সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

ওয়াসি আহমেদ এর গল্প : অপুর ধর্মটিচার

অপুর জন্য যেদিন ধর্মটিচার, ওরফে ময়লা জোব্বামোড়া ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধকে সপ্তায় তিন দিন এক ঘণ্টার জন্য নিয়োগ করা হলো, রিয়া-কামরানের মনে মিশ্র অনুভূতি বিরাজ করছিল। প্রথমত অনুভূতিটা ছিল : পোশাকআশাকে বৃদ্ধ নোংরা, কথাবার্তায় পুরোদস্তুর গ্রাম্য, অপুর টিউটর হিসেবে যা ঘোরতর বেমানান। দ্বিতীয়ত এক ধরনের স্বস্তিও ছিল, যাক্, অপুর শিশুমনে পৈতৃক ধর্মের একটা বেস তো হবে। একেবারে লাগামছাড়া হলে কী চলে!

ধর্মটিচার/মৌলভি স্যার রিক্রুটমেন্টের দিনগত রাতে রিয়া-কামরানের একান্ত কথাবার্তায় প্রতিক্রিয়াটা যেভাবে রূপ পায়, তা এরকম :


-- কাজটা ঠিক হলো? -- রিয়া

-- কেন বলো তো? -- কামরান।

-- লোকটার জামাকাপড় খেয়াল করোনি? কী দশা কাপড়চোপড়ের! ময়লা তো ময়লা, গন্ধ বেরোচ্ছিল। অপু যদি অ্যাকসেপ্ট না করে?

-- তেমন ভয় করছো?

-- করব না? ও যা রিঅ্যাক্ট করে। ইংলিশ টিচার রোজ রোজ এক জোড়া জুতো পরে আসে কেন, এ নিয়েই কত জেরা করে।

-- টিচারকেই করে?

-- তা বলতে পারব না। তবে আমাকে তো করে। দিন দিন রিঅ্যাক্টিভ স্বভাবটা বাড়ছে, এমন বিষয় নেই যাতে রিঅ্যাক্ট করবে না, ছোটখাটো তুচ্ছ বিষয়েও।

-- বাচ্চারা কিছুটা সেনসেটিভ হয়-ই।

-- কিছুটা হলে তো কমপ্লেন করতাম না, ওতো সুপারসেনসেটিভ।

-- কী করতে বলো? ধর্মটিচারকে তো কাল থেকে আসতে বলে দিলে।

-- ব্যাপারটা নিয়ে অত ভাবিনি। মুশকিল হবে, অপু যদি রিঅ্যাক্ট করে।

-- টেস্ট কেস হিসেবে কিছু দিন দেখা যেতে পারে।

-- তা পারে। আচ্ছা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিয়ে তুমি যদি বেচারাকে কিছু বলো।

-- তা কী করে হয়! বুড়ো মানুষ, হার্ট হবে। দুটো পয়সা রোজগারের জন্যই-না প্রাইভেট ট্যুশানি করছে।


-- আমি চিন্তা করছি অন্য কিছু। ধরো, লোকটা যদি কাঠমোল্লা হয়, হওয়াই স্বাভাবিক, অপু কি ইনফ্লুয়েন্সড হয়ে যাবে না? শেষপর্যন্ত, আমার ছেলে যদি ফান্ডাম্যান্টেল্স-এর দিকে ঝুঁকে পড়ে, কেলেংকারির একশেষ!


এ পর্যায়ে গুরুভার প্রসঙ্গ রসিকতার দিকে গড়াতে পরিস্থিতি খানিকটা হালকা হয়। কথা শেষ করে কামরান হাসে, সদ্য কেজি থেকে স্ট্যান্ডার্ড ওয়ানে প্রমোশন পাওয়া সাত বছরের ছেলের পক্ষে মৌলবাদী বনে যাওয়ার অসম্ভব কল্পনার কথা ভেবে ঘাড়-মাথা দুলিয়ে আরাম করে মিনিটখানেক ধরে হেসেই চলে। ম্লান আলোয় শোবার ঘরে এয়ারকন্ডিশনারের ঘুম ঘুম মন্থর শব্দের সাথে হাসিটা সংক্রমিত হয়ে রিয়ার গালে টোল ফোটালে, ব্রা-হীন লাল নাইটিতে তাকে স্মেশিং ভাবার চেয়ে কামরান খুঁজেপেতে জুতসই বাংলায় আশ্রয় নেয়, অভাবনীয়।

রিয়া বলে-- ঠিকই বলেছ, কিছুদিন দেখা যাক। আর এছাড়া স্মার্ট পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন মৌলবি পাবে কোথায়? অপু বাড়াবাড়ি কিছু না করলেই হলো।

এ কথার পর একটা গ্রহণযোগ্য সমাধান পাওয়া গেছে ভেবে কামরান রাতের মতো প্রতিক্রিয়া সংক্ষিপ্ত করে-- ছোটবেলা ধর্মের একটা বেস থাকা খারাপ না, একেবারের লাগামছাড়া হলে কী চলে! বলতে বলতে বিছানায় আধশোয়া অবস্থায় অভাবনীয় রিয়ার উন্মুক্ত বাহুমূলে স্বপ্নাবিষ্ট হয়ে পড়ে।

একেবারে লাগামছাড়া হলে কী চলে? বাক্যটা কামরানের নিজের নয়। দিনকয়েক আগে নিজের কম্পিউটার ফার্মে বসে আলাপ হচ্ছিল কোলিগ-কাম-পার্টনার আশরাফের সঙ্গে। অল্পদিনে ব্যবসা শুরু করে দুটো সফ্টওয়ার প্যাকেজ তারা এক্সপোর্ট করেছে। আরো দুটো ঝটপট অর্ডার পেয়েছে, তাও আইবিএম, মাইক্রোসফট-এর ঘাঁটি খোদ আমেরিকা থেকে। কথাপ্রসঙ্গে আশরাফ বলছিল, লোকাল মার্কেটিং-এর সম্ভাবনার কথা। দেশে প্রাইভেট সেক্টার ফ্লারিশ করছে, কোটিপতির সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। এরা টেকনোলজি চায়, কারণ কাজ হয় দ্রুত, লোক লাগে কম, ব্যবসা ফুলেফেঁপে উঠলেও ইউনিয়নিজমের খপ্পরে পড়তে হয় না। এদের জন্য কাজ করতেও সুবিধা, এরা কম্পিউটার ল্যাংগুয়েজ বোঝে না, টারমিনোলজিকে ভয় পায়, আবার সমীহও করে, অথচ টেকনোলজি তাদের চাই। এখন যা দরকার, এদের কাজের ধরন বুঝে লাগসই প্রোগ্রাম করো আর বোতাম টেপার ব্যাপারস্যাপার দেখিয়ে দাও। প্রোগ্রামের জটিলতা, কার্যকারণ নিয়ে এদের মাথাব্যথা নেই, এরা চায় দুপাতার ম্যানুয়েল, ব্যস। আশরাফের গলায় উত্তেজনা ছিল, পরপর দুটো বড় অর্ডার পাওয়ার পর ইদানীং তার গলায় আত্মবিশ্বাসী মেজাজ লেগেই আছে। মাথায় সারাক্ষণ নতুন নতুন আইডিয়া খেলছে, আর এ অবস্থায় নিজের উত্তেজনা ভাগাভাগি করতে সম্প্রতি সে যে এক্সপ্রেশানটা খুব ঘন ঘন, যখন তখন প্রয়োগ করছে, তা হলো-- চল বসি। বসা মানে, নতুন আইডিয়াকে সেলিব্রেট করা।

সেলিব্রেট করার ইচ্ছা পুরোমাত্রায় কামরানেরও ছিল, কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে রাজি হতে পারছিল না, কারণ অপুকে স্কুল থেকে আনতে একটু পরই তাকে ছুটতে হবে গুলশান থেকে ধানমন্ডি। শুধু যে লম্বা ড্রাইভ তা না, দশ-বারোটা জ্যামে আটকে গরমে হাঁসফাঁস করতে হবে। স্কুলের গাড়ি আছে, সকালে নিয়েও গেছে, তবে ছুটির পর কী এক ঝামেলায় গাড়ি আসবে না। ঘড়ি দেখে আসন্ন ভোগান্তির কথা ভেবে কামরান দমে যায়, তবে সরাসরি আশরাফকে নিরাশ না করে বলে-- এই গরমে হুইস্কি জমবে না, অন্যদিন।

আশরাফ চোখ টিপে হাসে-- হুইস্কির কথা বলেছি? নিরিবিলি দেখে কোথাও বসি চল, ভালো জিনিস নিয়ে বসলে মাথা খোলে।

কামরান বিষণ্ন বোধ করে, বলে-- অপুকে যে আনতে যাব এখনি, ওর ছুটি মনে হয় হয়েই গেছে।

-- সে তো ধানমন্ডি, এই গরমে, মাই গড!

কামরানকে ভেড়াতে না পারার বেদনার চেয়ে দীর্ঘপথ গাড়ি চালানোর দুর্ভোগটা যেন কামরানের হয়ে তাকেই পেয়ে বসে। আশরাফ জিজ্ঞেস করে-- কোন স্কুল যেন?

কামরান স্কুলের নাম বলে। শুনে আশরাফ ভুরু কুঁচকায়-- ওখানে কেন দিলি? ঢাকায় স্কুলের অভাব?

-- ভালো স্কুল তো, সবাই বলল।

-- সে তো পড়াশোনার বেলায়। ছেলেকে তোর মুরতাদ বানিয়ে ছাড়বে।

কামরান হো হো করে হাসল-- ভালো বলেছিস, মুরতাদ। জামাতিরা টার্মটাকে পপুলার করে ছাড়ল।

আশরাফ বলল-- হাসিস না। স্কুলে কিছুটা ধর্ম-কর্ম থাকা খারাপ না।

-- তোর, আমার ধর্ম-কর্ম আছে?

-- ব্যাকগ্রাউন্ডে তো ছিল। তোর ছেলে বড় হয়ে রিলিজিয়ন কী লিখবে?

-- ওর যা খুশি।

-- সেটা তো অনেক পরের ব্যাপার, তবে ছোটবেলা থেকে একেবারে লাগামছাড়া হলে কী চলে!

দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে কামরান বেরিয়ে পড়েছিল। পুরাতন এয়ারপোর্ট পর্যন্ত মোটামুটি এক টানেই চলে এল। কিন্তু তারপরই জ্যাম, জ্যাম। গরু ছাগল মোষের পালের মতো কার মিনিবাস রিকশা স্কুটার। একটা জ্যাম কিছুটা ঢিলে হয়, এঁকেবেঁকে কামরান একটু এগোয়, অমনি আরেকটা গজায়। একটা জ্যাম ছেড়ে আরেকটা জ্যামে পাড়ি দেওয়ার ফাঁকে, গরমে ঘামে কুটকুট যন্ত্রণায় মাথামুণ্ডুহীন যানবাহনের জট সামনে নিয়ে অপেক্ষা করতে গিয়ে কিছুক্ষণ আগে আশরাফের ‘লাগামছাড়া’ কথাটা মাথায় নড়েচড়ে বসে। লাগামছাড়া, লাগামছাড়া। এ সময় লাগমছাড়া হতে পারাটা তার নিজের জন্য কত জরুরি ছিল! গুলশান থেকে ধানমন্ডি কোনো ব্যাপারই না, এক টানে পৌঁছে যেত; ফের ধানমন্ডি থেকে গুলশান, আরেক টান মাত্র, অথবা লাগামছাড়া এক টানেই গুলশান-ধানমন্ডি-গুলশান। অথবা বিজয় সরণির গাট্টাগোট্টা ফোয়ারায় গুঁতো খেয়ে জাপানি টয়োটা আর বাঙালি সফ্টওয়ার ডেভেলাপার কামরান লাগামছাড়া আনন্দে লাট্টুর মতো ঘূর্ণি তুলে ইনফিনিটিতে মিশে যেতে পারত।

সারাদিন বারকয়েক লাগামছাড়া লাগামছুট হওয়ার ব্যাপারটা মাথায় খাপছাড়াভাবে ঘুরে গেলেও সন্ধ্যাবেলা রিয়ার বানানো চায়ে চুমুক দিতে দিতে এ প্রসঙ্গটাই তুলবে কামরান ভাবেনি। তুলতে গিয়ে একথা সেকথার পর, জ্যামে ব্রেক কষার মতো অপুর স্কুল প্রসঙ্গে এসে আশরাফের কথাগুলোই সে গড়গড় করে আওড়াল-- একেবারে লাগামছাড়া হলে কী চলে? ছোটবেলা ধর্মের একটা বেস থাকা খারাপ না।

অচেনা কথাগুলো যে তার না, আশরাফের, আর তার নিজের মুখে অন্যের কথাগুলো নিজের বলে রিয়াকে শোনাচ্ছে এই দ্বৈত প্রতিক্রিয়ায় সে কিছুটা চমকাল। পরমুহূর্তে ভাবল চায়ের কাপ নামিয়ে রেখে জোরে হেসে ওঠে, আর রিয়াকে বলে ডায়লগটা মোটেও তার না। সে তো লাগামছুট হতেই চায়। আনব্রিডল্ড, উদ্দাম কেশর ঝাঁকানো ব্ল্যাক স্ট্যালিয়ন। কিন্তু রিয়ার মৌনতা তাকে উদ্যোগটা নিতে বাধা দেয়, বরং একটু পর রিয়া যখন তারই মতো অচেনা গলায় কথা বলে, সে দ্বিতীয় দফার চমকায়।

রিয়া বলে-- অপুর স্কুলের পরিবেশটা একদম গডলেস। রিলিজিয়নের কোনো বালাই নেই, ছোট-ছোট বাচ্চারা স্কুলে পা দিতে না দিতে শিখছে ধর্ম একটা সংস্কার, ট্যাবু।

কথাগুলো যখন রিয়া বলে, আর আধোঅন্ধকার ব্যালকনিতে মুখোমুখি আড়াই হাত দূরে বসে কামরান শোনে, কামরান যা জানতে পারে না, রিয়াও যা বলে না, তা হলো, এ কথাগুলো প্রায় হুবহু রিয়া শুনেছিল দিনকয়েক আগে অপুর স্কুলে প্যারেন্টস ডে-তে গিয়ে। কথাগুলো বলেছিলেন একজন শাঁসালো মন্ত্রীর সদ্যপরিত্যক্তা স্ত্রী। পরিত্যক্তা হলেও মাত্র কিছু দিন আগেও ফ্ল্যাগকার-চড়া মহিলার মেকআপ, অ্যাকসেন্টের মোহে ছোট জটলা তৈরি হয়েছিল তাকে ঘিরে। কথাগুলোর সূত্রে অন্যরা মতামত দিচ্ছিলেন আর ধীরে ধীরে একটা আড্ডাও জমে উঠেছিল। আড্ডায় একটু একটু করে ধর্ম-ধর্ম একটা গন্ধ-সুবাস দানা বাঁধছিল। এ অবস্থায় হাঁড়ির খবর হাটে ভেঙে একজন মহিলা জানিয়েছিলেন, তিনি তার ছেলের জন্য বাড়িতে মৌলভি টিউটর রেখেছেন। শোনামাত্র অন্যরা মিটিমিটি হেসে জানিয়েছিলেন, কাজটা তারা সকলেই করেছেন। মন্ত্রীর প্রাক্তন স্ত্রী বিজ্ঞ মাথা নেড়ে বলেছিলেন, এ আর নতুন কী?

রিয়ার তখন বেশ নিঃসঙ্গ লাগছিল। ঘরে ফিরে অপুকে জিজ্ঞেস করেছিল-- বলো তো, তুমি কী করে হলে?

অপু চটপট বলল-- তোমার পেট থেকে। বাপি আর তোমার ... বলতে বলতে স্কুলব্যাগ খুলে নোটবুকের পাতা ওল্টাতে শুরু করল। রিয়া হতভম্ব হয়ে বলল-- কী খোঁজো?

অপু পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল― টিচার বলেছে ক্লাসে।

-- কী বলেছে?

-- মনে নেই, নোটবুকে আছে। হ্যাঁ, মনে পড়েছে, তোমার আর বাপির ইন্টারকোর্স থেকে। ইন্টারকোর্স কী?

নোটবুট ঘেঁটে রিয়া কাঁচা হাতে ব্ল্যাকবোর্ড থেকে তোলা কয়েকটা বাক্য পেল। বার্থ ইজ নো মিস্ট্রি। অ্যা বেবি ইজ বর্ন ডিউ টু ইন্টারকোর্স বিটুইন দ্য ফাদার এ্যান্ড দ্য মাদার। ইন্টারকোর্স ইজ বডি লাভ।

ঘটনাটা বলি বলি করে কামরানকে বলা হয়নি। কিন্তু কামরান যখন স্কুলের প্রসঙ্গ তুলল, রিয়া অপুর নোটবুক থেকে উদ্ধার করা কথাগুলো শুনিয়ে দিল। চা খাওয়ার পরিবেশটা তখন বদলে গেল। অনেকক্ষণ পর কামরান বলল-- শেষপর্যন্ত তাহলে মৌলভি টিউটর?

-- না, তা কেন? তবে ছোটবেলা ধর্মের একটা বেস তো সব বাবা-মাই বাচ্চাদের জন্য করে দেয়। দেয় না?

কামরান বলতে চাইল, যাতে করে সায়েন্সের বেয়ার রিয়েলিটিকে ক্যামোফ্লাজ করা যায়; কিন্তু মুখে বলল ধার করা কথা, আশরাফের কথা-- একবারে লাগামছাড়া হলে কী...! নিজের গলা দিয়ে বেরোলেও, কথাগুলো মনে মোটেও প্রভাব ফেলল না।

অদ্ভুত ব্যাপার ঘটল অপুকে নিয়ে। ধর্মটিচার নিয়োগের ঘটনাকে সে সহজভাবে নেবে, রিয়া-কামরান দুজনের কেউই ভাবেনি। প্রাথমিক অবস্থায় তার নিশ্চয়ই খটকা লেগেছিল। ষাটোর্দ্ধ বৃদ্ধ, জামাকাপড়ে ডার্টি, শরীরটা হালকা-পাতলা হলেও ঘাড়টা খানিকটা কুঁজো-- এই মানুষটা সপ্তায় তিন দিন স্কুলের পাঠ্য বিষয়ের বাইরে একটা বিষয়ে তাকে কোচ করাবে, যেমন ম্যাথ টিচার, ইংলিশ টিচার তাকে কোচ করায়। ব্যাপারটা গোলমেলে হলেও অপুর হাবভাবে, রিয়া যেমন ভেবেছিল রিঅ্যাক্ট করবে, তেমন লক্ষণ ধরা পড়ল না। হতে পারে, জোব্বা-পরা কুঁজো লোকটার প্রতি তার কৌতূহলই কারণ। হতে পারে, প্রতিক্রিয়াটা সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে। কিন্তু পাঁচ দিন সাত দিন পনের দিন পার হয়ে যেতেও যখন অপুর ভাবভঙ্গিতে পরিবর্তন বা বিরূপ প্রতিক্রিয়া লক্ষ করা গেল না বরং ধর্মটিচারের প্রতি তার মনোভাব আন্তরিক বলেই মনে হলো, রিয়া-কামরান এ নিয়ে আর খোঁচাখুঁচিতে গেল না।

তার চেয়ে বরং নতুন সফ্টওয়ার প্যাকেজটা রিয়াকে বোঝাতে কামরান ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কিছুদিন আগেও এসব নিয়ে কথা বলার সময় কামরান লক্ষ করত রিয়ার দুচোখে এক ধরনের শূন্যতা ফুটে উঠত। ইদানীং চোখ দুটোর এই বিশেষ ভঙ্গিতে তার পরিবর্তন এসেছে। কামরান অবশ্য জানত পরিবর্তন আসবেই আসবে; কারণ শূন্য, ফাঁপা দৃষ্টি দিয়ে আসন্ন অভাবনীয় পৃথিবীর কিছুই রিয়ার পক্ষে দেখা সম্ভব নয়। রিয়াকে কামরান বলে-- ফিজিক্যাল রিয়েলিটির দিন শেষ, এই যে তুমি আমি মুখোমুখি বসে আছি আর মুখোমুখি বলেই একে অন্যকে দেখাদেখি, ছোঁয়াছুঁয়ি করতে পারছি, এই ধারণাটা প্রিমিটিভ। লজিক আছে, বাট প্রিমিটিভ লজিক। যেমন-- টু প্লাস টু ইজ ফোর। যেমন-- আগুনের সংস্পর্শে এলে হাত পোড়ে। হাতটা পুড়ে যাবে প্রমাণ করতে কী আগুনে হাত ছোঁয়াতে হবে? হাস্যকর যুক্তি! কিংবা যেমন-- মানুষের রিপ্রোডাক্টিভ ব্যাপারটার কথা ভাবো, ফিজিক্যাল কনটেক্টকে এসেনশিয়াল প্রিকন্ডিশন ধরে নেওয়ার কোনো কারণ আছে? কিন্তু প্রিমিটিভ লজিকে তাই ভাবা হতো, ধরে নেওয়া হতো এটাই চূড়ান্ত রিয়েলিটি, এর বাইরের কিছু থাকতে পারে না। আর এখন? এখন পোস্টমডার্ন যুগে বাইরের ব্যাপারগুলোর দিকেই মানুষের নজর বেশি, কারণ এটা অন্য রিয়েলিটি, এর কোনো শেষ নেই, শুরু নেই, আদিঅন্তহীন। এ হচ্ছে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি। তুমি-আমি মুখোমুখি বসে নেই, অথচ আছি, কথা বলছি, ইন্টারেক্ট করছি।

ভার্চুয়াল রিয়েলিটি প্রসঙ্গে এসে কামরান উত্তেজিত না হয়ে পারে না, তার অস্থির অস্থির লাগে। গোটা ব্যাপরটাকে সে যে রকম ভাবতে চায়, রিয়াকে সেভাবে বোঝানো যায় না, বাধ্য হয়েই কিছুটা সরলীকরণের আশ্রয় সে নেয়।

রিয়া বলে-- আচ্ছা, ভার্চুয়াল রিয়েলিটিতে তুমি-আমি এভাবে মুখোমুখি বসে নেই, তারপরও প্রয়োজনের সব কাজকর্ম করে যাচ্ছি; বুঝলাম অনলাইন সব ব্যবস্থা করে দিচ্ছে, কিন্তু তোমার আমার প্রয়োজন তো মৌখিক বা লিখিত আদান-প্রদানে সীমাবদ্ধ নয়, অন্য আদান-প্রদানও আছে।

-- সব মিটিয়ে দেবে।

-- বলো কী? সব? আচ্ছা, তোমাকে আমার পেতে ইচ্ছে করল-- ডিপলি, মানে ইন্টিমেটলি আর কি, যেমন এখন হচ্ছে। রিয়ার মুখ লালচে হয়ে উঠল, তারপর তড়িঘড়ি বাক্যটা শেষ করল-- তখন কী হবে? আমরা দুজন তো মুখোমুখি বসে নেই।

-- ধরো, এটাও হয়ে যাবে।

কিন্তু রিয়া ধরে কী করে? কী ধরে? কামরানকে তখন বাধ্য হয়েই কিছু জটিলতার আশ্রয় নিতে হয়। সে সাইবারস্পেস নিয়ে কথা বলে, সাইবারস্পেসে মানুষ ও কম্পিউটার চিপসে কোনো তফাৎ নেই, বিশ্বব্যাপী ইনফরম্যাশন হাইওয়ে ধরে হাজার হাজার ডেটা যেমন অবাধে এক পিসি থেকে অন্য পিসিতে পরিভ্রমণ করছে, মানুষও তেমনি করবে, তার শরীরী অস্তিত্ব নিয়েই। তাহলে আর বাধা কোথায়?

রিয়াকে রিয়ার মতো করে বোঝাতে গিয়ে যুক্তিগুলো অনেক সময় একপেশে হয়ে পড়ে, সরলীকরণের ফলেই; তবে কামরান এটা লক্ষ করেছে, একজন লেম্যানকে এসব বোঝাতে গেলে, যুক্তি ছাপিয়ে কল্পনা প্রাধান্য পেয়ে বসে। এতে অসুবিধার কিছু নেই, বরং বিষয়গুলোয় বাড়তি ডায়মেনশন যোগ হয়। পোস্টমডার্ন মানুষ তো এই-ই চায়, মাত্রা বাড়াতে বাড়াতে নিজে নিজের প্রভু হতে চায়, স্রষ্টা।

ধর্মটিচারকে অপুর ঠিক ভালোও লাগে না আবার খারাপও লাগে না। কুঁজো মানুষটা সপ্তায় তিন দিন বিকেলবেলা তার টেবিলে এসে বসেন, তারপর পড়ানোর নামে যখন অদ্ভুত সব গল্প জুড়ে দেন, ব্যাপারটা তখন হয়ে ওঠে বেশ অন্য রকম। ভালো কী মন্দ, আলাদা করা মুশকিল হয়ে পড়ে। গল্প বলার সময় ধর্মটিচারের গলাটা আস্তে আস্তে চিকন আর মিহি হয়ে পড়ে, অপুর কাছে তখন তাকে অতটা বুড়ো মনে হয় না।

রিয়া বলে-- ধর্মটিচার কী পড়ান?

-- হুজুর?

-- উনি বলেছেন হুজুর ডাকতে?

-- হ্যাঁ, মজা না?

-- মজা কেন?

-- বাহ্, হুজুর তো বলে গরিবরা। নাটকে দেখায় না রাজার সামনে প্রজারা দাঁড়িয়ে হাতজোড় করে হুজুর হুজুর করছে? আমি প্রজা?

-- কী পড়ান?

পড়ান না তো, গল্প বলেন।

-- মজার গল্প?

-- পয়গাম্বরদের গল্প। পয়গাম্বর চেনো? প্রোফেট। একদিন এক প্রোফেট সমুদ্রের পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে পানিতে পড়ে যান, আর সঙ্গে সঙ্গে একটা বোয়াল মাছ তাকে গিলে ফেলে।

-- সমুদ্রে বোয়াল মাছ থাকে?

-- থাকে না? আচ্ছা, শার্ক তো থাকে।

-- ওনার গল্প তোমার ভালো লাগে?

অপু হ্যাঁ-না কিছু বলে না। রিয়া তখন জিজ্ঞেস করে-- আর কী বলেন? অপু মিটিমিটি হাসে, কিন্তু হাসিটা মুখ ফুটে বেরিয়ে পড়তে সে যেন তা লুকাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে। রিয়া কৌতূহলী হয়। অপুর এই হাসিটা তার চোখে স্বাভাবিক মনে হয় না। হাসিটা মুখে ফুটে ওঠার পর সেটাকে আড়াল করার জন্য সাত বছরের অপুর তৎপরতা রহস্যময় ঠেকে। এদিকে অপু, সাত বছরের অপু বলেই, হাসিটাকে চট করে ধামাচাপা দিতে পারে না, বরং কচি ফর্সা গালে, চিবুকে, ঠোঁটে, চোখের ভুরুতে হাসির ঝিকিমিকি রেখাগুলো চিরে চিরে বেরোয়। পরক্ষণেই কি মনে হতে সে এক ছুটে শোবার ঘরে ঢুকে টিভিতে স্পোর্টস চ্যানেল ছেড়ে রেসলিং-এ বিভোর হয়ে পড়ে।

দ্বিতীয় সুযোগে রিয়া যখন জিজ্ঞেস করে-- বললে না, কী বলেন-- অপু কিছুটা ভড়কে যায়। ছেলের ভয় পাওয়া মুখ দেখে রিয়াও ঘাবড়ে যায়। তাকে তখন আশ্বস্ত করতে শান্ত গলায় জানতে চায়-- বলো, উনি আর কী বলেন?

আশ্বাস পেয়ে অপু ভড়কে যাওয়া ভঙ্গিটা কিছুটা সামলায়, তারপর একটা রহস্যময় তথ্য দিচ্ছে, এমন গলায় বলে-- হুজুর বলেন, মানুষ কিছু তৈরি করতে পারে না। ‘তৈরি’ শব্দটা হয়তো তার মনমতো হয় না, তাই পরপরই পুরো বাক্য নতুন করে নির্মাণ করে-- মানুষ কোনো কিছু বানাতে পারে না।

এ কথার পর রিয়ার চোখমুখের অপ্রস্তুত অবস্থাটা ঝুরঝুর করে খসে পড়ে। সে হাসে। প্রথমে মিটিমিটি, যেন অপুর রহস্যসংবাদে সেও শরিক হচ্ছে, তবে একটু পরই হাসিটা তার নিঃশব্দ থাকে না, বিলম্বিত, শব্দময় হয়ে ওঠে। অপু তখন একটু আগের বাক্যের সাথে ছোট্ট লেজ জুড়ে দেয়-- তোমরাও আমাকে বানাওনি। হাসিটা মুখে ধরা অবস্থায়ই রিয়া ভাবে, অপু কি এ সময় নোটবুকের কথাগুলো আওড়াবে, কিংবা মনে নেই বলে, নোটবুক ঘেঁটে কাঁচা হাতে তোলা ব্ল্যাকবোর্ডের কথাগুলোই বের করে দেখাবে, কিংবা বডি লাভের মানে জানতে চাইবে? কিন্তু অপু যে মাত্র সাত বছরের অপু, এটাই যেন রক্ষা; কারণ মায়ের হালকা জেরার উত্তরে প্রশ্রয় পেয়ে মজা পাওয়া গলায় সে প্রথম বাক্যটিই আওড়ায়, বারবার আওড়ায়। মানুষ কিছু বানাতে পারে না। বলতে বলতে সে যেন এই আপাতসাধারণ বাক্যটির দুরূহ জটিলতা থেকে মুক্ত হতে পারে না। টেবিল থেকে গ্লাস তুলে বলে, মানুষ কিছু বানাতে পারে না; কলম তুলে বলে, মানুষ কিছু বানাতে পারে না; বই-খাতা, স্কুলব্যাগ, পানির ফ্লাস্ক একের পর এক ছুঁয়ে ছুঁয়ে বলে, মানুষ কিছু বানাতে পারে না। বলতে বলতে বাক্যটি যেন তাকে এক জটিলতা থেকে অন্য জটিলতায় নিয়ে যায়। একছুটে ব্যালকনি থেকে মুনিয়া পাখির খাঁচা এনে বলে, মানুষ একে বানাতেও পারে না, মারতেও পারে না। হাতের নাড়াচাড়ায় খাঁচার ভেতর ছোট্ট মুনিয়া এপাশে ওপাশে লাফায়, যেন অপুর কথায় সায় দিতে পাখিটাও চঞ্চল হয়ে ওঠে।

এক পর্যায়ে রিয়াকে ধমক দিতে হয়-- অপু, অপু!

অপু থামে, খাঁচাটা ব্যালকনিতে জায়গামতো রেখে ফিরে এসে বলে-- মুনিয়াটাকে যে বানিয়েছে, সে-ই ওটাকে মারতে পারে।

প্রসঙ্গ হালকা করতে রিয়া অপুর ঘনিষ্ঠ হয়-- ধর্মটিচার তাহলে তো অনেক কিছু পড়ান, তাই না?

-- পড়ান না তো, বলেন। গল্প বলেন।


# #

সাইবারস্পেসে মানুষ যখন তার শরীরী অস্তিত্ব, সুখ-দুঃখ, প্রেমানুভূতি, যৌন আবেগ নিয়ে পৃথিবীময় ঘুরে বেড়াবে, তখন মানবজীবন এমন এক চূড়ান্ত উৎকর্ষে পৌঁছে যাবে, অতীতের ঘটনা-টটনা মনে হবে গাঁজাখুরি। মানুষ ভাবতেই পারবে না এখনকার মতো বর্বর অবস্থায় কোনো কালে তারা ছিল। প্রস্তরযুগের কথা ভাবলে এখন কেমন মনে হয়? মনে হয় না, বানোয়াট? বড় বড় পাথরের চাঙড় হাতে গরিলার মতো একেকটা মানুষ জন্তু-জানোয়ারের পিছু ছুটছে, তারপর শুয়োর বা মোষের মাথা থেঁতলে মগজ টেনে খাচ্ছে। সভ্যতার হিসেবে মানুষ আগের অবস্থা থেকে খুব একটা এগোয়নি; এখনো কথা বলতে গেলে মুখ ব্যবহার করতে হয়, মারামারি-খুনোখুনিতে হাতের দরকার পড়ে। আগামী দিনের মানুষ এসব বর্বরতা থেকে মুক্ত হয়ে যাবে। ইতিমধ্যেই মানুষ কতটা ঝাড়া হাত-পা হয়ে গেছে ভাবো! উন্নত দেশে বাজার-হাট করা মানুষ ছেড়ে দিয়েছে। খেলাধুলা, বইপড়ার মতো কাজও অবলীলায় ইন্টারনেট করে দিচ্ছে। তবে বড় চ্যালেঞ্জটা এখনো সামনে-- আবেগ-অনুভূতি, শরীরীবোধ, যৌনতৃষ্ণার মতো মৌলিক ব্যাপারগুলো এখনো কম্পিউটার চিপসে ঢোকানো যায়নি। মানে, আজ পর্যন্ত যায়নি, তবে আগামীকাল ভোরে কী হবে বলা যায় না। বলতে বলতে কামরান হাসে। বুঝতে পারে, রিয়ার মতো লেম্যান, থুড়ি, লেওম্যানকে তার মতো করে বোঝাতে গিয়ে সে লজিক ছেড়ে পিচ্ছিল ফ্যান্টাসির দিকে চলে যাচ্ছে।

রিয়া বলে-- মানুষ তখন মানুষ থাকবে?

-- সেটা কোনো ভয়ের ব্যাপার না। মানুষ তখন আজকের মানুষ থাকবে না ঠিকই, তাই বলে দৈত্য-দানবও হয়ে ওঠবে না। মানুষ তার লক্ষ্য অর্জন করবে, সে হবে ক্রিয়েটার, স্রষ্টা।

# #

ব্যালকনি থেকে মুনিয়ার খাঁচাটা পড়ার টেবিলে এনে অপু একমনে পাখিটাকে দেখে। গলায় বুকে রেশমকোমল পালকের কারুকাজ, মার্বেলের মতো গোলগাল মাথায় ছটফটে গাঢ় চোখ, ঈষৎ খয়েরি ঠোঁট। দেখে দেখে ভাবে, কী সুন্দর! সুন্দর বলেই হয়তো একে মানুষ তৈরি (বানাতে) করতে পারে না, আবার সুন্দরের কারণে মেরেও ফেলতে পারে না। দ্বিতীয় কথাটায় তার খটকা লাগল। দুটো হাতই একযোগে নিশপিশ করে উঠল। মেরে ফেলা যাবে না কেন? এইটুকু শরীর, খাঁচা থেকে বের করে রেশমনরম গলায় জোরে চাপ দিলে ও কী করতে পারে!

ধর্মটিচার পড়ার টেবিলে খাঁচাসুদ্ধ মুনিয়া দেখে জিজ্ঞেস করে-- এটা কেন?

-- একে বানানো যায়?

-- না।

-- মেরে ফেলা?

-- ওর মৃত্যু আসবে যখন, তখন ...

-- মৃত্যু কখন আসবে?

-- যখন হুকুম হবে।

খাঁচার গা থেকে অপু হাত সরিয়ে নেয়। এ কথাটা নতুন, আগে শোনেনি। হাত নিশপিশ ভাবটা কিন্তু থেকেই যায়।

খাঁচাটা এরপর অপুর টেবিলেই পড়ে থাকে। পাখিটা যে সুন্দর, গলায় পালক রেশমনরম এসব তাকে ভাবায় না। খাঁচার ভেতর চোখ ফেললেই হাতের আঙুলগুলো তার চুলকায়, রেশমনরম জায়গাটা জোরে চেপে ধরার প্রেরণায় ডান হাতের পাঁচ-পাঁচটা আঙুল ছটফট করে। কখনো কখনো ছটফটানি বেড়ে গেলে সে খাঁচার ছোট্ট দরজায় হাত ঢুকিয়ে মুনিয়াটাকে মুঠোয় চেপে ধরে, তবে যতটা জোরে চাপ দিলে হাতের নিশপিশ দূর হওয়ার কথা, ততটা জোরে না। তার ভয় ভয় করে। যখন মৃত্যু আসবে কথাটা সোজাসরল নয়, বেশ ঘোরালো। মৃত্যু যদি না আসে, হাতের পাঁচ আঙুলে যত জোরই খাটাক, পাখিটা যেমন আছে তেমনই থাকবে।

চ্যালেঞ্জটা যে তার জন্য বড়সড়ো চ্যালেঞ্জ, অপুকে বলে বোঝাতে হয় না। কিন্তু চ্যালেঞ্জটা সে নেয় কী করে! মুনিয়াটাকে হত্যা করার যত ক্রূর পরিকল্পনাই তার মাথায় খেলে, বাস্তবে সে সাহস হারিয়ে ফেলে। এর মৃত্যুর সময় কখন আসবে, সে কী করে জানবে!


# #

কামরান বলে-- খাঁচাটা টেবিলে নিয়ে কী করো?

খুনের চিন্তা করতে করতে অপুর চোখেমুখে খুনি সংকল্প, বলে-- আমি এটাকে মেরে ফেলব।

-- মেরে ফেলবে? কেন?

-- ওকে কী মারা যাবে না?

-- কিন্তু মারবে কেন?

-- ওর যখন মরার সময় হবে, তখন নাকি এমনি এমনি মরবে।

-- হ্যাঁ, ঠিকই তো।

-- ঠিক?

-- অবশ্যই ঠিক।

-- হুজুর তাহলে ঠিক বলেছেন?

-- হুজুর? ধর্মটিচার? কী বলেছেন?

-- ওকে মারা যাবে না। যখন হুকুম হবে, তখন ও মরবে। এটাও ঠিক?

অপুর চোখেমুখে খুনের সংকল্প দপদপ করতে থাকায় কামরানের কিছুতেই মনে হয় না সে যার জেরার মুখে, সে আর কেউ না, সাত বছরের অপু। তার জন্যও এটা একটা চ্যালেঞ্জ। কিন্তু চ্যালেঞ্জটা মোকাবিলা করতে সে সহজ-সরল সনাতন পথই ধরে। বলে-- হ্যাঁ, ঠিক। কিন্তু তুমি পাখিটাকে মারার কথা ভাবছ কেন?

অপুর কচি ফর্সা চিবুক অবিশ্বাস্য দৃঢ়তায় কাঁপে, বলে-- আমি দেখতে চাই।

-- দেখতে চাও? কী?

জবাবটুকু অপু তখন দেয় না।

ভরসন্ধ্যায় ফাঁকা বাড়িতে খাঁচার দরজা খুলে অপু মুনিয়াটাকে বের করে। গলার তুলতুলে পালকে একবার আঙুল বুলিয়েই গলাটা সে চেপে ধরে। মৃদু খসখস শব্দ হয় গলার শিরায়, রেশমকোমল কিছু পালক ফ্যানের বাতাসে ঘরময় ওড়ে। মুঠো খুলে হাতটা মেলে ধরতে, বুড়ো আঙুলের ডগা থেকে এক ফোঁটা টলটলে লাল রক্ত টেবিলে খাতার পাতায় গড়ায়। মৃত পাখিটাকে টেবিলের ওপর লম্বালম্বি বিছিয়ে অপু শূন্য খাঁচাটা দেখে। কাজটা কত দূর সন্তোষজনক হয়েছে ভাবতে ভাবতে রান্নাঘর থেকে লাল বাঁটঅলা স্টিলের ছুরি এনে মৃত মুনিয়ার গলা ধীরে ধীরে পোচের পর পোচে কাটে। রক্তমাখা খাতার পাতায় দ্বিখণ্ডিত পাখিটাকে দেখতে দেখতে সে হাই তোলে।

রাতে রোমহর্ষক ঘটনাটা প্রথমে রিয়া দেখে, তারপর তার ডাকাডাকিতে কামরান। অপু তখন বেঘোরে ঘুমাচ্ছে, ডান হাতের বুড়ো আঙুলের ডগায় মশার কামড়ের মতো এক বিন্দু লাল টিপ। এদিকে তিনটা আরশোলা, দুটো ধুমশো টিকটিকি খণ্ডিত মুনিয়ার দিকে দুর্দান্ত অভিনিবেশ নিয়ে তাকিয়ে।

রিয়া কামরানকে দেখল, কামরান রিয়াকে। বিমূঢ় অবস্থায় নিজেদের মুখ দেখাদেখি ছাড়া করার মতো কাজ তাদের জুটল না। কামরানের মনে পড়ল অপু বলেছিল মুনিয়াটাকে মেরে সে দেখতে চায়। বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমন্ত অপুকে দেখে হঠাৎ তার গা শিরশিরিয়ে উঠল। অপু কী দেখতে চেয়েছিল? যা দেখার তা তো এর মধ্যে দেখে ফেলেছে। না-কি, না-কি এখনো সময় আছে, সাত বছরের এইটুকু অপুকে নিরস্ত করার? অন্তত বিভ্রান্ত করার? খণ্ডিত পাখিটাকে কাগজে মুড়ে বেরিয়ে আসতে আসতে চিন্তাটা সে মাথা থেকে সরাতে পারল না।

পরদিন অপুর ঘুম ভাঙল দেরিতে। ছুটির দিন, ভোরে ডাকাডাকিতে ঘুম ভাঙানোর তোড়জোড় নেই। চোখ খুলে ধাতস্থ হয়ে সে তাকাল টেবিলের ওপরে, তাকিয়ে একই সঙ্গে বোকা ও বিস্মিত হয়ে গেল। খাঁচাটা খাঁচার জায়গায়, ছোট্ট দরজাটা আটকানো, খাঁচার ভেতরে মুনিয়া। এক লাফে খাট ছেড়ে খাঁচার ওপর ঝুঁকে পড়ে দেখল, গত সন্ধ্যায় লাল বাঁটঅলা স্টীলের ছুরি দিয়ে গলা-কাটা মুনিয়াটা ঘাড় কাত করে ডানার পালক খুটছে। উত্তেজনায় বারবার সে খাঁচার ওপর ঝুঁকল, একবার হাত ঢুকিয়ে রেশমকোমল ছোট্ট শরীরটা ছুঁয়েও অনুভব করল। পরপরই চেঁচাল।

দরজাবন্ধ শোবার ঘরে রিয়া কামরান চেঁচানোর শব্দ পেল। রিয়া কামরানের মুখ দেখল, কামরান রিয়ার। চেঁচাতে চেঁচাতে অপু ছুটে এসে দরজা ধাক্কাতে শুরু করেছে। দরজা খুলতে দুজনের কেউই উদ্যোগী হলো না। হঠাৎ কামরানের কী হলো, দুহাতে মুখ ঢেকে ফেলল। সে যেন বন্ধ দরজার ওপারে ভীষণ, ভীষণ উত্তেজিত অপুর নির্মল, প্রতারিত মুখটা দেখতে পাচ্ছে।

রিয়া ভাবল, সাইবারস্পেস নিয়ে কথা বলার সময় কামরানের পরবর্তী বিষয় কী হতে পারে?


----

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন