সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

জয়শ্রী সরকার'এর গল্প: নোম্যান্স ল্যান্ডের সুখ পাখীরা কই




‘বাপুজি ঝাঁপির সব সাপ ছেড়ে দিন, ওদের খেয়ে নিক।’

সর্দার চাঁদনীর কথায় কান না দিয়ে সামনে এগিয়ে যায়। আমার মনে খেলে যাওয়া পলকের আনন্দ নিমিষেই থমকে যায়। অপেক্ষা করা ছাড়া কোন পথ খোলা নেই। সীমান্তে এসে আটকে গেছি সবাই। সাতগাছির কাছাকাছি মাথাভাঙ্গা মহকুমা। মাথাভাঙ্গার কোন এক গাঁয়ে আমার এক মাসী ছিল জানতাম। কোনভাবে যদি তাকে একটা খবর দিতে পারতাম। কোনভাবে যদি সে জানতো আমি এখানে আছি। একছুটে এসে সকলকেই বাঁচিয়ে নিয়ে যেতো। তবে সেতো অসম্ভব! আমার কাছে না আছে তার ঠিকানা, না আছে খবর পাঠাবার কোন পথ। 
 
সে কতকাল আগের কথা! নদীপথে দেখা হয়েছিল মাসতুতো বোনের সাথে। সেদিন মায়ের সাথে বেরিয়েছি বৃষ্টিবিলাসে। মনিরত্নার বিয়ে খেয়ে আমরা ফিরছিলাম। একইপথে সেও ফিরছিল। বোনঝিকে দেখে মা’র সেকি খুশি। কাঁদো কাঁদো স্বরে বলছিল, পদ্মকে দেখিনা কতকাল! সে আছে কেমন? তখনই জেনেছিলাম পদ্মমাসী ঘর বেঁধেছে মাথাভাঙ্গার কোন এক গাঁয়ে। কথাছিল ঝড়ঝঞ্জা কমলেই বেড়াতে যাবো মাসীর বাড়ি। হলোনা আর যাওয়া!

সেদিন মায়ের গা ঘেঁষে তিস্তায় ভাসছিলাম। হঠাৎ ছলমল ঢেউ কেমন থমকে গেল। ঐরকম হলে নাকি ঝড় আসে। আমাকে আর বোনকে নিয়ে মা উঠে গেল কূলবনে। নিরাপদ আশ্রয় একটা পেয়েছিলাম। তবে সেকি ঝড়! উথালপাথালিয়া তান্ডবে লন্ডভন্ড হয়ে যাচ্ছিল তিস্তা! কি ভয়ই না পেয়েছিলাম। মাকে জড়িয়ে ধরে আমি ও দিদি কোনরকম টিকেছিলাম।

ঘূর্ণিঝড়ের কাল, এক নাগাড়ে চলছিল। তিস্তা খলবলিয়ে গ্রাম ভাসিয়ে নিল। সর্বনেশে জলে কূলবন থেকে ভাসতে ভাসতে কে যে কই গেল! মা-ই কোথায়, দিদিইবা কোথায়, জানিনা!

আমি এসে পড়লাম সর্দারের হাতে। সেই থেকে কখনো ডাঙায়, কখনো নৌকায়। যেখানেই থাকি অন্তত খাবার পেয়েছি। মাথার উপরে ছাউনি পেয়েছি। হাঁটে-ঘাটে-মেলায় ঘুরে বেড়িয়েছি। এর ওর সাথে খেলার সুযোগও পেয়েছি। এমন সংকটে কোনদিন পড়তে হয়নি। এই আপদকালে পদ্মমাসীকে খুব মনে পড়ছে। মাসীর কথা মনে হতেই মায়ের জন্য হৃদয়টা কেমন হুহু করছে। বরফ হাওয়ায় বেঁচে থাকার কষ্টের চেয়েও প্রবল সে কষ্ট। 
 
খাবারের গন্ধ পাচ্ছি। কেউ একজন পাশে এসে দাঁড়িয়েছে।
 
হ্যাঁ, চাঁদনী দাঁড়িয়ে। প্যান্টের কোছা থেকে ছোট্ট আটার বন বের করছে। ওর খাওয়া দেখে খিদেটা চড়ে গেছে। অন্য সময়ে সে খেয়ে আমাকেও দিত। এখন কণামাত্র হাত ফসকে পড়লেও কুড়িয়ে খেয়ে নেয়। আজকাল নিজের পেটেই খিদে। আমার কথা ভাবলে ওর খাওয়াই হবেনা। ঐটুকুই তো খাবার, নিমিষেই শেষ হয়ে গেল।

খিদেয় আমার পেটটা চোঁ চোঁ করছে। কোনভাবে যদি এই নোম্যান্সলেন্ড থেকে মুক্তি না মিলে তবে না খেয়েই আমাদের মরতে হবে।

‘গতকাল ত্রিশ জানুয়ারী দুই হাজার তিন, রাতের অন্ধকারে কাঁটাতার পেরিয়ে অনুপ্রবেশের সময় হাতেনাতে ধরা পড়েছে একটি সাপুড়িয়ার দল। সংখ্যায় ওরা দুইশত তেরজন। এ নিয়ে দারুণ হুলুস্থুল পড়ে গেছে দুই সীমান্তে। ওদের অনেকের কাছেই বাংলাদেশের টাকা, নথিপত্র ও বিভিন্ন রশিদ পাওয়া গেছে বলে শোনা যাচ্ছে। তল্লাশি চলছে। অচিরেই জানা যাবে এর পিছনে কোন ষড়যন্ত্র আছে কিনা।’ এইটুকু পড়ে রক্ষী থামে। পত্রিকাটা ভাঁজ করতে করতে বিষণ্ন মুখে অন্যদের উদ্দেশ্য করে বলে, ‘বুঝলে হে, বিষয়টা অত সহজ নয়। শুনলেতো পত্রিকাওয়ালারা কি লিখেছে। ভালো করে তল্লাশি কর।’

তল্লাশি ওরা ভালো করেই করছে। যখন তখন ডেকে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করছে। স্পটে এখন সোলেমান বেদে দাঁড়িয়ে। তাকে যে তল্লাশি করছে তার বুক পকেটে একটি চারকোণা কাঠ। তাতে লেখা পি. কে. গোপ। আজ পিকে গোপের ডিউটি ছিলনা। হঠাৎ চাপ বেড়ে যাওয়ায় জরুরী তলবে তাকে আসতে হয়েছে। এ জন্যে তিনি কিছুটা বিরক্ত। রাগে গজগজ করতে করতে সে বকে যাচ্ছে। ‘যখন তখন বেআইনিভাবে ঢুকে পড়ছিস তোরা। এইবার মজা বুঝবি। সোলেমান কিছু একটা বলতে যাচ্ছিল। পি. কে গোপ ধমকে ওঠে। সোলেমান থেমে যায়। মাথা নিচু করে মাটিতে নোখ খুঁটে।

সর্দার এগিয়ে গিয়ে সোলেমানের পাশে দাঁড়ায়। বারবার বুঝানোর চেষ্টা করে যা ভাবা হচ্ছে, তারা তা নয়। ওরা বুঝতে নারাজ। একেতো উপরি ডিউটির চাপে একটা চাপা রাগ রয়েছে, তার উপর সর্পভীতি। মাথুই নামে যে, সে তো ভয়েই শেষ। একটু আগেই আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় সঙ্গীকে বলছিল, ‘তল্লাশির সময় একটু সাবধানে হাত চালিয়ো দাদা। এদেরতো বিশ্বাস নেই, কোথায় আবার সাপ টাপ না গুঁজে রাখে।’ এই বলে, এক মুখ থুতু ফুচ্চুত করে ঝাঁপির উপরেই ফেলে গেল। মাথুইকে এই কথা আমি একে তাকে বারবারই বলতে শুনেছি।

সবচেয়ে বেশী ভয় পেয়েছে বলরাম বাবু। তার কুষ্টিতে নাকি সর্পদংশনের যোগ রয়েছে। তাই তার ধারণা কোনভাবে তল্লাশির সময় সত্যি যদি কারো পকেটে বা শরীরের কোথাও সাপ নড়েই ওঠে। অথবা ঝাঁপির সাপগুলো যদি কোনভাবে ছাড়া পেয়ে যায়। নিশ্চিত প্রতিশোধ নিতে কাউকে ছাড়বেনা। আতঙ্কে সে ঘুমুতেও পারছেনা। মানুষের আনন্দ-ভয়-ঘৃণা তো থাকাই স্বাভাবিক। কষ্ট পাইনা। তবে বলি, এতই যদি ভয়, ঘেন্না, তবে ছেড়ে কেন দিচ্ছিসনা বাপু! অবশ্য ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত এই ছাপোষা রক্ষীদের হাতে নেই। আমি অনেককেই ফিসফিসিয়ে বলতে শুনেছি। ‘ওরা সাপখেলা দেখায়, ওদের যেখানে ব্যবসা জমবে সেখানেই যাক না। শুধু শুধু আটকে রাখার দরকারটা কি বাপু! কতকি চোখের সামনে পালিয়ে যাচ্ছে সেবেলায় কিছু হয়না! এই অসহায় মানুষ ও বোবাপ্রাণীগুলোকে শুধু শুধু আটকে রেখেছে!’

ঐদিকে নিজেদের নির্দোষ প্রমাণে ব্যর্থ হয়ে বোবাপ্রাণীর মতই কাচুমুচু মুখে দাঁড়িয়ে আছে বড় সর্দার। হাঁপানিটাও বেড়েছে। আলুথালু নিশ্বাস পড়ছে। সর্দারের প্রথম পক্ষ চামেলী, ঘনঘন চোখ মুছছে। স্বামীর এই হাল তিনি কিছুতেই সইতে পারছেননা। এক নিমিষে বিষধর নাগিনীকেও ঘায়েল করে ফেলা সর্দার নির্লিপ্ত মুখে দাঁড়িয়ে আছে। সর্দারের শ্বাসের উঠানামা আমাকেও রক্তাক্ত করছে। বিপদে তাঁর পাশে না দাঁড়াতে পারার কষ্ট সমুদ্রের ফেনিল ঢেউয়ের মতই তোলপাড় করছে।

রেশমি ক্ষোভে ফুঁসছে। ওর গাঁয়ের রঙ যেমন কালো তেমনই জাম বার্ণিশের মতো চিকচিকে। নাকের চারপাশজুড়ে নাকফুল গাঁথা। কানে রুপোর মাকড়ি। লতিবেয়ে ছোটছোট ফুল পুরো কানটিকে ঢেকে রেখেছে। হাতভর্তি বাহারী রঙের কাঁচের চুড়ি। কোমরে ঝালর বিছা। যেমন গড়ন, তেমনি চাহনি। ডোরাকাটা শাড়িতে ওকে সাপিনীর মতো লাগে। ঝিকঝাক তালে ফুসফুস করে ও এগোচ্ছে। কোমরে দোলদোল দুলতে থাকা বীণটা আমায় ডাকছে। ওই বীণটাতে যদি একবার ও ফুঁ দিত, আমি বোধহয় পারতাম এই ঝাঁপিটা ভেঙ্গে বেড়িয়ে যেতে। একবার অন্তত চেষ্টা করতে পারতাম সর্দারের পাশে গিয়ে দাঁড়াতে!

রেশমি যেভাবে ছুটছে তাতে যে কাউকে ছোবল দিলে এখন নীল হয়ে যাওয়ার কথা। অথচ ও কেমন ধুলাপড়া সাপের মতো গিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়েছে অফিসারের সামনে। আপোষ না মানা হাত দুটো দাসীর মতো গুটিশুটি মেরে বুকের কাছে জটলা পাকিয়েছে।

কিছুক্ষণ আমতা আমতা করে সেলাম ঠুকে সে ধীরে ধীরে বলতে শুরু করেছে। গতকাল সবাই সীমান্তের ওপার রংপুর গিয়েছিল। রংপুর জেলার মুন্সিগঞ্জে হাট বসে জমজমাট। ওখানেই ওরা দলবেঁধে সাপের খেলা দেখাতে যায়। খেলা শেষ করতে সন্ধ্যা হয়ে গিয়েছিল। কোকাবাড়ি পথে ওরা পাটগ্রামে ফিরে আসছিল সবাই। ঠিক তখনই একটি পুকুর ঘাটে বসে আগুন পোহাচ্ছিল কয়েকজন। খুব সম্ভবত আগের রাতে গাঁয়ে কারো গরু চুরি হওয়ায় গোয়ালেসহ গ্রামবাসীরা ক্ষেপেই ছিল। অন্ধকারে এতগুলো মানুষের নাড়াচাড়া দেখে ওরা ধরধর বলে চিৎকার করে ওঠে। গরুচোর মনে করে লাঠিসোটা নিয়ে বেরিয়ে আসে। অনেক মেরেছে। কোলের বাচ্চাগুলোকেও পর্যন্ত রেহায় দেয়নি। যদি রেশমির কথা বিশ্বাস না করে তবে যেন ঐ গ্রামে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসে- সেই আকুতিও সে জানায়।

‘ধরা পরলে সবাই এমনই বলে। আমাকে বলে লাভ নেই। সর তো বাপু।’ রেশমির মিনতি ছুড়ে ফেলে অফিসার উঠে অন্যদিকে চলে যায়। রেশমি জটলায় ফিরে আসে। পিছু পিছু আসে সর্দার। পরাজিত মুখে রেশমিকে খুব দুখী দেখায়। তেষ্টায় ওর ঠোঁটের চারপাশ কেমন শুকিয়ে গেছে। ইচ্ছে করছে এক আজলা জল এনে ওকে খাইয়ে নিজেও একটু খেয়ে নেই। কিন্তু এতো অতি অসম্ভব চাওয়া। মন্ত্র টন্ত্রও কিছুই আর কাজ করছেনা। তাছাড়া এই শীত আমি আর সহ্য করতে পারছিনা। খিদের জ্বালায় আমার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। চোখে ভেঙ্গে ঘুম নামছে। ঘুমের জন্যে সমগ্র শরীর শ্লথ হয়ে আসছে। একটু ঘুমুতে চাই। ঘুম আয়। ঘুম আয়।

বাইরে হৈচৈ রব ওঠছে। হঠাৎ ঘুম থেকে জেগে বুঝতেও পারছিনা যে বেলা কত হলো।

আমাদের সাথেই গন্ডগোল বেঁধেছে ওদের। সর্দারের সাথে সবাই মুক্তির আওয়াজ তুলছে। রক্ষীরা বিক্ষোভ থামাতে গালি ছুঁড়ছে। তেড়ে আসছে। মন্টু কাকার পিঠে একটা ধুমম করে শব্দ হলো। তেনার বয়স প্রায় সত্তর ছুঁইছুঁই। যদিও গায়ে গতরে বেশ শক্ত সামর্থ তবু সে আর্তনাদ করে উঠলো। রক্ষীরা এদিক ওদিক যেদিকে পারছে চাপকাচ্ছে। অন্য ঝাঁপিগুলো থেকেও হিসিহিস আওয়াজ পাচ্ছি। আমার বিন্দুমাত্র শক্তি নেই যে ফুঁসসসস করেও সামিল হব।

ভয়ে শিশুরা কেঁপে কেঁপে ওঠছে। কাঁদছে। কান্না থামাতে মায়েরা ওদের মুখে মাই গুঁজে দিচ্ছে। দিলে কি হবে! না খেতে পেয়ে মাই গেছে শুকিয়ে। কনকনে শীতে ছানাপোনাদের সর্দি লেগেই আছে। নাক বন্ধ, মাই টানতেও পারছেনা। ভয়ে, খিদেয় ওরা সমস্ত শক্তি দিয়ে কাঁদছে। ওদের নিস্ফল কান্না বরফ কণায় জমে যাচ্ছে। কিন্তু রক্ষীদের মন টলছেনা।
 
হট্টগোল ধীরে ধীরে বাড়ছে। 
 
শিশুদের কান্না খোলা হাওয়ায় চক্কর কেটে শেলের মতো বিঁধছে। হৃদপিন্ডটা ব্যথায় টনটন করছে। ইচ্ছে করছে চাঁদনীকে ডেকে বলি ঝাঁপির মুখটা যেন খুলে দেয়। সবগুলোকে ছোবলে ছোবলে শেষ করে দিয়ে এই মানুষগুলোকে মুক্তি দেই। আমিতো জানি বন্দীদশার কি যন্ত্রণা!

বারবছর ধরে আমি এই খাঁচায় বন্দী হয়ে আছি। তবে বন্দী থাকলেও তো খেতে পেয়েছি। সর্দার, রেশমি, বড় সর্দারনী, চাঁদনী আমায় যত্ন করে। মাঝেসাঝে বুকের পিঠে জড়িয়ে রাখে। মিলেমিশে খেলা দেখাই। বীণের সুরে মন মাতিয়ে নাচতে পারি। ঝাঁপি থেকে যখন ছাড়া পাই অন্যদের সাথে খেলা করি। এতকিছুর পরও মাঝেসাঝেই জলে জঙ্গলে মুক্তহাওয়ার মধ্যে ঘুরে বেড়ানোর জন্যে মন আনচান করে ওঠে। মুক্তির নেশায় পাগল পাগল লাগে। শিকল কেটে পালিয়ে যেতেও ইচ্ছে করে।

ছোট্ট একটি খাঁচায় গুটিশুটি হয়ে থাকা যে কি কষ্টের সে আমার চেয়ে কে জানে!

জানি বলেই বহরের এই আটকে থাকার যন্ত্রণায় ছটফট করি। আমি বন্দীদশায় খাবার পেতাম, ওরা বন্দী থাকায় আমাদের খাওয়াও বন্ধ হয়ে গেছে। খিদে, দিনের পর দিন একদন্ডের জন্য বের হতে না পেরে মাথা তোলার শক্তি পর্যন্ত হারিয়ে ফেলছি। আমার ভীষণ ঘুম পায়। ক্ষুধা ও শীতে আমি ঘুমাতেও পারিনা।

চাঁদনী যদি একবার একটু খুলে দিত ঝাঁপিটা। অথবা কেউ যদি একটু খেতে দিত আমায়। অথবা ঐ বীণটাতে একবার কেউ ফুঁ দিত! চেষ্টা করে দেখতাম একটু ফুটো করে বেরিয়ে যাওয়া যায় কিনা।

হট্টগোল থেমে গেছে সেই কখন। কুয়াশার চাঁদরে ঢেকে গেছে নোম্যান্সল্যান্ড। টহলরত রক্ষীরা ঘুমে ঢুলুঢুল করছে। ঢুলছে আবার শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে, হেঁটে, বিড়ি ফুঁকে জেগে থাকারও চেষ্টা করছে। মাঝেসাঝে কালো কুচকুচে মশাগুলো ওদের ঘুম ভাঙ্গিয়ে দিয়ে ফুড়ুৎ করে পালিয়ে যাচ্ছে। ওরা রাগে দুঃখে খিস্তিুও ছুঁড়ছে। ছোটলোকের বাচ্চাদের জন্য এদের এই শীতে ডিউটি বেড়ে গেছে। রাত নেই, দিন নেই যখন তখন বড়বাবুরা তলব পাঠাচ্ছে। তাছাড়া যে জটলা পাকিয়েছে তাতে সহজে গোল মিটবে বলে মনেও হচ্ছেনা।

অফিস থেকে বড়কর্তার নাক ডাকার আওয়াজ ভেসে আসছে। ঘন্টা দুই আগেই তিনি সকলকে চোখকান খোলা রাখার নির্দেশ দিচ্ছিলেন। ভুলেও কেউ যেন দায়িত্বে অবহেলা না করে। বিশেষ করে রাতে। সুযোগ পেলে আমরা পালিয়ে যেতে পারি সেই আশংকার কথা বলছিল। সর্তক করছিলেন সকলকে, এটি মোটেও ছোটখাট কোন ঘটনা নয়। মন্ত্রী-মিনিস্টাররা এই নিয়ে দৌড়ের উপর আছে। তারপরেই তিনি গিয়ে টেবিলে বসেছেন। অতঃপর ঘুম।

এদিকে বিশাল আকাশের চাতালে একদল উদ্বাস্তু ঠকঠক কাঁপছে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে মাখামাখি হয়ে শুয়ে একে অন্যের শরীরে উষ্ণতা খুজছে। আমার পাশেই শুয়ে আছে রেশমি। এ কয়দিনে কেমন নিস্তেজ হয়ে গেছে। নিজেকে কুয়াশায় সমর্পণ করে আঁচলখানা জড়িয়ে আগলে রেখেছে মেয়েকে। ধনুকের মতো বাঁকানো শরীরটা জাপটে ধরে ঘুমুচ্ছে চাঁদনী। যেনো সে ওম পেতে মায়ের কুসুম নরম পেটেই ঢুকে যেতে চায়। চাঁদনীর তবু তো মা আছে। এই যে মা নেই বলে আমি কেমন জমে যাচ্ছি। ঝাঁপিটা একটু খুলে দিলে আমি ওদের জড়িয়ে একটু অন্তত ঘুমুতে পারতাম।
 
কেউ আছ? একবার ঝাঁপিটা খোলে দেবে?
 
এক ঝাঁক জোনাকি আকাশে তারা গুনছিল। আমার ডাক শুনতে পেয়ে ওরা উড়ে এসে ঝাঁপির কাছে দাঁড়িয়েছে। ওরা শুনলো, অথচ পাশে ঘুমিয়ে থাকা চিরস্বজনদের কানে আমার ডাক পৌঁছলনা। ওরা বারবার আমাকে জিজ্ঞাসা করছে। আমার গলা দিয়ে কোনও স্বরই বের হচ্ছেনা। ইচ্ছে করছে ওদের বলি ঝাঁপির মুখটা একটু খুলে দিতে। ইচ্ছে করছে বলি, ওদের বাড়িতে আমাদের একটু জায়গা দিতে। ইচ্ছে করছে বলি, আমাকে না পারলেও ঐ মানুষগুলোকে মুক্ত করে দাও। কিন্তু শীতে আমি জমে গেছি। মনে হচ্ছে কেউ আমাকে বরফখন্ডের মাঝখানে চাপা দিয়ে রেখেছে। ঝাঁপির শক্ত খোলসের জন্যে না পারছি নীচ দিকে ফুটো করে মাটির গর্তে চলে যেতে। না পারছি ঝাঁপির মুখটা খুলে উপর দিকে বেরিয়ে যেতে। একদিকে শীত, অন্যদিকে খিদেয় আমার প্রাণঘাতী হওয়ার খেয়াল চেপেছে। ঝাঁপিতে মাথা নুইয়ে থেকে থেকে ঘাড়টা যেনো বেঁকেই গেছে। একটু আগে যেটুকু বলতে পেরেছিলাম এখন তাও পারছিনা।

কিছুক্ষণ এদিক ওদিক খোঁজে, সাড়া না পেয়ে জোনাকিরা উড়ে যায়। নোম্যন্সল্যান্ডে কুয়াশা ঘন থেকে ঘনতর হয়ে নামে।

ঘুম থেকে জেগে গেছে চাঁদনী। গুঙ্গাচ্ছে। একটু জল খেতে চাইছে মায়ের কাছে। রাত পোহালে দূরের নদী থেকে জল এনে খাওয়াবে বলে রেশমি একহাতে মেয়েকে বুকের মধ্যে জাপটে রেখে অন্যহাতে চোখ থেকে খসে পরা জল মুছে। এরপর কুয়াশা ভেজা চুলে নিজের হাতটা বুলিয়ে মেয়ের ঠোঁট দুটো ভিজিয়ে দেয়। চাঁদনী চুকচুক করে আবার ঘুমিয়ে যায়।

রাত থামলে জোনাকিরা আলো নিভিয়ে ঘরে ফিরে গেছে। মেঘের আড়াল থেকে সহসাই সোনারোদ উঁকি দিয়েছে। রোদের আঁচে মনটা চনমন করে ওঠে। হুরমুরিয়ে সে রোদ পালিয়েও যায়। বিকেল ঘনায়। ঝমঝমিয়ে সন্ধ্যে নামে। মাটি ফুঁড়ে বরফ নদী জেগে ওঠে। বুকের পাঁজর ভেদ করে সাঁইসাঁই ছুটে যায় ভিজে হাওয়া। দূরে রক্ষীরা বনের কুন্ডলীতে আগুন পোহায়। সে আগুন দূর থেকে দেখে আমরা জমে যেতে যেতেও জমে যাইনা। দূরের কোন গাঁয়ে বাউল গানের আসর থেকে প্রায় রাতেই গান ভেসে আসে।

এরমধ্যেই কানাঘুষা চলছে, বিবৃতি ধাওয়া পাল্টা ধাওয়া চলছে। ‘এই সাপুড়েরা বাংলাদেশের নয়। এটা ওপারের মদদেই হয়েছে।’ অন্যপক্ষ বলছে, বাংলাদেশ থেকে বেআইনীভাবে ওরা ভারতে ঢুকেছে। এপার ওপারের, কাদা ছিটাছিটাতে আমাদের মুক্তি ক্রমশ অনিশ্চিত হয়ে যাচ্ছে।

খোলা আকাশের নীচে আমাদের রাত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। আকাশের নীচে বসেও আমরা আকাশের নাগাল পাচ্ছিনা। সীমান্তের পাড়ে বসেও কোন দেশ পাচ্ছিনা। মানচিত্রে আমাদের ঘরটি কোথায়- এই নিয়ে দুই দেশ ফ্ল্যাগ মিটিং করেই যাচ্ছে। আহারে ফ্ল্যাগ মিটিং। প্রাণের চেয়ে কত দামী। পেতাম একবার ছাড়া, সবগুলোকে দিতাম কামড়ে ।

রাত বয়ে যায়। বরফের সাগরে বসে পৌষের আগুনের প্রতীক্ষা করি। যদি কোন সুখ পাখী এই নোম্যান্সল্যান্ডে এসে নামে। চাতকের মতো সেই আশেই থাকি।
 
বিভীষিকাময় এই সময়েও রেশমি গুনগুন গাইছে।

মোরা এক ঘাটেতে রান্ধিবাড়ি

মোরা আর এক ঘাটে খাই

ও মোদের সুখের সীমা নাই. . . . .
 
রেশমির সুরে সর্দার খেঁকিয়ে ওঠে। ‘ছিনালি, এত সুখ তোর মনে, যে গান আসে! আমার সামনে থেকে ভাগ।’ রেশমি এক ঝঁটকায় উঠে দাঁড়িয়ে মুখ ঝামটা দিয়ে অন্যদিকে চলে যায়। এমন সময় একটি গাড়ি এসে থামে। গায়ে লাল রঙের ক্রস। পিঠে খাগী কাগজের চারকোণা কার্টুন।
 
সকলে অনেকদিন পর কিছু একটা দেখারমতো জিনিস পাওয়ায় হুমড়ি খেয়ে পড়ে। আমারো মনে হয় সকলের সাথে এক ঝলক গিয়ে দেখে আসি! তবে যেতে না পারলেও শুনতে পাই, রেডক্রসের গাড়ি এসেছে। বিষয়টা বুঝতে সকলের বেশ কিছুক্ষণ সময় লাগলেও, বুঝতেপারা মাত্রই বইতে লাগলো আনন্দের জোয়ার। ঝড়ের বেগে ছুটে যেতে লাগলো সব। চাঁদনী খুশিতে হাততালি দিয়ে লাফিয়ে উঠলো। গাড়িটির কাছাকাছি পৌঁছানোর জন্য একসাথে সকলে ঝাঁপিয়ে পড়লো।

ততক্ষণে রক্ষীরা চলে এসেছে। সকলকেই অপেক্ষা করতে হবে কিছুক্ষণ। শরণার্থীর দলে নাম উঠে গেছে আমাদের। তাই সব মালামাল আমরাই পাবো। অধৈর্য্য হলে চলবেনা। শান্ত থাকতে বলছে সকলকে। সামনে খাবার থালা রেখে ক্ষুধার্ত নেকড়েকে বলছে অপেক্ষা করতে! রাক্ষুসে পেটের সাথে যুদ্ধ করে এই মানুষেরা কেমন করে টিকে আছে তা বোঝার সাধ্য ওদের কোথায়! আমাদের কথা নাইবা বললাম। অবশ্য, আমি ঠিক জানিওনা এখন কতজন আছি।

আমরা হলাম জনশুমারীর বাইরের প্রাণ। একটা ঝাঁপির মধ্যে আছি কি নেই, খিদে পায় কি, পায়না- কারো জানবার প্রয়োজনই পড়েনা। তবে ওরা খাবার পেলেই আমরা পাবো, এতে কোন সন্দেহ নেই। তাই চাঁদনীর মতো আনন্দ আমারও হচ্ছে। ওর সাথে আমার পার্থক্য হল ও তালি বাজিয়ে, নেচে সে আনন্দ প্রকাশ করতে পারছে, আমি পারছিনা। নুইয়ে থাকতে থাকতে আমার ঘাড়টা মাটির সাথে মিশে যাচ্ছে।
 
বেলা বাড়ছে। তীর্থের কাকের মতো সব বসে আছে রিলিফের আশে।
 
‘এই লাইনে দাঁড়াও’-
 
ডাক পড়লো। কার আগে কে দাঁড়াবে এ নিয়ে ঠেলাঠেলি শুরু হয়ে গেছে। না মানছে সর্দার, না মানছে নিয়ম। সর্দারও কেমন নিস্তেজ হয়ে গেছে। ভিখিরির মতো লাইনে দাঁড়িয়ে গেছে। একজনের পিছনে অন্যজন এগিয়ে যাচ্ছে।
 
রিলিফে শুকনা রুটি, কলা, গুড়ো দুধ, চিনি আর বিস্কুটের সাথে ত্রিপলও দিয়েছে। কতদিন পর খাবারের গন্ধ পাচ্ছি। আহা। কি আনন্দ। আমারও যেন তর সইছেনা আর। মন বলছে, সুখপাখি এল বলে শঙ্খিনী।

ছোটরা চোখের নিমিষেই তাদের ভাগেরটা খেয়ে নিয়ে আবার মায়ের কাছে হাত পাতে। ওরা নিজেদের ভাগ থেকে সন্তানের মুখে গুঁজে দেয়। সূর্যমুখী হাসি ছড়িয়ে তারা গপগপ করে খেয়ে খেলায় মন দেয়। মায়েরা সেই তৃপ্ত মুখখানি দেখে ক্ষুধার তিমিরে নিরবে ডুব দেয়।

আমাকে একটু দুধ আর রুটি দিয়ে গেছে রেশমি। আমিও খেয়ে নিয়েছি। তবু বুকটা হুহু করছে। ক্ষুধায় যদি ছোবল দিয়ে বসি, সেই ভয়ে আজ রেশমি আমার ঝাঁপির মুখটা ভালোভাবে খুলে দেখেনি। ক্ষুধার রাজ্যে মিত্র বলে বুঝি কেউ নেই। বুভুক্ষা পৃথিবীতে সকলেই সকলের শত্রু। সে যাইহোক, অনেকদিন পর খেতে পেয়েছি, এই অনেক। খাওয়ার পর ঘুম পাচ্ছে খুব। রাত নামার আগেই একটু ঘুমিয়ে নিতে চাই। রাতে কুয়াশার সমুদ্রে ঘুম আসেনা। তখন রাত শেষ হওয়ার জন্যে অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছুই করার থাকেনা।

এভাবেই সাতগাছিতে মাস বয়ে যায়।
 
অনেকদিন পর আজ রোদ ওঠেছে। ওরা এখানে ওখানে বসে রোদ পোহাচ্ছে। বাচ্চারা খেলছে। চাঁদনীর চুলের জটলা খুলে উকুন বেছে দিচ্ছে বড় সর্দানী। সোলেমানসহ বেটাছেলেরা এককোণে বসে মাটি খুঁড়ছে, এটা সেটা নিয়ে গল্প করছে। রক্ষীরা মাঝসাঝেই দূর থেকে টহল দিয়ে ঘুরে যাচ্ছে। সর্দার আমার পাশ ঘেষে বড় সর্দারনীর কাছে গিয়ে দাঁড়িয়েছে।

রেশমি মুখ থেকে থুতু নিয়ে গলার ভাঁজে জমে থাকা ময়লা তুলায় ব্যস্ত। সর্দারের উপস্থিতি তার নজর কারলোনা। সর্দার চামেলীর কাছে বসে মাটিতে আঙ্গুল দিয়ে দাগ কাটতে কাটতে ঝাঁপিগুলো ঠিকঠাক আছে কিনা জিজ্ঞাসা করে। নিচুস্বরে জানিয়ে যায়, ‘আমরা বাংলাদেশের দিকেই যাব। এই সীমান্ত পাড়ি দেয়া হবেনা। রাত নামলেই ছুটতে হবে।’ বাপুজির কথা শেষ হলে চাঁদনী মাথাটা উল্টে চামেলীকে বলে,‘ আম্মা বাপুজিরে বলেননা, সাপগুলা ছাইড়া দিক। ওদের কামড়ে দিলে আমরা চলে যাই।’ চামিলী মেয়ের কথার উত্তর না দিয়ে দিয়ে রেশমিকে ডাকে। দুজনে নিচুস্বরে ফিসফিস করে দোলে দোলে মাঠের পূর্বদিকে চলে যায়। 
 
আমরা রাতের আঁধার নেমে আসার প্রতীক্ষায় বসে থাকি।

আকাশ থেকে ঝর্নার মতো কুয়াশা নামে। মেঘের আঁধার চিরে চাঁদ ভাসে ডুবে। কুয়াশায় রোশনায় আঁধারও যেন চোখে পড়েনা। খসে খসে পড়া বরফ কণায় আজ আমার মরে যেতে ইচ্ছে করেনা। খাঁচায় শুইয়েও আজ আমি নোম্যান্সল্যান্ডের জোনাকি পাখীগুলোকে দেখতে পাই। মুক্তি কি অপরূপ। কি প্রশান্তির।

কুয়াশা মুড়ি দিয়ে রাত্রি ছুটে যায়। সকলেই গুটিগুটি পায়ে সামনে এগোয়। ফাঁটল ধরা জমি ফুঁড়ে বসে থাকা ধানের নেড়ায় পা ফুটিয়ে কেউ কেউ ওহ্ আহ করে। কেউ টুঁ শব্দটি না করে চোখের জল ফেলে। কি আশ্চর্য! যে আমি মৃত্যু যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিলাম, সেই আমি ছোট সর্দারের কোল থেকে ধুমধাম আছড়ে পড়েও কোন কষ্টই পাচ্ছিনা। রেশমির চোখদুটোও কেমন নীল মার্বেলের মতো জ্বলজ্বল করছে। অন্ধকারে আমি ঠিক দেখতে পাচ্ছি। ওর দৃষ্টি ঐ খুঁটির দিকে। ঐ সীমানা একবার পেড়িয়ে যেতে পারলেই মুক্তি।

মুক্তির নেশায় সবাই হন্যে হয়ে ছুটছি। হঠাৎই একটা সাইরেন বেজে উঠলো। হৈহৈ করে উঠলো চারিদিকে। হৈহৈ ছুটে আসছে আশেপাশের গাঁয়ের মানুষেরা।

‘ধর ধর, ওদের ধর।’

তোপের মুখে টিকতে না পেরে আমরা আবার খোলা প্রান্তরে ফিরে আসি। ততক্ষণে কারো মাথায়, কারো কানে, কারো হাতে, পা চুইয়ে রক্ত ঝরছে। রেশমির চোখে চোট লেগে ফুলেফেঁপে ঢোল হয়ে গেছে। কোলের বাচ্চাগুলো ব্যাথায় হাউমাউ করে কাঁদছে। অগণিত ঢিল, শিশু বুড়ো কাউকে ছাড় দেয়নি। মায়েরা নিজেদের ব্যাথা নিয়ে ওদের কান্না থামানোর জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করছে। কেউ কেউ গোপনে কুকাচ্ছে। আবারো শীতে আমি জমে যাচ্ছি। আকাশ পাতাল থেকে ধেইধেই করে ছুটে আসা হাওয়ায় আমার আত্মাটা বরফকণার মতো জমে যাচ্ছে। মাথাভাঙ্গায় আমার পদ্মমাসী থাকে। মাসীকে যদি একবার একটা খবর পাঠাতে পারতাম!

উত্তরিয়া বাতাসের তেজ কমেছে। নিরদ্দেশে থাকা সূর্যের মন ফিরছে পৃথিবীর দিকে। নোম্যন্সল্যান্ডকে আগের চেয়ে কিছুটা ঝলমলে দেখায়। কুয়াশার আস্তরণ ভেদ করে সকলের নড়নচড়ন বেড়েছে। অযথাই ওরা এদের, এরা ওদের শাপশাপান্ত আর করছেনা। রক্ষীদের চাহনিতেও নরম রুদ্দোরমাখা। মাথুই আজকাল আর আমার মস্তকের উপর থুথু ছিটিয়ে যায়না। দেখতে দেখতে ওদেরও অভ্যস্থতা এসে গেছে। ঐতো আমার থেকে তিন চার হাত দূরে বসে ওরা খবরের কাগজ পড়ছে। একজন পড়ছে। সকলের সাথে আমিও শুনছি। ‘রাষ্ট্রপ্রধানরা সীমান্তের বিষয়টি গুরুত্বের সাথে দেখছেন। তবুও আগামী চৌঠা ফেব্রুয়ারীতে হয়ে যাওয়া ফ্ল্যাগ মিটিং বৈঠকে এপাড় ওপাড়ের গোলবক্সে, ওপাড় এপাড়ের গোলবক্সে বল ছোঁড়াছুড়ি করেছে--কোন সুরাহাই হয়নি। ’ এইটুকু চনমনে মনটা কেমন জমে যাওয়া শুরু করেছে।

সভা বিফলে যাওয়ায় সংকট বেড়ে গেছে। সঙ্গে বেড়েছে সীমান্তে উত্তেজনা। সংবাদপত্রগুলো হলুদ-মরিচ-ধনে-গরমশলা মিশিয়ে রসনাতৃপ্ত করে খবর ছাপছে। সভার পর থমথম করছে চারদিক। শোনা যাচ্ছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে। যুদ্ধও নাকি লেগে যেতে পারে। ভয়ে আশেপাশের গ্রামবাসীরা অনেকেই নিরাপদ দুরত্বেও চলে যাচ্ছে। আমরা যে কোথায় যাব এই ভেবেই শালগ্রামশীলার মতো নিথর হয়ে যাচ্ছে সবাই। দেশ, মানচিত্র, ভিটে, ভোট এগুলো আর ভাবনাতেও নেই। হোক এই খোলা আকাশের নীচে তবু যেন প্রাণটা নিয়ে সকলে বেঁচে থাকতে পারে সেই প্রার্থণায় সকলে নিজেদের শপে দিয়েছে।

বিশাল এই আকাশের নিচে কত ক্ষুদ্র আমরা। না সৃষ্টিকর্তা, না মানুষ, না শয়তান কারো কাছেই আর্তনাদ পৌঁছাচ্ছে! আজ আবার মায়ের জন্যে মন কেমন করছে। এই আকাশ তো আমাদেরও। আমরাও খোলা আকাশের নীচে দাঁড়িয়ে নিশ্বাস নিতে চাই।

সর্দারের শ্বাসটানটা বেড়েছে। চাঁদনী ভয় পেয়ে কাঁদছে। বাবার কাছে গিয়ে সে আবারো একই আর্জি জানাচ্ছে। সর্দার মেয়েকে কাছে টেনে জড়িয়ে ধরে। আমার চোখ ভেসে যায় জলে। আমি জানী, সর্দার শত বিপদেও অন্যায় কিছু করবেনা। কিন্তু কিসের ন্যায় আর অন্যায়! আমি চাই তিনি চাঁদনীর কথা শুনুক। একবার ঝাঁপির মুখ খুলে দিক। তারপর সকলে মিলে সব সীমানা লন্ডভন্ড করে দেই। আকাশের আবার সীমানা কিসের!
 
সীমান্তে ঘনঘনই গাড়ি আসছে। রক্ষীদের বহরও ঘন হয়েছে। খানিক দূরেই বন্দুক তাক করে দাঁড়িয়ে আছে সেপাইরা। তবে কি এটাই যুদ্ধ! মানুষের যুদ্ধ আমি দেখিনি। কিন্তু বুঝতে পারছি সীমান্তে কিছু একটা ঘটছে। মাথুই, বলরাম ওরা বেজার মুখে ঘুরে বেড়াচ্ছে। কিছু একটা ঘটবে ঘটবে বলে ঢং ঢং বাজছে।

হঠাৎই সূর্যটা পালিয়ে গেল। সাতগাছিতে শীত হীমাঙ্কের নীচে এখন। ছমছম করছে ভোর দিন রাত। কাছেই আমার পদ্মমাসী থাকে। একবার যদি সে এদিকে আসতো। একবার যদি তাকে আমি ডাকতে পারতাম. . . . .!

গোয়ালের গরুগুলিকে মাঠে চরিয়ে, খোয়ারের মুরগীগুলোকে ছেড়ে, বাসী দুয়ারে গোবর ছিটিয়ে রোজকার দিনের মতো কৌতূহলী মানুষেরা নিশ্চয়ই এখন জিরো পয়েন্টে এসে দাঁড়িয়েছে। রাতারাতি কোথায় সব উধাও হয়ে গেল এই নিয়ে ওরা বলাবলি করছে। খবরের কাগজে নিশ্চয়ই ঝড় উঠেছে। একদল বলছে, বহরটি ওদেশে ফিরে গেছে। অন্যদল বলছে, ওরা এপাড়ে কোনভাবেই আসেনি। আমাদের রক্ষীরা তাদের দায়িত্বে অবিচল ছিল।

আমাদের মলিন কাপড়-চোপড়, হ্যারিক্যান-স্টোভ, শতছিন্ন ত্রিপাল, ঝাঁপিগুলো শীতে জমেজমে আর মাথা তুলতে পারছেনা। ওরা মানুষের ভাষাও জানেনা। জানলে, সকলের কৌতুহলের অবসান ঘটাতে পারতো!



সময়কাল: ২০১৮-২০২১


লেখক পরিচিতি:
জয়শ্রী সরকার
গল্পকার। গবেষক


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন