সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

চেতনার চৈতন্য, মগ্নচেতনা-ভগ্নচেতনা বনাম ওয়াসি আহমেদের গল্প: পুরুষোত্তম সিংহ


বাংলা গল্প আজ বহুমুখী নেটওয়ার্ক নিয়ে আমাদের কাছে হাজির। স্থির-অস্থির সময়ের কানা ক্যানভাসের কনস্ট্রাকশন নিয়ে উপস্থিত। ভিন্ন ভিন্ন ভুবনের লেখকরা বিভিন্ন সমাজবাস্তবতা নিয়ে এসেছেন। শুধু পশ্চিমবঙ্গের কথা ধরলেই নানা প্রবণতা খুব সহজেই চোখে পড়বে। ভারতেই পশ্চিমবঙ্গের বাইরে আরেক ভুবন আছে। বিদেশের পাশাপাশি পার্শ্ববর্তী দেশ বাংলাদেশেও গল্পের আখ্যান-রীতি-স্টাইল নিয়ে নানা বিবর্তন চলছে। তবে দীর্ঘসময় অতিক্রম করেও সমান্তরাল গল্পের প্রতি আজও মানুষের প্রবল ঝোঁক। গল্প-উপন্যাস ভাত ঘুমের বিশল্যকরবী হয়ে আজও বেঁচে আছে। সাহিত্যের ছাত্রছাত্রীদেরও ওই দিকে প্রবল ঝোঁক। পাঠ্যসূচির বাধ্যবাধকতায় হয়ত কিছু পড়তে হয়েছে।
 
সতীনাথ ভাদুড়ী আউট অফ সিলেবাস হয়ে গেলে প্রকাশকের কপালে দুঃখ আছে! পরীক্ষা-নিরীক্ষা, বিকল্প বয়ান, বিপরীত ভাবনা নিয়ে লিখতে হলে লেখককে সারাজীবন অবধারিত ভাবে গ্লানি সইতে হবে। পাঠকহীনতা, শূন্য প্রকাশক, অপমান-অবমাননার গ্লানি নিয়ে আর কাহাতক বাঁচা যায়? খুব সহজেই শিবির বিভাজন স্পষ্ট হয়ে ওঠে। হ্যাঁ গল্প-না গল্পের মধ্যে অসংঘটিত প্রতিযোগিতা চলে। কেউ কেউ ভাবেন এই পাঁকদণ্ডে না জড়িয়ে সমান্তরাল গল্প লেখাই ভালো। কিছু সস্তা হাততালি তো পাওয়া যাবে। আবার কেউ কেউ যেন নিজেকে দগ্ধ করতেই তলোয়ার নিয়ে নিজের বিরুদ্ধে নিজেই প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মধুময় পাল, দেবজ্যোতি রায়, সব্যসাচী সেনরা সর্বজনীন পাঠ্য হয়ে ওঠে না। বাঙালির মস্তিষ্কের জোর বড় কম। হৃদয়সত্তা নিয়ে কেবল ধুনুচিনাচ। আপাতত সেসব প্রসঙ্গ থাক আমরা ওয়াসি আহমেদের গল্পভুবনে প্রবেশ করব।

কেমনভাবে গল্প লেখা হবে তা নির্ভর করে মূলত লেখকের জীবনদর্শন ও সাহিত্য সম্পর্কিত ভাবনার ওপর। উত্তর আধুনিক যুগে গল্প উপন্যাসের নির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞা নেই। প্রবাহিত সময়ের লেখকরা নির্দিষ্ট কোন সংজ্ঞায় বিশ্বাসীও নয়। বরং একজন লেখক সারাজীবন লিখতে লিখতে নিজেই একটি বৃত্ত গড়ে তুলেছেন। তিনি গল্প বা উপন্যাস বলতে এই এই বোঝেন। সেই চিন্তা অনুসারে, সেই ভাবনাকে সঙ্গী করে সারাজীবন লিখে চলেছেন। ওয়াসি আহমেদের নিজস্ব একটি চিন্তা আছে, চেতনা আছে। গল্পকে তিনি ওপেন ফর্মে রেখে একটা কাহিনি গড়ে তোলেন। সে কাহিনি জটিল নয়, কোন রহস্য ঘোর নয়, একটা সাদামাঠা জীবনের কথা। কিন্তু সেখানে একটা সূক্ষ্ম সুস্থ সংস্কৃতিপ্রবণ সংস্থাপনযোগ্য চেতনা আছে। কুসংস্কার থেকে বেরিয়ে আসার প্রবণতা, অশুভ বোধ থেকে শুভ বোধে উত্তরণ, অমঙ্গচিন্তা দূর করে মঙ্গলালোকে প্রদীপ জ্বেলে দেওয়া, আদর্শের প্রতি অটল বিশ্বাস, পরিবর্তিত পরিসরে সৌন্দর্য খুঁজে নেওয়া, সর্বোপরি এই শ্যামল পৃথিবীতে নিজের মতো করে বাঁচার তাগিদ ও বেঁচে থাকার স্বপ্ন দেখা। তিনি মানুষের চেতনা জাগরণে বিশ্বাসী। বাংলাদেশের সময়-সমাজ-স্বরই তাঁকে এইপথে নিয়ে এসেছে। তিনি জানেন ‘এইপথে মানুষের ক্রমমুক্তি হবে’। অর্থনীতির অধ্যাপক ওয়াসি আহমেদ গল্পের মধ্য দিয়ে চেতনার চৈতন্য উন্মেষ ঘটাতে চেয়েছেন এবং সক্ষম হয়েছেন।

‘বক ও বাঁশফুল’ গল্পে আছে কুসংস্কার বিশ্বাস। আমাদের গ্রামজীবন ছিল কুসংস্কারাচ্ছন্ন। লোকায়ত বিশ্বাস-সংস্কার কীভাবে মানুষে জীবনে বদ্ধ হয়ে যায় ও মানুষের জীবনে পতন ডেকে আনে সেই দ্বন্দ্বের গল্প এটি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে বিশ্বাস-সংস্কারে অনেকটা ফাঁটল ধরেছে। সাধারণ গ্রামীণ বিশ্বাস বাঁশগাছে ফুল এলে তা অশুভ বার্তা বহন করে। প্রায় চার দশক আগে বাঁশগাছে ফুল এসেছিল। ঘর ছেড়েছিল মন্তাজ ও মাতা। মূলত মাতাই সন্তানকে নিয়ে ঘর ছেড়েছিল ভয়ে। গোটা গ্রাম জনশূন্য হয়ে গিয়েছিল। আসলে নদী ভাঙনে গ্রাম বিপর্যস্ত হয়েছিল। পরে মন্তাজ ভিক্ষাবৃত্তি থেকে রাখাল, শেষে আবার সংসার দাঁড় করিয়েছে। এবার বাঁশগাছে ফুল এসেছে। সঙ্গে বহু বকের আস্তানা এই বাঁশঝাড়ে। এবারও ফুল দেখে মন্তাজ পালাতে চেয়েছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত পালায়নি। দেখে বকরাই সমস্ত বাঁশফুল তছনছ করে দিয়েছে। বকরাও যখন পালায়নি তখন বোধহয় কোন অশুভবার্তা নেই। সময়ের বিবর্তনে জীবনবোধের কীভাবে পরিবর্তন ঘটে যায় সেই ভাঙা জীবনবোধের আখ্যান গল্পটি। প্রকৃতির নিরালম্ব সহজ সরল ভুবনে মানুষের বিশ্বাস-সংস্কারকে রেখে জীবনের সাদা-কালোর দ্বন্দ্বকে লেখক বড় করে তুলেছেন।

‘আলী দোস্ত বৃত্তান্ত’ চেতনার গল্প। মৃত্যুই জীবনের প্রকৃত অর্থ জানান দিয়েছে। মৃত্যুই আলী দোস্তকে জীবনের প্রকৃত স্বরূপ চিনিয়ে দিয়েছে। মৃত্যু আলী দোস্তের মনে এক বোধের উন্মোচন ঘটিয়েছে। হুমায়ুনের ভাই কামরান। সে হুমায়ুনের বিরোধীতা করায় তাঁর মৃত্যু অনিবার্য করে তোলা হয়েছিল। মৃত্যু ঘটে আলী দোস্তের হাতেই। আলী দোস্তের দুই হাতেই ছয়টি করে আঙুল। অতিরিক্ত আঙুল দিয়েই সে কামরানকে অন্ধ করে দেয়। অতিরিক্ত আঙুলের জন্যই সে ছোটবেলায় মাতা কর্তৃক বর্জিত হয়েছিল। কামরানার মৃত্যুর পর আলীর সঙ্গে দেখা হয় হাম্মাদের। সে জলের জোগান দেয়। অর্থাৎ সে জীবন সঞ্চার করে। আর সে নাকি মৃত্যুর হাতিয়ায়। মনে নিতে পারেনি আলী দোস্ত। জীবনে বেঁচে থাকার সমস্ত অর্থ হারিয়ে যায়। এক অচৈতন্য বোধ তাঁকে গ্রাস করে। অশুভ বোধ থেকে শুভ বোধে উত্তরণ ঘটে আলী দোস্তের। কিন্তু সেও তো মৃত্যুর কোলে হারিয়ে গেল। আসলে এই হিংসার জগৎ, সাম্রাজ্য দখলের লড়াই উৎসব উপযুক্ত মনে হয়নি আলীর। কামরানের বদলে হুমায়ুন পরাজিত হলেও এই কাজ তাকেই করতে হয়। ক্ষমতা দখলের লড়াই উৎসব থেকে সে নিজেকে দূরে রেখেছে। জীবনে বেঁচে থাকার কোনো অর্থ খুঁজে পায়নি। জীবনে এক ঘৃণাবোধের জন্ম হয়। নিজের কর্মের জন্য সেই ঘৃণা। জীবন থেকে মুছে ফেলতে চায় এই অশুভবোধ। ওয়াসি আহমেদ গল্প শুরু করেন আপাত সহজ ভাবে। গল্প খানিক এগিয়ে গিয়েই মূল বৃত্তান্তে পৌঁছে যান। প্রাথমিকভাবে গল্পের একটা প্লট গড়ে নিয়ে নিজের মূল উদ্দেশ্যে এগিয়ে যান। গল্প মধ্যপথে এসে মোচড় নেয়। কিন্তু আগের বৃত্তান্তগুলিও অনিবার্য হয়ে পড়ে কাহিনির পরিণতির জন্য।

‘মুগ্ধতার কারসাজি’ গল্পে সময়ের রোজনামচার ওপর লেখক ভীষণভাবে জোর দিয়েছেন। সুন্দর শ্যামল বসুধরায় চারিদিকে সৌন্দর্যের ফুলবৃষ্টি ছড়ানো রয়েছে। শুধু দেখরে মন চক্ষু মেলিয়া। এই দেখাটার মধ্যেই যাবতীয় সৌন্দর্য রহস্য লুকিয়ে আছে। সময়ের বিবর্তনে মানুষের চাহিদা বোধ দ্রুত পাল্টাচ্ছে। চাহিদাকে সামনে রেখে মানুষের ব্যবহারিক ভূগোল পাল্টে যাচ্ছে। নির্মিত হচ্ছে বহুতলযুক্ত ফ্ল্যাট। এই ফ্ল্যাটও একদিন ভেঙে ফেলা হবে সভ্যতার চাহিদা অনুসারে। এই কনস্ট্রাকশন ও ডিকনস্ট্রাকশনের মধ্য দিয়েই এগিয়ে যাবে চরাচর। ভুবনগ্রামের সেই বিবর্তিত সময়কে লেখক প্রতিপন্ন করতে চেয়েছেন। এই উন্নয়নের মাঝখানে হারিয়ে যায় মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। সমস্ত মানুষ একভাবে জীবনকে দেখে না। কেউ বহুতল নির্মিত ফ্ল্যাটে থেকে সুখি কেউ মাটির বাড়িতে থেকে পাখির কোলাহল শুনে খুশি। এই উন্নয়নের জোয়ারে মানুষের রুচিবোধ ধ্বংস হয়ে যায়। যেমন হয়েছে মনজুর হাসানের। মনজুর হাসান আজ শ্রমিকদের বহুতল ফ্ল্যাট নির্মাণ কর্মের মধ্যেই মুগ্ধতার রেশ খুঁজে নিয়েছেন। গাছ-পৃথিবী-পাখি অপেক্ষা মানুষের শ্রমের মধ্যেই জীবনের সৌন্দর্য খুঁজে চলেছেন। গল্পের বয়ানে পাই—

“মনজুর হাসান এগোলেন, ‘আমাদের দেশের সমস্যাটা আসলে উন্নয়নের—কথাটা আমার না, কে যেন বলছিল, খুব সম্ভব আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, ওই যে বিশ্ব সাহিত্য কেন্দ্র, চেনো তো। কনস্ট্রাকশন হলো উন্নয়নের একটা খুব ভিজিব্‌ল অ্যাসপেক্ট। এই যেমন রাস্তাঘাট, ফ্লাইওভার, পাওয়ারপ্ল্যান্ট, মানুষের ঘরবাড়ি। আমরা পড়ে গেছি সোসাইটির ট্রানজিশন ফেজে—উন্নয়নের, মানে কনস্ট্রাকশনের মাঝখানে। মানুষ তো এসেনশিয়েলি সেলফিশ, তাই নিজের ভোগান্তিকে বড় করে দেখে।” (মুগ্ধতার কারসাজি, বক ও বাঁশফুল, বেঙ্গল পাবলিশার্স, পৃ. ২৬)

সভ্যতার কনস্ট্রাকশনরাজ মানুষকে ভোগান্তির চরম শীর্ষে নিয়ে গেছে। কিন্তু এও তো সময়ের দাবি। এ দাবিকে মানুষ অস্বীকার করতে পারে না। এর মধ্যেই সৌন্দর্যকে খুঁজে নিতে হবে। বৃষ্টিতে ট্রান্সফারমারে ওঠা, কাকের কা কা শব্দের মধ্যেই তিনি সৌন্দর্য খুঁজে নিয়েছেন। সৌন্দর্যও একটা আপেক্ষিক ধারণা। কিছু বিষয় আছে চিরকালীন সৌন্দর্যের প্রতীক। যা যুগযুগান্তর ধরে মানুষকে মুগ্ধ করে যাচ্ছে, যাবে। তেমনি সময়ের বিবর্তনে, মানুষের রুচিবোধের বিবর্তনে, সভ্যতার আপাত ধ্বংসস্তূপের মধ্যেও মানুষকে নিজের বাঁচার জন্য সৌন্দর্য খুঁজে নিতে হচ্ছে। যে সৌন্দর্য খুঁজে নিয়েছেন মনজুর হাসান। গল্পটিতে আপাতভাবে হালকা চালে সময় ও সভ্যতার গভীর সংকটের কথা তুলে ধরা হয়েছে। বাঙালির চিন্তা চর্চা ক্রমশ ক্ষয়ের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আজকের বাঙালি মস্তিষ্কের চর্চা অপেক্ষা আলগা রোমান্স বেশি ভালোবাসে। চিন্তার দৈন্যতা ক্রমেই এগিয়ে এসে একবিংশ সভ্যতার মানুষকে করে তুলেছে ফাঁফা। বই পড়া অপেক্ষা রিয়ালিটি শো এর রমরমা আজ। বইমেলায় বই অপেক্ষা ফাস্টফুড বেশি বিক্রি হয়। তেমনি রয়েছে প্রকাশকের গড়িমসি। বিক্রি না হলে প্রকাশক ছাপবে কেন? প্রকাশক আর প্রতিষ্ঠানের যুগলবন্দিতে বাঙালির রুচিবোধটাই ধ্বংস হয়ে গেছে। সিরিয়াস বইয়ের পেছনমারা গেছে। বাজারে রমরমা চলছে থ্রিলার, ধর্ম-সেক্স নিয়ে লেখা কেতাবের কেচ্ছা কীর্তন। চিন্তাশীল জাতি হিসেবে আমরা বড় গরিব। বলা যেতে পারে ভিখারি জাতি। বইপাঠ অপেক্ষা আজকের বাঙালি ঝুঁকেছে ‘ঘন্টাখানেক পাদাপাদি’ অনুষ্ঠানে। তেমনি একজন লেখক লিখে কী করবেন? যদি বিক্রি না হয়, মানুষ না পড়ে। নিজ অর্থব্যয়ে আর কত বই ছাপা যায়? সমস্ত পরিশ্রম ধ্বংস হয়ে যায় পাঠকের দৈন্যতার ফলে। তেমনি একজন লেখক আর কত নৈঃশব্দকে সামনে রেখে, খ্যাতি, পরিচিতি, স্বীকৃতিকে উপেক্ষা করে লিখে যেতে পারেন? একদিন মন ভেঙে যায়। জনপ্রিয়তার সস্তা পথ বেছে নেন। বাঙালি জীবনের সেই ধ্বংসস্তূপ বড় হয়ে উঠেছে ওয়াসি আহমেদের ‘খেলাধুলা’ গল্পে। অর্থনীতির মেধাবী অধ্যাপক হাসান জামিল আজ গবেষণা, লেখাপড়া বাদ দিয়ে রিয়ালিটি শো বেছে নেন। অর্থনীতি অপেক্ষা তিনি আজ মেতেছেন রাজনীতি নিয়ে বক্তব্যে। জনপ্রিয়তা এসেছে। কিন্তু কেন এই অধ্যাপক এই পথ বেছে নিলেন? শুনে নেওয়া যাক গল্পের বয়ান—

“হাসান জামিল থামলেন। এইটুকু বলে তার ক্লান্ত হওয়ার কথা না, কিন্তু তাকে ক্লান্ত দেখাল, চোখের দৃষ্টি নিভু নিভু। নিভু নিভু চোখ দুটো এবার সোজা আফরোজার মুখে ফেলে বললেন, ‘আমার পরিশ্রম কারো কাজে আসেনি। যাদেরকে নিয়ে আশা ছিল পড়বে, তারাও খুলে দেখার গরজ করেনি। দিনের পর দিন অপেক্ষা করেছি কিন্তু ফিডব্যাক অন্তত পাব। আমার এক ছাত্র আবোলতাবোল প্রশংসা করে একটা রিভিউ ছেপেছিল পত্রিকায়, সেটা আমাকে খুশি করতে। বইটা না লিখলেই পারতাম, লিখে নিজেকে ধ্বংস করলাম।” (খেলাধুলা, তদেব, পৃ. ৪৭)

এই আক্ষেপ, বেদনা তাঁকে আজ রিয়ালিটি শো’তে উত্তেজিত করেছে। জগতের চলাচলের সমস্ত কেন্দ্রবিন্দু অর্থনীতি। কিন্তু মানুষ অর্থনীতি বুঝতে চায় না। মানুষ সাধারণ রাজনীতি ভালো বোঝে। রাষ্ট্র, মিডিয়া সাধারণ মানুষকে রাজনীতিমুখো করে সব ধ্বংস করতে প্রস্তুত। মানুষের বুঝে ওঠার আগেই সব কেল্লাফতে। লেখক শান্ত ভাষায়, মৃদু বয়ানে সেই দিকে পাঠকের দৃষ্টি নিক্ষেপ করেছেন। ওয়াসি আহমেদ বিরাট ক্যানভাস বা জটিল জীবন নিয়ে গল্পের আখ্যানভূমি গড়ে তোলেন না। গল্পকে কখনো বিরাট পরিসরেও নিয়ে যান না। জীবনের একটা ক্ষুদ্র দিককে সামনে রেখে সময়-সমাজের কিছু কথা বলতে চান। সে চিত্র সত্য জীবন চিত্র। ধরা যাক ‘জ্বালা’ গল্পের কথা। আলামিনের চায়ের দোকানকে কেন্দ্র করে একটা পরিবেশের চিত্র বড় করে তোলেন। চায়ের দোকানে সবাই আসে। বাদলভাই, টেপ টেরর রুস্তম থেকে মাফলার ইসরাফিল। যেমন নানা গল্প হয়। সেই গল্পের ভিতরে লুকিয়ে থাকে সময় ও মানুষের নানা ক্যানভাস। তেমনি রয়েছে আলামিনের বড় হওয়ার স্বপ্ন। সে স্বপ্নের ভিতর প্রতি পদক্ষেপে রয়েছে সংশয়। স্বপ্ন-সংশয় নিয়ে যে জীবন সেই জীবনের আখ্যান গড়তে চান লেখক। আলামিন চা দিতে দিতে মানুষ দেখে, মানুষের আচারণ দেখে। আসলে সে জীবন দেখে। জীবনের নানা স্তরের যে জটিলতা তা উপলব্ধি করে। ওয়াসি আহমেদ মিহি বুননে আপাত স্নিগ্ধ স্রোতে কাহিনি বয়ে নিয়ে যান। শতধারায় বয়ে যায় যে জীবন সেখান থেকে কিছু টুকরো ঘটনা এনে একটি কাহিনি দাঁড় করান। সে কাহিনিও জটিল বা মামুলি নয়। সেও একটি প্রবাহ। সেই প্রবাহের কিছুই মুহূর্তই তাঁর গল্প পরিসর।

তিনি গল্পে নিবিড় ডিটেলিং এ যান। ঘটনার পরতে পরতে যে রহস্য তা ধীরে ধীরে উন্মোচন করেন। ক্ষুদ্র দৃশ্যকেও আখ্যানে ধরে রাখেন। গল্পকে কখনোই জটিল করে তোলেন না। এমনকি গল্পের মধ্যে কোন হেঁয়ালী নেই। রাষ্ট্র বিরোধী বা ক্ষমতাকে অ্যাটার্ক করে কোন বয়ান নেই। সমস্ত ঝঞ্ঝাট থেকে মুক্ত হয়ে সেভ জোনে থেকে জীবনের বহমান সময়ের কথা বলতে চান। বহমান সময়ের মধ্যেই যে চোরাবালি তার সামান্য চিহ্নিত করেন। সে নিয়ে বিরাট প্রশ্ন বা ‘কেন’ এর সম্মুখীন হন না। ‘গুম হওয়ার আগে ও পরে’ গল্পে আফম আলী নেওয়াজের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণে জোর দিয়েছেন। অবসরপ্রাপ্ত আলী নেওয়াজের জীবনে কীভাবে বিপর্যয় নেমে এসেছিল এবং তা থেকে মুক্ত হলেন সেই কাহিনি। এমনকি তা তিনি শুনিয়েছেন স্ত্রী নার্গিস আখতারকে। তাঁর মনে হয়েছিল তিনি বুঝি গুম হয়েছেন, কিন্তু হননি। শেষ পর্যন্ত বাড়ি ফিরেছেন। অবসরপ্রাপ্ত আলী নেওয়াজের একটা বাধ্যবাধকতার জীবন ছিল। যেমন সবার থাকে। কিন্তু এই বন্দি শিবির থেকে তিনি হঠাৎ মুক্তি খোঁজেন। মিথ্যে বলে ব্যাংকে যান। বার্ধক্যের ফলে ক্লান্তি গ্রাস করে। ভেবেছিলেন বুঝি গুম হয়েছেন। কিন্তু বাড়ি ফিরতে পেরেছেন। তবে বিকলঙ্গ ভিখারিদের শোচনীয় দৃশ্য দেখেছেন। অপরের হাতে কীভাবে ব্যবহৃত হয় তা দেখেছেন। গুম হওয়ার আগের অবসরকালীন জীবন ও গুম হওয়ার পরের ইতিবৃত্ত নিয়ে এই আখ্যান। ছোট ছোট বাক্যে আলী নেওয়াজের জীবনের ঘটনাবলির উন্মোচন। রবীন্দ্র কথিত ছোটোগল্পের চমক নেই। সেসব মানার আজ প্রয়োজনও নেই। আখ্যান সমান্তরাল গতিতে এগিয়ে যায়। তিনি একটি ঘটনা বলতে আসেন, বলা হয়ে গেল বিদায় নেন। শান্ত স্নিগ্ধ মনোরম পরিবেশে কাহিনি গড়ে তোলেন। ভাঙাচোরা মূল্যবোধ থেকে সুস্থ স্বাভাবিক জীবন চিন্তায় উত্তরণ ঘটান।

‘হাওয়া মেঘের পালাবদল কিংবা পাঙাশের চাষবাস’ বিবর্তিত সময়ের প্রাক্‌কথন। চলমান সময়ের রহস্য গ্রাসে অনেক কিছু হারিয়ে যায়। সময় নিজের চাকার ঘুরন্ত গতিতে অনেক কিছুকে পিছনে ফেলে দেয়। আমাদের জীবন থেকে উঠে গেছে পোস্টঅফিস। অমলের নামে আজ আর কোন চিঠি আসার সুযোগ নেই। সুধারা আজ ফেসবুক, ইমেল, হোয়াটস্যাপে ব্যস্ত। সেই বিবর্তিত সময় ও জীবনবোধের গল্প ফুটে উঠেছে এই আখ্যানে। পোস্টমাস্টার শব্দের সঙ্গে যুক্ত আছে মাস্টার শব্দটি। তবে এ মাস্টার বিদ্যালয়ের শিক্ষক নয়। তবুও এক সম্ভ্রম লুকিয়ে আছে। পোস্টঅফিসে আজ আর কোন চিঠি আসে না। কেউ আর চিঠি লেখে না। একদিন চিঠি লেখার কদর ছিল। চিঠি লেখার জন্য শিক্ষিত মানুষের ডাক পড়ত। বাঙালি জীবন থেকে হারিয়ে গেছে সেইসব দিন। চিঠি না এলেও পোস্টমাস্টার আগলে রেখেছেন পোস্টঅফিস। স্থানীয় ছেলেরা তা দখল করে ক্লাব তৈরি করতে চেয়েছিল কিন্তু তিনি দেননি। সেজন্য রক্তপাত ঘটে গেছে তবুও অনড় অচল। কর্ম ও দায়িত্ব অপেক্ষা মানুষের চেতনায় যদি কোন বিষয় প্রবেশ করে যায় সেখান থেকে বন্ধন ছিন্ন করা অসম্ভব। আমাদের জীবনে প্রয়োজনহীন বিষয় মূল্যহীন। সেই মূল্যহীনকে আঁকড়ে ধরেও কেউ কেউ বাঁচতে চায়। সেই জীবনবোধের গল্প লেখক আমাদের শুনিয়েছেন। ভাঙাচোরা জীবনবোধ, ব্যক্তিত্ব, মানুষের চেতনার গল্প তিনি আমাদের শোনান। ব্যক্তির যে দায়িত্ব, অটল বিশ্বাস সেই যাপনচিত্রের বিন্দু বিসর্গ তিনি উঠিয়ে নিয়ে আসেন।

‘আঁধার’ একটি দৃশ্যের গল্প। আঁধারের মধ্যেও আলোর সন্ধান কীভাবে করা যেতে পারে লেখক তা দেখিয়ে দেন। হিংস্র প্রবৃত্তি থেকে মঙ্গলবোধে উত্তরণের গল্প। জীবনের চরমতম মুহূর্তে ভিতরের জঘন্য প্রবৃত্তিগুলি ধ্বংস হয়ে যায়। রিপুময় মানুষের বিবিধ প্রবণতা। আমরা যার দ্বারা রক্ষা পাই তাকেই একসময় আঘত করতে উদ্যত হই। কিন্তু পরক্ষণেই অপরাধ বোধ জেগে ওঠে। কিছু ক্ষেত্রে ধ্বংসলীলার পর অপরাধবোধ চেতনায় আঘাত করে। ওয়াসি আহমেদ ধ্বংসলীলার আগেই শুভবোধে চরিত্রদের ফিরিয়ে এনেছেন। বনের ঘন অন্ধকারে মতি বাঁচিয়েছিল রনিকে। আজ দুজনেই একে অপরকে হত্যা করতে উদ্যত হয়েছে। বনভূমিতে হঠাৎ রাইফেলের শব্দে তাদের চেতনা ফিরে এসেছে। একে অপরকে আঘাত নয় দুজনকেই বাঁচতে হবে। বেঁচেছে। রক্ত মাংসের মানুষ ক্ষণিক দ্বন্দ্ব, স্বার্থে আঘাত লাগলেই উত্তেজিত হয়। সেই মানুষদের জীবনের স্রোতে, মঙ্গলবোধে, শুভবোধে ফিরিয়ে আনেন লেখক। হীন কর্মের জন্য নরক ভোগ, পতন বা যন্ত্রণা দান নয় আগেভাগেই সেখান থেকে এক অলোর যাত্রায় চরিত্রকে ফিরয়ে আনেন। আমাদের ভালো পৃথিবী ক্রমেই যে মন্দের দিকে যাচ্ছে সেখানে ওয়াসি আহমেদ একটু প্রাণবায়ু সঞ্চার করেন। ‘আকুলের শেষ জবানবন্দি’ গল্পে এক চাপা বেদনা আছে। নিম্নবিত্তের স্পষ্ট উপলব্ধির বেদনা। আমাদের মেকি সভ্যতায় অর্থহীন মানুষ প্রায় মূল্যহীন। ওদের কথা শোনা হয় না। ওদের কথার কোন মূল্য দেওয়া হয় না। সেই মূল্যহীন ভাবনাবিশ্বের সচেতন উপলব্ধি বয়ানে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এ কাহিনি নিম্নবিত্তের জীবন সংগ্রামের আখ্যান। সেই সঙ্গে আমাদের চেনা জগৎ কীভাবে অচেনা হয়ে যায় সেই পাল্টে যাওয়া পরিসরের গল্প। সভ্য মানুষের জীবনচিন্তা ও বেঁচে থাকার কৌশলে কতকিছু ধ্বংস হয়ে যায়। সভ্য মানুষ মনে করে নিজের বাঁচাটাই শেষ কথা। অন্য কিছুর প্রয়োজন নেই। লেখক খুব সচেতনভাবেই সেই ভাঙাচোর মূল্যবোধের শূন্যতা আবিষ্কার করেন। শহর থেকে কুকুরদের নির্বাসন হয়েছে, চা খারাপ জন্য ফেলে দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে আছে আকুল, হাসিনাদের অনবরত লড়াইয়ের কথা। এ লড়াই নিম্নবিত্তের জীবনসঙ্গী। পথহীন, উপায়হীন, অচ্ছল মানুষের নিজের অস্তিত্ব বাঁচিয়ে রাখার সৎ প্রচেষ্টা। কিন্তু তাদেরও যে উপলব্ধি আছে, মস্তিষ্ক কিছু বলতে চায়, যা এলিটদের কাছে হাস্যকর মনে হয়। তবুও কিছু বলে যায়।

আমাদের ব্যবহারিক জীবনের বহুবিধ কলোরব নিয়ে ওয়াসি আহমেদের গল্পভুবন। জীবনের ভাঙাচোরা মূল্যবোধ ও অন্তর্গূঢ় বেদনা তিনি দেখেন। অনিষ্টচিন্তা মানুষের মনে জাগলেও অনিষ্টসাধনের আগেই তিনি চরিত্রকে সঠিক অবস্থানে ফিরিয়ে আনেন। এই যে অনিষ্টচিন্তা-অনিষ্টসাধন পূর্ববর্তী জীবন ও এক মঙ্গলানুভূতিতে ফিরে আসা—এই তিনের মধ্যবর্তী পরিসরই ওয়াসি আহমদের গল্পরেখা।

(২)

চেনা পরিবেশ ও অচেনা পরিবেশের দ্বন্দ্ব বড় হয়ে উঠেছে ‘ডলফিন গলির কুকুরবাহিনী’ গল্পে। পরিপার্শ্বিক জীবজন্তু, পরিবেশ, বনভূমি নিয়েই মানুষের বাঁচা, স্বপ্ন দেখা। মানুষের সমস্যাই মানুষকে সমাধানের পথে নিয়ে যায়। বিচ্ছিন্ন দ্বীপের মানুষ কোলাহলময় পৃথিবীর সমস্যা সমাধানের সূত্র আবিষ্কার করতে পারে না। সম্ভব নয়। অভিজ্ঞতার অভাব। তেমনি ভূ-গোলকে জৈববিচিত্রা নিয়েই মানুষের অবস্থান, সম্পূর্ণতা। রাতে পথ কুকুরদের অত্যাচারে ডলফিন গলির অধিবাসীরা অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। কর্পোরেশনের সহায়তায় পথ কুকুরদের নির্বাসন দেওয়া হয়। মানুষ ভেবেছিল এবার শান্তিতে ঘুম আসবে। শান্তিতে শৈশব, প্রকৃতি, মুক্তির কথা ভাবতে পারবে। কিন্তু সম্ভব হয়নি। এই বিচ্ছিন্নতায় যেন এক শূন্যতার জন্ম দিয়েছে। পথ কুকুররা মানুষকে অতিষ্ঠ করত, মানুষের ঘুমে যন্ত্রণা সৃষ্টি করত সত্য তবুও জনজীবন থেকে কুকুর শূন্যতা এক নৈরাশ্যের জন্ম দিয়েছে। গল্পের বয়ানে পাই—“আসলে ডালা-খোলা ট্রাকে করে বিদায় হওয়ার সময় কুকুরবাহিনীর সাথে ডলফিন গলিবাসীদের কিছু কিছু অসাবধান অঙ্গ-প্রতঙ্গও যে চালান হয়ে গিয়েছিল, তারা তখন খেয়াল করেনি। তারা মুক্তির কথা ভেবেই হাঁফ ছেড়েছিল।” (ডলফিন গলির কুকুরবাহিনী, নির্বাচিত গল্প, শুদ্ধস্বর, পৃ. ১৪) আসলে এক বিচ্ছিন্নতার জন্ম হয়েছে। যে বিচ্ছিন্নতা মানুষের মনে স্বপ্নহীনতার সৃষ্টি করেছে। কুকুরগুলি মানুষের কোন কাজেই লাগেনি, বরং অতিষ্ঠ করেছে, তবুও এক শূন্যতার যাপন গড়ে উঠেছে। এখানে ওয়াসি আহমেদের কৃতিত্ব। তিনি নিজস্ব একটি মানব দর্শন নিয়ে গল্পে নামেন। কাহিনির ভিতর দিয়ে সেই সত্য প্রতিফলিত করতে চান। মানুষের হীন কর্ম, ভুল প্রবৃত্তি গুলি দেখিয়ে দিয়ে মানুষকে আবার সঠিক পথে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন। মন্দ বোধ-ভালো বোধের মধ্যে শূন্যতা সৃষ্টি করে দেখিয়ে দেন মানুষের কাঙ্ক্ষিত সত্য কোনটি হওয়া উচিত। সমাজ পরিবর্তন তার দ্বারা সম্ভব নয়। কিন্তু কোন পথে গেলে মানুষের ক্রমমুক্তি ঘটবে সেই পথের সন্ধান দিয়ে যান। গল্প বাদ দিয়ে আধুনিক নীতিমালা হিসেবে ওয়াসি আহমেদের গল্প পড়া যেতে পারে। তবে নীতিকথা শোনার যুগ আজ অপসৃত। তাই তিনি গল্প নির্মাণ করেন। বঙ্কিমচন্দ্রের মতো নীতিবিদ্যার পাঠ বা এই হলেই ভালো হত, ওই হলে মন্দ হবে জাতীয় নয়। মন্দকে অতিক্রম করে, যাবতীয় রিরংসার প্রবৃত্তি থেকে মানুষকে দূরে নিয়ে গিয়ে সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করান। সে সত্যটা রুক্ষ্ম সত্য নয়। আবার ভাবাবেগও নেই। শুধু চেতনার পথে একটু আলো জ্বেলে দিতে চান। বিশ্বাস করেন এই আলো নিয়েই সুস্থ পৃথিবী ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাবে।

‘বীজমন্ত্র’ ভিন্ন স্বাদের গল্প। নিম্নবিত্তের অসম যুদ্ধের লড়াই। বেকারত্বের জ্বালা মেটাতে যেকোন পথ বেছে নিতে হয়। তপু বেছে নিয়েছে কর্মীসংঘের কাজ। স্বার্থের প্রয়োজনে মানুষ ষাঁড়, পাঁঠাকে কাস্ট্রেশন করে। এখানে মানুষকে কাস্ট্রেশন করা হয়েছে। এস্টাবলিশমেন্টের স্বপ্নে মানুষ এই সত্যও মেনে নিয়েছে। তপুকেও কাস্ট্রেশন করা হয়েছে। সে আজ বৃদ্ধ। মনে হয়েছে তাঁর মতোই আরেক তপু অফিসে এসেছে। প্রথম তপুর (প্রৌঢ়) চেতনায় দ্বিতীয় তপুর চিন্তা কীভাবে প্রাধান্য পেয়েছে তা নিয়ে লেখক এক মগ্নচেতনার আখ্যান আমাদের শোনান। ‘গর্তসন্ধান’ গল্পে আমাদের তথাকথিত এলিট সভ্যতার আদিম কদর্য রূপ বীভৎস চিত্র নিয়ে উপস্থিত হয়েছে। সভ্যতার ভান করে বিচরণ করা মানুষগুলি যে কত নীচ, ক্রুদ্ধ তা প্রকাশ হয়ে যায়। গোরুর দুধে ম্যানহলের জল মেশানোর অপরাধে সবাই আবদুল করিমকে প্রহার করেছে। শেষ পর্যন্ত তাঁকে ম্যানহলে ফেলে দেওয়ার ব্যবস্থা হচ্ছে। কিন্তু মানুষের আয়তনের তুলনায় ম্যানহলের আকার ছোট। ‘নির্বাচিত গল্প’ গ্রন্থের প্রথম পর্যায়ের গল্পগুলিতে লেখক জীবনের রূঢ় বাস্তবতার ওপর জোর দিয়েছেন।

নির্বাচিত গল্পগ্রন্থের ভূমিকায় ‘স্বপ্ন যখন প্রতিতুলনা’ অংশে বলা বক্তব্য গল্প বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে অনেকখানি সহায়ক। সামান্য অংশ তুলে ধরা যেতে পারে—

“লেখাকে মানুষের বানানো শিল্প হিসেবেই টিকে থাকতে হয়; আর শিল্প যখন, একে পরিচালনার (গাইড করার) কলাকৌশল আড়ালে-অবডালে যত উহ্যই থাকুক, কার্যত তা অত্যন্ত প্রণিধানযোগ্য। ফলে লেখায় একটা বাড়তি সুবিধা মেলে, সতর্ক লেখকমাত্রই লুফে নেন তার পর্যবেক্ষণের একান্ত নিজস্ব ক্ষেত্র বলে। টানা-লম্বা, বাসি, মুখস্থ ছবি আঁকার চেয়ে জীবনের ব্যাখ্যাকার হতেই তার লোভ। স্বপ্নের চেয়ে যা কম কুহকী নয়।

ব্যাপার যদি হয় জীবনকে ধারণ করা—অকপটে গভীরভাবে—তাহলে স্বপ্ন যতই অকপট—নির্ভেজাল হোক, গভীরতার খোঁজে একমাত্র লেখাই জরুরি হয়ে উঠতে পারে। ব্যাখ্যাকার হবো? এ জিজ্ঞাসার সুরাহা হয়নি বলেই যন্ত্রসভ্যতার তুমুল বৈচিত্র্যসন্ধানী জীবনযাপনে লেখা টিকে আছে, আজো। সমস্যা হয়তো এখানে যে ব্যাখ্যাকার হতে চেয়ে লেখককে মুখোমুখি হতে হয় বিচিত্র সব সম্ভাবনার যা পরস্পর সংঘাতপূর্ণও বটে। একই পরিস্থিতি ভিন্ন-ভিন্নভাবে তার সামনে এসে দাঁড়াতে পারে, সেই সাথে নানামুখী বিশ্লেষণের দরজা খুলে তাকে বিপাকেও ফেলতে পারে। ফলে সেই পরিণামহীন আত্মজিজ্ঞাসা।”

জীবনের এই বিশ্লেষণ, আত্মজিজ্ঞাসা, ব্যাখ্যাকারী মন ও সদা জাগ্রত প্রশ্ন একজন লেখককে চালনা করে। ব্যতিক্রম নয় ওয়াসি আহমেদও। মানুষ সর্বদা শুভ স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসে। জীবনের পতন, বেদনা, ভাঙন অপেক্ষা সর্বদা পজেটিভ স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা মনে মনে বড় করে তোলে। তেমনি অন্যের স্বপ্নকে অনেক সময় নিজের কাছে ভিত্তিহীন মনে হতে পারে। মস্তিষ্ক দ্বারা চালিত মানুষের বোধ বিবেক ভিন্ন ভিন্ন। তেমনি স্ত্রী-পুরুষের মধ্যে চাওয়া-পাওয়া, আকাঙ্ক্ষা, স্বপ্ন ভিন্ন ভিন্ন। নারী-পুরুষের সেই ভিন্ন চাওয়া-পাওয়া, বোধ, স্বপ্নের নির্ভর করে গড়ে উঠেছে ‘লোকমান হাকিমের স্বপ্নদর্শন’ গল্পটি। স্ত্রী বিলকিস বানু প্রতি রাতেই প্রায় স্বপ্ন দেখে। এইসব স্বপ্ন স্বামী লোকমানের কাছে ভিত্তিহীন মনে হয়। সাইকোলজিস্ট ডাক্তারকেও দেখিয়েছে। শেষে বিলকিস স্বপ্ন দেখে পরি রূপ একটি কন্যা গর্ভে বড় হয়ে উঠছে। স্বপ্নের কথা স্বামীকে জানায়। স্বামীর চিন্তা কন্যা পরির মতো কেন। অন্যদিকে লোকমান মনে মনে ভাবে যেন পুত্র সন্তান জন্ম হয়। লোকমান নিজেই একদিন স্বপ্ন দেখে স্ত্রীর পুত্র সন্তানই হচ্ছে তবে কপালে বসন্তের বহু দাগ। যা মেনে নিতে পারে না। আসলে মধ্যবিত্ত সর্বদা আকাঙ্ক্ষিত মন নিয়ে বাঁচতে চায়। সেখানে নারীর জীবনচিন্তার বিশেষ মূল্য নেই। সেই ভাঙাচোরা জীবনবোধের কথাই লিখে চলেন আখ্যানকার।

‘চক্রবৃদ্ধি’ গল্পটি প্রকাশিত হয় ১৯৯০ খ্রিস্টাব্দে। তৎকালীন বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতা ওয়াসি আহমেদ নানা গল্পে ধরতে চেয়েছেন। শান্ত সরল ভঙ্গিতে বাংলাদেশের জনজীবনের প্রকৃত রূপটি ফুটে ওঠে। ওয়াসি আহমেদ আখ্যান নির্মাণ করেন একটি ঘটনাকে কেন্দ্র করে। গল্প এগিয়ে যেতেই বহু ঘটনা সেখানে এসে উপস্থিত হয়। একটি সত্যকে সামনে রেখে ধীরে ধীরে বহুবিধ সত্য প্রবেশ করিয়ে একটা বৃত্ত নির্মাণ করেন। সব সত্যগুলিই যেন একদিকে ছুটছে। বহুবিধ লক্ষ্য যেন এক পথে অগ্রসর হচ্ছে। অনেক সময় একাধিক স্বর মিলে এক স্বরে পরিণত হচ্ছে। আসলে প্রতিবাদ রচিত হচ্ছে। যদিও তা সামান্য, ভঙ্গুর তবুও একটা প্রতিবাদের ক্যানভাস তৈরি হচ্ছে। এই গল্পে মেডিক্যাল ছাত্র স্বপন হত্যার বিচার চাইতে উপস্থিত হয়েছে রাজা, মধু ও বাচ্চু। আরও বহু মিছিল আসার কথা। কিন্তু আসেনি। এরপূর্বে সেই অঞ্চলের রতনকে হত্যা হয়েছে। ক্রমাগত এই হত্যাকাণ্ড চলতে পারে না, তাই এই প্রতিবাদ। কিছুক্ষণ পরে দেখা যায় শ্রমজীবী মহিলা ফোরাম প্রতিবাদ জানাতে এসেছে। তবে শেষে সব লন্ডভন্ড হয়ে যায়। রাজা খুঁজে পায় না মধুকে। একসময় বলে ওঠে মধু হত্যার বিচার চাই। গল্পটি নামকরণের দিক থেকে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। একটি মিছিলকে সামনে রেখে একাধিক মিছিলের জন্ম হচ্ছে আবার ভেঙেও যাচ্ছে। তেমনি স্বপন হত্যার বিচার চাইতে এসে রাজা খুঁজে যাচ্ছে মধুকে। বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতায় মিছিলের ওপরও আক্রমণ নেমে এসেছে। তাই মধুদের হারিয়ে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। তেমনি রাজার অবচেতন মনে স্বপনই যেন মধুতে পরিণত হয়েছে। কেননা রতন-স্বপন-মধুরা প্যারালাল ভাবে সময় ব্যবধানে একই সত্যের দিকে এগিয়ে যাবে। যেখানে অপেক্ষা করছে একটি মাত্র সত্য—মৃত্যু।

রিফিউজি, দেশত্যাগের ভাবনা, আমরা-ওরা চিন্তা বড় হয়ে উঠেছে ‘তীরভূমি’ গল্পে। পার্সপোর্ট, ভিসা করে এক দেশ থেকে অপর দেশে যাওয়া যায় কিন্তু লুকিয়ে গেলেই রিফিউজি। ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত সমস্যা আজও সহজ হয়নি। এ গল্পের প্রেক্ষাপট তিনটি দেশ—কিউবা-বাংলাদেশ-আমেরিকা। বাংলাদেশে বসেই ওয়াসি আহমেদ এক সরলরেখায় তিন দেশের জনজীবনের বিপর্যস্ত চিত্রটি ধরেছেন। কিউবার রিফিউজিরা ফ্লোরিডা ব্রীজে আশ্রয় নিয়েছে। ধীরে ধীরে প্রবেশ করবে আমেরিকায়। এই চিত্র ধরা পড়েছে সি.এন.এন চ্যানেলে। আশরাফ আলির কন্যা রওশনা এখন আমেরিকার অধিবাসী। সে পিতা-মাতা সহ সবাইকে নিয়ে যেতে চেয়েছে ওই দেশে। আশরাফ আলির বড় পরিবার, পুত্র-কন্যা মিলে অনেকজন। কারও চিন্তা আমেরিকা যাওয়া সহজ নয়, কেউ ভাবে খুব সহজ। কারও চিন্তায় প্রাধান্য পায় কিউবার মতো এদেশের মানুষকেও অত্যাচারিত হতে হবে, কেউ ভাবে ভিসা করে গেলে কিছুই হবে না। আশরাফ আলী প্রথমে আমেরিকা সম্পর্কে উৎসাহিত হলেও শেষে দেশের নানা কথা মনে পড়ে পিছুটান বড় হয়ে উঠেছে। শেষ পর্যন্ত দেখেছে রিফিউজি হিসেবে কিউবাবাসীদের অত্যাচারিত হবার দৃশ্য। যা আশরাফ আলির মনে নঞর্থক ধারণার জন্ম দেয়। কিউবার রিফিউজি, বাংলাদেশের জনজীবন, আশরাফ আলির পরিবার ও আমেরিকায় অবস্থিত রওশনার কর্মকাণ্ডকে এক সরলরেখায় রেখে বৃহৎ প্রেক্ষাপটে মানুষের অন্তর্গত চেতনার কথা বলেছেন। আশরাফ আলির পরিবারে সকলেই নিজের চিন্তা-চেতনা অনুসারে কথা বলেছে। ব্রীজভূমি সুন্দর কিন্তু রুক্ষ্ম বাস্তবতার দৃশ্য উন্মোচিত হলে সে সৌন্দর্য আর থাকে না। সেখানে লুকিয়ে থাকে বেদনার চোরাস্রোত। সে দৃশ্যই মানুষকে নিয়ে যায় অন্য জগতে। পাল্টে যায় সব বোধ।

‘খাঁচা ও অচিন পাখি’ গল্পে বিকলঙ্গ সুলেমানের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ ও বিকাশ আশ্চর্য জীবনচেতনায় প্রাধান্য পেয়েছে। এক হাত-পা হীন সুলেমানের চিন্তা-চেতনা, জাগতিক বোধ, ফেলে আসা জীবনের কথা সূক্ষ্ম সমীকরণে লেখক সঞ্চালন করেছেন।

‘অপুর ধর্মটিচার’ অনবদ্য গল্প। একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা ধর্মমোহ কাটিয়ে উঠতে পারিনি। এই উপমহাদেশে মানুষের বিচ্ছেদে, হানাহানিতে গোপন রসদ হিসেবে কাজ করে ধর্ম। ধর্মকে সামনে রেখেই সভ্যতা ধ্বংসের প্রতিযোগিতা আজও চলছে। বিজ্ঞানের দ্রুত অগ্রগতি হলেও ধর্মমোহ মানুষের মন থেকে আজও দূর হয়নি। এই মোহই পতনের বীজ রোপণ করেছে। ওয়াসি আহমেদ কুশলী দক্ষতায় ধর্মের নঞর্থক দিকগুলি দেখিয়েছেন। তাই বলে ধর্ম কিন্তু পরিত্যক্ত নয়। ধর্মের মহৎ দিকগুলি গ্রহণ করতে হবে। অথচ মৌলবী বা টিকিধারী পণ্ডিতরা ধর্মের অপব্যাখ্যা করে যে অবিশ্বাস অপসংস্কৃতির কালভূমি গড়ে তুলেছে তা শিক্ষিত সচেতন মানুষের মনে স্থান পায় না। শিক্ষিত হলেই যে সে চেতনা সম্পন্ন এমন বলা যায় না। শিক্ষিত কিন্তু ধর্মমোহে আবদ্ধ এরকম দৃষ্টান্ত এই উপমহাদেশে ঢের আছে। স্কুল থেকে ধর্মশিক্ষা বাদ গেছে। সাত বছরের অপু সন্তান জন্মের যৌন ব্যাখ্যা স্কুল থেকে শিখেছে। পিতা কামরানের ইচ্ছা ছিল পুত্রের কিছু ধর্মজ্ঞান আবশ্যক। পিতার এই ভাবনা নঞর্থক নয়। ধর্মকে সাহিত্য হিসেবে দেখা যেতে পারে। গীতা, কোরাণকে দর্শন হিসেবে পড়া যেতে পারে। আমরা আমাদের ঐতিহ্যকে জানবো, এটাই তো স্বাভাবিক। কিন্তু সেই জানার মধ্যে যেন কোন অতিনাটকীয় ঘটনা, অতিরঞ্জিত ঘটনা না থাকে। অতিনাটকীয় ঘটনায় যেন অবিশ্বাসের বোধ বিশ্বাস উৎপত্তি হয়। ধর্মকে গ্রহণ করতে হবে কিন্তু যুক্তি দিয়ে। অপুর ধর্মশিক্ষক জানান—মানুষ কিছু করতে পারে না, সব ঈশ্বরের হাত। এই বাক্য অপুর মনে সন্দেহের জন্ম দেয়। সে নিজেই মুনিয়া পাখিকে হত্যা করে। ধর্মবোধ অপুকে ক্রুদ্ধ করে তোলে। মানুষ কিছু করতে পারে কি না তা নিয়ে পরীক্ষা করতে সচেষ্ট হয়। প্রাণ যায় মুনিয়া পাখির। কিন্তু পিতা-মাতা সে বিশ্বাসে আবার আঘাত করে। পরের দিন খাঁচায় দেখা যায় একটি মুনিয়া পাখি। লেখক গল্পটিতে বহুমাত্রিক জটিলতার পাঠ গড়ে তুলেছেন। পিতা-মাতা বিজ্ঞানের কারিগরি বিদ্যায় দক্ষ, ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ডের কার্যকালাপে দক্ষ। পুত্রের বিশ্বাসকে আবার ভেঙে দিচ্ছেন। কেন দিচ্ছেন? কোন চেতনা? ধর্মের প্রতি বিশ্বাস ফিরিয়ে আনা? আবার তারা নিজেরাই তো সফটওয়্যার নির্মাণে নিযুক্ত। ধর্মের ট্যাবু থেকে আমরা আজও মুক্ত নই। ধর্মবোধ যাই যাই করেও পিছু ছাড়ছে না। কামরানরা সেই দ্বন্দ্বে ভোগা শ্রেণির প্রতিনিধি। যারা সম্পূর্ণ বর্জন যেমন করতে পারেনি তেমনি সব বিশ্বাসও করতে পারেনি।

সচেতন ভাবে ওয়াসি আহমদের গল্পের দুটি পর্যায় আবিষ্কার করা যেতে পারে। গত শতকে তিনি বাংলাদেশের সমাজ বাস্তবতা, সময়ের জটিলতা, ধর্ম-শ্রেণিজীবনে জোর দিয়েছেন। বর্তমান শতকে এসে তিনি মানুষের চেতনার শুভ দিকের বিকাশ ঘটাতে চেয়েছেন। গত শতকেও যে চেতনার বিকাশ গল্পে লক্ষ্য করা যায়নি তা নয়। তখন যা আড়ালে ছিল এই পর্যায়ে এসে তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। তিনি মানুষের গল্প লেখেন ঠিকই কিন্তু তা অন্তর্গূঢ় চেতনায় পর্যবসিত হয়। আবার তা চেতন-অবচেতন-অর্ধচেতনের গল্প নয়। চরিত্রকে স্বাভাবিক রেখে, আমাদের জীবন পরিসরে অবস্থিত করে এক বোধে ফিরিয়ে আনেন। এখানেই ওয়াসি আহমেদের স্বতন্ত্রতা, বিশিষ্ট জীবনশিল্পীর দাবিদার। জীবনের জটিলতা অপেক্ষা বা জটিল জীবনের বহুবিধ সংলাপ অপেক্ষা তিনি শান্ত সরল জীবনকেই বেছে নেন। যেখানে কোন ঝঞ্ঝাটের বালাই নেই। কিন্তু সময় তো আর জীবনকে সরল রেখায় চলতে দিতে চায় না। প্রতি পদে সে জীবনকে লাইনচ্যুত করতে চায়। সময়ের সমীকরণে ওয়াসি আহমেদের চরিত্ররা লাইনচ্যুত হয় ঠিকই আবার লাইনেও ফিরিয়ে আনেন লেখক। আসলে এই লাইন হল জীবনের সুজলা সুফলা সোপান। সেই সোপান সুধার কারিগর ওয়াসি আহমেদ।
 
 
 

আলোচক পরিচিতি:
পুরুষোত্তম সিংহ
লেখক। শিক্ষক। গবেষক
পশ্চিমবঙ্গে থাকেন।

1 টি মন্তব্য: