সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

মোনালিসা ঘোষ'এর গল্প: হিমুর সঙ্গে হিমালয়ে



আলেয়া :
 
হিমুকে হঠাৎ কলকাতায় দেখব ভাবিনি।ভর দুপুরে কলেজ স্ট্রীটে সংস্কৃত কলেজের সামনে ঘোরাঘুরি করছে। সেই হলুদ পাঞ্জাবী আর গুচ্ছের দাড়ি আর চুল।ভবঘুরে ছন্নছাড়া দেখতে ; আর একটা কি করি কি করি ভাব।

কিন্তু হিমুই তো ! কারণ হুমায়ুন আহমেদ কখনই হিমুর চেহারার কোনো ছবি দেননি গোটা জীবৎকালে ।আর এখন তো দেবার প্রশ্নই ওঠেনা। কী করব ! হিমু যদি না হয়? সোজা জিগেস করে ফেলব ? আপনি কি হিমু ? না ? না !

দমকা রোখ চেপে গেল। ডাকলাম, 'শুনছেন?'

সে ঘুরে দাঁড়াল।

-আজ্ঞে , আমায় বলছেন?

হিমু না হয়ে যায় না। কারণ লোকটা চমকায়নি। যেন জানা ছিল কেউ ডাকবে। অন্য কেউ হলে চমকাতো। ভুরু কোঁচকাতো। আসলে আপনাকে যেন কার মত দেখতে, চেনা চেনা। অত্যন্ত বোকামি করছি , বুঝতেই পারলাম । কারণ কোনোদিন কোনো বইতে কখনই হিমুর ছবি দেখিনি। কার মত দেখতে কি করে জানব !

- নামটা একটু বলবেন ?

- হিমালয়।

- ওহ্ আচ্ছা।

এপাশ ওপাশ তাকিয়ে হঠাৎ হ্যাঁচকা টানে টেনে হড়বড় করে নিয়ে সংস্কৃত কলেজের খাঁ খাঁ সিঁড়িতে বসিয়ে দিলাম।

- এখুনি ঠ্যালাচাপা পড়তেন । আপনার স্রষ্টা তো আপনাকে মেরে রেখে যাননি। হড়বড় করে নিজেই মারা গেলেন। প্যাজেরো গাড়ী নিয়ে আপনার বরাবর দেখেছি একধরণের মাথাব্যাথা আছে । ঠ্যালাচাপা পড়লে কি সম্মানটা থাকত ?
 
হিমু কিছু বলার জন্য হাঁ করতেই তাকে থামিয়ে দিয়ে বললাম , ‘ আহা হা , আপনার সম্মানের কথা তো হচ্ছে না। আপনার বাবা তো আপনাকে মহাপুরুষ বানাতে গিয়ে আপনার সম্মান হ্যানাত্যানা সব উচ্ছন্নে দিয়েছে। আমি আপনার লেখক হুমায়ুন আহমেদের কথাই বলছি। ‘

হিমু বলল,' জী , আপনি ঠিক কথাই বলছেন। আসলে হাতে তেমন কাজকম্ম নেই কিনা , উনি মারা গেছেন। অবসরে আছি তো ।আপনিও তো মনে হয় অবসরে আছেন আপা , নয়তো আমাকে যেমন পাকড়াও করলেন।'

আমি নিঃস্পৃহ গলায় বললাম , 'আপনি ওসি সাহেবদের থানায় গিয়ে এইসব অবসরে থাকার কথা বলতেন, যাতে ওসিকে রাগিয়ে লকআপে ঢুকে মনোনীত লোকটার কাছে পৌঁছতে পারেন, যে পুলিশের দলা খেয়েছে। এসবই আপনার লেখক আপনাকে দিয়ে করিয়েছেন। আমাকে এসব ফালতু কথা বলে লাভ নেই।'

হিমু বলল , 'জী আচ্ছা।'

- অবশ্য আপনাকে পাকড়ানোর ব্যাপারে আমার অনেক দিনের একটা সুপ্ত ইচ্ছে কাজ করছিল।

- বলেন আপা।

- এই শুনুন , আমি আপনার আপা , ফুপা , খালু কেউ নই। ফুরুৎ করে বই থেকে বেরিয়ে কলেজস্ট্রীট চত্বরে ঘোরাঘুরি করছেন। আপা ফুপা বলবেন না একদম। আমি আলেয়া। আলেয়া বলে ডাকবেন।

- আচ্ছা আলেয়া।

- আর আমি আপনাকে লেবুর শরবৎ এইসব খাওয়াতে পারবনা, স্বাস্থ্যের কথা ভেবে। বরং আমার ইচ্ছে করছে , আপনার এই হলুদ পাঞ্জাবীটা কেচে ফেলি। কটা আছে সঙ্গে এমনি জঘন্য পাঞ্জাবী ? সবকটাই কাচবো।

- জী কাচবেন।

- হ্যাঁ , এখন আপনার হাতে কোনো কাজ নেই , অবশ্য হাবিজাবি বকে মানুষকে বিভ্রান্ত করা ছাড়া আপনার কোনোকালেই কোনো কাজ ছিল না। এইটা হল আপনার স্রষ্টার কাজ। যত রাজ্যের হাবিজাবি কথা তাঁর মনের মধ্যে বজকাতো , তা উনি সব আপনার মুখ দিয়ে বলিয়েছেন। ছিঃ , ছিঃ , ছিঃ।

- ছিঃ ছিঃ , আপনি আমাকে যা খুশী বলুন ম্যাম্ , আমার স্রষ্টাকে দয়া করে কিছু বলবেন না।

কড়া চোখে তাকালাম।

- ম্যাম্ আবার কি ? আলেয়া , ব্যাস আলেয়া বলে ডাকবেন।

- জী আলেয়াজী।

- জী চলবে না।

- জী আচ্ছা।

- এখন শুনুন আমার অ্যাজেন্ডাটা আপনাকে নিয়ে। আপনি না তুমি। এবার থেকে তোমাকে তুমি বলেই ডাকব।

- জী ডাকবেন।

- তুমি এরকম বই- এর পাতার মধ্যে অনন্তকাল ভূতের মত বসে থাকতে পারো না !

- জী , না পারিনা। আমার তো ভবঘুরে স্বভাব !

- সেইজন্যেই আমি তোমাকে পরিণতি দেব , সে মেরে হোক , অ্যাক্সিডেন্ট ঘটিয়ে হোক , নিমোনিয়ায় ভুগিয়ে হোক, তোমার একটা পরিণতি আমি দেব। নিমোনিয়াতে তো তুমি ভুগতেই পারো , লেখক হুমায়ুন আহমেদ আর তোমার বাবার দুজনেরই বাতিক ছিল , জ্বর হলে ট্যাবলেট না খাইয়ে জল চিকিৎসা করানোর। যে কোনোদিন তুমি নিমোনিয়াতে ভুগে মরতেই পারতে। মরোনি তার কারণ লেখক তার সিরিজের স্বার্থে তোমায় বাঁচিয়ে রেখেছিল। আমার ধারণা ওরকম জবরদস্তি কারুর ইমিউনিটি বাড়ানো যায় না। যত্তসব বদমায়েশি।

- আজ্ঞে , আলেয়া আপনি তো দেখছি ঘোর রেগে আছেন । ঠিক কার ওপর রেগে আছেন , আমার ওপর , নাকি আমার বাবার ওপর নাকি লেখকের ওপর ?

- ধুর , তোমার ওপর রেগে কি করব ? তুমি তো একটা জলজ্যান্ত চরিত্র যার স্রস্টা মারা গেছেন বলে , তুমি না পাচ্ছো তোমার কোনো বিপদগ্রস্ত বন্ধুকে , থানার ওসিকে , না কোনো মন্ত্রীকে , না ফুপা , আপা কাউকে, না রূপাকে। বাই দ্য ওয়ে , ইয়েস , তুমি রূপাকে নীল শাড়ী পরে ছাদে দাঁড়াতে বলতে আর তারপর যেতে না। রূপা জানত তুমি আসবে না , তবুও দাঁড়িয়ে থাকত । কি মর্মান্তিক ! আমি তোমার ওপরেই রেগে আছি। তোমার সঙ্গে আমার একতরফা অ্যাজেন্ডা হল , হিমু অর্থাৎ হিমালয় , যার বাবা একটা পাগল ছিল , এই চরিত্রটার একটা সমাপ্তি টানা। আর তুমি আমার কথা শুনতে বাধ্য , কারণ তুমি একটা চরিত্র মাত্র যে নিজে থেকে কিছুই করে না , তার লেখক তাকে দিয়ে যা করায় , যা বলায় সে করতে আর বলতে বাধ্য।

এইসব বলে আমি হিমুকে বাড়ি নিয়ে চলে এলাম। হিমু বলল , 'আপনি আমাকে পরিণতি দেবার জন্য আমাকে মেরে ফেলতেও রাজী। সত্যি আপনি কি দয়ালু ! আমার চোখে পানি এসে যাচ্ছে।' আমি এসব কথায় কান দিলাম না।

গিজারের গরমজলে তাকে স্নান করতে পাঠালাম। হলুদ পাঞ্জাবী কাচতে দিয়ে তাকে সাদা টিশার্ট পরিয়ে দিলাম। আর তিন বেলা দাঁত মাজতে হবে বলে দিলাম। হুমায়ুন আহমেদের আমদানী করা পাঙ্গাস মাছ নাকি ছাতার মাথা , ওসব আমি রাঁধতে পারব না এ বাড়িতে চাইনিজ , কন্টিনেন্টাল , মোচার ঘন্ট , ট্যাংরা মাছ যা হবে , তাই খেতে হবে। হিমু জানালো , 'অসুবিধা নাই।'

 
হিমু :
 
 
আমরা ট্রেনে বসে আছি । সিকিম যাব। ট্রেনে উঠে থেকেই আলেয়া মন দিয়ে প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখছেন। মনোরম দৃশ্য। মাঝে মাঝে ছোটো একটি ডায়েরিতে কি সব লিখছেন।

- কি লিখছেন আলেয়া ?

প্রশ্ন করতেই আলেয়া কটকট করে তাকালেন , যেন এটি একটি নিষিদ্ধ প্রশ্ন।
 
আমাকে নিয়ে আমার লেখক হুমায়ুন আহমেদ কোনোদিন এমন দূরদেশে যাত্রা করেন নি। তিনি নিজের মত লিখতেন আর আমি অনেক কিছু করে ফেলতাম।

সেদিন আমাকে গীজারের গরম পানি তে স্নান করতে হয়েছে গায়ের ময়লা ওঠাবার জন্য। গরম পানি আমি দুচক্ষে দেখতে পারিনা , এই কথা বলে ফেলায় উনি কটমট করে তাকিয়ে বলেছেন , ‘কি মনে করেছো এ্যাঁ ? দরজার ওপাশে উপন্যাসে তুমি , মানে হিমু বাথটবে বরফের চাঁই ঢেলে বসেছিলে !’

- জী না , আমি বসিনি আলেয়া । লেখক ওমনি লিখেছেন।

রাগে কাঁপতে কাঁপতে আলেয়া বললেন , 'ছিঃ , আমি ভাবতে পারছি না , চরিত্রদের নিমোনিয়া হোক , এটা উনি কেন চাইতেন ! বারবার উনি একই প্রচেষ্টা করেছেন। শুধু হিমু সিরিজেই নয় , অন্যান্য উপন্যাসেও। বৃষ্টিতে ভিজে জ্বর হলে প্যারাসিটামল না খাইয়ে জল চিকিৎসা করা হয়েছে। নাহ , আমি ওনার নামে নিমোনিয়া প্রচেষ্টার মামলা করব।'

- জী , আলেয়া । কিন্তু মামলা কিভাবে করবেন ? উনি বেহেস্তে আছেন কিনা ....

এ'কথায় বোম পড়ার মত একটা আওয়াজ হয়েছিল। আর আমি বাথরুমে ঢুকে গেছিলাম।
 
 আপাততঃ এখন সিকিম যাচ্ছি। নামব শিলিগুড়িতে।

আমার নাম দেওয়া হয়েছিল হিমালয়। হিমালয় দেখা তো কখনও হয়নি। বই এর পাতা থেকে বেরিয়ে হিমালয়ে বেড়াচ্ছি , এটা একটা দারুণ ব্যাপার। কিন্তু এটা আলেয়াকে বলা যাবে না। লেখক হিমালয় নাম রেখেও কেন হিমালয়ে নিয়ে এসে গল্প লেখেন নি, এ নিয়ে আলেয়া তুমুল রাগারাগি করবেন। তখন আমার অবস্থা হবে , করুণ ও নিদারুণ।

আলেয়া হঠাৎ ঘুরে বসে জিগেস করলেন , 'হিমু , তোমাকে কেমন দেখতে কেউ কিন্তু জানে না।'

- জী , না জানে না।

- কোনো বইতেই তোমার লেখক তোমার কোনো ছবি আঁকান নি। হলুদ পাঞ্জাবী দড়িতে ঝুলছে , সেটা আবার ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইটে ! কি ঝামেলা ! গল্পে চোদ্দবার করে বলা আছে , হিমু হলুদ পাঞ্জাবী পরে ঘোরে।

- জী ।

- কটা ছিল হলুদ পাঞ্জাবী ?

- জানা নেই আলেয়া।

- এটা নিষ্ঠুরতা না ?

- জানি না আলেয়া ।

বিড়বিড় করে আলেয়া বললেন , 'অন্যায় ! হিমু আমি ঠিক কার ওপর রেগে আছি , তোমার ওপর , নাকি তোমার বাবার ওপর , নাকি লেখক হুমায়ুন আহমেদের উপর ?'

- জী , মনে হয় লেখকের উপর।

- হুম্।

অনেকক্ষণ আলেয়া প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে লাগলেন। এক সময় নিজেই বলে উঠলেন, 'তোমার লেখকের সঙ্গে আমি যোগাযোগ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সঠিক ঠিকানা পাইনি। দুঃখের কথা। তোমার বাবা একটা জাবদা খাতায় মহাপুরুষ হয়ে ওঠার জন্য উপদেশাবলী তোমার জন্য লিখে রাখতে গিয়ে মাত্র আঠেরো পাতা লিখে মারা গেলেন। তোমার জন্য ভালোই হল। উনি বেঁচে থেকে তোমাকে মহাপুরুষ বানানোর ট্রেনিং দিলে তুমি একটা ক্রিমিনাল হতে বলেই আমার বিশ্বাস।'

আলেয়া আবার চুপ করে গেলেন।

কি আশ্চর্য , এক সময় দেখা গেল , মাঠ ঘাট বন বাদাড় দেখতে দেখতে ওনার চোখ দিয়ে টপ টপ করে পানি পড়ছে।

আমি সেই অপূর্ব কান্না চুপ করে দেখতে থাকলাম।

আলেয়ার কান্না দেখতে দেখতে আমার মন খারাপ লাগছে কিনা পরীক্ষা করে দেখতে গেলাম। মন খারাপ লাগা মানে মায়া। মায়ার ব্যাপারে মনে পড়তেই টিয়া পাখীটার কথা মনে পড়ল। সেই সুন্দর টিয়া পাখীটা যেটা বাবা আমার জন্য কিনেছিল। আমি একটা শুকনা মরিচ আনতে গেলাম টিয়াপাখীটা কে খাওয়াবো বলে। এসে দেখলাম বাবা টিয়া পাখীটার গলা মটকে মেরে ফেলেছেন। বললেন , মন খারাপ করবি না। মৃত্যু হচ্ছে জগতের আদি সত্য। বাবা আমার মন থেকে মায়া কাটাতে চেয়েছিলেন।মায়া কি কেটেছে ?

মনে হয় না। নইলে কারণ তাহলে এখন আলেয়াকে দেখে মায়া লাগছে কেন!

হঠাৎ আলেয়া বলে উঠলেন, 'সেই মাজিদ ছিল না ? তোমার বন্ধু ?'

-জী।

-তার চাকরির দরকার ছিল। পরে তুমি যখন তাকে চাকরি খুঁজে দিলে, তার আর দরকার হল না চাকরির। হিমু, মাজিদ কি মায়া কাটাতে পেরে ছিল নাকি সে ছিল উদাসীন ছিল ?
 
আমি হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। আলেয়া কি মন পড়তে পারেন ? আমি জানতাম , আমি আন্দাজে মন পড়ে ফেলতাম! টিয়া পাখীর ঘটনাটার সঙ্গে মাজিদের যোগাযোগ আছে।

ঘটনাটা এমন -

বাবার চেষ্টা কতটা সফল হয়েছে ? মায়া কি কেটেছে ? এই যে মাজিদ বসে পত্রিকার পাতা ওল্টাচ্ছে , কেন জানিনা , ওকে দেখে বড় মায়া লাগছে। এই মায়া বাবা আমার শত ট্রেনিং-এও কাটাতে পারেননি , মাজিদ কোনো রকম ট্রেনিং ছাড়াই কাটিয়ে বসে আছে।
 
আলেয়া আবার প্রশ্ন করলেন , 'হিমু ?'

- জী

- তুমি দয়া আর মায়ার তফাৎ বোঝো ?

- জী , ভাবিনি কোনোদিন। দয়া সবাই করতে পারে না। ঈশ্বরীয় অবস্থার কেউ পারে।

- হিমু , এটা কি হতে পারে, তুমি যেটাকে মায়া ভাবছো, সেটা আসলে দয়া ?
 
আমি উত্তর দিলাম না। আলেয়া জানলেন কি করে , আমি মায়া বিষয়ে ভাবছিলাম! দয়া করতে হলে রাজারাজড়া হয়ে জন্মাতে হয় বোধহয়। আর নয়তো মহাপুরুষ। আমি তো আমার বাবার পরীক্ষামূলক উৎপাদন।

আপন মনে আলেয়া বললেন , 'দয়া ভাল। দয়া দম বন্ধ করে ঠেসে ধরে না। মায়া ভাল না। প্রথমে খুব ভাল লাগে। তারপরে বাধ্যতামূলক।' আপন মনে বলে যেতে থাকলেন আলেয়া, 'মায়া অবিদ্যার ব্যাপার। অবিদ্যা , অস্মিতা , রাগ , দ্বেষ , অভিনিবেশ। পঞ্চক্লেশ।'

বাবা এই ব্যাপারে ডায়েরিতে কোনো নির্দেশাবলী লিখে জাননি, তাই আমি চুপ করে ভাবতে থাকলাম। আলেয়া আবার হারিয়ে গেলেন প্রকৃতিতে। কী বিষয়ে ভাবনা চিন্তা করব, আমি সেই বিষয়ে ভাবতে লাগলাম।

এদিকে শিলিগুড়ি এসে গেল। আলেয়া গাড়ি ঠিক করে রেখে ছিলেন। গন্তব্য লাচুং। গাড়ি কিছুক্ষণ সমতলের বনাঞ্চল ধরে এগিয়ে ধীরে ধীরে পাহাড়ে উঠছে। চারিদিকে অপরূপ দৃশ্য। পাহাড়ের চারপাশে গোল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে ওপরে ওঠা। মাঝে মাঝে নামা অন্য পাহাড়ে যেতে। এমনি করে পাহাড় টপকে টপকে চলেছি। আলেয়া কথাবার্তা একেবারেই বন্ধ করে দিয়েছেন। গন্তব্য লাচুং। পৌঁছতে রাত হবে।

লাচুং পৌঁছে দেখা গেল আলেয়া একটা বেবি ডগি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে আছেন। ডগিটার বন্দোবস্ত নিয়ে ডগির মালিকের সঙ্গে আলাপ করছেন। আমার পরিণতির সঙ্গে ডগিটার যোগসূত্র আছে কিনা, এই নিয়ে ভাবনা চিন্তা করে আমি সময় কাটাচ্ছিলাম।

আলেয়া আমাকে হলুদ সোয়েটার দিয়েছেন পরার জন্য। প্যান্টের ওপর তাই পরে ঘুরছি। হঠাৎ আলেয়া ঘুরে আমার দিকে তাকালেন।

- হিমু

আমার মনে হল উনি বলছেন ,'হাই হিমু ..'

আমি বললাম ,' জী।'

- কাল আমরা রওনা হচ্ছি আটটায়। গুরুদোম্বা লেক যাব।

- বাহ্। ওখানেই কি আমি শেষ হয়ে যাব ?

- হ্যাঁ।

- বাহ্।

- ওখানে আমরা মিলিটারি ক্যাম্পে থাকব।

- বাহ্।
সকাল বেলা গাড়িতে উঠে দেখলাম , আলেয়া টপাটপ ওষুধ খাচ্ছেন।

- শরীর ভালো না ?

- শরীর ভালো , খুব বাজে রাস্তা। এগুলো বমি বন্ধের ওষুধ। আমাকে ঝিমিয়ে দেবে।

- ওহ আচ্ছা।

আলেয়া একটা পোর্টেবল অক্সিজেন সিলিন্ডার রাখলেন সীটে।

- অক্সিজেন কমে যাবে বাতাসে। এটা থাক।

হঠাৎ কি যেন মনে পড়ার মত করে বললেন , 'শোনো , এসব তোমারও হতে পারে। কিন্তু তুমি ঠিক রক্তমাংসের মানুষ কিনা আমি ঠিক শিওর নই। তোমার কোনো সমস্যা হলে তুমি বই এর পাতার মধ্যে ঢুকে যাবে।' এই বলে আলেয়া থান ইটের মত মোটা একটা হিমু সমগ্র সীটের ওপর রাখলেন। অক্সিজেন সিলিন্ডারের পাশেই।

ব্যবস্থাপনা করে আলেয়া জানলায় মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। আমি চারপাশ দেখতে লাগলাম। কি অপূর্ব দৃশ্য ! ক্রমে গাছপালা কমে এল, হিমালয়ের বরফাবৃত চূড়াগুলোই স্পষ্ট হতে থাকল। আমি হিমালয় কেন হিমালয়ের এই রূপ থেকে বঞ্চিত ছিলাম ! খুব আশ্চর্য লাগছে। গুরুদোম্বা লেকে গিয়ে আলেয়া আমার একটা পরিণতি দেবেন। নিশ্চিন্ত।

পথ এবড়ো খেবড়ো। মাঝে মাঝে ঝরনা পথের ওপর এসে নীচে নেমে গেছে। জেদী ঝরনা প্রবাহ। তাকে বাধা দেবে কে? বেশ কিছু গাড়ি আগে পিছে। অনেকেই গাড়ী থামিয়ে বমি করছেন। মাঝে মাঝেই মিলিটারী হসপিটাল। মিলিটারী পোস্ট। মিলিটারীরা এগিয়ে আসছেন, যাত্রীদের সাহায্যে। আলেয়া কখনও জাগছেন।

- হিমু শিলিগুড়ি থেকে গুরুদোম্বা লেক আমরা যাচ্ছি দুদিনে। মিলিটারীরা কতদিনে আসেন বলোতো ?

- জানিনা।

- কম করে পনেরো থেকে একমাসে। হিমালয়ের উচ্চতার সঙ্গে অক্সিজেনের মাত্রা কমতে থাকে। সেটা ধীরে ধীরে শরীরকে সইয়ে নিতে আসেন।

আলেয়া আবার ঘুমিয়ে পড়লেন।

আবার একটু জাগলেন।

- হিমু কিছু খাও। নয়তো পরে কষ্ট হবে। গা গুলোবে।

আমরা কিছু খেলাম। সঙ্গে আনা হয়েছিল। আলেয়া সব বিষয়ে বেশ সচেতন। সবচেয়ে বেশী সচেতন গা গুলোনো, বমি হওয়া ইত্যাদি বিষয়ে।

- হিমু গুরুদোম্বা লেকে অনেক মিলিটারী। কারণ পাহাড় পেরোলেই তিব্বত বর্ডার।

- জী , পাহাড় কি কেউ টপকেছে ?

- না টপকানোর কি আছে ! রাশি রাশি মানুষ রোজ টপকাচ্ছে।

- কারা টপকাচ্ছে আলেয়া ?

- বৌদ্ধ সন্ন্যাসী , হিন্দু সন্ন্যাসী ,কৈলাস যাত্রীরা। কেন রে বাবা , সপ্তদশ শতকে, কাশ্মীরি গুরু পদ্মসম্ভব গেছিলেন। গৌড় বাংলা থেকে গেছিলেন শান্ত রক্ষিত। আর বাংলাদেশ থেকে গেছিলেন একজন, যাকে বাঙালী বলে কেউ জানে না , শ্রীজ্ঞান অতীশ দীপঙ্কর।

আমি তো হিমু। বিভিন্ন সময় দেখা গেছে আমি বিভিন্ন কিছু জানি। লেখক যেমন চেয়েছিলেন আর কি! মনের ভেতর ঢুকে দেখলাম, গুরু পদ্মসম্ভব গুরুদোম্বা লেকে তপস্যা করে তিব্বত গিয়ে পাজী ওঝাদের তাড়িয়ে ছিলেন। ওঝারা ভূত প্রেত পুষত। প্রেতের কথায় মনে মনে ভূত তাড়ানোর কিছু দোয়া দরুদ মনে করতে গিয়ে দেখলাম মনে হচ্ছে ভূত তাড়ানোর থেকে মন থেকে ভয় তাড়ানো জরুরী। ভয় কি তাড়াতে পেরেছি? ভয় তাড়ানোর ব্যাপারে দার্শনিক ভাবনা চিন্তা করতে গিয়ে দেখলাম , আমরা এসে পড়েছি।

গুরুদোম্বা লেকে নেমে একটু হাঁটতেই ঠান্ডায় আলেয়ার ঠোঁট নীল হয়ে গেল। এক বৌদ্ধ সন্ন্যাসী সকলকে এক টুকরো ফল দিচ্ছিলেন। সেটা খেতেই মন্ত্রের মত কাজ হল। আলেয়া একটু সুস্থ বোধ করলেন। সন্ধে না হওয়া অবধি আলেয়া একটা পাথরের ওপর চুপ করে বসে রইলেন। সন্ধে হতে তাঁবুর ভেতর ঢুকে গেলেন। রাতের খাবার খেয়ে চোখ বুজিয়ে বসে রইলেন এবং এক সময় শুয়ে পড়লেন। আমি আমার পরিণতির বিষয়ে ভাবতে ভাবতে এক সময় ঘুমিয়ে পড়লাম।

পরদিন ঘুম ভাঙল যখন, তখন আলো ফুটে গেছে। আলেয়া বিছানায় নেই। খুঁজতে খুঁজতে দেখলাম অনেকটা দূরে ইট জড়ো করে উনি কাঠ ও কর্পূর দিয়ে আগুন জ্বালিয়েছেন। এই সকালে হি হি ঠান্ডায় ওনার স্নান সারা এবং উনি আপাদমস্তক সাদা গরমজামা পরেছেন। শুধু সাদা। বরফ প্রকৃতি আর উনি এক হয়ে গেছেন। আমি কাছে যেতে আলেয়া ইশারায় আমায় বসতে বললেন। উনি মন্ত্র পড়ছিলেন।

-অউম্ ইতি ব্রহ্ম।

তারপর ঘি আহুতি দিচ্ছিলেন।

-অউম ইতি ইদম্ সর্বম্। ধৃষ্ট অসি ব্রহ্ম যচ্ছ। অগ্নয়ে চ স্যাধ্যায় প্রবচনে চ।

এমনি চলতে থাকল। কতক্ষণ কেটে গেল কে জানে। ক্রমে কুয়াশা ঘনিয়ে এল। যজ্ঞের সঙ্গে সঙ্গে আলেয়া গোল গোল ভাতের মন্ড একটি পাতায় রাখছিলেন। এক সময় ইশারায় আমাকে গুরুদোম্বা লেকের একটি পাথর দেখিয়ে তার ওপর রেখে আসতে বললেন। জল ঢাললেন যজ্ঞকুন্ডে এবং একটি ভাতের মন্ড নিজে গিলে ফেললেন। তারপর হারিয়ে গেলেন। বন্ধ চোখের পাতার ভেতর পাথরের মত বসে থাকা আলেয়াকে দেখে আমার মনে হল উনি নেই।

আমার চোখে পানি এসে গেল। আমি একটা ঘোরের মধ্যে বসে রইলাম। আমার জন্য লেখা আমার বাবার উপদেশগুলির একটাও আমার মনে পড়ল না। আমি বারবার সেগুলো মনে আনার চেষ্টা করলাম আর বারবার বিফল হলাম।

তখন দুপুর একটা। আলেয়া তাঁবুতে এসে আমাকে একটু ভাত দিলেন। শুধুই ঘি মাখানো ভাত। আর নিজেও খেলেন। বললেন , চলো হিমু হাঁটি।

আমরা হাঁটতে থাকলাম। উদ্দেশ্যবিহীন। একসময় আলেয়া বললেন, 'আমাদের ছাড়াছাড়ি হবার সময় এসেছে।'

আমি চুপ করে রইলাম।

- হিমু , কিছু বুঝছো ?

- জী , বুঝছি আলেয়া।

- কী ?

- আমি রক্তমাংসের মানুষ হয়ে গেছি।

- হ্যাঁ।

আবার চুপচাপ হাঁটতে লাগলাম।

- হিমু তোমার নাম কোথা থেকে এসেছে জানো ?

- হিমালয় থেকে। এই পর্বতে এসে বুঝেছি, এর দৃঢ়তা, অসীমতা বাবা আমার ভেতর দেখতে চেয়েছিলেন।

- না।

- তবে ?

- মুক্তিযোদ্ধা এক বঙ্গবীর হিমায়েতউদ্দিনের নাম থেকে। বহুদিন বাদে ওই মহাপুরুষকে মনে রেখে লেখক হুমায়ুন আহমেদ তোমার নাম রেখে ছিলেন হিমু।

হিমু, তোমাকে পরিণতি দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না। তোমার লেখক হাজার হাজার পাঠকের মনে তোমাকে বাঁচিয়ে রেখে গেছেন। আমি পরিণতি দেবার কে? বরং আমি নিজেই নেই হয়ে গেলাম হিমু। চলি।
 
আমাকে ও হিমালয়কে বিমূঢ় করে আলেয়া হাঁটতে লাগলেন দূর থেকে দূরে কুয়াশার পথে। আর পেছন ফিরলেন না।



লেখক পরিচিতি:
মোনালিসা ঘোষ
গল্পকার। প্রাবন্ধিক। সাইকোলজিস্ট 
জন্ম কলকাতায়। 


কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন