সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

ওয়াসি আহমেদ'এর গল্প : ডলফিন গলির কুকুরবাহিনী

লেকসার্কাস ডলফিন গলির বেওয়ারিশ কুকুরগুলোকে যেদিন সিটি কর্পোরেশনের লোকজন ট্রাকে চড়িয়ে নিয়ে বিদায় হলো, ঘটনার নির্মমতা ও আকস্মিকতা সত্ত্বেও গলিবাসীরা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল।

রাত ঘন হওয়া মাত্র কী যে অনাচার শুরু হতো! গলিতে সবে গাড়ি-টাড়ির পেঁ-পোঁ থেমেছে, পথচারির চলাচল নেই, স্ট্রীটলাইটের নিচে চোরাগোপ্তা কুয়াশা, দরজা আটকানো ঘরবাড়িতে জোড়া-জোড়া কি নিঃসঙ্গ বালিশে মাথারা ডুবুডুবু অমনি শুরু হতো। প্রথম-প্রথম এক-আধটা উদাস খাপছাড়া হাঁক, পরপরই পালে পালে হালুম-হুলুম। শুরু হলো তো চলল। নিশুতি রাতে কুকুরের দখলে চলে যেত আশাপাশের যত লেন, বাইলেন। দিনের বেলার লাথি-ঝাঁটা, ইট-পাটকেলের শোধ তুলতেই যেন জোটবাঁধা সন্ত্রাস।

গলিতে কুকুরের সংখ্যা বাড়ছিল অলক্ষে। লক্ষ করার বিষয়ও নয়। একেকটা মাদি বছরে সাত-আটটা বিয়োয়। খেতে না পেয়ে, গাড়ি-চাপা পড়ে সংখ্যা কমলেও যা থাকে তা যে ভয়াবহ, গলিবাসীরা রাতের পর রাত অতিষ্ঠ হয়ে টের পেল। প্রথমদিকে কেউ কেউ ধারণা করত, সাবধানী প্রাণী, হয়তো রাতে কিছু টের পায়। চোর-ছ্যাচড়ের উৎপাত তো জানা কথা, অন্য কিছুও হতে পারে। বেওয়ারিশ হলেও স্বভাবজাত সাবধানতায়ই হয়তো চেঁচায়। কিন্তু বালিশে মাথা ঠেকানো যাবে না, সারা দিনের ঝঞ্ঝাটের পর একটুখানি স্বাধীনতায়ও হুমকি, কার সহ্য হয়! সমাধানের উপায় নিয়ে কেউ তেমন মাথা ঘামায়নি। রাত পার হয়ে গেলে দিনের ইঁদুর-দৌড়ে সমস্যাটা চাপা পড়ে যেত। ফলে আবার রাত ভারী হয়ে নামতে বিছানায় এপাশ-ওপাশ, বালিশ খামচাখামচিই সার হতো!

এমন যখন অবস্থা তখন সিটি কর্পোরেশনের কুকুর-ধরা ঠ্যাঙাড়ে বাহিনী এক সকালে গলিতে হানা দিয়ে ভোজবাজির মতো বেওয়ারিশ কুকুরগুলোকে ধরে ধরে ঝটপট ট্রাকে তুলে নিয়ে বিদায় হলো।

এত বড় কাণ্ড এত সহজে ঘটিয়ে ফেলা সম্ভব, চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা শক্ত হতো। অবশ্য সকল প্রশংসা ঠ্যাঙাড়ে বাহিনীর। সুশৃঙ্খলভাবে, নিপুন পেশাগত দক্ষতায় তারা কাজটা সমাধা করেছে। প্রথমে তারা দু-তিনজনের ছোট ছোট দলে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পাউরুটি, বিস্কুটের লোভ দেখিয়ে, মুখে চোঁচোঁ আওয়াজ তুলে একেকটা কুকুরকে কাছে টেনেছে; তারপর আচমকা দলের একজন লোহার বেড়ি দিয়ে কুকুরটার গর্দান চেপে ধরেছে, সঙ্গে সঙ্গে দলের আরেকজন হাতখানেক লম্বা ইনজেকশনের সিরিঞ্জ মাটিতে শাবল পোঁতার মতো ঘাড় বরাবর বিঁধিয়ে দিয়েছে। কয়েক সেকেন্ডের অপেক্ষা, হাতের পাউরুটির কি বিস্কুট হাতেই রয়ে গেছে, ওদিকে ঘাড় হেলিয়ে কুকুরটা নেতিয়ে পড়েছে। একের পর এক। এগলিতে ওগলিতে। পরের কাজটুকু সোজা টেনে টেনে হালকা ভারি মাঝারি ওজনের কুকুরগুলোকে ডালা-খোলা ট্রাকে তোলা আর বিদায় হওয়া। যারা দেখেছে—গলির দোকানদার, লন্ড্রির কর্মচারী, ফেরিঅলা, পথচারী, জন্মান্ধ ভিখিরি--তারা সুস্থির হয়ে কৌতূহল মেটানোর সুযোগ পায়নি। পেশাগত এই ক্ষিপ্রতায় তারা অভিভূত হয়েছে। তারপর চমকে, বিস্ময়ে যখন এ ওর মুখোমুখি হয়েছে, মুখে কথা আটকে গেছে। শেষ নভেম্বরের ঈষদুষ্ণ আকাশ ততক্ষণে মাথার ওপর পালের মতো ফুলে উঠেছে।

পাড়ার কেউ যে উদ্যোগী হয়ে কাজটা করিয়েছে তা-না। জানা গেল, কুকুর ধরা বাহিনী সিটি কর্পোরেশনের একটি বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত স্কোয়াড। বছরে কয়েক বার তারা তাদের প্রশিক্ষণকে কাজে লাগাতে এলাকা বাছাই করে কাজে নেমে পড়ে। একটা সময় গেছে, যখন তাদের কাজের পদ্ধতি ছিল বেশ ক্রুড। ইনজেকশনের বদলে তারা ব্যবহার করত দশাসই মুগুর। মোক্ষম নিশানায় মাথার পেছন বরাবর এক আঘাতেই একটা কুকুরকে চিরদিনের মতো ঘুম পাড়িয়ে দেওয়া যেত। সে-তুলনায় আজকালকার ব্যবস্থা স্মার্ট, ঝুটঝামেলাহীন। আর মালিকহীন বেওয়ারিশদের দেখামাত্র চেনা যায় বলে, বাছাই করা পাড়া বা মহল্লায় হানা দিয়ে স্থানীয়দের সাহায্য-টাহায্য ছাড়াই নির্বিঘ্নে কাজ সেরে ফেলা যায়।

ট্রাকে চড়ে কুকুরবাহিনী বিদায়ের দিনটা আর পাঁচটা দিনের চেয়ে অন্যরকম গেল। পাড়াময় খবরটা রটে যেতে লোকজনের কথাবার্তায় প্রসঙ্গটা নানাভাবে ঘুরে ফিরে এল। ছোটরা নিজেদের মধ্যে উৎসাহী বর্ণনা-পাল্টাবর্ণনায় মেতে রইল। বড়দের প্রতিক্রিয়া কিছুটা মিশ্র। কেউ কেউ সিটি কর্পোরেশনের সময়োপযোগী পদক্ষেপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। কুকুর-ধরা স্কোয়াডের দক্ষতার গুণগান করতে গিয়ে তারা এক ফাঁকে খোদ মেয়রের গুণকীর্তনে ঝুঁকে পড়ল। নাগরিক জীবন শান্তিময় করতে কুকুর-ধরা (এমনই দক্ষতায় ও ক্ষিপ্রতায়) যে দূরদর্শী পরিকল্পনার ফল, এ নিয়ে মুক্তকণ্ঠে মতামত ব্যক্ত করল। আগামীতে বেড়াল, ভিক্ষুক, ফুটপাত দখলকারী হকার, মেয়েদের গলার হার, কানের দুল ছিনতাইকারী ছিঁচকে মাস্তান, চাঁদাবাজ, নেশাখোর, ঘুষখোরদের ওপরও যে একই কায়দায় সুশৃঙ্খলা হামলা চালানো হবে এবং ডালা-খোলা ট্রাকে করে হোক বা অন্য কোনো লাগসই কায়দায়ই হোক, নির্বিচারে নির্মূল করা হবে, এ বিষয়েও সাধ্যমতো ভবিষ্যদ্বাণী শোনাল। কেউ কেউ অন্য কথা বলল। আগাগোড়া ঘটনাটাকে অতি নিচু স্তরের নাটক ভেবে তারা নাক সিঁটকাল। বলল, শহরের মশা-মাছি, আবর্জনা-জঞ্জাল,যানজট, জলজট, খুন-রাহাজানির মতো হাজারটা জরুরি কাজের সব কটার বারোটা বাজিয়ে পাড়ায় পাড়ায় কুকুর-মারা স্রেফ লোক দেখানো ভড়ং। আগামী ইলেকশনে অতীত সাফল্য হিসেবে নিশ্চয় কোন পাড়ায় কটা মদ্দা বা মাদি মারা হয়েছে তার ফিরিস্তি দেওয়া হবে; চাই-কি রোদে শুকিয়ে সযত্নে তুলে রাখা মরা কুকুরের কাটা লেজ প্রমাণ হিসেবে দাখিল করা হবে।

প্রতিক্রিয়া যার যেমনই হোক, এ কথা তো দিনের আলোর মতো সত্য যে কুকুরের অত্যাচারে-অনাচারে-বেলেল্লাপনায় গলির বাসিন্দাদের জীবন অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। আর তাই ট্রাকে চড়ে কুকুরবাহিনী বিদায় হওয়ার পর দিনগুলো যেমনই কাটুক, রাতগুলো যে শান্তিময়, নিদ্রাময় হবে এ নিয়ে কারো সংশয় রইল না। অনুভূতিটুকু গলির আবালবৃদ্ধবনিতাকে একরকম চমকে দিল। তারা ভেবে ভেবে অবাক হলো, কত কাল তাদের চোখ ভরে ঘুম নামেনি। গাঢ়, গভীর অতল ঘুম। চেতনহীন অতল আঁধারে কত কাল তারা সাঁতার কাটেনি যেখানে স্বপ্ন নামের রঙিন মাছেরা পাখনা দুলিয়ে খেলা করে। এর বদলে রাতের পর রাত তারা মুহুর্মুহু দুঃস্বপ্নে ঘায়েল হয়েছে। দিনের বেলার গ্লানি-হতাশা বিকট চেহারা নিয়ে রাতের আঁধারে দরজা-আটকানো ঘরে ঘরে নির্বিচারে হামলা চালিয়েছে। কত কাল পর তারা নির্ভেজাল ঘুমের আমেজ ফিরে পেতে যাচ্ছে! ভেবে ভেবে তারা উজ্জীবিত বোধ করল। কারো কারো এমনও মনে হলো এর অপর নাম মুক্তি, দিনের ঘানিটানা, পরাধীনতার পর রাতভর অপার মুক্তি।

প্রথম প্রথম কয়েকটা রাত গেল অন্যরকম। রোমাঞ্চকর, আনকোরা। শশারগোল নেই, বুক ধড়াস্ করা হাক-ডাক নেই। নিঝুম রাতগুলো নির্ভেজাল রাত। শব্দহীন স্তব্ধ রাত ভারি থমথমে হয়ে উঠতে নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসেও রোমাঞ্চের সুড়সুড়ি জাগে। সমান্যতম খুচরো আওয়াজে কানের পরদা চনমন করে ওঠে। গলিবাসীদের জন্য এ এক আচানক অভিজ্ঞতা। তারা মনে করতে পারে না আগে কখনো এমন হয়েছে। ঝিমঝিম নীরবতায় তারা শিউরে শিউরে ওঠে। অনভ্যাসের ফল, তারা ভাবে। দীর্ঘ-দীর্ঘ দিন শান্তিহীন হইচই-এ খাবি খেতে খেতে আচমকা অথৈ নীরবতায় তাদের মন-প্রাণ আচ্ছন্ন হয়ে থাকে। এলোমেলো কত কথা মাথায়। আকুলিবিকুলি করে! তারা প্রকৃতির কথা ভাবে, নিজেদের শৈশবের কথা ভাবে। আর ভাবে মুক্তি। রাতভর টানা মুক্তির আমেজটুকু যদি হাতে পায়ে মুখে সারা শরীরে সুগন্ধির মতো মেখে নিতে পারত! ভেবে ভেবে বালিশে মাথা ঠেকাতে গিয়ে তারা থমথম নৈঃশব্দে ডুবে যায়। কিন্তু অতল অন্ধ আঁধারে নিজ নিজ হৃৎপিণ্ডের আকুল শব্দে, শব্দতরঙ্গে তারা হতবিহ্বল হয়ে পড়ে। ভেবে পায় না কোথায় ছিল এই প্রাণস্পন্দন! রাতের পর রাত কুকুরের কারণে তারা খোয়াতে বসেছিল বেঁচে থাকার অত্যাশ্চর্য ছন্দময় গুঞ্জন। ভাবতে ভাবতে গাঢ়-গভীর-স্তব্ধ রাতে তাদের উসখুস জাগে। ঘুম আসে না।

রাতের অভিনব অভিজ্ঞতার কথা লোকজন দিনে বলাবলি করে। বলতে তাদের ভালো লাগে। আর বলতে গিয়ে দেখে নিজেদের ব্যক্তিগত, নিজস্ব অভিজ্ঞতা মোটেও ব্যক্তিগত নয়, বরং যাকে বলে সমষ্টিগত, যৌথ। নির্ঘুম রাত কাটানোয় তাদের চোখে জ্বালা করে, জ্বালা-ধরা ফোলা চোখে তারা একে অন্যকে দেখে এবং কুকুরহীন বিরান গলিতে নৃত্যপর রোদ-ছায়ার জড়াজড়িতে বিভোর হয়ে পড়ে।

ডলফিন গলিতে সফল অভিযানের পর একে একে আশপাশের পাড়া-মহল্লায় একই কায়দায়, একই রকম ক্ষিপ্র দক্ষতায় ‘অপারেশন ডগ' পরিচালিত হয়। পত্র-পত্রিকায় প্রশংসার ফুল ফোটে। বলার অপেক্ষা রাখে না, কুকুরের অত্যাচারে-অনাচারে-বেলেল্লাপনায় ডলফিন গলির বাসিন্দাদের মতো আশপাশের পাড়া-মহল্লার বাসিন্দাদেরও জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল, রাতের ঘুম হারাম হতে বসেছিল। এও বলার অপেক্ষা রাখে না, এপাড়ায় ওপাড়ায় ডালা-খোলা ট্রাকে চড়ে কুকুরের পাল বিদায় হওয়ার পর ডলফিন গলির বাসিন্দাদের মতো অন্যরাও ঘটনার নির্মমতা ও আকস্মিকতা সত্ত্বেও হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছে। উপরন্তু এও বলা বাহুল্য, কুকুরের হাক-ডাকহীন স্তব্ধ শান্ত নিশুতি রাতে ডলফিনবাসীদের অভিজ্ঞতার সঙ্গে তাল মিলিয়ে এপাড়ায় পাড়ায় অন্যদেরও জোড়া-জোড়া চোখের পাতা খোলা থেকে গেছে।

ফলে রাতের পর রাত পার হয়ে গেলেও ঘুম কিংবা মুক্তি কারো কাছেই ধরা দিতে চাইল না। মনে হলো এই আসবে, এই আসবে। অথচ পিছলে যাচ্ছে। অন্যদিকে ঘুমহীন খরখরে চোখে জ্বালা বাড়িয়ে রাতভর উসখুস ভাবটাই স্থায়ী হওয়ার পাঁয়তারা করতে লাগল। কী যেন ছিল, কী নেই। মগজে খাঁজগুলো পূর্ণ করে ছিল। শরীরের অস্থিসন্ধিতে তাবিজ-মাদুলির মতো ছিল। এখন নেই। খালি, শূন্য, ফাঁপা।

মুক্তির আশায় বুকের ভেতরটা যতই আইঢাই করুক, একের পর এক দীর্ঘ রাত ঘুমের অপেক্ষায় থেকে থেকে মানুষজন তাদের ফুলোফুলো লাল চোখ নিয়ে অধৈর্য হয়ে পড়ল। কী ছিল, কী নেই তাদের মাথায় এল না। কেনই-বা সারাক্ষণ উসখুস। তাদের কারো কারো তখন রেওয়ারিশ কুকুরগুলোর মুখ মনে পড়ল। পালে পালে মদ্দা, মাদি, কুঁচোকাঁচা, লোম-ওঠা, লোম-ঢাকা, লেজকাটা, তিনপেয়ে, আড়াইপেয়ে, ঘেয়ো শরীর, রক্ত-পুঁজ-মাছি। নানা আকারে-আকৃতিতে এরা ছিল। যত্রতত্র ছিল। ঘরের সামনে, ড্রেনে, ডাস্টবিনে, মুদিদোকানে, কসাইখানায়, গলির পথে পথে, দৃষ্টির সবটুকু সীমানায়, মগজের খাঁজে-খাঁজে। এত দূর ভেবে তারা থমকালো। তাই তো জন্মাবধি ছিল, তাবিজ-মাদুলির মতো, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের মতো ছিল।

আসলে ডালা-খোলা ট্রাকে করে বিদায় হওয়ার সময় কুকুরবাহিনীর সাথে ডলফিন গলিবাসীদের কিছু কিছু অসাবধান অঙ্গ-প্রতঙ্গও যে চালান হয়ে গিয়েছিল, তারা তখন খেয়াল করেনি। তারা মুক্তির কথা ভেবেই হাঁফ ছেড়েছিল।



১৯৮৬

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন