সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

হামিরউদ্দিন মিদ্যার গল্প : জোনাক জ্বলে উঠবে



 
দখিন ধারের মাটির ঘরটায় আমি আর মেজদিদি অকাতরে ঘুমাচ্ছি, হঠাৎ ভোরবেলার কাঁচা ঘুমটা মা ঠেলা দিয়ে ভাঙিয়ে দিল। ব্যাপার কী বুঝতে পারলাম না। তা হলে কি ফাঁকে শুয়ে আছি? চোখ কচলে তাকালাম, কই না তো! ঘরেই আছি। এই তো আমার পাশে দিদি ঘুমাচ্ছে। খুব গরম লাগলে এক-দুইদিন রাতে খেয়েদেয়ে উঠানে তালাই বিছিয়ে খানিক শুই। গরম একটু কমে, মাটির বুক শীতল হলে মা আমাদের উঠিয়ে দেয়।

আবার ঠেলা দিল মা, ঘুমে ঢলছে দ্যাখো! এই খ্যাপা, ওঠ। সেই থেকে ওঠাচ্ছি, কেমন মোষের মতো ঘুম দ্যাখো।

এতক্ষণে তন্দ্রা ছুটল। বাইরে কাদের কথাবার্তা কানে আসছে।কারও কিছু হল নাকি! নাকি ঠাকুমার কিছু হয়ে গেল!

কয়েক দিন ধরেই ঠাকুমার অবস্থা ভাল নয়। শয্যা নিয়েছে আর মুখ দিয়ে বিড়বিড় করছে, কালো ছায়াটা তোরা দেখতে পাচ্ছিস নি, আকাশটাকে কেমন ঘিরে ফেলেছে!

বুড়ি মানুষের কথায় কেউ তেমন কান দিই না। বয়স নব্বইয়ের চাকায় পা দিয়ে সেঞ্চুরির দিকে হামা টানছে। এই বয়সের মানুষ চোখে কালো ছায়া দেখবে না তো কি বেহেশতের বাগিচা দেখবে? তবুও দিদি আর আমি দু-একবার আকাশের দিকে ভয়ে ভয়ে তাকিয়েছি। সেখানে কালো ছায়া তো দূরের কথা, একটা বাদুড়-চামচিকেও উড়তে দেখি না। যেন লকডাউনে পশুপাখিরাও বাসার মুখ বন্ধ করে দিয়েছে।

কী হয়েছে? ঘুমজড়ানো গলায় জিজ্ঞেস করলাম মাকে। মুখে-চোখে বিরক্তি।

ফাঁকে বেরিয়ে আয়, তা হলেই বুঝতে পারবি। মা আমার কৌতূহলের মাত্রাটা যেন ইচ্ছে করেই বাড়িয়ে দিচ্ছে। দিদি পাশ ফিরল। মা ওকেও ঠেলা মেরে ওঠাল।

বাইরে বেরিয়ে দেখি আমাদের পাড়ার বেশ কয়েকজন উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে। অন্য পাড়ারও আছে দু-একজন। ওদের দেখে বুকটা আমার ঢিপ ঢিপ করতে লাগল। নিশ্চয়ই কারও কিছু হয়েছে। আমাদের বাড়িতে যখন এত লোকজন, ঠাকুমা বোধহয় আর নেই। চোখে কালো ছায়া দেখতে দেখতে নিজেই ছায়ার জগতে চলে গেছে। আহা গো! বুড়িটা আমায় কত ভালবাসত! কিন্তু মানুষ মরলে তো মানুষ বুক ফাটিয়ে কাঁদে। কেউ তো কাঁদছে না। সবার চোখে-মুখে, কথাবার্তায় খুশির ছোঁয়া। যেন কোনও উৎসব পালিত হবে।

আমি কাছে যেতেই হীরকের বউ বলল, এসো ভোম্বল ভাই, আজ তোমার গায়ে তেল-হলুদ দেব। টপ টপ জামা-প্যান্টটা ছেড়ে গামছা পড়ে এসো তো। গা ধুয়ে নাও এবার।

হীরকের বউয়ের কথা শুনে সবাই খিলখিল করে হেসে উঠল। হীরক আমার বড়কাকার ছেলে। তার বউ সম্পর্কে ইয়ার্কিদার হয়। তাই কথাগুলো বিশ্বাস হল না। গায়ে তেল-হলুদ দেয় তো বিয়ের আগে। কোথায় আমি অঘটন ঘটিয়েছি যে রাতারাতি গায়ে তেল-হলুদ!

পাড়ার জরিনাকাকি বলল, তুই এত বদ কেনে লো নতুনবৌ। একেই বেচারির কাঁচা ঘুমটা ভাঙানো হল। তার ওপর দিলি তো মুখটা ফ্যাকাশে করে।

হীরকের বউ আমার হাতটা টেনে কলতলার দিকে নিয়ে গেল। ওরে আমার ভাই রে! তোমাকে বিয়ে করতে হয় না। স্নানটা করে নাও তো। শিবঠাকুর হয়ে যাও। সবাই যে তোমার মাথায় পানি ঢালার জন্য দাঁড়িয়ে আছে।

মেজদিদি ঘুমজড়ানো চোখে এসে দাঁড়িয়েছে সবার মাঝে। বলল, হাসি-মশকরা ছাড়ো। কী হয়েছে সে কথা বলো তো আগে! রাতের বেলা কীসের পুলক বাঁধল?

হীরকের মা বিষয়টা এবার খোলসা করল। বলল, করোনা থেকে বাঁচার উপায় বেরিয়ে গেছে রে! শীতলপুরের এক বাচ্চা জন্মানোর পরেই কথা বলেছে! যাদের ঘরে একটিই ছেলে, আগে পিছে কোনও ভাই নাই, তার মাথায় পানি ঢেলে, সেই পানি আদা দিয়ে চা করে খেতে বলেছে। আমাদের পাড়ায় তো তুই-ই আছিস।

মাথায় আমার আগুন চেপে গেল। বললাম, দাঁড়াও দাঁড়াও, এক মিনিট! খবরটা এই রাতের বেলা কে দিল তোমাদের? খেয়েদেয়ে কোনও কাজ নেই!

পাড়াসম্পর্কে এক বুড়ি পিসি বলল, সুখবর কি চাপা থাকে রে! ঠিক মানুষের মুখে মুখে, কাকপক্ষীর দ্বারা ছড়িয়ে পড়ে। হাসি-মশকরা করে উড়িয়ে দিস না বাপ। ওপরওয়ালা যেমন দুনিয়াতে রোগ পাঠায়, সেই রোগের ওষুধও পাঠায়। এমন কিছু ব্যাপার তো নয়, যদি কাজে লাগে লাগুক। সারা দুনিয়া জাহান আজ জেগে উঠেছে। গোটা গ্রাম জুড়ে চলছে আজ পানি ঢালা।

তা বলে গায়ে ঢালা ময়লাগুলো খাবে? যতসব উজবুকি কারবার! জন্মানোর পরেই কোনও বাচ্চা কখনও কথা বলে!

বলে রে বলে। সবই ওপরওয়ালার খেল। মানুষগুলো কেমন হুড়মুড় করে মরে শেষ হয়ে যাচ্ছে দেখদিনি। এই দুনিয়ায় খোদার কিছু নেক বান্দাও তো আছে না কি? তাদের তো বাঁচাতে হবে। তাই ওই বাচ্চার মুখে বোল ফুটিয়েছে। বাঁচার উপায় বলে পাঠিয়েছে।

রাগে সারা শরীর গির গির করছে। আর থাকতে না পেরে বলেই ফেললাম, তা গ্রামে এতগুলো ছেলে থাকতে আমাকেই কেন?

মা এবার ঝাঁঝিয়ে উঠল, চুপ করবি! খুব পাকা পাকা কথা হয়েছে। যা বলছি চুপচাপ শোন। সুড়সুড় করে গামছাটা পরে আয়।

আমার কোনও জারিজুরি খাটল না। শেষমেশ ভিজতেই হল। কাঠের পিঁড়ির ওপর বসিয়ে নীচে বড় গামলা পাতা হল। পালাক্রমে চলল মাথায় জল ঢালা। গামলাতে জমা জল পরম যত্নে সবাই গ্লাসে, বাটিতে কুড়িয়ে নিজের নিজের বাড়ি চলে গেল।

শেষে দিদিও এক বালতি জল মাথায় হড়াস করে ঢেলে দিল।

কটমট করে তাকালাম। মৃদু হেসে দিদি বলল, তুই কি চাস ভাই, যে আমি মরে যাই? আমার টিকার দরকার নাই?

কাঠের পিঁড়িটা হাতে তুলেই তেড়ে গেলাম। দিদি তখন দৌড়ে ঘরের ভেতর সেঁধিয়ে গেছে।


।।দুই।।

মানুষ যখন ডুবতে বসে তখন কিছু না পেলে বাঁচার জন্য কুটোটাকেও ধরে উঠতে চায়। কতরকম কাণ্ডকারখানাই না ঘটছে চারিদিকে! কয়েক দিন আগেই আমাদের গ্রামের বাগদিপাড়া, রায়পাড়া আর লোহারপাড়া জুড়ে খুব মাটি খোঁড়াখুঁড়ি চলল। ব্যাপারটা হল, কোথাকার কোন এক গ্রামে এক ব্যক্তিকে স্বপ্নে এক সাধুবাবা দেখা দিয়ে বলেছেন, সকালে ঘুম থেকে উঠেই বাড়ির সামনের উঠোনে ঈশান কোণে মাটি খুঁড়তে। মাটি খুঁড়লে নাকি পোড়া কাঠকয়লা বেরোবে। সেই কাঠকয়লা গুঁড়িয়ে তেলের সঙ্গে মাথায় মাখতে হবে। তাতেই করোনা ভয়ে বাপ বাপ বলে পালাতে পথ পাবে না।

সকাল থেকেই চলল খুব খোঁড়াখুঁড়ি। সত্যিই অবাক কাণ্ড! মাটির তলা থেকে বেরোচ্ছে পোড়া কাঠকয়লা। কোথাও সামান্য টুকরো। কোথাও বা অনেকটা। লোকে বলতে লাগল, জয় সাধুবাবার জয়! এত মানুষ মরে হুড় হয়ে গেল বাবা, এতদিন পর স্বপ্নে দেখা দিলে!

শেখপাড়ার কালুকাকা গিয়েছিল লেউল গরাইয়ের দোকান। সেখানেই স্বচক্ষে দেখে এসেছে। কথাটা পাড়ায় এসে রাষ্ট্র করে দিল। কালুকাকা জিজ্ঞেসও করেছিল, সাধুবাবা শুধু তোদেরই ওষুধ দিল লেউলে! আমাদের মোসলমানদের জন্য কিছু উপায় বাতলায়নি? তাহলে তো আমরা সব মরে যাব রে!

কালুকাকার প্রশ্নে লেউল গরাই কোনও উত্তর দিতে পারেনি। সকালে উঠে যা জানলাম, জল ঢালার কথা শুধু মুসলমানদেরই বলা হয়েছে। তাহলে ওপরওয়ালা কি চায় না সবাই বাঁচুক? না কি সবার ঈশ্বর আলাদা আলাদা!

কয়েক দিনের ভেতরে আমাদের এলাকাতেও একজন আক্রান্তের খোঁজ মিলল। সে বাইরে কাজে গেছিল। খবরটাকে গোপন করে সারা গ্রাম ঘুরে বেড়িয়েছে। সেই গ্রামের অবস্থা এখন খুব বাড়াবাড়ি। প্রশাসনের লোক এসে সারা গ্রাম বাঁশ দিয়ে আড়াল করে দিয়েছে।

ওই গ্রামের কোনও মানুষ নিশ্চয়ই কাঠপোড়ার ছাই গায়ে মেখেছিল, কেউ গায়ে জল ঢালা চা খেয়েছিল। কিন্তু সেসব ওষুধ করোনার কিছু করতে পারেনি। এ এমন এক ভাইরাস যাকে বিনাশ করার জন্য সারা পৃথিবীর তাবড় তাবড় বিজ্ঞানীরা উঠে-পড়ে লেগেছেন।

ঠাকুমার সিথানের পাশে বসে আছি। আমার দিকে ফ্যালফ্যাল করে চেয়ে আছে। জিজ্ঞেস করলাম, ছায়াটা আর দেখতে পাচ্ছ?

বুড়ি ফোকলা মুখে কী বলছে, স্পষ্ট করে বোঝা যাচ্ছে না। আবছা শোনা যাচ্ছে,আঁধার, আঁধার।

কী আঁধার আঁধার করছ সেই থেকে! এই তো ঘরে লাইট জ্বলছে।

মাথা নাড়াল বুড়ি। বিড়বিড় করছে, আঁধার আঁধার।

কপালে হাত দিলাম। হাতটা এবার চেপে ধরল আমার। কিছু বলতে চাইছে, কিছু একটা। কিন্তু শুধু মুখটা নড়ছে। কোনও কথাই স্পষ্ট বেরোচ্ছে না। গলা জড়িয়ে যাচ্ছে। জড়ানো গলাতেই আবার বলল— আঁধার, আঁধার।

ঠাকুমা মাস ছ’য়েক আমাদের ঘরেই আছে। সবার ঘরে পালি খাচ্ছিল। বাপ-কাকাদের সবার মধ্যে সুসম্পর্ক নেই। খুব ঝামেলা হচ্ছিল বুড়িকে নিয়ে। বাবা একদিন আমাদের ঘরে নিয়ে চলে এল।

একবিঘা ধানি জমি আছে ঠাকুমার নামে। মরার আগে দাদু ওই জমিটা হাতছাড়া করেনি, বুড়ির সময়-অসময়ের জন্য রেখে গেছে। এখন যেহেতু আমাদের ঘরে থাকে তাই জমিটা চাষ করি আমরা।

ফাঁকে বেরিয়ে দেখলাম, মা রান্নাশালে রান্না করছে। বলল, কন্টোলে চাল দিচ্ছে শুনলাম।একবার বঁ করে যা তো খোকা। খবরটা নিয়ে আয়।

হ্যাঁ, কিছুদিন ধরেই শোনা যাচ্ছে রেশনে ফ্রিতে চাল দেবে। সেই আশাতেই চেয়ে আছে মানুষগুলো। এখন তো সবার রুজিরোজগার বন্ধ। অভাব, অভাব। চারিদিকে অভাব! মাঠের ধান পাকতে এখনও ঢের বাকি। যাদের ছেলেরা ভিনরাজ্যে খাটতে গেছে তারা এখন আটকে। কাজ বন্ধ হয়ে গেছে। যেখানে আছে সেখানে কষ্টেসৃষ্টে দিন পার করছে। মালিকের কাছে আগাম টাকা ধার নিয়ে খেতে হচ্ছে। বাড়ির লোক চাতক পাখির মতো হাঁ করে বসে আছে ছেলের জন্য।


।।তিন।।

দিনকে দিন হাঁড়ির অবস্থা খুব খারাপ হতে বসেছে। বাবা গঞ্জের একটা কাপড়ের দোকানে মাসমাইনের কাজ করে। সেই দোকান এক মাস হল বন্ধ। বাবা আগের মাসের বেতনটা খুঁজতে গেছিল। মালিক বলেছেন, এখন টাকা টাকা কোরো না তো। দেখতেই পাচ্ছ কী অবস্থা ব্যবসার। টাকাটা কি পাবে না?

বাবা নিরাশ হয়ে ফিরে এসেছে। জমানো টাকাও নেই ঘরে। মাঠের ধানটা উঠলে তবুও মাসকতক পেটপুরে ভাত খাওয়া হয়। বাকি সবই কেনা। তার ওপর আগের বছর বড়দিদির বিয়ে হল।

হ্যাঁ, এবার বলি। মেজদিদি ছাড়াও আমার আর একটা দিদি আছে, যে একটা ছেলের সঙ্গে পিরিত করে ভেগেছে। ভাগলে কী হবে! ফ্যামিলি মেনে নেয়নি। আবার অনুষ্ঠান করেই বিয়ে দিতে হল। ঘাড়ের ওপর বাঁশ! খাট, আলমারি, গহনা যা যা লাগে সবই দেওয়া হয়েছে। জমানো পুঁজি বিয়েঘরটা পার করতেই শেষ। মেজদিদিও বিয়ের বয়েসি হয়ে উঠেছে কিন্তু বিয়ে দেওয়ার মতো এখন অবস্থা নেই।

এখন কত মেয়ে নিজেরাই বিয়ে করে নিচ্ছে। আমার মেজদিদিটা চালাক-চম্পট নয়। একটা পুরনো মোবাইল কিনে দেওয়া হয়েছে। যদি নিজেই একটা হিল্লে করতে পারে, করুক। কিন্তু আমাদের খেপিটা একেবারে অবোধ। ফোনে গেম খেলে আর সিনেমা দেখেই পার করে দেয়।

কন্ট্রোলে গিয়ে দেখলাম সেখানে কয়েকজন পুলিশ দাঁড়িয়ে। চুন দিয়ে গোল বৃত্ত করে সবার দাঁড়ানোর জায়গা করে দিচ্ছে। সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার জন্য।

সরকার ঘোষণা করেছে, মাস্ক না পেলে মুখে গামছা, ছেঁড়া কাপড় বেঁধেও বাইরে বেরোতে। এদিকে দেখোদিনি কাণ্ড! কন্ট্রোলে এসেছি, একটা গামছাও আনতে ভুলে গেছি। তাই কাছে যেতে সাহস পাচ্ছি না। একটু দূর থেকেই দাঁড়িয়ে দেখছি। একটু পরে পুলিশগুলো গাড়িতে চেপে চলে গেল। বুকে বল এল আমার। কাছে গিয়ে দেখলাম সবই রায়পাড়ার লোক। জিজ্ঞেস করে জানলাম, আমাদের পাড়ারগুলোকে পরশু দেবে। এক এক দিনে পাড়ায় পাড়ায় ভাগ করে দিয়েছে।

মা জিজ্ঞেস করল, কী রে! কবে চাল দেবে?

বললাম, পরশু দিনে।

তুই বুঝিয়ে বলতে পারলি নাই যে ঘরে চাল শেষ!

তা দিবে কেন।সবেরই তো একটা নিয়ম আছে।

আসলে তুই কিছু বলিসইনি। বুঝে কর গে, আমার কী! যা চাল আছে, আজকের রাতটা কোনওরকম টেনেটুনে হবে। কাল থেকে সবাই হাওয়া খাবি।

শুধু কন্ট্রোলের চালটার ভরসা করে থাকলেই হবে! কেজি দশেক চালে ক’দিন চলবে? আব্বাকে অন্য কিছু কাজ ধান্দা দেখতে বলো।

শেষের কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেছে। ভয়ে থরথর কাঁপছি।

মা ঝাঁঝিয়ে উঠল, হ রে লাটসাহেবের ব্যাটা। বাপটা তোর ঘরে বসে আছে! কোনও কাজ-ধান্দা দ্যাখেনি! ছোট মুখে খুব তো চ্যাটাং চ্যাটাং কথা ফুটেছে। তা তুই কি মরদ নোস? আন দেখি এক বস্তা চাল।

কোনও জবাব না দিয়ে সরে এলাম রান্নাঘর থেকে। ঘরের দাওয়ার ওপর বসলাম। একটু পরে বাবা সাইকেল নিয়ে ফিরে এল। চোখ-মুখ লাল। দেখেই বুঝতে পারছি, মালিক আজও ঘুরিয়েছে।

বাবা বলল, দুয়োর আগলে বসে আছিস যে! মাঠ গেছিলি আজ?

সকালেই মাঠটা দেখে আসতে বলে গেছিল বাবা, যাঃ, ভুলে গেছি! ভয়ে ভয়ে বললাম, যাচ্ছি।

এখনো যাসনি? ভাল ভাল। ঘরে ঢুকে বসে থাক সব। তাহলেই পেটের ভাত জুটবে।

মা রান্নাশাল থেকে ভাতের হাঁড়ি ন্যাকড়া দিয়ে ধরে হেঁশেলঘরে রাখতে এল। বাবাকে দেখে বলল,

কী হয়েছে গো? চোখ-মুখের এমন অবস্থা কেন?

বাবা বলল, আর বোলো না। শালার পুলিশগুলো মওকা পেয়ে গেছে। রাস্তায় আটকে উদোম সুঁটিয়ে দিল!

বল কী! শুধু শুধু ঘা দিল! তুমি বলনি কোথায় যাচ্ছ?

বলার আর সময় দিল কোথায়!

আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে বাবার পুলিশের হাতে মার খাওয়ার কথা শুনে মুচকি মুচকি হাসছি। খুব তো ফুটানি করে, জীবনে কারও হাতে মার খায়নি। আচ্ছা দিয়েছে তো!

মাঠে গিয়ে দেখলাম, কচি থোড় থেকে বেরিয়ে পৃথিবীর আলো দেখতে না দেখতেই অনেক ধানের শিষ মরে সাদা হয়ে গেছে। কই, এর আগে যখন খেতটা দেখে গেলাম তখন তো একটাও শিষ মরেনি!

পাশের জমিতে নিবারণ বাগদি স্প্রে করছে আর আলের মাথায় দাঁড়িয়ে আছে জমির মালিক ঝোড়ো মল্লিক। ঝোড়োকাকা বলল, ভাইপো, স্পেরে করবি নাই? ধানটা যে চলে যাবে রে!

স্প্রে করা মানেই দোকানে গিয়ে শিষ-মরা রোগের ওষুধ কিনে আনতে হবে। তার জন্য টাকার দরকার। নিজেদের মেশিন নেই, স্প্রে মেশিনও ভাড়া নিতে হবে। বাড়িতে গিয়ে এই কথা বাবাকে কী করে বলি!

ঝোড়োকাকার কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। কাকা বলল, সময় খুব খারাপ রে ভাইপো। আকাশে-বাতাসে বিষ। বলে একটা মরা ধানের শিষ টেনে বের করল গাছ থেকে। শিষের গোড়াটা নখ দিয়ে চিরে দেখাল, ভেতরে সরু একপ্রকার পোকা গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে। ছোট গোলাকার চোখগুলোর দিকে তাকাতেই মনে হল, পিটপিট করে চেয়ে দেখছে আমাদের।

ঝোড়ো কাকা বলল, ভাইপো, বুঝলি কিছু? লড়াই লড়াই!

মাঠে ঝোড়োকাকার মুখে শোনা ‘লড়াই’ কথাটার যথার্থ সত্য টের পেলাম রাত্রে খেতে বসে। ভাতের থালার দিকে তাকিয়ে নীরবে বসে রইলাম কিছুক্ষণ। দিদি আর আমি মুখ চাওয়াচাওয়ি করলাম। তারপর ঘাড় নামিয়ে তাড়াতাড়ি খেয়ে উঠে পড়লাম।

উঠোনে তালাই বিছানো ছিল, গা এলিয়ে পড়ে থাকলাম। একটু পর দিদিও আমার পাশে এসে শুল। দু’জনেই নীরব।

হেঁশেলঘরে মায়ের গলা পাচ্ছি। বাবার সঙ্গে জোরে জোরে কথা বলছে— কাল থেকে খাব কী, অ্যাঁ? নিজেরা না খেয়ে থাকি, ছেলেমেয়েগুলোর মুখে তুলব কী? তোমার সেই চিন্তাভাবনা আছে?

ভিক্ষা করতে বেরোব কাল থেকে! সবাই বসে বসে একপেট করে গিলবি, কেমন? বাবার গলাতেও ঝাঁঝ।

হ্যাঁ, তাই বেরিয়ো। আমিও চলে যাব, যেদিকে দু’চোখ যাবে। এত অশান্তি আর ভাল লাগছে না।

শুনতে পাচ্ছি, মা ফুঁপিয়ে কাঁদছে। এদিকে দিদি আর আমি আকাশের দিকে তাকিয়ে নীরব জেগে আছি। অন্ধকার আকাশ? না কি আমিও ঠাকুমার মতো কালো ছায়া দেখছি!

দিদি, এই দিদি।

অ্যাঁ।

কোনও তারা দেখতে পাচ্ছিস রে?

উঁহু!

কোনও জোনাক?

উঁহু!

এতক্ষণে আমার ঠাকুমার কথাটা সত্যি মনে হল। বুঝতে পারছি সারা আকাশজুড়ে একটা কালো ছায়া নেমে এসেছে। সব কিছু গ্রাস করে নিচ্ছে ধীরে ধীরে। অপেক্ষায় আছি কবে অন্ধকার কেটে জোনাক জ্বলে উঠবে।

__________________________________________________

লেখক পরিচিতিঃ
হামিরউদ্দিন মিদ্যা
জন্ম ১৪ই জানুয়ারি ১৯৯৭ সাল। পশ্চিমবঙ্গের বাঁকুড়া জেলার সোনামুখীর এক প্রত্যন্ত গ্রামে থাকেন। লেখালেখিতে নবীন।মূলত ছোটগল্পকার।ইতিমধ্যেই তাঁর গল্প প্রকাশিত হয়েছে বর্তমান,সাপ্তাহিক বর্তমান, এই সময়, সংবাদ প্রতিদিন,তথ্যকেন্দ্র,অনুষ্টুপ,পরিচয় প্রভৃতি পত্রপত্রিকায়। বিভিন্ন ওয়েব পোর্টালেও লিখে থাকেন। ২০১৯ সালে কলকাতা বইমেলায় সৃষ্টিসুখ প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত হয়েছে একমাত্র গল্পগ্রন্থ 'আজরাইলের ডাক'।



৩টি মন্তব্য:

  1. প্রণব চট্টোপাধ্যায়৯ আগস্ট, ২০২১ ৪:২৯ AM

    খুব ভালো লাগলো গল্পটি।করোনাকালের এযাবৎ যতগুলি গল্প পড়েছি,তারমধ্যে এটি অন্যতম।গ্রামবাংলার মানুষদের কুসংস্কার,সেই সঙ্গে লকডাউনের প্রভাবে মধ্যবিত্ত,গরীব পরিবারগুলির কী করুণ অবস্থা চলছিল,সেই চিত্রটি খুব ভালো ফুটিয়ে তুলেছেন গল্পকার।

    উত্তরমুছুন
  2. একদিন অন্ধকার কেটে জোনাক ঠিকই জ্বলে উঠবে।
    ভালো লেগেছে আপনার গল্প।

    উত্তরমুছুন
  3. একেবারে অর্গানিক লেখা।খুব ভালো লেগেছে গল্পটি।

    উত্তরমুছুন