সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

ওয়াসি আহমেদ' এর গল্প সাঁতার শেখার সূত্র


এমন না যে মন্টু, সাবু, বাসন্তি, সুবলেরা সাঁতার জানে না। বেদম হাত-পা ছুঁড়ে হলেও পানিতে অন্তত ভেসে থাকার কায়দাটা জানে।

কেউ শেখায়নি, পুকুরে-ডােবায় ঝাপাঝাপি করতে করতে একসময় নিজেরা অবাক হয়ে আবিষ্কার করেছে বেঠাই পানিতে ডুবে না গিয়ে ভেসে থাকার কেরামতি তারা রপ্ত করে ফেলেছে। মানে সাতরানাের।

আবার এমনও না যে, গত বা চলতি বর্ষায় মাঠ-ঘাট ভাসিয়ে বাড়িঘর ঘিরে ফেলা পানিতে স্রেফ সাঁতার না জানার কারণে ঘড়া নিয়ে গােসল করতে গিয়ে এ পাড়ায় বা অন্য পাড়ায় একটা আট-দশ বছরের ছেলে বা মেয়ে পা হড়কে পানিতে পড়ে আর উঠে আসেনি। 

বা এমন না, ছােটদের একটা সাঁতার প্রতিযােগিতার তােড়জোড় চলছে। যে-কারণে সাঁতার কাটার নামে ঝুপঝাপ পানি ছিটানাের বদলে নিয়মকানুন মানা জরুরি হয়ে পড়েছে - যাতে সাঁতরানো যে পানিতে হাত-পা ছােড়াছুড়ি না, বরং ইদানীং মাঠে-ময়দানে তাে বটেই, বাড়ির চিলতে উঠানে, পথেঘাটে, নদীর পাড়ে সুপারিগাছের তক্তা-ব্যাটে লাল টেপ প্যাচানাে টেনিস বলকে কখনাে হাঁটু ভেঙে আস্তে, কবজির মােচড়ে, কখনাে পেছনের পায়ে ঠেস দিয়ে গায়ের জোর উজাড় করে পেটানাের মতাে একটা শিক্ষণীয় বিষয় তা মন্টু, সাবু, বাসন্তি, সুবলেরা বুঝতে শেখে। 

কোনােটাই না, তারপরও আজিজ মাস্টারের মাথায় ভূত। শুক্রবারে, স্কুল তাে থাকে না, সে দশ-বারাে বছরের বাচ্চাগুলােকে নিয়ে পুকুরে ক্লাস নেয় - সাঁতরানাের। পুকুরটা স্কুলের মসজিদ লাগােয়া, বাঁধানাে ঘাট-টাট নেই, বাঁশের খুঁটিতে আটকানাে তালগাছের গুড়িই ঘাট। এককালে নাকি বড় বড় ঝামা পাথর বসিয়ে তিন-চার ধাপের ঘাট ছিল। হতে পারে, যখন নিকুঞ্জবাবুরা ছিলেন, স্কুলটা নিকুঞ্জবাবু ওরফে নিকুবাবুর বাবা অনন্ত বিকাশ চৌধুরীর করা, কত দিন আগে কে জানে! ঝামাগুলাে হয় চুরি গেছে, নয় ভরা বর্ষায় বিলীন পুকুরের পানিতে তলিয়ে গেছে। দু-একটা পুকুরের তলানিতে টিকে থাকলে থাকতে পারে। সেটা কোনাে বিষয় নয়, বিষয় আজিজ মাস্টারের ক্লাস - শুক্রবারে সকাল দশটা-সাড়ে দশটা থেকে জুমার আজান হয়ে যাওয়ারও বেশ পরে মুসল্লিরা অজুর জন্য ঘাটে ভিড়তে শুরু করা পর্যন্ত। পানিতে চক-ডাস্টার চলে না, আজিজ মাস্টার  দাঁতে ফুটবল রেফারির হুইসেল কামড়ে আগেই হাজির থাকে। তেলমাখা খালি গা, মাঝারি উঁড়ির ঢালে পিছলে যাওয়া ঢলঢলে বারমুডায় তাকে যেমনই দেখাক, ব্ল্যাকবাের্ডে যেভাবে চেঁচিয়ে সুদকষা বা সম্পাদ্য বা বীজগণিতের সূত্র বােঝায় তেমনি টং টং মেজাজে হুইসেল বাজিয়ে সে বাচ্চাদের পুকুরপাড়ে সার করে দাঁড় করায়। পানিতে নামার আগে মুখে-মুখে নামতা শেখানাের মতাে ফ্রিস্টাইল, ব্যাকস্ট্রোক বা ডুবসাঁতার, যেদিন। রুটিনে যা সে-বিষয়ে কথা বলে, মানে ক্লাস নেয়। বাচ্চারা তাকে মানে, অর্থাৎ ভয় পায়। তবে বিষয়টা সাঁতার, তাদের আমােদের বিষয় বলে। কান পেতে শােনে, এমনকি পানিতে নামার পরও তার নির্দেশ মানতে সাধ্যমতাে চেষ্টা চালায়।

কাজটা যত সহজ মনে হয়, আদতে মােটেও না। একই বিষয়। বারবার বলে বলে শেখাতে নাজেহাল হয়ে আজিজ মাস্টার হয়তাে ভাবে এর চেয়ে সুদকষা বা সিঁড়িভাঙা সরল অঙ্কের মতাে জটিল-কুটিল। অঙ্ক বােঝানােও সহজ। যে বিষয়টাকে সে সাঁতারের মূল সূত্র বলে মানে। আর বাচ্চাদের মগজে ঢােকাতে গিয়ে মেজাজ খারাপ করে তা নতুন কিছু না, দম। কখন ছাড়তে হবে, কখন ধরে রাখতে হবে। কত করে যে বলে, নিজে করে দেখিয়ে দেয়! বারবার করে দেখায়, বলে, তােগাে মাতায় সােজা জিনিসটা ক্যান ঢােকে না ক তাে! আসল কতাটা অইল... এই দ্যাখ আরবার দেখাই... 

আজিজ মাস্টার যখন আজিজ মাস্টার হয়নি, ঘরের মানুষ বাইরের মানুষ সবার মুখে আঙ্গু, সে-সময় থেকেই তার মাথায় গণ্ডগােলের লক্ষণ টের পাওয়া যাচ্ছিল। যে-কারণে তার পক্ষে কোন ফাঁকে স্কুল-কলেজের পাট চুকিয়ে আব্দুল আজিজ-বিএসসি বনে যাওয়া ছিল বিস্ময়ের। আরাে বড় বিস্ময় - যখন সে অনন্ত বি (বিকাশ) চৌধুরী জুনিয়র স্কুলে সহকারী শিক্ষকের জন্য দরখাস্ত ঠুকে দেন-দরবার, ঘুষ-ঘাষ ছাড়াই চাকরিটা বাগিয়ে ফেলেছিল। তাজ্জব হলেও এর পর তার নামের শেষে মাস্টার ল্যাজটুকু না জুড়ে উপায় ছিল না।

ছােট যখন ছিল, তার মাথা খারাপের বড় লক্ষণ ছিল বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে কুমার নদীতে মােষের মতাে গলা ডুবিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা পড়ে থাকা। বাড়িতে বাপ-মার হাতে ঠেঙানি খেলে পানিতে নেমে কী ঝাল ঝাড়ত, ওঠার নাম করত না। স্কুলে মাস্টারের কানমলা বা জালিবেতের চাবকানি খেলে তো কথাই নেই।

তবে পানিতে যে পড়ে থাকত এতে ভয়ের কারণ ছিল না। সাঁতার কাটত ভালাে। কিছু নিয়মকানুন, কে আর তাকে শেখাবে, নিজে নিজেই কীভাবে যেন রপ্ত করেছিল। বছরে অন্তত দুই-তিনবার আশপাশের এলাকায় সাতার প্রতিযােগিতার খবর শােনামাত্র নাম লেখাবে বলে পাগল। হয়ে যেত। কিন্তু তার বয়সীদের জন্য আলাদা ব্যবস্থা নেই জেনেও তাগড়া। জোয়ানদের সঙ্গে সাঁতরাবে বলে জিদ ধরত, মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে এমন চেঁচামেচি জুড়ত, আয়োজকরা ধুশালা আপদ বলে মেজাজ খাট্টা করলেও শেষমেশ যা তুই এলেবেলে বলে নিয়ে নিত। আশ্চর্য যা, তেরাে-চৌদ্দ বছর বয়সে নলসিন্দুরের বিখ্যাত বৈরাগীর ঢােল সাঁতার প্রতিযােগিতায় এলাকার ঝানু সাঁতারুদের পেছনে ফেলে ফার্স্ট প্রাইজ চামড়ার খপিওয়ালা ট্রানজিস্টার বগলদাবা করে টানা গলায় আবদুল আলীমের হলুদিয়া পাখি সােনারই বরণ বাজাতে বাজাতে বাড়ি ফিরেছিল। 

যুদ্ধের বছর তার বয়স পনেরাের ওপরে হওয়ার কথা না। তারপরও কীভাবে যেন কাদের সঙ্গে ভিড়ে বর্ডার পার হয়ে বয়স ভাড়িয়ে, মানে বাড়িয়ে, নাম লিখিয়েছিল। দাড়ি-গােঁচের দেখা নেই, এদিকে বয়স নাকি তার উনিশ পাড়ি দিয়ে কুড়িতে ঠেকব-ঠেকৰ করছে। চোট্টামিতে ধরা পড়েও ট্রেনিং কিছু আটকায়নি। মালকেঁচা মেরে কাদাপানিতে সপ্তাদুয়েক সকাল-বিকাল লেফট রাইটের পর স্ট্রেন চালানাে, গ্রেনেড ছোড়ার নিয়মকানুন শেখা হয়ে গেলেও তার আসল বয়স আন্দাজ করেই হবে অপারেশনে নেওয়া হতাে না। সাঁতারে এলেবেলে হয়ে টিকে গিয়ে প্রাইজ জিতলেও যুদ্ধে এলেবেলে নিয়ে কে ঝামেলা পােহাবে! বয়সগত চোট্টামি ছাড়াও তার মাথার গণ্ডগােল হয়তাে ট্রেনিংয়ের সময় ধরা পড়ে থাকবে। 

দেশ তাে দুম করে স্বাধীন হয়ে গেল। এদিকে আজিজ মাস্টার ওরফে আজ্জুর যুদ্ধ করা হলাে না, একটা গ্রেনেড ফাটানােও না। ফিরে এসে সে তার রাগের কথাটা জনে-জনে বলে বেড়াত। সব দোষ নাকি কমান্ডার হামিদ ওরফে শহীদ হামিদ মীরের। তাকে শুধুআশায় আশায়ই রখিত। যুদ্ধ। শেষ হওয়ার মাসখানেক আগে মর্টারের গােলায় ছাতু হয়ে হামিদ মীর শহীদ হয়ে গেলেও লােকটার জন্য তার মায়া-টায়া ছিল না। বলত, নিজে শহীদ হইয়া পার পাইছে, আমার জীবন বরবাদ কইরা গ্যাছে।

সে সময় প্রায়ই তার মাথা গরম থাকত বলে মাথা খারাপ আজ্জুর বদলে মাথা গরম আজ্জু বলেই এলাকার লােকজন তাকে চিনত। সাঁতারে প্রাইজ জেতা বা কাউকে না বলে যুদ্ধে যাওয়াকেও পাড়াপড়শিরা তার মাথার গণ্ডগোলের সঙ্গে এক করে দেখত। অবশ্য একজন ছাড়া, সে তার মুদি দোকানদার বাপ মােতালেব। যুদ্ধের সময় মােতালেব সন্ধ্যার পর বাড়ির পেছনে ঘুটঘুটে ছাতিমতলায় পিড়ি পেতে বসে স্বাধীন বাংলা বেতার ধরতে আজ্জুর প্রাইজ জেতা ট্রানজিস্টারের নাক-কান মুচড়ে এত যে তন্ময় হয়ে থাকত তার কারণ যুদ্ধের খবরাখবরের চেয়ে ছেলের খবর জানাতেই নাকি ছিল তার বেশি আগ্রহ। কাউকে কাউকে নাকি বলেছে, আর রেডিয়ো কওয়া যায় না আব্দুর খবরও দিবার পরে। যুদ্ধের সময় রেডিয়ােতে খবর বলতে কোথায় কোন জায়গায় মুক্তিরা অপারেশন করছে, কতজন পাকসেনা বেঘােরে মারা পড়ছে, সেসবের মধ্যে আজ্জুর খবর জানতে তার বাপ যে কানকে চোঙ বানিয়ে রেডিয়োতে গেঁথে রাখত, গ্রামে ফিরে এ খবর শুনে তার মাথা আরাে গরম হয়ে গিয়েছিল। যুদ্ধেই নিল না কমান্ডার!

মাথা গরমের দাওয়াই অবশ্য তার জানা ছিল। পানিতে গলা ডুবিয়ে থাকার অভ্যাস আগেই ছিল। যুদ্ধ থেকে ফিরে অভ্যাসটা ফের চালু করতে দেখা গেল দিনে প্রায় সময়ই সে পানিতে কাটাচ্ছে। এতে কাজ কতটা হতাে সে ছাড়া আর কে বলবে! মাথা ঠাণ্ডা করতেই যে পানিতে নামত, তা-ই বা কে বলবে! জেনে-বুঝে করুক বা না-ই করুক, পানিতে সে নিশ্চয় কিছু একটা পেত। আর সাঁতার - একা একা সাঁতরে কোথায় কোথায় চলে যেত! তবে একবার প্রাইজ জেতার পর প্রতিযােগিতার আগ্রহ হয়তাে আর ছিল না, যে-কারণে খুব ভােরে, সাঁঝে কি সন্ধ্যায় বৃষ্টি-বাদলার বাছবিচার নেই, একা একা প্রায় নিঃশব্দে সাঁতরে চলত, ডুবসাঁতারে পানিতে শােরগােল তুলে এক টানে অনেক দূর গিয়ে শ্বাস নিতে মাথা তুলে আবার নীরবে-নিঃশব্দে পানির অতলে হারিয়ে যেত। অবস্থা দেখে কারাে কারাে মনে হতাে, মাথা গরমের কারণ শহীদ হামিদ কমান্ডারের ওপর রাগ ঝাড়তেই পানিতে একা একা নিজের সঙ্গে যুদ্ধ করে।

সাঁতার যে কেন কাটত আজ্জু কাউকে বলেনি, তারপরও মানুষজন যেমন খুশি ভাবত। যেন একটা কিছু ভাবা দরকার, ভেবে কারণ বের করা দরকার। কারণ ছাড়া মানুষ কিছু করে না। পাগলও? আজ্জুকে অবশ্য পাগল কেউ বলেনি, মাথা গরম আর পাগল এক না। যে যেমনই ভাবুক, আজ্জু ওরফে আজিজ হয়তাে মানুষজনের চিন্তাশক্তির পরীক্ষা নিতে একবার সাতরাতে সাঁতরাতে সাত-আট মাইল ভাটিতে নলাকান্দা বাজার পর্যন্ত গিয়ে। কী মনে করে আর ফিরে আসেনি, মানে লাপাত্তা হয়ে গিয়েছিল। নলাকান্দা বাজারে তার চেনা-জানা কেউ হয়তাে ছিল, হতে পারে সে তারই বয়সী, তারই মতাে বর্ডার পার হয়ে ট্রেনিং নিয়েছিল, হতে পারে তারও যুদ্ধ করা হয়নি – কমান্ডারের কারণে হােক বা ট্রেনিং শেষ হতে না হতে যুদ্ধ খতম হয়ে যাওয়ায়ই হােক। হতে পারে তাকে পেয়ে আজ্জু বুকে পুষে রাখা অনেক গুমরানাে কথা যা যুদ্ধ শেষে ফিরে এসে কাউকে বলেনি, বলেছিল; আর বলতে বলতে হয়তাে টের পাচ্ছিল মাথার ভেতরে আগুনের ধিকিধিকি তাপটা ঝিমিয়ে পড়ছে। হতে পারে, এরপর তারা দুজন বাজারে পাখির দোকানে গরম-গরম জিলাপি আর সরভাসা কড়া মিষ্টি চা খেতে খেতে অনেক গল্প করেছিল। হতে পারে, এরপর...

আন্দাজে-অনুমানে আর কত দূর!

লাপাত্তা হওয়ার মাস দুয়েক পর খবর পাওয়া গিয়েছিল সে নলাকান্দা মীর কাদিম হাইস্কুল থেকে এসএসসি পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছে। থাকে এক গরুর খামারির বাড়িতে, মাগনা থাকা-খাওয়ার বদলে দিনে এক বেলা বাদ-ফজর চারদিক ফর্সা হওয়ার পর খামারি রহম আলীর দুই ছেলেমেয়েকে পড়ায়। ছেলে ছােট, মেয়ে বড়। বিশেষ খবর বলতে আর যা জুটেছিল, পানির টান তার কিছুটা কম গেছে, সাঁতার কাটে ঠিকই তবে আগের মতাে না,, পানিতে গলা ডুবিয়েও পড়ে থাকে না, আর মাথাও নাকি তার ঠাণ্ডা। উড়াে খবর হােক, ফালতু গুজব হােক, এলাকার লােকজনের ধারণা মাথা ঠাণ্ডার কারণ খামারির দশ-এগারাে বছরের পরির মতাে মেয়ে সুরাইয়া। পরির মতাে কথাটা বাড়াবাড়ি হলেও, লােকজনের ধারণা মেয়েটা সুরাইয়া না সুমাইয়া যদি দেখতে-শুনতে চলনসইও হয় আর আজুর সামনে পড়তে বসে ছােট ভাইয়ের নজর লুকিয়ে ঘন ঘন তার দিকে মিষ্টি করে তাকায়, মিষ্টি করে না হলেও শুধুনরম-ঠাণ্ডা চোখেই তাকায়, বা স্কুলে যাওয়ার আগে জায়গির মাস্টারের খাওয়ার একটু-আধটু তদারকি করে, তাহলে ছ্যামড়ার গরম মাথা ঠাণ্ডা না হয়ে যায় কই! মাথা গরমের উছিলা লাগে, কমান্ডার যুদ্ধে নেয় নাই এইটা একটা উছিলা। আরে বাবা, যুদ্ধ করছ নাই তাে হইছেটা কী, জান বাজি রাইখা তুই এটুক ছাওয়াল যুদ্ধে গেলি, টেনিং নিলি, ইস্টেন-ফিস্টেন চালাইতে শিখলি, সােজা কথা! আর দ্যাশে ফিরা কী। উল্টাপাল্টা প্যাচাল ধরলি - তােরে নেয় নাই। আরে গাধার গাধা, যুদ্ধ করছ আর না-ই করছ, তুই যে মুক্তি এইটা ভুইলা গেলি! কয়টা মুক্তি টেনিং নিয়া যুদ্ধ করছে ক তাে! ফিরা আইসা কেউ কইছে যুদ্ধ করি নাই! উল্টা গুল পিটছে পিপড়ার লান টিপা টিপ্যা পাঞ্জাবি মারছে, গণ্ডা-গণ্ডা ডজন-ডজন। তুই খামােখাই এট্টা উছিলা বাইর করলি, হামিদ কমান্ডাররে দুষলি। যাউক, এক উছিলায় মাথা গরম, আরেক উছিলায় ঠাণ্ডা। 

শােনা কথা, তার বাপ মােতালেব নাকি তার সঙ্গে দেখা করতে তখন মাঝে মাঝে চুপিচুপি নলাকান্দা যেত, সঙ্গে পুঁটলিবাঁধা তার মায়ের হাতে বানানাে নারকেলের মােয়া, গাছের টসটসে কালােজাম, এমনকি লােকজন। সাক্ষী, এক বর্ষায় দুইটা মস্ত কাঁঠাল নিয়ে নৌকা কেরায়া করে তারামন, মানে আজুর মাকেও নিয়ে গিয়েছিল। দিনে দিনে ফেরার তাড়া থাকলেও মােরগ জবাই করে মেহমানদারির পর সুরাইয়া না সুমাইয়ার মায়ের জোরাজুরিতে রাতটা না কাটিয়ে ফেরার উপায় ছিল না।

ছেলের সঙ্গে যােগাযােগ থাকলেও মােতালেব আজ্জুর ব্যাপারে কাউকে কিছু বলত না। লােকটা সে বরাবরই মুখচাপা, দোকানদারি করত মন দিয়ে, গায়ে পড়ে কিছু বলতে যেত না। যুদ্ধের সময় সেই একবারই আজ্জুর ব্যাপারে মুখ খুলেছিল। রেডিয়ােতে কান ঠেকিয়ে আর খবর জানতেই যে সে বসে থাকে, কথাটা বোস বলে ফেলে ভেবে পায়নি। কাজটা ঠিক করল না বেঠিক। কিন্তু এরপর, আজ্জু লাপাত্তা হয়ে নলাকান্দায় থিতু হওয়ার পর সে ও তারামন নিশ্চয় সলাপরামর্শ করেই ঠিক করেছিল আজ্জুর বিষয়ে কিছু বলতে যাবে না। ছেলের কথা কেউ জানতে চাইলে দুজনেই এমন ভাব করত যেন খবরাখবর কিছু জানা। নেই। আজ্জুর প্রাইজ পাওয়া রেডিয়াের কী অবস্থা এমন প্রশ্নের মুখেও তাদের পড়তে হতাে। জবাব না পেয়ে কারাে ধারণা হতাে যুদ্ধের পর রেডিয়াের কাজ নেই বলে হয়তাে পড়ে থেকে বরবাদ হয়ে গেছে, নয়তাে চুরি গেছে। আসলে যে কথাটা কারাে মাথায় খেলেনি তা হলাে, যেবার তারা স্বামী-স্ত্রী মিলে জোড়া কাঁঠাল নিয়ে নলাকান্দা গিয়েছিল, সেবার চটের থলেতে করে রেডিয়ােটাও তাদের সঙ্গী হয়েছিল। আর এ তাে কেউ জানে না, জানার কথাও না, রেডিয়াে পেয়ে আজ্জু খুশী হয়েছিল।

এলাকা ছাড়ার ঝাড়া সাত বছর পর আজ্জু যখন ফিরে এলাে, তখন গায়ে-গতরে অনেক বড়সড় হওয়ায় তাকে চট করে চেনা কঠিন হলেও চেনাতে সাহায্য করল সেই রেডিয়াে। চামড়ার খাপ ছিড়ে গিয়েছিল, তার পরও লােকজনকে মনে করিয়ে দিতে হলাে না এটা সেই জিনিস যা নিয়ে অনেক বছর আগে এক সন্ধ্যায় নেচে নেচে হলুদিয়া পাখি বাজাতে বাজাতে সে বাড়ি ফিরেছিল।

সাত বছর সে কী করেছে মানুষকে বলে না বেড়ালেও যা জানা গেল তাতে অনেকের তাজ্জব হওয়ার পালা। বাপ-মা নিশ্চয় জানত, এবার এলাকার লােক জানল নলাকান্দায় বছর দুয়েক থেকে সে পাড়ি দিয়েছিল ফরিদপুর জেলা সদরে। সেখানে ছাত্র পড়িয়ে নিজের পড়ার খরচ জুগিয়ে। বিএসসি পাশ করেছে, তাও খােদ সরকারি রাজেন্দ্র কলেজ থেকে। কিছুদিন যেতে তার ব্যাপারে কৌতূহলী লােকজনকে বেকুব বানিয়ে সে  যখন অনন্ত বি জুনিয়র স্কুলে সহকারী শিক্ষক হয়ে চক-ডাস্টার হাতে ক্লাসে-ক্লাসে ঘুরতে লাগল, দেখা গেল মাস্টারিতে সে মন্দ না, দোষের মধ্যে গলাটা বেশি চড়া। তবে ক্লাসের ফাঁকে মাস্টারদের কমনরুমে তার গলা বড় একটা চড়ত না। স্কুলে যােগ দেওয়ার মাস দুই-তিনের মধ্যে সে আবার খবর হয়ে উঠেছিল। তখন শীতকাল, সম্ভবত পৌষের শেষ। লােকজন কাঁথা-চাদর, বাঁদরটুপি দিয়ে শীত ঠেকাতে কূল পাচ্ছে না, এমনি একদিন বিকেলে বা সন্ধ্যার মুখে সদ্য আজিজ মাস্টার বনে যাওয়া আজ্জুকে দেখা গেল শীতের পরােয়া না করে চাদর-টাদর ছাড়াই ঘিয়া পাঞ্জাবি আর সফেদ পাজামা পরে পানিতে টান পড়া নদীর চড়ায় একটা ছইওয়ালা নৌকা থেকে নামতে। একটু পরই নজরে পড়ল সে একা না। পিছুপিছু আরেকজন। লম্বা ঘােমটায় মুখ দেখা না গেলেও এ যে অন্য কেউ না তার বউ, এমন ধারণায় যারা বাজি ধরতে এক পায়ে খাড়া ছিল, তাদের কষ্ট করে সত্যতা যাচাই করতে হলাে না। 

হ্যাঁ, নতুন বউ নিয়ে এভাবেই তার বাড়িতে ঢােকা। আর দুই দিন পরে যা জানা গেল, মেয়েটা — বউটা আর কেউ না, পরি-সুন্দরী সুরাইয়া। একটা উড়াে গুজব বাস্তবে রূপ নিতে দেখা গেল সুরাইয়া পরি-টরি না, সাদামাটা চেহারার হালকা-পাতলা গড়নের মেয়ে। এই তবে সে যে মাথা গরম আজ্জুর মাথা ঠাণ্ডা করেছিল, পানি থেকে টেনে ডাঙায় তুলেছিল! সব গুজব যে গুজব না, কিছু গুজব ভবিষ্যদ্বাণীর মতাে ফলে যায় – আজ্জু ওরফে আজিজ মাস্টারের বউ হয়ে সুরাইয়া বুঝি এ কথাই প্রমাণ করে ছাড়ল।

কত কাল আগের কথা! সেসব ঘটনার যারা সাক্ষী, এত বছর পরও তাদের মনে পড়ে মাথা খারাপ আজ্জু কী করে ধীরে ধীরে এলাকায় নামকরা অঙ্কের মাস্টার বনে গেল। মাস্টারি অবশ্য তার স্কুলেই, বাড়িতে টিউশনি কোনাে দিন করেনি। এ আরেক রহস্য। অঙ্কের মাস্টার, হেসেখেলে দুই-তিনটা ব্যাচ সামলানাে কোনাে ব্যাপার না। বাংলা যে বাংলা, তাও প্রাইভেট না পড়লে নাকি জিপিএ ৫ পাওয়া যায় না। আর অঙ্ক বা ইংরেজি হলে তাে কথাই নেই, বিশেষ করে অঙ্ক। প্রথম প্রথম লােকজন, এমনকি স্কুলের সহকর্মীরাও পরামর্শ দিত, সে কানে তােলেনি। তার এক কথা, গাধাগুলানরে ইস্কুলে এত বুঝানাের পরে আর কী বাকি থাকে! কিন্তু টাকাকড়ি কি জীবনে কিছু না! বাড়িতে বসে মৌজে বানের পানির মতাে টাকাকড়ির আমদানি - এ না হলে অঙ্কের মাস্টার! কিন্তু দেখা গেল, তার বাড়িতে যে ব্যাচের কারবার নেই, এ খবরটাই অঙ্কের মাস্টার হিসেবে তার নামজাকের মূলে।।

এত বছরে সংসার তার বড় হওয়ার কথা ছিল, হয়নি। বাপ-মা মরে গেছে। বাজারে বাপের দোকান কে চালাবে! ভাড়া দিয়ে রেখেছিল বছরখানেক, কয়টা টাকাই বা ভাড়া, তাও নানা ক্যাঁচমেচ, বিক্রি করে আপদ বিদায় করেছে। এদিকে পরি-সুন্দরী সুরাইয়াকে নিয়ে এককালে যত রটনাই রটুক, কে জানত তার কাচ্চাবাচ্চার মা হওয়ার উপায় নেই। বাজা বউ নিয়ে আজিজ মাস্টারের মনে জ্বালাপােড়া আছে বলে মনে হয় না।

এদিকে পানির টান যে তাকে ছেড়ে গিয়েছিল তা সত্যি নয়। নলাকান্দায় যাওয়ার পর বা সাত বছর পর গ্রামে ফেরার পর অনেকের এমন ধারণা হলেও পরে দেখা গেছে ছােটবেলার মতাে পানিতে গলা ডুবিয়ে পড়ে না থাকলেও সে মাঝে মাঝেই লম্বা সময় পানিতে কাটায়, তাও পুকুরে-টুকুরে না, নদীতে। যুদ্ধের পর বিনাযুদ্ধে ফিরে এসে পানির সঙ্গে যুদ্ধ করত, এ না হয় মানা গেল। বা আরাে ছােটবেলা বাপ-মার ওপর, মাস্টারদের ওপর রেগে টং হয়ে পানিতে যে নামত তারও না হয় যুক্তি ছিল। তখন বয়স কম ছিল। তবে পরে যে পানিতে নামত - নিয়মিত না, দুই-তিন বছর পর পর হঠাৎ হঠাৎ – চুপচাপ, সাড়া নেই শব্দ নেই, সাঁতরে চলত, এর কী কারণ? যদি বুঝিয়ে বলত। যদি বলত আমার ইচ্ছা, আমার খেয়াল, তুমাগের কী, তাহলে কিছু বােঝা না গেলেও বােঝা যেত সেই যে লােকে একসময় বলাবলি করত পানিতে সে কিছু একটা পায়। কী পায় তা হয় না-ই বলত। পায় যে, একি শুধুই কথার কথা? হামিদ কমান্ডার যুদ্ধে নিল না বলে মনের ঝাল ঝাড়তে পানিকে বেছে নিল এ তাে মানুষের ধারণা। সত্যি যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে পরে যখন বড় হয়ে পানিতে নামত, দুই-তিন বছর পর পর হঠাৎ হঠাৎ, কী হাসিল করতে? কার ওপর, কিসের ওপর ঝাল ঝাড়তে?

দেশে যুদ্ধ-টুদ্ধের কোনাে আলামত নাই। স্বাধীন দেশে কিসের যুদ্ধ যে। সেই কোন কালে তাকে যুদ্ধে নেয়নি বলে পুরনাে রাগ আবার তার মাথায়। চাড়া দেবে! তবে পানি যে তাকে কখনােই ছাড়েনি, আর সেও ছাড়েনি, এ তাে সত্য। মুখ ফুটে তাে কাউকে কিছু বলে না। বউকে বললে বলতে পারে। বাজা হলেও বউকে যে সে ভালােবাসে এ মােটেও লুকাছাপার বিষয় না। কায়দা করে জানতে চাইলে বউয়ের কাছে হয়তাে জবাব একটা পাওয়া যেতে পারে, আবার নাও পারে। তবে সঠিক যদি জানতে হয় তাহলে বউ-টউ না, তার মুখেই শােনা উচিত। তাকে কি আবারাে কেউ যুদ্ধে না নেওয়ার পায়তারা করছে? কিসের যুদ্ধ?

মানুষের দোষ কী! একটা সুস্থ লােক যে আবার এলাকার নামি অঙ্কের মাস্টার, সে কেন জগতে এত কিছু থাকতে পানিকেই বেছে নেবে - এ ধাঁধার কিনারা করতে পারে না বলেই তারা ওলটপালট নানা কিছু ভাবে।

ভাবার কারণের অভাব নাই। আগে একাই নামত পানিতে। দিনে কি রাতে, বৃষ্টিবাদলার তােয়াক্কা করত না। এখন নিজেই নামছে না, ছােট ছেলেমেয়েদের নিয়ে মহা তােড়জোড়ে নামছে। বীজগণিতের মতাে সাঁতারের সূত্র বােঝাচ্ছে। দম ধরে রাখা, দম ছাড়া শেখাচ্ছে। আর আশ্চর্য, ফ্রিস্টাইল, ব্যাকস্ট্রোকের চেয়ে বেশি শেখাচ্ছে ডুবসাঁতার - টানা না, থেমে থেমে ছােট-ছােট ডুবে আট-দশ গজ গিয়ে পানিতে তােলপাড় না তুলে, মাথা-নাক-থুতনি জাগিয়ে দম ছাড়া, দম নেওয়া। তাড়াহুড়া চলবে না, হাঁসফাস না। প্রথম প্রথম হাঁসফাস লাগবে, ধীরে ধীরে কন্ট্রোল করতে হবে। কন্ট্রোল। না হলে হবে না। কী হবে না?

আজিজ মাস্টার মুখ খােলে না। বাচ্চাদের যে কী জাদু করেছে ওরাও জানতে চায় না ডুবসাঁতারে কেন তাদের এত পোক্ত হতে হবে। হতে পারে, কারণ জানলে মজাটা থাকবে না। কিংবা এমনও হতে পারে, মজার কারণ আজিজ মাস্টার নিজে। এই যে ঘড়ি ধরে হুইসেল খুঁকে তাদের জড়াে করছে, সার করে পুকুরপাড়ে কলাগাছের মতাে দাড় করাচ্ছে, পানিতে নামার পরও হুইসেল বাজিয়েই নির্দেশ দিচ্ছে, এরকম কিছু তাে আগে কখনাে তাদের জীবনে ঘটেনি। বা হতে পারে, আজিজ মাস্টারের ছােটবেলার কীর্তিকলাপ বড়দের মুখে শুনে শুনে, বিশেষ করে ভরা বর্ষায় টানা সাতারে, ডুবসাঁতারেও হতে পারে, সাত-আট মাইল ভাটিতে নলাকান্দায় গিয়ে যে উঠেছিল, এসবই তাদের মজার কারণ।

কিংবা তাও না। মজার কারণ খুঁজে মজা নষ্ট করতে তারা নারাজ। আর তাই মজাটা যে কী জানা নেই বলেই অজানা মজার টানে দিন দিন আজিজ মাস্টারের ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা বাড়ছে। শুধু শুক্রবার না, কিছুদিন হলাে শুক্র-শনি সপ্তায় দুই দিন ঘড়ি ধরে রুটিনমাফিক ক্লাস। সেই সঙ্গে পুকুরপাড়ে ভিড় করা দর্শকের সংখ্যাও বাড়ছে। ভাবখানা এমন, ডাক পেলে বড়রাও মালকোঁচা মেরে নেমে পড়তে রাজি।

কী মতলব - যে হারে বাচ্চারা পানির দিকে ঝুঁকছে! নিজের তার পানির টান বাচ্চাগুলাের ওপর চাপিয়ে সে কি চায় ডাঙা ছেড়ে সবাই পানিতে থাকুক? ডাঙার কী দোষ! 

মানুষের কৌতুহল। তারা জানে আজিজ মাস্টার এখন আর ছােটবেলার মাথা গরম আজ্জু  না। কী এমন হয়েছে বা কী হতে যাচ্ছে সামনে যে বাচ্চারা তাে বাচ্চারা, পারে তাে গ্রামসুদ্ধ মেয়ে-পুরুষকে হুইসেল কুঁকে পানিতে নামায়, ডুবসাঁতারের তালিম দেয়। তখন তাে পুকুরে কুলাৰে , পালে পালে নদীতে, বিল-বাওড়ে নামাবে?



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন