সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

অলোকপর্ণা'র গল্প: লোমশ একটি পুতুলনাচ





 প্রবল লোমশ এক মানুষের সামনে ইন্দিরা বসে আছে এখন। লোকটা গুনগুন করে রবীন্দ্রসঙ্গীত গাওয়ার ভান করছে। আর সেই গানকে ঢাল করে মাঝে মাঝে ইন্দিরার বুকের দিকে চোরাগোপ্তা তাকিয়ে নিচ্ছে। এমন লোমশ মানুষ ইন্দিরা এই প্রথম দেখল। কানের লতিতে লোম, ভুরু উপচে লোম দুচোখ ঢেকে দিচ্ছে প্রায়, গাল পরিষ্কার করে কামানো হলেও সেখানে রোমের ইঙ্গিত সুগভীর। এই বয়সেও লোকটার মাথায় চুল অশেষ। তিন হাত দূরে বসেও ইন্দিরা চশমার এপার থেকে লোকটার নাকের উপর জ্যান্ত দু তিনটে লোম দেখতে পাচ্ছে। লোকটার বুকের বোতাম ফুঁড়ে লোম বেরিয়ে আছে, যেভাবে খেলনা ভালুকের গায়ের সেলাই ফেটে তুলো বেরিয়ে থাকে। মাংস মজ্জা নয়, তুলো ভরা ভালুক বা বাঁদর বা কুকুরের মতো যেন লোকটার আগাপাশতলা লোম দিয়ে তৈরি। তাদের মাঝখানের টেবিলে রাখা ফলকাটার ছুরিটা তুলে নিয়ে ইন্দিরা এখন যদি লোকটার গলায় বসিয়ে দেয়, তবে যেন রক্ত নয়, রাশি রাশি লোম উপচে বেরিয়ে আসবে লোকটার ভিতর থেকে।

লোমশ মানুষটা ইন্দিরাকে বলল, “আমিও লিখি, কবিতা, একটা বলি? শোনো?”

না বলার অবকাশ থাকে না।

চোখ বুজে, কোলের উপর রাখা হাতদুটো জড়ো করে মানুষটা একমনে বলতে লাগে,
“চঞ্চল রাত চাঁদের ফোয়ারা,
আকাশে জেগেছে শতশত তারা,
আমার মনেতে দেয় যে পাহারা
তোমারই শতেক চাহনি।
ফুলেতে ভ্রমর কাতর হইল,
দীঘিতে হাঁসেরা অবগাহিল,
প্রিয়া হে আমার কেমনে কাটিল,
তোমা বিনা শত যামিনী।”

বোঝা গেল, যৌন সুরসুরি দেওয়ার চেষ্টা করতে গিয়েও শেষ অবধি সাহসে কুলায়নি। ইন্দিরা অনুমান করল, লোমশ মানুষটা যে বই পড়ে, বা পড়ত, তা আজ থেকে অন্তত একশো বছর আগে লেখা হয়েছে। অন্ততপক্ষে গত সত্তর বছরের মধ্যে লেখা কোনো কবিতা লোকটা পড়েনি। ইন্দিরা তেতো গিলে বলল, “আপনার প্রিয় কবি কে?” জবাবটা যদিও তার জানা ছিল, লোকটা উৎসাহিত হয়ে বলল, “আমি কেবল একজনের লেখাই পড়ি, আমাদের যিনি আছেন,” দুহাত কপালে ঠেকিয়ে, “গুরুদেব!”

অনুমান মিলে যাওয়ায় নিরাশ ইন্দিরা চেয়ারে হেলান দিয়ে বসল।

লোকটা কথা বলার ফাঁকে ফাঁকে ইন্দিরার বুকের দিকে তাকিয়ে নিচ্ছে। অদ্ভুতভাবে দুটো কাজ একসাথে করতে গিয়ে লোকটা কিন্তু কথার খেই হারাচ্ছে না। মানুষের বিভিন্ন দক্ষতা ইন্দিরাকে এভাবে প্রায়ই বিস্মিত করে।

লোকটা বলল, “অন্ত্যমিলগুলো দেখো, চাহনির সাথে যামিনী, ভালো মিলেছে না? বলো?”

ইন্দিরা একগাল হেসে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো।

এরকম হাসি হাসতে আজকাল অনাবিল আনন্দ হয়। এই মুহূর্তে ফলকাটার ছুরিটা লোকটার গলায় বসিয়ে দেওয়া না গেলেও এই যে একগাল হাসি হাসা গেল, এতে ইন্দিরার আরাম পায়।

ইন্দিরা জানতে চাইল, “নিবেদিতাদি কখন ফিরবে?”

“এই তো এসে পড়বে, পাঁচ দশ মিনিট। চা খাবে তুমি?”

না বলার অবকাশ থাকে না।

লোকটা দাপুটে গলায় চা বানানোর হুকুম দেয়।

চলটা খসে পড়া এক মহিলা চায়ের কাপ নিয়ে আসেন। গরম চা। তাতে দুধ। তাতে চিনি। ইন্দিরার ইচ্ছে করে, লোমশ লোকটার লোমশ মুখে এখনই গরম চামড়া পোড়ানো এই চা ছুঁড়ে মারতে।
ইন্দিরা হেসে হেসে, ফুঁ দিয়ে দিয়ে, চায়ে চুমুক দিল।

লোকটা পুনরায় রবীন্দ্রসঙ্গীতে ফিরে গেছে, “জ্যোৎস্নারাতে সবাই গেছে বনে”র সঙ্গতে লোকটার চোখ ইন্দিরার বুকে অবাধ যাতায়াত করছে।

“আপনি কবে থেকে কবিতা লিখছেন?”

গান থামে, লোকটা উৎসাহী হয়ে ওঠে, “কবিগুরু যেদিন মারা যান, সেইদিন কলকাতা শহরে মানুষের বন্যা। আমার পিসতুতো দাদা, তখন স্কুল ফাইন্যাল দেবে। আমাদের বাড়িতে থেকেই পড়াশোনা করতো। তা সে শোনামাত্র বই খাতা ফেলে দৌড়, কী, না- নিমতলা যাবে! তারপর বেলা বয়ে গেল, সে আর ফেরে না। অনেক রাতে, তখন তো এখনকার মতো নিশাচর ছিল না কেউ, সে ফিরলো, খালি পায়ে, মাথা অবধি ধুলোবালি। ট্যাঁকে করে কী নিয়ে ফিরলো জানো?”

“কী নিয়ে?” চায়ে চুমুক দিতে দিতে বলে ইন্দিরা।

“কবিগুরুর একগোছা শ্বেতশুভ্র চুল!”

ইন্দিরা হতবাক হয়ে লোমশ মানুষটার দিকে তাকিয়ে থাকলো, চায়ের কাপ সরল না তার মুখ থেকে।

“আমি তো ছোট তখন। রাতে ঘুমিয়ে পড়েছি তাড়াতাড়ি। পরদিন সকালে উঠে সেই চুল দেখার পর আমি জীবনের প্রথম কবিতাটা লিখলাম,” লোকটা বলে চলে, “ ‘চিরকবি, তুমি রবি আমাদের ত্রাতা/ ভূভারতে ছড়াইবে তব জয়গাঁথা/ বারে বারে বহুরূপে জনম লহিয়া/ আসিও হরিতে তুমি মোদেরো হিয়া।।’ কবিতাটা নিজের থেকেই এলো কিন্তু, ভাবো, কী অদ্ভুত না! মহাকবির চুলের কী মহিমা!”
 
আরও বারদুয়েক লোকটা ইন্দিরার বুক মেপে নিল এই ফাঁকে।

“হ্যাঁ, নিশ্চয়ই।” কবিগুরুর ছিন্নকেশের মহিমা প্রসঙ্গে ইন্দিরা সায় জানায়।

“তোমার এই বই আমি পড়বো” মাঝখানের টেবিলে রাখা ইন্দিরার বইকে ইঙ্গিত করে একথা বলে লোমশ মানুষটা।

“সেই চুল এখন কার কাছে আছে?”, ইন্দিরা জানতে চায়।

লোমশ মানুষটা গালে লোমশ হাত বোলাতে বোলাতে বলে, “দাদা বিলেতে পড়তে যাওয়ার আগে আমায় দিয়ে গেছিল সেই চুলগোছা। সে তো আর ফিরলো না। আমি ব্যাঙ্কের লকারে রেখে দিয়েছি। অমূল্য সম্পদ, ঠিক কি না? বাড়িতে রাখা নিরাপদ নয়, তাই না? নোবেলই চুরি হয়ে গেল!”

“ঠিক বলেছেন, একেবারেই নিরাপদ নয়”, টেবিলের উপরে রাখা নিজের সদ্যপ্রকাশিত বইটার দিকে আড়চোখে তাকিয়ে ইন্দিরার আফসোস হয়।

“তা তুমি কী নিয়ে লেখ? নিবেদিতা তোমার কথা খুব বলে, বলে তুমি কাজ করো আবার লেখালেখিও করো,”

“ওই শখে লিখি, তেমন কিছু না,”

“কী লেখো, প্রেমের গল্প? না থ্রিলার?”, ইন্দিরার বুকে চোখ রেখে লোমশ লোকটা জানতে চায়।

ইন্দিরার ইচ্ছে হলো জবাব দেয়,- থ্রিলার। তারপর কথাচ্ছলে রোমহর্ষক কোনো গল্প শুনিয়ে লোকটাকে ভয় পাইয়ে দিতে। রীতিমতো মুখ শুকিয়ে যাওয়া ভয়, ভিটেমাটিচাটি হওয়া ভয়, অস্তিত্ব বিপন্ন করা ভয়। কিন্তু ইন্দিরা থ্রিলার লিখতে পারে না। এবং এই নিয়েও ইন্দিরার এইমুহূর্তে আফসোস হল। থ্রিলার আর প্রেমের বায়নারির ফাঁদে পড়ে ইন্দিরা জবাব দিল, “ওই যা দেখি, যা মনে ধরে, তাই নিয়েই আর কী”

“বেশ বেশ, ভালো করো, শুধু গল্পই লেখো? কবিতা লেখো না?”

“পারি না”, জবাবটা রূঢ় শোনায়।

লোমশ লোকটার চোখ ইন্দিরার বুক থেকে মুখে উঠে আসে।

আবার অনাবিল হাসি হেসে ইন্দিরা বলে, “কবিতা লেখা মুখের কথা নাকি”

লোকটা পুনরায় আত্মতৃপ্তিবোধ করে আর ইন্দিরার বুকে চোখ ফেরায়।

অকস্মাৎ। ছুরির প্রয়োজন পড়লো না, “আপনি কখনো দুঃখের কবিতা লিখেছেন?” এক্ষেত্রে বেমানান প্রশ্নটা আপনা হতেই এলো।

লোকটা আবার চোখ ফেরাল ইন্দিরার মুখে, থমকাল কিছুক্ষণ, যেন কিঞ্চিৎ ভীত, সে বলল, “লিখেছি। কম। কিন্তু লিখেছি। লিখতে হয়েছে।”

ইন্দিরা অবাক হয়। আনন্দও পায়। সে এখন এমন বয়সে এসে পৌঁছেছে, যেখানে যে কাউকে যা খুশি প্রশ্ন করা চলে। লোকটা চোখ বুজে কিছুক্ষণ ভাবে, তারপর বলতে শুরু করে, “সেখানে পাইবে তুমি আমায়/ যেখানে জীবন মুঠো হইতে স্খলিত হয়/আমি কোন খাঁচার পাক্ষী/ হারাইয়াছি কোন বনে তাহা বুঝিনে” লোমশ লোকটার গলা ক্রমশ কাঁপতে থাকে, “আমার পালকে শুধু লাল লাল লাল/ হাতভরা জীবনের স্বেদ/ সকলই ক্লেদ, সকলই ক্লেদ।/ আমারে ত্রাণ করো/ ত্রাণ করো/ ত্রাণ করো হে প্রাণনাথ!” ইন্দিরা অবাক হয়ে দেখে “ত্রাণ করো প্রাণনাথ” বলতে বলতে লোমশ লোকটার চোখ থেকে দুফোঁটা অলৌকিক জল গড়িয়ে পড়ল।
 
লোকটা চোখ খুলতে সময় নেয়। খুলতে ইন্দিরা দেখে, লাল ওই চোখদুটো এখন আর তার বুকে নামছে না।

“কিছু মনে কোরো না, বয়স হয়ে গেছে তো, মন নরম হয়ে গেছে। ছেলেবেলার মতো একটুতেই জল ঝরে।” লোমশ হাত দিয়ে লোমশ লোকটা গাল মোছে।

“কোনো ব্যাপার না,” যেন আনন্দিত হওয়ার কথা ছিল, অথচ তেতো মুখে ইন্দিরা বলে, “নিবেদিতা দি এখনো এলো না,”

লোকটা বলে, “এই এসে পড়বে, আরেকটু বসো, তাড়া নেই তো,” লোকটার চোখ এখনো ইন্দিরার মুখেই আটকে আছে।

অবাক হয়ে ইন্দিরা ভাবে, তবে কি শুশ্রুষা এলো? ইন্দিরা প্রমাদ গোনে। তবে কি ভয় নয়? কেবল ক্ষত? বিষাদ? বিষণ্ণতা?

ইন্দিরা মনে মনে আস্তিন থেকে বিষাদের তাস নামিয়ে রাখে। এর কাজ ফুরিয়েছে সম্ভবত।

লোকটা, যেন অনুতপ্ত, ফের বলে, “আমি পড়বো তোমার বই”

ইন্দিরা মিনিট তিনেক সময় নেয় নিজের সঙ্গে বোঝাপড়া করার জন্য। পৃথিবী লোলুপ হয়ে আছে ভুলিয়েভালিয়ে লোকটাকে খাদের ধারে নিয়ে গিয়ে এক ধাক্কা মারার জন্য। সেটা যদিও লোকটার পক্ষে ক্ষতিকর। গত আধঘন্টা ধরে লোকটা ইন্দিরার বুক দেখেছে। ইন্দিরার কি লোকটাকে এখন ধাক্কা মেরে খাদে ফেলে দেওয়া উচিত?

লোমশ পুতুল ইন্দিরার উল্টোদিকে বসে ইন্দিরারই বই নেড়েচেরে দেখছে এখন। এই বই লোমশ মানুষটাকে কিচ্ছু দেবে না। শুধু হয়তো পায়ের তলার মাটিটা কেড়ে নেবে। নিজের অভ্যন্তরীণ ক্রূরতা ইন্দিরাকে ছাড় দেয়।

লোকটাকে বুকে ফেরাতে ইন্দিরা বলে, “এই বই আপনার ভালো লাগবে না।”

লোকটা অল্প হাসে, বলে, “কেন লাগবে না? আমি কিন্তু বেশ গল্প উপন্যাস পড়ি, সাহিত্যচর্চার মধ্যেই আছি। বঙ্কিম, শরৎচন্দ্র, রঙুক, বিশুক, সিকেরা- আমার সব পড়া।”

ইন্দিরা হেসে বলে, “আমি তেমন কিছু লিখিনা।”

“তাতে কী? তুমি ইয়ং ইওম্যান, লিখছো, কত বড় ব্যাপার! ভাবা যায়! তোমার বই বেরিয়েছে! নিবেদিতা কত বলে তোমার কথা”

“ওরকম অনেকেই লেখে আসলে, এখন আর এমন কিছু ব্যাপার নয়” ইন্দিরা হাত কচলায়। লোকটা এখনো তার মুখে আটকে আছে। কিছুতেই তাকে বুকে ফেরাতে পারছে না ইন্দিরা। এই অবস্থায় লোকটাকে ছেড়ে গেলে পৃথিবীর ভারসাম্য ক্ষুণ্ণ হবে। ইন্দিরার ক্রূরতা জিতে যাবে। আর জিতে গেলে ইন্দিরার ক্রূরতার জয় না, পরাজয় হয়।

অতএব, হ্যাঁচকা টান মেরে লোমশ পুতুলটাকে খাদের ধার থেকে সরিয়ে এনে ইন্দিরা বলে, “নিবেদিতাদি কিন্তু একদম আপনার মতো। কাজেকর্মে, কথাবার্তা, সবকিছুতেই”

লোমশ লোকটা গদগদ হয়। তার বুক স্ফীত হয়ে জামার বোতাম ফুঁড়ে সেলাই খুলে আরো আরো লোম বেরিয়ে আসতে চায়।

জেনেশুনে ঢিল ছোঁড়ে ইন্দিরা, “নিবেদিতা নামটা ওকে খুব মানায়, এত ডেডিকেটেড!”

“আমার দেওয়া!” বলে লোমশ হেসে ওঠে। আর তার দুচোখ অজগর সাপের মতো ধীরে ধীরে পিছলে ইন্দিরার বুকে নেমে আসে।

ইন্দিরা উল্লসিত হয়। মনে মনে নিজের পিঠ চাপড়ে বলে,- সাবাস!

আজ অবধি একটি থ্রিলার অথবা একটি প্রেমের গল্প না লিখতে পারা ইন্দিরা আস্তিনে বিষাদের তাস ভরে ফেলে উঠে দাঁড়ায়। বলে, “অনেক বেলা হল কাকু, আজ আসি। নিবেদিতাদিকে বলবেন, পরে আরেকদিন আসবো,”

“চলে যাবে? আচ্ছা... ঠিক আছে... আমি বলবো তুমি বই দিতে এসেছিলে।”
 
শো শেষে, লোমশ লোকটার বাড়ি থেকে বেরিয়ে এসে রাস্তার ধারের ড্রেনে সশব্দে থুতু ফেলে ইন্দিরা। তারপর দর্শকদের প্রতি মাথা ঝুঁকিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আস্তিনে নিজের ঠোঁট মুছে নেয়। 
 
---------------
 
লেখক পরিচিতি:
অলোকপর্ণা
কথাসাহিত্যিক।
বেঙ্গালুরুে থাকেন।
 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন