শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

অমর মিত্রের গল্পঃ বাবুইবাসা


লেখক নিখিল দত্তর পরিবারের কারো খোঁজ জানেন স্যার, আমি ত্রিদিব বলছি ?

ত্রিদিবের মুখে নিখিল দত্তর কথা শুনে একটু অবাক হল সমীর। ত্রিদিব থিয়েটার লাভারস গ্রুপের ছোটখাট এক অভিনেতা। থিয়েটার দলের কাজ নিয়েই ব্যস্ত থাকে। সাহিত্যপাঠ নিয়ে ওর আগ্রহের কথা সমীরণ শোনেনি কোনোদিন। সমীরণের একটি গল্প নাট্যরূপ দিয়ে ওদের থিয়েটারের দল অভিনয় করেছিল, তখন থেকে যোগাযোগ। সমীরণ গল্প ও উপন্যাস লেখে। তার ভালো নাম হয়েছে। প্রকাশক তার কাছে এসে বসে থাকে বই করবে বলে। সেমিনারে ডাক পায় অনেক। ইউনিভার্সিটির সিলেবাসে তার গল্প ঢুকে গেছে। নিখিল দত্ত এককালের নামী লেখক। অসাধারণ প্রেমের গল্প লিখতেন। মানুষে মানুষে সম্পর্ক নিয়ে লিখতেন। তাঁর লেখার পটভূমি ছিল পশ্চিম। এই ঝাঁঝা, শিমুলতলা, গালুডি, রাঁচি, যেখানে দুর্গা পুজোর সময়ই শীত নেমে আসে। নিখিল দত্তর ছেলেবেলা কেটেছে ঐদিকে। বাবা রেলে চাকরি করতেন। নিখিল তাঁর ছেলেবেলার কথা বলতেন তন্ময় হয়ে।সেই পাহাড়ি জনপদ, আদিবাসী গ্রাম, তাদের কুটিরে রঙের প্রলেপ। ওদিকে মিশনারিদের খুব প্রভাব ছিল। তখন ব্রিটিশ আমল। বড়দিনের কথা বলতেন নিখিল। যিশুর কীর্তন। সব মনে পড়ে গেল অনেক বছর বাদে। সমীর তাঁর সঙ্গে তরুণ বয়সে অনেক মিশেছে। সমীরের মনে পড়ে ধুতি এবং পাঞ্জাবি পরিহিত নিখিলদাকে। চোখে কালো ফ্রেমের চশমা। মাথার চুলে ব্যাকব্রাশ। তা পাকেনি। হ্যাঁ, নিখিল দত্তর চুল পাকেনি। তাঁর মায়ের ৮৫ বছর বয়সেও চুল পাকেনি যে তা দেখেছিল সমীর। শীর্ণকায় ছিলেন তিনি। একেবারে শাল গাছের মতো সিধে, টানটান। থিয়েটার লাভার দলের ত্রিদিব তার শরণাপন্ন হয়েছে। লেখক বলতে তাকেই চেনে ত্রিদিব।

সমীরণ জিজ্ঞেস করল, হঠাৎ নিখিলদার খোঁজ করছ যে ?

তাঁর একটি উপন্যাস, “ বাবুইবাসা’’ আমরা নাট্যরূপ দিয়েছি, অনুমতি দরকার, আমাদের নেক্সট প্রডাকশন এইটি।

সমীর বলল, তিনি তো বেঁচে নেই।

ত্রিদিব বলল, তা জানি, কিন্তু তাঁর পরিবারের অনুমতি ব্যতীত নাটকের শো নামাতে পারব না, উনি
কোথায় থাকতেন, মানে ওঁর বাড়ি ছিল?

সমীর বলল, পাইকপাড়ার নর্দার্ন এভিনিউ, ওখানে বেঙ্গল সুইটস বলে একটি মিষ্টান্ন ভাণ্ডার আছে, তার
ঠিক অপজিটে, জিজ্ঞেস করলেই বলে দেবে।

যাব কী করে ?

সমীর বলল, উবার ধরে যাও, পাইকপাড়া নর্দার্ন এভিনিউ লিখবে বুক করার সময়, বেঙ্গল সুইটস জিজ্ঞেস করবে, পেয়ে যাবে,বাগান ঘেরা বাড়ি করেছিলেন নিখিলদা, কত আড্ডা দিয়েছি ব্যালকনিতে বসে, শীতের সময় বাগানে রোদে পিঠ দিয়ে।

আপনি একবার যাবেন স্যার ?

আমি ! আমি কেন ? সমীরণ অবাক হলো।

হ্যাঁ, আসলে লেখকদের বাড়ি যেতে আমার ভয় করে, একবার দীপিতা দেবীর বাড়ি গিয়েছিলাম ওঁকে দিয়ে আমাদের নাট্যোৎসব উদ্বোধন করাব বলে, উনি আমাকে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন ওঁর কোন কোন উপন্যাস আমি পড়েছি, তারপর তারাশঙ্কর, বিভূতিভূষণ নিয়ে জিজ্ঞেস করতে লাগলেন, স্যার আপনি চলুন।

সমীরণ বলল, সে ভয় তোমার নেই, উনি ১৫ বছর চলে গেছেন।

তাহলেও, লেখকের স্ত্রী, পুত্র কন্যা, আমার চেয়ে তাঁরা কত বেশি জানেন, আমি রাজমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়ি গিয়েছিলাম একবার, ওঁর একটা গল্প পছন্দ হয়েছিল আমাদের, তাঁর মেয়ে কী জেরাই না করতে লাগলেন, বললেন স্ক্রিপ্ট ওঁর কাছে নিয়ে যেতে, তিনি পড়ে অনুমতি দেবেন, আমাকে জিজ্ঞেস করলেন গল্পটা আমি কী বুঝেছি, আমি বলতে উনি মন্তব্য করলেন, আমি কিছুই বুঝিনি, আমার মাথায় ঐ গল্প ঢোকেনি, কী অপমান বলুন, তিনি বলেছিলেন, স্ক্রিপ্ট না দেখে অনুমতি দেওয়ার কথাই ওঠে না।

সমীরণ বলল, রাজমোহনের খুব অহঙ্কার ছিল, মনে করতেন, তিনি সকলের চেয়ে শ্রেষ্ঠ, উনি গ্রাহাম গ্রিন,সলবেলো, আর তাঁর সমকালের লেখকরা কিছু নন তাঁর কাছে, মনে করতেন তিনি নোবেল পাওয়ার যোগ্য লেখক, ওঁর মেয়েরাও তাই মনে করে।

ত্রিদিব বলল, আমার ভয় করে লেখকের বাড়িতে যেতে, আমি তত পড়িনি, অবশ্য সব জায়গায় তা হয় না, আপনার কাছে অনুমতি নিতে আমিই গিয়েছিলাম।

আমি তোমাকে পড়া জিজ্ঞেস করেছিলাম ?

ত্রিদিব বলল, না স্যার, বরং আপনি আমাকে একটা বই উপহার দিয়েছিলেন, তার ভিতরে আমার ও
আমার বউ মণিকার নাম লিখে সই করে দিয়েছিলেন, আমরা যত্ন করে রেখে দিয়েছি, কতজনকে দেখিয়েছি, বলি আপনি আমাকে কত ভালোবাসেন!

আমার লেখা পড়ে লোকে ? লেখক সমীরণ বসু জিজ্ঞেস করল।

কী যে বলেন স্যার, আপনার কত পাঠক, আমাদের চন্দনা ম্যাম, বিখ্যাত অভিনেত্রী চন্দনা সরকার আপনার লেখায় মুগ্ধ, আমাকে রিকোয়েস্ট করেছেন কতবার, আপনার বাড়ি একবার যাবেন, জিজ্ঞেস করবেন আপনার লেখা তাঁর জীবনের সঙ্গে এত মিলে যায় কী করে ?

সমীরণের শুনতে ভালো লাগল। সমীরণ এখন সফলতার স্বাদ পেয়েছে। লেখক হিশেবে তার চাহিদা হয়েছে। পুজো সংখ্যায় তার লেখা ছাপার জন্য পত্রিকা সম্পাদক তার বাড়িতে এসে বসে থাকে। সমীরণের প্রকাশিত লেখা আবার ছাপতে রাজি তারা। অথচ সেই অল্প বয়সে সে ভাবেইনি, এই জায়গায় কোনোদিন পৌঁছতে পারবে। এর জন্য সমীরণকে অনেক হিশেব করে এগোতে হয়েছে। সম্পাদক লেখকের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করতে হয়েছে, সম্পর্ক ছিন্ন করতে হয়েছে। মনে পড়ল এসব কথা। নিখিল এখন বেঁচে নেই। খুবই মান্য লেখক ছিলেন নিখিল। ক্ষমতাবান ছিলেন। তিনি এক বড় পত্রিকার সম্পাদক মন্ডলীর প্রধান ছিলেন। গল্প নির্বাচনের দায়িত্বে ছিলেন। সমীরণ বসুর মনে পড়ল তাঁর লেখক জীবনের আরম্ভে, কতবার গল্প জমা দিয়েছেন নিখিলের হাতে। পত্রিকা দপ্তরে নিখিল ছিলেন রাজা। তখন সমীরণ কুড়ি একুশ। শুনেছিল নিখিল দত্তের স্নেহভাজন হলে সে দ্রুত এগোতে পারবে। নিখিল তরুণ লেখকদের খুব পছন্দ করেন। নিখিল লেখক হিশেবেও বড়। তরুণ লেখকরা তাঁকে ঘিরে থাকে। সেই তরুণরা তিরিশ বা তার উপরে। গল্পের আন্দোলন করেছিলেন নিখিল তাদের নিয়ে। গল্পের কথন ভঙ্গী বা ফর্ম বদলে দিতে ডাক দিয়েছিলেন। কত কথা উড়ে বেড়াত নিখিল দত্তকে নিয়ে। প্যান্ট শার্ট,
শীতে শুট, দামী সোয়েটার। ধুতি পাঞ্জাবি পরলে তা-ই বা কত দামী। নিখিল খুব শৌখীন মানুষ ছিলেন। নিখিল খুব ভালো গান গাইতেন। রবীন্দ্রনাথের গান। যাই হোক সমীরণের প্রথম অভিজ্ঞতা ভালো ছিল না। একের পর এক গল্প জমা দিয়েছে, ছাপা হয়নি। নিখিল বলতেন কপি নিজের কাছে রেখে জমা দিতে। তখন ফোটোকপিয়ার মেসিন আসেনি। পরে তা জেরক্স কোম্পানি নিয়ে আসে। তখন কপি রেখে জমা দেওয়া মানে লেখার সময়ে কার্বন কপি করতে হতো। এখন তো হার্ড কপি, প্রিন্টেড কপি দিতেই হয় না। সফট কপি মেইল করলেই হয়। লেখা হারায় না মেল করলে। সমীরণ এখন ফাউন্টেন পেনে লেখে না। ল্যাপটপ তার সঙ্গী। কলকাতার বাইরে গেলেও ল্যাপটপ সঙ্গে থাকে। হ্যাঁ, অচেনা লেখকের লেখা হারিয়ে যেত নিখিল দত্তের সম্পাদকীয় দপ্তর থেকে। সমীরণের অন্তত তিনটি লেখা হারিয়েছে। শোনা যায় নিখিল দত্ত কয়েকটি পংক্তি কিংবা একটি পরিচ্ছেদ পড়েই গল্প জঞ্জালের বাক্সে ফেলে দিতেন। হ্যাঁ, আবার তিনিই তো সমীরণের চতুর্থ লেখাটি বাম হাতে তুলে নিয়ে জঞ্জালের বাক্সে না ফেলে চিঠি পাঠিয়েছিলেন দেখা করার জন্য। সেই চিঠি পেয়ে তার কী উত্তেজনা! নিজহাতে পোস্ট কার্ড লিখেছিলেন নিখিল দত্ত। সমীরণ দুরু দুরু বুকে দেখা করলে নিখিল তাকে বসতে বলে সমীরণের গল্পের পাণ্ডলিপি খুলে দিয়েছিলেন। কয়েকটি জায়গার উল্লেখ করে বলেছিলেন সংস্কার করতে। আবার লিখে
আনতে। গল্পটি তাহলে আরো ভালো হবে। সমীরণ তা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছিল। সেই গল্প ছাপা হলে তার সুনাম হয়েছিল। সে নিখিল দত্ত মশায়ের বৃত্তের ভিতরে প্রবেশ করতে পেরেছিল। তখন নিখিল দত্ত মশায়ের বৃত্তে প্রবেশ করা মানে লেখক হওয়ার পথে এক ধাপ এগোন। কিন্তু সমীরণ বুঝেছিল, তাকে আরো অনেকদূর যেতে হবে। উপন্যাস লিখতে হবে, প্রকাশক পেতে হবে সেই উপন্যাসের। সে ধীরে ধীরে নিখিল দত্তর ঘনিষ্ঠ বৃত্ত থেকে সরে এসেছিল, কিন্তু সম্পর্ক ত্যাগ করেনি।

ত্রিদিব জিজ্ঞেস করে, স্যার যাবেন কি নিখিল দত্তর বাড়ি ?

কী মনে হতে সমীর বলল, যাব, সেই যে চলে গেলেন নিখিলদা, আর যাওয়া হয়নি, শান্তা বউদির সঙ্গে একবার দেখা হয়েছিল একাডেমি মঞ্চে তাঁর জন্মদিন পালনের এক অনুষ্ঠানে। মৃত্যুর পরের বছরে মনে হয়। তারপর আর জানি না।

জন্মদিনের অনুষ্ঠান হয়তো হয়েছে, সে আমন্ত্রিত হয়নি। কিন্তু হলে তার কি কোনো রিপোর্ট বেরত না?
জন্মদিন পালিত হলে সে কি খবর পেত না ? জন্মদিন পালন করবে কারা ? পরিবার ? নিখিলদার পুত্র অরডিনারি কমার্স গ্রাজুয়েট। কন্যা সাহিত্যের ছাত্রী ছিল। নন্দিনী। ছিপছিপে। শ্যামলা মেয়ে। মাথা ভর্তি
কোঁকড়া চুল, কালো হরিণ চোখ। সাহিত্যের পাঠ ছিল খুব ভালো। ভারতীয় এবং বিশ্ব সাহিত্য। তার মুখেই
প্রথম হান্ড্রেড ইয়ারস অফ সলিচিউড ও গ্যাব্রিয়েল গারসিয়া মার্কেজের কথা শুনেছিল সমীরণ। সম্ভবত
১৯৮৫ নাগাদ। লোক্মুখে প্রচলিত ছিল, নিখিল দত্ত তাঁর দপ্তরে জমা পড়া গল্প প্রাথমিক ভাবে নন্দিনীকে
দিয়ে দেখিয়ে নিতেন। নন্দিনী অধ্যাপনা করত। আচমকা হৃদযন্ত্র বিকল হয়ে মারা যায়। খুব বেদনাদায়ক ছিল সেই মৃত্যু। নিউ দিল্লি স্টেশনে ফ্লাই ওভারে উঠতে উঠতে আচমকা বুক চেপে বসে পড়েছিল সে। দম নিতে নিতে ঢলে পড়েছিল নিখিলদার সামনেই। সেই মৃত্যু কাটিয়ে উঠতে অনেক সময় লেগেছিল তাঁর। মৃত্যুচেতনা নিয়ে পরপর কয়েকটি গল্প লিখেছিলেন তিনি। একটি গল্পে ঈঙ্গেমার বারগম্যানের সেভেন্থ সিল ছবির ছায়া পড়েছিল। সেখানে মৃত্যুর সঙ্গে দাবা খেলা নয়, মৃত্যুর সঙ্গে সাঁতার কাটতে কাটতে নিজের কন্যার মৃত্যুকে প্রতিরোধ করতে চাইছে প্রধান চরিত্রটি। মৃত্যুকে আটকে দিয়েছে লোকটি। সেই গল্প তাঁকে শেষ জীবনে খুব খ্যাতি দিয়েছিল। আবার মনে করিয়েছিল সেভেন্থ সিল ছবির কথা। তিনি প্রভাবিত হয়েছিলেন। নিখিল দত্ত তাকে বলেছিলেন, “ আমার সামনে মেয়েটা চলে গেল, আমার প্রথম সন্তান, আমি যেন মৃত্যুকে দেখতে পাচ্ছিলাম সমীরণ, আমার কিছুই করার ছিল না, কী নিষ্ঠুর মুখ তার, নিয়ে গেল, নিয়ে গেল……”।

নিখিল দত্তর কথা কতদিন বাদে মনে করছে সমীরণ রায়। নিখিল দত্তর বই সংগ্রহ ছিল ঈর্ষণীয়। দোতলা
বাড়ির একতলার ১৫০০ বর্গফুটে একটি বসার ঘর, বাকি সবই বইয়ে ভর্তি। দেওয়ালজুড়ে তাক। বইয়ের পাশে বই। সাজিয়ে দিয়েছিল তাঁর অনুরাগী এক এক গ্রন্থাগারিক। ক্লাসিকের সংগ্রহ, দেশি বিদেশি লেখকদের অনুবাদ, ইংরেজি ভাষার বই কত! নিখিল তার শিক্ষকের ভূমিকা পালন করেছিলেন। কত বই তাকে পড়তে বলতেন। শিক্ষকের কাজ করেছিলেন নিখিল। তখন তার আরম্ভের দিন। কোন বই পড়তে হবে, তা বলে, তাক থেকে বের করে দিতেন নিখিল। লেখা এবং পড়া, দুই নিয়েই থাকতে হয় লেখককে। সমীরণের মনে হলো সে নিখিল দত্তর বাড়ি যাবে। সেই লাইব্রেরি, ঘরে ঘরে বই, গল্প উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ, দেশি বিদেশি…...বই আর বই, ভালো বই ভালো বই। তার নিজের বইও ছিল তার ভিতরে।
ত্রিদিব বলল, দুদিন বাদে রবিবার, বিকেলে সে গাড়ি নিয়ে আসবে, নিয়ে যাবে সমীরণকে।

এল ত্রিদিব। সমীরণ গড়িয়ায় থাকে। গড়িয়া থেকে ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাস ধরে অনেকটা পথ পাইকপাড়া। দক্ষিণ থেকে উত্তর। মধ্যে বিধান নগর রোড ষ্টেশন, একটি খালের পাশের রাস্তা, বেলগাছিয়া রেলওয়ে ব্রিজ, বাম দিকে জলাধার, টালা পার্ক…...সব বদলে গেছে। বাইপাসে বড়বড় বিজ্ঞাপনের হোরডিং। হাস্যোজ্জ্বল রঙীন মুখেরা শহরের চেহারা বদলে দিয়েছে। দূরে, বহুদূরে উপনগরের বহুতল। রাস্তার ধারে বড় বড় অফিস বিল্ডিং, শপিং মল। ধাপার পাহাড়। পাহাড় নয় জঞ্জাল। কলকাতার সব জঞ্জাল ধাপায় গিয়ে পাহাড় হয়ে গেছে। কতদিন সমীরণ এদিকে আসেনি। এখন বেরোন হয় কম। লেখা পাঠায় মেল করে। কিংবা পত্রিকা অফিসের লোক এসে নিয়ে যায়। সমীরণের অচেনাই লাগছে এই মহাসড়ক। এখন সভা-সমিতি ব্যতীত যায় কোথায়? বেড়াতে। মধুপুর যশিডি, হাজারিবাগ, কিংবা গোপালপুর চিল্কা হ্রদ, অজন্তা, ইলোরা। বিদেশেও।আমেরিকা গিয়েছিল গত বছর। মার্চের শেষেও ভার্জিনিয়ার পথের দুপাশ তুষারাচ্ছন্ন দেখেছিল সে। সব গাছের পাতা ঝরে গেছে। কত নির্জন সেই পথ! আমরা অমন নির্জনতা পাব না। ১৩০ কোটি মানুষ। পথে ঘাটে, বনে জঙ্গলেও মানুষ গিজগিজ করছে। নিখিল দত্তর বাড়িটি ছিল সুন্দর। সামনে ফুলের বাগান ছিল। পেছনে কেরল দেশীয় নারকেল গাছ, পেয়ারা, জামরুল, আমের ছায়া। কতদিন এসে দেখেছে নিখিল দত্ত সামনের বাগানে ডেক চেয়ারে আধশোয়া হয়ে বই পড়ছেন। একদিন, সেই তার লেখালেখির আরম্ভের দিনে দেখেছিল তারই সদ্য প্রকাশিত গল্প সংকলন, “ মাঠ ভাঙে কালপুরুষ” পড়তে। সমীরণ বইটির প্রচ্ছদ দেখে একটু তফাতে দাঁড়িয়েও চিনতে পেরেছিল। আহা অমন সুন্দর মুহূর্ত সেইটুকু জীবনে যেন আর কখনো আসেনি। সমীরণ দাঁড়িয়েই ছিল। একটি গল্প পড়া শেষ করে মুখ তুলেছিলেন তিনি। পায়জামা, পাঞ্জাবি, শাদা শাল গায়ে নিখিল দত্তকে বড় আপনার মনে হয়েছিল সেদিন। নবীন লেখকের বই কে পড়ে ! সেই বই এখন তার কাছে একটি কপিও নেই। প্রথম বই। মনে পড়ছিল সমীরণের। সেই নর্দার্ন এভিনিউ, বেঙ্গল সুইটস, টালার বিখ্যাত জলাধার, সব স্পষ্ট মনে নেই। বেঙ্গল সুইটসের ডানদিকের রাস্তা। না এসে ভুলে গেছে পথ। সব অন্যরকম লাগছে। জিজ্ঞেস করে করে সেই বেঙ্গল সুইটসের সামনে পৌঁছল তারা। মিষ্টান্ন ভান্ডারের মুখোমুখি রাস্তার শেষে সেই দোতলা বাড়ি। কই ? গাড়ি থেকে নেমে সমীরণ বেঙ্গল সুইটসে গেল। মিষ্টি নেবে বউদির জন্য। কত বয়স হতে পারে এখন ? পঁচাত্তর। নিখিলদার চেয়ে বছর বারোর ছোট ছিলেন। বেঁচে থাকলে নিখিলদা এখন সাতাশী-অষ্টাশী। কত দিন চলে গেছে। মস্ত একটি বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। বাড়ির নাম ছিল বাবুইবাসা। বাবুই ছিল তাঁর কনিষ্ঠ সন্তানের নাম। পুত্র। বাড়িটি কি ঐটি, না তার ভুল হচ্ছে ? মিষ্টান্ন ভান্ডারকে নিখিল দত্তর বাড়ির কথা জিজ্ঞেস করতে, তিনি জিজ্ঞেস করলেন সমীরণ তাঁর কে হয়? কেউ হন না, লেখকের বাড়ি এসেছে সে তাঁর পরিবারের খোঁজ নিতে
সমীরণ তার নাম বলতেই, দোকানের কর্মচারী জিজ্ঞেস করল, আপনিও স্যার লেখক, আমি টেলিভিশনে
আপনাকে দেখেছি মনে হয়।

তারপর সে ঈষৎ বিস্মিত হয়ে বলল, ওঁরা তো এখানে নেই স্যার, ওই দেখুন আটতলা বিল্ডিং, সেই জমির উপর, প্রমোটিং হয়েছে।

নেই! প্রায় আর্তনাদ করে ওঠে সমীরণ, বাবুইবাসা ভেঙে ফেলেছে ?

ইয়েস স্যার, তিন কোটি টাকার ডিল হয়েছিল, রাইটার স্যারের মৃত্যুর বছর পাঁচ বাদে, তারপর সবাই চলে যান।

ত্রিদিব জিজ্ঞেস করল, কোথায় গেছে, ঠিকানা ?

তা জানি না স্যার, কত বাড়ি ভাঙা পড়ছে, বাড়ি ছেড়ে সব চলে যাচ্ছে লরিতে জিনিশপত্র নিয়ে, আমার বাড়ি এই পাইকপাড়াতেই, এখানে পুরোন কোনো বাড়িই নেই প্রায়, ঝড় উঠেছে স্যার, উন্নয়নের ঝড়।

আর কোনো কথা হয় না। সমীরণ একবার ভাবে যায় বহুতলটির সামনে। সেই বাড়ি, বাগান, বাবুইবাসার লাইব্রেরি, মন খারাপ হয়ে গেল। না এলেই হতো।

ত্রিদিব জিজ্ঞেস করল, কী করব স্যার ?

সমীরণ ফিরতে ফিরতে কোনো কথারই জবাব দিল না। বাড়ি পৌঁছতে সেই অন্ধকার আর আলোয় ঝলমল ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাইপাস পার হতে কত সময় যে লাগল। জ্যাম। মানুষে মানুষে ছয়লাপ। কত মানুষ। এদের ভিতরে নিখিল দত্তর পরিবার, শান্তা বউদি আর বাবুই মিশে গেছে। মিশে কি গেছে ? তিন কোটি টাকার চুক্তিতে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে সব নিয়ে। নিয়ে গেছে সেই সব বই, সেই সব পাঁচমুড়ার ঘোড়া, হাতি। শান্তা বউদি খুব পড়তেন। বাবুই অবশ্য সামনে তেমন আসত না। কথা কম বলত। বাবুইয়ের বিয়ের সময় এক জোড়া পাঁচমুড়ার ঘোড়া উপহার দিয়েছিল সমীরণ। কত বড় ছিল সেই আয়োজন। বাড়ির সামনের চওড়া রাস্তা জুড়ে প্যান্ডেল হয়েছিল। রাস্তাটি গাড়ি চলাচলের নয়, এবং ওই বাড়ির সামনে গিয়েই থেমে গেছে বলেই সম্ভব হয়েছিল। গড়িয়ায় পৌঁছে সমীরণ বলল, কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে অজন্তা প্রকাশনীতে খোঁজ করো, ওঁদের কাছেই তো নিখিল দত্তর সব বই।

দিন কয় বাদে আবার ত্রিদিবের ফোন, স্যার খোঁজ পেয়েছি, নিউ টাউনে কোওপারেটিভ ফ্ল্যাট পেয়েছে ছেলে, সেখানে থাকে, আপনি যাবেন তো স্যার, লেখকের বাড়ি একা যেতে কেমন লাগে !

নিউ টাউন সল্টলেক সিটি পেরিয়ে। নতুন নগর পত্তন হয়েছে। সরকার সস্তায় জমি দিয়েছে বসতবাটির নানা সমবায় সমিতিকে। সেখানে সব বহুতল। খাস কলকাতা, গড়িয়া, পাইকপাড়া যেমন জনাকীর্ণ, এই নতুন টাউনশিপ তা নয়। পরিকল্পিত নগর। ভারি সুন্দর এই পরিকল্পনা। সেই যে হাউজিং কোওপারেটিভ, তার বিস্তার অনেক। খুঁজতে হলো এফ-ব্লক। এখন বিকেল। রবিবার। ত্রিদিব ফোন করে আজই সময় নিয়েছে। ফোন নং পেয়েছিল প্রকাশকের কাছ থেকে। নিঝুম বিকেলে তারা লিফট বাহিত হয়ে সেভেন্থ ফ্লোরে উঠল। ফ্ল্যাটের দরজার মাথায় লেখা রয়েছে বাবুইবাসা। বুক ধক করে উঠল। বাবুইবাসার বাগানে বসে নিখিল দত্ত তার প্রথম গল্পের বই, “মাঠ ভাঙে কালপুরুষ” পড়ছেন, ভাবতেই এখন গায়ে কাঁটা দেয়। ডোর বেলে আঙুল ছোঁয়ায় ত্রিদিব। সমীরণের মনে হলো, পায়জামা পাঞ্জাবি পরিহিত নিখিল দত্ত এসে দরজা খুলবেন। আরে সমীরণ, তুমি! কতকাল তোমাকে দেখিনি সমীরণ, তোমার এখন কত নাম, আমাকে কি ক্রমশ সকলে ভুলে যাচ্ছে, আমি কি কিছুই লিখিনি সমীরণ!

মৃত্যুর পর নিখিল যেন এখানে এসে উঠেছেন। সমীরণ তার প্রথম বই “মাঠ ভাঙে কালপুরুষ”-এর সেই কপিটি চেয়ে নেবে বাবুই-এর কাছ থেকে। নিজের কাছে রেখে দেবে কপি। প্রথম বই প্রথম সন্তানের মতো। নিখিল দত্ত প্রথম সন্তান হারিয়ে এক বছর প্রায় কিছুই লিখতে পারেননি। দরজা খুলল যে সে তো সত্যিই নিখিল দত্ত। বাবুই পরিণত বয়সে একেবারে বাবার মতো হয়ে গেছে। প্যান্ট হাওয়াই শার্ট, চোখে দামি ফ্রেমের চশমা। বাবুই আহ্বান করল তাদের। সমীরণ বলল, আমি পাইকপাড়ার বাড়িতে খুব যেতাম, আমার নাম সমীরণ দত্ত, চেনা যাচ্ছে।

বাবুই হাসে, চিনেছি, বসুন, আপনিও কি নাটকের দলে আছেন, অ্যাক্টর ?

সমীরণ অবাক। তার মুখ অন্ধকার হয়ে গেল। বাবুই তার নামই জানে না। সমীরণ কিছু বলার আগে ত্রিদিব তার পরিচয় দিতে বাবুই বলল, অনেকদিনের ব্যাপার, ভুল হয়ে গেছে, স্যরি।

শান্তা বউদি?

মা চলে গেছেন বাবার চার বছর পর, তারপরই আমরা চলে আসি, মা ওই বাড়ি ছেড়ে আসতে চাইছিলেন
না, চা না কফি ?

ত্রিদিব তখন তার সাইড ব্যাগ থেকে টাইপ করা অনুমতিপত্র বের করল, আর দশ হাজার টাকার একটি চেক। বাবুইয়ের স্ত্রী এসে দাঁড়িয়েছে। বাবুই আলাপ করিয়ে দিল। তাদের একটি সন্তান, দারজিলিং বোর্ডিং  ইস্কুলে পড়ে। তারা বছরে একবার যায়, সেও আসে সামারে, ক্রিশমাসের ছুটিতে। কী করে বাবুই? বাবুই বলল, ঘরে বসে ইনকাম ট্যাক্স, জি এস টি, একাউন্টসের কাজ করে সে। বাবুইয়ের স্ত্রী গোপা একটি কনভেন্ট ইস্কুলে পড়ায়। অনুমতি নেওয়া হয়ে গেল। কফি মুখে ছুঁইয়ে সমীরণ বলল, আপনার বিয়ের সময় আমি বড় বড় দুটি পাঁচমুড়ার ঘোড়া এনে দিয়েছিলাম, আছে?

বাবুই হাসে,বলে, শিফটিঙের সময় সব আনা যায়নি।

আমি এসেছিলাম আপনাদের সেই বিখ্যাত লাইব্রেরিতে রাখা আমার প্রথম বইটি যদি পাই, আমার কাছে নেই,

…, বই কোথায় আছে, নিখিলদার সেই সংগ্রহ ?

বাবুই বলল, আনা যায়নি, আমরা ফারনিচারস নিয়ে এসেছিলাম শুধু, তাও সব না, বাকি সব রেখে এসেছিলাম, প্রমোটার যা করার করেছে।

বই!

হ্যাঁ। বাবুয়ের স্ত্রী বলল, আমাদের এগারশো স্ক্যোয়ার ফিট ফ্ল্যাটে ওসব এনে রাখব কোথায়...।

সমীরণ আর বসেনি। প্রমোটারের হাতে জ্ঞানভান্ডার সঁপে দিয়ে বাবুই তার বাসা বদল করেছিল। তার প্রথম বই, হারানো বইও ছিল তার ভিতরে। সমীরণ আর ত্রিদিব ফিরছিল মহাসড়ক দিয়ে। ইস্টার্ন মেট্রোপলিটন বাই পাস। নিজ মনে বিড়বিড় করছে সমীরণ, “হেরে গেলেন নিখিলদা, হেরে গেলেন। মৃত্যুর সঙ্গে সাঁতরে শেষ পর্যন্ত দম ফুরিয়ে ফেললে গো নিখিলদা”!

বাইপাসের ডান দিকে বহুদূর অন্ধকারে ধাপার মাঠ। কলকাতা শহরের সব জঞ্জাল সেখানে জমে জমে পাহাড়। অন্ধকারে সেই পাহাড়ে আগুন জ্বলছে। আগুনে পুড়িয়ে নিঃশেষ করে দেওয়া হয় বাতিল সামগ্রী। বই। পাঁচমুড়ার ঘোড়া। প্রমোটার তিন লরি বই এনে ধাপার মাঠে ফেলে আগুন জ্বালিয়ে ফিরে গিয়েছিল একদিন। ৪৫১ ডিগ্রি ফারেনহাইট তাপমাত্রায় বই পুড়ছিল। রে ব্র্যাডবেরির বই নিখিল দত্তই তাকে পড়িয়েছিলেন প্রথম। তার প্রথম বই “মাঠ ভাঙে কালপুরুষ” পুড়ছে। রে ব্র্যাডবেরি পুড়ছে। বইগুলি নষ্ট করতেই যেন বাড়ি ভেঙে এমন বহুতল নির্মাণ যার কোনো তলেই কোনো বই নেই। সেই আগুন জ্বলছে ওই দূরে জঞ্জালের পাহাড়ে। সমীরণের মনে হয়, তার বইই পুড়ছে। সমীরণ নিজের প্রথম বইটির নাম উচ্চারণ করতে করতে প্রজ্জ্বলিত পাহাড় পার হয়ে যেতে থাকে। যেতেই থাকে। পাহাড়ও বইয়ের আগুন নিয়ে চলতে থাকে তার সঙ্গে।



লেখক পরিচিতিঃ
অমর মিত্র
সাহিত্য অকাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত কথাসাহিত্যিক


৪টি মন্তব্য:

  1. অপূর্ব। এভাবেই অবহেলায় আমরা আমাদের শিকড় হারিয়ে ফেলছি।

    উত্তরমুছুন
  2. এই মন্তব্যটি লেখক দ্বারা সরানো হয়েছে।

    উত্তরমুছুন
    উত্তরগুলি
    1. উন্নয়নের গগনচুম্বি বহুতলের তলে এভাবে চাপা পড়ছে আমাদের সুকুমার বোধবুদ্ধি।

      মুছুন
  3. লেখক এই দেখলেন গল্পটি। তিনি কেন সরাবেন?

    উত্তরমুছুন