শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

কুলদা রায়ের বই 'বৃষ্টি চিহ্নিত জল' নিয়ে পাঠভাবনা : রঞ্জনা ব্যানার্জী



বইয়ের নাম ‘বৃষ্টি চিহ্নিত জল’। লেখক কুলদা রায়। প্রকাশক নালন্দা এবং আমার সংগ্রহের কপিটি দ্বিতীয় সংস্করণের। এই বইয়ের কিছু গল্প আমার আগেই পড়া ছিল, সেই কারণেই জানি এই বইটির বহুল প্রচার জরুরি। ভালো লেখা পাঠকের হাতে পৌঁছাতে পারেন পাঠকই। তাই পাঠক হিসেবেই আমার অনুভূতি ভাগ করলাম এখানে।  
বইয়ের নামেই আছে ভাবনার নিড়ানী। বৃষ্টির জলেরও নানা চিহ্ন থাকে: কোথায় কোন সময়ে কাকে ছুঁয়ে দিলো তার ধরনেই জলের ধরন, স্বরের ভিন্নতা। টিনের চালে যে বৃষ্টির নূপুর, লাউয়ের ডগায় তার আওয়াজ কোথায়? আকাশ ফুঁটো হলে পুকুরে জলের বুড়বুড়ি নক্সা কাটে, বাড়ির ছাদ কিংবা কাদাগোলা খাদে তেমন মিহি তানের সুর নেই যে! ছাতা মাথায় জল ছপছপ পায়ের আওয়াজ আর কান্না-ধোয়া জলের চিহ্নের থই তো এক নয়। তবে সব জল একসময় সাগর-পানেই ধায় আর সাগরের জলও কান্নার জলের মতোই নুনে ভরা! তবে মানুষ কেবল দুঃখে নয় সুখেও কাঁদে। তাই ‘বৃষ্টি চিহ্নিত জলের’ পনেরটি গল্প সেইসব দুঃখ-সুখের গল্প-কথাই।

গল্পের শুরুতে প্রাক-কথনে ১৯৩৬-৩৭ এর ফ্রেমে বাঁধাই ধূসর ছবিটি লেখকের কলমের গুণেই স্পষ্ট দেখতে পাই যেন! একটি মৃতদেহকে ঘিরে আছে কিছু মানুষ। এরা প্রায় সকলেই পস্পরের আত্মীয়। কারো কারো সাজে খানিক আড়ম্বর আছে, বোঝা যায় ছবি তোলাই তাদের লক্ষ্য। এটিই হয়তো এই এলাকার প্রথম ক্যামেরায় তোলা ছবি। ছবির মানুষদের মধ্যে দুই জন ‘বিশেষ’। আসলে একজন বলাই শ্রেয়, কেননা অপরটি ‘জন’ নেই আর। দেহ। মৃতদেহ। প্রাণ না থাকলে দেহকে ‘জন’ বলা যায় না। তবে যতক্ষণ ‘জন’ ছিলেন ততক্ষণ তাঁরও একটি গল্প ছিল নিশ্চিত। অপর বিশেষ জনটি সেই গল্পেরই ছেঁড়া সুতোর টান । তিনি মৃতের স্বামী। নাম সৃষ্টিধর রায়। লেখকের পূর্বপুরুষ। বলা ভালো আমাদেরও। কেননা মানুষই মানুষের পরম-আত্মীয়। আমরা জেনেও অজ্ঞানের মোড়কে নিজেদের ‘অহম’ জড়াই। এই জনসমুদ্রে জন্মচিহ্নে ধর্ম-ছাপ লাগার আগে আমরা সকলে ভূমিরই সন্তান ছিলাম একদা। কুলদা রায়ের এই পনের গল্পে আমাদের ভুলে যাওয়া সেই মূল তারেই টঙ্কার তোলে। বিশেষ সম্প্রদায়, বিশেষ শ্রেণি, লিঙ্গ কিংবা বয়সের আবছা বিভেদরেখা মুছে তাঁর গল্পেরা আমাদের সকলেরই গল্প বনে যায়।

বিষয়ের ভিন্নতা সত্ত্বেও গল্পগুলো কেমন যেন পস্পরের আঙুল ছুঁয়ে আছে। ভালো লেগেছে এদের সন্নিবেশের ক্রমও। গল্পগুলো পাঠকের কাছে খানিক আড়াল নিয়ে আসে। এই রূপ-অরূপের আড়াল ভেঙে কে কতটা দেখবে তা পাঠকের দেখন-চোখই জানে।

প্রথম গল্প ‘আমার সাহিত্য -বোধের গল্প’ শিরোনামের গল্পটি দিয়েই শুরু করি : এই গল্পে নাতির সাহিত্য-বোধ জন্মানোর পথ্য এলো গামলার ভেতরে ‘হলুদ বর্ণের ‘ফাইয়া’ হয়ে। এ নিয়ে জাদুবাস্তব-পরাবাস্তব তত্ত্বতালাশে চিত্তচঞ্চল হওয়ার আগেই কাশেম রেজার কন্যা কোকো আপার কথামতো সামান্য মধুযোগে ফাইয়া খেলে কষ লাগে না - এই সত্যতে নাড়া বেঁধে থিতু হতে হয় পাঠকের। ‘ফাইয়া’ থেকে পেঁপে হতে ধৈর্য ধারণ জরুরি, এ কথাও সত্য। তাই পেঁপে লেখা কাগজটি পাতা মেলে আকাশমুখি হওয়াও জাদু মনে হয় না। জানি মা আঁজলা ভরে জল দিয়েছেন অতএব ফাঁকি নেই, বরং আছে বীজের আশ্বাস। অতঃপর ঠাকুরদা’ শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের আগে ‘গঙ্গাজল’ নয় কাশেম রেজার হাতে পেঁপের মিষ্টি রস খেয়ে বোঝেন তাঁর শেষ বাসনা পূর্ণ হয়েছে, ‘ফল ফলেছে’ । ঠাকুর দা’র চোখের কোণ উপচে দু’ফোটা জল গড়ায়। আর্দ্র হয় পাঠকও। তাঁর অন্তিম শরণের দিনটিতেই নাতির সাহিত্যে হাতেখড়ি। নাতি লেখে, ‘ পেঁপে ফল পাকিলে মিঠা লাগে। কাঁচা হইলে আনাজ’। এইখানে এসেই গল্প শেষ কিন্তু পাঠক আমার নটে গাছটি মুড়োয় না বরং বীজোদ্গম হয় যেন! জাদু এবং বাস্তবের ঘোর কাটিয়ে পরত খুলে এইবার গল্পের শাঁস খুঁজি। বুঝি সাহিত্য তেমনই বস্তু যা আনাজ থেকে মিষ্ট না হলে সাহিত্য হয়ে ওঠে না এবং জীবনের পাঠ ছাড়া সেই মিষ্টতার মন্থন কোনোভাবেই সম্ভব নয়। এবং এই যে ভাষার ব্যবহার ‘ফাইয়া’ কিংবা ‘পেঁপে’ এদের স্থান চিনে বসানোর জন্যেও ‘মননের পক্কতা’ জরুরি।

পরের গল্প ‘সোনার কলস’ প্রকৃতই গা- হিম করা খুনের গল্প। লাশ গুমের গল্প। চিরচরিত কালো-কন্যার যৌতুক দিয়েও শেষরক্ষা না-হওয়ার গল্প। অথচ বুননের শৈলীতে আমরাও বড়ো ঠাইরেনের নানা রঙ্গ-রস মেশানো বয়ানের মোহে পড়ি। শেষমেশ সেই বিমলাবালার ঘোড়ার পিঠে চড়ে আকাশে হাপিস হওয়ার গল্পের সঙ্গে সোনার কলসের মাটি ঘষ্টে পুকুরে নামার মিলযোগ, সত্যকে কুহকে জড়ায়। তবে রক্তকরবীর আধপোড়া ফলের বিষে সব মাছের সঙ্গে অদ্ভুত কালো কাছিমটি সত্য নিয়ে মরে ভেসে উঠলেও আমরা ধন্দে পড়ি। এই ‘জলের’ গল্পটি কনে-বদল, কনে-গুম সব ছাপিয়ে মানরক্ষার দায় নারীজীবনের চেয়েও যে অধিক মূল্যমানের সেই আদি সত্যই কাছিমটির চার পায়ে বাঁধা ঝুমঝুমিতে অনুরণন তোলে।

‘শবনম অথবা হিমিকালিপি’ গল্পের শুরু অসিতবাবুর রচনা দিয়ে। তিনি মফস্বলের ইতিহাস নিয়ে প্রবন্ধ লিখেছেন। সেখানেই বলা আছে ‘চিলে কোঠা’ বাড়ির নাম এসেছে চিলম্যান থেকে । গ্রেগরী চিলম্যান এদেশে এসেছিলেন নীলচাষের জন্যে। সে অনেক কাল আগে- ১৮০৩ সালে। গল্পটি কিন্তু চিলম্যানের নয়। তাঁকে নিয়ে বিশেষ কিছু নেইও এখানে। ১৯৭২ এ যিনি থাকতেন, সেই গণিতের শিক্ষক হুজুর স্যার? নাঃ গল্পটি তাঁরও নয়। তবে চিঠিগুলি তাঁর এবং আলমগীরের অঙ্কন-প্রতিভা তিনিই আবিষ্কার করেছিলেন। কিন্তু এই গল্প আলমগীরেরও নয়। গল্পটি তবে টগরের? টগর কে? দুধফুল যা আলমগীর এঁকেছিল? নাকি সেই চিঠির অরূপ প্রেমিকা, হুজুরের স্ত্রী? গল্পটি তারও নয়। শবনমের কি? শবনম মানে ভোরের শিশির। টগরের মেয়ের নাম শবনম রাখার কথা। হিমিকার মেয়ের নাম শবনম রাখা হয়েছিল। মধুমতীর ঘাটের সেই পরী নামের দেহপসারিনীর মেয়েটিও যে শবনম! এইখানে এসে জলের মতো ঘুরে ঘুরে বলা এই গল্পের শুরুটা ভাসে। গ্রেগরী চিলম্যান! তাঁর সমাধিতে লেখা ছিল ‘a son of solitude’! তিন শবনমের জন্মসূত্রে সেই একাকী ঘোরের বিনে সুতোর মিল এবং হুজুর স্যার, আলমগীর, আনিস স্যার এরা সকলেই ভালোবেসে হয়ে গিয়েছিলেন একা ।

কুলদা রায় সময়ের আগু-পিছুর চিহ্নসূত্র সাবলীলতায় গুঁজে দেন গল্পের অনুসঙ্গে। ‘সুবোল-সখার বিয়ে বৃত্তান্তে’ সময়ের উপস্থাপন এতই প্রামাণ্য যে মনে হয় যেন এই সময়েই দর্শক আসনে বসে দেখছি ঘটমান-অতীত। ‘বেলগাছটির অবস্থান ঈশান কোণে। রুয়েছিলেন দীননাথ। সেটা পঞ্চাশ সালের ঘটনা… ‘ এই তিন বাক্যে যেন ইতিহাস পাশ ফিরে চোখ মেলে। আবার বরযাত্রীর নৌকায় শচীন নব ঘোরাচ্ছে। আকাশবাণী ধরা পড়ছে না। কাঁটা ধরল ঢাকা বেতার। খবর পড়ছেন, 'সরকার কবীর উদ্দীন’। বর্মা থেকে চাল আসবে, বন্যা হবে না। ন্যায্যমূল্যের দোকানে রক্ষী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে মালামাল বিক্রি হচ্ছে-দেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলছে। এই গুরুগম্ভীর তথ্যের র মধ্যেই সুলেখা রানী বলে উঠে, ‘একটা গান দ্যান, ভাবের গান। কচকচানি ভালো লাগে না।‘ পাঠকেরও ঠিক এমনই মনে হয়। ব্রেক দেওয়া যাকে বলে। গল্প গুরুগম্ভীর ভাব জমাট করে বসে যাওয়ার আগেই লঘু করে ফের গল্পে টানা --- এই শৈলীটির কারণেই গল্পের ঈশান কোণে মেঘ জমলেও গুমোট হয় না। ভাবনার জানালা খোলাই থাকে।

‘মথি উদয়ের তারায়’ এসে সত্য কী এই প্রশ্ন নতুন করেই প্রশ্নবিদ্ধ করে নিজেকে । ধর্মের ভাইরাস বড়ো সংক্রামক। যে ‘তারা’ জীবন বাঁচায় সে ‘তারা’ বিভ্রম হলেও সত্য।

‘গন্নিবিবির জুতো-পাখি’ তে গল্পের ছলে তথ্য ঠাঁসা। গল্পের নির্মোহ শুরুটি দারুণ, ‘সিকদার বাবুগো গদিঘরে গন্নি বিবি ঝনন ঝনন ঝা বলে পা দিয়া দাপানি তুলল- হ্যার আগের দিনই একজোড়া পাম্পস্যু কেনা হইছিল। কাহিনী এইটুকুই। ’- এই যে যতি তাতেই পাঠকের ঔৎসুক্য চরমে ঠেকে । গন্নি বিবি কে? কেনই বা এই পাম্প স্যু কেনা? ততক্ষণে গল্প সিন্ধুকে ঢুকে ফের বেরিয়ে ডাল-পালা ছড়িয়ে এপার ওপার, এপাড়া সে-পাড়া ঘুরে ইংল্যন্ডে পৌঁছে গেছে! এই গল্পের গরু মসৃণভাবে কবরস্থান পর্যন্ত নিয়ে যাবে পাঠককে এবং মার্কেজের মতো কুলদা রায়ও নানা তথ্যপ্রমাণের উপস্থাপনে পাঠকের বিভ্রান্তির বুদবুদ ঘোলা হওয়ার আগেই ছেঁকে ফর্সা করবেন দক্ষতায় এবং পাঠকও গল্পের গরুর দড়িটি ধরেই থাকবেন শেষ পর্যন্ত। এই গল্পেই এক জায়গায় একটা দারুণ প্রশ্ন আছে। সেন্ট মথুরানাথের সদাপ্রভু কর্তৃক শাপান্তে নিক্ষিপ্ত আদম-হাওয়ার গল্পটি শ্রবণশেষে হাড়ময় মস্তিষ্ক, ক্ষুধাযুক্ত পেটের অশিষ্ট সেইসব জনগণের মাঝ থেকে কেউ একজন জানতে চায়, ‘বাপের পাপ পোলার গায়ে চাপানো কি ঠিক হইল ফাদারবাবু? এই কামডা কি আপনের সদাপরভু ঠিক কইরেছেন?’

‘বৃষ্টিচিহ্নিত জল’ এই গল্পটি পড়তে পড়তে মনে হয় যেন এটি আমাদের রাধারানীরই গল্প। এই গল্পের কৃষ্ণও ফেরে নি রাধার কাছে তবে তাঁর বাঁশিটি ফেলে গেছে ভুলে। এই গল্পের জমজ দুই বোনের সারা জীবন জুড়ে থাকবারই কথা ছিলো। একই সঙ্গেই কন্যা বিদায়- তাদের পিতার এমনই আশ। কিন্তু শেষতক বোনে বোনে চোখের-কাজল ভাগ হলেও চোখের-জল ভাগ হলো না। আকাশ ভেঙে যে জল অঞ্জলিকে ভিজিয়ে গেলো সেই জল বিজুলির নয়। এই গল্পের বিজুলি-অঞ্জলির বাড়ির বর্ণনা পড়তে পড়তে মনে হলো যেন বিভূতি বাবু আমাদের এদিককার কোনো আঞ্চলিক ভাষায় কথা কইছেন। গল্পটি বেদনার কিন্তু আগাগোড়াই ভাষার মিষ্টতায় টইটম্বুর। অবশ্য কুলদা রায়ের ভাষারও নিজস্ব একটা শান্তশ্রী আছে।

‘দুধকুমারের হাতি’ গল্পের হাতি কোনো মামুলি হাতি নয়। গল্পের শুরু হলো লক্ষণ দাসের হাতির বর্ণনা দিয়ে। সে হাতি আফ্রিকার হাতি। ‘হাঁটলে মেদিনী কাঁপত’ । শুকচাঁদ ঘরামীর হাতিকে নারকেল খাওয়ানোর পক্ষে দার্শনিক যুক্তি, ‘নারিকেল হলো গে মানুষের অহঙ্কারের চিহ্ন। গণেশ ঠাকুরের হাতির কাছে নারিকেল দিলেন মানে আপনার অহঙ্কারকেই দিলেন। …হাতিরূপী গণেশ ঠাকুর আপনার অহঙ্কারের শ্বাসটুক খাইল, জল্টুক খাইল। তারপর আইচাটা ছুইড়া মারল। আর আপনার মনে পাপ আসার কোনো সুযোগ থাকল না। পাপ মনে কল্যাণ আসে ক্যামনে স্যার!’ গল্প হাতি থেকে ক্রমশ সরে যায় লক্ষণ সেনের পূর্ব ইতিহাসে। বালক কালের লখাই। গল্প ফেরে দুধকুমারের দিকে। দুধকুমার এসেছিলেন ইয়েমেন থেকে। জাহাঙ্গীর বাদশাহর আমলে। বড়ই প্রত্যক্ষ পীর। এই পীরের চমৎকারেই লক্ষণদাসের হাতি হলো। সার্কেসের দল হলো। হাতির নাম মধুবালা কিন্তু একাত্তরে লক্ষণদাস কর্ণেলের মেয়ের হাতি দেখার সাধ মিটাতে যায়নি। গ্রাম পুড়েছে। মানুষ মরেছে। সেই ঘটনা স্বাধীন দেশের ডিসিও ভোলেন নাই। নথিতে এই কথা আছে। এবার স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর নাতি খেলা দেখতে চেয়েছে। দেখতে পায় নি। হাতির অসুখ।। তবে এমপি সাহেব দেখেছেন। এই দেখতে না-পারার জন্যে নজরবন্দি ছিলো সার্কাসের লোকেরা তাদের মালিক সহ। ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে: কুশীলব পাল্টায়।

‘কারবালা বিবি’ গল্পও একাত্তরের গল্প। পানঘুচি নদীতে আছে সেই কান্নার জল। এই গল্পে মেনাজ ফকির কারবালা-পালা শেষ করতে পারেন নি কখনই। কেন জানতে হলে জানতে হয় কারবালা বিবির গল্পটি। কলারণ গ্রামে ঢুকলে সব নিরাপদ। কলারণ মীর কদম পীরের গাঁও। ইয়াহিয়া খান তো বটেই আইয়ুব খানও তাঁকে ইজ্জত করে। তারপরেও নিয়তির টানে কারবালা বিবির বাচ্চাটি হারিয়ে যায়। এই শোকের গল্প বিষাদ সিন্ধুর মতোই হাহাকারের।

‘শুঁয়াচান পাখি’ এই গল্প ক্ষুদ্র ঋণ-বাণিজ্যের গল্প। এই গল্প টিভিতে দেখায় না। এই গল্প সাফল্যগাঁথার নয়, পর্দার পেছনের গল্প। এ-ও জলের গল্প। অন্য যুদ্ধের গল্প। এই যুদ্ধে জয়ী হওয়া সহজ নয়। তবে যুদ্ধের টোপ গেলানো সহজ। স্বাধীন দেশের উন্নয়নশীল বাঘ কীভাবে বলিয়ান হচ্ছে সে কথা বিশদে প্রচার পায় তার পাশাপাশি কিস্তি ফেরতের ব্যর্থতার গ্লানি এড়াতে কেউ কেউ যে জলেও ডুবে মরে; সে কথা জল জানে আকাশ পেরিয়ে সুইডেনের রানীর কানে পৌঁছায় না।এমন কি হার্ভাডের থিসিসেও নয়। মাইক্রোক্রেডিটের ম্যাক্রোর হিসেবে টিন খুইয়ে ফেলার কথা মুন্নি গাইকে কেড়ে নেওয়ার কথা, নোলক খুলে জলে নেমে যাওয়ার গল্প - অনুক্তই থাকে। কেবল ক্যামেরার পেছনের চোখ-জোড়াই লক্ষ করে জমেলা বিবি যেন রমিজা খাতুনের চোখের তারায় ‘শুঁয়াচান পাখি’ হয়ে থমকে আছে।

‘কোমল পুষ্প’ গল্পটি পনের গল্পের মধ্যে অন্যরকম লেগেছে আমার। আখ্যান তো বটেই এই গল্পের কথক নিয়েও খানিক দ্বন্দ্ব আছে। কথক পাঁচ ভাইবোনের একজন। গল্প চলে তার বয়ানে কিন্তু সে থাকে না কোথাও। এমন কি গীতাদি’র বাড়ি বেড়ানোর পরে মেজো বোন ও দাদার মন খারাপের কথোপকথনে সে আমরা হয় কায়াটি ছাড়াই। সাহা পাড়ার গীতাদি’র রহস্য অধরাই থাকে তবে কোমলপুষ্প গানের মুখরাটি মেজো বোনের তোলা হয়ে গিয়েছিল জানালার ওপারে দাঁড়িয়েই। গল্প শেষে বাড়ির চুপচাপ ছেলেটির অনেকক্ষণ পরে খোঁজ না পাওয়ার মতোই গীতাদি’কে ছাপিয়ে আমিও কথক ছেলেটিকে খুঁজি।

‘পরীছায়া পরীমায়া’ ঘোর লাগানো গল্প। ডানা- থাকা বা না -থাকা দুইই পরীকথা। দুখি দিদির পুড়ে মরা ডানা-না থাকার জন্যে। লোকজন দেখছে ভেতরে পুড়ছে একলা মেয়ে কিন্তু জানবাজী রেখে জান বাঁচাতে এলো না কেউ। ডানা থাকলে দুখি দিদির মায়ের কানে ‘আমি পুড়ছি গো মা’ বাজতো না। ডানার কায়া নয় ছায়াটি ভুল করে নিয়ে গিয়েছিল বলেই বাসেত ভাই পুকুরের মাঝখানে মাছের মতো ভেসে উঠেছিল। ছায়া দিয়ে ওড়া যায় না। গল্প শেষে উপলব্ধি করি সব মানুষেরই একজোড়া ডানা আছে। ডানা থাকলেই ওড়া যায় না। ছায়া-কায়ার তফাৎ জানতে হয়। এবং ডানা পরতেও জানা চাই। তবেই ইচ্ছে ডানায় উড়াল দেওয়া যায়।

‘জন্মকাল’ লেখা হয়েছিল কৌশিকের। একেবারে আবহাওয়া, দিন, সন, ক্ষণের বিবরণ তো বটেই লক্ষ্মী দাইয়ের দরজা খুলে ‘উলুধ্‌বনি দ্যান গো মা…’ এর সঙ্গে মা যে পুকুর পাড়ে তারও উল্লেখ করেছিল মধু। বিনোদিনী মানে মধুর মা এই নাতির নামে অর্জুন গাছ লাগাচ্ছিলেন জন্মক্ষণে। গগন করাতি জানে সেইসব কথা। প্রথম গাছটির জন্যে সে-ই তো গর্ত খুঁড়েছিল। বিধুবাবুর ন্যাওটা হয়েছিল কৃষ্ণ-পালা শুনে। গগন এই বাড়ি ছেড়েছে মধুর নিখোঁজের পরে। এই গল্পও ভিটে ছাড়ার গল্প। এই গল্প কাঞ্চনকুমারীদের হারিয়ে যাওয়ার গল্প। এই গল্পে বর্ডার পার হওয়ার সূত্র ধরে কীভাবে আজন্ম ভিটে শত্রুসম্পত্তি হয়ে যায় সেইসব কূটকৌশলের গল্প। গগন করাতিও নিরাপদ নয়; সংখ্যাগুরুর অংশ হয়েও নয় । নতুন নাতির নামে গাছটি লাগানো হয় না বিনোদিনীর। ইচ্ছে ছিল তবে যে ভিটে চলে যায় সরকারের কলমের খোঁচায়, সে ভিটেতে গাছ লাগিয়ে লাভ নেই আর। গগন করাতি জানে সেই ইচ্ছের খোঁজ। ধর্মের অমিল মনের মিলকে আবিল করতে পারেনি আজও। কিছু লোক এখনও মানবসুত্রেই গাঁথা। তবে সজিনা গাছের চারা পোঁতার সময়েই মধুসূদনের বেগুনি শার্ট টিনের বাক্স থেকে বেরিয়ে আসে গল্পের ভেতরের আরেকটি গল্প সাপের মতো ঠান্ডা শ্বাস ফেলে। শার্টটি কুচিকুচি করে পুড়িয়ে ফেলে গগন। আকাশের শুকতারা দেখে ছাই হয়ে যাচ্ছে সত্য। বাবাগাছ-কাকাগাছ-পিসিগাছেরা নতুন শিশু গাছটিকে সঙ্গী করে জমিয়ে রাখে এইসব চুপকথা।

মধুসূদনের পরে আর কেউ মহাকাব্য লিখতে পারে নি, জহুর স্যার তাঁর ক্লাসে বলেছিলেন। এমন কি ঠাকুরবাড়ির ছেলেটিও নয়। এর পেছনের কারণটি অবশ্য পোক্ত ছিলো না। ৪৭ এ সূর্যকান্ত মাস্টার ভিটে ছেড়েছিলেন। মেঘনাদবধ কাব্যটি সুর্যকান্ত বাবুর সূত্রে পাওয়া। মাইকেলকে তাঁর পিতামাতা ত্যাগ করেছিল। তবে মাইকেল তাঁর স্বদেশকে বুকে নিয়ে ঘুরেছেন। জহুর স্যারের পূর্বপুরুষ মুর্শিদাবাদের নবাবের বংশধর। লর্ড ক্লাইভ তাঁদের তাড়িয়েছেন। ভুমিচ্যুত হলেই কি জন্মের দাগ মোছা যায়? (মেঘনাদ বধ)

শেষ গল্পটি নিউইয়র্কে। খানিকটা দলছুট প্লটের বিচারে। যদিও এতেও আছে দেশত্যাগ। এবারের ছাতা ধর্মগুরুর হাতে। তিনিই ঈশ্বরের সোল-এজেন্ট। অগতির গতি। পশ্চিমে যারা হিন্দু ধর্ম নিয়ে কোকাকোলার মতো ব্র্যান্ড পর্যায়ে কর্ম-কোলার বাণিজ্য করেন তাঁদেরই প্রতিনিধি যেন তিনি। জ্যোতি দিদি আছেন আমেরিকাতে, আবার নেই-ও। কারণ তিনি এসেছেন কিন্তু তাঁর থাকাটি নিবন্ধিত হয় নি।জ্যোতি দিদি দেশ ছেড়েছেন ৯২ এ। কেন? নানা নথি দেখে জানা যায়, পাশের দেশে সেই সময়ে উগ্র হিন্দুত্ববাদীরা প্রাচীন একটি মসজিদ ভেঙে দেওয়ায় বাংলাদেশের ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের হামলায় শাঁখারিপট্টিতে কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনায় জ্যোতি দিদির বাড়িটি পুড়ে যায়। তাঁর মেয়েটির মৃত্যু হয়। তিনি মানসিক স্থিতি হারিয়ে হাসপাতালে ছিলেন। গুরু সেই সময়ে ঢাকায় ভ্রমণ করছিলেন। ম্যারাথন পিসের কর্মসূচি উপলক্ষে তাঁর সফর। কিন্তু সেটি আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতির কারণে বাতিল হলে তিনি ঢাকা ক্লাবে শান্তির জন্য মেডিটেশন পরিচালনা করে পরে পিজিতে হাসপাতালে যান। এবং সেখানেই জ্যোতি রানীর দেখা পান। গুরুর কৃপাতেই জ্যোতি দিদির যেমন নিউইয়র্কে আসা। তেমনি গুরুর অকৃপাতেই তাকে আমেরিকাও ছাড়তে হয়। সেও ঘটনা বটে। (জ্যোতিদিদির বিড়াল)

যে গল্পের আনন্দ কিংবা বিষণ্ণতা আমাকে স্পর্শ করতে পারে এবং পাঠ শেষে আমার ভাবনার দরজায় ধাক্কা না-হোক অন্তত জানালায় টোকা পড়ে সেই গল্পই আমার বিচারে ভালো গল্প। ‘বৃষ্টি চিহ্নিত জল’ আমার কাছে ভালো বই। বইয়ের দুই মলাটে বাঁধাই করা মানব-জীবনের নানা গলি ঘুরে জেনেছি সব জল ধোয়া যায় না। এবং কোনো কোনো জলের দাগ জীবনের জলছাপ হয়ে রয়েই যায়।



লেখক পরিচিতি:

রঞ্জনা ব্যানার্জী

কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক। 

কানাডায় থাকেন।

 



 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন