শনিবার, ১৫ মে, ২০২১

শাহাব আহমেদ'এর ধারাবাহিক উপন্যাস: পেরেস্ত্রোইকা মস্কো ও মধু




১৬ তম পর্ব

এক দুর্বিসহ অনন্তকাল শুয়ে আছে কদর্য ভাল্লুকের মত হাত-পা ছড়িয়ে। মাথা নীচু করে ঘোলা চোখে পিট পিট করে তাকাচ্ছে আলিওনার দিকে। একটু আগে এক মহিলা ঝাঁঝালো ব্লিচ দিয়ে পরিস্কার করে গেছে নিউরো-সার্জারি হাসপাতালের করিডোর ও ওয়েটিং রুম। কতক্ষণ কেটে গেছে খেয়াল নেই।একা বসে আছে আলিওনা। আশেপাশের সবগুলো চেয়ার দখল করে বসেছে শূন্যতা। 
সুদীপ থাকবেনা, চলে যাবে, এমনটা সে ভাবতেই পারেনা। অসম্ভব আপাদ-মস্তক সম্মোহিত নিশি পাওয়া অচেতনের মত সে এগিয়ে গিয়েছিল সুদীপের দিকে। সুদীপ ছিল আগুন আর সে আলো-পতঙ্গ। তার কোনো শক্তিই ছিলনা সুদীপের সর্বগ্রাসী আকর্ষণ প্রতিহত করার।
এখনও সেই ঘোর কাটেনি।

মাত্র কয়েক বছর আগে, তিন কি চার, সে সবে সুদীপের সাথে মিশতে শুরু করেছে। বোধে বিলীন হয়ে আছে মোহন মর্ফিনের মাদকতা। যুক্তি ভেসে গেছে অনুভূতির প্লাবনে। প্রতিটি দেহকোষে কী অসম্ভব তীব্রতার ধুতুরা দহন। প্রতিটি স্পর্শ, এমনকি হাতে হাত, বিদ্যুতের কম্পন ছড়িয়ে দেয় লক্ষ কোটি মাইক্রো ফাইবারে। দেহ কেঁপে ওঠে, মনে হয় সুদীপ নদী, সে নিমজ্জিত মীন, আর তার পাখনায় চপল খলসের অজস্র অপূ্র্ব রামধনু রং!

এমনি সময়টাতে একদিন সুদীপ ওকে পিকনিকে নিয়ে গিয়েছিল জিলিওনাগোর্স্ক শহরে। ওর বন্ধুদের সাথে। শহর নয়, একশ কোটি আকাশচুম্বি পাইনের বন, ফিন উপসাগরের সৈকত ছুঁয়ে হেঁটে হেঁটে। লম্বা লম্বা শরীর গাছগুলোর, গাছ নয় খুশহাল দানো, মাথায় কোকড়ানো চুল আর অজস্র খয়েরি রংয়ের পাইন-কোন্। মাথা ঝিম ঝিম-করা বিশুদ্ধ বাতাসে পাইনের ঘ্রাণ।

জুন মাসের রৌদ্রময় উষ্ণ দিন।
যেই উষ্ণতা শরীরে শিরায় শিরায় ছুটে যায়, তাই উড়ে উড়ে আসে সমুদ্রের হাওয়ায়। পাইন গাছগুলো দুলে ওঠে, দুলে ওঠে বুক। ভালোবাসতে ইচ্ছে করে ভীষণ, বাল্টিক সাগরের হাওয়ায় উড়ে যেতে ইচ্ছে করে।

কিন্তু বন্ধুরা ধরে রাখে।

ওরা সাথে নিয়েছিল বাঙালি স্টাইলে রান্না করা কত খাদ্য: মুরগির রোস্ট, ছোলা, ডাল, পরোটা…, সবটা মনেও নেই, অদ্ভুত ঝাল মেশানো স্বাদ। অনেকদিন পরে সুদীপের সাথে প্রথম মিলনে সে অনুভব করেছিল অমন ঝাল মেশানো তীব্রতা। ভূমিকম্পের পরিমাপ আছে কিন্তু মানুষের ভালোবাসার বিস্ফোরণের কোনো মাপকাঠি নেই। সেই স্মৃতি মনে করতেই ওর মুখে নেমে আসে সাঁঝের আকাশের আগুনের আভা। সুদীপ কি চলে যাবে ওকে এবং এইসব স্মৃতিগুলোকে পেছনে ফেলে? জীবনের তো সবে শুরু।
লাবণ্য এখনও এত ছোট!
 
সেই সমুদ্র সৈকতে এক আশ্চর্য ঘটনা ঘটেছিল। সবাই হাটঁছে, সেও। ওর ফিনফিনে বসন উড়ছে বাতাসে। চুল উড়ে এসে ঢেকে দিচ্ছে মুখ। সুদীপ হঠাৎ বালুতে বসে আলিওনাকে বলেছিল, "বসো আমার কাঁধে, তোমাকে কাঁধে নিয়ে হাঁটবো।”

ওর বন্ধুরা হৈ হৈ করছে।

“না সুদীপ, তুমি আলিওনার ভার বইতে পারবেনা, তোমার গায়ে জোর কম। আলিওনা সাহসই করবেনা তোমার কাঁধে চড়তে।”

আলিওনা ওদের কথা মিথ্যে প্রমাণ করে নির্দ্বিধায় কাঁধে চড়ে সুদীপের মাথা ধরে বসেছিলো।

ওর ঘাড়ের দুই পাশে দুই উরু, বুকের সামনে পা। সুদীপ ওর দুই পা ধরে রেখে উঠে দাঁড়িয়েছিলো।
আলিওনার এমনিতেই লিক লিকে লম্বা দেহ, মোটেও ভারি নয়। একটুকুও ভয় করেনি। মনে হয়েছিলো সে মাটির পৃথিবীতে নেই। সুদীপ ওকে তুলে ধরেছে হাওয়ার পৃথিবীতে, যেখানে শুধু স্বপ্ন আর উড়ন। মানুষের জীবনে সুখ-স্মৃতি সত্যিই কত কম।

আলিওনার দম বন্ধ হয়ে আসে। সে উঠে দাঁড়ায়, হাঁটা হাঁটি করে। রিসেপশনের প্রায় বৃদ্ধা মহিলা বসে বসে ঝিমুচ্ছে, হয়তো স্বপ্ন দেখছে। পেরেস্ত্রোইকা পূর্ববর্তী পুরানো দিনের স্বপ্ন! পেনশনে যাবে, ঘুরে ফিরে সুখে শান্তিতে জীবন কাটাবে…. যৌবনে জীবন বাজি রেখে যুদ্ধ করে রক্ষা করেছে যে মাতৃভূমি, সেখানে বেঁচে থাকবে দীর্ঘদিন।
 
ডাক্তার, নার্স কেউ নেই, হয়তো ব্রেক রুমে বসে চা খাচ্ছে আর চুটকির ফোয়ারায় হাসাহাসি করছে।

অথবা.... ঘুমাচ্ছে।
আলিওনা একজন মানুষ এই বিশাল ওয়েটিং রুমে সম্পূর্ণ একা।
মানুষ আসলে এক একটি গ্রহ নক্ষত্রের মত, প্রত্যেকের নিজস্ব কক্ষপথ, একান্তই আপনার।
সোভিয়েত হাসপাতালগুলোতে কড়াকড়ি ছিলো জেল-খানার মত, যারা ভেতরে যায় তারা বন্দি, যারা বাইরে থাকে তাদের ভেতরে যেতে দেয়া হয় নির্দিষ্ট সময়ে। রোগীদের সাথে থাকার কোন ব্যবস্থা নেই। এক একটা ওয়ার্ডে অনেক রোগী, বসার জায়গা নেই, রোগীর বিছানায় বসতে হয়।
আলিওনার শ্বাসরুদ্ধ অপেক্ষার অবসান করে একজন ডাক্তার বের হয়ে আসেঃ "রোগীর অপারেশন শেষ হয়েছে, জ্ঞান ফিরেছে, এখন রিকোভারি রুমে আছে।"
"আমি কি ভেতরে গিয়ে একটু দেখা করতে পারি?"
"না, সে যখন নরমাল ওয়ার্ডে আসবে, সম্ভবত আগামিকাল, তখন দেখতে পাবে।"
"সে বাঁচবে তো? ভালো হয়ে উঠবে তো?"
"হ্যাঁ, আশা করি। বিপদজনক অবস্থাটা পার হয়ে এসেছে। তুমি বাসায় ফিরে বিশ্রাম করো "
আলিওনা বের হয়ে আসে। কিছুক্ষণ আগেই ঘণ্টা বাজিয়ে ২৩শে সেপ্টেম্বর পরিখা পার হয়ে ২৪শে ঢুকে গেছে। শীতল দমকা হাওয়া ওর মনে স্বস্থির প্রলেপ ঢেলে দেয়। রাত হাঁটছে মাতালের মত হেলে দুলে। নির্জন ও সংক্ষিপ্ত মায়াকোভস্কি স্ট্রিট পায়ে হেঁটে সে নেভস্কি প্রসপেক্টে এসে দাঁড়ায়।

একটা ট্যাক্সি এগিয়ে আসতেই উঠে বসে। ট্যাক্সি চলছে নেভস্কি মহাসড়ক ধরে প্যালেস ব্রিজের দিকে। এডমিরালটি বিল্ডিং এর শীর্ষের সোনার চূড়াটি দেখা যাচ্ছে রাতের আবছা অন্ধকারে। অনেকগুলো গাছ হাঁটছে তার সামনে প্রহরীর মত। আলিওনার মনে পড়ে ১৯৯০ সালের মে মাসের একটি সকালের কথা। সে তৈরি হয়েছে ইনস্টিউটে যাবার জন্য। লাবণ্যের মাত্র ১৪ মাস বয়েস । ও দৌড়াদৌড়ি করছে আর নানি তাকে রাখছে চোখে চোখে।

এমন সময় দরজায় কলিং বেলের আওয়াজ। দরজা খুলতেই সাদা প্যান্ট, সাদা শার্ট এবং কালো গোঁফের বিস্তীর্ণ হাসি মুখে সুদীপ দাঁড়িয়ে আছে। ও কিভাবে ছুটে যাবে সুদীপের বুকে, হাত-পা তো খুশিতে অবশ! পর মুহূর্তেই সুদীপের আলিঙ্গন !

“মা.. আ..আ…সুদীপ”, “লাবণ্য, বাবা..আ..আ.. এসেছে।”

মা ও লাবণ্য ছুটে আসে তীরের বেগে ।

লাবণ্য এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে দেখে, তারপর ঝাপ দেয় সুদীপের কোলে।
 
সুদীপ লন্ডনে চলে গিয়েছিল ১ বছরের জন্য কিন্তু মাত্র ৬ মাস থাকতে পেরেছে তাদের ছেড়ে। এমনি তীব্র ছিল ভালোবাসার টান! ফোন ছিলোনা, চিঠি আসতো মাঝে মাঝে, কিন্তু সে যে চলে আসবে, তা জানায়নি, সারপ্রাইজ দিয়েছে। মনে আছে সুদীপ চকচকে কালো গোঁফ নিয়ে তাকে চুম্বন করতে এসেছিল, কিন্তু তার নাকে মুখে সুড়সুড়ি লাগে।

সে ওকে বাথরুমে টেনে নিয়ে বলেছিল, “এখুনি গোঁফ কাটো, নইলে আমাকে চুমু দিতে পারবেনা।”

কথায় বলে,“নম্র প্রেমিক, ভালো প্রেমিক”- সুদীপ তর্ক করেনি, বলেছে “আচ্ছা আচ্ছা, ৬ মাস ধরে তোমার বিরহে গোঁফ রেখেছি, তোমার জন্য কাটতে যদি হয়, কেটেই ফেলবো।”

তাকে ক্লাশে চলে যেতে হয়েছিল। ফিরে এসে সুদীপকে পেয়েছিল গোফহীন। লাবণ্যকে কোলে নিয়ে বসেছিলো সোফাবেডে, আর লাবণ্য পুট পুট করে গল্প করছিল বাবার সাথে।

মা ছিল রান্নাঘরে ।

সুদীপ বলেছিল, “আলিওনা, অবাক ব্যাপার, আমি লাবণ্যকে এত ছোট রেখে গেছি, ওর তো আমাকে চেনারই কথা নয়। অথচ সারাদিন সে আমার সাথে রয়েছে, এমন কি নানির কাছেও যায়নি।”

“বা রে চিনবেনা ? প্রতি রাতে তোমার ছবি না দেখা পর্যন্ত সে ঘুমাতেই যেতো না।”
 
নেভা নদীর ওপর দিয়ে ট্যাক্সি চলেছে। শান্ত ঘুমন্ত নদী। এই ব্রিজটা এক্ষুনি খুলে যাবে জাহাজ চলাচলের জন্য। জাহাজগুলো লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে। ওরা তখনও মিচুরিনস্কায়া স্ট্রিটের একরুমে থাকতো, মা ও মেয়ে। সুদীপের সাথে পরিচয় হয় ইনিস্টিউটে। সে তখন স্কুল শেষ করে কাজ করতো সেখানে। বয়েস কত? ১৭ বা একটু বেশি।

পরিচয় হওয়ার কিছুদিন পরেই ও চলে যায় নভগরদ শহরে। সারা সপ্তাহ দিনভর হাসপাতালে ক্লিনিংয়ের কাজ করে, রাতের শিফটে মেডিকেল ইনস্টিটিউটে ভর্তি হবার জন্য প্রিপারেটরি কোর্স করে। হোস্টেলে ছোট একটা রুমে থাকে লেনিনগ্রাদের অন্য এক মেয়ে ও অসংখ্য ছারপোকা তেলাপোকার সাথে ভাগাভাগি করে। প্রতি শুক্রবার কাজ শেষ করে বাসে চড়ে বসে। বাস নামিয়ে দেয় মাস্কোভ্স্কায়া মেট্রোস্টেশনে। সেখান থেকে পাতালে ডুব দিয়ে গোর্কভস্কায়া স্টেশনে বের হয়ে আসে রাত ১২ টার একটু পরে। সুদীপ দাঁড়িয়ে থাকে ওর জন্য।

বাসা পর্যন্ত হেঁটে যেতে লাগতো মাত্র ১৫ মিনিট। ওকে দরজা পর্যন্ত পৌঁছে দেয়ার ১৫ মিনিটে সে কমপক্ষে ৫০ বার বুকে চেপে ধরে চুমোয় চুমোয় ভরিয়ে দিতো, তারপরে কুইভিশেভ স্ট্রিটে ট্রাম ধরে চলে যেতো হোস্টেল। কোনো কোনোদিন হেঁটে যেতো ট্রামের দেরি হলে।

দেশী একটা মেয়েকে ভালোবাসতো সে কিন্তু এখন আর বাসেনা।সে মেয়েটিকে দেখেছে। সুন্দর, কালো, লম্বা চুলের বাঙালি মেয়ে, বড় বড় চোখ। ওদের চোখগুলো ইওরোপীয়ানদের মত নয়। মেয়েটিকে কখনও প্রতিদ্বন্দ্বী মনে হয়নি ওর, বরং মনে হয়েছে সে অন্য একটি ছেলেকে পছন্দ করে নিয়েছে বলেই তো সুদীপ তার হতে পেরেছে। 
 
এক রাতে সে চলে আসে রাত ১২ টার একটু আগে। শীতের রাত। সুদীপ এসে পৌঁছায়নি। বাইরে কনকনে ঠাণ্ডা আর নাৎসীর মত বাতাস। ভাবে সুদীপ হয়তো আসবে না। সে বাসায় চলে যায়। কিন্তু সুদীপ আসে কয়েক মিনিট পরেই। সে দাঁড়িয়েই থাকে অথচ ওর দেখা নেই। শীত জমিয়ে দেয় হাড়ের শেষতক ।

সুদীপ তখন ৫ কোপেক দিয়ে টোকেন কিনে মেট্রোর ভেতরে ঢুকে যায়। গোর্কভস্কায়া মেট্রোটি অসম্ভব গভীর, কারণ এই স্টেশনের পরেই ট্রেন যায় বড় নেভার নীচ দিয়ে। নেভা গভীর নদী। বড় বড় জাহাজ চলে এই নদী দিয়ে। সুদীপ অপেক্ষা করে থাকে, গহীন মাটির তলে প্রতিটা ট্রেন এসে থামে, সে খোঁজে। সবাই বের হয়ে চলে যায় কিন্তু আলিওনার দেখা নেই। ১ টা বাজার মাত্র মিনিট ৫ বাকি, মেট্রো বন্ধ হয়ে যাবে। ভারী মন নিয়ে সে ওপরে উঠে আসে, ২ কোপেক দিয়ে বুথ থেকে ফোন করে ওর বাসায়।

আলিওনা!

“তুমি কোথায়?”

“এই তো দাঁড়িয়ে আছি তোমার অপেক্ষায়।”

“উহু! তুমি তো ঠাণ্ডায় জমে গেছো, আমার বাস আজ আগে চলে এসেছে। তোমাকে না দেখে আমি দেরি করিনি। আমিও বাসে শীতে জমে গেছি। আগে ফোন করোনি কেন?”

সুদীপের মাথায় সে বুদ্ধিটা অগে এলে নিশ্চয়ই শীতে দাঁড়িয়ে থাকতো না মেপল গাছগুলোর মত।

“আমি মাকে নিয়ে চা খাচ্ছি, চলে আসো।”

ও গিয়েছিল।

গরম চা থামিয়েছিল অন্তঃস্থল পর্যন্ত স্পর্শ করা শীতের কাঁপুনি।

মা বলেছিল, “অনেক রাত হয়ে গেছে, ট্রাম পাবে না। যা শীত! এখানেই থেকে যাও।”
 
মা মেয়ে ঘুমিয়েছিল পাশাপাশি দুটি সিঙ্গল বিছানায়। দুই বিছানার মাঝখানে সামান্য ফাঁক বিছানার কাছে আসার জন্য। সুদীপকে ঘুমোতে দেয়া হয়েছিল সোফাবেডে, নতুন ইস্ত্রি করা বেডশিট বিছিয়ে। ওর ঘুম আসছিলনা। যদিও মা ঘুমিয়ে পড়েছিল অল্প সময় পরেই।

সুদীপ ঘুমায়নি, ও বুঝতে পারছিল।

খালি এপাশ ওপাশ করছিল।

প্রায় ঘণ্টাখানেক চলে গেছে, সুদীপ একটা দু:সাহসের কাজ করে।

ওর মুখে একটা হাসি খেলে যায়, কথাটা মনে করে।
 
সে সোফা থেকে উঠে মেঝেতে হামাগুড়ি দিয়ে ওর কাছে চলে এসে মেঝেতে বসেই মাথাটা এলিয়ে দেয় বুকের ওপর। ও ভয়ে হিম হয়ে যায়, এমনকি ফিস ফিস করতেও ভয় পায়, মা জেগে যাবে। ওকে ঠেলে সরিয়ে দেবার চেষ্টা করে কিন্তু ও একটা জোঁক। কোন মতেই যাবেনা। কোন মতেই। আইভি লতার মত জড়িয়ে থাকবে ভালোবেসে। আর সে ? সে অবশ ও বলহীন হয়ে থাকবে সেই ভালোবাসায়।



১৭ তম পর্ব



শীত গ্রীষ্ম শরৎ বসন্ত এই অপেক্ষা করে করেই দিন যায়। নভগরদের মাঝপথে বাস থামে বাথরুম ব্রেকের জন্য। মিনিট পনেরো, তারপরে আবার চলতে শুরু করে। একবার যাবার পথে ওর বিপদ হয়। বাথরুম সেরে বাসে ফেরার পথে ফড়িংয়ের মত এক অনাহুতের দঙল ঘিরে ফেলে। ওরা জিপসি। সবাই জানে ওরা ভয়ানক বাজিকরের দল, মানুষকে নিঃস্ব করে ছাড়তে পারে। ঈশ্বর তো ঈশ্বর, শয়তানও ওদের সাথে পেরে ওঠেনা। কেউ কথা বলে বেখেয়াল করে, কেউ পকেট মারে বা ব্যাগ হাতড়ে সবকিছু নিয়ে নেয়।

“এই তোমার হাতটা দাও, দেখে দেই।”

তার বলায় ও চাহনিতে এমন কিছু একটা ছিলো, যে ওদের সংস্রব এড়িয়ে চলার মায়ের শেখানো

সব নির্দেশ ভুলে মন্ত্রমুগ্ধের মত হাতটি বাড়িয়ে সে। সেই মহিলা তার হাত দেখলো খুটে খুটে, তারপরে দ্রুতগতিতে নিজের দুই হাত নাড়িয়ে হাত খুলতেই দেখা গেল কী একটা পোকা তার হাতের

তালুতে।”

“তোমার মা বেশিদিন বাঁচবেনা, সামনেই তার বড় একটা ফাড়া আছে, এই দেখো তার লক্ষণ”

সে ভয়ে আৎকে উঠে। মা-ই তার জীবনের সবকিছু, অন্তত তখনও।

“তবে ফাড়া কাটানো যাবে। তোমার কাছে টাকা আছে? আমার হাতে রাখো।”

আলিওনা নিজেই ব্যাগ থেকে টাকাগুলো বের করে দেয়। তাকিয়ে থাকে, মুখ থেকে কোনো কথা বের হয়না। মহিলাটি চুপ করে হেঁটে চলে যায়।

বাসের ড্রাইভার এগিয়ে আসে, “এই মেয়ে, দাঁড়িয়ে আছো কেন, তাড়াতাড়ি ওঠো, বাস ছেড়ে যাবে।” সবগুলো রুবল নিয়ে গেছে, সব মানে তিন রুবল। ওটাই তার যাওয়া, আসা ও এক সপ্তাহের খাবারের বাজেট। বাসে বসে তার কান্না পায়, সারাটা রাস্তা মনমরা হয়ে থাকে। এক সপ্তাহ সে কিভাবে চলবে এবং কিভাবেই ফেরার টিকেট কাটবে? সে সময়ে অঢেল টাকা মানুষের হাতে ছিলোনা। পরিচিত কেউ নেই। হাসপাতালে ওদের সুপারভাইজার আন্তোনিনা’র কাছ থেকে কিছু আশা করা বৃথা। সে একটা খবিশ। কচি কচি নির্বোধ মেয়েগুলোর রক্ত ও ঘাম চুষে খায়, কিন্তু মাস শেষে “কে-তে-উ”* গোনার সময় যতভাবে পারে ঠকায়। মেয়েরা ওকে ভয় করে বাঘ অথবা বাগডাসের মত। তবে ওর সাথে কাজ করতো এক বুড়ি, ভালো। সে বলে, “দোচিনকা, নিয়ে ভল্-নুইছা, ইয়া দাম তিবিয়ে দেঙ্গি” ( কন্যা, দুঃশ্চিন্তা করিস না, আমি টাকা দেবো )। মানুষ মানুষেরই জন্য, ক্ষমতার বাইরের সাধারণ মানুষগুলো এমনই ছিলো। ছিলো তাদের অপরিসীম ভাতৃত্ববোধ ও দেশপ্রেম!
 
১ বছর চলে যায়।
 
আলিওনা ফিরে আসে নভগরদের পর্ব গুটিয়ে। ভর্তি হয় সুদীপের ইন্সটিউটে, সুদীপের শেষবর্ষ আর ওর প্রথম। একদিন সুদীপ ছুটে আসে খ্যাপার মত।স্টাইপেন্ডের টাইট বাজেটে চলতো বলে উৎসব ব্যতীত সচরাচর ফুল আনতোনা। ঐদিন এনেছিল লাল লাল গোলাপ ফুল। লাল গোলাপ আলিওনার প্রিয় কিন্তু সুদীপের প্রিয় আরো বেশি। লাল গোলাপের কথা বলতে গিয়ে ও গুনগুন করতো ইয়েসিনিনের “পার্সিয়ান মোটিভ” এর কবিতা। আর বলতো সাদীর গল্প, যে নাকি তার প্রেমিকার বুক ছাড়া অন্য কোথাও চুম্বনই করতোনা। এ কথা বলতে বলতে ধেয়ে আসতো ঠোঁট উচিয়ে ওর বুকের দিকে তৃষ্ণার্ত মেষ শাবকের মত। ওর লজ্জায় মুখ লাল হয়ে উঠতো। কিন্তু সুদীপটা প্রথম থেকেই ছিল স্পর্শের ন্যাওটা।

সেদিনই বলেছিল, “আলিওনা, তুমি আমাকে বিয়ে করবে?”

আলিওনা বোবা হয়ে গিয়েছিল, কয়েক মুহূর্ত, তারপরে ওর সারা শরীরে জেগে উঠেছিল ঝড়।

“হ্যাঁ সুদীপ, আমি তোমাকে ভালোবাসি, আমি তোমার স্ত্রী হতে চাই।”

যেমন অপ্রত্যাশিত ছিল সুদীপের প্রস্তাব তেমনি দ্বিধা ও দ্ব্যর্থহীন ছিল ওর উত্তর।
 
মা ছিল সবসময় দুশ্চিন্তাগ্রস্থ। বিদেশির সাথে মেলামেশায় মা ভয় পেতো। তাদের সব সময়ই বোঝানো হয়েছে বিদেশ হলো নেকড়ের জঙ্গল। অমঙ্গল আশংকায় তার ঘুম হারাম হয়ে যায় ! সুদীপ তার মেয়েটাকে নিয়ে চলে যাবে চিরদিনের জন্য। মেয়ের নাগরিকত্ব চলে যাবে। সুদীপ ওকে মারধর করলে, অপমান করলে, এমনকি নিজ দেশে অন্য একটি বিয়ে করলেও ( ওদের দেশে পুরুষেরা নাকি এক সাথে ৪ জন স্ত্রী রাখতে পারে ), মেয়েটা কোনোদিন ফিরে আসতে পারবেনা। ওর জীবনটা ধ্বংস হয়ে যাবে।

এ কথা ভাবতে ভাবতে হাত পা হিম হয়ে আসে, বুকে হৃৎপিণ্ডটা থেমে যেতে চায়। আলিওনা যখন মাকে বলে বিয়ের কথা, মা ওকে বুঝাতে চেষ্টা করে। কিন্তু আলিওনা তর্ক করে, ঝগড়া করে, যা হয় হবে, সে সুদীপকে ছাড়া অন্য কাউকেই বিয়ে করবেনা।

ওর বয়েস মাত্র ১৮ !

জীবনের ধূসরতা সে দেখেনি, মা দেখেছে। রিপ্রেশন দেখেছে, যুদ্ধ ও ব্লকেড দেখেছে, দিনের পর দিন না খেয়ে থেকেছে। একা একা সারা জীবন কাটিয়েছে। তার আপন দেশের, আপন ভাষা ও সংস্কৃতির একটা মানুষ কী কষ্টই না দিয়েছে তাকে। আর এ তো সম্পূর্ণ বিদেশি। অশ্রুই তার যুক্তি, কিন্তু অশ্রুর শক্তি বড় দুর্বল। ভালোবাসার প্রশ্নে অন্যের অভিজ্ঞতা চিরদিনই অচল মুদ্রার মত। ভালোবাসার প্রশ্নে সবাই পান করতে যায় নিজস্ব অমৃত। কেউ পায় তিক্ত মদ, কেউ বিষ, অমৃত পাওয়া যে সম্ভব এটা মায়ের বিশ্বাসই হয়না। 
 
যা হোক, সুদীপ আলিওনা যথেষ্ঠ কর্মঠ, ঠিক ঘড়ির কাঁটা ধরে বিয়ের ১০ মাস পরে লাবণ্যের জন্ম হয়। মানুষের যে এত উর্বর হতে নেই এই বোধটা এদের ছিল বলে মনে হয়না। অবশ্য একটা ছোট্ট ব্যপার এর কারণ হতে পারে। সোভিয়েত ইউনিয়নে জন্ম নিয়ন্ত্রনের বিশেষ কোনো বন্দোবস্ত ছিলোনা, এবোর্শনের ছিল। হাজার হাজার হাসপাতাল ও স্পেশালিষ্ট ছিল এবোর্শন করার জন্য, তার জন্য রাষ্ট্রের অর্থও ছিল কিন্তু ভালো কন্ডম তৈরির টেকনোলজি, অর্থ ও ইচ্ছা ছিল আদর্শ বিরোধী। যে রাবার ব্যবহার করা হতো, তা রাবার গাছ নয়, সম্ভবত গাব গাছের কষ থেকে আসতো। তা গরু ছাগলের প্রজনন প্রতিহত করার কাজে লাগলেও, মানুষের তা পছন্দ হতোনা। তখনও পর্যন্ত বাইরের সুগন্ধি, সুন্দর সুন্দর মেয়ের ছবি আঁকা, বিভিন্ন ধরনের, বিভিন্ন ব্রান্ডের সমাজতন্ত্রকে শায়িত করার ছোট ছোট বাক্সগুলো ইম্পোর্ট করা শুরু হয়নি।
 
সুদীপ লন্ডনে ৬ মাস রেস্টুরেন্টে কাজ করে ২০০০ পাউন্ড নিয়ে এসেছিল। ফিরে প্রথমেই সে গিয়েছে মস্কোতে অভ্রের ঋণ শোধ করতে। আর খোঁজ নিতে বাঁচার জন্য কি করা যায়? অভ্র টাকাটা না নিয়ে বলেছে, “ঋণ শোধ পরে, সিঙ্গাপুরে যান, কম্পিউটার নিয়ে আসেন। তা বিক্রি করে আগে খেয়ে পড়ে বাঁচার বন্দোবস্ত করেন ।”

পৃথিবীতে সব বন্ধুই শুধু নিজের দিকে টানেনা, কিছু ব্যতিক্রমও আছে। অভ্র সব কিছু বুঝিয়ে দেয় কি করতে হবে। কিন্তু সিঙ্গাপুরে যাবার জন্য দরকার ছিল প্রায় সাড়ে চার হাজার ডলার।

ওর কাছে তা ছিলনা।
 
সুদীপ ফোন করে বখতিয়ার খিলজি ভাইকে। এতকাল সে শুধু নেতাই ছিলনা, ছিল বড় ভাই। তার স্নেহ ছিল অফুরন্ত। সে এখন এমন একটি চেরাগ নিয়ে নাড়াচাড়া করছে যার তুলনায় আলাদীনের চেরাগ নস্যি।

যদিও কোন প্রমাণ নেই এবং এ বিষয়ে চেচিয়ে বলারও কিছু নেই তবে সাধারণ জ্ঞান হলো এই যে, পার্টির অতি উচু স্তরের নেতাদের হাতে কালো টাকার যে পাহাড় জমা হয়েছে তা ঠেলে বর্ডার পার করানোর জন্য কিছু বিশ্বস্থ বিদেশি কমরেডের প্রয়োজন ছিল। খিলজি ভাই এত বছর এদের সাথে চলাফেরা করে এই বিশ্বস্ততা অর্জন করেছেন। সোভিয়েত কমরেডরা তাকে বস্তার পরে বস্তা ভরে ডলার দিতে ইতস্তত করেনা। খিলজি ভাই তা জায়গা মত পৌঁছে দেন পাই পাই হিসেব করে এবং উদার কমিশন অর্জন করেন।
 
সোভিয়েত দেশ তো কোনো ছোটখাট বাগদাদ নয় এবং এখানকার চোরও আলাদিনের মত ছিঁচকে চোর নয়। এখানে কথা হচ্ছে রিয়েল টাকারঃ হাজার নয়, লাখ নয়, মিলিয়ন নয়, আরো বড় অঙ্কের, রুবল নয় ডলারের। বন, খনি, তেল, গ্যাস, নিকেল, অ্যাভিয়েশন, মিসাইল, অস্ত্র ইত্যাদি যে কোনো উৎস থেকে গড়িয়ে আসা টাকা। শ্রমিকশ্রেণি গরীব বলে শ্রমিকশ্রেণির রাষ্ট্র গরীব হবে এমন কোনো কথা কোনো লাল বই বা আপ্তবাক্যে নেই।
 
সুদীপ যেই স্তরের মানুষ, ধন সম্পদের সাধারণ নিয়ম মেনে তাকে এখন খিলজি ভাইয়ের না চেনারই কথা। কিন্তু অবাক কাণ্ড সে সেই আগের মতই ।

“কবে আইছস? চইলা আয় আমার বাসায়, তর ভাবী রান্না করতাছে।”

আগে সবাই ছিল সম-আদর্শের সমশ্রেণির নি:স্ব, সুতরাং একে অন্যের কাছে যেতে কোন ইতস্তত বোধ হতোনা। এখন সুদীপ ইতস্তত বোধ করে।

ফুল ছাড়া রাশিয়ান পরিবারে যাওয়াটা প্রচলিত নয়। সে ভাবীর জন্য ফুল নিয়ে উপস্থিত হয়।

বাসা আগের মত নেই, দারুনভাবে বদলেছে। ভাগ্য ভালো ভাবী বদলাননি। আসলে ভাবী না বড় বোন, বলা মুশকিল।

“কি রে কেমন আছিস? আলিওনা কেমন আছে? মেয়েকে তো দেখালি না, বড় হচ্ছে, ভালো আছে? নিয়ে এলি না কেন?”

অনেকগুলো আন্তরিক প্রশ্ন একসাথে। রাশিয়ান ভাবীরা দুই ধরণের, হয় আন্তরিক, নয় আন্তরিক নয়। “মুখে শেখ ফরিদ, বগলে ইট”- এই ধরনের ৩য় একটা প্রজাতি থাকলে থাকতেও পারে কিন্তু সুদীপের চোখে পড়েনি। ভাবীর একটা ছেলে, একটি মেয়ে। সুদীপ আগে যখন মস্কো আসতো ওদের সাথে খেলা করতো। এখন সে নিজেই মেয়ের বাপ। সময় কিভাবে সব ওলট পালট করে দেয়!
 
বখতিয়ার ভাই আড্ডাবাজ, দিলদার মানুষ। দুটো স্তপকা ( ছোট টাই গেলাসের মত ভদকার গ্লাস) নিয়ে এসে স্তালিচনায়া ভদকার বোতল খুলতে খুলতে ভাবীকে ডাকেন, শসার পিকল আর কালবাছা ( রাশিয়ান মোটা সসেজ) নিয়ে আসতে।

ভাবী ওসব দিয়ে যেতে যেতে বলেন, “বেশি খেওনা, রান্না প্রায় শেষ।”

যথারীতি গৃহিনীর সুস্বাস্থ্য কামনা করে প্রথম স্তপকা শেষ হয়। তারপরে “গৃহের মঙ্গল ও প্রাচুর্য” কামনা করে ২য় স্তপকা। (এই টোস্টটা মনে হয় অপ্রয়োজনীয় এই পরিবারের জন্য।) । “বন্ধুত্ব” কামনা করে ৩য় স্তপকা খাদ্যনালী অতিক্রম করার পর পরই অর্থাৎ চতু্র্থ স্তপকার আগে আগে ভাবী খাদ্য পরিবেশন করেন।
 
তবে তিনটা স্তপকা টপা টপ একের পর এক যায়নি। রাশিয়ান পদ্ধতি হল এক স্তপ্কা খাবার পরে আলোচনা চলে ব্যবসা, নারী, খেলাধুলা, ইন্ডিয়ান ছবির নায়ক নায়িকা ইত্যাদি নিয়ে। তারপরে অন্য স্তপ্কা। রাজনীতি নিয়ে আলোচনা না করা হচ্ছে রাশিয়ানদের অস্তিত্বের ইন্সটিঙ্কট। 
 
"Frightening times are approaching
Soon fresh graves will cover the land"

Anna Akhmatova, July 1914 
 
১৯১০ সালের পর থেকে শুরু করে রাশিয়া এত বেশি তাজা কবর খুড়েছে আন্না আখমাতভার ভবিষ্যৎবাণীকে দাড়ি কমাসহ সত্য প্রমাণ করে দিয়ে যে, রক্তের স্নানে বিশুদ্ধ হয়ে এরা সবাই এখন জেনেটিকালি মডিফাইড। এরা জানে রাজনীতিতে নাক না গলানো হচ্ছে বেঁচে থাকার গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। 
 
রাশিয়া বাংলাদেশ বা ইন্ডিয়া নয়, যেখানে যার যা ইচ্ছা তাই বলতে পারে লাগামহীনভাবে এবং ক্ষমতা তাতে কান দেয়না, অক্ষমতাও বড়জোর সেই কথা শুনে ‘বোকলা’ দাঁত দেখিয়ে হাসে। ১৯৭১ সালে যুদ্ধের সময় ছাড়া চোখ বেঁধে দেয়ালের সামনে দাঁড় করানোর নজির এখনও এইসব দেশে নেই, তাই স্ট্যালিন বা মাও সেতুংয়ের মত একজন বড় নেতার জন্য এইসব দেশের কমরেডরা কেঁদে জারজার।

তিনটি স্তপকার মাঝখানে খিলজি ভাই সুদীপের কথা শোনেন মনোযোগ দিয়ে, তার পরে বলেন:

“ডলার পাউন্ড তো আগে নাড়াচাড়া করস্ নাই। সাথে নিয়া হাঁটা রিস্কি, অজানা মানুষের কাছে ভাঙানো আরো বেশি ভয়ের। হয় ডাকাইতের হাতে পড়বি, নয় কেজিবির। তুই পাউন্ডগুলা রাইখ্যা যা, আমি ডলারে ভাঙাইয়া রাখুম নে। তর ১টা কম্পিউটার ও ১ টা ফ্যাক্স কিনতে লাগব ৪ হাজারের মত, আর শ পাঁচেক হোটেল, ট্যাক্সি ও খাবার খরচ। তর পাউন্ডে ৩৩-৩৪ শ হইব, হাজার- এগার শ ডলারের মত টান পড়ব। আমি তা ধার দিমু। কবে যাবি? টিকিট কাটবি কেমনে?”
 
সুদীপ জানায় যে সে কিছুই জানি না।

“ঠিক আছে,আমি টিকিট কাইট্যা রাখুম নে, আমার লোক আছে। কম্পিউটার আইন্যা তুলবি কই ? বেচবি কেমনে? লোক আছে? অহন খুব ডাকাতি হয় কিন্তু। সাবধান হইতে হইব।”
 
সুদীপ অসহায়ের মত মাথা নাড়ে।

“আইচ্ছা শোন, আমি এই সব খুচরা ব্যবসা অহন আর করিনা। তর লাইগ্যা ড্রাইভার পাঠাইয়া দিমু এয়ারপোর্টে, কম্পিউটার আমার বাসায় রাইখ্যা যাইস, অমি বিক্রি কইরা দিমু। কিন্তু আমি একবারের বেশি তর জন্য কিছু করতে পারুমনা বুঝছস? আমার ব্যবসা এইটা না।”


পাদটিকাঃ

*সোভিয়েত আমলের শেষ দিকে শ্রমজীবীদের “শ্রমে অংশগ্রহণের কোয়েফিশিয়েন্ট” বা “কে-তে-উ” নামে একটি একক ব্যবহার করা হতো, বেতনের ওপরে কে কত বাড়তি বোনাস পাবে, তা নির্ধারণ করার জন্য। যদিও কালেকটিভ সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে এর গণনা করার কথা, সুপারভাইজরদের অপ্রতিহত ক্ষমতার কাছে খুব কম লোকই মুখ খোলার সাহস পেতো। তাই বিষয়টি ছিলো খুব বেশি সাবজেকটিভ।



১৮ তম পর্ব



জন্মের সময়ে বাবা মার হয়তো ধারণা ছিল যে ছেলে একদিন বিরাট কিছু হবে। তাই তার নাম রাখা হয় বখতিয়ার খিলজি। গ্রামের মানুষ হলেও বাপ-মা যে প্রজ্ঞাবান ছিলেন তা অস্বীকার করার উপায় নেই । স্কুলে ছিলন মধ্যস্তরের ছাত্র। কিন্তু খেলার মাঠে সর্দার। ফুটবলের মাঠে তার সাথে দৌড়ে কেউ পেরে উঠতোনা। হাডুডু খেলায় তাকে আটকানো ছিল অসম্ভব ব্যাপার। রাজনীতিতে নামেন অল্প বয়সেই। ৬৯ এর গণঅভ্যুথ্থানে খুব সক্রিয় অংশ নেন। তারপরে মুক্তিযুদ্ধ। তাদের এলাকায় তিনিই ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের মূল নেতা। বুকে কলিজাটা ফুটবল মাঠের সমান।

বহু পাকি বন্দী করেছেন, তারপরে তাদের গুলি করে হত্যা করেছেন নদীতীরে।

বখতিয়ার খিলজি ১৯৭৩ সালে চলে যান সোভিয়েত ইউনিয়নে। পড়াশুনা, রাজনীতি দুটাই চলে তুমুল গতিতে। রেজাল্ট তিনি খারাপ করেননি। ১৯৭৮ সালে বিয়ে করেন ক্রিস্টিনাকে। ক্রিস্টিনার পড়ালেখা ৮ ক্লাস, তার পরে টেকনিকুমে ( ভোকেশনাল স্কুল ) পড়েছেন দুই বছর। শেষ করে কি একটা নিম্নশ্রেণির কাজ নিয়ে সংসারের হাল ধরে রেখেছেন। তবে সেই সময়ে কোনো কাজই নিম্ন বা উঁচু শ্রেণির বলে গন্য করা হতোনা। বেতনের তারতম্যও বিশেষ ছিলোনা। খিলজি ভাইয়ের রাজনীতি থেকে কোনো আয় ছিলোনা। তবে দুতাবাসের স্কুলে মাস্টারি করিয়ে কিছু আয় হতো, তা দিয়েই অন্য সব কমরেডদের মত কষ্ট ও ত্যাগ স্বীকার করে আদর্শের বিশুদ্ধতা রক্ষা করেছেন।
 
লেখাপড়া শেষ করার পর তার দেশে ফিরে যাবার কথা কিন্তু রাশিয়ান বৌ, পার্টির প্রতি বিশ্বস্থতা এবং মস্কোতে একজন ফুলটাইম পার্টি প্রতিনিধির প্রয়োজনীয়তার কথা বিবেচনা করে তাকে এখানেই রেখে দেয়া হয়।

দীর্ঘদিন তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টি এবং বাংলাদেশী ছাত্র সংগঠনের মধ্যে মূল যোগসুত্র হিসেবে কাজ করেন। দেশ থেকে আসা কমরেডদের যত্ন আত্মি করা, হোটেলে দেখা করা, তাদের সাথে বিভিন্ন মিটিং ও ভ্রমণে সঙ্গ দেয়া, এ সবই তাকে করতে হোত। তাছাড়া দেশ থেকে কমরেডদের নিয়ে আসা ডলার ভাঙিয়ে দেয়ার গোপন কাজটাও ছিল তার। তখন রুবল ডলারের অফিশিয়াল রেট ছিল ১ ডলার সমান ৬৪ কোপেক। মানে ১০০ ডলার ভাঙালে ৬৪ রুবল পাবার কথা। আন-অফিশিয়াল রেট ছিল ১ ডলার সমান ৪-৫ রুবল (৮০ দশকের প্রথম দিকে), অর্থাৎ ১০০ ডলার ছিল ৪০০ থেকে ৫০০ রুবলের সমান। সে সময়ে এ ছিল বড় অঙ্কের টাকা। সুদীপ অভ্ররা ৮০-৯০ রুবলে সারা মাস চলতো। শুধু তাই নয়, দেশে বন্যা- দুর্ভিক্ষের চাঁদা দিতো, মতি ভাই সম্পাদিত পার্টির সাপ্তাহিক “একতা” কিনতো। কোনো বছর পার্টির কংগ্রেস, কোনো বছর ছাত্র ইউনিয়ন, যুব ইউনিয়ন, কৃষক সমিতি, ট্রেড ইউনিয়ন ইত্যাদির জাতীয় সম্মেলনে চাঁদাও দিতে হতো ।

দেশ থেকে আসা অনেক কমরেড ( সবাই নয় ) হয়তো বহু কষ্ট করে জমিয়ে এক- দুই-চার-পাঁচশ ডলার নিয়ে আসতেন ( বিদেশে খালি হাতে কোন সুস্থ মানুষই যায়না )। দেশে কিছু উপহার নিয়ে যাবার জন্যও অর্থ প্রয়োজন। তারা শাখের করাতের মধ্যে পড়ে যেতেন। একদিকে নৈতিক অবস্থানে থাকা দরকার, অন্যদিকে বাংলাদেশে এত দাম দিয়ে কেনা ডলার মাস্কভা-নেভার জলেও ফেলে দিতে পারতেননা। খিলজির হাতে তুলে দিতেন। ন্যায্যদামে ডলার পাউন্ড ভাঙানোর খোদ জায়গা ছিল দুতাবাসগুলো। খিলজিকে সেখানে যেতে হতো স্কুলে পড়ানোর জন্য। সে চুপচাপ কমরেডদের ডলারগুলো ভাঙিয়ে দিয়ে তাদের উপকার করতো। দ্বন্দ্ববাদের জটিলতায় ঘর্মাক্ত কমরেডরা জিজ্ঞেস করতে ভুলে যেতেন এত রুবল এল কোত্থেকে? তাদের এই ভুলে যাওয়ায় বিশেষ কিছু অস্বাভাবিকতা খোঁজার কারণ নেই। তারা ছিলেন ব্যতিক্রম, ছাত্রদের জন্য তাদেরই করা আইন, তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। আর যুক্তির কথা হল হাতির দেশে মানুষ হাতিই চড়ে, উটের দেশে উট। আর খচ্চরের দেশে খচ্চরে চড়ায় ভালো মন্দের প্রশ্নটা হয়ে দাঁড়ায় আপেক্ষিক।

“বিশ্ব বিপ্লবের বিশালত্বের তুলনায় এ সবই চেটের বাল ছাড়া কিছু নয়”- সোভিয়েত প্রবাদবাক্যে বলে। মানুষের বুকের গহীনে লুকিয়ে থাকা বেদনাগুলো কখনও কখনও অশালীনভাবে প্রকাশিত হয়। সবদেশে, সব সমাজে তা সত্য। কমরেডরা অতিমানব নয় এবং নিজের স্বার্থ ও পরের স্বার্থের মাঝখানে যে চোরাবালির চর তা খুব কম মানুষই অতিক্রম করতে পারে নিজের পা না দাবিয়ে। ভবিষ্যত শোষণহীন সমাজ যখন হবে, সম্ভবত সেখানেও ওই চোরাবালিটুকু থাকবে।

খিলজি ভাই ছিলেন খুবই দায়িত্বশীল। কমরেডদের প্রতি ভদ্র ও মার্জিত, সহনশীল ও স্নেহ পরায়ন। তিনি নতুন আসা ছাত্রদের এয়ারপোর্ট থেকে নিয়ে আসতে যেতেন দলবল নিয়ে, “পার্টির কোড অব এথিক্স” শেখাতেন, নতুন দেশে অস্তিত্ব রক্ষার প্রয়োজনীয় তালিম দিতেন।

ছিলেন ধৈর্যশীল একজন মানুষ।

তবে খুব বেশি বেয়াদবির মাধ্যমে তাকে চটানো সম্ভব ছিল এবং রেগে গেলে তার শান্ত হতে সময় লাগতো। মনটা সাদা কালো ছবির মত, খুব একটা জটিল নয়। গ্রামের মানুষ, তার মধ্যে গ্রাম্যপনা খুঁজে পেতে কষ্ট হয়না। মার্কসবাদ- লেনিনবাদে জ্ঞান রাখেন ভালো, তবে সেই জ্ঞান যে অতি উচ্চ তাত্ত্বিক লেভেলের তা বলা যাবেনা। অভিজ্ঞতা বলে, ঐ সব জ্ঞান যত বেশি উচু মার্গে যায়, তত বাড়ে গণ-মানুষের সাথে বিচ্ছিন্নতা। খিলজি ভাই গণবিচ্ছিন্ন ছিলেন না।

এবং তিনি বহু অর্বাচীনের তুলনায় ভদকার স্তপকা গুনতে জানতেন, কত নম্বরের পরে মাতাল হবেন সে বিষয়ে জ্ঞান ছিল টনটনে। এবং সময় মত থামতে জানতেন। তাকে কখনই মাতাল দেখা যায়নি। ওই শীতের দেশে একটু আধটু মদ খাওয়া ছিল নর্মাল, তা কারুরই চরিত্র বৈশিষ্ট্য ব্যাখ্যা করতো না।

আগের দিনগুলোতে দেশ থেকে লোক আসতো হয় প্রফেশনাল পড়াশুনো করতে, নয় পার্টি স্কুলে ট্রেনিং নিতে, নয় বিভিন্ন অনুষ্ঠানাদিতে ডেলিগেট হয়ে।কিছু কমরেড অবশ্য আসতেন চিকিৎসার জন্য।

যারা সোভিয়েতমুখো হতেন কম বেশি সবাই ছিলেন বাম ঘরানার। সরকারি বৃত্তি নিয়ে যারা আসতো তাদেরও বেশিরভাগই কোনো না কোনো ভাবে সম্পর্কযুক্ত ছিল এই ঘরানার সাথে। বাম শক্তি বাংলাদেশের রাজনীতিতে বরুন ফলের সমান অবদান রেখেছে বলে, এটা ভাবার কোনই কারণ নেই যে আমাদের দেশে এরা সংখ্যায় কম ছিল। “বামপন্থীরা বালখিল্য রোগে ভোগে”-লেনিন বলেছিলেন এবং এরা অতি নিষ্ঠার সাথে সেই রোগে ভুগেছেন, কারণ লেনিনের বাণী ভ্রান্ত হোক তারা তা চাননি। 
 
যেহেতু রাশিয়ায় কমিউনিস্ট পার্টি ক্ষমতায় এবং খিলজি ভাই ছিলেন ভাতৃপ্রতিম পার্টির লোক, সুতরাং তিনিও যথেষ্ট ক্ষমতা রাখতেন। ছাত্রদের এক শহর থেকে অন্য শহরে ট্রান্সফার করে আনা নেয়া করা এবং প্রয়োজনে অবাধ্য এবং সোভিয়েত রাষ্ট্রের জন্য ‘ক্ষতিকর’ ছাত্রদের বহিস্কার করার পরামর্শ দেয়া ইত্যাদির এখতিয়ার তার ছিল।

তবে তার পরামর্শ মতই যে সব কাজ হতো তা নয়। যেমন তিনি কাউকে বহিস্কার করার পরামর্শ দিলেও, সেই ছাত্রের আর্থ্য-মাহাত্মে স্থানীয় নেতৃবন্দ বা গুপ্ত পুলিশ সন্তুষ্ট থাকলে তাকে সরানো ছিল তার সাধ্যের বাইরে ।

এখানে একটা অতি গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ এসে যায়। তা হলো পুঁজিবাদি দেশগুলোর মতই সোভিয়েত ইউনিয়নে রাষ্ট্রের ভেতরে ছিল রাষ্ট্র, শহরের ভেতরে শহর, পার্টির ভেতরে পার্টি। বুদ্ধিমান যারা তারা আপন আপন লোকগুলোকে চিনে নিয়ে নিজস্ব গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করার মরণ-পণ লড়াইয়ে লিপ্ত থেকেছে।

যেমন বলা হতো ব্যবসা ভালো না, অথচ ছাত্ররা ব্যবসা করার জন্য বিদেশে যেতো ডিনের পার্মিশন ও আভির থেকে ভিসা নিয়ে। যে কাজ তাদের দেশের জন্য খারাপ সে কাজ করতে তারা ভিসা দিতো। শুধু তাই নয় ডিন অফিস ও আভিরে ব্যবসায়ি ছাত্রদের কদর ছিল রাজপুত্রদের মত, অথচ তাদের সমাজের বিশুদ্ধতা রক্ষা করার মিশন কাঁধে নিয়ে সুদীপ অভ্রের মত যারা ব্যবসা করতোনা, তাদের ছিল বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অচ্ছুতের দশা। তাদের বাইরে তো দূরের কথা এক শহর থেকে আর এক শহরে যেতে ভিসা পেতে গা কাঁপিয়ে ম্যালিরিয়া জ্বরের মধ্য দিয়ে যেতে হতো। অর্থাৎ গ্রাম্য ভাষায় যাকে ‘ভোদাই’ বলা হয়, সব সমাজেই সে ভোদাইয়ের মর্যাদা নিয়ে বাঁচে। গোলাপকে গোলাপ আর গোবরকে গোবর বলার জন্য যারা হেগেল-মার্কস করে, তাদের যে আসল নাম কী তা জানার প্রয়োজন আছে কি?
 
১৯৮৮-৮৯ সালের দিকে এটা স্বচ্ছ হয়ে আসে যে সোভিয়েত পার্টি তার নিয়ন্ত্রণ হারাচ্ছে। দৃশ্যমান জগতের চেয়ে অদৃশ্যমান জগত যেমন অনেক বেশি বড়, দীর্ঘকাল ধরে অদৃশ্যমান তাস্কর্যের

বৃহৎ সৌন্দর্যে অবগাহন করা জনগণের নেতারা পথ খুঁজতে থাকে কিভাবে সঞ্চিত অর্থ পরিবর্তনের ডামাডোলে সংরক্ষণ করা যায়। পবিত্রতম এই প্রশ্নে কম্যুনিষ্ট, ক্যাপিটালিস্ট, হাজি, পাজি, ড্রাগ ডিলার, ডিক্টেটর সবাই এক। টাকা বর্ডার পার করাতে হবে জনতার দৃষ্টি এড়িয়ে এবং যত শীঘ্র সম্ভব তত ভালো। ভেতর থেকেই বিশ্বস্থ কিছু বিদেশি কমরেডকে বলা হয় আমাদের কিছু বিদেশি ফার্ম দরকার, আমরা তাদের সাথে ব্যবসা করবো। বিদেশি জেনুইন কোম্পানিগুলো আসার আগেই, অনেকে বিদেশি ছাত্র-ছাত্রি আমেরিকা, সিঙ্গাপুর, হংকং বা অন্যদেশে গিয়ে নামে মাত্র কোম্পানি রেজিস্ট্রি করে সিল ছাপ্পর নিয়ে আসে। শুরু হয় মানব জাতির ইতিহাসের অন্যতম বিশাল পুজি পাচারের সুনামি।

দেশি কোম্পানিগুলো হার্ড কারেন্সি একাউন্ট খুলতে পারতো না, কিন্তু বিদেশি কোম্পানিগুলো পারতো। দেশি ও বিদেশি কোম্পানির মধ্যে “ক্রয়-বিক্রয়”, “কনসালটিং ফি”, “নো হাউ”, “মেনেজমেন্ট ফি”, “মার্কেটিং”, “লিজিং” ইত্যাদির নামে বিভিন্ন মনগড়া চুক্তি স্বাক্ষর করে কোটি কোটি টাকা ও সম্পদ বৈধভাবে পাচার হয়ে যায়। অপরিচিত এই শব্দগুলো তখন রাশিয়ার ঝরা-পাতার খসখসানি, তুষারপাতের শব্দ ও বুকের কান্নার ফোপানিকে আচ্ছন্ন করে দিয়েছিল। বোবা মানুষগুলো বিশ্বস্ত ও বোবা কুকুরের মত তাদের নেতা ও প্রভুদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আস্তে আস্তে পথে নেমে আসতে শুরু করেছিলো ভুল বাঁশিওয়ালাদের বাঁশির সুর শুনে।

এই নাম সর্বস্ব বহু কোম্পানি বড় বড় রাষ্ট্রিয় সংস্থা থেকে টাকা পেয়ে মাল পাঠায়নি। বরং নিঁখোজ হয়ে গিয়ে ঐ সব সংস্থার নেতৃত্বের সাথে টাকা ভাগাভাগি করে নিয়েছে। বহু বিদেশি এই কাজ করেছে। এবং খুব ভালো করেছে। কারণ মৃত সমাজতন্ত্রের জন্য অশ্রু ফেলার মানুষের অভাব কোনোদিন হবেনা। কিন্তু এখন যাদের উপকার দরকার তারা সবাই ১০০% ই মার্কস-লেনিনের শিষ্য। সবাই পার্টির নেতা, পার্টির কর্মি।

গর্বাচভ বা ইয়েল্ৎসিন কে?

সোভিয়েত কমিউনিস্ট পার্টির নেতা।

ক্রাভচুক ও শুশকেভিচ, যারা ইয়েলৎসিনের সাথে এক টেবিলে বসে সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে দেবে, তারা কারা?

কমিউনিস্ট পার্টির নেতা।

ইগর গাইদার ও চুভাইস, যারা দেশের সমস্ত সম্পদ, কল কারখানা, খনি, বন, ট্রান্সপোর্ট, অ্যাভিয়েশন লাল-ডিরেক্টরদের কুক্ষিগত করতে দেবে প্রায় বিনা পয়সায় তারা কারা?

কমিউনিস্ট পার্টির নেতা ।

এই লাল ডিরেক্টরেরা, যারা রাষ্ট্রিয় সম্পদ হস্তগত করে বিশাল বিশাল অলিগার্খে ( oligarchs) পরিণত হবে, তারা কারা?

কমিউনিস্ট পার্টির নেতা।

তারা যদি এতই ভালো হয়, তাহলে এই নিয়ে কোনো মার্কসবাদীরই কোনো রাগ অভিমান থাকার কথা নয়। সোভিয়েত ইউনিয়নে ক্ষমতা যাদের হাতে ছিল, ভেঙে যাবার পরে ( রাশিয়া বা অন্যান্য প্রাক্তন সমাজতান্ত্রিক দেশগুলোতে ) ক্ষমতা এখনও তাদের হাতেই আছে। শুধু আগে তাদের স্যালুট দিয়ে ডাকা হতো ‘তাভারিশ’(কমরেড) বলে, এখন বলা হয় ‘গসপাদিন’ বা স্যার। কমরেড শব্দের অর্থ বন্ধু, ক্ষমতায় যাওয়ার পূর্ব-সন্ধ্যা পর্যন্ত, তারপরে তো নেতারা আসলেই গসপাদিন।
 
আগে যদি এই লোকগুলোকে কেউ ঠগ হিসেবে না চিনে দরবেশ হিসেবে চিনে থাকে, এটা তো তাদের দোষ নয়। দোষ তাদের যারা ভুলকে ফুল ভাবে, মরিচিকাকে মধু। পদ্মলোচন নামে ডাকলেই অন্ধ ছেলে দৃষ্টিবান হয়না। ওই দেশটি মানবজাতির জন্য বহু ভালো কাজ করা সত্ত্বেও “সোনার পাথর বাটি”র নাম দিয়েছিল পদ্মলোচন। সুদীপ, অভ্র, খিলজির দল তা বুঝতে পারেনি, তারা এক আফিমের ভয়ে অন্ধের মত ছুটতে ছুটতে অন্য আফিমে ঝাপ দিয়ে মানবিক যুক্তি ও বিচার-বোধগুলো হারিয়ে ফেলেছিল। কিন্তু তারা যে খুব বঞ্চিত হয়েছে তা নয়, পেরেস্ত্রোইকা তাদের এনে দিয়েছে সুযোগ-সুবিধার রূপালি সাম্পান এবং তারা সহজেই চড়ে বসেছে। 
 
সুদীপ, অভ্র, খিলজি ভাই এবং অন্যেরা আজ ব্যবসার নামে যে কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হয়েছে, তারা জানে তা ব্যবসা নয়। তারা বিশ শতকের মননশীল মানুষের মনের মূল ধরে নাড়া দেয়া একটি বিশাল প্রতিশ্রুতির মৃত্যু-শয্যায় হরিলুটের বাতাসা লুটছে। এই মৃত্যু হতোই, বিশুদ্ধতম পুজারীও মিথ্যার মন্দিরের ভাঙন রোধ করতে পারেনা। বাংলাদেশে যে নেতারা বৃটিশ আমল থেকে ত্যাগ করে এসেছেন, জীবন-যৌবন বলি দিয়েছেন মানবতা মুক্তি ও সমাজ-বিপ্লবের বেদীতে, তারা “সোনার পাথর বাটি” আর “পদ্মলোচনের” ফারাকটা বুঝে উঠতে না পেরে বিশুদ্ধতম স্বৈরতন্ত্রকে পুজা করেছেন বিশুদ্ধতম সমাজতন্ত্র হিসাবে। এবং তারা তাদের মন্দির ধ্বসে যেতে দেখে অশ্রু ফেলেছেন আর বলেছেন, “সাম্রাজ্যবাদ, এটা সাম্রাজ্যবাদের কুকীর্তি”, কিন্তু একবারও স্বীকার করেননি যে তাদের সমাজতন্ত্রের ফাউন্ডেশনে ছিল মানুষের হাড়, খুলি আর কঙ্কাল, পোক্ত ফাউন্ডেশনের জন্য যা অবিশ্বাস্য রকমের ভঙ্গুর মেটেরিয়াল।

তাবৎ পুঁজিবাদি দুনিয়ার অজগরেরা হা করে আছে। তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করবে কারা? সুদীপ, অভ্র ও খিলজিরা, যারা সুযোগ বুঝে নৌকা ও রং বদলাতে পারে? নাকি তারা যারা সৎ, ঋজু, কট্টর ও প্রায় অন্ধ, যারা স্ট্যালিনের রাশিয়াকে সমর্থন করেন যখন সেখানে ভিন্নমতের কমরেডদের হত্যা করা হয়, আবার ক্রুশ্চেভকেও সমর্থন করেন যখন ব্যক্তিপুজার অভিযোগ তুলে স্ট্যালিনের হত্যাযজ্ঞের কঠোর নিন্দা করা হয়। আবার ব্রেজনেভকেও সমর্থন করেন যখন তিনি নীরব অভ্যুথ্থানের মাধ্যমে ক্রুশ্চেভকে ক্ষমতাচ্যুত করে সমাজতন্ত্রের নতুন তত্ত্ব দেন। এ কোন্ ধরনের মেরুদণ্ড? সত্য ও সততা কি এতই তরল হয়?

নির্লজ্জ ও নীতি-বিভ্রান্ত তোষণ?

যারা এত গুনী, এত বিজ্ঞ, টাকায় যারা বিক্রীত হননা, তাদের কোন মুদ্রা দিয়ে কেনা হয়, যে একটা দেশ, যার নীতির পেন্ডুলাম ১৮০ ডিগ্রি বিপরীতে গেলেও তার প্রতি সমর্থন থাকে অবিচল?

কী দিয়ে ভারতবর্ষের ত্যাগী কমরেডদের কেনা হয়েছিল?

আদর্শের অচেতন অন্ধত্ব দিয়ে?

পরিবর্তনের ডামাডোলের অশ্বারোহী বখতিয়ার খিলজিরা একটি অদ্ভুত আইন লক্ষ্য করেনঃ একজন কমরেডের টাকা পাঠিয়ে উপকার করে দিলে, তার হাত ধরে আরেকজন কমরেড আসে, তারপরে আরেকজন, তারপরে লাইন পড়ে যায়। এক একজন বিশাল বিশাল মানুষ। এশিয়া, আফ্রিকা, ল্যাটিন আমেরিকাসহ সারা বিশ্বের মানুষের ভাগ্য নিয়ে নাড়াচাড়া করেন যারা, সেই সব মানুষ। এরাই তো ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মত নিঃস্ব ও ছোট্ট একটি দেশের জীবন-মরণ সংগ্রামে আপাত নিঃস্বার্থভাবে এগিয়ে আসা অদ্ভুত, উদার, অনিন্দ্য এবং সুবোধ সব মানুষ, যারা ডলারের বস্তা কাঁধে মোহাজের হবার জন্য অজু করে বসে আছে।



১৯ তম পর্ব


পরের সপ্তায় সুদীপ কথামত বখতিয়ার ভাইয়ের থেকে টাকা ও টিকেট নিয়ে সিঙ্গাপুরে চলে যায়। সিমলিম স্কোয়ারের “ফিউচার কম্পিউটার এন্ড ইলেকট্রনিক্স” ছিলো তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে আসা কম্পিউটার ক্রেতাদের বুদ্ধ গয়া। সুদীপ সেখানে গিয়ে কম্পিউটার ও ফ্যাক্স কেনে পরের দিন। একদিন পরে ফিরতি প্লেনে চেপে বসে। তার সিঙ্গাপুর ঘুরে দেখার মত আর্থিক সংগতি তখন ছিলোনা। একদিন বেশি থাকা মানে বেশি খরচ।

মস্কো এয়ার্পোর্টে বখতিয়ার ভাইয়ের ড্রাইভার তাকে খুব সমীহ করে তুলে নেয়। ১ সপ্তাহের মধ্যে পণ্য বিক্রি হয়ে যায়। ১৫০০ ডলার লাভ হয়। বখতিয়ার ভাইয়ের ঋণ শোধ করে দিয়ে সুদীপের এখন একটা কম্পিউটার ও ফ্যাক্স আনার পুঁজি দাঁড়িয়ে যায়।

ততদিনে গ্রীষ্মের ছুটি শুরু হয়েছে। আলিওনার ১ম বর্ষ শেষ, প্র্যাকটিকাল শুরু হবার আগে সপ্তাহ দুই ছুটি আছে। লাবণ্য বড় হচ্ছে নানির আদরে-স্নেহে। অভ্র বলে “একটা সুযোগ আছে। আপনি ভাবীকে সিঙ্গাপুরে নিয়ে যান। খুব ভালো লাগবে। এক প্রাক্তন কমরেড ভাবীর টিকেটের খরচ দেবেন, ভাবী তার জন্য একটা কম্পিউটার ও ফ্যাক্স নিয়ে আসবে আর আপনি আপনারটা নিয়ে আসবেন।”

সুদীপ সেই প্রাক্তন কমরেড বড় ভাইকে খুব ভালো জানে। একসাথে রাজনীতি করেছে বহুদিন। তিনিও যথেষ্ট স্নেহ করতেন।সুদীপের কাছে প্রস্তাবটি একটি বিশাল সুযোগ মনে হয়। এই প্রথম তার আলিওনাকে নিয়ে কোথাও যাবার সুযোগ এসেছে। বলা চলে বিলম্বিত মধু চন্দ্রিমা যাপন, তাও সিঙ্গাপুরে। যৌবন যখন টগবগ করে কে এমন সুযোগ হারায়?

ভ্রমণটা ছিল সত্যই অদ্ভুত। আলিওনার প্রথম বিদেশে যাওয়া। সে এত বেশি মোহিত হয়েছে সিঙ্গাপুর দেখে যে সে তার ক্লাসের বান্ধবিদের এ গল্প করতে ক্লান্তি বোধ করেনা। 
 
যদিও ১৯৯০ সালে ম্যারিনা বে এখনকার মত এত ঝলমলে চাকচিক্যময় ছিলোনা তবুও তা ছিল আজকেরই মত বিশাল ট্যুরিস্ট এট্রাকশানের স্থান। পৃথিবীর দামীতম স্থাপত্যগুলোর অন্যতম, মাথার ওপরে একটি বিশাল ও সুন্দর জাহাজ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তিনটি অভ্রভেদী বিল্ডিংয়ের এনসেম্বল ‘ম্যারিনা বে সেন্ডস’ তখনও তৈরি হয়নি। তারপরেও সেই সুন্দর, পরিচ্ছন্ন, শান্ত ম্যারিনা বে'র তীরে সুদীপ নিয়ে গিয়েছিল আলিওনাকে। লোকজন এখানে হাঁটতে পছন্দ করে, বিশেষ করে সন্ধ্যার পরে। বহু যুবক যুবতী হাঁটে জোড়া বেঁধে বেঁধে।

সেই বিকেলে ওরা ছিল অনেক জোড়ার মধ্যে সুন্দরতম। সুন্দরতম কারণ তাদের মধ্যে ছিল দুইটি মহাদেশের কমপক্ষে দুইশ হাজার বছরের ভালোবাসার তৃষ্ণা। একটি ধবধবে সাদা বিশাল তেজি সিংহের মুখ থেকে জল ঝরে পড়ছিল সমুদ্রে। সে আর আলিওনা দেখছিলো দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে মুগ্ধ হয়ে। এত সুন্দর জায়গায়, এত সুন্দর আবহাওয়ায় সুদীপকে ওর মনে হয়েছিল হাজার জনমের নিভৃত জন, যে তার ব্যবহারের নম্রতার মতই স্পর্শেও অসম্ভব কম্র ও সেনসুয়াল। যার সাথে নিবিড়তার প্রতিটিবারই যেন মাথা ঝিম ঝিম করা প্রথমবার।
 
জলের পাশে বহু বেঞ্চ রয়েছে বসার। কিন্তু কিছুক্ষণ হাঁটা হাঁটি করার পর সুদীপ গিয়ে বেঞ্চের বদলে ঘাসের ওপরে গা এলিয়ে দেয়। আলিওনা হয়তো বেঞ্চে বসতেই বেশি পছন্দ করতো, কিন্তু সেও সুদীপের পাশে নরম ঘাসে বসে। জলে ছোট ছোট ঢেউ আর ঝিলমিল করা আলো। দূরে বড় ওভারব্রিজটিকে আবছা আলোতে ভুতুড়ে রূপকথার রাজ্যের মত মনে হয়। আকাশে একশ বিলিয়ন তারা টিম টিম করছে।

সুদীপের ইচ্ছা করে চুপ করে পানির দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে আলোর খেলা দেখতে। কিন্তু আলিওনা কথা বলে, তার গত ২৪ ঘন্টায় জমে উঠা বিস্ময়কর অভিজ্ঞতাগুলো শব্দের প্রজাপতি হয়ে ডানা ঝাপটায়। সুদীপের ভালোই লাগে ওর উচ্ছাসমুখর কথা শুনতে।
 
পরের দিন প্রায় সারাটা দিন ওরা কাটায় সেন্টোসা দ্বীপে, কখনও তপ্ত বালুতে পাশাপাশি রৌদ্রস্নান করে, কখনও জলে নেমে উচ্ছল সাঁতরিয়ে জলকেলি করে। সুইমিং ড্রেসে আলিওনাকে অপূর্ব লাগে, শরীরের খুব সামান্যই ঢাকা, মসৃন সুন্দর ত্বক, দেহের গঠনে কোনো ছন্দপতন নেই, লম্বা ও স্লিম ।

এমন নয় যে সে তাকে এত উন্মুক্তভাবে এত কাছ থেকে দেখেনি। কিন্তু উষ্ণ আবহাওয়া, সমুদ্র, সিঙ্গাপুর এমন একটা মাদকতার সৃষ্টি করে যে সুদীপের মনে হয় যেন আলিওনা ওর স্ত্রী নয়, প্রেমিকা, যাকে সারা বছর ভালোবাসা যায়। এবং তৃপ্তি মেটেনা।

সিঙ্গাপুরে আসার আগের দিন একটা ঘটনা ঘটেছিল যা সুদীপের বুক কাঁপিয়ে দিয়েছিলো অশুভ আশংকায়। ও আলিওনাকে নিয়ে উঠেছিল দিদারের হোস্টেলে, দিদারের রুমে। দিদারকে সুদীপ দেশে থাকতেই চিনতো। ওদের এলাকার ছেলে। ওকে ছাত্র ইউনিয়নে এনেছিল সুদীপই। খুব মেধাবি ও আড্ডাবাজ। সহজেই মানুষকে দলে ভেড়াতে পারে। নাটক করে, নাচে, গান বাজনা করে। কবিতাও আবৃত্তি করে। সুদীপ যখন ওদের গ্রামের সম্মেলনে শহর থেকে প্রথম বক্তৃতা দিতে যায়, সেখানে দিদার উপস্থিত ছিল কৌতুহলবশে। সুদীপের বক্তৃতার ভাষা ও স্বরগ্রামের কম্পন, শোষণহীন সমাজ ও মানবতা মুক্তির প্রতিশ্রুতি তাকে চমকিত করে। সৎ মেধাবি ও প্রগতিশীল ছাত্রদের একমাত্র ছাত্র সংগঠন, ছাত্র ইউনিয়নই যে ছাত্র সমাজের দাবী আদায় করতে পারে এই কথাগুলো দিদারের চুম্বকের মত মনে হয় ।

তারপরে সুদীপ যখন মিটিং শেষে কর্মিদের সাথে আড্ডা দিতে বসে সুনীলের “কেউ কথা রাখেনি” আবৃত্তি করে শোনায়, তখন দিদারের মনোজগতের কোনো একটি তারে ঝংকার ওঠে, সে একটি ভালোলাগার তড়িৎ সঞ্চারণে সম্মোহিত হয়। সে সুদীপকে আপন করে নেয়। তারপরে ছাত্র রাজনীতিতে নেমে আসে। কৃষক পরিবারের সহজিয়া জীবনে অভ্যস্ত দিদার মাইলের পর মাইল হেঁটে গ্রামে গ্রামে গিয়ে ছাত্রদের সংহত করে, হয়ে ওঠে মানবতা মুক্তির স্বপ্নচারী, যে স্বপ্ন মার্কস ও লেনিন দেখান, সেও হয়ে ওঠে তার নিপূন ফেরিওয়ালা। অল্পদিনের মধ্যে সে এলাকার সংগঠনের সভাপতি নির্বাচিত হয়। ছাত্র সে ভালো ছিল। গ্রামের কলেজে পাশ করে শহরে যাবার সময় এসে যায়। বুয়েটে ভর্তি হয়। তারপরে সোভিয়েত ইউনিয়নের স্কলারশিপ পেয়ে চলে আসে সুদীপের আসার বছর তিন পরে। সব রাস্তা রোমে যায়, সব নদী সমুদ্রে। সব মানবতা মুক্তির স্বপ্নাচারীকে মস্কো হাতছানি দেয় ছিনালি স্বপ্নের মত।
 
তাকে পাঠিয়ে দেয়া হয় সুদূর জর্জিয়া রিপাবলিকের তিবিলিসি শহরে। একটুকরো এডেনের উদ্যান চুরি করে তৈরী প্রাচীন আইবেরিয়ার এই শহর। এখানে পাহাড় পাহাড়ের দিকে চেয়ে থাকে, প্রাচীন মন্দির মন্দিরের দিকে। এখানে অনেক উঁচু পাহাড়ে দেয়াল ঘেরা “নারিকালা” দুর্গে সেই ৪র্থ শতাব্দি থেকে বন্দী হয়ে আছে সময়। ঝর্নারা গান গায় সেখানে, “সময় নেই আমার” এই বলে “মৎকিভারি” বা “কুরা” নদী ছুটে চলে সোমত্তা রমনীর মত। আঙুরের লতায় স্বপ্নেরা আঙুর হয়ে ঝুলে থাকে, চায়ের পাতায় ঝলমল করে রোদ। বাতাস মৌ মৌ করে পাকা পীচফলের গন্ধে।

নিশ্চয়ই লিলিথ ও ইভ - স্বর্গীয় দুই নারী হেঁটেছে আইবেরিয়ায়, তা নইলে কি করে এত সুন্দর হয় মর্ত্যের মাটি? কি করে জিউসের চিল উড়ে বেড়ায় ককেশিয়ার অপূ্র্ব আকাশে জর্জিয়ার রূপান্ধ না হলে?

১ বছর সে ভাষা শেখে এই শহরে। লিলিথ যখন আদমকে ফেলে উড়ে চলে গিয়েছিল লোহিত সাগরে, এবং আদম ক্লান্ত ছিল একাকীত্বের জ্বরে, ঠিক তেমনি পদ্মাতীর থেকে আসা দিদার ছিল একাকীত্বের তুঁত-মিশ্রিত হতাশায়। সে খিলজি ভাইকে ধরে মস্কোতে নিয়ে আসার জন্য।
 
খিলজি ভাই সহায়তা করেন। সে মস্কো চলে আসে। মস্কোর মাটির নীচে বিশাল শহরের মত লেফরতভা নামে যে অভিশপ্ত ইমারতটি আছে, যার প্রতিটি সেলে সেলে, দেয়ালে দেয়ালে রয়েছে বহু অন্ধকার ও ছায়া, বহু দীর্ঘশ্বাস, কান্না ও রুধিরের পাতাল গঙার ইতিহাস, সেই লেফরতভা জেলের কাঁধের ওপরে অনেকগুলো হোস্টেল দাঁড়িয়ে আছে। তার একটিতে তার স্থান হয়।

প্রতি ভোরে ফর্সা হয়ে ওঠার আগে আগে অনেকের মতই সেও শুনতে পায় বড় বড় লড়ির যাওয়া আসা, সেই ভুতুড়ে ও রহস্যময় পাতাল জগতের ফটকের খোলা ও বন্ধ হবার শব্দ। তারপর সারাদিন সেখানে কোন কাকপক্ষীও দেখা যায়না। লেনিনের বিপ্লবকে সমাধিস্থ করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল লেনিন জীবিত থাকতেই, লেফোরতভা জেল ছিল সেই কবর খনকদের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার।

দিদারেরও সিঙ্গাপুরে যাবার কথা সুদীপের সাথে একই ফ্লাইটে। সাথে যাবে একজন খুবই স্পেশাল ব্যক্তি। সে একটি ফুলের মত যৌবনবতী আর দিদার পদ্মার হাওয়ার মত পবিত্র। সে পুষ্পিতাকে ভালোবাসে। কিন্তু ফুল কখনই একজনের জন্য ফোটেনা। পদ্মার হাওয়ার মত তরুন যারা তারা এ সত্যটি বোঝে খুব দেরি করে। পদ্মাতীরের মানুষ, স্বপ্নের রামধনুতে হাঁটা মানুষ।

গ্রীষ্মকাল। দিদারের চারজনের রুম খালি, পুষ্পিতার রুমেও তাই। আগের রাতে ট্রেনে চড়ে সুদীপ ও আলিওনা এসে পৌছায়, ওরা রাত কাটাবে হোস্টেলে, পরের দিন রওনা দেবে সিঙ্গাপুর।

আলিওনা বলে, “আমি চুল কাটিয়ে আসি, তারপরে আবার বলে আমি যদি চুল সাদা রং করি কেমন হয়?”

সুদীপের পছন্দ হয় আইডিয়াটি, সে সম্মতি জানিয়ে মাথা নাড়ে।

হোস্টেল থেকে হেয়ার ড্রেসারের স্টোর পর্যন্ত মাত্র ৫-৭ মিনিটের হাঁটার পথ। ৪ টার দিকে বের হয়ে যায় আলিওনা কিন্তু আর কোনো খবর নেই। দিদারের রুমে খাদ্য, আড্ডা, হৈ হুল্লোড়, ভদকা ও জীবনের কোলাহল। সবাইকে বিদায় দিয়ে যখন হুঁশ হয় তখন রাত ৯টা এবং আলিওনার খবর নেই। সুদীপের চোখ ছানাবড়া, দৌড় দৌড় দৌড়, আলিওনার খোঁজে।



২০ তম পর্ব

খেজুরের রস চুরি করতে গিয়েছিল দিদার, দুই বন্ধুকে নিয়ে। ঘুট ঘুটে কালো রাত। কিন্তু চোরের চোখ বিড়ালের চোখ, সব দেখতে পায়। কিন্তু খেজুর গাছের গোড়ায় চারিদিকে যে গৃহস্থ খেজুরের পাতা আর কাঁটা দিয়ে ফাঁদ পেতেছিলো, তা দেখতে পায়নি। ওদের মধ্যে যার গাছে উঠার কথা ইতিমধ্যেই তার পা কাঁটায় বিদ্ধ হয়েছে। কিন্তু ওরা পেশাদার চোর নয়, শখের চোর। সে ঠিকই গাছে উঠে যায়। গাছ তো নয়, বেহেশতের সিড়ি, এতই লম্বা !
ওর মুখে একটা দড়ি যার মাথায় আংটা বাঁধা। এক হাতে বাদুর ঝোলা হয়ে রসের হাড়িটা নামিয়ে যেই সে আংটাতে ঝুলাতে যাবে, হাড়িটা হাত ফসকে পড়ে যায়। দিদার ছিল নীচে, ভাগ্যিস মাথায় পড়েনি। মাথায় পড়লে অবশ্য খারাপ হতোনা, আওয়াজ কম হতো। রাতের নির্জনতায় একটা রসের হাড়ি যে কতখানি আওয়াজ করতে পারে তা যে রস চোর নয় তার পক্ষে অনুধাবন করা অসম্ভব।
 
গৃহস্ত বাড়িতেও যে লোকজন এত মানুষ হৈ হৈ করে জেগে উঠতে পারে সেটাও একটা বোধের অতীত ব্যাপার। দিদারের সাথে নীচে যে তৃতীয়জন ছিল সে ভো দৌড় মারে। কিন্তু একজন তো গাছে।

দিদার ওকে ফেলে পালাতে পারছে না, বলে “লাফ দে শালা, লাফ দে”। কিন্তু ও ভয় পায়, নীচে যে পরিমাণ লম্বা লম্বা কাঁটা তা নির্ঘাত পা দিয়ে ঢুকে মাথা দিয়ে বের হবে। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই যে একটা কিলও মাটিতে পড়বেনা সেই ভবিষ্যত চিন্তা করে সে শেষ পর্যন্ত লাফ দেয়। কাঁটা মাথা দিয়ে বের হয়নি কিন্তু ওর ডান পায়ের পাতা এঁফোড়-ওঁফোড় হয়ে গেছে। সে দৌড়ানো তো দূরের কথা হাঁটতেও অপারগ। দিদার তাকে কাঁধে নিয়েই ছোটে।খড়িয়ার টেক পার হয়ে নিশ্চিত হয় যে বিপদ কেটে গেছে। তখন ওরা হাঁটতে শুরু করে। একজন দিদারের কাঁধে ভর দিয়ে ল্যাংড়ায়।

রাতের অন্ধকার আবহমান কাল ধরেই প্রেমিক-প্রেমিকার বান্ধব হিসেবে কাজ করেছে, কিন্তু রস চোরের জন্যও যে সে কত বড় বান্ধব এই স্বীকৃতিটা কোনো চোর অন্ধকারকে কোনোদিন দেয়নি ।
আজকের দিনে হলে যাকে টিটেনাস গ্যাংগ্রেনে নির্ঘাত মারা পড়তে হতো, সে লোক এক সপ্তাহ খুড়িয়ে খুড়িয়ে হাঁটার পর আবার রস চুরি করে আসে সফল ভাবে। একেই বলে অধ্যবসায়। যারা বলে অভিজ্ঞতার দাম নেই তারা যে অনভিজ্ঞ এর চাইতে বড় প্রমাণ আর হয়না।

নৈশ অভিযানগুলোর দিদার ছিল মাস্টার মাইন্ড। জীবনে বেশিরভাগ অভিযানই তার সফল হয়েছে। গ্রামের মেয়েরা ওর দিকে বাঁকা চোখে তাকাতো, লম্বা চৌরা লিকলিকে। কিন্তু ওর মাথায় তখন বিভিন্ন রকমের চিন্তা।
দিদারের মাথা ভালো, সে ভালো রেজাল্ট করতে খুবই ইচ্ছুক ।
 
কিন্তু সে একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছে যে, পড়াশুনো করে ভালো রেজাল্ট করে অর্ডিনারি ভালো ছাত্রেরা , যারা মূলত বইয়ের পোকা। বইপড়া ছাড়াও সংসারে বহু কাজ রয়েছে যা অনেক বেশি আনন্দদায়ক এবং প্রয়োজনীয়। সে নিশ্চিত যে বেশিরভাগ সফল মানুষই অন্যকে ব্যবহার করে বা ঠকিয়ে সফল। এবং সেও ভালো রেজাল্ট করতে সক্ষম হবে পড়াশুনো ছাড়াই, যদি সে কোনভাবে ভুত প্রেত জ্বিন পরী ইত্যাদির শক্তিকে কাজে লাগাতে পারে। ১৪-১৫ বছর বয়সেই সে বহু রাত কাটায় ভুত প্রেতের সন্ধানে। ভয় বলে একটা কথা যে আছে, তা তার অভিধানে ছিলোনা। এটা তো প্রতিষ্ঠিত সত্য সে গাবগাছে ভুত থাকে, বিশেষ করে তা যদি হয় ঝাকড়ানো গাব গাছ। সে কম গাব গাছের ডালায় বসে বা ঘুমিয়ে রাত কাটায়নি।
 
কিন্তু ভুতের দেখা পায়নি।

তাদের গ্রামের ১০-১৫ মাইলের মধ্যে এমন কোনো শ্মশ্মান বা গোরস্থানও ছিলোনা যেখানে তার রাত কাঁটেনি। কিন্তু তার প্রচেষ্টা অসফল রয়ে গেছে। রাত বিরাতে গোরস্থানের পাশে ইলিশ মাছ ভাঁজতে নেই। ভাজা ইলিশের গন্ধ সেই এলাকার ভুতের, সে যেখানেই থাকুক না কেন, নাকে ঢুকবেই এবং যে মাছ ভাজছে তার পেছনে এসে বসে থাকবে। যখন সে মাছ নামিয়ে রাখবে, সেই পাত্র থেকে ভুত আস্তে আস্তে ভাজা মাছ সাবাড় করে দেবে। কত মানুষের সাথে যে এই ঘটনা ঘটেছে তার ইয়ত্তা নেই।
 
অনেকগুলো গোরস্থান ঘুরেও যখন সে কোন অলৌকিক প্রাণির সাক্ষাত পেতে অক্ষম হয় তখন সিদ্ধান্ত নেয় সবচাইতে দু:সাহসী নীরিক্ষাটি করার। সে একটি কেরোসিনের স্টোভ, কড়াই, তেল ও ইলিশ মাছ নিয়ে কোষা নৌকায় চড়ে বসে। নৌকা বাঁধে গোরস্থানের পাশের হিজল গাছটিতে। রাত দশটার মত হবে। তখন ভাদ্র মাস, সারা বিল থৈ থৈ পানি। আমন ধান আর দল দামে ভরা, মাঝে মাঝে দু চারটা ধঞ্চে শোলার ঝোপ। শাপলা ফুলে বিল একাকার।
শুধু গোরস্থানটিই পানির ওপরে ।

চারিদিকে অন্ধকার, গ্রাম ও বাড়িঘরগুলো দূরে দূরে, সেখানে খুব ছোট ছোট বিন্দুর মত দু একটা বাতি দেখা যায়। বেশ কিছু দূরে অশ্বিনী মালোর নৌকায় টিম টিম করছে বাতি, অশ্বিনী মালো ভেসাল বাইছে। তার নৌকায় ছোট একটা ছই। রাতে সে ভেসাল বাওয়া শেষ করে ওখানেই ঘুমায়।
খুব ভোরে মাছ নিয়ে যায় দিঘলী বাজারে।

দিদারের সম্পূর্ণ উন্মুক্ত নাও। সে শুয়ে পড়ে চিত হয়ে। মধ্যরাতের পরে মাছ ভাজবে। এখন একটু ঘুমিয়ে নেবে। আকাশে কোটি কোটি তারা, মাঠের ফুলের মত। দূরে চলে গেছে ছায়াপথ।
সপ্তর্ষিমণ্ডলের তারাগুলো চেয়ে আছে উপুড় হয়ে। ভাদ্রের গরম শীতল হয়ে এসেছে।
বেশ ভালো লাগছে নির্জন আকাশের নীচে থৈ থৈ পানির জগতে।
ও ঘুমিয়ে পড়ে।
 
স্বপ্ন দেখে সাদা শাড়ি পড়া অপূ্র্ব সুন্দরি এক নারী। চুলগুলো ভীষণ লম্বা। একেবারে তার কোমর, এমনকি নিতম্ব ছাড়িয়ে। গায়ে ব্লাউজ নেই, উন্মুক্ত কাঁধ দেখা যায়। বিশাল আলু ক্ষেতের আল দিয়ে হাঁটছে। আলুর সবুজ কচি পাতার সমুদ্রে তার সাদা শাড়ি, কালোচুল একটা অপূর্ব মোহনীয়তা সৃষ্টি করেছে। চেহারাটা ভীষণ পরিচিত মনে হয় কিন্তু চিনতে পারছেনা। সে খুব করে চিনতে চেষ্টা করে। এ তো প্রমিলা দি। ওদের স্কুলে যেতো, ক্লাস নাইনে পড়তো। অদ্ভুত সুন্দরি ছিল, আগুনের মত নয়, পানির মত। একটা অসম্ভব কমনীয়তা ও সৌষ্ঠব ছিল তার মুখে।
কখনও পোড়াতো না, ফাল্গুনের প্রথম দিনগুলোর শীতলতার মত শান্তি ছড়াতো। সেই প্রমিলাদি কেন যেন আত্মহত্যা করেছিল। দিদার জানেনা কেন। কানাঘুষা শুনেছে যে সে ছিল নষ্ট।
ও কোনদিন বুঝতে পারেনি এত সুন্দর একটি মেয়ে নষ্ট হয় কি করে?
কে তাকে নষ্ট করে?
কেন করে?
নারী তো ফল, পাকুর বা রান্না করা তরকারি নয় যে, আপনা আপনি নষ্ট হয়ে যাবে।
আর নষ্ট কথাটার মানেই কি?
 
ও স্বপ্ন দেখে দেখে ঘুমায়। জাগে প্রায় রাত একটার দিকে। প্রথমেই খোঁজ নেয় ইলিশ মাছের টুকরাগুলো আছে কিনা। সবই আছে। ও ইলিশ মাছ ভাজা শুরু করে, ইচ্ছে করেই ভাজা মাছ রাখার থালাটা একটু পেছনে রাখে, যাতে ভুত এসে তার পেছনে বসলে মাছটা সহজেই তুলে নিতে পারে। ভাজা ইলিশের গন্ধে মৌ মৌ করে সাড়া রাতগাঁ’র বিল। এক সময়ে তার মাছ ভাজা শেষ হয়ে যায়। তার থালায় সবগুলো মাছই রয়েছে। সে খেতে শুরু করে। কিসের ভুত-প্রেত, তার মাছ সে নিজেই খেয়ে শেষ করে।
 
সে বুঝতে পারে যে, লোকজন যা বলে তা আসলেই গাঁজাখুরি গল্প। ভুত-প্রেত বলে কিছু নেই। থাকলে সে দেখতে পেতো। লেখা পড়া তার নিজেরই করতে হবে। ভাবতে ভাবতে সে ঘুমিয়ে পড়ে।
ঘুম যখন ভাঙে সে কিছু হৈ চৈ গুঞ্জন শুনতে পায়। অশ্বিনী মালোর নৌকার কাছে আরও কয়েকটি নৌকা জড়ো হয়েছে। ওরা জোরে জোরে কথা বলছে। আফসোস করছে। সে নৌকা নিয়ে এগিয়ে আসে।
 
মালো শুয়ে আছে। এত বেলা পর্যন্ত সে ঘুমায়না। তার ডান হাত মাথার নীচে এবং কনুই আকাশের দিকে, তার বাম হাঁটু ৯০ ডিগ্রিতে দাঁড় করানো। সে মৃত। লোকে নিশ্চিত যে, রাতগাঁ গোরস্থানের ভুতের কাজ এটা। দিদারের মনটা খারাপ হয়ে যায়। আহা, লোকটা রাতেও ভেসাল বেয়ে মাছ ধরেছে। গরীব মেহনতি মানুষ। এমন মৃত্যু কি মেনে নেয়া যায়? 

 
চলবে

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন