সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

ওয়ালিদ প্রত্যয়'এর গল্প : গিফট ফ্রম গড

মৃত্যুর পরে অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই-- কখনো মৃত্যুবরণ না করা প্রেমিকা আমাকে এই কথা বলেছিলো এবং কোনো রকম যৌক্তিক বিচার ছাড়াই আমি তার কথা মেনে নিয়েছিলাম। এখন- এই মধ্যরাতে- কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে আমার ওর কথা মনে পড়ে, কিন্তু আমার কোনো মেলানকোলিক অনুভূতি হয় না, ট্রিগার চাপলেই আমার মগজ টাইলসের ফ্লোরে ছিঁটকে পড়বে এবং আমি আর কখনোই আমার প্রেমিকাকে দেখতে পাবো না- সে যতদিন বেঁচে থাকবে, আমাকে দেখবে- ছবিতে কিংবা কল্পনায়; কিন্তু আমি, অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখতে পাবো না জেনেও কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে বসে আছি এবং আমার ভয় কিংবা দুঃখবোধ কোনোটাই হচ্ছে না। সেদিনও হয় নি- যেদিন আমার ঠাকুমা মারা গেলেন- তিনি সবচেয়ে বেশি ভালোবাসতেন আমাকে আর তার পোষা কুকুরটাকে। ঠাকুমা মারা যাওয়ার পঞ্চাশ মিনিট পর আমি বন্ধুদের সাথে ক্রিকেট খেলতে গিয়েছিলাম, কে আগে ব্যাট করবে এই নিয়ে মারামারি করেছিলাম, সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে ঠাকুমার শেষকৃত্যে অংশ নিয়েছিলাম এবং রাতে ভাত খেয়ে ঘুমুতে গিয়েছিলাম। ঠাকুমার কুকুরটা পাঁচ দিন কিছু খায় নি।

কিছুক্ষণের জন্য পিস্তল নামিয়ে রেখে আমি একটা সিগারেট ধরাই- ধোঁয়া ছেড়ে মনে হয়- আমার মৃত্যুর পর আমার দেহ নিয়ে কী করা হবে, এই বিষয়ে আমার চিন্তিত হওয়া উচিৎ কিনা! আমাকে জন্মদানের সময় আমার কোনো অনুমতি নেওয়া হয় নি, আমি এখন যে শরীরটাকে বহন করে চলছি- জিজ্ঞেস করা হয় নি এই শরীর আমি চাই কিনা! কিন্তু এখন যেহেতু আমি আমার শরীরটাকে তৈরী করে ফেলেছি- এর পরিণতি নির্ধারণ করার অধিকার আমার আছে। একটা কাগজে লিখে রাখা যায়- মৃতদেহটা নিয়ে আমার পরিকল্পনা কী। আমি আসলে এই বিষয়ে কখনো ভাবিনি। জীবন নিয়ে ভাবলেও- মৃত্যু নিয়ে ভাবার সময় পাইনি কখনোই, অধিকাংশ লোক যেমন পায় না। আমার বাবা চাইতেন আমি জীবন নিয়ে ভাবি- আমি ভেবেছি- কিন্তু তার সাথে আমার ভাবনা মেলেনি। আমার কাছে সমস্তকিছুই অর্থহীন লেগেছে। অনেকবছর আগে আমি একটা ট্রেন স্টেশনে দাঁড়িয়ে ছিলাম- ট্রেন দুই ঘন্টা লেট, স্টেশন পায়চারি করা ছাড়া আমার কোনো কাজ ছিলো না। বোনের বিয়ে ছিল তখন, তার হবু স্বামীকে আমি চিনতাম না, নামও জানতাম না। ট্রেনের বিলম্ব দেখে মনে হচ্ছিল- রুমে ফিরে আসি। আমি যদি বোনের বিয়েতে উপস্থিত না থাকি, কার এসে যাবে তাতে? নিশ্চয়ই কিছুই আটকে থাকে না। সেসময়ই আমার মধ্যে একটা অস্তিত্বের সংকট দেখা দেয়। একটা ফর্সা মেয়ে- বয়স কতো হবে?- পঁচিশ?- একটা বেড়াল কোলে নিয়ে আমার মতোই ট্রেনের অপেক্ষায় আছে। তার পরনে সূর্যমুখীর পাপড়ির মতো হলুদ জামা। আমার মনে হলো- এই মেয়েটা এখন এখানে না থাকলে কি হতো? স্টেশনে আমি বাদে- আর কে কে তাকে খেয়াল করছে? তার অস্তিত্ব- ঠিক এই মূহুর্তে কার কার কাছে গুরুত্বপূর্ণ? আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। কেননা এখন তাকে দেখেই আমার সময় কাটছে। একটু পরে- যখন তাকে আর দেখতে পাবো না- হয়তো সারাজীবনেও আর না- তখন সে আমার কাছে অস্তিত্বহীন। তাতে এই সাময়িক অস্তিত্বের আসলে কী দরকার ছিল? মেয়েটা নিশ্চয়ই কারো মেয়ে, কারো বোন, কারো প্রেমিকা। তাদের প্রত্যেকের কাছে মেয়েটার আলাদা আলাদা উপস্থিতি। ইনডিভিউজুয়ালি প্রত্যেকের কাছে তার অস্তিত্ব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একদিন তো তার অস্তিত্ব থাকবে না, যাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ-তাদেরও অস্তিত্ব থাকবে না। তাহলে এই মহা-গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি আসলে কি মহা-গুরুত্বহীন নয়? মেয়েটা যদি তার কোলের বেড়ালটাকে না পুষতো, তাহলে কি বেড়ালটা বাঁচতো না?

কিছুক্ষণের মধ্যে একটা ট্রেন এসে স্টেশনে দাঁড়ালো। আমার না, এটা হলুদ মেয়েটার ট্রেন। তাড়াহুড়ো করে সে ট্রেন ধরতে গেলো-প্রায় দৌড়ে- তার ব্যাগ ফ্লোরে পড়ে গেলো। মেয়েটার এতো তাড়া কিসের? সময়মতো না পৌঁছালে কী হবে আসলে? আমরা কি এই পৃথিবীতে যে যার সময়মতো এসেছি? কখনো কি মনে হয় নি আমার- যদি আরো বিশ বছর আগে জন্মাতাম! কিংবা জন্মাতাম না কখনোই।

হলুদ মেয়েটার ট্রেন ছেড়ে দিয়েছে- আমি একা দাঁড়িয়ে রইলাম এবং কিছুক্ষণ পর সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি আমার বোনের বিয়েতে যাবো না। বাড়িতে ফিরে বাবাকে ফোন করে জানালাম- জীবন নিয়ে আমি ভেবেছি এবং আমার মনে হয়েছে- জীবন অর্থহীন। বাবা আমার কথার চেয়ে বোনের বিয়ে নিয়ে বেশি চিন্তিত বলে মনে হলো। তিনি কেবল আমার ধারণাকে নাকচ করে দিয়ে ফোন কেটে দিয়েছিলেন এবং আরো চিন্তা করার পরামর্শ দিয়েছিলেন। বাবার পরামর্শ অনুযায়ী আমি আরো চিন্তা করেছি এবং আমার ভাবনায় কোনো পরিবর্তন আসে নি।

তারপর অনেক দিন বাদে যখন বাবা যখন অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভরতি, বাবার শরীরে নানান বৈদ্যুতিক যন্ত্রপাতি লাগানো, তিনি কথা বলছিলেন টেনে টেনে, গলার স্বর কাচের গেলাসের মতো ভেঙে গিয়েছিলো- তার কথা শুনলে যেকোনো শ্রোতাই কষ্ট পেয়ে যেতো- তখন তিনি আমার কাছে আমার জীবন ভাবনার ব্যাখ্যা শুনতে চেয়েছিলেন। আমার কাছে জীবন অর্থহীন হলেও, বাবা বলেছিলেন, হাসপাতালের বেডে শুয়ে তার মনে হয়েছে- জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত খুবই মূল্যবান, একে অপচয় করা ঠিক না। খুব ক্লিশে কথাবার্তা, মৃত্যু পথযাত্রী মানুষরা এমন কথা বলে থাকেন বলে আমি তার কথায় পাত্তা দিলাম না। আমি আমার ভাবনাটা বললাম- পাহাড়ের ঢালু তল দিয়ে একটা ভারী গোলাকার পাথরকে ঠেলে উপরে ওঠানোর নামই জীবন। পাথরটা শুরুর দিকে ক্ষুদ্র থাকলেও, সময়ের সাথে সাথে এর ভর বৃদ্ধি পায়, বৃদ্ধি পায় ওজনও। সবাই একে ঠেলেঠুলে পাহাড়ের চূড়ায় নেওয়ার চেষ্টা করে, কিন্তু কখনো পৌঁছুতে পারে না। পাথর ভারী হয়, ঠেলে উপরে ওঠানো মানুষটা হয় দূর্বল- এক সময়ে তার আর শক্তি থাকে না- পাথরটা গড়িয়ে নীচে পড়ে যায় এবং মানুষ তার পাথরের দ্বারাই পিষ্ট হয়। যবনিকা পতন। আমাদের জীবন- ফুটন্ত পানিতে বুদবুদ ওঠার মতো, কয়েক ন্যানো সেকেন্ড সে তার অস্তিত্ব জানান দেয়, ফুলে ওঠে এবং কেউ খেয়াল করার আগেই মিলিয়ে যায়। এই বয়স্ক পৃথিবীতে ষাট বছর আয়ু নিয়ে আসা মানুষের জীবন বুদবুদ ছাড়া কিছুই নয়। বাবা আমার কথা শুনে বলেছিলেন- তুমি শুধু যন্ত্রণার দিকটা বর্ণনা করেছো। মানুষের জীবন কেবল যন্ত্রণার নয়- তুমি তোমার বোনের আনন্দ দেখোনি যখন তার বাগদান করা হচ্ছিলো, কিংবা তার যখন সন্তান জন্মালো- তখনও তুমি তাদের খুশি দেখো নি। সাতদিন শুধু জল খেয়ে কাটিয়ে দেওয়া পথশিশু যখন একটুকরো রুটি পায়- তখন কি তুমি তার আনন্দ দেখো নি?

আমি বললাম, সেই এক টুকরো রুটির আনন্দের জন্য যদি সাতদিন জল খেয়ে কাটাতে হয়- আমি সেই আনন্দকে ঘৃণা করি।

আমরা সবাই ভেবেছিলাম, বাবা মারা যাবেন। কিন্তু বাবা মারা যান নি, শুধু তার পা দু’টো অচল হয়ে গিয়েছিলো। হুইল চেয়ারে বসে থাকতেন, শৌচকর্মের ব্যবস্থা চেয়ারের নীচেই। দীর্ঘদিন এভাবে কাটানোর পরে তিনি ফোন করে আমাকে বলেছিলেন- “জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত সুন্দর?”

কেউ একজন আমার দরজায় কড়া নাড়ছে। এখন মধ্যরাত, অনাকাঙ্ক্ষিত কোনো ভিজিটর আশা করছি না। পিস্তলটা টেবিলে নামিয়ে রেখে দরজা খুলে দেখি- ঠিক আমার উপরের তলায় আমার সমবয়সী একজন থাকেন, যার নাম আমি মনে করতে পারছি না, যদিও তিনি আমাকে বন্ধু বলে দাবি করেন এবং প্রায়ই আমাকে মদ খেতে দেন- তিনি দাঁড়িয়ে আছেন। পরনে শুধু হাফ প্যান্ট। লোমশ বুক এবং বগল ভরতি লোম নিয়ে তিনি জিজ্ঞাসু চোখে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। দরজা খোলার পর আমি ছাড়া কেউ যেনো শুনতে না পায় এমন ফিসফিস করে তিনি বললেন, আপনার কাছে কনডম আছে?

আমি না সূচক মাথা নাড়লাম। তিনি হতাশ হয়ে বললেন, কী জ্বালা! বান্ধবী বিছানায় রেডি হয়ে আছে, শেষ মুহূর্তে গিয়ে দেখি কনডম আনতে ভুলে গেছি। ওর এখন সিজন চলছে, রিস্ক নিতে চাচ্ছি না। কী করি বলুন তো!

আমি তাকে কোনো সল্যুশন দিতে পারলাম না। ভদ্রতা করে এক কাপ কফির আমন্ত্রণ জানালাম এবং তিনি সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলেন। রুমে এসে বললেন, মেয়েটা অপেক্ষা করছে, একটু দ্রুত কফি বানান। চিনির পরিমাণ তো জানেনই। আরেহ্‌, টেবিলে রিভালবার কেনো?

আমি কফি বানাতে বানাতে তাকে আমার সিদ্ধান্তের কথা জানালাম। তিনি আঁতকে উঠে বললেন, সর্বনাশ। আপনি এভাবে সুইসাইড করলে তো বিল্ডিঙয়ের লোকজন বিপদে পড়বে। পুলিশ টুলিশ এসে একাকার অবস্থা হবে- সবাইকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে, গোয়েন্দা আসবে, কী একটা বাজে অবস্থা হবে বুঝতে পারছেন? এই কাজ করবেন না।

আমি তাকে এইসব ব্যাপারে চিন্তা করতে নিষেধ করলাম। তিনি কফির মগ হাতে নিয়ে বললেন, মরে গিয়ে লাভ নেই আসলে। আমি শিওর মরে যাওয়ার পর আপনি ওখানে কোনো সুস্বাদু খাবার পাবেন না, বিছানায় সুশ্রী নারী পাবেন না। লাইফ ইজ এ গিফট ফ্রম গড।

কাপে চুমুক দিয়ে তিনি বলে চললেন, আজকে পত্রিকায় দেখলাম- বোবা একটা মহিলাকে তিনজন রেইপ করেছে। ভিক্ষুক মহিলা, বস্তিতে থাকতো। না মারা যায় নি- এখনো বেঁচে আছে। চিন্তা করুন- এতো কষ্টের পরেও তিনি বেঁচে আছেন।

আমি বললাম, ইজ হার লাইফ অলসো এ গিফট ফ্রম গড?

তিনি কিছু বললেন না। নীরবে কফি শেষ করলেন এবং আমাকে বোঝালেন- জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার মানে হেরে যাওয়া। এবং তিনি এও জানালেন, তিনি আমাকে খুব পছন্দ করেন,আমার অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু তাকে কষ্ট দেবে। তিনি জানতে চাইলেন, আমার প্রেমিকার সাথে আমার ছাড়াছাড়ি হয়েছে কিনা! কিংবা আমি চাকরি হারিয়েছি কিনা! আমি তাকে বললাম, সব ঠিক আছে। প্রেমিকাও আছে, চাকরিও। তিনি আমার কথা শুনে খানিকটা স্বস্তি পেলেন বলে মনে হলো। তিনি আমার কাছ থেকে বিদায় নেওয়ার সময় বললেন, যেহেতু ঠিক আমার ঘরের উপরেই তার ঘর- তাদের সঙ্গমের শব্দে আমার কোনো অসুবিধা হয় কিনা! আমি মুচকি হেসে তাকে বিদায় জানালাম।

এখন আমাকে চিন্তা করতে হবে- আমার মৃত্যুর পর আমার লাশের কী হবে? আমি কী চাই আমার মৃতদেহ আমার পরিবারের কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হোক? নাকি এই ঘরেই বন্দি থাকুক? দরজায় একটা নোটিশ টাঙিয়ে রাখবো- আমি এখন শান্তিতে আছি, প্লিজ বিরক্ত করবেন না। আমার এই নোটিশ অনুসারে হয়তো কিছুদিন কেউ এই দরজায় নক করবে না। কিন্তু আমার লাশের যখন গন্ধ ছড়াবে তখন? আমি কি চাই আমার লাশ মাটিতে দাফন করা হোক, নাকি আগুনে পুড়িয়ে ফেলা হোক? আগুনে পোড়ার সময় সাউন্ডবক্সে বাজবে ডেভি জোন্সের পিয়ানোর সুর। যারা আমার শেষকৃত্যে আসবে- তারা সুরের তালে মৃদুভাবে নিজেদের শরীর দোলাবে, সবাইকে দেওয়া হবে রেড ওয়াইন। পোড়ার শেষ ছাই গুলো সমুদ্রে ফেলে দেওয়া হবে। সমুদ্র আমার প্রিয়। সমুদ্রে স্নান করতে গিয়ে আমি পেচ্ছাব করেছিলাম – আমার এখনো মনে পড়ে- সমুদ্রে পেচ্ছাব করার জন্য যে অপরাধবোধ আমার মধ্যে জন্ম নেয়- সেটা দীর্ঘদিন স্থায়ী হয়েছিলো। আমার ছাই সমুদ্রে মিশিয়ে দিয়ে একটা সামান্য প্রায়শ্চিত্ত কি হবে?

আমার রুমে একটাই জানালা- জানালা দিয়ে শহরের মূল রাস্তা দেখা যায়। দেখা যায় ল্যাম্পপোস্ট, কংক্রিটের বুক ফেঁড়ে ওঠা ছায়াদাত্রী গাছ, ঘোড়ার গাড়ি, বৃদ্ধ-বৃদ্ধার মর্নিং ওয়াক, পাখির টুইটিং, এম্বুলেন্সের শব্দ, ঠোঁটে সিগারেটসমেত বিধবা, অভিসারে ব্যর্থ হওয়া কবি, স্যুট পরা কর্পোরেট জব হোল্ডার, সূর্যের প্রতিদিন একঘেয়ে ওঠা নামা। আমার মতো মানুষের জন্য রাস্তার পাশে জানালা ছাড়া আর কিছুই নেই। এই জানালা দিয়েই এখন- এই মধ্যরাতে- রাস্তায় এক মাতালের মাতলামি করার শব্দ আমার ঘরে প্রবেশ করছে। আমি জানালা দিয়ে তাকে দেখার চেষ্টা করি। উন্মাদের মতো সে প্রলাপ বকছে। আমি মনোযোগ দিয়ে তার কথা শুনি- কেননা আমি জানি- পৃথিবীর সমস্ত সত্য কথাই প্রলাপের মতো লাগে। আমার বিল্ডিঙয়ের নীচ তলা থেকে একজন বের হয়ে মাতালটাকে ধমক দিচ্ছে- বলছে, এখান থেকে চলে না গেলে সে পুলিশ ডাকবে। পুলিশ লাথি মেরে তাকে জেলে পুরবে। মাতাল হেসে বলল, আমার পেটে প্রতিদিন লাথি মারে ঈশ্বর।

মাতালের মুখে এমন উচ্চমার্গিয় কথা বেমানান। হয়তো তিনি শিক্ষিত কেউ। তাতে আমার কিছু যায় আসে না।

আমি আমার টেবিলে ফিরে আসি এবং আমার লাশ নিয়ে কী করা হবে তার কোনো সমাধান খুঁজে পাই না। এই অযৌক্তিক পৃথিবীতে আমার মৃত্যুর পর- শুনেছি মৃত্যুর পর কোনো চেতনা থাকবে না- তাহলে আমার লাশ নিয়ে যা খুশি করা হোক- তাতে আমার চিন্তিত হওয়াটাও অযৌক্তিক বলে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম।

কপালে গুলি চালালে আমার চেহারা নিশ্চয়ই ভয়ংকর দেখাবে। মাথার উপর দিয়ে ট্রাক চলে যাওয়া একটা মৃতদেহকে আমি রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখেছিলাম। আমার মনে পড়ে- সেই দৃশ্য দেখার পর আমার প্রচণ্ড বমি হয়েছিলো। আমার ক্ষেত্রেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তির সম্ভাবনা প্রবল। আমার প্রেমিকাকে আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম- যদি আমি এখন যেমন দেখতে, তেমন দেখতে না হতাম- যদি আমার দাঁত ঠোঁট থেকে বের হয়ে থাকতো, সারাদিন লালা ঝরতো, কিংবা আমার চেহারা যদি এসিডে ঝলসে যাওয়ার মতো হতো, বা দূর্ঘটনার মুখ বিকৃতি হতে যেতো, মুখের উপর থাকতো শত সেলাইয়ের দাগ, মাথায় খাবলা খাবলা চুল ওঠা- তবুও সে আমাকে ভালোবাসতো কিনা!

আমার প্রেমিকা জবাব দিয়েছিলো- “প্রেমে পড়ার আগে যদি তোমার এমন দশা থাকতো- তাহলে হয়তো তুমি আমার নজরে আসতে না, কিংবা তোমাকে দেখেও আমি আমার মুখ ফিরিয়ে নিতাম। কিন্তু প্রেমে পড়ার পর যদি দূর্ঘটনায় বা অন্য কোনো কারণে তোমার এমন হয়- তবুও আমি তোমাকে ছেড়ে যাবো না, ভালোবেসে যাবো।”

মৃত্যুর পরে অন্ধকার ছাড়া কিছুই নেই- প্রেমিকার এই কথাটার মতো তার উত্তরও আমি বিশ্বাস করেছিলাম, এখনো করি।

এতোকিছুর পরেও আমার গোলাকার পাথরটা পাহাড়ের ঢালু তল বেয়ে উপরে তোলার ইচ্ছে নেই। আমার শক্তি ক্ষয় হওয়ার আগেই পাথরটা নিজ থেকে ছেড়ে দিতে চাই। ঘড়িতে এখন রাত দেড়টা, ক্যালেন্ডারে ২৯ অগাস্ট।

একটা গেম খেলা যায়- টসের গেম। কপালে পিস্তল ঠেকিয়ে টস করবো- হেড উঠলে ট্রিগার চাপা হবে, টেইল উঠলে না। ঠোঁটে সিগারেট , কপালে ঠেকানো পিস্তল আর আঙুলের মাথায় কয়েন। বাতাসে ছুঁড়ে দেওয়ার পর অসংখ্য স্পিন শেষ করে কয়েনটা আমার মুঠোর মধ্যে এলো। আমি এখনো টসের ফলাফল জানি না। সিগারেট শেষ করে মুঠো খুলবো- তার মানে এখনো আমার হাতে পাঁচ মিনিট সময় আছে।

চোখ বন্ধ করে চেয়ারে হেলান দিতেই আমি উপর তলা থেকে সঙ্গমের শব্দ শুনতে পেলাম। কংক্রিট ভেদ করে শব্দ আসার কথা না, তবুও আসছে। নাকি আমার মাথার ভেতর বাজছে কেবল। সঙ্গমের শব্দটা শোনার সাথে সাথে আমার মনে পড়ে গেলো- আমি আমার বাবার মেজো ভাইকে এক দুপুরে আমার মায়ের ঘরে ঢুকতে দেখেছিলাম। তখন আমি ক্লাস থ্রিতে পড়ি।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন