সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

যে গান আর্তনাদের: আফসানা বেগম



বৈষয়িক দিক দিয়ে এক সময়কার সমাজের সবচেয়ে নীচুস্তরের মানুষেরা যে উপন্যাসের প্রাণ, তার নাম তলকুঠুরির গান। এই প্রাণ যেন বইয়ের পাতায় ছাপার অক্ষরে ধরে রাখা জ্বলজ্বলে জীবন্ত; নিপীড়নের কষাঘাতে বিমূঢ় আবার পরমুহূর্তে প্রতিবাদের চেতনায় উদ্দীপ্ত! সমাজের ভোগবাদী আর সম্পদের সিংহভাগের অধিকারী মানুষ যখন সহায় সম্বলহীনের উপরে চড়াও হয়, তখন তা কতটা ভয়াবহ হতে পারে, ইতিহাসের পাতা থেকে তুলে নিয়ে এই উপন্যাস পাঠককে তা দেখিয়ে দিয়ে যায়। দিনের পর দিন, প্রজন্মের পর প্রজন্ম শারীরিক কিংবা মানসিক আঘাতের চিহ্ন বয়ে বেড়ানো মানুষের সামনে-পিছনে, এমনকি মনের ভিতরেও গুমরে ফেরে কেবল আর্তনাদ, যা কিছুতেই সুমধুর সঙ্গীত হতে পারে না। অথচ লেখক, ওয়াসি আহমেদ, নিম্নশ্রেণির অসহায় মানুষদের চিৎকার বা আর্তনাদকে কেন গানের মর্যাদা দিতে গেলেন সে প্রশ্ন শুরুতেই ভাবনায় আসে। সমাধান থাকতে পারে চিরায়ত কবি শেলির বিখ্যাত বাক্যে, আমাদের সবচেয়ে প্রিয় গান সেটাই যা সুরে সুরে তীব্রতম কষ্টের কথা বলে। তলকুঠুরির গান উপন্যাসও যেন ঠিক তাই, যে গান শেষ হয়ে গেলেও দীর্ঘস্থায়ী এক ক্ষতের মতো পাঠকের হৃদয়ে দগদগে ছাপ ফেলে, প্রিয় গানের কলির মতো বই বন্ধ করে ফেললেও কানের কাছে বাজতে থাকে।

তলকুঠুরির গান উপন্যাসটি নিছক দৈনন্দিন ঘটনা নিয়ে নয়। ইতিহাসের এক অন্যায়পূর্ণ অধ্যায় থেকে প্রতিবাদ আর সাহসী লড়াইয়ের আভাসে মানুষের উত্তোরণের কাহিনি বোনা আছে এতে। বাস্তবের নিপীড়ন আর ফলশ্রুতিতে ছোটোখাটো বিদ্রোহের ধারাবাহিক ঘটনা উপন্যাসটিকে পাতার পর পাতা এগিয়ে নিয়ে গেছে। তিন প্রজন্মের জটিল কাহিনিটি ততধিক জটিল বুননে ঠাসা হয়েছে। কাহিনি কেবল নিপীড়ন আর বিদ্রোহের ইতিহাসেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, লেখকের বর্ণনায় সেদিনকার দাসত্ব আজকের সমাজে বসবাসকারী মানুষের জীবনেও বহমান, যা তিনি প্রমাণসমেত হাজির করেছেন। আর তাই এই উপন্যাস দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সামান্য আগে থেকে শুরু হয়ে আজকের দিনের কর্পোরেট সমাজ পর্যন্ত ধারণ করে। যেহেতু ইতিহাসভিত্তিক বলিষ্ঠ পটভূমি উপনাসটিকে গড়ে উঠতে এবং বিস্তৃতি লাভ করতে প্রধান ভূমিকা পালন করেছে তাই উপন্যাসের কাহিনির সার-সংক্ষেপে যাবার আগে তার পটভূমি বিশ্লেষণ জরুরি।

উপন্যাসের পটভূমি বিশ্লেষণ:

তলকুঠরির গান উপন্যাসে যে ‘তলকুঠুরির’ কথা বলা হয়েছে তা নানকার জনগোষ্ঠীর করুণ কাহিনি আর তা থেকে উত্থানের গল্প। এই কাহিনিতে বর্ণিত স্থান প্রাচীন সিলেট। বাঙালি জাতির ইতিহাসে শত শত বছর ধরে অত্যাচারের প্রতিবাদ হিসেবে একের পর এক সংঘঠিত হয়েছে গৌরবম-িত বিপ্লব আর বিদ্রোহের ঘটনা। যুগে যুগে এ অ লে অধিকারবিহীন মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য যত বিদ্রোহের আবির্ভাব হয়েছে, সিলেট অ লের নানকার বিদ্রোহ তার মধ্যে বিশেষ স্থান দখল করে আছে। দীর্ঘদিনের অত্যাচারের প্রতিক্রিয়া হিসেবে শেষ পর্যন্ত ১৯৪৯ সালের ১৮ই আগস্ট নানকাররা ফুঁসে ওঠে আর ছয়জনের হত্যার মাধ্যমে সামন্তবাদের বিরুদ্ধে তাদের বিদ্রোহের সূচনা করে। প্রকৃতপক্ষে বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক থেকে আরম্ভ হওয়া অসন্তোষ এবং বিচ্ছিন্ন ক্ষুদ্র সংগ্রামের ঘটনার ফলশ্রুতিতে ধীরে ধীরে চরম বিদ্রোহের ঘটনা ঘটে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে ১৯৫০ সালে জমিদার প্রথা বিলুপ্তির মাধ্যমে নানকারদের মুক্তি ঘটে।

‘নান’ উর্দু শব্দ, যার অর্থ রুটি। ‘কার’ অর্থ যোগান দেয়া বা কাজ করা। এই দুই শব্দের মিলনে সৃষ্টি হয়েছে ‘নানকার’ শব্দটি। বিনা পারিশ্রমিকে কেবলমাত্র রুটির বা খাবারের জন্য যারা উদয়াস্ত কাজ করত তাদের বোঝাতে শব্দটি ব্যবহার করা হতো। জমিদার বা মিরাশদারেরা নামমাত্র খাদ্যের যোগানের বিনিময়ে নানকার প্রজাকে জমির ভোগসত্ব দিত। ওই জমিকে বলা হতো নানকার জমি। ওই জমিতে ফলানো প্রত্যেকটি ফসল, পুকুরের মাছ, এমনকি গাছের ফলের উপরেও কেবল জমিদারের অধিকার থাকত। নানকার তার অনির্দিষ্ট পরিমাণ শ্রম দিয়ে জমির ফসল ফলাতো, পুকুরে মাছ বড়ো করত, ছোটো চারাকে বৃক্ষে পরিণত করত কিন্তু সেই ফসল বা মাছ বা গাছের কাঠে হাত দেয়ার অধিকার তার ছিল না। প্রকৃতপক্ষে, নানকার ছিল জমিদারের হুকুম দাস। শুধু বাড়ির কর্মঠ পুরুষই নয়, নানকার পরিবারের স্ত্রী-কন্যা এবং প্রত্যেক সদস্য বংশানুক্রমিকভাবে জমিদারের দাসে পরিণত হতো যা থেকে পরিত্রাণের কোনো নিয়ম ছিল না। সাধারণত, নি¤œবর্ণের হিন্দু, কিরান, নম-শূদ্র, মালি, ঢুলি, নাপিত, পাটনি, ইত্যাদি শ্রেণির লোকেরা নানকার প্রজা হিসেবে গণ্য হতো।

নানকার বিদ্রোহের অন্যতম সংগঠক অজয় ভট্টাচার্যের নানকার বিদ্রোহ নামের বইয়ে বিদ্রোহের প্রেক্ষাপট এবং সংগঠক হিসেবে তার অভিজ্ঞতা বর্ণিত হয়েছে। তার ভাষায়,

‘নানকার প্রথাকে আসলে দাসত্বপ্রথা বললে এতটুকু অত্যুক্তি হয় না। ইতিহাসে বর্ণিত দাসজীবনের সাথে নানকার জীবনের সাদৃশ্য যতখানি, বৈসাদৃশ্য সেই তুলনায় নগণ্য। নানকারের জীবন মৃত্যু, অস্তিত্ব- অনস্তিত্ব, দাসত্বপ্রথার দাস-মালিকদের মতো, এ-যুগের জমির মালিক জমিদারদের উপর ষোলো আনা নির্ভরশীল ছিল। দীনতা, হীনতা ও তীব্রতায় ও-যুগের দাসত্বপ্রথা থেকে এ-যুগের নানকার প্রথা কোনো অংশেই কম পীড়াদায়ক ছিল না। বস্তুত পক্ষে, ও-যুগের দাসত্বপ্রথাকেই নানকার প্রথার ভেতর দিয়ে এ - যুগেও বাঁচিয়ে রাখা হয়েছিল, আর তা করা হয়েছিল সামন্ত প্রথারই কল্যাণে।’

এই বর্বর নানকার প্রথা তুলে দেয়ার উদ্দেশ্যে এবং জমিদারের হাত থেকে নানকার প্রজাদের স্বাধীন করার জন্য উপমহাদেরশের কিছু সংখ্যক কমিউনিস্ট নেতা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন, অজয় ভট্টাচার্য তাদের মধ্যে অন্যতম। তলকুঠুরির গান উপন্যাসের লেখক বইয়ের ভূমিকায় প্রকাশ করেছেন যে, বিদ্রোহের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রচিত বস্তুনিষ্ট বইপত্র বা দলিলাদির অভাব থাকলেও অজয় ভট্টাচার্যের নানকার বিদ্রোহ বইটি উপন্যাস রচনায় তার প্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তবে তলকুঠুরির গান উপন্যাসটিতে বিদ্রোহের কাহিনি মোটেও সরাসরি বর্ণিত হয় না। বরং কল্পকাহিনি লেখায় সিদ্ধহস্ত, ওয়াসি আহমেদ নির্যাতন পরবর্তী অবশ্যম্ভাবী বিপ্লবকে উপজীব্য করে নানকারদের দৈনন্দিন হাসি-কান্না, দ্রোহ ও বেদনার কল্পিত ছবি আাঁকেন। পাতায় পাতায় সেই ছবি যেন কথা বলে, পাঠকের সামনে কাঁদে-হাসে, আর এভাবেই ওই যুগের এক প্রান্ত থেকে আজকের ব্যস্ত, নিষ্ঠুর শহরে এসে আছড়ে পড়ে। তাই তো লেখক মূল চরিত্রের চোখ দিয়ে আজকের কর্পোরেট জগতকে নানকারির সঙ্গে তুলনা করতে প্রয়াস পান।


প্রাথমিক কথা:

অসংখ্য চরিত্রের সমন্বয়ে অত্যন্ত দ্রুতগামী বর্ণনার এক আখ্যান তলকুঠুরির গান। কোনো কোনো চরিত্র এর কেন্দ্রেই থাকে, শুরু থেকে শেষ অব্দি, যেমন থাকে শরীফ, শুকুর চান, তকবীর চান, মতিজান আর আম্বিয়া। কোনো চরিত্র আবার মাটি ফুঁড়ে উঠে আসার মতো হুট করে উপস্থিত হয়েই বর্ণনার হাল ধরে ফেলে। তখন তাকে কেন্দ্র করে বর্ণনা এগিয়ে যায়। বর্ণনার কৌশলে নতুন চরিত্রের আগমনে আগের চরিত্রের পুঙ্খানুপুঙ্খ পরিণতি পাঠকের কাছে জরুরি মনে হয় না। বিশাল ক্যানভাসের উপন্যাসে কাহিনির জটিলতার এক স্তর থেকে আরেক স্তরে পৌঁছতে এবং তাকে এগিয়ে নিতে গিয়ে লেখককে নিতান্ত প্রয়োজনেই অসংখ্য চরিত্রের অবতারণা করতে হয়েছে। সুতরাং, চরিত্রের আসা এবং তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চরিত্রের আবির্ভাবে আগের চরিত্র মিলিয়ে যাওয়া অত্যন্ত যৌক্তিক বলে মনে হয়।

বিপ্লব যেমন কারো একার পক্ষে সম্ভব নয়, আবার গ্রেফতার বা গা ঢাকা দেয়ার কারণে একজন দীর্ঘক্ষণ তার হাল ধরে রাখতেও অনেকসময় অপারগ, এই কাহিনিতেও তাই বিদ্রোহের নেতা কিংবা উপদেষ্টার আসনে একের পর এক মানুষের আবির্ভাব হয়েছে। এক রাতের অন্ধকারে উপস্থিত হয় অমল, আসে সবচেয়ে প্রথমে মুক্তির বারতা নিয়ে। তারপর ধীরে ধীরে আসে আবজল, সুভাষ এবং সবার শেষে নইমুল্লা যেন ভোজবাজির মতো আবির্ভূত হয় আর অমল বরাবর থাকলেও নইমউল্লাই বিদ্রোহকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়। কেবল নানকার গোষ্ঠীর বাইরে থেকে আসা সংগঠকই নয়, তাদের ভিতরে শক্তিশালী এবং মনে মনে আপাদমস্তক বিদ্রোহী চরিত্র হলো, মতিজান। মতিজান মৃত্যু অব্দি নানকারীর পতনের স্বপ্ন দেখে। আরো আছে আম্বিয়া, মতিজানের কন্যা এবং কেন্দ্রীয় চরিত্র, শরীফের ফুফু যাকে দিয়ে উপন্যাসের ভিতরে লুকিয়ে থাকা আরেকটা রূপকথাসদৃশ উপন্যাসের পরদা ওঠে। তবে যত চরিত্রই সারিবদ্ধভাবে কিংবা কখনো হুট করে উদয় হোক না কেন, ওয়াসি আহমেদ অল্প-স্বল্প বাক্যে তার চেহারাটা পাঠকের কল্পনায় বসিয়ে দিতে একবারও ভোলেননি। কাহিনিনির্ভর উপন্যাসটিতে কাহিনির বিশালতার এবং অধিকতর গুরুত্বের কারণে লেখককে চরিত্র বর্ণনা করতে হয়েছে অত্যন্ত সংক্ষেপে অথচ একবারও তিনি তাতে ব্যর্থ হননি। যেমন উদাহরণ হিসেবে প্রধান চরিত্র শরীফের অফিসের বস, যার নাম শরীফ খান, চরিত্র বর্ণনার শুরুতে মাত্র কয়েকটি বাক্যেই তার চেহারাটা পাঠকের সামনে ভেসে ওঠে,

‘শরীফ খানের বয়স পঞ্চাশের এদিক-ওদিক হলেও চেহারাটা তরতাজা তরুণের। বিশেষ করে খাটো জুলফির আশেপাশে উজ্জ্বল রূপালি ঝলক যেন তার তারুণ্যকেই উসকে দিচ্ছে। কামরার মিহি ঠান্ডা নরম আলো ফরসা কপালে, গালে, চশমাঢাকা চোখের নীচে থমকে আছে। শরীফের মনে হলো, চেহারার এ অভিব্যক্তিটা নিছকই সুন্দর, বৈশিষ্ট্যময় নয়। বৈশিষ্ট্য যা কিছু, অল্প বাঁকানো টানটান চিবুকে। ঠিক এখানেই যেন শরীফ খান তার সাহস আর জেদকে আঁটো করে ধরে রেখেছেন।’

বহু উপন্যাসে দেখা যায় পাতার পর পাতা স্থানের দোষ-গুণ বা চেহারা বর্ণনায় ব্যবহৃত হয়ে যায়। তলকুঠুরির গান উপন্যাসে স্থান বা জায়গার বর্ণনায় ওয়াসি আহমেদ বলতে গেলে অত্যন্ত সামান্য অংশ বরাদ্দ করেছেন। অথচ তাতে পাঠকের বিন্দুমাত্র অসুবিধা হয় না। কাহিনির চুম্বক গতি পাঠককে তার দেখার অভিজ্ঞতা থেকে জায়গার দৃশ্য কল্পনা করিয়ে নেয়। যুগের পর যুগ পৃথিবীতে যে দাসপ্রথা বহাল ছিল, তার ছবি দেখার বা কহিনি শোনার পূর্বের স্মৃতি থাকুক বা না-থাকুক, পাঠক কাহিনি ঘিরে জায়গাটা আবিষ্কার করে ফেলতে পারে।

তলকুঠুরির গান উপন্যাসটি আপাত দৃষ্টিতে দুটো ভিন্ন কাহিনির সমান্তরাল যাত্রা। একটি কাহিনির সঙ্গে আরেকটির অর্ধ শতাব্দীরও বেশি পার্থক্য। প্রথম কাহিনিটি সরাসরি জমিদার অধ্যুষিত নানকার প্রজার জীবন কাহিনি। লেখক ওই পর্যায়টি বর্ণনা করেছেন সাধারণ বর্তমানে, স্মৃতিময় অতীতের ক্ষেত্রে মানুষ সাধারণত যা করে থাকে। যেমন করে বলা যায়, বাংলাদেশ ১৯৭১ সালে স্বাধীন হয়। আর ক্রিয়ার কালের ব্যবহারের এই কৌশলের কারণে উপন্যাসটিতে চরম নির্যাতনের বর্ণনা আরো বেশি প্রকট লাগে, মনে হয় নির্যাতনের ঘা যেন এখনো দগদগে। অন্যদিকে সমান্তরাল কাহিনিজোড়ার আরেকটি কাহিনি, যা কিনা তুলনামূলকভাবে অনেক পরের, অথচ বর্ণিত হয়েছে ঘটমান অতীতে, যা পড়লেই পাঠক তার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটতে পারে। সেখানে তাই লেখকের বর্ণনার সঙ্গে ছুটতে ছুটতে পাঠকের মনে তার রেশে থেকে যায়।

উপন্যাসের কাহিনি-সংক্ষেপ:

তলকুঠুরির গান উপন্যাসটি শুরু হয়েছে কেন্দ্রীয় চরিত্র শরীফের অদ্ভুত এক খেয়ালের মধ্যে দিয়ে। মধ্যবয়সে পৌঁছে অতীতের স্মৃতির তাড়নায় সে নিজের নামের সঙ্গে ‘নানকার’ শব্দটি জুড়ে দেয়। আকস্মিক নাম বদলানো আশেপাশের মানুষদের কৌতূহলের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু শরীফ কাউকে কিছুই পরিষ্কার করে বলতে পারে না। সে কেবল উপলব্ধি করে যে সে একজন ‘নানকার’ কিংবা প্রজন্মের পর প্রজন্ম নানকারি পেশা বয়ে বেড়ানোই তার নিয়তি। আবার এ নিয়ে যে শরীফ দুঃখিত, তা নয়। বরং নামের এই উড়িয়ে এনে জুড়ে দেয়া বাড়তি অংশ তাকে যেন কল্পনাতীত এক আনন্দ দেয়, পুর্বপুরুষদের স্মৃতি আর হদবেগারির ঘানিতে নিজেকে আবিষ্ট করে রাখতে পেরে গর্বে তার বুক ফুলে ওঠে। সে তার শিকড় ভুলে থাকতে লজ্জাবোধ করে। তাই কখনো না কখনো কেউ তাকে ‘নানকার’ নামে ডাকবে, দুঃসহ অতীতের কথা তার কিছুতেই ভোলা হবে না, ভোলা হবে না নিজের প্রকৃত পরিচয়, এতেই সে খুশি।

যদিও শরীফের জন্ম হয়েছে নানকারি উঠে যাবার পরে তবু সেই দুঃসহ সময়ের গল্প শোনার স্মৃতি এখনো টাটকা। তাই সেই ঘটনা তার কাছে পূর্বপুরুষের অতীতমাত্র নয়, যেন জ্বলজ্বলে বর্তমান। এর কিছুই অবশ্য শরীফ অনেক আগে জানত না, বাবাকে দেখত বিস্ময়ের চোখে। বয়স্ক হবার অনেক আগে লাঠি নিয়ে চলাফেরা করা বুড়িয়ে যাওয়া বাবার মুখে মেঘনা পাড়ের অন্যান্যদের সঙ্গে তার ভাষার পার্থক্য বালক শরীফের চোখে খটকা লাগত। আর সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন জাগত যখন কপালকে দুই ভাগ করে ফেলা দড়ির মতো একটা চিহ্ন দেখত বাবার কপালে। দড়িটা বাস্তবের দড়ির মতোই উঁচু ঠেকত শরীফের ছোটো হাতে। খেতজমির আলের মতো ফুলে থাকা দড়িটা নিয়ে শরীফের মনে অনেক প্রশ্ন ছিল। তারপর একদিন তার কৌতূহল চরমে উঠল যেদিন বড়ো বোন পরীক্ষায় পাশ করাতে মোনাজাতে বসে বাবাকে বলতে শুনল, ‘আমি নানকারের বাচ্চা নানকার’ কিংবা ‘নানকারের বেটি মেট্টিক পাশ দিল।’ রাতে বাবার কপালের দড়িটায় চুপি চুপি হাত বোলাতে গেলে শরীফ দেখত দড়িটা ঘুমায় না, যেন দগদগে কোনো স্মৃতি চেপে রেখে প্রহরীর মতো বাবার দুটো চোখ পাহারা দেয়। তবে মোনাজাতে বাবার গলায় ‘আমি নানকারের বাচ্চা নানকার’ শোনার পর থেকে শরীফ যেন বাবার নতুন এক চেহারা আবিষ্কার করে, বুঝতে পারে যে কেবল কপালের দড়িতে নয়, শিরা ফুলে ওঠা গলাতেও বাবা অনেক রাগ আর কান্না জমিয়ে রেখেছে। কৌতূহল দমিয়ে রাখতে না পেরে শরীফ বাবার কাছে ‘নানকার’ শব্দের অর্থ জানতে চায়।

ছেলের প্রশ্নে নয় কি দশ বছরের বালক শরীফকে একদিন তার বাবা এক লম্বা কাহিনি শোনান, শরীফের কাছে তা এক রূপকথাই বটে।

সুরমা নদীর ধার থেকে এগারো মাইল দূরে রনকেলি গ্রামের কাহিনি দিয়ে শুরু হয় সে রূপকথা। যেখানে শরীফের ফুপু আম্বিয়া থাকে, থাকে তার স্বামী তৈয়ব আলী। তখন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, এখানে ওখানে মিলিটারির তেরপলমোড়া লরি। সেখানে আম্বিয়া অংশ নেয় নানকারদের বিপ্লবী মিছিলে। হাতে টিমটিমে হারিকেন আর অত্যাচারের হিসেব নিতে উদ্গ্রীব এক নারীমিছিল নিয়ে মাইলের পর মাইল পেরিয়ে শহরের কর্ণধারের কাছে যায় তারা। ঘটনাচক্রে মিছিলের নেতৃত্ব দেয় আম্বিয়া।

আম্বিয়া খাতুনের হারিকেন হাতে শহরপ্রধানের বাড়িতে ঢুকে পড়ার বীরত্বের গল্পে বালক শরীফ যখন আচ্ছন্ন, তখন তার বাবা, শুকুর চান তাকে শোনায় আরেক কাহিনি, যে কাহিনি তার বাবা আর শরীফের দাদা, তকবির চানের। নানকার তকবির চানের একমাত্র সম্বল, ছেঁড়াফাঁড়া একটা খেপলা জাল দিয়ে সে সামান্য যা মাছ ধরে তা দিয়ে আসে জমিদারের বাড়িতে। নিজের ছেলেমেয়ের মুখে এক টুকরো মাছ তুলে দেয়ার ক্ষমতা শুকুর চানের হয় না। বরং মাছ ধরা শেষে বেঁচে থাকার মতো খোরাকি যোগাড় করতেই তার এবং তার স্ত্রী, মতিজানের জীবন ওষ্ঠাগত। শেষে একদিন তকবির চান মনে মনে ঠিকই করে ফেলে যে, আগেভাগেই নিজের পরিবারের জন্য দু’একটা মাছ সরিয়ে ফেলবে। আর তার ভাবনাকে সায় দিতে তার পরপরই ছেঁড়া জালে অপ্রত্যাশিতভাবে আটকা পড়ে বড়োসড়ো এক বোয়াল। বাজারে গোপনে মাছ বিক্রি করে মাছের পেটের বড়ো বড়ো টুকরো নিয়ে বাড়িতে হাজির হয় তকবির চান। সন্তানদের সঙ্গে সুস্বাদু মাছ মুখে পুরতে পুরতে ভাগ্যের জোরে বিশাল মাছ মিলে যাবার আর বাড়ি পর্যন্ত সে মাছ হাজির করে সবাইকে চমকে দেয়ার বীরত্বের গল্প শোনায়।

কিন্তু নানকারদের কাজকর্ম আর চলাফেরার কিছুই কি গোপন থাকে তাদের মালিক মিরাশদারদের কাছে!

যথারীতি জমিদারবাড়িতে তলব পড়ে তকবির চানের আর নিয়ম ভাঙার স্পর্ধা দেখানোর নির্ধারিত যে শাস্তি ছিল তাই জোটে কপালে। সাধারণ চাবুকের আঘাত তো আছেই, আরো আছে কবজা দিয়ে আটকানো দুটো ভারী কাঠের তকতার মধ্যে অপরাধী নানকার প্রজাকে শুইয়ে উপরে জমিদারের কোনো পাইকের সমানে হাঁটাহাঁটি। দুই তকতার মাঝখানে অপরাধী প্রজার হাড়গোড় ভাঙে, মুখে রক্ত ওঠে, তবেই শাস্তি সম্পূর্ণ হয়। তকবির চানের কপালেও জোটে সেটাই। তবে তাকে যখন দুই তকতার ভিতরে পেশা হয় আর তার মুখের কোণে রক্ত উঠে আসে, ছোটো ছেলে শুকুর চান নিজেকে কিছুতেই আটকে রাখতে পারে না তখন। ছুটে গিয়ে তকতার উপরে চাপ রেখে চলা মানুষটাকে দেয় এক ধাক্কা আর সে কারণে চৌধুরির লাথি খেয়েও বাবার মুখে রক্ত ওঠা মাথাটা কোলে নিয়ে বসতে চায়। ঠিক তখনই এলোপাথারি চাবুকের প্রান্ত এসে বাড়ি খায় ছোট্ট শুকুর চানের কপালের মাঝ বরাবর। কপাল ফেটে গলগল করে রক্ত পড়লেও যন্ত্রণায় কাতর না হয়ে সাহসী আম্বিয়া খাতুনের ছোটো ভাই শুকুর চান একভাবে তাকিয়ে থাকে তার বাবা, তকবীর চান নানকারের রক্তভেজা মুখের দিকে।

ছেলেবেলায় শোনা সে রূপকথা তিরিশ বছর পরেও শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কংক্রিটের দেয়াল ঘেরা অফিসে বসে থাকা শরীফের পিছু ছাড়ে না। জীবন-জীবীকা, সমস্তকিছুর মধ্যে সে কেবল নানকারীর ছাপ খুঁজে চলে। একদিকে যেন সে তা থেকে মুক্ত হতে চায় আবার আরেক দিকে সে নিজের মধ্যে সেই পরিচয়টা জিইয়ে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে। আর তাই তো নামের পিছনে, ‘নানকার’ জুড়ে দেয়া। বাবার মুখে শোনা কাহিনির মধ্যে ডুবে থাকতে থাকতে একসময় সে নিজেকেও সেদিনের সেই নানকার প্রজার জায়গায় কল্পনা করতে পারে, ওই কাহিনি যেন তার নিজের কাহিনি, কপালের উপরে ফোলা ফোলা দড়ি যেন তার নিজের শরীর! ধীরে ধীরে অতীতের কাহিনির ঘোরে নিমজ্জিত শরীফ প্রতিবাদ করতে ভুলে যায়, বড়ো কোম্পানির জনৈক কর্মচারি হিসেবে কোম্পানির অন্যায় হিসেব-নিকেশেরও যুক্তি খুঁজে পায়। নিজের জুনিয়রকে প্রমোশন পেয়ে নিজেরই উপরে উঠতে দেখলে তার পিছনেও যুক্তি খোঁজে আর নীরব থাকে। ধীরে ধীরে আরো বেশি ঘোরগ্রস্থ হলে একদিন কবজা দিয়ে তকতার সঙ্গে তকতা আটকে শাস্তির সরঞ্জাম বানিয়ে বাড়িতে এনে লুকিয়ে রাখে। অতীতের পথে হাঁটতে হাঁটতে শরীফ হয়ে ওঠে এক অদ্ভুত মূক আর বিমূঢ় মানুষ, যে বসবাস কারে আজকের প্রতিযোগতাময় বর্তমানে কিন্তু নিজেকে জাহির করার বিন্দুমাত্র উৎসাহও তার থাকে না, সে যেন বর্তমানের মোড়কে অতীতের নিপীড়িত প্রজার নাকে-মুখে রক্ত ওঠা লাশ।

রূপকথার সে কাহিনিতে তকতা চাপার ফলশ্রুতিতে মৃতপ্রায় তকবির চানের বাড়িতে আবির্ভূত হয় নানকারীর বিরুদ্ধে মানুষকে ফুঁসিয়ে তোলায় ব্যস্ত নেতা অমল ভটের। ওষুধ আর সাহস দিয়ে সাহায্য করতে চায় তকবির চানকে। কিন্তু সামান্য সেরে উঠলেও শেষ রক্ষা হয় না তকবির চানের। তকতা চাপা খাওয়ার রেশ থেকে যায় শরীরে যা তাকে মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে যায়। আর তার মৃত্যু কিছু কালের জন্য তকতা চাপায় নানকার প্রজাদের মৃত্যু ঠেকাতেও সক্ষম হয়। ধীরে ধীরে নানকার প্রজাদের জাগিয়ে তুলতে থাকে অমল ভটের মতো কাহিনির মধ্যে আকস্মিক উপস্থিত হওয়া আরো বহু নেতা। তাদের সংশ্রবে মুখ বুজে থাকা নানকারদের মধ্যে হঠাৎ করে কেউ কেউ জেগে ওঠে, যদিও মৃত্যুই হয় তাদের পরিণতি। এভাবেই একের পর এক মৃত্যু আর হারানোর শোক গায়ে মেখে বিদ্রোহ যেন আরো চাঙা হয়। একসময়ে চলমান কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে তাকে জুড়তে সক্ষম হয় কমিউনিস্ট নেতারা। শেষের সাহসী নেতা, নইমইল্লার হাত ধরে তারা বিজয়ের স্বপ্ন দেখে। এখানে উল্লেখ না করলেই নয়, নইমউল্লা চরিত্রটি লেখকের স্বীকারোক্তিতে সত্যিকারের বিদ্রোহের ঘটনা থেকে আহরিত। কাহিনিতে শুকুর চান তথা তাবৎ নানকারদের জাগরণকে উসকে দিতে যে ছিল তৎপর। শরীফের বাবা শুকুর চানের কপালে দড়ির মতো দাগ বিষয়ে প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যে চরিত্র মন্তব্য করে, ‘মাইর খাইলে মাইর দেওয়ার তরিকা জানা লাগে।

ওদিকে, জমিদার-মিরাশদারদের কুনজর থেকে কন্যাকে বাঁচাতে অনেক আগেই মতিজান আম্বিয়াকে গোপনে পাঠিয়ে দিয়েছিল অনেক দূরের গ্রামে, যেখানে নানকারীর বিরুদ্ধে মিছিলের অগ্রভাগে তাকে পাওয়া যায়। তবে দেশভাগের পরে জমিদার-মিরাশদারদের অত্যাচারের সঙ্গে পুলিশি হামলাও সহ্য করে নানকার প্রজারা। আর অবর্ণনীয় অত্যাচারের ঘায়ে ছেলে শুকুর চানের হাত ধরে মা মতিজান নানকারীর রাজ্য থেকে বাঁচার আশায় নৌকায় চেপে বসে। অসুস্থ শরীরে ইচ্ছে ছিল মরতেই যদি হয় তবে নানকারীর বাইরে গিয়ে মরবে। মতিজান তা পারে বটে। মেঘনা পাড়ের যেখানে নানকারী নেই সেখানে সদ্যমৃত মতিজানের কবর হয়।

কেবলমাত্র নানকারী নিয়মের জন্য একটা পরিবারের উপরে ঘটা যাবতীয় অত্যাচারের আর ভাগ্য বিড়ম্বনার চিহ্ন যেন বয়ে বেড়ায় একা শরীফ। না অফিসের অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারে, না বাড়িতে স্ত্রী মুনিরার সঙ্গে সহজ হতে পারে। অথচ হঠাৎ আবার কোথাও গোপনে প্রতিবাদ উসকে দেবার চেষ্টা করে। নিজের সে ব্যবহারের যুক্তি নিজেই খুঁজে পায় না। তারপর একদিন অফিসের অন্যায়ের বিরুদ্ধে ফুঁসে ওঠা এক মিটিং আর ভাষণরত কণ্ঠস্বরের মধ্যে দিয়ে উপন্যাসটি পরিণতিতে পৌঁছায়। শরীফের মাথার মধ্যে ঢুকে পড়ে প্রতিবাদের ভাষা, অনুরণনে সে বিস্মিত হয় তবে শান্ত থাকে।

সমধর্মী উপন্যাস ও তুলনামূলক আলোচনা:

কার্ল মার্ক্সের তত্ত্বে শোষক ও শোষিতের, পুঁজিপতি ও সর্বহারার শ্রেণিসংঘাতের কথা উল্লেখ করা হয়। পুঁজির মালিকানা সংক্রান্ত বড়ো পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেয়া হয়। সর্বোপরি, বলা হয় জগৎ বদলের কথা এবং দাস বা সর্বহারা কিংবা প্রলেতারিয়েতের কথা, যাদের কেবল শৃঙ্খল ছাড়া হারাবার কিছু নেই। আলোচ্য উপন্যাসে ‘নানকার’ জনগোষ্ঠী সেই প্রলেতারিয়েতের চিহ্ন বয়ে বেড়ায়। দিনের পর দিন সংগ্রামের মধ্যে দিয়ে তারা নিজেদের জন্য নতুন পৃথিবী গড়ার স্বপ্ন দেখে।

নিপীড়ন, বিপ্লব ও বিদ্রোহ অবলম্বনে পৃথিবীময় কত উপন্যাস লেখা হয়েছে তার হিসেব নেই। তবে কিছু উপন্যাসের কথা হয়ত ‘বিপ্লব ’ শব্দটি উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গেই আমাদের চিন্তায় চলে আসে। কারণ, সেসব কাজ এতই মহৎ কলেবরের এবং এতটাই সাড়াজাগানো যে তাকে ভুলে থাকার উপায় নেই। বিশ্বে যে উপন্যাসের মাধ্যমে সর্বপ্রথম সাহিত্যে নতুন এ ধারাটির সংযোজন হয়েছিল, তা ছিল মাক্সিম গোর্কির উপন্যাস, মা (১৯০৬)। সাড়াজাগোনো অক্টেবর সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পূর্বের রাশিয়ার উত্তেজনাকর জীবন মা উপন্যাসের পটভূমি যা রাশিয়ার কৃষক বিদ্রোহ আর পোটেমকিন নাবিক বিদ্রোহের ঘটনায় পরিণতি পায়। জারশাসিত রাশিয়ায় ভূমিদাসপ্রথার বিলুপ্তি ঘটলেও তা কৃষককে সামন্ত্রশ্রেণির নাগপাশ থেকে মুক্ত করতে পারেনি তাই সেখানে সাধারণ মানুষের অধিকার বলতে কিছু ছিল না। মা উপন্যাসের এই পটভূমি নিশ্চয় যুগে যুগে ঔপন্যাসিকদের বিদ্রোহের ঞটনা নিয়ে উপন্যাস লিখতে উৎসাহিত করেছে। অন্যদিকে, দাসপ্রথার কথা বলতে গেলে, অ্যালেক্স হ্যালির রুটস: দ্য সাগা অফ অ্যান আমেরিকান ফ্যামিলি (১৯৭৬) বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। কেন্দ্রীয় চরিত্রে আঠারো শতকের একজন আফ্রিকান দাস যাকে আমেরিকায় কিনে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, তার জীবন বর্ণিত হয় এই উপন্যাসে। এই উপন্যাসের ধারাকে অনুসরণ করে অসংখ্য উপন্যাস লেখা হয়েছে পরবর্তী কালে, তার মধ্যে, নাদিন গোর্ডিমারের বার্গার’স ডটার (১৯৭৯), অ্যালিস ওয়াকারের কালার পার্পল (১৯৮২), টনি মরিসনের বিলাভড (১৯৮৭)-এর কথা উল্লেখ না করলেই নয়।

আমাদের জনপদের উপন্যাস সামগিক্র তাৎপর্যে ও বিষয়-রচনারীতিতে বরাবর নিজস্ব জীবনাচরণ, সাংস্কৃতি ও বোধকে ধারণ করে চলেছে। এর উপরে বিদেশি সাহিত্যের প্রভাব কখনো পড়েছে প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে। তবে সেভাবে বলতে গেলে প্রধানত অসম জীবনব্যবস্থা, রাজনীতির লোভী চরিত্র, সামস্তবাদ বা বুর্জোয়া নীতি, সমাজের উচ্চশ্রেণি বনাম আমজনতা, কৃষক-মজুরের দীনতা, ধর্মীয় গোড়ামি, রাষ্ট্রীয় জুলুম, সামরিক শাসনের কপট চেহারা, ইত্যাদি আমাদের উপন্যাসে ব্যাপকভাবে এসেছে। বেশিরভাগ উপন্যাস যে বিষয়গুলো যথাযথভাবে প্রতিফলন ঘটিয়েছে কিংবা শিল্পসম্মতভাবে উপস্থাপন করতে পেরেছে তা বলা কঠিন। তবে জীবনবোধের জায়গা থেকে দেখলে, উল্লেখ করার মতো অনেক উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে বিদ্যমান।

তলকুঠুরির গান উপন্যাস আলোচনা প্রসঙ্গে অবলীলায় বলা যেতে পারে নিম্নবর্গের মানুষের জীবনাচরণ উপন্যাসের বিষয় হয়ে ওঠার তাৎপর্যের কথা। সেভাবে বলতে গেলে উনিশ শতকের প্রারম্ভ পর্যন্ত নিন্মবর্গের মানুষের জীবনালেখ্য ছিল উচ্চবিত্তীয় এবং সামন্ত ধারায় বর্ণিত। তার আগের প্রধান লেখকদের, যেমন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের উপন্যাসে সরাসরি এ অ লের জীবন উঠে এলেও তা কিছুতেই ইউরোপীয় সাহিত্যের আবেশমুক্ত নয়। পরে সেই ধারাকে সরিয়ে নতুন ধারার আবির্ভাব ঘটেছিল তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়, মানিক বন্দোপাধ্যায়, বিভূতিভূষণ বন্দোপাধ্যায়, মানিক বন্দোপাধ্যায়, সতীনাথ ভাদুড়ি, অদ্বৈত মল্লবর্মন, কমলকুমার মজুমদার, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ এবং আরো অনেক ঔপন্যাসিকের লেখার মাধ্যমে। তাদের উপন্যাসে নিন্মবিত্তের মানুষেরা নিজেই নিজেদের কথা বলে, মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের কণ্ঠে বলে না। যে কারণে তাদের রচনায় দীর্ঘকাল ধরে উপেক্ষিত ও অবহেলিত নিন্মশ্রেণির মানুষের সংবেদনশীল উপস্থিতি লক্ষণীয় হয়ে ওঠে।

সমাজের নিন্মশ্রেণির মানুষকে শোষনের কথা যেখানেই বর্ণিত হয়েছে সেখানেই প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে এসেছে তা থেকে উত্তোরণের আভাস। আর তাই এই অ লে ক্রমাগত ঘটে যাওয়া অগুনতি বিদ্রোহ বিভিন্ন কল্পকাহিনির উপজীব্য বিষয় হয়েছে। তলকুঠুরির গান সেই ধারাকে সমর্থন করেই রচিত। প্রসঙ্গক্রমে উল্লেখ করা যেতে পারে সেই ১৮৫৮ সালের নীল বিদ্রোহের ঘটনাকে কেন্দ্র করে নীলদর্পণ (১৮৬০) নাটকটি। দীনবন্ধু মিত্রের রচিত এই নাটক কত লেখক-ঔপন্যাসিককে বিদ্রোহের পূর্বাভাস আর পরিণতি নিয়ে লিখতে অনুপ্ররেণা যুগিয়েছে তার কোনো সীমা নেই। মাইকেল মধুসূদন দত্ত নাটকটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় নাটকটিকে তুলনা করেছিলেন হ্যারিয়েট বিসারের আঙ্কল টম’স ক্যাবিন (১৮৫২)-এর সঙ্গে। প্রাচীন এইসমস্ত রচনার কারণেই ক্রমাগত বাংলা সাহিত্যের ঔপন্যাসিকেরা একের পর এক বিদ্রোহের কাহিনিনির্ভর সফল উপন্যাস পাঠককে উপহার দিয়েছেন। সতীনাথ ভাদুড়ী যেমন বি ত মানুষদের একজন হয়ে যান ঢোঁড়াই চরিত মানস (১৯৪৯, ১৯৫১) উপন্যাসে। একইসঙ্গে অখ- ভারতের ঔপনিবেশিক রাজনীতি আর সামন্ততন্ত্রকে ব্যক্ত করেন উপন্যাসের দুই খণ্ডে। অন্যদিকে, সাবিত্রী রায় হাজং অ লের তেভাগা আন্দোলনের পটভূমিতে রচনা করেছিলেন পাকা ধানের গান, পরপর যার তিনটি পর্ব পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে প্রকাশিত হয়। পরবর্তী কালে, তারাশঙ্কর বন্দোপাধ্যায়ের উপন্যাস, অরণ্যবহ্নি (১৯৬৬)-তে তিনি তুলে ধরেন ঐতিহাসিক সাঁওতাল বিদ্রোহের কাহিনি। এর সামান্য পরে সত্যেন সেন রচনা করেন বিদ্রোহী কৈবর্ত (১৯৬৯) উপন্যাসটি। এই উপন্যাস পাল যুগে উত্তর বঙ্গের বরেন্দ্র অ লের শূদ্রস্থানীয় মানুষের বিদ্রোহ নিয়ে রচিত। পরবর্তী কালে, আদিবাসীদের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি উপস্থাপন করে লেখায় সিদ্ধহস্ত মহাশ্বেতা দেবীও কৈবর্ত বিদ্রোহ নিয়ে একটি উপন্যাস রচনা করেন, কৈবর্ত খ- (১৯৯৪)। একইভাবে, সাঁওতাল বিদ্রোহ নিয়েও একাধিক উপন্যাস রচিত হয়েছে, যেমন, স্বর্ণ মিত্র ছদ্মনামে উৎপলেন্দু চক্রবর্তীর লেখা দামিন-ই-কো’র ইতিকথা (১৯৭২) উপন্যাসের কথা উল্লেখ না করলে নেহায়েত অন্যায় হবে। ছাত্রজীবনে নকশালপন্থী আন্দোলনে জড়িয়ে আদিবাসী অ লে কাটানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা লেখক উপন্যাসটির পাতায় পাতায় তুলে ধরেছেন।

বাইরে থেকে দেখে এবং বস্তুত বহু বছর পরে ইতিহাসে সংঘঠিত কোনো কোনো বিদ্রোহের কাহিনি উপজীব্য করে যখন কোনো লেখক উপন্যাস লেখার কাজে হাত দেন তখন নিঃসন্দেহে তাকে পালন করতে হয় সমাজতাত্ত্বিক এবং একইসঙ্গে মনস্তাত্ত্বিকের ভূমিকা। ২০১৫ সালে প্রকাশিত তলকুঠুরির গান উপন্যাসটি লেখক আজকের পরিবেশে শারিরীকভাবে বিচরণ করে গত শতাব্দীর নির্দিষ্ট এক পরিবেশে মানসিক ভ্রমণ করে কাটান। কথাপ্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে, তিতাস একটি নদীর নাম উপন্যাসের লেখক অদ্বৈত মল্লবর্মন যেমন ছিলেন সেই ‘মালো’ সম্প্রদায়েরই সদস্য, যাদের দৈনন্দিন জীবন তিনি উপন্যাসটিতে সুচারুভাবে এঁকেছেন, অথচ মহাশ্বেতা দেবী বা উৎপলেন্দু চক্রবর্তী, কেউ কিন্তু সাঁওতাল সম্প্রদায়ের অন্তর্ভূক্ত ছিলেন না। ঠিক তেমনি, ওয়াসি আহমেদের মোটেও সরাসরি কোনো সংযোগ নেই নানকার সম্প্রদায়ের সঙ্গে। কেবলমাত্র অবহেলিত একটি সম্প্রদায়ের প্রতি গভীর মমতা, সমবেদনা আর সহানুভূতি থেকেই এমন কল্পকাহিনির উদ্ভব সম্ভব।

এক্ষেত্রে, সমধর্মী অন্যান্য উপন্যাসের সঙ্গে ওয়াসি আহমেদের তলকুঠুরির গান উপন্যাসের প্রধান পার্থক্য হলো উপন্যাসটিতে পাশাপাশি অতীত ও বর্তমানের পদচারণা। দুটো সম্পর্কহীন কাল একে অন্যের হাত ধরে হাঁটে তবে কোথায় যেন দুটোতেই এক অভিন্ন সুর বাজে। পাঠক আজকের বর্তমানকে অতীতের নিরিখে বিবেচনা করতে পারে। পড়তে পড়তে পাঠক অনুভব করে যে গত শতাব্দীর ঘটনা যেন আজকের কেন্দ্রীয় চরিত্রকে পরিচালনা করছে। বহু আগে যা ঘটে গেছে তা নিয়েও পাঠকের মনে অনিশ্চয়তাভরা উত্তেজনা তৈরি হয় যেন তার উপরেই নির্ভর করবে বর্তমানের চরিত্রটির পরিণতি। অতীতের বর্ণনায় লেখক সরাসরি ইতিহাস লিপিবদ্ধ করেননি মোটেও, বরং ইতিহাসের সুনির্দিষ্ট গ-ির মধ্যে থেকেই নিজস্ব সৃজনশীলতা দেখাতে সক্ষম হয়েছেন। উপরন্তু, বর্তমানের কাহিনি বর্ণনায় লেখক মূলত মনঃস্তাত্ত্বিক জটিলতার সমাধান করতে চেয়েছেন। একজন মানুষের মাথার ভিতরে পৃথিবীর সবচেয়ে দ্রুতগামী ঝড় বয়ে যেতে পারে যা হয়ত সবসময় লিপিবদ্ধ করা সম্ভব হয় না। তবে লেখক সেই চেষ্টাটি করেছেন। শরীফের কথা হয়ত তার নিজের জবানীতে (স্ট্রিম অফ কনশাসনেস) লেখা যেত কিন্তু লেখক পুরো উপন্যাসেই নিজেকে রেখেছেন নেপথ্য বর্ণনাকারীর ভূমিকায়। আর তাই তার বর্ণনা অত্যন্ত নির্লিপ্ত যা পাঠককে অদ্ভুত এক আকর্ষণে জড়িয়ে ফেলতে পারে। পাঠক যেমন কর্পোরেট দুনিয়ার নিয়মে পিষ্ট জনগোষ্ঠীর একজন হয়ে উঠতে পারে আবার স্মৃতির প্রকোপে পাগলপ্রায় শরীফের জ্বালাও নিজের করে উপলব্ধি করতে পারে।

সাঁওতাল বিদ্রোহ কিংবা কৈবর্ত বিদ্রোহ নিয়ে লেখা উপন্যাসগুলোতে নিম্নশ্রেণিভূক্ত নারীর উপরে অত্যাচার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হিসেবে এসেছে। সত্যিকারের ইতিহাসে নানকার শোষনেরও আরেকটি ভয়াবহ দিক ছিল জমিদার-মিরাশদার কর্ত্তৃক নানকার পরিবারের স্ত্রী-কন্যাদের যথেচ্ছ ব্যবহার। প্রজাদের স্ত্রী-কন্যাদেরকে জমিদারেরা নিজের সম্পত্তি বলে মনে করত। বাড়ি থেকে কন্যাকে উঠিয়ে নিয়ে যাওয়া কিংবা রাতারাতি উধাও করে ফেলা ছিল সাধারণ ব্যাপার। কোনো কোনো ঐতিহাসিকের বর্ণনায় নানকারদের মধ্যে অসন্তোষ ও তা চরম বিদ্রোহের দিকে পৌঁছানোর ব্যাপারে প্রধানতম কারণ হিসেবে এই বিষয়টিকে পাওয়া যায়। তবে ওয়াসি আহমেদের উপন্যাসে বিষয়টি সেভাবে আসেনি। আকারে ইঙ্গিতে ওই সমাজের সাধারণ উঠতি বয়সের নারীর পরিণতি এসেছে বটে। তার উপরে ভিত্তি করে চরিত্র আম্বিয়াকে জমিদার পরিবারের কুনজর থেকে বাঁচানোর জন্য গোপনে গ্রামছাড়া করানোর ঘটনা পর্যন্ত বর্ণিত হয়েছে যাতে করে পাঠক বিষয়টির ভয়াবহতা বুঝতে পারে।

উপন্যাসের চরিত্র, শুকুর চানের ভাবনার মধ্যে স্বগোতোক্তির মতো করে উপন্যাসের লেখক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় তুলে ধরেছেন। ইতিহাসে দেখা যায়, উপনিবেশিক আমলের জামিদার-মিরাশদারেরা উপনিবেশিক শক্তির হাতিয়ার হিসেবে কাজ করত। যে অ লগুলোতে নানাকারদের উপরে অত্যাচার হতো তা ছিল অথ- ভারতের প্রত্যন্ত অ ল, যেখানে সরকারি শাসনের বিকেন্দ্রীকরণের ছাপ সেভাবে পড়েনি। কিন্তু ১৯৪৭-এর দেশভাগের পরে নানকারদের যন্ত্রণা আরো বাড়ে। একে তো জমিদার-মিরাশদারেরা অত্যাচারী হিসেবে আগে থেকেই ছিল, নতুন করে যুক্ত হয় স্বাধীন দেশের পুলিশ। কারণ, অত্যাচারী শাসক বরাবরই তার অধীনে থাকা বাহিনিকে দেশের জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করে। তাই প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের কুফল হিসেবে তখন সামান্য বিদ্রোহের ঘটনায় জমিদারদের অনুগত পুলিশ বাহিনিরও মুখোমুখি হতে হয় নানকার-কৃষকদের। কৃষক-নানকার মিলে তখন জমিদার এবং উপরন্তু পুলিশের বিরুদ্ধে লড়াই করে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পুলিশদের পরাস্ত করতে সফলও হয়। তবু হতাশায় শুকুর চান স্বগোতোক্তির মতো যে কথা ভাবে তাতে স্বাধীন দেশে তাদের অবস্থান পরিষ্কার হয়ে ওঠে,

‘খোলা আসমানের নীচে হিন্দুস্থান, পাকিস্থান ভাগাভাগি সারা। দেশ বলতে এখন একটা না, দুইটা। দুইটাই স্বাধীন। স্বাধীন দেশে কি নানকাররাও স্বাধীন? কেউ এসে চোঙে ফুকে ঘোষণা দেয়নি। নাকি দেবে? নানকারদের আজাদি আর দেশের আজাদি কি আলাদা?’

অ ল বা জাতিগোষ্ঠীর বিদ্রোহ ভিত্তিক নানান বিখ্যাত উপন্যাসে যেমন আঞ্চলিক ভাষা অবধারিতভাবে এসে পড়ে, তলকুঠুরির গান উপন্যাসে প্রচুর ডায়ালগের উপস্থিতি ছাড়াও ওয়াসি আহমেদ সিলেট অ লের ভাষায় আ লিকভাবে ব্যবহৃত আবরি, ফারসি এবং উর্দু শব্দ তার বর্ণনায় মিলিয়ে দিয়েছেন। প্রমিত বাংলার বর্ণনার মধ্যে ইচ্ছকৃত মিলিয়ে দেয়া শব্দগুলো পাঠকের কাছে মোটেও দুর্বোধ্য লাগে না। বরং মনে হয় যেন ওই শব্দ ছাড়া সুনির্দিষ্ট আবহ তৈরি সম্ভব ছিল না। লেখকের বর্ণনার মুন্সীয়ানা তাই বিচিত্র শব্দ নিয়ে খেলার প্রবণতার মধ্যে সহজে ধরা পড়ে।

তবে শুধু শব্দ নয়, বর্ণনার ফাঁকে ফাঁকে সিলেটের নিজস্ব বুলিতে রচিত ধাঁধা, শ্লোক বা গীতও জুড়ে দিয়েছেন লেখক। উপন্যাসটির গম্ভীর চলন আর বিষণ্ণ আবহে ক্ষণে ক্ষণে তাতে একরকমের বৈপরিত্যের উদ্ভব ঘটে, গীতিকবিতার আমেজ পাঠক উপভোগ করে। যেমন, চুয়াল্লিশতম চ্যাপ্টারে গিয়ে কাহিনির স্রোত যখন ঘুরেফিরে শুরুর ঘটনা ছোঁয়, সেই যেখানে আম্বিয়া জেলার কর্ণধারকে নালিশের উদ্দেশে হারিকেন হাতে নারী মিছিলের নেতৃত্বে রাস্তা ধরে হেঁটে যাচ্ছিল, সেখানে দারুণ মজার শ্লোক এসে পড়ে। অত্যাচারিত মানুষের মনের অবস্থার বিপরীতে ক্ষমতার সিংহাসনে আসীন মানুষের নির্লিপ্ততার প্রমাণ সে শ্লোক,

‘কানা রাজার চোউখোর ঠুলি
দিতাম রে ভাই খুলি
...
দিন-দুইফরে হারিকেনের সইলতা জ্বলে
আরো জ্বলে লাল দরিয়া আন্ধার বুকর তলে,
মা-বইনোর পাওয়ের ভারে
জমিন কাঁপে সুরমা গাঙের ধারে,
কানা রাজার চোউখোর ঠুলি...’

পরিশেষে:

ওয়াসি আহমেদ নিজের এক সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেছিলেন যে এই উপন্যাসের বীজ তিনি দশ বছর ধরে মাথায় নিয়ে ঘুরেছেন। অর্থাৎ, ধরে নেয়া যায় যে উপন্যাসটি একটি দীর্ঘকালের পরিকল্পনার ফসল। সাক্ষাৎকারে তিনি এ-ও বলেছিলেন যে এটিই তার লেখক জীবনের জটিলতম একটি রচনা। অবশ্য এই বিষয়গুলো পাঠক উপন্যাসটি পড়লে এমনিতেই অনুভব করতে পারেন। এই উপন্যাসের জন্য তাকে দিনের পর দিন পরিশ্রম করতে হয়েছে, এই বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অত্যন্ত সফল গল্পকার ওয়াসি আহমেদ উপন্যাসের ক্ষেত্রেও সমান দক্ষতা দেখিয়েছেন আগেও, তবে তলকুঠুরির গান যেন তার আগের সমস্ত দক্ষতাকে ছাড়িয়ে গেছে।

গল্পের ক্ষেত্রে লেখকের বর্ণনার ভঙ্গিটি যেমন থাকে শান্ত, ঋজু এবং নির্লিপ্ত, উপন্যাসেও তার ব্যাতিক্রম ঘটেনি। নিজের গল্পের মতোই টানটান গদ্যে তিনি দীর্ঘ উপন্যাসটি শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত টেনে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছেন। তার লেখায় কোথাও বাহুল্য নেই, অতিরিক্ত শব্দ বা বাক্য ব্যবহারের অভ্যাস নেই। নিতান্ত মনঃস্তাত্ত্বিক বিষয়ের বর্ণনায়ও তার আটোসাটো কলম থাকে নির্মোহ। আবার, অল্প বাক্যে প্রচ- অত্যাচারের বর্ণনা পাঠকের মর্মমূল নাড়িয়ে দেয় এবং দ্রুত বয়ে যাওয়া শৈল্পিক ছবির মতো রেশ রেখে যায়; যেমন, কুবাত নামের এক নানকারকে অত্যাচারের পরবর্তী দৃশ্য লেখক ছোট্ট করে বর্ণনা করেন,

‘পুকুরের পুবপাড়ে জারুলগাছের উঁচু ডালে দুই পা বেঁধে কুবাতকে ঝুলিয়ে রাখা হয়। তক্তাচাপার বদলে এ শাস্তির উদ্দেশ্য ছিল এলাকায় যাতে খবরটা ভালোমতো চাউর হয়। হয়েও ছিল। পাতাঝরা ন্যাংটো জারুলের ডালে বাদুড়ের মতো ঝুলন্ত কুবাতকে বহু দূর থেকে দেখা যাচ্ছিল। ঝুলন্ত অবস্থায় পিঠে ফালি ফালি ঢেউখেলানো লালচে টানা দাগ রোদের ছাটে বা তার নিজের নড়াচড়ায় বাইম মাছের মতো এঁকেবেঁকে নাচছিল।’

তলকুঠুরির গান উপন্যাসে দুই ভিন্ন জগতের সমান্তরালভাবে এগিয়ে যাওয়ার গতির বিষয়ে একটি কথা না বললেই নয়। পাঠকের এমন মনে হলেও হতে পারে যে দুইটি জগতের চলনে যেন অসম গতিসম্পন্ন। অর্থাৎ, কখনো এক কালের কাহিনি একটু বেশি এগিয়ে যাচ্ছে, আরেক কালকে দীর্ঘসময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। সাধারণত দু’-তিনটা ডাইমেনশন নিয়ে লেখা বিখ্যাত উপন্যাসগুলোতে চ্যাপ্টারের বিভাজনের ক্ষেত্রে শব্দসংখ্যার ছন্দ দেখতে পাওয়া যায়, এই উপন্যাসে কোথাও দু’এক স্থানে তা অনুপস্থিত। এরকম বিলম্বিত ছন্দে দুই কালকে পটভূমি ধরে উপন্যাস লিখেছেন উইলিয়াম ফকনার, হুলিও কোর্তাসার, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় এবং আরো অনেক প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক।

টানটান গদ্যের বিশাল কলেবরের উপন্যাসটি পড়ার পরে এরকম অনুভূতিও হয় যে এ যেন আরো বড়ো হতে পারত। বর্ণনা বিদ্রোহ বা আন্দোলনের কার্যক্রমের আরো গভীরে যেতে পারত। ফলশ্রুতিতে অসংখ্য ডায়ালগ আসতে পারত যাতে করে জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রায় আন্দোলনের ভূমিকা পাঠকের সামনে আরো বেশি জীবন্ত হয়ে ওঠে। কিন্তু গভীরভাবে ভাবলে তা না এসে কোনো ক্ষতি হয়নি। লেখক ওয়াসি আহমেদের বর্ণনার যে ধারা তাতে তাল মিলিয়ে চলতে পাঠকের এতটুকু ক্লান্তি হয় না। তিনি এই উপন্যাস লেখার সময়ে বর্ণনাকারী বা ন্যারেটর হিসেবে ঘটনার ভিতরে ঢুকে যাননি, বরং পাখির চোখ দিয়ে দেখেছেন দূর থেকে। আর সুদূর সে দৃষ্টিতে বড়ো কলেবরের ঘটনার খুঁটিনাটি অল্প কথায় অথচ চমৎকারভাবে ধরা পড়েছে।

ক্রিয়ার কাল নিয়ে অভিযোগ দু’চারটি বিখ্যাত উপন্যাস সম্পর্কে যেমন করা যায়, তলকুঠুরির গানও তার ব্যাতিক্রম নয়। কিছু কিছু স্থানে ক্রিয়ার সামান্য অসতর্ক ব্যবহার দেখতে পাওয়া যায়। ব্যাকরণগত শুদ্ধতার কথা ভাবলে যা সম্পাদনার যোগ্য। উপযুক্ত সম্পাদনায় তা আরো সঠিক হতে পারে বটে, তবে এতে পাঠকের পাঠের অভিজ্ঞতায় বড়ো ধরনের চির ধরায় না।

পরিশেষে বলা যায় উপন্যাসের সমাপ্তির কথা। শেষে এসে উপন্যাসটি অন্তিম সংগ্রাম আর জাগরণের কথা বলে যায়, এটিই এই উপন্যাসের মূল শক্তি। নানকার জনগোষ্ঠীর কাহিনির স্মৃতির ঘোরে ডুবে থেকেও প্রধান চরিত্র, শরীফ একসময় নিজের ভিতরে প্রতিবাদের আওয়াজ শুনতে পায়। উপন্যাসের সমাপ্তি তাই ইঙ্গিত দিয়ে যায়, নিজ নিজ সংগ্রামে নিমজ্জিত প্রত্যেকটি মানুষ কোনো না কোনোদিন প্রতিবাদের অনুরণন নিশ্চয় শুনতে পাবে।


উপন্যাস: তলকুঠুরির গান
লেখক: ওয়াসি আহমেদ
প্রকাশক: প্রথমা প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ: অমর একুশে বইমেলা ২০১৫
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ২৫৬
মূল্য: ৪৫০ টাকা
ISBN: ৯৭৮ ৯৮৪ ৯১২০০ ৯৪ 
 
----------------- 

আলোচক পরিচিতি:
আফসানা বেগম
কথাসাহিত্যিক। অনুবাদক।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন