সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

ওয়াসি আহমেদ'এর গল্প : লোকমান হাকিমের স্বপ্নদর্শন


রিকশা ভাড়া মেটাতে গিয়ে লোকমান হাকিমের মনে হলো দিনটা ভালো যাবে। রিকশাওয়ালা ক্যাঁচম্যাচ করল না। দশ টাকার নোটটা বাড়িয়ে যেই জাদরেল গলায় বলল- পাঁচ টাকা দাও, রিকশাওয়ালা সুড়সুড় করে এক টাকার তিনটা আর দুই টাকার একটা ময়লা নোট ফেরত দিয়ে দিল। টাকা ক'টা হাতে নিয়ে লোকমান হাকিম ঘাড় ঘুরিয়ে স্ত্রীকে দেখল। স্ত্রীর নজর অন্য দিকে, গেটের ভেতরে, অনেকটা ভেতরে, প্রায় সিঁড়ির কাছাকাছি। সেখানে দারোয়ান গোছের দুটো লোক কী নিয়ে কানাকানি করছে আর মুখ লাল করে পান খাচ্ছে।

স্ত্রীকে নিয়ে লোকমান হাকিম গুটিগুটি পায়ে সিঁড়ি পর্যন্ত চলে এল। লোক দু’জন এতক্ষণে তাদের খেয়াল করল। দু'জনের মধ্যে টিঙটিঙে আর বেগুনি শার্ট পরা লোকটা মুখভর্তি পিক সামলাতে সামলাতে ঠোঁটজোড়া চিকন আর গোল করে জানতে চাইল- কার কাছে যাইবেন?

লোকমান হাকিম বিরক্ত হলো। গত দুই বছর ধরে এখানে আসছে, কার কাছে যাবে, সে জানে না! সে জবাব দিল না, ফিরে তাকাল না পর্যন্ত। তবে সামনে পা বাড়াতেই লোকটা ফোড়ন কাটল- ডাক্তার কিন্তুক পাঁচজন। লোকমান হাকিমের বিরক্তির পরিমাণটা আরো বাড়ল। স্ত্রীর দিকে ফিরে, 'চলো' বলে সিঁড়িতে পা রাখতে যাবে, স্ত্রী বলল- অ্যাই, দেখো...

লোকমান হাকিম দেখল। স্ত্রীর দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে সিঁড়ির গোড়ায় দুই সারি কচু গাছের ওপর। সব মিলিয়ে দশবারোটা গাছ। পাতাগুলো অন্যরকম, চক্রাবক্রা। গাঢ় সবুজের ওপর টকটকে লাল ফোঁটা, ছোট-বড়ো নানা মাপের ফোঁটা। এমন রংচঙের কচুগাছ লোকমান হাকিম জীবনে দেখেনি, তার স্ত্রী দেখবে কোত্থেকে। কিন্তু কচু গাছের মতো বেহায়া, নিম্নশ্রেণীর উদ্ভিদের পক্ষে এমন সাজগোজর ব্যাপারটা সে সহজভাবে নিতে পারল না। মনে মনে সে নিশ্চিত হয়ে গেল এটা এই শালাদের কাজ, পানের পিক ফেলে গাছগুলোর এ অবস্থা করেছে। স্ত্রী তাকিয়ে আছে গাছগুলোর দিকে, মুখটা আহ্লাদে ডগোমগো, পারলে এখুনি কোলে তুলে ‘সোনা, আমার সোনা' বলে গালে কপালে চুমু খায় আর কি! একটু আগের বিরক্তিটা এবার পুরোদস্তুর রাগে রূপ নিল। লোকমান হাকিম চাপা গলায় একটা জাদরেল ধমক ছুড়ল-- বিলকিস, চলো। রেগে গেলে তার গলায় এক ধরনের ঘর্ঘর আওয়াজ ওঠে। স্ত্রী বিলকিস বানু তা জানে। দু’জন এরপর একটার পর একটা সিঁড়ি টপকাতে থাকে। পেছন থেকে বেগুনি শার্ট বলে ওঠে- ও, নিজামুদ্দিন স্যারের কাছে যাইবেন? সোজা তিনতলা।

দেড়তলা পর্যন্ত এসে লোকমান হাকিমের হাঁপ ধরে গেল! জোরে পা চালিয়েছে বলেই হয়তো। চারপাশে ওষুধ-ওষুধ গন্ধ। হাঁপ ধরলে লম্বা শ্বাস নিতে হয়; কিন্তু এখানে তা করলে ওষুধের গন্ধে ফুসফুস ঝাঁজরা হয়ে যাবে। বিলকিসের হাবভাবে ক্লান্তি নেই, দুলকি চালে চলছে। স্বামীকে থেমে পড়তে দেখে ঝট করে রেলিং ধরে ঝুঁকে বলল- কী?

-কী আবার!

—দুইটা সিঁড়ি না ভাঙতে এই অবস্থা!

—ঘরের বাইরে এসে পাগলামিটা একটু কম করলে তো পারো। জীবনে কচুপাতা দেখোনি?

--দেখব না কেন? তবে এ জাতের পাতা এই প্রথম দেখলাম। তুমি দেখেছ নাকি যে আমাকে বলছ!

জবাবে লোকমান হাকিম জোরে দু'বার নিশ্বাস ফেলল, তারপর বিড়বিড় করে বলল- দারোয়ানটা পর্যন্ত বুঝল পাগলের ডাক্তারের কাছে যাচ্ছি।

দুপুরবেলা অফিসে বসেই লোকমান হাকিম টের পাচ্ছিল ভেতরে উত্তেজনা হচ্ছে। কাজকর্মে মন বসাতে পারেনি, অস্থির-অস্থির লাগছিল। কখন ঘরে ফিরবে- গোসল, খাওয়াদাওয়া সেরে রেডি হয়ে বিলকিসকে নিয়ে বেরুবে, চিন্তাটা সরাক্ষণ মাথায় ঘুরঘুর করছিল। দুটো চল্লিশে ঘরের দরজায় কড়া নাড়ার সময়ও মনে হয়েছে তাড়াতাড়ি করা দরকার। অথচ ডাক্তারের সঙ্গে অ্যাপেয়েন্টমেন্ট সেই বিকেলে। অস্থিরতার কারণ যে নেই তা-না, বিলকিস পরশু রাতেও স্বপ্নটা আবার দেখেছে। এই নিয়ে কম করে হলেও সাত-আট বার দেখল।

তিনতলায় উঠে লোকমান হাকিম নাস্তানাবুদ হয়ে পড়ল। গত দুই বছরে চারবার এখানে এসেছে। কোনো বারই সিঁড়ি ভাঙতে এত পরিশ্রম করতে হয়নি। এবারই প্রথম সে লক্ষ করল সিঁড়িগুলো সাধারণ সিঁড়ি না, ধাপগুলো স্বাভাবিকের চেয়ে। অনেক উঁচু। সেগুনবাগিচায় এজিবি বিল্ডিং-এ তার অফিসটাও তিন তলায়, সেখানে রোজই কয়েকবার, অন্তত চার থেকে ছয় বার, তাকে সিঁড়ি ভাঙার কাজ করতে হয়। তবে এমন অবস্থা কখনোই হয়নি।

তিনতলায় ওঠার মুখে কালো রং করা কাঠের ওপর সাদা অক্ষরে ডাক্তার নিজামুদ্দিন এম আর সি পি-- লন্ডন এর নেমপ্লেট। পরপর দুটো ঘর। পাশাপাশি হলেও একটার ভেতর দিয়ে অন্যটায় যেতে হয়। প্রথম ঘরটাতে এরই মধ্যে পনের-ষোলজন মানুষ চেয়ার দখল করে বসে আছে। একটামাত্র চেয়ার দেখা গেল ফাঁকা, বেতের চেয়ার, ছানি আলগা হয়ে এক দিকে বেঁকে আছে। দেখেশুনেই এটায় কেউ বসেনি। বিলকিস হাত ধরে লোকমান হাকিমকে চেয়ারটায় বসতে ইঙ্গিত করতে সে না বসে পারল না। এত ক্লান্ত লাগছে, জোরে শ্বাস না টেনে উপায় নেই- বাতাসের বদলে ওষুধ ঢুকবে, ঢুকুক।

মিনিট পাঁচেক একটা ঘোরের মধ্যে পর করে লোকমান হাকিম চোখ খুলল। খুলেই নিজের কাণ্ড দেখে বোকা বনে গেল। এসেছে রোগী নিয়ে, গত দিন অফিস পালিয়ে এখানে নাম লিখিয়ে গেছে সাত নম্বর সিরিয়েল; অথচ এখন তার হাবভাবে কে বলবে, সে নিজেই রোগী না! এদিকে ওদিকে তাকিয়ে সে বিলকিসকে পেল না। ডানে-বাঁয়ে, মুখোমুখি সব অপরিচিত মুখ মহিলা, পুরুষ। এক কোণে বছর দশেকের একটা ছেলেও রয়েছে। বিলকিস এদের মধ্যে নেই, ফাঁকতালে সটকে পড়েছে। উঠবে উঠবে করে সে উঠল না। চেয়ারটা ভাঙা হলেও বসার কাজ চলছে, উঠলে বেদখল হয়ে যাবে। প্রথমে তো ভাঙা দেখে কারো আগ্রহ হয়নি বসার, তবে তাকে একবার বসতে দেখার পর কারো না কারো প্রেরণা জাগবেই।

লোকমান হাকিম বসে বসে কিছুক্ষণ লোকজন দেখল, দশ বছরের ছেলেটাকে দেখল বিশেষ করে। ওপাশের ঘর আর এই ঘরের মাঝখানে দুই পাট দরজা একটুখানি ফাঁকা, সাদার উপরে সবুজ স্ট্রাইপ পর্দা দরজার ফাঁকে সাপের মতো দোল খাচ্ছে। পর্দা আর মেঝের মাঝখানে বিঘত পরিমাণ জায়গায় ভেতর থেকে আসা টিউবলাইটের নরম, ঠাণ্ডা আলো। লোকমান হাকিম খেয়াল করল তার চোখ দুটা ঘুরেফিরে মানুষজনের মুখ, দশ বছরের ছেলেটার মুখ, পাটভাঙা দরজায় দাঁড়ানো বেয়ারার মুখ, দেয়ালে বসানো ‘আপনার শিশুকে টিকা দিন'-এর মুখ, নো স্মোকিং-এর ক্রসচিহ্নের ভেতর তেড়েফুঁড়ে ওঠা সিগারেটের মুখ হয়ে বারবার পর্দার তলায় গোটানো ঠাণ্ডা আলোর ওপর গিয়ে পড়ছে। এমন সময় ভেতরের ঘর থেকে দু'জন লোক বেরিয়ে আসতে দরজাটা হাঁ হয়ে গেল, সঙ্গে সঙ্গে পর্দার নিচে লেজ গোটানো আলোটাও লাফিয়ে উঠল। দরজার পাট দুটো আবার ঘনিষ্ঠ হতে আলোর রেখাটা অদৃশ্য হয়ে গেল। যে দু’জন বেরিয়ে এল, তাদের মধ্যে কে যে রোগী, অর্থাৎ পাগল, বোঝা মুশকিল। দু'জনই বেশ স্বাস্থ্যবান, হাসিখুশি, একজনের হাতে ধরা কিছু কাগজ। ভেতরের ঘর থেকে এমন সময় টুং করে মিষ্টি আওয়াজ হলো, অনেকটা ওই নরম, ঠাণ্ডা আলোটার মতো। দরজায় দাঁড়ানো বেয়ারা এবার একটা নাম ডাকল। লোকমান হাকিম হঠাৎ অস্থিরতা অনুভব করল। সাত নম্বর কি ডাকা হয়ে গেছে? গতকাল অফিস থেকে ভেগে নাম লেখানোর পর আর অফিসে ফিরে যায়নি। মনে হয়েছিল, অফিস করার চেয়ে বাসায় গিয়ে বিলকিসকে খবরটা দেয়া জরুরি। খবর শুনে বিলকিস কী রকম অদ্ভুত চোখে তাকিয়ে বলেছিল- আবার পাগলের ডাক্তার। কিন্তু এখন বিলকিস গেল কোথায়? লোকমান হাকিম বুঝতে পারল, ভেতরে তার একটু একটু করে রাগ জমতে শুরু করেছে। পর্দার তলায় এতক্ষণ সুন্দর আলোটা ছিল, আলোটা আর নেই ভাবতে রাগটাও যেন ডালপালা ছড়াতে লাগল।

লোকমান হাকিম উঠল, আর ওঠামাত্র বুঝতে পারল, ভেতরের রাগ-ঝাল ছাপিয়ে তার দুই হাঁটুতে ভর করে আছে লজ্জা। লাজুক পায়ে দরজা আগলে দাঁড়ানো বেয়ারার কাছে গিয়ে গলা নামিয়ে বলল- ভাই, কত চলছে?

বেয়ারা মুখ উদাস করে বলল- সময় হলে ডাকব।

একটা চড় লাগাতে ইচ্ছা করলেও লোকমান হাকিম সামলে নিল। বলল- তা তো জানি, তা তো জানি, তবু সিরিয়েলটা ---

--চার।

ভীষণ নিরাপদ বোধ করে লোকমান হাকিম ঘুরে দেখল চেয়ারটা বেদখল হয়ে গেছে। বোরখা-পরা এক মহিলা চেয়ারটাকে কালো গিলাফে ঢেকে দিয়েছে। সে কিছু মনে করল না। নিজের মনোভাবে সে নিজেই অবাক হলো। মহিলা মানুষ, গরমের মধ্যে পা থেকে মুণ্ডু পর্যন্ত ঢেকে আছে, কতক্ষণ আর দাঁড়াবে! বসুক, ফ্যানের বাতাস-টাতাস ওখানে লাগবে না, তবু পা জোড়া তো হালকা হবে, বসুক।

ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় পা দিতেই লোকমান হাকিম দেখল বিলকিস পেছন ঘুরে দাঁড়িয়ে। কোমর প্যাঁচানো নী বুটিদার শাড়ি বাতাসে অল্প-অল্প দুলছে। গেলবার বকরি ঈদে সে নিজে পছন্দ করে গাউসিয়া থেকে শাড়িটা কিনে দিয়েছিল। শাড়ির কথা ভাবতে গিয়ে পরমুহূর্তেই তার খটকা লাগল, বকরি ঈদে শাড়ি দিতে যাবে কোন দুঃখে! এক ভাগা কোরবানিতে বাড়িওয়ালার সঙ্গে শামিল হতেই বোনাসের টাকাকড়ি হাওয়া। তাহলে? ... ও মনে পড়েছে, বকরি ঈদের সঙ্গে শাড়িটা জড়িয়ে ফেলা আহাম্মুকি ছাড়া কিছু না। শাড়িটা গাউসিয়া না, মৌচাক থেকে কিনে দিয়েছিল তার বড় বোন, রুবি। সেবার খুলনা থেকে ঢাকায় সপরিবারে বেড়াতে এসে তিন দিন ছিল তাদের তল্লাবাগের বাসায়। দুলাভাই আর বোনকে শুতে দেওয়া হয়েছিল খাটে, বাকিরা লোকমান হাকিম, বিলকিস আর বোনের দুই বাচ্চা মেঝেতে চাদর বিছিয়ে । ভালো ঘুম হয়েছিল রাতে, মশা-টশা একদম ছিল না। ঠিক এ রকম একটা নীল বুটিদার কবে যে গাউসিয়া থেকে কিনে দিয়েছিল, অনেক চেষ্টা করেও লোকমান হাকিম মনে করতে পারল না।

ঘরের তুলনায় বারান্দাটা ভালো। কেন যে মানুষগুলো ভেতরে গিজগিজ করছে, লোকমান হাকিম ভেবে পেল না। চওড়া বারান্দা, বাইরে থেকে ঠাণ্ডা বাতাস আসছে। বিলকিস ঝুঁকে আছে বারান্দার রেলিঙে কনুই চেপে, নিচের দিকে তাক করা চোখ, যেন একটা ঝুলন্ত দড়ি বেয়ে দৃষ্টিটা নেমে গেছে সোজা নিচে। লোকমান হাকিমের সন্দেহ হলো, নির্ঘাৎ কচুপাতার ওপরই ওর চোখ, কিন্তু এখান থেকে পাতাগুলো কি দেখা যাচ্ছে? পায়ে পায়ে সে রেলিঙের কাছে গিয়ে দাঁড়াল, আর তখনি বিলকিস লোকমান হাকিমকে তার দৃষ্টি অনুসরণ করার সুযোগ না দিয়ে, যেন জানে লোকমান হাকিম চোরের মতো তারই পাশে দাঁড়ানো, ঘুরে বলল- সাত নম্বর আসতে এত দেরি!

—কোথায় দেরি? এই না আসলাম। এখন চার চলছে- পাঁচ, ছয়, তারপর আমরা।

—আমরা মানে?

—আমি সঙ্গে যাব না! বরাবরই তো যাই, যাই না? ডাক্তার কী না কী জানতে চান! তাছাড়া...

লোকমান হাকিম একটু দ্বিধা করল, বিলকিসের চোখের দিকে তাকাল, তারপর বলেই ফেলল। তাছাড়া পরশু রাতের ঘটনাটা ডাক্তার সায়েবকে বলা দরকার।

--না।

এত জোরের ওপর বিলকিস কথাটা উচ্চারণ করল, লোকমান হাকিম চমকে গেল। তার কথার ওপর জোর খাটানোর অভ্যাস বিলকিসের একদম নেই। তার রাগ হলো। তবে বারান্দায়, রেলিঙের কাছাকাছি থাকায়, ঠাণ্ডা বাতাসটা গায়ে লাগায়, রাগটা সে হজম করে ফেলল।

বিলকিস আবার বলল- না, ওসব বলার দরকার নেই।

এবার লোকমান হাকিম ভড়কে গেল। এমন তো করে না। সে রীতিমতো অনুনয় করে বলল- না কেন? একশো টাকা ভিজিট দেব, তুমি নেহায়েত পুরনো পেশেন্ট বলে একশো টাকা কনসেশান, না হলে তো দুশো টাকাই খসতো। একশো টাকা কি কম? এই বাজারেও হাতিরপুলে বেস্ট কোয়ালিটি দেড় কেজি খাসির মাংস পাওয়া যায়।

এতদূর এসে লোকমান হাকিম থামল। গোছগাছ করে কথা বলতে সে একদম পারে না। বিলকিস পারে। বিলকিসকে মাঝে মাঝে কথায় পেয়ে বসে, এমন মুহূর্তে তার চোখের পাতাগুলো কেঁপে কেঁপে মুখের ওপর কী রকম ছায়া ফেলে, লোকমান হাকিমের তখন বুক চিনচিন করে। বিলকিসকে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে বলল- মনের কথা বলতেই তো ডাক্তারের কাছে আসা। গতকাল কী অবস্থায় নাম লেখালাম জানোই তো-- ফরচুনেটলি এও স্যার মেয়ের অসুখ বলে অফিসে আসেননি, না হলে তো বেরতেই পারতাম না। পরশু রাতের স্বপ্নের দৃশ্যগুলো মনে মনে ঠিক করে রাখো, ঠিক এগজেক্ট ফ্যাক্টটা বলা দরকার, ফাস্ট টু লাস্ট যা-যা দেখলে, যেভাবে দেখলে, সব বলবে। জানোই তো, নিজামুদ্দিন ডাক্তারের নাগাল পাওয়া সোজা কথা না, মানুষের মুখে মুখে নাম, পাগলা নিজাম...

শেষ কথাগুলো লোকমান হাকিমের পছন্দ হলো না, মনে হলো আসল বিষয় থেকে সরে যাচ্ছে। এক মুহূর্ত বিলকিসের দিকে তাকিয়ে আবার শুরু করল- ডাক্তারের কাছে সব কথা বলতে হয়; হাসিকান্না, দুঃখবেদনা যা মনে আসে, সব। যত বলবে তত সুবিধা, ডাক্তার চট করে তোমার কেস ধরে ফেলবে। মনের ভাব ঠিকমতো প্রকাশ করতে পারায় লোকমান হাকিম উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠল- আরে, এই নিজামুদ্দিন যে-সে না, সাইকিয়াট্রিস্ট অ্যান্ড সাইকোলজিস্ট।

--মানে?

—মানে...

লোকমান হাকিম এতক্ষণে মুখটা হাসি-হাসি করল, বুঝতে পারল বিলকিস পথে আসছে। বলল- মানে, মানে হলো গিয়ে, মনের রোগের ডাক্তার যেমন, মানুষের মনের খবরাখবর রাখার বেলাতেও মহা ওস্তাদ।

--মানে?

লোকমান হাকিম এক ঝলক স্থির চোখে বিলকিসের চোখে তাকাল, তারপর কী ভেবে ঝট্‌ করে ঘুরে ঘরের ভেতরে চলে গেল। মিনিটখানেকের মধ্যে ফিরে এসে বলল- চার নম্বর কেস খারাপ, এখনো চলছে। কব্জি উল্টে ঘড়ি দেখে সময় হিসাব করে বলল- বারো মিনিট ধরে চলছে। চার নম্বর এতক্ষণ ধরে চলায় সে অখুশি হলো না। বরং মনে মনে একটা অঙ্ক দাঁড় করিয়ে ফেলল। চার বেরুনোর পর পাঁচ ঢুকবে, পাঁচ বেরুবে, তারপর ছয়, ছয়ের পর সাত; এখন যদি চার আরো দুই মিনিট ভেতরে থাকে, পাঁচ ঢুকে স্লামালেকুম দিয়ে বসতে বসতে এক মিনিট, বসার পর ধরা যাক বারো মিনিট- মোট বারো আর এক তের আর দুই, পনেরো মিনিট; ছয় ঢুকতে এক মিনিট, কেস যদি পাঁচের মতো হয়, তাহলে ধরা যাক বারোই- মোট বারো আর এক তের আর হাতের পনেরো, আটাশ মিনিট। দুই মিনিট এদিক ওদিক হলে, এখন ঘড়িতে পাঁচটা দশ, পাঁচটা চল্লিশের মধ্যে বিলকিসের ডাক পড়বে। আধ ঘণ্টা বারান্দার এই সুন্দর বাতাসে দাঁড়ানো কিছু না। ভেতরে গাদাগাদি করে বসা লোকগুলোর বোকামিতে লোকমান হাকিম মজা পেল। এখানে তার বেশ ভালো লাগছে। একটা সিগারেট ধরাতে পারলে ভালো লাগাটা আরো বাড়ত। বুকপকেটে কাগজপত্রের ভাঁজে দুই শলা ব্রিস্টল আছে, প্যান্টের বাম পকেটে আঙুল ছুঁইয়ে ঘরের চাবির পাশে ম্যাচটাও টের পেল। কিন্তু ইচ্ছাটা দমন না করে উপায় নেই। মনটাকে ঘোরাতে বারান্দায় দেয়ালে চোখ ফেলতেই সে দেখার মতো জিনিসটা পেয়ে গেল। ডাক্তার নিজামুদ্দিনের নেমপ্লেট। নামধামসহ ভূতপূর্ব আর বর্তমান বৃত্তান্ত মিলে হাতখানেকের কালো তার ওপর সাদা অক্ষরে এমাথায় ওমাথায় পৌনে পাঁচ লাইন। বড় বড় ডাক্তারদের নামধাম খুঁটিয়ে-খুঁটিয়ে পড়া লোকমান হাকিমের বহু দিনের অভ্যাস, হবিও বলা যায়। একেকটা নাম, নামের শেষে বিচিত্র অনুভূতি জাগানো অক্ষরের পর অক্ষর। অক্ষরগুলো মিলেমিশে এক দুর্জ্ঞেয়, মোহময় আবহ- ঢাকা, লন্ডন, এডিনবরা, মস্কো, ভিয়েনা। পথেঘাটে চলতে-ফিরতে লোকমান হাকিম এ ধরনের আবহ উদ্রেককারী সাইনবোর্ডগুলো পড়ে; শুধু পড়েই না, মনে রাখারও চেষ্টা করে। সেগুনবাগিচায় তার অফিসের কোলিগরা ডাক্তারদের কার কোথায় চেম্বার, তার কাছে খোঁজ করে। সে যে সাইনবোর্ড পড়ে, আবার মনেও রাখে, এসব কোলিগদের জানার কথা নয়। ব্যাপারটা তার পরও কীভাবে দাঁড়িয়ে গেছে। তবে গলির মোড় মোড়ে ঘুপচি ফার্মেসির ততোধিক ঘুপচি ঘর আলো করা ডাক্তারদের বেলায় তার অনুভূতি চূড়ান্ত নিরাসক্ত, এদের প্রতি লোকমান হাকিমের আগ্রহ নেই। লম্বা সাইনবোর্ডধারী সব বড় ডাক্তাররা যে একগোত্রীয়, তা কিন্তু না; বড়রও বড় থাকে, বটগাছের ওপর অশ্বত্থ গাছ, শোল মাছের ওপর গজার মাছ, বাঘের ওপর ঘোগ। ডাক্তারদের বেলা এই ঘোগ হচ্ছে মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ। মানসিক রোগের ডাক্তারদের প্রতি লোকমান হাকিমের ভক্তি-শ্রদ্ধার কারণ খুঁজতে কিছুটা পেছনে যেতে হবে।

বছর তিনেক আগে লোকমান হাকিম আবিষ্কার করতে শুরু করে তার সদ্যবিবাহিতা স্ত্রী বিলকিস বেশ অন্যরকম। বিলকিস সাধারণের মতো নয়, লোকমান হাকিমের মতো নয়। বিলকিস বড় বেশি পরিপাটি, এতটা পরিপাটি বিয়ের চারদিনের মাথায় লোকমান হাকিমের শার্টে বোতাম লাগাতে গিয়ে সে এত গভীর মনযোগে একটার পর একটা সুঁইয়ের ফেঁড় তুলল, যত্ন করে গেরো দিল, দাঁত দিয়ে সুতা কাটল-লোকমান হাকিম অভিভূত হবে কী, তার মন বলল কিছু একটা আছে।

বিলকিস কথা বলে গোছগাছ করে, গল্পের মতো করে। রোজ বিকালে সিঁথি কেটে খোঁপা বাঁধে, আবার ফুল-টুলও দেয়। কোনো দিন কপালের মাঝ বরাবর জ্বলজ্বলে টিপ পরে চেহারাটা এমন বদলে ফেলে, লোকমান হাকিমের চিনতে কষ্ট হয়। দেখে দেখে তার খটকা লাগে, তবে কারণটা সম্বন্ধে নিশ্চিত হতে সময় লাগে। দিনে দিনে বিলকিসের নানা বাতিক ধরা পড়ে। যেমন- এক রাতে দুম করে জিজ্ঞেস করে বসল, লোকমান হাকিম কাউকে প্রেম পত্র লিখেছে কী না; আরেক রাতে ঘুম ভেঙে লোকমান হাকিম দেখল বিলকিস অপলক চোখে তাকে দেখছে। চোখাচোখি হতেই বলল- তুমি বড় সুন্দর! এসব কথাবার্তায় লোকমান হাকিমের গায়ে কাঁপুনি আসে, নিজের কানকে পর্যন্ত বিশ্বাস করতে কষ্ট হয়। মানুষটা সে এতই সাধারণ, সেগুনবাগিচায় অফিসের তিনতলায় ময়লা একটা টেবিল, হাতাভাঙা চেয়ার আর একগাদা লেজাররেজিস্টারের বাইরে চোখ ফেলার কথা ভাবতে পারে না। সুন্দরী কোনো মেয়েকে দেখে মুগ্ধ হয়ে প্রেমপত্র লেখার দুঃসাহস সে কল্পনাও করতে পারে না। আবার দেখতে শুনতেও সে একরকম কুৎসিতই। গায়ের রং বেশ ময়লা, গর্তে বসা চোখ, কপাল জুড়ে ছোটবেলার বসন্তের দাগ, মাথায় চুল পাতলা হয়ে পেছন দিকে খুলির জোড়ের অংশটুকুই যা ঢাকা পড়ে। অন্যদিকে লম্বায়ও সে খাটো, রীতিমতো বেঁটেখাটো, টেনেটুনে পাঁচ ফুট দুই হবে কি-না, তবে এ তুলনায় ঘাড়, কাঁধ, বুক বাড়াবাড়ি রকম চওড়া। এ অবস্থায় বিলকিসের মুখে সাংঘাতিক কথাগুলো শুনে লোকমান হাকিম স্ত্রী সম্বন্ধে একটা মোটামুটি ধারণা খাড়া করে ফেলে।

বিয়ের অল্প দিনের মধ্যে বিলকিসের বিষয়ে লোকমান হাকিম অন্য যে আবিষ্কারটা করে, তাতে সে হতবুদ্ধি হয়ে যায়। বিলকিস অদ্ভুত অদ্ভুত স্বপ্ন দেখে। রাতে কিংবা দিনে, চোখের পাতা এক করামাত্র ঝাঁকে-ঝাঁকে স্বপ্ন তার মগজের অলিগলি চষে বেড়ায়। যেমন- বিয়ের সপ্তা দুয়েকের মাথায় বিলকিস স্বপ্ন দেখল লোকমান হাকিম পাল্কি চড়ে বিয়ে করতে যাচ্ছে। বউটা দেখতে বিশ্রী, কালো, তার ওপর মোটা, তার ওপর বাম চোখটা ট্যারা। দুদিন না যেতেই বিলকিস দেখল, মহাধুমধামে তার নিজের বিয়ে হচ্ছে সেই ফরসা, লম্বা ছেলেটার সঙ্গে যে তাকে নাখালপাড়ায় বোনের বাসায় দেখতে এসে অর্ধেকটা কালোজাম মুখে পুরে হুট করে পালিয়ে গিয়েছিল। তখন সবে বিয়ে হয়েছে বলে, বিয়েজনিত বিষয়গুলিই স্বপ্নে প্রাধান্য পেত। কিছু দিন পর বিষয় বদল হতে দেখা গেল জগতে এমন জিনিস নেই, যা নিয়ে বিলকিস স্বপ্ন দেখে না, বা দেখতে পারে না। নিজের আশা-আকাক্ষার ব্যাপারগুলো পর্যন্ত সে স্বপ্নে মিটমাট করে ফেলে। যেমন- বিকালবেলা কোথাও যেতে ইচ্ছা করছে, কিন্তু বৃষ্টি বা রিকশা ভাড়া যে কারণেই হোক, যাওয়া হলো না, রাতে ঘুমের মধ্যে সে জায়গাটা ঘুরে এল। ঘরে বাজার নেই, এদিকে ইলিশ মাছ খেতে ইচ্ছা করছে, চিন্তা কী, রাতভর সর্ষেবাটা ইলিশের স্বাদ মুখে নিয়ে টানা ঘুম দিল।

লোকমান হাকিম কদাচিৎ স্বপ্ন-টপ্ন দেখে। সেগুলোকে স্বপ্ন না বলাই ভালো। যেমন- এও স্যার মোটা একটা লেজার খুলে রাগি গলায় তাকে ধমকাচ্ছেন; নয়ত মাছবাজারে গেছে শুক্রবার সকালবেলা, এক ভাগা চাপিলা মাছ দরদাম করে টাকা দিতে যাবে, দেখল মানিব্যাগ ফেলে এসেছে। ঘুম ভাঙার পর এসব ঘটনার কথা তার মনেও থাকে না। বিলকিসের মতো পর্বের পর পর্বে ভাগাভাগি স্বপ্ন দূরে থাক, জোড়াতালির কোনো স্বপ্নও তার মাথায় খেলে না। বরং চোখ-কান বন্ধ করে মাথার ভেতরটা শূন্য, ফাঁকা, অন্ধকার করে ঘুমানোর পরও বিলকিস কী করে স্বপ্নের পথেঘাটে একা একা ঘোরে, ভাবতে গেলে তার নিজের মাথাটাই ফাঁকা, ধু ধু হয়ে পড়ে। এমন অবস্থায় ডাক্তার নিজামুদ্দিন এমআরসিপি-লন্ডন এর শরণাপন্ন না হয়ে লোকমান হাকিমের উপায় ছিল না।

নিজের স্বপ্ন দেখা নিয়ে বিলকিসের জড়তাটড়তা নেই; ব্যাপারটা যে লোকমান হাকিমের জন্য ভোগান্তির, টাকা খরচ, এসব নিয়ে সে আশ্চর্য বিকারহীন। বরং লোকমান হাকিম তাকে পাগলের ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাচ্ছে, এই বোধটুকু অমর্যাদাকর মনে হলেও তার ভাবখানা এমন, এক ছুতায় তল্লাবাগের দেড় কামরার ঘর থেকে তো বেরুনো যাচ্ছে, চওড়া মিরপুর রোডে রিকশার হুড তুলে বা নামিয়ে খোলামেলা ঠাণ্ডা বাতাস খাওয়া যাচ্ছে, লোকজন গাড়িটাড়ি ভিড়ভাট্টা দোকানপাট দেখা যাচ্ছে!

চার-চারবার ডাক্তার দেখানোর পরও বিলকিসের স্বপ্ন দেখায় ভাটা পড়েনি। সমস্যাটাকে ডাক্তার খুব গুরুত্ব দিচ্ছেন বলে লোকমান হাকিমের মনে হয় না। কিন্তু এত বড় ডাক্তার, লোকমান হাকিম আস্থা হারায় কী করে! এমন হতে পারে, আগে যে কবার এসেছে, বিলকিসের স্বপ্নবিষয়ক জটিলতা ডাক্তারকে ঠিক মতো বোঝাতে পারেনি। তবে পরশু রাতের স্বপ্নটা ডাক্তারের জন্য একটা বড় ক্লু হতে পারে। স্বপ্ন নিয়ে লোকমান হাকিম মাথা না ঘামালেও এ স্বপ্নটাকে সে নিজে খুব গুরুত্বপূর্ণ মনে করে। পরশু রাতের স্বপ্নটা যে শুধু পরশু রাতেই দেখা তা-না, পরশুর আগের পরশু, তারও আগে, সম্ভবত দিন-পনেরো ধরে ভেঙে ভেঙে নানা পর্বে-অধ্যায়ে স্বপ্নটা বিলকিস দেখে আসছে।

বিলকিসের অসংখ্য উট স্বপ্নের মতো এ স্বপ্নটাও উদ্ভট, আবার বাস্তবও। উদ্ভট, যেমন- বিলকিস দেখল, তার একটা পরীর মতো ডানাওয়ালা ছেলে হয়েছে। মাথা চোখ মুখ পা সবই মানুষের মতো; তবে হাত নেই, হাতের বদলে পরীদের মতো ডানা। জন্মনোর পরপরই ছেলেটা ডানা ঝাপটে ঘরের চার দেয়ালে পাক খেতে লাগল, আর দেয়াল ঘেঁষে ওড়ার সময় ঘরের ভেতরটা নরম, মিষ্টি আলোয় ভরে উঠল। এত দূর পর্যন্ত স্বপ্নটা উদ্ভট, গাঁজাখুরি; কিন্তু এর বাস্তব দিক হচ্ছে, বিলকিসের পেটে সত্যি সত্যি বাচ্চা। সবে তিন মাস বলে, বিলকিসকে দেখে কেউ চট করে অনুমান করতে পারবে না। প্রথম যেদিন বিলকিস স্বপ্নটার কথা বলল, লোকমান হাকিম হতবাক হয়ে গিয়েছিল। এমন অভাবনীয় স্বপ্নের প্রতিক্রিয়া কী হওয়া উচিত, ভেবে উঠতে পারেনি। অল্প সময়েই তার মনে আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল। এমন বিষয় নিয়ে কেন বিলকিস স্বপ্ন দেখতে গেল? নিজের পেটের বাচ্চা নিয়ে কেউ ইয়ার্কি করবে ভাবা যায়? বিয়ের পর বাচ্চা হবে, এ তো স্বাভাবিক ঘটনা, সবার বেলা হয়, কারো-কারো বেলা অবশ্য ব্যতিক্রম, তবে হওয়াটা স্বাভাবিক, উচিতও। এখানে স্বপ্নের বুজরুকি কী জন্য? বাচ্চা যখন হবে, ছেলে বাচ্চা হওয়াই ভালো। লোকমান হাকিমও একটা ছেলে বাচ্চা চায়, ছেলে কার মতো হবে, সে কী করে বলবে! তাই বলে হাত কেটে পাখা লাগাতে হবে? পায়ে না হেঁটে বাচ্চাটা পাখা ঝাপটে চার দেয়ালে চরকি কেটে বেড়াবে?

ঠিক পাঁচটা চল্লিশে ভেতরের ঘরে ডাক পড়তে লোকমান হাকিম অবিশ্বাসী চোখে ঘড়ি দেখল। নিজের অঙ্কটা কাটায় কাঁটায় মিলে যেতে সে বিস্মিত হলো।

ডাক্তারের চেম্বার আজ অন্যরকম। টেবিলটা আগে ছিল জানালার কাছে, সেটাকে সরিয়ে দেয়ালের কাছে নিয়ে আসা হয়েছে, অন্যান্য আসবাবপত্রেরও জায়গা বদল হয়েছে। ঘরটা আগের মতো নেই, কিছুটা ঘিঞ্জিভাব এসে গেছে। বসামাত্র বিলকিসের হাতব্যাগ থেকে পুরনো কাগজপত্র বের করতে লোকমান হাকিমা ব্যস্ত হয়ে পড়ল। কাগজপত্র যেভাবে উঠে এল, সেভাবেই ওগুলো টেবিলের ওপর মেলে ধরতে ডাক্তার নিজামুদ্দিন প্রথমে লোকমান হাকিম, তারপর বিলকিস, আবার লোকমান হাকিমের দিকে চোখ ফেলে বললেন- হ্যাঁ। লোকমান হাকিম কথা খুঁজে পেল না। ডাক্তার কাগজপত্রগুলো দেখলেন, এক জায়গায় হাতের কলম দিয়ে গোল্লা আঁকলেন, আবার একই কায়দায় চোখ ফেললেন।

বিলকিস মাথা নিচু করে আছে। লোকমান হাকিম জড়ানো গলায় বলল- স্বপ্ন...। ডাক্তার কাগজপত্র উল্টেপাল্টে পুরনো রোগী শনাক্ত করতে চাইলেন যেন, তারপর মুখ তুললেন– স্বপ্ন দেখা এখনো চলছে?

--হ্যাঁ স্যার, কোনো উন্নতি নেই।

—শুধু রাতেই দেখেন? দিনে দেখেন না?

—দিনে-রাতে যখন তখন চোখ বুজলেই দেখে। একেক সময় একেক স্বপ্ন, আবার একই স্বপ্ন ঘুরিয়ে ফিরিয়েও দেখে। এমন উৎপাত স্যার, কী বলব, আমি পাগল হয়ে যাব। পরশু রাতে...

—ওনাকে বলতে দিন। রোজই দেখেন? দেখতে ভালো লাগে?

বিলকিস তেমনি মাথা নিচু করে আছে, ওই অবস্থায় সে মাথা নাড়ল।

--মুখে বলুন।

লোকমান হাকিমের ভেতরে রাগ জমতে লাগল। এত করে বোঝালো, তার পরও মুখে তালা মেরে আছে! এটা বিয়ের পিড়ি নাকি? নাকি, ওই ফরসা-লম্বা ওকে দেখতে এসেছে, এখনি অর্ধেকটা কালোজাম মুখে করে পালাবে? ডাক্তারের চেম্বার বলে, অনেক কষ্টে একটা ঘরে, রাগী ধমক লোকমান হাকিম সামলে ফেলল।

-বলুন।

এবার বিলকিস মুখ তুলল। তাকিয়ে লোকমান হাকিম থ বনে গেল। বিলকিসের চোখের পাতা কাঁপছে, ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে চোরাহাসি। বিলকিস যখন স্বপ্ন নিয়ে কথাবার্তা শুরু করে, তখন এ রকম ছায়াজমাট হাসিতে তার চোখ-মুখ ভরে ওঠে। কিন্তু এ সময় হাসিটার কী দরকার ছিল!

—ভালো লাগে?

--লাগে।

--খুব ভালো লাগে?

--খুব।

—কখন দেখতে ভালো লাগে?

—যখন আসে।

--তার মানে সব সময় আসে না?

--চেষ্টা করলে আসে।

--চমৎকার! কী দেখতে সবচে' ভালো লাগে?

প্রশ্ন শুনে বিলকিসের হাবভাব দেখে মনে হলো উত্তরটা খুব লজ্জার, অনেকটা ওই ফরসা-লম্বার ঘটনার মতো। ডাক্তার এবার লোকমান হাকিমের দিকে ফিরলেন- কী দেখতে ওনার সবচে ভালো লাগে?

প্রশ্নটা লোকমান হাকিমের জন্য কঠিন, তবু সে চেষ্টা করল- এক কথায় সবই ভালো লাগে। অসুখটা স্যার এখানেই, স্বপ্ন হলেই হলো। বিড়াল নিয়ে স্বপ্ন দেখে, আবার আমাকে নিয়েও দেখে, আবার ধরেন, এই যে এখানে এলাম, বলা যায় , রাতে এটাও ভর করতে পারে। ঘুমের মধ্যে একজন মানুষের এত অত্যাচার কেন হবে? রাতটা তো স্যার ঘুমানোর জন্য, রেস্টের জন্য। সারা রাত পরিশ্রম করে যদি স্বপ্ন দেখতে হয়, তাহলে রেস্ট, ঘুম কখন হবে?

ডাক্তার যেন এতক্ষণে লোকমান হাকিমের প্রতি মনোযোগী হলেন। বললেন- আপনার স্ত্রীর সমস্যাটা কোথায়? -বললাম যে স্যার।

—এখানে সমস্যা কোথায়? স্বপ্ন দেখা কী চাট্টিখানি কথা!

কথা শুনে লোকমান হাকিম ঢোঁক গিলল। লোকটা কী বলে! মনে হচ্ছে, এবারও সমস্যাটাকে গুরুত্ব দিচ্ছে না। মনে তার অভিমানও হলো। এই মানুষটা সম্বন্ধে তার কত উঁচু ধারণা! এবারও যদি সমস্যাটা না ধরানো যায়? এদিকে এখন পর্যন্ত পরশু রাতের ঘটনার কথা বলাই হয়নি। সে কিছুটা বিরক্তিসহ বলে ফেলল- কিন্তু দিনে-রাতে মাথার মধ্যে ভনভনড নিয়ে মানুষ বাঁচতে পারে? পরশু রাতে...

--পরশু রাতে কি ভনভন টের পেয়েছিলেন?

পাশ থেকে বিলকিস ফিক করে হেসে উঠতে লোকমান হাকিম হতভম্ব হয়ে গেল। বিমূঢ় ভাবটা কাটাবার আগেই শুনল ডাক্তার বিলকিসের দিকে ঝুঁকে জিজ্ঞেস করছেন- কী দেখতে সবচে' ভালো লাগে বললেন না?

-বাচ্চা।

লোকমান হাকিম এতই চমকাল, তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো গলাটা বিলকিসেরই। ডাক্তার আরেকটু সামনে ঝুঁকলেন। বিলকিস এবার পুরো জবাবটা শেষ করল- বাচ্চা দেখতে সবচেয়ে ভালো রাগে, পরীদের মতো ঝলমলে ডানাওয়ালা বাচ্চা। ধীরে ধীরে বিলকিসের চোখের পাতা কাঁপতে শুরু করল, ছায়া জমে উঠল চেহারায়। পরশু রাতে শেষ বারের মতো দেখা স্বপ্নটা আস্তে আস্তে, ভাঁজের পর ভাঁজ সে খুলতে লাগল।

বিলকিস শেষ পর্যন্ত পরশু রাতের স্বপ্নদৃশ্য বর্ণনা করতে শুরু করেছে দেখে লোকমান হাকিম হাঁফ ছাড়ল। কিন্তু মুহূর্তেই ভেতরে একটা উসখুস ভাব জেগে উঠল। বিলকিসের মা হওয়ার ব্যাপারটা ডাক্তারকে কীভাবে জানায়? কথাটা জানানো দরকার, কিন্তু কীভাবে বলে? আমার স্ত্রীর পেটে বাচ্চা, আমার স্ত্রী গর্ভবতী-- বাক্য দুটো নিজের কানেই বেখাপ্পা লাগতে ভাবল ইংরেজিতে সুবিধা, মুখ থেকে বের করলেই হলো, অনুভুতিতে দাগ কাটে না। ভাবতে ভাবতে উপযুক্ত বাক্যটা মাথায় চলে এল। বিলকিস শেষ মাত্র ডাক্তারকে একটা গোপন ক্লু দিচ্ছে এমনভাবে খুব আলগোছে বাক্যটা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলল- সি ইজ ক্যারিং।

ডাক্তার চোখ ফেরালেন, সেকেন্ড দুয়েক লোকমান হাকিমকে দেখলেন, কৌতুকে নাচছে দুই ভুরু, তারপর ঝুপ করে বললেন- ক্যারিং? আপনি জানেন, উনি কি ক্যারি করছেন?

ডাক্তার চুপ করে ভুরু নাচালেন, যেন সত্যিই জবাবের অপেক্ষা করছেন, তারপর রহস্যের গেরোতে কষে আরেকটা গেরো জুড়ে বললেন- সি ইজ ক্যারিং ড্রিমস, স্বপ্ন।

কথা শেষ করে ডাক্তার আবার বিলকিসের দিকে ঝুঁকলেন, থেমে থেমে অনেকগুলো কথা বললেন, যার মাথামুণ্ড লোকমান হাকিম ধরতে পারল না। একবার শুনল বলছেন— স্বপ্নটা তুলনাহীন, এমন স্বপ্নের সাক্ষাৎ পাওয়া ভাগ্যের কথা, হাতের বদলে ডানাওয়ালা, পরীদের মতো ডানাওয়ালা বাচ্চা কে না চায়! বিলকিস খুব ভাগ্যবতী।

ঘরে ফিরে লোকমান হাকিম ঝিম ধরে বসে থাকল। মাথাটা তার ফাঁকা, ধু ধু হয়ে আছে। বিকাল থেকে কী-কী করল, কোথায় গেল, কীভাবে কাটাল কিছুই মনে দাগ কাটছে না। ফেরার পথে রিকশায় চুপচাপ বসে এসেছে। বিলকিসের সঙ্গে একটা কথাও হয়নি। ঘরে এসে বেতের চেয়ারে পা দুটো জড়ো করে বসে বসে মনে হলো রিকশ সময় পার করে সে উঠল। ছোট ঘরটায় পা টেনে টেনে কয়েকবার পায়চারি করল। এক টুকরো বারান্দা আছে ওপাশে, বারান্দায় গিয়ে এমনি এমনি দাঁড়াল, আবার ফিরে এল, বেতের চেয়ারটায়ই বসল। মাথাটা তার পরও ফাঁকা।

বিলকিস ঘরে এসে কাপড় বদলালো, নীল বুটিদার খুলে অন্য একটা শাড়ি পরল। রান্নাঘরে ঢুকে ডাল বসাল, তরকারি গরম করল, ভাত রাঁধল, আরো কী কী করল। রাত ন'টার দিকে ভাত বেড়ে দিতে লোকমান হাকিম চুপচাপ খেয়ে উঠে সোজা বিছানায় চলে গেল। মশারি খাটিয়ে শুতে এসে বিলকিস গজগজ করল- খামোখা পয়সা খরচ।

শেষরাতের দিকে লোকমান হাকিমের ঘুম ভাঙল। সচরাচর এটা হয় না, এক ঘুমেই তার রাত শেষ হয়। চোখ খুলে চারপাশ অন্ধকার দেখে তার খটকা লাগল, তার মানে সকাল হয়নি। এদিকে ঘুম ভাঙামাত্র বুঝতে পারল, মাথাটা আর ফাঁকা নেই, চিনচিনে যন্ত্রণা হচ্ছে মাথায়। শারীরিক লক্ষণ বলতে কেবল মাথায় যন্ত্রণাই না, সে খেয়াল করল গা শিরশির করছে, শ্বাস-প্রশ্বাস দ্রুত হচ্ছে, বুক জুড়ে অস্থির অস্থির ভাব।

ঘুমটা চোখে থেকে পুরোপুরি কেটে যেতে সে পরিস্থিতি সম্বন্ধে সজাগ হলো, আর তখনি অবিশ্বাস্য আবিষ্কারে হতভম্ব হয়ে গেল। এইমাত্র সে একটা স্বপ্ন দেখে জেগে উঠেছে। সে দেখেছে বিলকিসের একটা বাচ্চা হয়েছে, ছেলে বাচ্চা, ছেলেটা দেখতে হুবহু তার নিজের মতো, কালেকুলো, গর্তে বসা চোখ। ঘাড় কাঁধ বুক অসম্ভব চওড়া। সবে জন্মানো বাচ্চাটার কপাল জুড়ে অবিকল লোকমান হাকিমের মতো ছোটবড়, নানা মাপের বসন্তের দাগ। স্বপ্ন বলতে এইটুকু, কিন্তু তার মনে হলো, অনেকটা সময় ধরে একটু একটু করে সে স্বপ্নটা দেখেছে। বারকয়েক ঘুরিয়ে ফিরিয়ে সে স্বপ্নটা নিয়ে ভাবল। আর তাতে বুক জুড়ে অস্থিরতাটাও বাড়ল, ভীষণ পিপাসা পেল। অন্ধকার বিছানায় একসময় সে আতঙ্কিত হয়ে পড়ল।

জীবনে প্রথম একটা পরিপূর্ণ স্বপ্ন দেখার আতঙ্ক নিয়ে লোকমান হাকিম উঠে বসল। বিছানার এক পাশে বিলকিস ঘুমাচ্ছে, হাত দুটো বুকের কাছে জড়ো করা। অন্ধকারে মুখ দেখা যাচ্ছে না, ভারি শ্বাসপ্রশ্বাসে হাঁটু-গোটানো দুই ভাঁজ শরীর অল্প অল্প দুলছে। স্বপ্ন দেখার পর বিলকিসের যেমন হয়, একেবারে অন্য মানুষ হয়ে যায়, চোখের পাতা কাঁপে, ছায়া জমে ওঠে চেহারায়,তার তেমন কিছুই হলো না। বরং বুকটা খুব দ্রুত ওঠানামা করছে, হাঁসফাঁস লাগছে। এও কি স্বপ্ন? খাট থেকে নেমে লোকমান হাকিম অন্ধকারে পা ঘষে-ঘষে স্পঞ্জের স্যান্ডেল খুঁজল, না পেয়ে খালি পায়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকল। ঘাড় ঘুরিয়ে মশারির চৌকোনা চাঁদোয়াটা আবছাভাবে দেখল, চাঁদোয়ার নিচে বিলকিসের শরীরের ভেতর তালগোল পাকানো তিন মাসের বাচ্চাটার জন্য এক আশ্চর্য, অচেনা মমতা অনুভব করল।

পরের দুটো দিন অন্যরকম গেল। অফিসে বসে একটু পরপর সে আনমনা হলো। কাজকর্মে মন বসাতে পারল না। নিজের স্বপ্ন দেখার ঘটনাটা যতবার মাথায় এল, ততবারই সে নতুন করে বিভ্রান্ত হলো। ঘরে ফিরেও স্বস্তি পেল না। রাতে বালিশে মাথা রাখতে গিয়ে ভয়ে শিউরে উঠল।

তৃতীয় রাতেও লোকমান হাকিম হাঁসফাঁস করে জেগে উঠল। তার বুক ধুকপুক করছে, দম আটকে আসছে। অবিকল একই স্বপ্ন। কদাকার শিশুটা চিৎ হয়ে শুয়ে হাত-পা ছুড়ছে। হুবহু তার নিজের মুখ, গর্তে-বসা বিবর্ণ চোখ, কপাল জুড়ে ছোটবড় ক্ষত। ঘুমের মধ্যে সে হয়তো চিৎকার করে উঠেছিল। চোখ খুলতেই দেখল, বিলকিস ঝুঁকে আছে মাথার ওপর। বিলকিস ঘুম জড়ানো গলায় জানতে চাইল কী হয়েছে? লোকমান হাকিম জোরে শ্বাস নিল, গুমোট ঘরেও বুক ভরে উঠল ঠাণ্ডা বাতাসে। বাতাসটা বুকের আনাচেকানাচে খেলিয়ে লম্বা নিশ্বাস ফেলতে ফেলতে লোকমান হাকিম ভাবল, বিলকিসকে সে কী বলে! একবার ভাবল, বলে- স্বপ্ন। কিন্তু তার কষ্ট হলো। এই কষ্ট অচেনা, এত দিন কোথায় লুকিয়েছিল মাথায় এল । স্বপ্ন দেখার সঙ্গে এই কষ্টের ব্যাপারটা কী করে জুটে গেল! তার রাগ হলো না, গা শিরশির করতে লাগল।

বিলকিস আবারো কী হয়েছে জিজ্ঞেস করতে লোকমান হাকিম অসহায় বোধ করল। এক মুহূর্ত সে চোখ বুজে ভাবল, এইটুকু বাচ্চা, না হয় চোখদুটো গর্তে বসা, ঘাড়-পিঠ অসম্ভব চওড়া, না হয় ডানা নেই, দেখতে কুৎসিত- তারই মতো, কিন্তু কপালে এই দাগগুলো কেন, এগুলো কোত্থেকে এল? গলার ভেতরে কী একটা জট পাকিয়ে উঠছে। লোকমান হাকিম ভেবে পেল না এ অবস্থায় বিলকিসকে তার কী বলার আছে! বিলকিসকে কি বলা যায়- সে একটা স্বপ্ন দেখেছে, তার নিজস্ব স্বপ্ন। স্বপ্নটা সে দেখতে চায় না, এখন যদি বিলকিস তার স্বপ্নটা লোকমান হাকিমকে দেয়, একবার দেখতে দেয়!




১৯৯০

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন