সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

হোয়্যার হ্যাভ অল দ্য ফ্লাওয়ার্স গন: ওয়াসি আহমেদ এর উপন্যাস ‘বরফকল’ নিয়ে নজরুল সৈয়দের আলোচনা






১.
শেফালি- শরৎ আর হেমন্তে ফোটে। ফোটে রাতে, সকালে ঝরে যায় শিশিরের শব্দের মতো। শিউলী নামেই বেশি পরিচিত। চম্পা ফুলের জাত পরিচয় হারিয়ে গেছে নাগরিক জীবন থেকে। দোলন চাঁপা, কাঠগোলাপ ইত্যাদি নামে চিনলেও চম্পাকে চেনে না কেউ। জবা-ই শুধু স্বনামে পরিচিত, সে কি পারবে আত্মপরিচয় টিকিয়ে রাখতে?

২.

মুক্তিযুদ্ধ এক বিরাট আবেগের ব্যাপার। এই প্রসঙ্গ এলেই খুব গলা কাঁপিয়ে, কণ্ঠ ভারি করে, গম্ভীর হয়ে বলতে হবে ‘ত্রিশ লক্ষ প্রাণ আর দুই লক্ষ মা বোনের ইজ্জতের বিনিময়ে আমরা পেয়েছি আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি, বাংলাদেশ’। শ্রোতা দর্শক তখন গর্বে মাতোয়ারা হয়ে বিপুল করতালিতে ভাসিয়ে দেবে আর ব্যাকগ্রাউন্ডে বেজে উঠবে ‘এক সাগর রক্তের বিনিময়ে বাংলার স্বাধীনতা আনলো যাঁরা, তোমাদের এই ঋণ কোনোদিন শোধ হবে না’। সঙ্গে কোরাসে আরো অনেক কণ্ঠ বলে উঠবে ‘না না না শোধ হবে না’।

শোধ যে হবে না তা তো আমরা বলেই দিয়েছি গানে, সুরে, অতএব শোধবোধ। দায় শোধের দায় এবার শেফালিদেরই... প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সে দায় বয়ে বেড়ায় তারা। শেফালি থেকে চম্পা, চম্পা থেকে জবা... কোনোদিন কি এই দায় শোধ হবে?

আমাদের গৌরবের ৫০ বছর পূর্তি হবে, অনেক টাকার মচ্ছব হবে আর জবারা নতুন করে শঙ্কায় পড়বে, তার মা কি কোনোদিন মানুষের সামনে এসে দাঁড়াতে পারবে? কী হবে তাঁর পরিচয়?

৩.

মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলা ভাষায় রচিত হয়েছে অসংখ্য বই, অনেক গর্বের গল্প। কিন্তু রাষ্ট্র যাঁদের নাম দিয়েছে বীরাঙ্গনা, আমাদের সেই দুই লক্ষ মা-বোন যাঁদের ইজ্জতের বিনিময়ে স্বাধীনতা পেয়েছি বলে আমরা গলা কাঁপাই, সেই হতভাগ্য নারীদের বঞ্চনার চিত্র কি আমরা তুলে আনতে পেরেছি আমাদের সাহিত্যে বা গবেষণায়? মুক্তিযুদ্ধের গৌরবের যে গল্পটা আমরা খুব গর্বের সঙ্গে প্রকাশ করি, অগৌরবের গল্পটা কি আমরা বলতে পারি?

খুব যে পেরেছি তা বলা যাবে না। গত পঞ্চাশ বছরে রিজিয়া রহমানের ‘রক্তের অক্ষর’ আর শাহীন আখতারের ‘তালাশ’ ছাড়া আর তেমন বেশি নাম মনে আসে না। সেগুলোতেও কেবল সেই দূর্ভাগা নারীর গল্প। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সেই দায় বহনের তালাশ আমরা কি আগে করেছি কখনো? আমার পড়া হয়নি তেমন কোনো সাহিত্য। এমনকি এ বিষয়টা যে ভাবিয়ে তুলতে পারে, তাই জানা হতো না যদি না ওয়াসি আহমেদের উপন্যাস ‘বরফকল’ পড়া হতো।

স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের ৫০ তম বর্ষেই প্রকাশিত হয়েছে ‘বরফকল’। আড়াইশ পাতার এ বইতে ওয়াসি আহমেদ তুলে এনেছেন তিন প্রজন্মের পরিচয় লুকিয়ে বাঁচার চেষ্টার গল্প। উপন্যাস তকমার আড়ালে ‘বরফকল’ আসলে এক দুর্দান্ত ডকু ফিকশন। কখনো ফার্স্ট পার্সনে, কখনো থার্ড পার্সনের ভাষ্যে গল্পের চরিত্রদের আমরা দেখতে পাই। সেই গল্পও কোনো লিনিয়ার গল্প না! কখনো গল্প বলা হয় আশির দশকে যখন শেফালি শেষবারের মতো নতুন এক ঠিকানা পায় হারিয়ে যাওয়ার, কখনো গল্প ছুটে আসে স্বাধীনতার বিয়াল্লিশ বছর পরে যুদ্ধশিশু চম্পার জীবনে, কখনো গল্প ছুটে যায় মুক্তিযুদ্ধেরও অনেক আগে, শেফালির ছেলেবেলায়, কখনো গল্প ভাসে মুক্তিযুদ্ধের রক্তে...। তুমুল চড়াই উৎড়াই পেরিয়ে পাঠক অবশেষে জানতে পারে পুরো গল্পটা। খুব আরামে একটি গল্প জেনে নিয়ে ‘খুব মুক্তিযুদ্ধ জেনে ফেলেছি’র আত্মতৃপ্তি পাঠককে দেন না ওয়াসি আহমেদ। আবার কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে শেফালিদেরকে কীভাবে ধর্ষণ করলো পাকিস্তানী নরপশুরা, সেইসব রগরগে বর্ণনা দিয়ে পাঠকের মনে প্রবল চাপ কিংবা ভেতরের পশুপ্রবৃত্তিকেও জাগিয়ে দেন না ওয়াসি। শুধু পাঠককে বাধ্য করেন বারবার এটা বুঝতে যে তিনি শুধু একটি গল্প বলছেন না, ব্রেখটের এলিয়েনেশন থিওরির মতো তিনি পাঠককে বার বার থমকে দাঁড় করান বিভিন্ন প্রশ্নের সামনে। ‘বরফকল’ পড়া শেষ হয়ে যাওয়ার পরও বহুদিন যে প্রশ্নগুলো পাঠককে স্বস্তি দেবে না।

৪.

শেফালির বিবাহের ছিলো ঠিকঠাক, লগ্নটাই যা শুভ ছিলো না। শুরু হয়ে গেলো যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধ। ভাই যুদ্ধে গেলো, শেফালিকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো কুমিল্লা ক্যান্টনমেন্টে। মাসের পর মাস তাঁকে নির্যাতন করলো পাকিস্তানী সেনারা। যুদ্ধ শেষে তাঁর ঠাঁই হলো পুনর্বাসন কেন্দ্রে। পরিবার আর সমাজ তাঁকে আশ্রয় দিলো না, আশ্রয় হলো রেখাবুর কোল। আর তার কোলজুড়ে এলো শিশু সন্তান। যে সন্তানকে জন্মের পরেই সে মেরে ফেলতে চেয়েছিলো, রেখাবু তার নাম রাখলেন চম্পা... আরো একটা ফুল। যুদ্ধাপরাধীদের আন্তর্জাতিক আদালতে বিচারের দাবীর জন্য চাই শক্ত ডকুমেন্ট। জাফর সাদেক যখন ঘুরে ঘুরে মরছে সেই ডকুমেন্ট সংগ্রহের চেষ্টায় তখন শেফালি নীরবতা ভেঙ্গে বলে দিলো তাঁর সবটুকু কষ্ট আর বেদনার কথা। রাষ্ট্রীয় গর্বের গায়ে হানলো তীব্র আঘাত। সেই আঘাত বুমেরাং হয়ে ফিরে এলো তাঁর আর তাঁর সন্তানের জীবনে। রাষ্ট্র যখন মুক্তিযুদ্ধের গর্বে উল্লসিত, শেফালি তখন পালিয়ে বেড়ায় জীবন থেকে।

শুধু শেফালি না, পালিয়ে বেড়ায় তাঁর সন্তান যুদ্ধশিশু চম্পাও। আজীবন তাঁকে পালিয়ে বেড়াতে হয় এই গর্বিত রাষ্ট্রের আনাচে কানাচে। কিন্তু কোথায় পালাবে তাঁরা? এট্টুন দ্যাশ, কই যাবে শেফালি? কোথায় পালাবে? যেখানেই যায়, কদিন পরেই জানাজানি হয়ে যায় তাঁর অগৌরবের ঘটনা, পালিয়ে যেতে হয় নতুন ঠিকানায়। চম্পাকেও পালাতে হয় বারবার। সে যে যুদ্ধশিশু, তাঁর যে বাপের পরিচয় নেই, সে যে বেজন্মা, জাউরা! সরকার তাদের নাম দিয়েছে- একজন বীরাঙ্গনা, আরেকজন যুদ্ধশিশু। নাম দুটো হলেও আসলে পরিণতি এক... দুইজনকেই পালিয়ে বাঁচতে হয় এই গর্বিত রাষ্ট্রে। আর জীবনের পরম্পরায় সেই পলায়নের ভার চাপে তাঁর সন্তান জবার কাঁধেও।

দেশটা স্বাধীন হয়েছে ঠিক, কিন্তু শেফালি বেগমরা পরাধীন হয়ে গেছে। যুদ্ধটা যদি না হতো তার মতো লাখ লাখ মেয়ের জীবন বরবাদ হতো না!

৫.

‘বরফকল’ শুধু শেফালি, চম্পা আর জবার মর্মস্পর্শী জীবনের আখ্যান না। জাফর সাদেকের অনুসন্ধানের মাধ্যমে ওয়াসি আহমেদ তুলে ধরতে চেয়েছেন পাকিস্তানী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার করতে না পারার ব্যর্থতার গল্পটাও। কী কারণে আজও সেইসব যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের আওতায় আনা গেলো না, এমনকি যুদ্ধাপরাধী হিসেবে বিশ্বের কাছে পরিচিতও করা গেলো না, সেই গল্পটা ওয়াসি আহমেদ তুলে ধরেছেন ‘বরফকল’ উপন্যাসে। যে কারণে এটি শুধু একটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প হয়ে থাকেনি, এটি হয়ে গেছে মুক্তিযুদ্ধের এক অনন্য দলিল।

এই উপন্যাস লিখতে ওয়াসি আহমেদকে পড়তে হয়েছে প্রচুর, করতে হয়েছে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার প্রক্রিয়ার ব্যাপক তত্ত্ব তালাশ। নুরেমবার্গ ট্রায়াল থেকে শিমলা চুক্তি পর্যন্ত ঘাঁটতে হয়েছে। যা এই উপন্যাসটিকে অনন্য এক মাত্রা দিয়েছে। যা শুধু একটি হতভাগা নারী বা তার প্রজন্মের বঞ্চনার আখ্যান করে রাখেনি, যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবীটা নতুন করে পাঠকের সামনে হাজির করেছে।

আজকে যখন দেশজুড়ে পালিত হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের গর্বের ৫০ বছর পূর্তির উৎসব, স্বাধীনতার রজত জয়ন্তীর আনন্দে যখন আমরা মশগুল, তখন ওয়াসি আহমেদের উপন্যাস ‘বরফকল’ পাঠককে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করবে। এই উপন্যাসের চম্পা যেন তার ঘুমন্ত সাত ভাই তথা সতেরো কোটি মানুষকে আবার জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করছে। কিন্তু আমাদের ঘুম কি সত্যিই ভাঙবে? আমরা কি জেগে উঠতে পারবো?

৬.

২৫৪ পৃষ্ঠার এই উপন্যাসটি প্রকাশ করেছে কথাপ্রকাশ। অপূর্ব সুন্দর প্রচ্ছদ করেছেন সব্যসাচী হাজরা।
 
 

আলোচক পরিচিতি:
নজরুল সৈয়দ
লেখক। নাট্যনির্দেশক। সাহিত্য সমালোচক।
ঢাকায় থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন