সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

ওয়াসি আহমেদের গল্প পড়া এবং বোঝা : অমর মিত্র


                                                     
ওয়াসি আহমেদের গল্প প্রথম পড়েছি ২০০০ সাল নাগাদ, সেই প্রথম যখন বাংলাদেশ গিয়েছিলাম।তাও তো কম দিন পার হয়ে যায়নি। সেবার মৃদুভাষী, অন্তর্মুখী ওয়াসির সঙ্গে কথা বলে, সাহিত্যের আড্ডা দিয়ে, তাঁর গল্প নিয়ে কলকাতায় ফিরে, পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম। তাঁর গল্প বলার স্টাইল, তাঁর চিন্তার গভীরতা আমাকে তাঁর প্রতি আগ্রহী করে তুলেছিল। তখন বাংলাদেশ নতুন দেশই। আমাদের কাছে অতি নতুনই। সেই বাংলাদেশে যাওয়াই ছিল প্রথম অন্যদেশে যাওয়া।
 
সেই একটা দেশের নতুন সাহিত্য তখন গড়ে উঠছে। হাসান আজিজুল হক, আখতারুজ্জামান ইলিয়াস পড়েছি। ওয়াসি এবং অন্য বন্ধুরা সন্ধান দিলেন জীবন ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নামের ক্ষীণকায় এক গ্রন্থের। লেখক শহীদুল জহির। কিন্তু সেই সফরে ওয়াসি ছিলেন আমার অন্যতম আবিষ্কার। নতুন দেশে নতুন সময়কালের নতুন গল্প। কিন্তু আমাদের সাহিত্যের উত্তরাধিকার তো একই। তবু সে এক আলাদা দেশ। তার বাস্তবতা আলাদা। সে দেশ পার হয়ে এসেছে রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ। গল্প উপন্যাসে মুক্তিযুদ্ধর ছায়া তখন অনেক বিস্তৃত। সেইসব গল্প ছিল তীব্র দহনের। ওয়াসি তাঁর লেখার গুণেই আলাদা হয়ে গিয়েছিলেন আমার কাছে। তারপর ইতস্তত তাঁর গল্প পড়েছি। সমীরণ মজুমদার সম্পাদিত অমৃতলোক পত্রিকায় ওয়াসির গল্প পড়েছি। অনুষ্টুপেও। কিন্তু তেমন নিয়মিত পড়িনি। তিনি কম লেখেন। লেখার পিছনে সময় দেন অনেক। তাঁর গল্প পড়লে ধরা যায় তা। ওয়াসির গল্পে ঢাকা শহরকে চেনা যায়। মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তকে চেনা যায়। আমি যা পড়েছি তা ঢাকা শহরের প্রায় না মানুষের গল্প। তুচ্ছ মানুষের গল্প। একজন লেখক নিজের শহরকে তাঁর লেখায় আঁকবেন, কী ভাবে আঁকবেন তা ওয়াসির গল্পে ধরা যায়। আমি কয়েকটি গল্পের কথা বলছি। এই সব গল্পে যে মানুষকে আঁকা হয়েছে, যাদের গল্প বলা হয়েছে, তাদের জীবনে গল্প থাকেই না প্রায়। গল্প লিখতে বসে ওয়াসি আহমেদ তাঁর সময়কে চিহ্নিত করতে থাকেন তুচ্ছ মানুষগুলিকে এঁকে। 
 
একটি গল্প, 'শৈত্য প্রবাহ'। এক সামান্য হিসেব রক্ষকের কর্ম জীবনের শেষ দিনের বৃত্তান্ত, এই গল্প। মানুষটির নাম আহমদ হোসেন। তাকে আন্তন চেখবের ‘কেরানির মৃত্যু’ গল্পের কেরানিই বলা যায়। সেই কেরানির মৃত্যু হয়েছিল ভয়ে। অবসাদে ক্লান্তিতে মৃত্যু হয় আহমদ হোসেনের। তার ফেয়ার ওয়েলের ব্যবস্থা করেছে অফিস। এত বছর সততার ( ! ) সঙ্গে সার্ভিস দিল কোম্পানিকে, তার ফেয়ারওয়েল তো করতেই হবে। সেই অনুষ্ঠানে অফিসের বড় কর্তা, মেজ কর্তা উপস্থিত থাকবেন। বড় কর্তা, মেজ কর্তাদের এতকাল ভয়ই করে এসেছে আহমদ হোসেন। তাঁদের ঘরে তেমন ঢুকেছে বলে মনে পড়ে না। তাকে তাঁরা চেনেন বলেও তার মনে হয় না। কিন্তু তাঁরা থাকবেন তাই ফেয়ারওয়েলের ব্যবস্থা হয়েছে মিটিং রুমে, যে রুমে হিসাব রক্ষক আহমদ হোসেন কোনোদিনই প্রবেশ করেনি। ফলে ঘরটির শীততাপ নিয়ন্ত্রণে তার হাত পা কাঁপছে। ঘরটিতে প্রবল শীত, বাইরে অসহ্য গ্রীষ্ম। শৈত্য প্রবাহে আহমদ হোসেন জমে যেতে থাকে। অনুষ্ঠান একটু দেরি করেই আরম্ভ হয়। এবং নিম্ন পদের কর্মচারী থেকে উচ্চ পদের কর্মচারীদের দিকে ভাষণের অনুরোধ যেতে থাকে। তাইই হয়। আসলে আহমদ হোসেন যা নয় সেই কথাই বলা হতে থাকে। তিনি ছিলেন অফিস অন্তপ্রাণ, কর্তব্যনিষ্ঠ, এফিসিয়েন্ট, পাংচুয়াল...হেন ছিলেন তেন ছিলেন। একই কথা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সকলে বলে যাচ্ছে। তিনি ছিলেন কোম্পানির সম্পদ। ছিলেন ছিলেন। অতীত হয়ে গেছে আহমদ হোসেন। সে ভাবেনি সে এমন। সে ভাবেনি সে বর্তমানে আর নেই। তার শীত করছিল। কখন অনুষ্ঠান শেষ হবে সেই কথা ভাবছিল সে। তার মনে হচ্ছিল সকলে মিলে তার রুহের মাগফেরাত কামনা করছে। আসলে তার মনে হচ্ছিল সে যেন কবরে প্রবেশ করছে একটু একটু করে। মৃতের নিন্দা করে না কেউ। মৃতের যে গুণাবলী নেই, তার কথাও বলা হয় কবরের পাশে দাঁড়িয়ে। আহমদ হোসেনের অফিসের কর্তারা পরপর যখন বলে যাচ্ছেন, একই বিষয়ের পুনরুক্তি যখন হয়েই যাচ্ছে, তখন আহমদ হোসেনের মাথাটি নেমে এল টেবিলের উপর। তার কবরে যেন মাটি পড়ছে তখন। গল্পটি লেখার গুণে শৈত্যপ্রবাহ বয়ে দেয় পাঠকের অন্তরাত্মায়। আহমদ হোসেন মানুষটি অতি সাধারণ। অসৎ ছিল না, আবার সৎ ও ছিল না। সুযোগ পেয়েছে যখন, উপরি ইনকাম করেছে সকলকে লুকিয়ে। গড়পড়তা মানুষকে নিয়ে ওয়াসি আহমেদের এই গল্প আমাকে বিব্রত করেছে। মনে থাকবে। মনে থাকবে অভয়ারণ্য নামের অসামান্য এক গল্পের কথাও। অভয়ারণ্য এক পুলিশের নিম্নপদের কর্মচারীর কথা। সে মানুষ পেটাতে পারে, পালিশ করতে ওস্তাদ। সাতবছরেও সন্তানহীনা তার বউ শান্তা। আলী নেওয়াজ রায়ট পুলিশের এ এস আই। এক বর্ষার সন্ধ্যায় ডিউটি সেরে বাসায় ফিরে সান্ধ্য আহার সেরে হালকা কমলা রঙের একটা বই নাড়াচাড়া করতে করতে তার ভিতরে প্রবেশ করে। বইয়ের ভিতর ডুবে যায়। তার চোখে জল এসে যায়। এই গল্প কিছুটা বাস্তব এবং পরাবাস্তবের হাত ধরে এগোয়। আলী নেওয়াজ বইয়ের ধার কাছের মানুষ নয়। কিন্তু কমলা রঙের বইয়ের ভিতরে ঢুকে অশ্রুপাত করায়, শান্তার মনে হয় এমন তো হওয়ার কথা নয়। তার স্বামী একটা গ্যাঁড়াকলে পড়ে গেছে। তার পেটমোটা হাত ব্যাগ খুলে সবুজ রেক্সিনে মোড়া ডায়েরিতে কী যেন লিখে রাখে। হয়ত তার মনের গতিপ্রকৃতি। জীবনে কত কিছুই না মানুষের অনুভব করার আছে--কত বেদনা...।
 
যে বইটি তাকে মোহাচ্ছন্ন করল, সেই বইটি হতে পারে একটি নভেল। তার মানে শান্তা নভেল পড়ে। আলী নেওয়াজ অল্প বয়সে একটি বা দুটি নভেল পড়েও থাকতে পারে। মনে নেই। এই বইটি দুঃখের বই। দুঃখ আছে বলেই তার চোখে জল আসে। বাইরে বৃষ্টির দাপট, ঝোড়ো বাতাস, রান্নাঘরে আচমকা প্রেসার কুকারের সিটি অগ্রাহ্য করেই আলী নেওয়াজ নভেলের পাতার পর পাতা পড়ে একটা ঝামেলার ( গ্যাঁড়াকল ) দিকে ক্রমাগত এগিয়ে যেতে থাকে। আলী নেওয়াজ মানুষটি যে কোনো দাঙ্গা, হাঙ্গামা, জনমানুষের প্রতিবাদ থামাতে অগ্রবর্তী। সে তার দায়িত্বে ভয়ঙ্কর নিষ্ঠ। সারাদিন মানুষ পিটিয়ে দাঙ্গা থামিয়ে, প্রতিবাদ থামিয়ে সে বাসায় ফিরে স্বাভাবিক। এই কাজই তার ডিউটি। ডিউটি পালন করে সে তৃপ্ত। শুধু সেদিন কী হয়েছিল, বৃষ্টিস্নাত সন্ধায় বাড়ি ফিরে খাওয়া দাওয়া সেরে নভেলটি হাতে পেয়ে তা পড়তে পড়তে চোখের জল ফেলতে থাকে। কেন তা বোঝে না শান্তা। বরং তার মনে হয় আলী নেওয়াজ বদলে যাচ্ছে। এই গল্প আপনাকে স্তম্ভিত করবে। সেই যে নিষ্ঠুর মানুষটি কতগুলি ঝুপড়ির মানুষকে উচ্ছেদ করতে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল তার সহকর্মী কনস্টবলের মাথা ফাটতে, তার ভিতরে নিহিত আছে আলী নেওয়াজের পরিবর্তন। লাঠি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে এক গর্ভবতী নারীর প্রতিরোধের মুখে পড়ে। তারপর যা হওয়ার তা হয়েছে। আচ্ছা, মার কি আলী নেওয়াজ খায়নি। মার খাওয়া আর মার দেওয়া, দুটিই তার ডিউটির অন্তর্গত। মার খেয়ে হাসপাতাল এবং বাড়িতে ছ’মাসও কেটেছে তার। কিন্তু তখন তো এমন হয়নি। আলী নেওয়াজ ঝুপড়ির মানুষকে পালিশ করতে গিয়ে যে প্রতিরোধের ভিতর পড়েছিল তার ভিতরেই নিহিত আছে তার নভেল পাঠ এবং অশ্রুপাত। তারপরে ডায়েরিতে হাবিজাবি লেখা। এই মানুষটার জীবন আচমকা বদলে গেল। পাঠক, আলী নেওয়াজ বদলে গেছে। বদল অশ্রুপাত বা নভেল পাঠে চিহ্নিত নয়। অন্য কিছুতে। অসামান্য এই গল্প। ফিরে পড়া যায়। কাহিনিবৃত্তই গল্প নয়। তার বাইরে কিছু থাকে, যাকে খুঁজে বের করেন লেখক। এই গল্প সেই আবিষ্কারে গেছে। পড়তে হবে। গল্পের সার বলে দেওয়া আমার কাজ নয়। 
 
নগর চেনা খুব সহজ নয়। মুক্তিযুদ্ধ, গ্রাম বাংলা থেকে বেরিয়ে ওয়াসি আহমেদ নগরের তুচ্ছ মানুষদের চিনেছেন নগর চেনার সঙ্গে। আমি তাঁর সমস্ত গল্প পড়িনি, কিন্তু যা পড়েছি, টের পেয়েছি নগরের রুক্ষ্ম জীবন যেভাবে চেনেন ওয়াসি, তা ইলিয়াসের গল্পে দেখেছি আমরা। পূর্ব বাংলার গল্প সজীব হয়ে আছে তার সজীব প্রকৃতি নিয়ে, সেখানে ঢাকা শহরে জীবিকার জন্য পড়ে থাকা মানুষের গল্প তেমন পাইনি। পাইনি মানে আমার পড়া হয়নি। সেইসব তুচ্ছ মানুষ, খিন্ন মানুষের কথা লেখা হয়েছে নিশ্চয়। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের লেখায় পেয়েছি। তাঁর "চিলেকোঠার সেপাই" উপন্যাসে ঢাকা শহরের প্রাণ স্পন্দন টের পেয়েছিলাম। তবে দুই লেখকের ঘরানার তফাৎ আছে। ওয়াসি আহমেদকে মনে হয়েছে চেখভীয় ঘরানার খুব কাছে। তাঁর একটি গল্প, ছ’ফুট দূরত্ব’। এ এক আত্মহত্যার কাহিনি। গল্পটি প্রথম পুরুষে লেখা। গল্প কথক হয়ত লেখক নিজেই, অথবা আর কেউ। রাজন। সে জেনেছে বহুতল থেকে নিচে ঝাঁপ দিয়ে যে আত্মহনন, পতনে ভূমিতল ছোঁয়ার ছ’ফুট আগেই মানুষের হৃদপিণ্ড বন্ধ হয়ে যায়। ফলে মৃত্যু হয় যন্ত্রণাহীন। যন্ত্রণাহীন মৃত্যুকে সে স্বপ্ন দ্যাখে, সে মাটি থেকে ছ’ফুট দূরত্বের অপেক্ষা করছিল স্বপ্নের ভিতর। কিন্তু নামতে নামতে ভেসে থাকে। পতন থমকে যায়। তখন তার মোবাইল বেজে ওঠে। সে বিরক্ত হয়। মোবাইল সমেত ঝাঁপ দিয়েছিল কেন ? স্বপ্ন এমনই। স্বপ্ন ভাঙে। পরদিন সে অফিস গিয়ে শোনে একজন আত্মহত্যা করেছে ফ্ল্যাট বাড়ির ছাদ থেকে লাফ দিয়ে। তার নাম আরেফিন। তার হাঁটতে কষ্ট হতো। পায়ে খুব অসুবিধে হতো। তবু সে পেরেছে লাফ দিতে। আর মাটিতে কংক্রিটে পড়ে তার মাথা চৌচির হয়ে গেছে। ছটফট করতে করতে মরেছে। সেই আবাসনের প্রহরীরাও বলল মৃত্যুর আগে তার ছটফটানির কথা। কথক খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জেনে নিতে থাকে মৃত্যু কীভাবে হয়েছে হাসপাতালে নিয়ে যেতে যেতে। তার মানে মাটি ছোঁয়ার ছ’ফুট আগে সে মরেনি। কষ্ট পেয়ে মরেছে। ওয়াসি জাল বুনে বুনে এগোন। সেই বুনন এমনই যে পাঠক জালে আটকা পড়েন। গল্প মনস্তাত্বিক। গল্প অতি আধুনিক জীবন বোধের। মৃত্যুকে বুঝে নিতে চাওয়ার। 
 
‘জানালা’ গল্পটি দুই দম্পতির। এক দম্পতি সুখী মধ্যবিত্ত। স্বামীটি চিকিৎসক। আনিস। স্ত্রী সীমা, কর্মরতা নারী। বর্তমানে গর্ভবতী। মেটারনিটি লিভে আছে। অন্য দম্পতিটি একটি নির্মীয়মাণ বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। বাড়িটি উঠতে উঠতে থেমে গেছে। তাদের দেখা যায় জানালার ওপারেই। ওই বাড়ির পুরুষটি, রমযান হয়ত ঐ বাড়ির প্রহরী। গল্প সামান্য। প্রহরীর বউ কুটনো কোটে, জামাকাপড় রোদে দেয়, প্রহরী নানা রকম কাজ করে। ইলেকট্রিক সারাই করে, তাদের না আছে গ্যাস, না আছে ইলেকট্রিসিটি, না আছে অমন কিছু, থাকে যেন একটি খোড়লের ভিতর। এই গল্পে উচ্চবিত্ত আর প্রায় না মানুষ হয়ে যাওয়া রমযানের পরিবার, তার নিশ্চিন্তে শাক বাছা, পুঁই ডাটা, জালি কুমড়োর চাষ, রান্নাবান্নার ভিতরে সেও হয়ে উঠেছে গর্ভবতী। যোজন যোজন তফাৎ দুই মানবীর। গল্পটিতে রমযানের বিবি যেন ছেয়ে ফেলে সীমাকে। নিহিত শ্লেষে শেষ হয় বুঝি এই গল্প। 
 
পার গল্পটিতে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ফিরে আসে আলী কবিরের মনে। তাদের এক অঞ্চল থেকে বর্ষার রাতে অন্য অঞ্চলে পাড়ি দিতে পার হতে হয় এক বিস্তৃত বিল। সেই বিল পার হতে যে নৌকো পাওয়া গিয়েছিল তার নিচে ছিল ছিদ্র। স্থানীয় এক কিশোর জল ছেঁচে ছেঁচে পার করে দিয়েছিল তাদের দলটিকে। আলী কবির এখন, চল্লিশ বছর বাদে সম্পন্ন সফল মানুষ। ছেলে আমেরিকায়। স্ত্রী সেখানে। মেয়ে ঢাকার এক কলেজে পড়ায়। তিনি বাসে রাজশাহী যাচ্ছেন। পথে বাস অচল হয়ে গেলে তিনি একটি চায়ের দোকানে বসে অপেক্ষা করছেন বাস চালু হবে কখন। সেই বিল এই অঞ্চলেই। তাঁর সেই যুদ্ধযাত্রার কথা মনে পড়তে থাকে। সামনে একটা তুচ্ছ মানুষ বসে চা আর বান রুটি খাচ্ছে। রুটি বাসী বলে একবার তার সঙ্গে চা দোকানির কলহ হয়ে গেছে। লোকটি যেন অকাল বৃদ্ধ। তাকে সে বিলের কথা জিজ্ঞেস করে। সে বলে বর্ষা ছাড়া বিলে পানি থাকে না, তারপর সে তাঁকে একটা নম্বর দিয়ে ফোন ধরিয়ে দিতে বলে। সমন্ধির সঙ্গে কথা বলবে। তাকে এখানে অপেক্ষা করতে বলে সে আসছে না। পার একটি তুলনাহীন গল্প। যে কিশোর মুক্তিযোদ্ধাদের নৌকোর জল ছেঁচে তাদের পার করিয়ে দিয়েছিল অকুল দরিয়া, সেই সমুখে বসে আছে। গল্পটি স্তম্ভিত করে। মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা আলী কবিরের জীবনে সুখ এনেছে। সমৃদ্ধি এনেছে। যে অন্ধকারে দরিয়া পার করে দেয়, তার কাজই ঐ। আর কিছু না।
 
‘সাঁতার শেখার সূত্র’ গল্পটিতে আছে বেঁচে থাকার উপায় খুঁজে বের করার এক অনন্য প্রয়াস। আজিজ মাস্টারের জীবন পানিতে কেটেছে। সে বাল্যে কিছু হলেই জলে গা ডুবিয়ে ঘন্টার পর ঘন্টা পড়ে থাকত। বাড়ি থেকে পালিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করতে গিয়েছিল। তখন তার পনের। প্রাপ্ত বয়স্ক হয়নি বলে হামিদ কম্যান্ডার তাকে যুদ্ধে যেতে দেয়নি। ট্রেনিং দিয়েছিল। হামিদ শহীদ হয়েছিল। সে ফিরে এসে হামিদকে দোষারোপ করে যুদ্ধ করতে দেয়নি বলে। এই ব্যক্তিই অঙ্কের টিচার হয় স্থানীয় স্কুলে। ছাত্রদের ডুব সাঁতারের কৌশল শেখায়। সকলে সাঁতার শিখতে ভীড় করে। মনে হয় পুকুর ভর্তি হয়ে যাবে সাঁতারুতে। পুকুর থেকে নদীতে যেতে হবে সকলকে। কিন্তু ডুব সাঁতার শেখাবেই আজিজ মাস্টার। তার সারাজীবন ডুব সাঁতারেই কেটেছিল যেন। গল্পটি লেখার গুণে অপূর্ব।
 
আপাতত ওয়াসি আহমেদ পাঠ শেষ হলো। কিন্তু এরপরেও তাঁকে নিভৃতে পড়া চলবে। নিভৃত পাঠই একজন লেখকের সবচেয়ে বড় পাওনা। ওয়াসি নিভৃত পাঠের লেখক। 
 
 
 
আলোচক পরিচিতি:
অমর মিত্র
কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক। সম্পাদক
কলকাতায় থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন