শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

প্রতিভা সরকারের গল্প: দাঙ্গা পরবর্তী

 
এই মফস্বল থেকে জয়ন্তী পাহাড় দেখা যেত তখন। পাহাড় নয়, পাহাড়ের আভাস। নীলচে ঢেউয়ের মতো। আঁকার খাতায় দুটো ঢেউয়ের মাঝে একটা কিরণ ছড়ানো হাফ সূর্য এঁকে দিতাম আমি। ব্যাস,পাহাড়ে সকাল হলো। এখানেও।
 
ব্রাশ করতে করতে রোজ সত্যি পাহাড়ের রেখাটার সঙ্গে দেখা হতো। খুব ইচ্ছে হতো একদিন ওদিক পানে হাঁটা লাগাই, কাউকে কিছু না বলেই। কিন্তু মা এসে গলায় গামছা জড়িয়ে দিত। কাঁসার ঘটিতে তোলা জল রয়েছে। সূর্যের আলো পড়ে তাকে সোনালি মধুর মতো লাগছে। পিঁড়ে পেতে মা বলতো, এবার কুলিকুচি কর।
 
কুলকুল শব্দ করে এক গাল থেকে আর এক গালের ভেতরে জল ঠেলাঠেলি করতাম আমি। হয়তো সামনে দিয়ে যাওয়া পিঁপড়ের সারিকে ছত্রভঙ্গ করে দিলাম ঠোঁটের ফাঁকে ফোয়ারা ছুটিয়ে। নয়তো নয়নতারা গাছের গোড়া ভিজিয়ে দিলাম। পেস্টের গন্ধ চলে গেলে উপচে পড়া জল ঠোঁটের চারপাশ থেকে মুছে নিয়েই দৌড়তাম। মা বড় বাটিতে দুধ মুড়ি কলা মেখে রেখেছে। চামচ দিয়ে হড়বড় করে মুখে তোলা। দেরি হলেই বারান্দার চৌকিতে পড়ার বই ছড়িয়ে বসে থাকা খুকিদি হাঁক ছাড়বে, টুনু কোথায় গেলি রে !
 
অনেকদিন ধরে গৃহশিক্ষকতা করায় সে প্রায় ঘরের মেয়েই হয়ে গেছিল। যখন আমার ক্লাস সেভেন, খুকিদিই পড়াতে এসে একদিন মা-কে বলল, বৌদি ওইপারে খানসেনাদের সঙ্গে খুব যুদ্ধ লাগছে। আবার রিফিউজির ঢল নামতেছে।
 
ঠাকুমা সবজি কুটছিল রান্নাঘরের দাওয়ায়। কথাটা শুনে ফেলে মুখ তুলে বলল,
 
-কাগজে তো তাই লিখতেছে। কিন্তু মুসলমান মুসলমানরে কাটে ক্যান কও তো।
 
-এই যুদ্ধ তো ধর্মের যুদ্ধ না, মেইন কোশ্চেন হইল গিয়া পাকিস্তানি হুজুরদের সবেতে নাক গলানোর অভ্যাস। নিজেদের শাসন, আধিপত্য কায়েম করতে গিয়া বাঙালিরে পিষা মাইরতে চায়। কেউ কি তা মাইনা নিতে পারে?

দেশভাগের সময় হওয়া দাঙ্গার কথা ভুইলা যান। খবরের কাগজ ফ্যালায়া দিয়া একদিন চইলা যান মানসাই নদীর দিকে। নিজের চোখে দ্যাখেন গিয়া, কতো লোক চইলা আসছে পূর্ববঙ্গ থিকা। বাচ্চাকাচ্চা, বুড়া-বুড়ি, থামার নাম নাই। তাদের সাথে কথা কইলে বুঝবেন ঐ পারে কী চলতেছে।
 
ঐ মফস্বলে আমরা এইরকম মিশ্র ভাষায় কথা বলতাম তখন। ঠাকুরদা যদিও দেশভাগের অনেক আগে চলে এসেছিল এবং প্রচুর জমিজমা কিনে এলাকায় জোতদার হিসেবে নাম করে ফেলেছিল, কিন্তু ভূমিপুত্র রাজবংশীরা ছাড়া ওখানে সব বসতিই ছিল দেশভাগের সময় এপারে চলে আসা পূর্ববঙ্গীয়দের। তাই তাদের কথাতেও দেশের ভাষার টান লেগে ছিল তখনও, ঢুকে পড়ছিল নানা স্থানীয় শব্দ, আবার কলকাতা ফেরতদের মান্যভাষার প্রভাবে ক্রিয়াপদগুলি ক্রমে সংক্ষিপ্ত হয়ে আসছিলো। আমি তখন এসব না বুঝলেও বড়দের হাবভাব বুঝতাম খুব ভালো। ছেঁড়া ছেঁড়া কথা, চোখের দৃষ্টি, হাতের নাড়াচাড়া, মনের কথা বুঝিয়ে দেবার পক্ষে এসবই যথেষ্ট, বাচ্চা আর বুড়োর কোনো তফাত নেই সেখানে৷
 
ঠাকুমার উচ্চারণে মুসলমান কথাটার গায়ে এমন ঝংকার লেগে থাকতো, যে আমি বুঝতাম কোথাও বেড়া টানা আছে। আমাদের বাড়ি আর পাশের বাড়ির মধ্যে যেমন। মা ঠাকুমা কখনো খোলসা করে না বললেও পাশের বাড়ির কাকিমা 'শ্যাখের ব্যাটা'দের গল্প করবার সময় ভুলে যেতো সামনে বাচ্চারা আছে। ফলে হিন্দুকন্যাদের জন্য তাদের লোলুপতা, জমিবাড়ি দখল করার হাঁমুখ সবটাই শুনে ফেলতাম। যে দৈত্যাকার মূর্তিটা একটু একটু ক'রে গড়ে উঠছিল মনের মধ্যে, সেটা সম্পূর্ণ হলো যেদিন নোয়াখালি দাঙ্গার প্রসঙ্গে কাকি হাত পা মুখের সাহায্যে অভিনয় করে দেখালো কী করে তার স্বাস্থ্যবান জেঠাকে কুপিয়ে মারা যাচ্ছিল না দেখে একজন লোহার শিক গরম ক'রে নাভির ভেতরে ঢুকিয়ে দেয়। শুয়োরের মতো চিৎকার করতে করতে অবশেষে মরে জেঠা।

তারপরেই নাকি পূর্ববঙ্গ থেকে রিফিউজির ঢল নামে এপারে চলে আসবার জন্য। শেয়ালদা স্টেশন বাঙালে ভরে যায়।
 
আমার সাদা মুখ দেখে মা রেগে যায়। বাচ্চাদের সামনে করার মতো গল্প এগুলো ! কোনো বোধবুদ্ধি থাকলে কেউ করে ! কবে কোথায় কী হয়েছে ঠিক নেই, ক' পোচ রঙ চড়েছে আসলের গায়ে, তারই বা ঠিক কী, বাচ্চাদের সামনে এইগুলো বলার দরকারটা কী ! মায়ের গজগজানি শুনতে শুনতে সাহস অল্প ফেরে। এগুলো সবটাই ঠিক নয় তাহলে ! আমি বায়না ধরি,

- আমাকে নিয়া চলো। রিফিউজি দেখব।
 
যেন রিফিউজি অবাক হয়ে দেখার মতো কোনো কিছু, কলকাতায় গিয়ে চিড়িয়াখানার জন্তু দেখেছিলাম যেমন শিকের ফাঁকে।
 
মা রাজি হয় না। ঠাকুমার কড়া বারণ। তখন ধরে পড়া আবার খুকিদিকে, আমার ঘরের দিদিমণি, প্রাইভেট টিচার। খুকুদি খুব যেতো মানসাইয়ের চরে। বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে খিচুড়ি রান্না করে শরণার্থীদের মধ্যে বিলোত, পুরনো জামাকাপড় জড়ো করে নিয়ে যেতো। মায়ের সঙ্গে কী শলা হলো কে জানে, আমার মাথায় রিবন বেঁধে মা ববি প্রিন্টের ফ্রক পরিয়ে খুকিদির সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়ে বলল,
 
- ঘুমিয়ে উঠে জামাকাপড় ছেড়ে মা ঠাকুরঘরে ঢুকবে। সাড়ে পাঁচটায় চা খাবে। তার আগেই পাছদুয়ার দিয়া টুনুকে ঢুকায়া দিও।
 
আমি লাফাতে লাফাতে যাচ্ছিলাম খুকিদির সামনে। এমনিই মানসাইয়ের ওপর কাঠের ব্রিজে দাঁড়াতে খুব ভালো লাগে। নীচ দিয়ে লগি ঠেলতে ঠেলতে মাঝিরা নৌকা বায়, নদী-বাঁকের ঠিক মাঝখানে সূর্য ঢেউয়ের তলায় লম্বা স্নান সারতে টুপ করে ডুব দেয়, আর কতো পাখি যে ডাকতে থাকে, খুব উঁচু দরের গানবাজনা মনে হয় আমার কানে। ব্যালেরিনা, অর্কেস্ট্রা, এইসব শব্দগুলো খুকিদিই আমাকে যত্ন করে বুঝিয়েছে।
 
সেদিন ব্রিজ অবদি পৌঁছবার আগেই পথ আটকালো ছোটকাকার বয়সী একটা ছেলে। পাজামা পাঞ্জাবি পরা, মুখটা সবসময় কেমন হাসি হাসি। হাতে একটা বড় ব্যান্ডেজ বাঁধা, তাই একটা হাতা গোটানো।
 
-তোমার ছাত্রী ?
 
খুকিদি বলল,
 
- হ্যাঁ, ওর নাম টুনু। ভালো নাম নূপুর মিত্র। পড়াশোনায় খুব ভালো।
 
একটু থেমে যোগ করল, খুব পাকা কিন্ত।
 
শেষ কথাটি বলার সময় খুকিদি মুখ মটকালো, একটা চোখ ছোট করল। আমার তো মহা অস্বস্তি। সবাই এঁচোড়ে পাকা বলে বটে, কিন্তু একটা অচেনা ছেলের সামনে এইভাবে প্রথমেই...।

পরে বুঝেছি খুকিদির তরফ থেকে সেটা ছিল একটা সাবধান বাণী। ছোট দেখিয়া হেলাফেলা করিও না। পস্তাইবে।
 
ছেলেটা অবশ্য পাত্তা দিল না। কোমরে হাত দিয়ে সোজাসুজি তাকিয়ে বললো,

- তুমি রিফিউজি দেখবা ? সাবধানে আসো, নদীপাড় এইখানে বড় ঢালু।
 
সে আমাদের টাউনের ভাষা নকল করবার চেষ্টা করছিল, কিন্তু তার কথায় পরিষ্কার অচেনা টান ছিল। কিন্তু সবসময় হাসি হাসি চোখদুটো দেখে ভালো লেগে গেল। তার হাত ধরে তরতর করে নেমে গেলাম বালুচরে। পিন্টুদা, খুকিদি ছেলেটাকে এই নামেই ডাকছিলো, ঘুরিয়ে দেখালো শরণার্থীদের ক্যাম্প, কতো লোক সেখানে, বালির ওপর সার সার শুকোচ্ছে শাড়ি জামা কাপড়, বাচ্চারা কলকল করছে, বৌয়েরা রান্নার যোগাড়ে ব্যস্ত। তাদের সব কথা বুঝতে অসুবিধে হচ্ছিল, এছাড়া আর কোনো তফাত তো আমার চোখে পড়ল না। তাহলে এদেরকে রিফিউজি বলার মানেটা কী! একজন দাড়িওয়ালা দাদুগোছের লোক আমার চুল একটু ঘেঁটে দিয়ে বললো, আমার আমিনার লাহান বড় বড় চক্ষু ! ডাঙর মাইয়া, তারে আর ফিরা পাব কিনা আল্লা জানে !
 
বুড়ো মানুষটির চোখ ছলছল করে, আমি তাড়াতাড়ি অন্য দিকে তাকাই।
 
দূরে টেবিল চেয়ার নিয়ে বসে আছে এক খাকি উর্দি। সামনে খাতা পেন।
 
সেদিকে তাকিয়ে আছি দেখে পিন্টু বলল,

-নতুন লোক তো রোজই আসতেছে, তাদের নামধাম ল্যাখার ব্যবস্থা।
 
খুকিদি হঠাৎ বললে,
 
- পিন্টুদা, জিনিসটা পাঠাইতে পারছেন ?
 
পিন্টু একবার আমাকে দেখে নিল। তারপর বলল, পরে বলতেছি।
 
কী জিনিস কে জানে বাবা, আমার নজর ততক্ষণে নদীর চরে লাথি মেরে ধুলো ওড়ানো বাচ্চাগুলোর দিকে। খুকির হাতে টান মেরে বলি, যাই ? এখুনি চলে আসব।

খুকি চোখ বড় বড় ক'রে না বলে। পাঁচটা বাজে। আমাদের ফিরতে হবে।
 
ফিরে এসেছিলাম নির্বিঘ্নেই। কিন্তু মাঝরাতে ঝড়টা উঠলো। ভয় করছিলো, কারণ ঘন ঘন মেঘের ডাক, বজ্রপাত, শিলাবৃষ্টি, সবই হচ্ছিল। তবে আকাশ ফুঁড়ে নয়। চোখে আঁচল চেপে খাটে বসে থাকা মা, আর মেঝেয় দাঁড়িয়ে ভীষণ ক্রুদ্ধ বাবার মধ্যে।
 
- মা বারণ করা সত্ত্বেও তুমি খুকির সঙ্গে ওকে পাঠালে? কী জানো তুমি, কতটুকু জানো ?
 
মা একটা কিছু বলতে গেলে, বাবার গলা আবার বজ্রের মতো ফেটে পড়লো,
 
- বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ লড়ছে এমন কিছু মুক্তিসেনা লুকিয়ে আছে ঐ ক্যাম্পগুলোতে। অস্ত্র চালান করা, আন্তর্জাতিক রেডিও স্টেশন অপারেট করা, সবেতে আছে ছেলেগুলো। শিতলখুচি বর্ডার দিয়ে ওরা পারাপার করে। আজ যাদের দেখছো, কাল গেলে দেখবে তাদের মুখগুলো পালটে গেছে। সে যাক, ওদের দেশের স্বাধীনতার লড়াই ওরা কেমনভাবে লড়বে ওরা বুঝবে। কিন্তু খুকি...
 
- খুকি কী ? খুকি কেমন কইরা আসলো এইসবের মধ্যে ?

মা ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করে।
 
- শোনো, তোমার খুকি না হাতে এতোদিন হাতকড়া পরতো, যদি ইন্দিরা গান্ধীর হুকুমে পুলিশ অন্যদিকে তাকিয়ে না থাকতো। রিলিফ দেবার নাম করে চরে যায়, ছেলেগুলোর সঙ্গে মেলামেশা করে। একটি মুসলমান ছেলের সঙ্গে নাকি সম্পর্কও হয়েছে। সারা টাউনে ঢি ঢি পড়ে গেছে তো। আর তার সঙ্গে তুমি মেয়েকে পাঠিয়ে দিলে!
 
- তাই কী হইছে! এত্তটুকু একখান মেয়ে আমার...
 
বাবা লাফ দিয়ে মায়ের সামনে চলে আসে। আঙুল নাচায় নাকের ডগায়,
 
- ব্যাস ব্যাস আর কথা নয়, এনাফ ইজ এনাফ। আমার হুকুম, ঐ খুকিকে তুমি কালকেই জবাব দেবে।
 
আমি ঘুমের ভাণ করে পড়ে থাকি, কিন্তু হু হু করে চোখের জল অসাড়ে বয়ে যায়। খুকিদি ও খুকিদি, আমি তোমার কাছেই পড়তে চাই।
 
পরের দিন খুকি পড়াতে আসে না। তার পরের দিনও না। মায়ের চোখকে ফাঁকি দিয়ে দুপুরবেলা থানাপাড়ায় তার বাড়িতে গিয়ে হাজির হই। খুকিদির চোখের নীচে গাঢ় কালি। আমাকে দেখে খুব খুশি হয়, নিজের মা-কে চেঁচামেচি করে ডাকে, দ্যাখো মা, কে এসেছে, আমার সেরা ছাত্রী। শরীরটা একটু খারাপ হয়েছিল রে। তাই দুদিন পড়াতে যেতে পারিনি।

বলে উঠতে পারি না তাকে বাবার সিদ্ধান্তের কথা। তার আগেই খুকি বলে,
 
- চ, টুনু, তোকে একটা জায়গায় নিয়ে যাই।
 
আমার মা তো এখনো ঘুমোচ্ছে। যাওয়া যেতেই পারে। আর কখনোই এরকম সুযোগ হবে না হয়তো। আগেও খুকিদির সঙ্গে অনেক টো টো করে বেরিয়েছি। কিন্তু তখন সবকিছু অন্যরকম ছিল। রিফিউজিরাও ছিল না। খুকিদির বাড়ির পেছনের পরিত্যক্ত রেল লাইনে বসে কতো দুপুর গেছে কাঁটা ফল কেন আঁকশির মতো আঁকড়ায় সবকিছুকে, কাপাস তুলোর বীজ কেন উড়ে বেড়ায় এইসব হাতেকলমে দেখে। আজ সেখানে বসেই মহা পাকা আমি দাঙ্গার গল্প শুনলাম, মুক্তিযুদ্ধের কথা জানলাম। আধিপত্য আর অপশাসনের বিরুদ্ধে লড়তে গিয়ে এতো প্রাণ যাচ্ছে, এতো দুর্দশা চারদিকে, হিন্দু মুসলমান শুধু নামে, আসলে সবাই মানুষ, এইসব বলতে বলতে খুকিদির চোখমুখ খুব উজ্জ্বল হয়ে উঠছিল। সামনের ধানখেতে ঠান্ডা বাতাস বইছিল। এতো শান্ত চারধার, পৃথিবীর কোনো ভূখণ্ডে রক্তপাত হচ্ছে, বাঁচতে চাওয়া মানুষ সীমান্ত পেরিয়ে দলে দলে ঢুকে পড়ছে প্রতিবেশী দেশে, এমন কোনো সংকেত ছিল না চরাচরে।
 
তবু গল্পের মাঝখানে পিন্টু আর একটা অচেনা ছেলে এলো, তারা জানতো খুকিদিকে এখানেই পাওয়া যাবে। কাপড়ে মোড়ানো ভারী কিছু তারা রাখতে দিল খুকিদিকে। আজকেই এই টাউনে তাদের শেষ দিন। ফিসফিসিয়ে কিছু কথা, খুকিদি চোখ নামিয়ে বসে থাকলো কিছুক্ষণ, তারপর উঠে দাঁড়িয়ে পিন্টু আলমের সঙ্গে গলা মেলালো, জয় বাংলা।
 
পলাতক মুক্তিযোদ্ধাদের আস্তানা হয়ে উঠছিলো একাত্তরের সেই শান্ত মফস্বল আর খুকিদি হলো তাদের সমর্থক ও খাবার-যুগিয়ে। সবার চোখের আড়ালে কী করে যে সে এই কাজগুলো ক'রে যেতো, ততোদিনে লম্বায় খুকির কাঁধসমান হয়ে গেলেও তা আমি বুঝিনি। খুকি বলেছিল, নিজের দেশ, ভিটেমাটির জন্য যারা লড়াই করে,মেয়ে পুরুষ, হিন্দু মুসলমান ভেদ করে না, তারা সব হিরো। বাংলাদেশ স্বাধীন হবার সময় হয়ে এসেছে, তাই পিন্টুর মতো আহত মুক্তিযোদ্ধারা ব্যান্ডেজ বাঁধা হাত পা নিয়েই দৌড়চ্ছে দ্যাশের দিকে। পেছনের কোনো টান আর টানই নয় তখন।
 
খুকিদির চোখ খটখটে শুকনো হয়ে গেলে আমি উঠে আসবার জন্য উসখুস করছি, ঠিক এইসময় চারপাশে একটা কী যেন ঘটতে লাগলো। একটা অচেনা বাতাস অনেকক্ষণ থেকে খুকির কপালের ওপরের গোল্লাপাকানো কোঁকড়া চুলের গুছিটি নিয়ে খেলে যাচ্ছিল। হঠাত তার দমক বেড়ে গেল। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে পুরো ধানখেতের মাথা নাড়ানো। অদ্ভুত একটা সড়সড় শব্দ সামনে পেছনে পাশে দূরে। খুকিদি আমার হাত শক্ত ক'রে ধরে বললো, চুপ করে বোস। সেদিন জিজ্ঞাসা করেছিলি পরাগমিলন কী ভাবে হয়। সেজন্যেই ক'দিন হলো তোর কথা ভাবছিলাম। ভাগ্য ভালো থাকলে আজ দেখে নিবি, আর কোনদিন ভুলবি না।
 
হাওয়া বাড়তে লাগলো, আর কিছুক্ষণ বাদে অবাক হয়ে দেখলাম এক একটি ধানগাছের একাধিক শিষে থরে থরে সাজানো প্রত্যেকটি নৌকাকৃতি ধানের দানা দুভাগে খুলে গেছে । প্রত্যেকটির ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে ঝুলছে, বাইরে দুলছে, দোল খাচ্ছে ডাঁটিসহ একাধিক সাদা ধানফুল। হাওয়ায় উথাল-পাথাল দুলছিল নিষিক্ত হতে চাওয়া সেই অজস্র জেদি সাদা ভ্রুণ। খুকিদি বললো, আর যেন কল্পনাতেও দেখতে পেলাম, ভেতরের পরাগথলি থেকে মিহি পরাগের গুঁড়ো আশির্বাদের মতো নেমে আসছে তাদের ঢেকে দিতে। বাতাসে সে কী সুগন্ধ !
 
কতোক্ষণ এই অলৌকিক দৃশ্যের সাক্ষী ছিলাম কে জানে, দশ মিনিট না আধ ঘন্টা, ঘোর কাটতে দেখে দুভাগ হয়ে যাওয়া সব ধান জুড়ে গেছে। হাওয়া পড়ে গেছে। নিষিক্ত ভ্রূণ গর্ভে নিয়ে শান্ত হয়ে গেছে সব গাছ। এবার শুধু সন্তানদের পুষ্ট করে তোলবার পালা।
 
ধানগাছ যদিও স্বয়ংসম্পূর্ণ উদ্ভিদ, তার পরাগথলি, পরাগমিলন, ভ্রূণ, সবই তার নৌকাকৃতি দানার শরীরের নিজস্ব ঘেরে, তবু সেইদিন খুকিদির কল্যাণে সৃষ্টিরহস্যের অনেকটাই যেন নাগালে এলো।

চোখে চোখ রেখে অদ্ভুত গলায় খুকিদি বলল, ধ্বংস নয় রে, নতুন কিছু করতে চাওয়া, নতুন সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষাই সব।
 
পাশের ভারী থলেটা সে তুলে নিল, বাড়ির দিকে যেতে যেতে বলে গেল, এবার তুই পালা।
 
পাশের বাড়ির কাকি দাঙ্গার গল্প এতো বলতো, একা থাকলেই যেন সেইসব শব্দ ঘূর্ণিঝড় তুলতো মনের মধ্যে। কোথায় পটপট করে ঘর পুড়ছে, গোয়ালে বাঁধা গাভীটির মৃত্যু চিৎকার, অসংখ্য মানুষের কলরব, কান্না, সব যেন শুনতে পেতাম। আজ অজস্র ধানের পরাগ ঝরাবার শব্দ কানে নিয়ে ফিরতে ফিরতে দুটো ব্যাপার কেমন যেন জেনে গেলাম। দাঙ্গার ঐ দৃশ্যকল্প আমাকে আর কখনো বিরক্ত করবে না। খুকিদি আমাকে আর কোনদিনই পড়াতে আসবে না।
---------------------------------------------
  পূর্ব প্রকাশিত :১৫ এপ্রিল ২০২১ গুরুচণ্ডালি
 
 
লেখক পরিচিতি:

প্রতিভা সরকার

কথাসাহিত্যিক। প্রাবন্ধিক।

কলকাতায় থাকেন।



1 টি মন্তব্য:



  1. মুক্তিযুদ্ধের গল্পগুলো এরকমই রক্তাক্ত, বারুদের সৌরভমাখা ও স্মৃতিময়, ইতিহাস সাক্ষী।
    প্রিয় কবি শক্তিদত্ত রায় পাঠের শুরুর দিকে তার একটি লেখায় শৈশবকথনে ছিল "রিফিউজি, রিফিউজি" খেলা।
    এইগল্পটি পড়তে পড়তে হঠাৎ শক্তিদির শৈশবের সত্যিগল্পটির কথা মনে পড়লো, এটিও কি ভীষণ বাস্তবঘেঁষা।

    "এই যুদ্ধ তো ধর্ম যুদ্ধ না, ...পাকিস্তানিরা বাঙালি গো পিষা মারতে চায়!"

    ঠিক তাই। এটি আসলে ঠিক জাতিগত যুদ্ধও নয়।
    অতিসংক্ষেপে, ১৮৫৭ র সিপাহী বিদ্রোহে, বা আরও অতীত বিদ্রোহকালে যার সূচনা, ১৯৫২ র ভাষার যুদ্ধ, ১৯৬৬ এর ছয় দফা, ১৯৬৯ এর ছাত্র- গণঅভ্যুত্থান আর ১৯৭০ এর একদফা পেরিয়ে তবেই এই ১৯৭১এ "বাংলাদেশ" স্বাধীন করার লড়াই, বাংগালী জাতির মুক্তির সংগ্রাম।
    আবার একই সংগে এই যুদ্ধে জাতিগত, অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও শ্রেণি শোষণ থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষাও তীব্র, একইসাথে এটি মুক্তিযুদ্ধও।
    এ কারণে মুক্তিযুদ্ধে ভিন্ন ভাষাভাষী আদিবাসী মানুষও ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, বাংগালীর পাশাপাশি তারা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছে, জীবন দিয়েছে অকাতরে।
    এই অর্থে বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীতেও মুক্তিযুদ্ধ শেষ হয়ে যায়নি, এটি বহমান প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে। আর মুক্তিযুদ্ধের মূলনীতি ছিল "সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা"; এর কোনোটিই শতভাগ অর্জিত হয়নি বলে মুক্তি যুদ্ধের শেষ নাই।

    "ধ্বংস নয় রে, নতুন কিছু করতে চাওয়া, নতুন সৃষ্টির আকাঙ্ক্ষাই সব।"

    ঠিক তাই। কিশোরী টুনুর চোখে চোখ রেখে বলা খুকিদির এই কথন অমোঘ উচ্চারণের মতো মনে হয়েছে।

    ব্যক্তিগত স্বীকারোক্তি জানাই, এপারে চণ্ডালের জন্ম মুক্তিযুদ্ধেরকালে, একারণেই তার নাম "বিপ্লব"; শুধু তাই নয়, প্রজন্ম ৭১ এর অজস্র নামকরণ " নিশান", "মুক্তি", " স্বাধীন", "সবুজ", " জয়", "বিজয়", " নবীন", "কচি", "প্রভাত" ইত্যাদি। অর্থাৎ পূর্বসূরিরা এইসব নামকরণে তাদের আগামীর শুভ স্বপ্ন দেখেছিলেন নব প্রজন্মে।
    আর আমরা যারা প্রজন্ম ৭১, তারাও মুক্তিযুদ্ধকে চিনে নিতে চাই, ভিডিও ক্লিপিং, প্রামাণ্যচিত্র, সিনেমা, দলিলপত্র, ইতিহাস পাঠ, স্মৃতিচারণ, এইসব গল্প কথনে।
    সেদিক থেকে এইসব লেখার মূল্য অসামান্য।

    নতুন দেশের অভ্যুদয়েরকালে ধানের পরাগায়নের বর্ণনায় কঠিন বাস্তবতায় টুনুর হঠাৎ সাবালকত্ব অর্জন গল্পটিকে অভিনব মাত্রা দিয়েছে।
    "গল্প পাঠ" সংস্করণ অনেক শাণিত মনে হয়েছে।
    ব্রেভো প্রতিভা দি, ভালোবাসা ও প্রণাম নিও। 🌷🍂🌿

    উত্তরমুছুন