সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

ওয়াসি আহমেদ'এর গল্প: আমাদের মীনা

মীনার বয়স যখন দশ, তখন খুব কাছে থেকে একজন ইয়াং-স্মার্ট মন্ত্রীকে তার দেখার সুযোগ ঘটে। শুধু যে দেখার তা না, ছোঁয়ারও। মীনাকে নিয়ে তখন এলাকায় বেশ আলোড়ন হয়।
বাংলদেশের রাজধানী ঢাকা থেকে দুশো কিলোমিটার দক্ষিণে যে-স্কুলে মীনা নিচু ক্লাসের ছাত্রী, সে-স্কুলের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে মন্ত্রী স্কুলে আসেন। স্কুলের জন্য তো বটেই, গোটা এলাকার জন্যও ঘটনাটা বিশাল। এর বড় কারণ, এই উন্নয়নের যুগেও এলাকাটা বেশ দুর্গম। রাস্তাঘাট বলতে গেলে নেই, যা-ও আছে, তাতে শুকনো মৌসুমেই অল্প-স্বল্প চলাচলের কাজ চলে; মূল ভরসা জলপথ লঞ্চ নয়তো নৌকা। এ অবস্থায় একজন খোদ মন্ত্রীকে এখানে আসতে রাজি করানো চাট্টিখানি কথা নয়। যারা কাজটা করতে পেরেছেন, তারা যে অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন, রাতকে দিন করেছেন, এ নিয়ে কারো মনে সংশয়ের বিন্দুমাত্র অবকাশ থাকে না। শোনা কথা, এমন অসম্ভব কাজ সমাধা করতে তারা তিন দফা ঢাকা অভিমুখে অভিযান চালিয়েছিলেন।

পয়লা দফায় তারা লঞ্চে চেপে প্রথমে সদরঘাটে, পরে বিজয়নগরে দুটো হোটেলে পাক্কা ছয় দিন সাত রাত কাটিয়ে বিফলমনোরথ হয়ে ফিরে এসেছেন। মন্ত্রীর ধারেকাছে ভেড়ার সুযোগ মেলেনি। দ্বিতীয় দফায় তারা মন্ত্রীর দূরসম্পর্কের এক আত্মীয়ের মাধ্যমে কাছ-সম্পর্কের আরেক আত্মীয়কে ধরে বাংলাদেশ সচিবালয়ে যেখানে বসে মন্ত্রী রাষ্ট্রীয় কাজকর্ম করেন, সেখানে মন্ত্রীর একান্ত সচিবের কাছে জোরালো ধরনা দিয়ে কিঞ্চিৎ আশার আলো নিয়ে সদরঘাটে এসে লঞ্চে চেপেছেন। তৃতীয় ও শেষ দফায় তারা মরিয়া হয়ে, বলতে গেলে জীবন বাজি রেখে ঢাকা তথা মন্ত্রী অভিমুখে যাত্রা করেছেন, আর সেই একান্ত সচিব ভদ্রলোকের অশেষ কৃপায় মন্ত্রীর মাঠের মতো ঘরে ঢুকে মুখোমুখি সার বেঁধে দাঁড়িয়ে রোমাঞ্চিত হয়েছেন এই ভেবে যে, তারা এতদূর আসতে পেরেছেন। তারা তখন আশায় বুক বেঁধেছেন; এতদূর যখন পৌঁছানো গেছে...। অবশ্য তাদের আশা ও শ্রমের পেছনে গূঢ় একটা প্রেরণাও ছিল। তারা জানতে পেরেছিলেন, মন্ত্রীর স্ত্রীর আপন মামার শ্বশুরবাড়ি এক কালে তাদের এলাকায়ই ছিল। সে-সম্পর্কের সূত্র ধরে তিনি হয়তো তাদের এই আন্তরিক আহ্বান, শ্রম ও নিষ্ঠাকে পুরস্কৃত করবেন।

বাস্তবে ঘটনা যা ঘটল, তা সত্যি রোমাঞ্চকর। মন্ত্রী সামান্যতম গাঁইগুঁই ছাড়াই জানালেন, যাবেন। কিসে যাবেন? সেটা আরো রোমাঞ্চকর, হেলিকপ্টারে যাবেন। এত সহজে এত বড় কাজ হয়ে যাবে, আয়োজকদের কল্পনায়ও ছিল না। তারা তাদের অতীত দুই অভিযানের ব্যর্থতার কথা ভুলে গেলেন। তবে মন্ত্রী রাজি, এ খবর গরমগরম এলাকাবাসীদের পৌঁছে দিতে তারা তড়িঘড়ি সদরঘাটে গিয়ে লঞ্চে চাপলেন না। একটু রয়েসয়ে মিরপুর চিড়িয়াখানা, সাভার স্মৃতিসৌধ ঘুরেটুরে, শিশুপার্কে খেলনা ট্রেন চড়ে গোটা একটা বিকাল খুব আমোদে কাটিয়ে এলাকামুখো রওনা হলেন। তাদের সেই ফিরতিযাত্রা বড়ো মধুর হয়েছিল।

এরপর যা হওয়ার, তাই হলো। মহাতোড়জোড়। একে মন্ত্রী, আবার হেলিকপ্টার। গোটা এলাকায়, ঘরে-বাইরে একই আলোচনা। অল্পবয়সি, বেশিবয়সি সবার মনেই মন্ত্রীর আগমনবার্তা উত্তেজনা ছড়াল। সঙ্গে কাজও চলল। স্কুলের দেয়ালে ফকফকে সাদা রঙ পড়ল। আশপাশের আগাছা-জঙ্গল সাফ করা হলো। পুরোনো নামফলক ফেলে সাদার ওপর কুচকুচে কালিতে নতুন নামফলক লেখা হল। হেডমাস্টারের ঘরে গদিআঁটা খানকতক চেয়ার ঢোকানো হল। স্কুল মাঠে হেলিপেড তৈরির কাজ চলল। গণ্যমান্যদের নিয়ে সতেরো সদস্যের অভ্যর্থনা কমিটি গঠন করা হলো। আর তখন মীনার ডাক পড়ল উই শ্যাল ওভারকাম গাওয়ার জন্য।

সমবেত কণ্ঠে উদ্বোধনী সঙ্গীত হিসেবে ছোট ছেলেমেয়েরা গানটা গাইবে। মীনা নিজেও ছোট, তবে গানের গলাটা ছোট নয় বলে, নেতৃত্বে থাকবে সে। গানের প্রথম ইংরেজি চরণের পর বাংলায় আমরা করব জয় গেয়ে আকাশ-বাতাস মাতিয়ে তোলার শক্তি মীনার গলা ছাড়া আর কার গলায় ফুটবে! অঙ্ক টিচার সুভাষ স্যার চক-ডাস্টার ফেলে, বাড়িতে অসুস্থ স্ত্রীকে ফেলে, সকাল-বিকাল বাচ্চাদের নিয়ে গানের রিহার্সেল চালিয়ে যেতে লাগলেন। মন্ত্রীর সামনে গাওয়া হবে, এ উদ্দীপনায়ই যেন ছেলেমেয়ের দল গানটাকে অল্প দিনে মোটামুটি ভালোই গলায় তুলে নিল। তবে মীনা যে মীনাই, দুদিনেই ধারণাটা সবার মনে বদ্ধমূল হয়ে গেল। গলার কারুকাজে, দমে সে অন্যদের চেয়ে মাইল-মাইল এগিয়ে।

রিহার্সেলের সময় সকাল-বিকাল স্কুলের আশেপাশে থোকা-থোকা জটলা জমে উঠতে লাগল। সমবেত কণ্ঠের ভিড়েও মীনার আকাশ-বাতাস মাতানো আমরা করব জয় জটলার মানুষজনের মনে বিচিত্র উত্তেজনা ছড়াল, গা তাদের শিউরে শিউরে উঠল। অল্প দিনেই গানটা এর গলায় ওর গলায় সুরে-বেসুরে মাঠে-ঘাটে, ঘরে-বাইরে বাজতে লাগল। সুভাষ স্যার মীনার নেতৃত্বে যারপরনাই মুগ্ধ, অবশ্য মুগ্ধতাটুকু তিনি মীনাকে সরাসরি জানতে দিলেন না। এইটুকু মেয়ে, অতিপ্রশংসায় ভড়কে না যায়! যদিও তার ভালোই জানা, মীনা খুব চটপটে ও বুদ্ধিমতী; চার-পাঁচ বছর বয়স থেকে ছড়া-কবিতা আবৃত্তি করে আসছে। ভড়কে যাবার মেয়ে সে নয়।

উদ্বোধনী সংগীত নিয়ে সুভাষ স্যারের বিশেষ কৃতিত্ব রয়েছে। প্রথমে তো বাছাই করা হয়েছিল, ধনধান্যপুষ্প ভরা। চমৎকর সুর, সুন্দর কথা, বাচ্চাদের গলায় মানায়ও ভালো। তবে কিঞ্চিৎ হিন্দুয়ানি আক্রান্ত বলে বাতিল হয়ে যায়, সে-জায়গায় ঠাঁই নেয়, দুর্গম গিরি কান্তার মরু। এটিও ভালো, তবে মুশকিল, কথাগুলো বেশি তেজি। বাচ্চাদের গলা তো, ঠিকমতো গলায় না বসলে সব বরবাদ। এ অবস্থায় সুভাষ স্যার হিন্দু-মুসলমান ছেড়ে বুদ্ধি খাটিয়ে প্রস্তাব পাড়লেন, উই শ্যাল ওভারকাম। ননকমিনুন্যাল, ননরেসিয়েল-- একদম নির্ভেজাল। অতি সাধারণ, কিন্তু বারুদঠাসা কথা। এ কথাগুলোর বলে বলীয়ান হয়েই না খোদ আমেরিকায় নিগৃহীত, কালো মানুষদের অধিকার আদায়ে মেতেছিলেন মার্টিন লুথার কিং জুনিয়র। এদিকে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের এ এলাকাটা তো এক অর্থে নিগৃহীতই।

নির্দিষ্ট দিনে মন্ত্রী এলেন। নানা ঘনঘটা, উত্তেজনা, অস্থিরতায় টানটান পরিবেশে স্কুল মাঠে সদ্যতৈরি হেলিপেডে তাকে বয়ে আনা সুরমা-রঙ হেলিকপ্টার হেলেদুলে, কিছুটা যেন ভয়ে ভয়ে নামল। রুদ্ধশ্বাস কয়েকটা মুহূর্ত গেল। দরজা খুলতে মন্ত্রী বেরিয়ে এলেন।

ইয়াং-স্মার্ট, হাসিখুশি মন্ত্রী। জেলাসদর থেকে দুই দিন আগে আসা পুলিশবাহিনী প্রাণপণে কাদামাটিতে বুট আছড়ে সেল্যুট দিল। তেমন বিকট শব্দ-টব্দ হল না, তবে এক তালে বেশ কয়েক জোড়া বুটের আছড়ে পড়ায় একটা ভাবগম্ভীর আওয়াজ সঞ্চারিত হল। মন্ত্রী গণ্যমান্যদের সঙ্গে পরিচিত হলেন, তারপর অল্প হাঁটাপথে মাঠ পেরিয়ে আকাশীরঙ সামিয়ানা খাটানো স্কুলপ্রাঙ্গণে এসে পৌঁছলেন।

পথ দেখিয়ে মন্ত্রীকে মঞ্চে তুলে সবচেয়ে উঁচু আর ঢাউস চেয়ারে বসানো হলো। সামনে ধপধপে কাপড়মোড়া টিচার্স কমনরুমের টানা লম্বা টেবিল, টেবিলে প্লেট-ঢাকা গ্লাস, জেলাসদর থেকে আনা মিনারেল ওয়াটার, ফুল। মঞ্চের ওপারে কাতারে কাতারে মানুষ। স্কুলের পঞ্চাশ বছর পূর্তি অনুষ্ঠান বলে সমাগতদের বড়ো অংশ স্কুলের অতীত-বর্তমানের ছাত্র-ছাত্রী। যথারীতি মাইক্রোফোন টেস্টিং হ্যালওও ওয়ান টু থ্রি দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হলো। তারপর তর্জমাসহ পবিত্র কোরান তেলাওয়াত। তারপর যে জন্য এত কথা। উই শ্যাল ওভারকাম সাম ডে। আমরা করব জয় একদিন।

মঞ্চের এক পাশে সারবেঁধে খুদে খুদে ছয়জন ছেলেমেয়ে। দুইজন ছেলে, চারজন মেয়ে। মাঝখানে সাদা ফ্রক পরা মীনা। তার শ্যামলা-রোগা মুখের সামনে উটের মতো গলা বাড়ানো মাইক্রোফোন। দর্শকসারির পেছনের দিকে সুভাষ স্যার। অসহিষ্ণু ভঙ্গি, দুশ্চিন্তায়-উৎকণ্ঠায় নিশ্বাস নিতেও যেন তার কষ্ট হচ্ছে। দেরি করছে কেন? মীনা কি ভড়কে গেল! তখনি গান শুরু হয়ে গেল। ছ-ছটা কচি কণ্ঠের সমবেত আওয়াজ। কিন্তু একি, গলাগুলো আলগা, আলাদা হয়ে পড়ছে কেন? তেজ নেই, সুর নেই। কথাগুলোও ধরা যাচ্ছে না। দাঁড়ানোর ভঙ্গি, গায়কি সবই জড়সড়ো। এসব কী হচ্ছে! এত এত রিহার্সেল! সুভাষ স্যার ভাবলেন ছুটে পালান।

ইংরেজি বাংলায় দু-লাইন গাওয়া হয়ে যায়। গাওয়া তো নয়, যেন জোর করে, থাপ্পড়ের ভয় দেখিয়ে কেউ তাদের মুখ থেকে আওয়াজগুলো বের করিয়ে নিচ্ছে। শুনে শুনে সুভাষ স্যার মোটামুটি মন ঠিক করে ফেলেছেন, আর না, চোরের মতো পালানো ছাড়া গতি নেই, তখনি তাকে জোর করে বসিয়ে রাখতেই যেন গানের আলাদা আলাদা গলাগুলো জোট বেঁধে একাত্ম হয়ে ওঠে, ছন্দময়, সুরেলা, বলীয়ান হয়ে ওঠে, আর সব ছাপিয়ে মীনার গলাটা মাথার ওপর আকাশীরঙ সামিয়ানা ছাপিয়ে সত্যি সত্যি আকাশ-বাতাস মাতিয়ে তুলতে তৎপর হয়ে পড়ে। সুভাষ স্যার হাঁফ ছাড়েন। তাকিয়ে দেখেন মঞ্চটা দুলছে। ছয়টা শিশুর সম্মিলিত কণ্ঠতরঙ্গে গোটা মঞ্চটাই তাল ঠুকে সাড়া দিচ্ছে। সামিয়ানাঢাকা মস্ত স্কুল প্রাঙ্গন থমকে স্থির হয়ে আছে।

এদিকে মীনাকে দেখে কে বলবে সামনে তার বিশাল জনতা! অপূর্ব ভঙ্গিতে হাত নেড়ে, গ্রীবা উঁচিয়ে যেন এক তেপান্তরের প্রান্তরে একা দাঁড়িয়ে বিশ্বজয়ের আহ্বান জানাচ্ছে। এই গ্রীবাভঙ্গি তো তাকে কেউ দেখিয়ে দেয়নি, গলার পর্দাটা এই যে এতটা চড়াতে চড়াতে খাদে নামাচ্ছে, ফের চড়াচ্ছে, ভয় করছে না এইটুকু মেয়ের! সুভাষ স্যারের বুক ঢিপঢিপ করে, কী মেয়ে! চোখের কোল উপচে ততক্ষণে দুফোঁটা গনগনে কান্না তার পাঞ্জাবির বুক ভিজিয়ে দিয়েছে।

গান শেষ হয়। দর্শক-শ্রোতাদের হুঁশ ফেরে। তারা প্রাণভরে হাততালি দেয়। মীনার নেতৃত্বে অপর পাঁচজন মঞ্চ ছেড়ে পায়ে পায়ে এগোয়। এসময় একটা ঘটনা ঘটে। মন্ত্রী হাত-ইশারায় মীনাকে কাছে ডাকেন। মীনা চটপটে মেয়ে, ভড়কে না গিয়ে চটপটে পায়েই মন্ত্রীর দিকে এগোয়। তবে কাছাকাছি হতে তাকে যেন খানিকটা লজ্জায় পেয়ে বসে। সে লাজুক হাসে, সমবেত দর্শক-শ্রোতার চোখে দৃশ্যটা অপূর্ব ঠেকে। এদিকে মন্ত্রী অপূর্ব দৃশ্যটাকে স্মরণীয় করে তুলতে হাত বাড়িয়ে মীনাকে কাছে টানেন, আর তার প্রকাণ্ড চেয়ারে তিনি নিজে বসার পরও যেটুকু জায়গা ফাঁকা পড়েছিল, সেখানে অবলীলায় মীনাকে বসিয়ে দেন। পরপরই তিনি মীনার ছোট্ট কাঁধে আলতো হাত রেখে, কানে মুখ ঠেকিয়ে কথার পর কথা বলে যেতে থাকেন। এদিকে মীনা ভড়কে যাবার মেয়ে নয় বলে, নিজেও কথার পর কথা চালিয়ে যেতে থাকে। এ পর্যায়ে সামনে বসা জনতা মীনা কিংবা মন্ত্রীর কথা শুনতে না পেলেও, দৃশ্যটি অপার কৌতূহলে উপভোগ করে, এবং ভাবে, শুধু অপূর্বই নয়, দৃশ্যটা অবিস্মরণীয়ও।

মন্ত্রী মীনাকে কী বলেছেন আর মীনাই বা এত কী কথা বলেছে বা বলতে সাহস পেয়েছে এ নিয়ে সমবেত জনতার অভিন্ন আগ্রহ-কৌতূহল ততক্ষণে অদম্য রূপ নিয়েছে। নেওয়ারই কথা। কারণ তাদের কথাবার্তা হয়েছে প্রায় কানে কানে, পাশে বসেও কারো সাধ্য ছিল না শোনে!

কথাবার্তা অনেক হয়েছে। প্রথমে মন্ত্রী তাকে একের পর এক প্রশ্ন করে গিয়েছেন। নাম কী, কোন ক্লাসে পড়ে, বাবা কী করেন, কী নাম, ভাইবোন কজন, কাকে সবচেয়ে ভালোবাসে?

মীনা জবাব দিয়ে গেছে। গোড়াতে লজ্জা পেয়েছে, মন্ত্রী যখন হাত-ইশারায় ডাকেন তখনি তার শ্যামলা-রোগা মুখ খানিকটা লাজুক হয়ে পড়েছিল, তবে জবাবগুলো দিতে দিতে সে লজ্জা কাটিয়ে সাবলীল হয়ে উঠেছে। তখন সে প্রশ্নের অতিরিক্ত উত্তর দিয়েছে আর এভাবেই দুজনের কথাবার্তা নানা প্রসঙ্গে পল্লবিত হয়েছে। মন্ত্রী জানতে চেয়েছেন, গানটা সে কার কাছে শিখেছে? সে বলেছে, সুভাষ স্যার। তিনি কে? অঙ্ক স্যার। বলে, তার মনে হয়েছে, গান প্রসঙ্গে উত্তরটা আরো বিশদভাবে দেওয়া যাক। সে তখন সুভাষ স্যারের মুখ থেকে বহুবার শোনা কথাগুলো মনে করে মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রের নামটা সুন্দর করে উচ্চারণ করেছে। মন্ত্রী তখন তার দিকে আরে বেশি ঝুঁকে পড়েছেন। সম্ভবত তিনি ভেবেছেন, এ মেয়েকে বোকা বোকা প্রশ্নগুলো করা ঠিক হয়নি, বিশেষ করে কাকে সবচেয়ে ভালোবাসে? তিনি তখন জুতসই কথা খুঁজে না পেয়ে মীনার গানের গলার প্রশংসা করেছেন, আর করতে গিয়ে হয়তো ভেবেছেন, এ মেয়েকে তো তার নিজের তরফ থেকে একটা পুরস্কার-টুরস্কার দিলে হতো! কিন্তু কী দেন, সঙ্গে তো কিছু আনেননি, আনলে খুব ভালো হতো। তারপরও তিনি পুরস্কারের চিন্তা মাথায় নিয়ে জিজ্ঞেস করেছেন, মীনা কী পেলে খুশি হয়। মীনা তাকে হতভম্ব করে দিয়ে বলেছে, তিনি যেন তাদের স্কুলটা দোতলা করে দেন। হতভম্ব ভাব কাটিয়ে তিনি মাথা নেড়েছেন। মীনা বলেছে, সত্যি? তিনি আবার মাথা নেড়ে বলেছেন, সত্যি, আর? মীনা বলেছে, তিনি যেন ক্লাসরুমে ফ্যান লাগিয়ে দেন। তিনি মাথা নেড়েছেন। মীনা বলেছে, ঠিক? তিনি বলেছেন, ঠিক ঠিক, আর? এতদূর এসে মীনা সময় নিয়েছে, যেন ভাবনাচিন্তা করে জবাব দেওয়াটা এ পর্যায়ে জরুরি। এদিকে মন্ত্রী মিটিমিটি হাসিমুখে মীনার চিন্তিত মুখের দিকে তাকিয়ে অপেক্ষা করেছেন, হয়তো ভেবেছেন, বলো খুকি, চিন্তা করে বলো, কী চাই; টেডি বেয়ার, বার্বি ডল। তোমার নিশ্চয়ই এসব নেই, চাও আমার কাছে, দুদিন পর তোমার হাতে পৌঁছে যাবে। এক সময় মীনা মুখ তুলে তাকিয়েছে। তিনি অভয় দিয়ে বলেছেন, বলো। মীনা তখন বলেছে, সুভাষ স্যারের বেতনটা যেন তিনি বাড়িয়ে দেন। মাইক্রোফোনে তখন স্বাগত ভাষণ হচ্ছে। তিনি একবার ভাষণরত বক্তার দিকে, একবার মীনার দিকে তাকিয়ে উদাস ভঙ্গিতে মাথা নেড়েছেন।

মন্ত্রীকে নিয়ে অনুষ্ঠান দীর্ঘ সময় ধরে চলেছে। তবে মীনাকে মন্ত্রী ছেড়ে দিয়েছেন কিছু সময় পর। চটপটে পায়ে মীনা মঞ্চ থেকে নেমে এসেছে। আর নামার পরপরই সে টের পেতে শুরু করেছে, এইমাত্র সে যা ঘটিয়ে এসেছে, ঘটনা হিসেবে তা অকল্পনীয়। মীনা তখন এর কোল থেকে ওর কাঁধে। কী বলেছেন মন্ত্রী? সে-ই-বা কী বলেছে? এত কথা, এত অন্তরঙ্গ কানাকানি! জেঁকে-ধরা আগ্রহ-কৌতূহলের চাপাচাপিতে মীনা ভড়কে গেছে। চটপটে হোক, বুদ্ধিমতী হোক, মীনা তো দশ বছরের মীনাই।

এদিকে বাড়ি ফিরে মীনার চোখে পড়েছে সবার আচরণই যেন কেমন অন্য রকম। তার বড় তিন ভাইবোন তার দিকে কীরকম চোখে তাকাচ্ছে। সামনে ঘোরাঘুরি করলেও কাছে ভিড়ছে না, কিংবা ভিড়বে বলে এগিয়েও বিচিত্র বাধায়, জড়তায় বা অন্য কিছুতে আটকে গিয়ে চোরাচোখে তাকে দেখছে। মীনার বাবা; থানাসদরে ছোট ফার্মেসি চালান, লোক মুখে ডাক্তার; মেয়েকে কী বলবেন, এমন অবস্থায় কী বলা উচিত ঠিক করতে না পেরে বলে উঠেন, কী গরম বাবা আজ, জামাকাপড় বদলা রে মা।

বলেই হয়তো তার খেয়াল হলো, গাধার মতো কী বললাম! শুধরে বললেন, যা কাণ্ড হলো আজ! এ কথায় তিন ভাইবোন ঘরের তিন কোণ থেকে দাঁত বের করল, এতে চোরা চোখগুলো তাদের খানিকটা সোজা হলো। ব্যতিক্রম মীনার মা। মেয়েকে কোলে নিয়ে এক পাক ঘুরে বললেন, আমার সোনা মা! আজ মন্ত্রীর পাশে বসেছে, একদিন মন্ত্রী হয়ে দেশ চালাবে। মীনার পিঠাপিঠি বড়ো ভাইটা বোকাসোকা। সে এ কথায় বেজায় উত্তেজনায় কী মজা কী মজা বলে লাফাতে লেগে গেল। বোকা ভাইটার লাফানোর সুযোগে মীনার দুই বোন ছুটে এসে দুপাশ থেকে মীনাকে জাপটে ধরল। জড়তা, আড়ষ্টতার খোলস এভাবে খসে পড়তে, মীনার বাবা এতক্ষণ ধওে চেপে রাখা মনের কথাটা অনেকটা জনসভায় ঘোষণা দেওয়ার মতো কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন, আমাদের মীনু শুধু আমাদের না, গোটা এলাকার গর্ব, দেশের গর্ব।

মীনাকে নিয়ে আলোড়নের সেই শুরু। দিন যত গেল, আশেপাশে মীনার খ্যাতি ছড়াল। মন্ত্রীর কাছে পেশ করা মীনার দাবিগুলোও চাপা থাকল না। তাতে খ্যাতিটা আরো বেশি বেশি ছড়াল। স্কুলে মীনার প্রতিপত্তি বাড়ল। স্কুলের হেডস্যার, যার মেঘ ডাকার মতো একটা হাঁকে গোটা স্কুল চুপ হয়ে যায়, তিনি পর্যন্ত খাতির করে মীনাকে একদিন তার অফিস ঘরে ডেকে নিলেন। হেডস্যার বলে কথা, মীনা জড়সড়ো পায়ে সামনে দাঁড়াল। হেডস্যার ভাবলেন, কী বলেন, এইটুকুন ছাত্রীকে!

তিনি বলেন, তুমি মীনা? মীনা মাথা নাড়াল। তিনি বললেন, ভালো, তুমি মন্ত্রীকে আমাদের স্কুলের কথা বলেছ, আমরা খুব খুশি হয়েছি। মীনা লজ্জায় গুটিয়ে আরো ছোট হয়ে গেল। মীনার এই ক্রমশ ছোট হয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে হেডস্যার যেন মজা পেলেন। তিনি তখন তার কঠিন মুখটার চারপাশে কয়েক চিমটি হাসি ছিটিয়ে বললেন, শুধু অঙ্কের সুভাষবাবুর বেতন বাড়াতে বললে, আমাদের কথা বললে না!

হাসিমুখে বললেও মনে ব্যথা নিয়ে কথাটা বলছেন কি না, মীনা বুঝতে পারল না। সে আরেকটু গুটিয়ে আরেকটু ছোট হলো। হেডস্যার তখন বললেন, তুমি একদিন অনেক বড় হবে।

নানা ডামাডোলে কয়েকটা দিন পার হয়ে যেতে, এবং মন্ত্রী বিষয়ক উত্তেজনা কিছুটা থিতিয়ে স্থির হতে, মীনার বাবা (ফার্মেসির সুবাদে ডাক্তার হলেও, মীনাকে গানে তালিম দেওয়ার মূলে ইনিই) একদিন নিরিবিলিতে মেয়েকে পেয়ে জিজ্ঞেস করলেন, আচ্ছা, এতকিছু থাকতে স্কুল দোতলা করতে বললি?

মীনা বলল, দোতলা হলে কত ভালো!

একতলা ভালো লাগে না?

দোতলা হলে তো অনেক বড়ো দেখাবে আর অনেক দূর থেকে দেখাও যাবে। যাবে না?

তা যাবে। আচ্ছা, কী মনে হয় উনি দোতলা করে দেবেন?

দেবেনই তো।

অন্য কিছুও চাইতে পারতি।

চেয়েছি তো, ফ্যান।

তা ভালো। আমাদের রাস্তার কথাটাও বলতে পারতি। শহর পর্যন্ত রাস্তাটা হয়ে গেলে কত ভালো হতো! যাক্, সুভাষ বাবুর ব্যাপারটা কী? ওনার বেতন বাড়ানোর কথা বললি? উনি বলেছিলেন নাকি বলতে?

উনি বলতে যাবেন কেন? উনি কী করে জানবেন মন্ত্রী আমাকে ডেকে কথা বলবেন?

তাও তো কথা। তবে?

ওমা, সুভাষ স্যার রোজ রোজ একটাই পাঞ্জাবি পরে আসেন। স্যারের টাকা-পয়সা তো ওনার বউয়ের চিকিৎসায়ই শেষ হয়ে যায়। নতুন জামাকাপড় কিনতে পারেন না।

সুভাষ বাবু তোকে খুব আদর করেন?

সবাইকেই করেন।

মন্ত্রী কি ওনার বেতন বাড়িয়ে দেবেন?

মীনা লাজুক হেসে মাথা নাড়ল।

এসবের মধ্যে মীনার কিছু কিছু সমস্যা বাড়ল। রোজ সকালে স্কুলে পা দিয়ে তার গা শিউরে ওঠে, কবে জানি দেখবে স্কুলটা দোতলা হয়ে গেছে। ক্লাসে বসে গরমে হাঁসফাঁস লাগলে হঠাৎ মনে হয় কোথা থেকে এক ঝাপটা ঠান্ডা বাতাস তার ছোট্ট শরীর ঘিরে বনবন চক্কর কাটছে। শিউরানি বাড়ে মীনার। মনটা উড়ুউড়ু প্রজাপতির মতো এখানে থেকে ওখানে ওড়ে, স্থির হতে পারে না।

কিন্তু এসব কথা মীনা কাউকে বলতে পারে না। নিজের মনেই চেপে রাখতে হয় আর একটু পরপর শিউরে উঠতে হয়। মীনা ভাবে, যদি এক রাতের মধ্যে ভেল্কিবাজির মতো স্কুলটা দোতলা হয়ে যেত, তাহলে মজা হতো সবচেয়ে বেশি। মুখ ফুটে কাউকে কিছু বলতে হতো না, সবাই বুঝত, এ মীনার কাজ। ক্লাসে ক্লাসে বোঁ বোঁ ফ্যান ঘুরত, সবাই বুঝত, মীনার কাণ্ড। আর সুভাষ স্যার রংচটা ঘিয়া পাঞ্জাবি বদলে নিত্যনতুন জামাকাপড় পরে দুই খিলি পান মুখে ঠেসে চক-ডাস্টার নিয়ে ব্ল্যাকবোর্ডে দাঁড়াতেন। সবাই বুঝত...

দিনের এসব ভাবনাগুলো রাতে মীনাকে খানিকটা সংকটে ফেলে। ঘুমের মধ্যে ঘটনাগুলো ঝটপট ঘটতে থাকে। তবে ঝটপট ঘটতে গিয়েই যেন কোথাও কোথাও ওলটপালট হয়ে যায়। যেমন: স্কুল ঘরটাকে দেখে মীনা, সেটার তো দোতলা পর্যন্তই ওঠার কথা ছিল, মন্ত্রীকে তো দোতলা করতেই বলেছিল, কিন্তু সেটাকে দেখায় আকাশছোঁয়া গম্বুজের মতো। এই গম্বুজ দিয়ে কী করবে মীনা! কোনো রাতে দেখে সে সিঁড়ির পর সিঁড়ি টপকে গম্বুজের মাথায় চড়ে বসতে চাইছে, কিন্তু সিঁড়ি আর শেষ হয় না। এক রাতে দেখল সুভাষ স্যার চুড়িদার আর নাগরা পরে তাদের বাড়ি বেড়াতে এসেছেন, এদিকে মাথায় ওটা কি টোপর? পেছন পেছন লাল বেনারসিমোড়া মহিলা কি ওনার বউ? মীনা দৌড়ে গিয়ে তার হাত ধরে, হাতটা কী তুলতুলে, আর ঘোমটামোড়া মুখটা যে কী সুন্দর! মীনা জিজ্ঞেস করে, আপনার অসুখ ভালো হয়ে গেছে? তিনি অবাক হয়ে বলেন, কীসের অসুখ? আমার আবার অসুখ হলো কবে! স্কুল নিয়ে স্বপ্নটা আজগুবি হলেও, সুভাষ স্যারেরটা খুব মজার। মীনা ভাবল এটা কাউকে বলা যায়। কিন্তু পরদিন স্কুলে গিয়ে শুনল সুভাষ স্যার ছুটি নিয়েছেন, তার স্ত্রীর অসুখ আগের চেয়ে বেড়েছে। এমন উল্টোপাল্টা স্বপ্ন দেখার জন্য নিজের ওপর রাগ হলো মীনার।

রাতে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবল মন্ত্রী দেরি করছেন কেন? বেশ কয়েকদিন তো হয়ে গেল। একরাতে মীনা যখন একথা ভাবছে, শুনতে পেল বাঁশের তরজার পার্টিশন দেওয়া ঘরের ওপাশে বোকা ভাইটাকে মা গল্প শোনাতে শোনাতে ঘুম পাড়াচ্ছে। ভাইটা মীনার দুবছরে বড়ো হলেও মাথায় বুদ্ধি একদম নেই বলে এখনো ক্লাস ওয়ানের বই-ই পড়ে। রাতে আবার তাকে দৈত্য-দানবের গল্প বলে ভয় পাইয়ে ঘুম পাড়াতে হয়। গুছিয়ে বলার দরকার নেই, হাউ মাউ খাউ জাতীয় কিছু ভয় ধরানো কথা বললেই তার চোখ ভরে ঘুম নামে। আজও মা দৈত্যের গল্পই বলছে, গুছিয়ে টেনে টেনে গল্পের মতোই বলছে। মা বলছে, তারপর দৈত্যকে রাজকন্যা বলল, দৈত্য, আমি এ জঙ্গলে থাকব কী করে, খাবো কী! তুমি আমার জন্য ঘর বানিয়ে দাও, খাবারদাবার এনে দাও। দৈত্য বলল, জো হুকুম রাজকন্যা, তুমি চোখ বোজো, আমি এখনি তোমার জন্য সাতমহলা প্রাসাদ বানাচ্ছি আর শাহি খানাদানা নিয়ে আসছি। রাজকন্যা চোখ বুজল, আর একটু পর যেই না খুলল, থ হয়ে গেল, সত্যি সত্যি সাতমহলা প্রাসাদের সোনার খাটে সে শুয়ে, চারপাশে মজাদার সব খাবারের মো মো গন্ধ।

শুনতে শুনতে, না-কি খাবারের ঘ্রাণ পেতে পেতে মীনা নিজেও ঘুমিয়ে পড়ল। তবে ঘুমে চোখ বন্ধ হয়ে গেলেও যা দেখল, তা বেশ উদ্ভট। দেখল, মন্ত্রী এসে দাঁড়িয়েছেন খাটের কিনারে। সুন্দর চেহারাটা উদভ্রান্ত, চুল এলোমেলো, পরনের জামাকাপড়ের কথা বলার মতো না, স্যুট-টাই ছেড়ে তিনি পরে আছেন সুভাষ স্যারের ময়লা ঘিয়া পাঞ্জাবি। এদিকে সবই ভেজা, সপসপে। ফোঁটা-ফোঁটা পানি ঝরছে গা থেকে। মীনা লাফিয়ে উঠল, খুঁজেপেতে শুকনো তোয়ালে এগিয়ে দিল। মন্ত্রী মাথা মুছতে মুছতে বললেন, একদম ভিজে গেছি, তুমি কেমন আছ মীনা? হঠাৎ ইচ্ছে হলো তোমাকে দেখতে। মীনা বলল, আপনার কি বুদ্ধিশুদ্ধি নেই, এভাবে বৃষ্টিতে ভিজে কেউ বেরোয়! মন্ত্রী লজ্জা পেয়ে হাসলেন, পরপরই মুখটা কাঁচমাচুু করে বললেন, খাবারদাবার কিছু হবে? মীনা সমস্যায় পড়ল, কী দেয়? তখনি মনে পড়ল স্কুলব্যাগে তেঁতুলের আচারের একটা পুঁটলি পড়ে আছে। তড়িঘড়ি আচারটুকু বের করে দিতে তিনি চেটেপুটে খেয়ে তৃপ্তির ঢেকুর তুলে বললেন, তাড়া আছে মীনা, ফর্দটা মিলিয়ে নিই। বলেই তিনি ঘিয়া পাঞ্জাবিটা একটানে খুলে ফেললেন। মীনা দেখল তার গা-ভরতি বড় বড় ঘন লোম, বৃষ্টিতে ভিজে লোমগুলো এমনভাবে গায়ে সেঁটে আছে, চামড়া-টামড়া কিছুই দেখা যাচ্ছে না। মন্ত্রী বললেন, লজ্জা পেয়ো না মীনা, দেখো ফর্দটা আমি যত্ন করে কোথায় লুকিয়ে রেখেছি। মীনা দেখল ভালুকের মতো লম্বা লোমে ঢাকা বুক হাতড়ে হাতড়ে তিনি একটা চারকোনা ছোট কৌটা বের করছেন। তারপর কৌটার এক পাশ দুআঙুলে টিপে ধরতে অন্য পাশটা খুলে বেরিয়ে পড়ল ফিতার মতো একটা লম্বাটে কাগজ। কাগজটা আলগোছে তুলে নিয়ে বললেন, এ হলো গিয়ে ফর্দ, সব লেখা আছে।

মীনা উঁকি দিয়ে কাগজটায় কী লেখা পড়তে চেষ্টা করল। তিনি বললেন, সব আছে। এই দেখো, আমি বলছি। তোমার তো মাত্র তিনটা, তাই না? প্রথমটা স্কুল।

মীনা বলল, দোতলা।

হ্যাঁ, দোতলা।

পরেরটা হল গিয়ে...

ফ্যান।

হ্যাঁ হ্যাঁ, ফ্যান। তার পরেরটা সুভাষ স্যার। ঠিক আছে না?

সুভাষ স্যরের বৌয়ের খুব শরীর খারাপ।

তা-ই, এটাও লিখে রাখলাম। আর, আর কিছু, বলে ফেলো।

হেডস্যারেরও বেতন...

বাড়াতে হবে তো, ঠিক আছে। বলো আর ...

আমার ভাইটার ...

ভাইয়েরও বেতন?

না, না ওর বুদ্ধি নেই।

বুদ্ধি দিতে হবে? দিয়ে দেব। আর...

আর কিছু না। সুভাষ স্যারেরটা খুব তাড়াতাড়ি।

এটাকে তাহলে এক নম্বরে নিয়ে আসি।

মীনা দেখল মন্ত্রী চলে যাচ্ছেন। ঘিয়া পাঞ্জাবিটা গা থেকে খুলে যেখানে রেখেছিলেন, সেখানেই পড়ে আছে।

দিনে দিনে মন্ত্রীর আসা-যাওয়া বাড়তে থাকে, বাড়তে বাড়তে এক সময় মাত্রাছাড়া, লাগামছাড়া হয়ে পড়ে। যখন তখন তিনি আসেন। মীনা চাইলে তো বটেই, না চাইলেও আসেন। ক্লাসে অক্সিজেনের প্রস্তুতপ্রণালি পড়ানোর সময় আসেন, সমাপিকা-অসমাপিকা ক্রিয়া মুখস্থ করার সময় আসেন, খেতে বসে ঝোল ভাত মাখানোর সময় আসেন, খেলার সময় আসেন, আর ঘুমানোর সময় তো কথাই নেই। তো এত যখন তিনি আসেন, মীনাও প্রতিদানে তাকে চোখে চোখে রাখতে, খবরের কাগজে একদিন তার বড়সড়ো রঙিন ছবি পেয়ে কাঁচি দিয়ে চারকোনা করে কেটে দেয়ালে সেঁটে দেয়। বড় বোন রীনা, মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে সময় আর কাটে না, ছবিটা আবিষ্কার করে নাইনে পড়া মেজো বোন বীনার কানে কীসব বলে। তারপর রীনা-বীনা দুজন মিলে মায়ের সঙ্গে কীসব কানাকানি করে। সবশেষে তাদের বাবা-মাও নিজেদের মধ্যে কী নিয়ে কানাকানি জুড়ে দেন।

এদিকে খবরের কাগজ ঘেঁটে মীনা আরো ছবি জোগাড় করে। কোনোটা ফিতা কাটার ছবি, কোনোটা জনসভায় তর্জনী উঁচিয়ে বক্তৃতা দেওয়ার ছবি, কোনোটা স্রেফ ইয়াং-স্মার্ট চেহারার ছবি। প্রথম ছবিটার মতো এ ছবিগুলোও সে এদেয়ালে সেদেয়ালে লাগিয়ে গোটা একটা ঘর ভরে ফেলে। কিন্তু শুধু একটা ঘরের দেয়ালে, দরজা-জানালায় ছবি টাঙিয়ে মীনার আশ মেটে না। সে বেশি করে খবরের কাগজ ঘাঁটে, হাতে সারাক্ষণ ছোট একটা কাঁচি। মীনা যেখানে, কাঁচিও সেখানে। মীনা একমনে মন্ত্রীর ছবি কাটে, চারকোনা করে, গোল করে কাটে আর কাটে। নিজের ঘরটা ভরে যেতে, সে বাবা-মায়ের ঘরে ঢোকে, বোনদের ঘরে ঢোকে, রান্নাঘরে, বাথরুমে বাড়ির চার দেয়ালে, ছোট উঠানের মাঝবরাবর মেজবোন বীনার কামিনীগাছের ঠাসাঠাসি ডালপালায় সুতো বেঁধে ছবির পর ছবি ঝোলায় আর ঝোলায়। এতদূর এসে তার খেয়াল হয় ছবি লাগানোর এক ইঞ্চি জায়গাও আর ফাঁকা নেই। সে তখন হাত থেকে কাঁচিটা খোলে, আঙুলগুলো ফাঁকা-ফাঁকা লাগে (নিশপিশ শব্দটা কোথায় যেন পেয়েছিল)। কাগজের ওপর কাঁচি চালাতে আঙুলগুলো অশান্ত নিশপিশ করে।

# #

মন্ত্রী বলেন, আমার এত ছবি টাঙিয়েছ মীনা!

মীনা বলে, আপনার ফর্দের খবর কী?

খুব লম্বা হয়ে গেছে। এখন আর একটা কৌটায় ধরে না, অনেকগুলো কৌটা লাগে।

কোথায় রাখেন এত কৌটা?

শরীরের আনাচেকানাচে লুকিয়ে রাখি।

লুকিয়ে কেন?

বাহ্, অন্য মন্ত্রী নিয়ে নেবে না! যার ফর্দ সব থেকে লম্বা, তিনিই পয়লা নম্বরে, ফার্স্ট।

আপনাদের মধ্যেও ফার্স্ট সেকেন্ড আছে?

আছে না! আমাদের যিনি ফার্স্ট তার সারা গা-ভরতি কৌটা আর কৌটা, সবকটা লম্বা লম্বা ফর্দে ঠাসা। তিনি যখন চলাফেরা করেন, কৌটাগুলো ঝুমঝুম আওয়াজ তোলে, আমরা টের পেয়ে যাই তিনি আসছেন।

মীনা হি হি করে হেসে বলে, মজা তো।

হ্যাঁ, খুব মিষ্টি আওয়াজ। শুনবে? শুনলে তোমার ঘুম চলে আসবে।

কিন্তু কী করে! আপনার তো অত কৌটা নেই।

যে কয়টা আছে, তাতেই হবে। শুনতে চাও তো বলো।

শুনি।

বলতে না বলতে মীনা দেখল, তিনি জামাকাপড় খুলতে শুরু করেছেন। আর জামাকাপড়ের ধরনটাও অদ্ভুত, লম্বা এক পাট কাপড়, রঙটা সবুজ হতে পারে, নীলও হতে পারে। সারা শরীরে পেঁচিয়ে থাকা কাপড়টা তিনি টেনে টেনে গা থেকে ছাড়িয়ে, লজ্জা-টজ্জার বালাই নেই; ন্যাংটো হয়ে লাটিমের মতো কয়েকটা চক্কর কাটলেন। সঙ্গে সঙ্গে সারা শরীরে তাবিজ-মাদুলির মতো ঝুলে থাকা গোটা কয়েক ছোট-বড় কৌটা সত্যিই একটা মিষ্টি-মধুর আওয়াজ তুলল। এদিকে মীনা দেখল, তার শরীরটা আসলে একটা মাঝারি উঁচু গাছ, পাতা-টাতা নেই, কাণ্ড আছে, দুটো-দুটো চারটা ডাল আছে, যেগুলোকে হাত-পা বলে মনে হচ্ছিল, আর আছে গুঁড়ি, যা নিচের দিকে না হয়ে উল্টো করে মাথার দিকে বসানো। মীনা দেখল, উপুড় করা গাছটা বোঁ বোঁ চক্কর কাটছে আর সেই মিষ্টি-মধুর আওয়াজটা তার দুচোখ ঘুমে অবশ করে দিচ্ছে। সে ঘুমিয়ে পড়ল। আর ঘুমিয়েই থাকল।

কত যে ঘুম মীনা ঘুমাল! মীনার মা যিনি মন্ত্রীর সঙ্গে মীনার চেয়ার ভাগাভাগির পর মেয়েকে কোলে তুলে এক পাক ঘুরেছিলেন, মীনার বাবা যিনি জনসভায় ঘোষণা দেওয়ার মতো করে মেয়ের গর্বে গলা কাঁপিয়েছিলেন, মীনার তিন ভাইবোন যারা ঘরের তিন কোণ থেকে চোরাচোখে তাকে দেখেছিল, সবাই অবাক চোখে মীনার টানা, লম্বা ঘুম দেখে যেতে লাগল। দিনের পর দিন, মাসের পর মাস।

তারপর একদিন ঘুম তার ভাঙল। সবাই দেখল, মীনার শ্যামলা-রোগা মুখটা আরো রোগা হয়ে গেছে, আর ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে চোখ দুটো ফোলা-ফোলা। ফোলা চোখে মীনা দেয়ালজোড়া ছবির পর ছবি দেখে বলল, এগুলো কী? কে লাগিয়েছে? তার তখন মনে পড়ল, অনেক দিন আগে একজন মন্ত্রীকে খুব কাছ থেকে দেখার তার সুযোগ হয়েছিল, এমনকি ছোঁয়ারও। তিনি তার সঙ্গে চেয়ার ভাগাভাগি করেছিলেন। দেয়ালজোড়া ছবিগুলো তো তারই। কে লাগাল?

মীনার মা বললেন, আমার সোনা-মা আবার স্কুলে যাবে। মীনা ভাবল, স্কুলে কি সে অনেক দিন যায়নি!

তার মা বললেন, সোনা-মা, তুই যে ঘুমিয়েছিলি। অনেক দিন। আমরা তোকে ডাকিনি।

মীনা স্কুলে গেল। ছাতাধরা, নোনার দাগে ভরা কুৎসিত স্কুল ঘর। বন্ধুরা বলল, তোর মন্ত্রীর কী খবর? সুভাষ স্যার ক্লাসে এলেন। ঘিয়া পাঞ্জাবিটা পরেই এলেন, পাঞ্জাবির এখানে ওখানে আনাড়ি হাতের তালি। চক-ডাস্টার ফেলে তিনি চেয়ারে বসতে না বসতে ঝিমোতে লাগলেন। মীনা শুনল, বউ মরে যাওয়ার পর থেকে তাকে ঝিমুনি রোগে পেয়েছে।

স্কুল শেষে বাড়ি ফেরার পথে মীনা দেখল এক জায়গায় জনা পাঁচ-ছয় ছোট ছোট মেয়ে গোল হয়ে হাত ধরাধরি করে ছড়া কাটছে। কথাগুলো চেনা চেনা, আবার অচেনাও। এলাটিং বেলাটিং সই লো/রাজা একটি বালিকা, না-না মন্ত্রী একটি বালিকা চাইল/মীনা মন্ত্রীর কোলে বইল/মন্ত্রী কানে কানে কথা কইল/কী কইল কী কইল...

সেরাতে মীনা নিজের ছোট্ট ঘরে চুপটি করে বসে ঘরভরতি ঠাসাঠাসি ছবিগুলো খুঁটিয়ে দেখল। দেয়ালে, দরজায়, জানলায় এক ইঞ্চি জায়গাও ফাঁকা নেই। ছবি আর ছবি। ছোট-বড় চারকোনা, গোল সব ছবি। এত ছবি কে লাগিয়েছিল? কাঁচি দিয়ে খবরের কাগজ কেটে কেটে? কত দিন, মাস, বছর লেগেছিল ছবিগুলো জোগাড় করতে? এদেয়াল থেকে সেদেয়ালে চোখ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে সে অন্যমনস্ক হয়ে পড়ল। তার তখন ছোট-বড় বিচিত্র সব কৌটার কথা মনে পড়ল, ঝুমঝুম মিষ্টি আওয়াজে ঘুমিয়ে পড়ার কথাও মনে পড়ল।

মীনা আড়মোড় ভেঙে উঠে দাঁড়াল। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে সমস্ত শরীরে তার ব্যথা, ব্যথাটা যেন হাড়মাংস ফুটো করে রক্তে-টক্তেও ঢুকে গেছে। তার কিছু একটা করতে ইচ্ছে জাগল। তবে কী করবে ভেবে উঠতে না পেরে ঠিক করল একটা কিছু লিখবে। কত দিন কাগজ-কলম নিয়ে বসেনি। খাতার পাতা ছিঁড়ে মীনা টেবিলে বসল, খুঁজেপেতে কলম বের করল, তারপর লিখবে বলে কলম বাগিয়ে চাপ দিতে গিয়ে দেখল লেখাটেখা হচ্ছে না, কালি শুকিয়ে গেছে। মীনা বুদ্ধিমতী মেয়ে, হতাশ হলো না। আলপিন দিয়ে কড়ে আঙুলের তুলতুলে ডগায় আলতো খোঁচা দিল। টকটকে এক বিন্দু রক্ত ফুলের কুড়ি হয়ে ফুটে উঠতে ভাবল, লাল কালিতেই লিখবে, লেখাটা জ্বলজ্বলে হবে। আঙুলের ডগায় কলম চেপে রক্তটুকু সে শুষে নিল। কিন্তু এত কম, এ দিয়ে লেখা যায়! সে তখন এআঙুলে ওআঙুলে, তর্জনী, মধ্যমা, অনামিকা (কে রেখেছে নামটা, এত আহ্লাদি!) এবং শেষমেশ বুড়োআঙুলে আলপিন খুঁচিয়ে ফুটো করল। ফোঁটা-ফোঁটা রক্ত এক জায়গায় জড়ো করে কলম চেপে শুষে নিল। রাক্ষুসে কলমটা এতেও ভিজল না। মীনার গোঁ বাড়ল। সে তখন আঙুল-টাঙুল ছেড়ে কব্জির কাছে একটা বড়সড়ো শিরার খোঁজ পেয়ে, একটার বদলে কয়েকটা আলপিন জড়ো করে শিরার মাঝখানে যত্ন করে ফুটো করল। আলপিনগুচ্ছ ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফুটোটাকে বড় করল, চওড়া-চ্যাপ্টা করল। তারপর নিশ্চিন্ত মনে কলম ডুবিয়ে ভাবতে বসল, কী লেখে!

প্রথমে দোনোমনা করে লিখল, মাননীয় মন্ত্রী, পরপরই মাননীয় কেটে প্রিয় করল। মীনা লিখে গেল, প্রিয় মন্ত্রী, আপনি আসেন না কেন? আপনার মনে আছে অনেক দিন আগে আপনি একটা সুরমা রঙের হেলিকপটারে চড়ে আমাদের স্কুলে এসেছিলেন? হেলিকপটারটা ভয়ে ভয়ে আপনাকে নিয়ে নেমেছিল। খুব সুন্দর ছিল ওটা। আর আপনাকে দেখাচ্ছিল আরো সুন্দর। আমরা উই শ্যাল ওভারকাম গেয়েছিলাম। আপনি আমাকে আপনার চেয়ারে বসিয়েছিলেন, মস্ত বড় ছিল ওটা, আমি বসার পরেও একটা বিড়ালবাচ্চা আরাম করে বসতে পারত। আপনি আমার নাম জিজ্ঞেস করেছিলেন, কোন ক্লাস, ক’ভাই- বোন? কত কী যে আপনি বলেছিলেন! আপনি জানতে চেয়েছিলেন, কাকে সবচেয়ে ভালোবাসি? আমি লজ্জা পেয়েছিলাম, কার কথ বলি; মা, বাবা, না বোকা ভাইটা, নাকি সুভাষ স্যার? আসলে তখন তো জানতাম না কাকে সবচেয়ে ভালোবাসি। এখন বলি? সবচেয়ে ভালো আপনাকেই বাসি। এতদূর এসে মীনা খেয়াল করল, কব্জির শিরা থেকে একটা বেগবান, গাঢ় লাল ফোয়ারা ফুটে উঠেছে। তাকিয়ে থেকে লেখার নেশাটা আরো বাড়ল, লেখাটাও হচ্ছে জ্বলজ্বলে।

মীনা লিখে চলল, হ্যাঁ আপনাকেই। আপনার মতো কে আছে, হেলিকপ্টারটা কত সুন্দর! আপনি আসছেন না কেন? সুভাষ স্যারের বেতন বাড়ানো লাগবে না, ওনার তো বউ মরে গেছেন, বউ মরে যেতে এখন ওনার ঝিমুনি রোগ ধরেছে। স্কুলটা তো এমনিতে ভাঙাচোরা, ওটা আর দোতলা করতে হবে না, ফ্যান-ট্যানও বাদ। লিখতে লিখতে খাতার পাতার এপিঠ ওপিঠ ভরিয়ে তুলতে তুলতে মীনা টের পেল কাঁপুনি তুলে জ্বর আসার মতো সারা শরীর জুড়ে ঘুম নামছে। বহু দূর থেকে মেঘ-গুড়গুড়ের মতো একটা জোরালো ঘুম তার ছোট্ট শরীরে ঝাঁপিয়ে পড়ছে। টেবিলের ওপর ঘুমজর্জর মাথাটা ছুড়ে দিতে দিতে মীনা ডাকল, মন্ত্রী।

প্রবল ঘুমের মধ্যে মীনা দেখল, মন্ত্রী দাঁড়িয়ে। খালি গা, বিশাল চওড়া বুক, হাত-পা কী লম্বা, দৈত্যদের মতো, এদিকে চেহারাটা ঝলমলে, হাসিখুশি। মীনা লজ্জা পেল। এতদিন পর এলেন, কোথায় হেলিকপ্টার, কোথায় সুন্দর জামাকাপড়। মন্ত্রীই তো? সুরমা রঙের হেলিকপ্টারে যিনি এসেছিলেন? মীনার সমস্যাটা যেন মন্ত্রী টের পেলেন। প্রকাণ্ড শরীরটা দ্রুত এক পাক ঘুরিয়ে তিনি চরকি কাটলেন। ঝুমঝুম মিষ্টি আওয়াজ উঠতে মীনা ভাবল, তাই তো!

অনেক দিন আসি না মীনা। মন্ত্রী বললেন।

মীনাকে চুপ থকতে দেখে বললেন, ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে রোগা হয়ে গেছ। চোখ দুটোও ফোলা।

মীনা এবারো চুপ। একে লজ্জা, আবার ঝোড়ো ঘুম।

গানটার কী হলো? উই শ্যাল ওভারকাম। ধরো, এক সঙ্গে গাই।

মীনা ধরে কী করে। সে একটা হেলিকপ্টারের মৃদু গরগর আওয়াজ পায়।

ধরো, প্লিজ। দুর্দান্ত গেয়েছিলে!

বলতে না বলতে তিনি নিজেই ধরেন। ঘুম-ভারী মীনার কানে বাজে সুরে ভরা অপূর্ব গলা। প্রথম ক’টা লাইন গুনগুনিয়ে নেড়েচেড়ে তিনি গলাটা ছেড়ে দেন। গানের কথাগুলো ছাড়া পেয়ে লাফাতে লাফাতে ছোটে, উড়ে উড়ে পাক খেয়ে খেয়ে ছোটে। মীনা দেখে একটা প্রকাণ্ড মাঠ। স্কুল মাঠ কি? মাঠে কত যে মানুষ! গানের সঙ্গে মানুষগুলোও তাল ঠোকে, গলা মেলায়। আমরা করব জয়, একদিন।

গানের কথা ও সুর বাতাসে উথালপাথাল দোলে, মাঠভরতি মানুষের ঝাঁকটা দোলে। এ...ক দিন এ...ক দিন। মীনা দেখে, ঘাস-মাটি ছেড়ে মন্ত্রীর পা জোড়া দুলে দুলে শূন্যে উঠছে। গান-ভারী বাতাস কেটে তার দৈত্যের শরীর পালকের মতো ভাসছে। আর ভাসছে এইটুকুন পুতুলের মতো তার হাতে মীনা। গানে গানে ছুটতে ছুটতে মীনা হাঁফ ছাড়ে।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন