয়ে যেতেই হবে – যতক্ষণ না সে উৎকর্ষতার শিখরে পৌঁছাতে পারছে। তার হাত ও পায়ের ক্ষত ক্রমশঃ গভীরতর হচ্ছিল। ঝরতে থাকা গরম রক্তের স্রোত উপেক্ষা করে সে বাজিয়েই চলল। সঙ্গীতের চেয়ে প্রেয় তার কাছে আর কিছুই নেই। তার ঠিক সামনে, একটু দূরেই তার জীবনের লক্ষ্য দাঁড়িয়ে আছে! তার শরীর অবশ হয়ে আসছে। এক অকল্পনীয় ভয়ে সে কেঁপে উঠল – সে কি পারবে না? আর একটুখানি, আর একটু, আর....

সে পেরেছে! সে আজ চরম পূর্ণতা লাভ করেছে। এইবার নৈঃশব্দ্য নামছে বিশ্ব জুড়ে। চরাচরব্যাপী শীতল, চরম নৈঃশব্দ্য। এমন এক সংগীতের পর শ্রোতাদের কাছে যে নিশ্ছিদ্র নীরবতা কাম্য – আজকের স্তব্ধতায় তার সেই পরম প্রাপ্তি।


-----------------------------------------------------------------------------------
মূলগল্প: Maestoso by Jorge Volpi Escalate. Translated by : Kit Maude



লেখক পরিচিতি:

হোর্হে ভোলপি এস্ক্যালেট (JORGE VOLPI ESCALATE) – জন্ম ১০ জুলাই, ১৯৬৮, আবাস - মেক্সিকো। মূলতঃ ঔপন্যাসিক এবং প্রাবন্ধিক। ক্লিনসরের সন্ধানে (En busca de Klingsor) তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। মেক্সিকোর সাহিত্য আন্দোলন Crack Manifesto তে তাঁর অবদান ও অংশগ্রহণ উল্লেখযোগ্য। তৎকালীন লাতিন আমেরিকার সাহিত্যের পরাবাস্তবতার প্রচলিত ধারাকে ভেঙে তাঁর লেখায় চরিত্র ও পারিপার্শ্বিকের প্রাধান্য দেখা যায়। তাঁর লেখা বিশ্বের পঁচিশটি ভাষায় অনুবাদিত হয়েছে। প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে Biblioteca Breva Award আর the Planta-Casa de América বিশেষ উল্লেখযোগ্য। এছাড়াও তিনি Guggenheim Memorial Foundation এর বৃত্তি পেয়েছেন। বর্তমানে তিনি মেক্সিকোর Festival Internacional Cervantino (FIC) এর ডিরেক্টর। মায়িস্তোসো তাঁর এক উল্লেখযোগ্য রচনা। 

 


অনুবাদক পরিচিতি:

দোলা সেন

গল্পকার। অনুবাদক।

আসানসোলে থাকেন।

 

1 টি মন্তব্য:

  1. খুব ভাল লাগল। গল্পটি এবং অনুবাদ দুটিই। মনেই হয়নি অনুবাদ পড়ছি।

    উত্তরমুছুন