সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

রমডয়টার: সুহান রিজওয়ান



(১)
 
ওয়াসি আহমেদকে নিয়ে লিখতে গেলে একটু থমকাতে হয়। কী বলবো তার প্রসঙ্গে, চট করে তা গুছাতে পারি না।

কিন্তু কেন? সেই ওয়াসি আহমেদ, আজিজ মার্কেটে অধুনালুপ্ত শুদ্ধস্বর প্রকাশনীর অফিস ঘরে যার লেখার ব্যাপারে প্রথম শুনি প্রায় এক দশক আগে; সেই ওয়াসি আহমেদ, ডলফিন গলি নিয়ে যার ছোটোগল্প এবং নানকারদের নিয়ে যার 
উপন্যাস পড়ে বেশ লেগেছিলো; সেই ওয়াসি আহমেদ, এই বছর দুয়েক আগেও দৈনিকের সাহিত্যপাতায় যার টুকরো সব আলাপ রীতিমতো উপভোগ করেছি ছুটির দিন সকালে; পাঠক হিসেবে তাকে নিয়ে নিরেট কিছু বলতে গিয়ে তবু আমায় আটকাতে হবে কেন?

ভেবে মনে হয়, কারণটা হলো ওয়াসি আহমেদের লেখার বহুমাত্রিকতা। কথাসাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে পদচারণা করেও যে লেখকেরা মূলতঃ একমাত্রিক, তাদের উচ্চতা আমরা সহজেই চিহ্নিত করতে পারি। অথচ ওয়াসির লেখার ধরনটা এমন, যে নির্দিষ্ট করে ঔপন্যাসিক, কিংবা গল্পকার, অথবা মুক্ত গদ্যকারের মতো তকমা আঁটানো যায় না তার গায়ে; বিশেষায়িত পরিচয়ের বদলে তাকে নিয়ে বলতে হয় সামগ্রিক ভাবেই। আর লেখক হিসেবে এই অর্জন চূড়ান্ত সফলতার পরিচয় বহন করলেও পাঠকের জন্য তখন উদ্দিষ্টকে নিয়ে বলাটা হয়ে পড়ে কঠিন।

চেষ্টা থাকবে এই আলাপে তাই, ওয়াসি আহমেদের পরিচয় বুঝে নিতে গিয়ে, বুড়ি ছোঁয়ার মতো করে তার রচনা জগতকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে আসার।

(২)
 
প্রথমেই কথা হোক ওয়াসি আহমেদের গল্প প্রসঙ্গে।

ভালো-মন্দ, বা অমন কোনো সাধারণ বিশেষণের বাক্সে যখন আঁটানোর প্রয়োজন পড়ে, ওয়াসির গল্পেরা রীতিমতো পরিষ্কার অফসাইডের মতো দূরত্ব নিয়েই অবস্থান করে বিভাজনরেখার ইতিবাচক দিকটায়। চশমা পরা দাদারা যেমন গল্প-হয়েছে-কি-হয়-নাই জাতীয় তর্কে মেতে ওঠেন সময়ে সময়ে, তেমন কোনো মতবিরোধের সুযোগ ওয়াসি দ্যান না, কারণ তার গল্পেরা কুস্তিগিরের মাদক নিয়ে ফাঁপানো পেশি নয়, সেগুলো মূলত-নিত্যবৃত্ত-বর্তমানে-বলে-যাওয়া নিরেট গল্পই।

ওয়াসির ‘নির্বাচিত গল্প’ নামের সংকলনকে উদাহরণ হিসেবে নিলে লক্ষ করা যাবে, চমৎকার সব গল্প আছে সেখানে। সেখানে জায়গা পেয়েছে ঠ্যাঙাড়ের কাছে আমাদের অঙ্গ হারিয়ে ফেলার সেই গল্প (ডলফিন গলির কুকুরবাহিনী), জায়গা পেয়েছে সকল কিছু বিসর্জন দিয়ে ‘এস্টাবলিশমেন্টের সামনে নিজেদের কমিটমেন্টে ফাঁক না রাখার’ সেই দারুণ গল্পটা (বীজমন্ত্র), নতুন দুনিয়ার স্বপ্নে বিভোর সেই অভিবাসন প্রত্যাশী কেরানির গল্পও (তীরভূমি) আছে সংকলনটায়। ‘কালাশনিকভের গোলাপ’ নামের অতিপরিচিত গল্পটা যেমন আছে, তেমনই আছে কর্কট রোগাক্রান্ত আখতারুজ্জামান ইলিয়াসকে নিয়ে লেখা ‘পা’ গল্পটাও। এদের বাইরে ‘অপুর ধর্মটিচার’, ‘শীত পিপাসার দেও-দানব’ আর ‘গ্যালারি’ গল্পগুলোকেও উল্লেখযোগ্যের তালিকায় আমি ঢুকিয়ে দিতে চাই ব্যক্তিগত পছন্দের জোরে।

হ্যাঁ, সব গল্পকেই হয়তো সমানভাবে পছন্দ করা যায় না সংকলনটায়, কিন্তু নির্বাচিত গল্পকে যদি লেখকের সেরা সৃষ্টির বিজ্ঞাপণ বলে গ্রহণ করা যায়, তখন ওখানে নির্দ্বিধায় লক্ষ করা যাবে সৎ লেখকের প্রধানতম বৈশিষ্ট্য, রদ্দি গল্পের অনুপস্থিতি।

আর তার বাইরে উল্লেখ করতে হয় ওয়াসির বিচিত্র একটা রসবোধকে, ‘ডলফিন গলির কুকুরবাহিনী’ গল্পটা ছাড়াও যার উৎকৃষ্ট সাক্ষর বহন করে ‘চক্রবৃদ্ধি’, ‘স্মৃতিস্তম্ভ কিংবা এলেমানের লেজ’ নামের গল্পগুলো। সমাজ আর রাজনীতির প্যাঁচঘোচে সৃষ্ট নানাবিধ ঘোরালো সমস্যাকে ওয়াসি এসব গল্পে বারবার উপস্থাপন করেন প্রতীক দিয়ে, কালো কৌতুকের মাধ্যমে।

কিন্তু সমাজের প্রতি ওই টানটান দৃষ্টির ফলে যেটা হয়, ওয়াসির গল্পেরা মোটাদাগে খানিক দূরে সরে থাকে একাকী মানুষের চাইতে। মানুষের ভেতরে যা চলছে, মনের সেই সর্পিল অনুসন্ধানের দিকে পাঠক যেতে পারে না, সে বরং ঘুরপাক খায় চারপাশের অপ্রাপ্তি আর অসাম্যের মাঝে পড়ে আমাদের দীর্ঘ হওয়া শ্বাসের চক্করে। ব্যাপারটা বিশেষ করে স্পষ্ট হয় ‘শীত পিপাসার দেও-দানব’, ‘খাঁচা ও অচিন পাখি’, ‘লোকমান হাকিমের স্বপ্নদর্শন’ গল্পগুলোর দিকে মন দিলে; ব্যক্তির সংকটের হতে হতেও এরা শেষতক হয়ে গেছে সমষ্টির স্বপ্নভঙ্গের গল্প।

তবে এটাকে ওয়াসির দুর্বলতা নয়, পক্ষপাত বলাই ভালো। কারণ যখন তিনি ইচ্ছা করেন ব্যক্তিকে নিয়ে বলতে, প্রতীকী হোক (বনসাইয়ের স্বপ্ন), আর সরাসরি হোক (দীপার দুপুর); তখনও কিন্তু তার গল্পটা অক্ষুন্নই থাকে। নির্বাচিত গল্প সংকলনে এই ঘরানার গল্পের মাঝে আমার সবচেয়ে পছন্দ ‘সুন্দিকাঠের আলমারি’, মায়ের স্মৃতি বহন করা আলমারির কথা বাবার মুখে কী করে প্রজন্মান্তরে ছড়িয়ে পড়ে, তা থেকে পাঠক অনুধাবন করে সহজেই, একদিন সবকিছু গল্প হয়ে যায়।

(৩)
 
দুনিয়াজোড়া অকল্পসাহিত্য (Non-fiction) ঘরানার লেখার মাঝে সবচাইতে জনপ্রিয় ধারাটি বোধহয় মুক্তগদ্য। অকল্পসাহিত্যের কথা এ কারণেই টানা, কারণ আমার মনে হয়, সেই লেখকই আমাদের কাছের এবং প্রিয় হয়ে ওঠেন, সাহিত্যকর্ম ছাড়াও যার অকল্পসাহিত্য পড়তে আমাদের ভালো লাগে। ব্যক্তিগত এই উপপাদ্যের একটি মোক্ষম উদাহরণ আমার কাছে ওয়াসির লেখা, তার মুক্তগদ্যের আমি দারুণ ভক্ত।

বাংলাদেশের মননশীল পাঠকেরা নিশ্চয়ই জানেন, ওয়াসি আহমেদের মুক্তগদ্য সংকলন ‘টিকিটাকা’, যা মূলতঃ একটি জাতীয় দৈনিকের শিল্প ও সাহিত্য সাময়িকীতে প্রকাশিত হওয়া টুকরো কিছু লেখার মলাটবদ্ধ রুপ, ইতোমধ্যেই সমাদৃত হয়েছে পাঠকের কাছে। সৈয়দ মনজুরুল ইসলামের ‘অলস দিনের হাওয়া’ নামের কলাম সংগ্রহটাকে বাদ দিলে বাংলাদেশি কোনো লেখকের এমন সংকলনের কথা আমার চট করে মনে আসে না।

লিখতে বসে মনে পড়ছে, ‘টিকিটাকা’ সংকলনের প্রথম লেখা ‘পুরোনো বইয়ের ডেরায়’ প্রকাশিত হয়েছিলো যেদিন, সেদিনই ওয়াসি আহমেদের সাথে সশরীরে সাক্ষাৎ ঘটে গেছিলো ঢাকার এক বইবিপণিতে। জানিয়েছিলাম তখন, আগাথা ক্রিস্টির রহস্যোপন্যাসের প্রতি তার মতোই আমারও মুগ্ধতা আছে, সে কারণেই তার সদ্য প্রকাশিত লেখাটা (যাতে উপস্থিত ছিলো ক্রিস্টি প্রসঙ্গ) বেশ উপভোগ করেছি।

অথচ পরের কয়েক মাসে পত্রিকার পাতায় ওই বিশেষ পাতাটা অনুসরণ করে টের পাই, লেখকের পাঠ্যভাসের সাথে পাঠকের পছন্দের সমাপতন না ঘটলেও ওয়াসির ভাগ্যে প্রশংসা কম পড়তো না। পত্রিকার কলামের শব্দ সীমাবদ্ধতার গরম চোখের সামনে মিইয়ে গিয়েও বিশ্ব সাহিত্যের নানা দিকে তার প্রগাঢ় আগ্রহ ও প্রজ্ঞা স্পষ্ট করেছেন ওয়াসি, আর পাঠক রীতিমতো উপভোগ করেছে সেই টুকরো লেখাগুলো। বৈচিত্র্যময় বিভিন্ন বিষয়ে লেখা ওই আলাপগুলো কেন্দ্র করে যে বন্ধুদের সাথে আড্ডায় নানা নতুন প্রসঙ্গের উদ্রেক ঘটাইনি, সে দিব্যিও দেয়া যায় না।

আরো পরে, বই হিসেবে পড়তে গিয়ে লক্ষ করি, ‘টিকিটাকা’ সংকলনের অন্তর্গত রচনাগুলোকে আসলে কয়েকটা শ্রেণিতে ফেলে দেওয়া যায়।

একটা শ্রেণিতে আছে লেখা সংক্রান্ত আলাপ। লেখার বাইরেও লেখার জগতের অন্য যে অনুষঙ্গগুলো আছে; সেদিকে নিজের আগ্রহের কথা ওয়াসি জানান দিয়েছেন ‘লেখালেখির ইশকুল’, ‘ভূতলেখকদের রাজ্যপাট’, ‘সাহিত্য পুরস্কার’ শিরোনামের রচনাগুলোয়। ‘অমরতার পূর্বাভাস’, কিংবা ‘মরিবার হলো তার সাধ’ রচনাগুলোকেও মোটাদাগে এই ঘরানার বলে আখ্যা দেয়া চলে। এ জাতীয় রচনাগুলো পড়তে গিয়ে কেবলই মনে পড়েছে আলবার্তো ম্যাঙ্গুয়েলের ‘এ রিডার অন রিডিং’ নামের সংকলনটাকে।

‘টিকিটাকা’ বইয়ের আরেক শ্রেণিতে ছিলো কোনো বই, কিংবা লেখকদের নিয়ে দারুণ সব আলোচনা। শৈশবে ‘ধানশালিকের দেশ’ পত্রিকায় যার ফটোজ্যান্তপ্রপঞ্চের গল্প সদাশিবের সাঙ্গপাঙ্গ পড়ে মুগ্ধ হয়েছিলাম, সেই প্রায় বিস্মৃত লেখক বিপ্লব দাশকে নিয়ে লেখাটা ভারি চমৎকার। রবীন্দ্রনাথের গল্পের হারিয়ে যাওয়া চরিত্রদের নিয়ে লেখাটা আকারে ছোট হলেও বহু কিছু বলে যায় অনায়াসে। অতি প্রিয় বই, মঈনুস সুলতানের ‘কাবুলের ক্যারাভান সরাই’ নিয়ে আলাপটা পড়ে আবারও খুঁজে পাই ওয়াসির সাথে নিজের ভালোলাগার সাদৃশ্য, বুক তখন খানিক চওড়া হয় অকারণেই। ঘুরে ঘুরে আসে ইলিয়াস প্রসঙ্গ। ক্যাপস্টান টোবাকো অনুগ্রাহী ওই লোকটির কৌতুকী স্বভাবের উল্লেখের সাথে জানা যায় তার ওজন দরে পুঁথি কেনার কথা, পাঠক অবহিত হয় ‘খোয়াবনামা’ উপন্যাস রচনার কালে ইলিয়াসের প্রস্তুতির টুকরো বয়ান।

দেশি লেখক নয় কেবল, ওয়াসি ছাড়েননি ভিনদেশি ভিনভাষী লেখকদেরও। আইওয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল রাইটিং প্রোগ্রামে আমন্ত্রিত হবার সুবাদে নানা ভাষার লেখকদের সাথে সরাসরি আলাপের স্মৃতিচারণ নিয়ে বেশ কিছু পর্ব ছিলো, সংকলনের জেল্লা যারা বাড়িয়েছে। এছাড়া জন মারে বা মিলোরাড প্যাভিচের বইয়ের আলোচনা টেনে নিজের বিস্তৃত পাঠ পরিসরের প্রমাণটাও টেনেছেন তিনি।

এটা ঠিক, যে পত্রিকার কলামের সীমিত পরিসরের কারণে ‘টিকিটাকা’ সংকলনের অনেক লেখাতেই আলোচনা জমে ওঠার সময়েই ওয়াসি ভেগেছেন, তবে তার আগে তিনি নিশ্চিতভাবে উস্কে দিয়ে গেছেন পাঠকের আগ্রহ। কিন্তু আজকের এই অনলাইন ভারাক্রান্ত যুগে ওই উস্কানি দেওয়ার বাইরে কলাম লেখকের কিছু করার থাকে বলে মনে হয় না। মিলোরাড প্যাভিচের উপন্যাস ‘দা ডিকশনারি অব খাজার্স’ যে এ মুহুর্তে জায়গা পাচ্ছে আমার শয্যাপাশে, ওয়াসি আহমেদ উস্কে না দিলে কি সেটা হয়ে উঠতো সহসা?

(৪)
 
দেশভাগ পূর্ব সময়ে সিলেট এলাকার রুটির গোলাম নানকারদের বিদ্রোহের সমান্তরালে আধুনিক কর্পোরেট জমানার দাস জীবনের গল্প ফেঁদেছিলেন ওয়াসি আহমেদ তার ‘তলকুঠুরির গান’ উপন্যাসে, মাথায় সেটা এখনো অল্পবিস্তর হাওয়া খেলায়। আর অতি সম্প্রতি প্রকাশিত এবং পঠিত ‘বরফকল’ উপন্যাস তো বিষয়বস্তুর কারণেই আরো সংবেদনশীল হয়ে করোটিকে বিব্রত করে। এমন পরিস্থিতিতে, ওয়াসি আহমেদের উপন্যাসের জগত নিয়ে দুয়েকটা কথা বলার সাহস মনে হয় করাই যায়। স্বীকার করি, টাটকা থাকার সুবিধা নিয়ে আলাপের টেবিলে অধিকাংশটা জুড়ে থাকবে ‘বরফকল’ উপন্যাসটাই।

‘তলকুঠুরির গান’ উপন্যাসের মতো ‘বরফকল’ও হেঁটেছে বাংলাদেশের ইতিহাসের অপেক্ষাকৃত অনালোচিত একটি অধ্যায়কে কেন্দ্র করে, বীরাঙ্গনা।

পৃথিবীর যে কোনো যুদ্ধে বড় ক্ষতিটা স্বীকার করতে হয় নারীদেরই। সন্তান বা স্বজন হারানোর বেদনা তারা পুরুষদের চেয়ে কম বহন করে না। কিন্তু তার বাইরে, যুদ্ধে নারীদের ব্যবহৃত হতে হয় বন্দুক বা গ্রেনেডের মতোই। মানব সভ্যতার ইতিহাসে প্রতিটি যুদ্ধেই তাই নারীর প্রতি সহিংসতা প্রদর্শন করেছে বিরোধী পক্ষের সৈনিকেরা, আমাদের ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধেও ক্ষতবিক্ষত হতে হয়েছে তিন লাখ নারীকে। কিন্তু বাংলাদেশে, যেখানে পুরুষতান্ত্রিকতার রক্তচক্ষু দাঁড়িয়ে আছে ছোরা হাতে আর রাজনীতিকরা রিং মাস্টারের মতো তৎপর চাবুক হাতে ইতিহাসকে পোষ মানাতে, বীরাঙ্গনাদের সেখানে পরিণতি ক্যামন হয়? ওয়াসি আহমেদ সেই উত্তর খুঁজেছেন ‘বরফকল’ উপন্যাসে।

উপন্যাসটা আমাদের বলে বীরাঙ্গনা শেফালি বেগমের গল্প, মুক্তিযুদ্ধ যাকে বিক্ষত করেছে এবং সমাজ দিয়েছে অস্পৃশ্যের তকমা; আমরা শুনি শেফালির মেয়ে চম্পার কথা, পাকিস্তানি সৈন্যের জারজ সন্তান বলে পরিচয় গোপন করে শৈশব থেকেই যাকে ছুটতে হয়েছে এই ঠিকানা থেকে ওই ঠিকানায়; আমাদের জানা হয় চম্পার মেয়ে জবার কাহিনিও, যে কিশোরী দেখতে পাচ্ছে যে জন্ম ইতিহাসের চিহ্ন লুকাতে তার গার্মেন্টস-কর্মী মা মুক্তিযুদ্ধের কয়েক দশক পরেও পালিয়ে বেড়াচ্ছে বস্তি থেকে বস্তিতে। তিন প্রজন্মের এই নারীদের সাথে থাকেন বীরাঙ্গনাদের পুনর্বাসনের সাথে জড়িত একজন স্নেহময়ী; থাকেন জাফর সাদেক নামে এক তথ্যচিত্র নির্মাতা, যিনি নিজেও বোঝেননি পুরুষশাসিত এই সমাজে বীরাঙ্গনা শেফালিকে পাদপ্রদীপের আলোয় নিয়ে আসাটা কীভাবে এলোমেলো করে দেবে মেয়েটির জীবন। ভিন্ন ভিন্ন ব্যক্তির বয়ানে উপন্যাস ‘বরফকল’ এগিয়ে যায় এই মানুষগুলোকে নিয়েই।

স্বাভাবিকভাবেই, উপন্যাস ‘বরফকল’ পড়তে গিয়ে মনে পড়ছিলো একই বিষয়বস্তুকে কেন্দ্র করে লেখা শাহীন আখতারের ‘তালাশ’ উপন্যাসের কথাও। বীরাঙ্গনাদের প্রতি আমাদের ক্ষমার অযোগ্য উন্নাসিকতাকে ক্রমাগত থাপ্পড় মেরে শাহীন শুনিয়েছিলেন একজন বীরাঙ্গনার গল্প। অথচ ওয়াসির ক্ষেত্রে লক্ষ করি, বীরাঙ্গনা শেফালি বেগম নয় শুধু, তিনি যেন ধরতে চেয়েছেন শেফালির পরবর্তী প্রজন্মের দুর্ভোগ। আমরা তাই দেখি, কীভাবে মায়ের মতোই পলায়নপর হয়ে কাটছে চম্পার জীবন; বিদেশিদের কাছে দত্তক হিসেবে আশ্রিত তারই মতো যে যুদ্ধশিশুটি আজ ফটাফট করে ইংরেজি বুলির তোড়ে প্রগলভ গণমাধ্যমের সামনে, চম্পা তার মতো হতে পারছে না কিছুতেই।

তবে এই যে চম্পার ঠিকানা বদল করে পালিয়ে বেড়ানো কিংবা স্বামী পরিত্যাক্ত হবার বেদনাটা, রক্তের ভেতরে সেটা যেন ঠিক অনুভব করা যায় না ওয়াসির বর্ণনার নিস্পৃহতায়। গল্পটা চম্পার ঠিকই, কিন্তু উপন্যাসের বর্তমানে কোথাও সশরীরে উপস্থিত না থাকা ওই শেফালিই যেন ছায়া হয়ে থাকে সর্বত্র, পাঠকের সহানুভূতির সবটাই মূলত সে-ই কাড়ে। Show, Don’t tell নীতির বাত্যায় ঘটিয়ে ওয়াসি প্রচুর tell করে যান, আর পাঠক চম্পার গল্পটা শুনতে শুনতে অনুভব করে, অতীত ছাপিয়ে গেছে এই মেয়েটির বর্তমানকে। এই পর্যবেক্ষণ অবশ্য সত্য এমনকি ‘তলকুঠুরির গান’ এর ক্ষেত্রেও, সেখানেও নানকার পিতা শুকুর চানের অতীতটার সাথে উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র শরীফের টানাপোড়েনটা ভেতরে কুরে কুরে খায় পাঠককে।

(৫)
 
গল্পের আলাপ হলো, মুক্তগদ্য নিয়েও কথা হলো, উপন্যাসও বাদ গেলো না; এখনো তবু যেন নিরেট কিছু খুঁজে পেলাম না ওয়াসি আহমেদকে নিয়ে বলার। কীভাবে যে লেখক হিসেবে সংজ্ঞায়িত করবো তার সীমানা, সেই অক্ষমতায় প্রথমে তাই খানিক নুয়ে পড়ি নিজের কাছেই। তবে, আরো খানিক ভাবার পরে উদ্ধার পাওয়া যায় ওয়াসির নিজের লেখা হতেই। ‘টিকিটাকা’ সংকলনের নামকরণেই তো ফুটবল ভক্ত হিসেবে নিজের পরিচয় স্পষ্ট করেছেন ওয়াসি, অন্যায় হবে না তাই, যদি ওয়াসির লেখা প্রসঙ্গে উপমা টানতে আমি যাই ওই ফুটবলের কাছেই, যদি তাকে সংজ্ঞায়িত করি ‘রমডয়টার’ বলে।

জার্মান শব্দ ‘রমডয়টার’ এর বাংলা পরিভাষা করা যায় ‘শূন্য (ফাঁকা জায়গা) সন্ধানী’। শব্দটা প্রথম ব্যবহার করেন থমাস মুলার, জার্মানি আর বায়ার্ন মিউনিখের ২৫ নাম্বার জার্সি গায়ে যিনি এখনো ফুটবল মাঠ মাতাচ্ছেন। আধুনিক ফুটবলে এই ‘রমডয়টার’ শব্দটা কোনো পজিশনকে বোঝায় না, বরং বোঝায় একটা দায়িত্বকে, অ্যাটাকিং থার্ডের যে কোন খেলোয়াড়ের ওপর যা অর্পিত হতে পারে। ‘রমডয়টার’ এর মূল কাজ, দূরদৃষ্টি কাজে লাগিয়ে ফাঁকা জায়গা বের করা, নিজের বা অন্যের জন্য, যেন গোল এনে দেওয়া যায়। অধিকাংশ ফুটবল দলই অবশ্য রমডয়টার এর দায়িত্বে কোনো খেলোয়াড়কে নিয়োগ করতে পারে না। কারণ অংক কষে ফুটবল খেলার এই আধুনিক যুগে একজন খেলোয়াড়কে অকারণে এলোমেলো ইচ্ছেমাফিক খেলার স্বাধীনতা দেয়াটা প্রায় সকলের কাছেই বিলাসিতা। সব দলে তো আর লিওনেল মেসি কিংবা থমাস মুলার নেই!

ওয়াসি আহমেদ, বোধ করি, আমাদের কথা সাহিত্যে সেই শূন্য সন্ধানী মানুষটিই। আমাদের আবেগপ্রবণ ছোটগল্প চর্চায় যেখানে অনুপস্থিত থেকেছে রাজনীতি, আমাদের পত্রিকার পাতায় যেখানে দীর্ঘকাল ফাঁকা ছিলো লেখাজোখা নিয়ে সরস আলাপ, আমাদের ইতিহাস আশ্রিত উপন্যাসের চর্চা যেখানে যেখানে সাধারণভাবে ঘুরে বেড়ায় চেনা কিছু আখ্যানকে কেন্দ্র করেই; ওয়াসি আহমেদ সেখানে ক্রমাগত শূন্যতা পূরণ করেন। একমাত্রিক না হয়ে সত্যিকার অর্থেই তিনি এক বিরল বহুমাত্রিক লেখক, রমডয়টারের মতো যাকে কোনো পজিশনে বেঁধে দেওয়া যায় না।

সাহিত্য যদিও ফুটবলের মতো ফল প্রত্যাশী নয় কখনোই, তবু, পাঠক হিসেবেই আশা রাখি, আমাদের কথাসাহিত্যে ওয়াসি আহমেদ রমডয়টার হিসেবে আরও অনেকদিন খুঁজে যাবেন শূন্যতা আর সেটা পূরণও করে যাবেন অবিরাম।
 --------------
 
 

আলোচক পরিচিতি:
সুহান রিজওয়ান 
ঔপন্যাসিক
বাংলাদেশে থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন