সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

ওয়াসি আহমেদের গল্প: কালাশনিকভের গোলাপ


এসােল্ট রাইফেলের নকশাকার লােকটা যখন দেখল দশ গজ সামনে দুজন পুলিশের একজনের টেনশুটার তার বুকে তাক করা, সে নড়ল না। জায়গায় দাঁড়িয়ে হাতে ধরা কম্বলের বোঁচকাটা আলগােছে রাস্তায় ছেড়ে দিল। একটা শব্দ হলাে—ভোঁতা না ধারালাে না, আবার দড়ি প্যাচানাে কম্বলের কারণে মােলায়েম আধােআধাে মাখামাখাও না। অনেকটা সংহত, টুঁটিচাপা কাঠিন্যের আভাস পাওয়া গেল। পুলিশ দুজনকে সচকিত করতে, এমনকি ভয় পাইয়ে দিতেও যা যথেষ্ট।
 
পুলিশরা ভয় পেল না। একজনের টেনশুটার লােকটার বুক বরাবর। বন্দুক তাক করা অবস্থায় সে সাবধানে কয়েক পা এগিয়ে একদম পয়েন্টব্ল্যাংক রেঞ্জে চলে এলাে। অন্যজন কম্বলের বোঁচকাটাকে বুট পরা পায়ের ছােট আদুরে লাথিতে কয়েক গজ দূরে হটিয়ে উবু হয়ে দড়ির গিট খুলতে বা কাটতে বসল। এতে তাক করা জনের সুবিধা হলাে, সামনে আর এগােনাের পথ নেই দেখে সে দুই পা আরামে ফাঁক করে দাঁড়িয়ে লােকটার ময়লা হলুদ শার্টের বােতাখােলা বুকে বন্দুকের নল ছুঁইয়ে সুড়সুড়ি দিতে লাগল। এসময় একটা অন্যরকম ভয় তাকে পেয়ে বসল লােকটাকে না, তার নিজেকে, ট্রিগারে বাঁকানাে তর্জনীটা যেভাবে থরথর করছে !

শেষ-মার্চের সন্ধ্যায় বাতাসে মিহি ধুলাে। রাস্তার হেলােজেন আলােয় ধুলােমাখা পেঁজা কালচে তুলাের মতাে অচঞ্চল ধোঁয়া। পাঁচমিশালি গন্ধ। ডিজেলপােড়া গন্ধ আর এ্যামােনিয়ার দমকা ধাক্কার সঙ্গে পেরে না ওঠেও তাজা গাঁদা ফুলের দুরুদুরু সুবাস। অল্পদূরে বাসস্ট্যান্ডের কলরােল আর আশপাশের ক্যাটকেটে আলাের ফাঁকফোকরে চোরাগোপ্তা অন্ধকারের কিছু নির্দোষ গন্ধও হয়তাে বাতাসে ঘােরে ফেরে।

ট্রিগার-ছোঁয়া আঙুলের কাপাকাপি থামাতে পুলিশটা তার কাছে ওপাশে চোখ ফেলে-অন্যমনস্ক হতেই বুঝি। বুকে নল ঠেকানাে লোকটা অসহিষ্ণু ট্রিগার থেকে মনকে সরাতেই যেন বারকয়েক দৃষ্টি এপাশ ওপাশ করে। এক ফাঁকে মাথা তুলে কালাে আকাশটাও দেখে। মেঘ, তারা-টারা তাতে নেই। নিচু ধোঁয়াকার আকাশে কিছু একটা খুঁজতে গিয়ে বুঝি বিরক্তই হয় ভাবে, সময়টা অসময়, সন্ধ্যারাত না হয়ে সকাল কিম্বা দুপুর যদি হতাে না বিকাল। ঈদের ছুটির এ কয়দিনে রাস্তাঘাটে মানুষের অফুরান ক্যাচমেচ যেন একরকম ভুলতেই বসেছিল। এমনও হয়তাে তার মনে হয়, এতাে যে গন্ধ নাকে বাড়ি মারছে, কোলাহলের একটা গন্ধও নির্ঘাৎ এতে সওয়ার হয়ে আছে।

চারদিন আগে সপ্তাখানেকের লম্বা ছুটি শেষ হলেও লােকজন যে যার মতো ফাউ-টা যথারীতি দেশগ্রামে কাটিয়ে এবার ফিরছে তাে ফিরছে, পাগল হয়ে না কে বলবে! টানা বাসযাত্রার পর বাড়িফেরৎ মানুষজন গাবতলীতে নেমে গরম তাে গরম, আশপাশের পাগলাটে হৈ চৈ-এ কে কোনদিকে পথ খুঁজবে, রিকশা স্কুটার বা বােনাসের টাকাকড়ি পকেটে রয়ে গেলে হলুদ নয়ত বাধ্য হলে কালাে ক্যাব ধরবে, এ অবস্থায় হুঁশজ্ঞান থাকার কথা না।

ভিড়ের ভেতর তিরিশ পয়ত্রিশের লােকটাকে আলাদা করার উপায় ছিল না। তবে ভিড় কেটে সে যেই রাস্তায় উঠল, পুলিশ দুজন তাকে যেন খেয়াল করতে বাধ্য হলাে। এগুচ্ছিল সে রয়েসয়ে, গরমে ঘামছিল খুব। এদিকে হাতে ধরা নাইলনের সবুজ দড়ি-বাধা ছাই রঙের কম্বলের পোঁটলাটাকে মনে হচ্ছিল বেজায় ভারি। এতটাই, ডান কাঁধটাকে বারবার ঝাঁকি দিয়েও সােজা করতে হিমসিম খাচ্ছিল। ঝাকি খাওয়া তার কাঁধটাই নজরে পড়েছিল পুলিশদের। কম্বলই যদি শুধু, তাগড়া জোয়ান না হলেও তেমন রােগাপটকা তাে না যে কাঁধটা ঘাড় থেকে খুলি খুলি করবে! কম্বলই যদি!

চ্যালেঞ্জ করার সময় পুলিশদের মাথায় সন্দেহের চেয়ে হয়তাে কৌতূহলই কাজ করেছে বেশি। সন্ধ্যা পেরিয়ে গেছে, ঘড়িতে কত হতে পারে—আট-টা সােয়া-আট-টা, চারপাশে ক্যামেচ, মানুষ মানুষ। কৌতূহলের পাশাপাশি বিরক্তি কাটানাের ব্যাপারও পুলিশদের মাথায় থাকতে পারে। কিন্তু রাস্তার ওপর লােকটার ছেড়ে দেয়া কম্বলের পোঁটলা থেকে আওয়াজটা শােনামাত্র ব্যাপারটা যে কৌতূহল মেটানাে বা বিরক্তি কাটানাের পর্যায়ে নেই, তা তারা ছাড়া আর কে বুঝবে! বুকে নল ঠেকিয়ে আর কম্বলের ভাঁজ খুলতে গিয়ে তারা দুজন নিশ্চয় একথাই ভেবেছে। বাসস্ট্যান্ডে সন্ধ্যাবেলার দায়সারা পেট্রোল ডিউটি চা-সিগারেট আর ঢিলেঢালা ঘােরাঘুরির ওপর দিয়েই যায়। কপাল ভালাে হলে খুচরাখাচরা ফেনসিডিলের চালান নয়ত সাের্সের খবর পাকা হলে হেরােইন, ইয়াবা টেবলেট। আর্মস প্রস্তাবটা কতদূর বাস্তবায়নযােগ্য এ নিয়ে সংশয় থাকলেও মফিজ দেখে টুকরাে কথাগুলাে কানের পর্দায় জুতমতাে আছড়ে পড়তে লােকগুলাে অনিচ্ছুক পা টেনে ভিড় পাতলা করে সরে পড়ছে। দ্বিতীয়বার তৃতীয়বার কথাগুলো উচ্চারণ করবে কী না ভেবে সে নিজেকে নিরস্ত করে। সে জানে আর কথা খরচে না গিয়ে স্রেফ চোখ ঘুরিয়ে আর হাতের টেনশুটার নাচিয়ে জায়গাটা সে ফাঁকা করে ফেলবে। তাকে কিছুটা আত্মবিশ্বাসী দেখায়, কিন্তু চোখ ঘােরাতে গিয়ে কম্বলের ওপর থ্রিপিসে নজর পড়ামাত্র নিরস্ত ভাবটা তাকে ছেড়ে যায়। এই হালারা বলে সে অবশিষ্ট জটলার দিকে ধাবিত হয়।

ছাগলগুলাে একে-ফর্টিসেভেন চেনে না, কেমন পুলিশ! মনে হয় না বাপের জন্মে নামও শুনেছে। বাসস্ট্যান্ড থেকে খানিকটা দূরে পুলিশফাঁড়ি পর্যন্ত হ্যান্ডকাফ পরিয়ে তারা তাকে নিয়ে যেভাবে হেঁটে এসেছে যেন রাজ্য জয় করে ফিরছে। ফাঁড়িতে পৌঁছে ডিউটিরত অন্য দুজনের সঙ্গে কানাকানি করে কোণের দিকে নােনাধরা দেয়াল ঘেঁষা মেঝেতে বসতে বলেছে। তুই-তােকারি না, তুমি-তুমি করেছে, দু-একবার আপনে-টাপনেও—সে যে একে-র কারণে এ নিয়ে তার সন্দেহ নেই।

নিজের দুর্গতি সে নিজের বােকামিতেই ডেকে এনেছে, এখন করার কিছু নেই। কম্বলে পেঁচিয়ে আনার বুদ্ধিটা তার নিজের। এনেও ছিল ঠিকঠাক। দিনাজপুর থেকে সারাটা পথ ঝুটঝামেলাহীন এসেছে। পথে দুবার আনসাররা। বাসে উঠে টিপেটুপে এটা ওটা দেখেছে। মাথার ওপর বাংকে ঠেলেঠুলে ঢােকানাে কম্বলটাকে কেউই গুরুত্বপূর্ণ মনে করে নি। গাবতলী পৌছে ভিড়ে মিশে রাস্তা পর্যন্ত সুন্দর চলে এসেছিল। ডানহাতে নাইলনের দড়ির গিট খামচে পোঁটলাটা বয়ে আনছিল। হাতটা কমজুরি, কনুইয়ের ঠিক ওপরে গুলি খাওয়া। তবে পোঁটলার ওজনের কারণে না, গুলিবিদ্ধ হাতের কারণেও না, ঝামেলা পাকাচ্ছিল। নাইলনের দড়ি, আঙুলে কেটে বসে যাচ্ছিল।

রাস্তায় উঠে আর পারছিল না। হাতবদল করবে করবে করেও ভাবছিল রাস্তায় তাে উঠেই পড়েছে, রয়েসয়ে যা করার করবে। দীর্ঘ সময় ঝুঁকির মধ্যে পার করে নিজেকে সে কেবল নির্ভার ভাবতে শুরু করেছে এমনসময় ভূঁইফোড় আর কাকে বলে! দশগজ দূরে বুক বরাবর। এত হতাশ লাগছিল, যেন পােটলাটা রাস্তায় ছেড়ে দিলেই হতাশা থেকে রেহাই পাবে। ঘটনাটা কীভাবে ঘটে গেল মনে করাও তার পক্ষে মুশকিল। নিজেকে ঝুঁকিমুক্ত ভাবতে শুরু করেছিল, এটুকু মনে আছে, সেই সাথে হয়তাে অন্যমনস্কতাও তাকে পেয়ে বসেছিল। পুলিশটাকে যখন দেখল বুক নিশানা করে ট্রিগার এই টিপে এই টিপে, সে অন্যমনস্কতার মধ্যে ভাবনাচিন্তার সামান্যতম সুযােগও পায়নি। আসলে ভাবনাচিন্তার জন্য মাথা খেলানাের আগেই নাইলনের দড়িতে নাজেহাল ডান হাত যা করার করে ফেলেছে। পােটলা ছেড়ে দিয়েছে আর তখনি আওয়াজটা। ভিড়ভাট্টার শােরগােল ছাপিয়ে এতই আলাদা সে নিজেও চমকে উঠেছিল।

সুযােগ যদি পেত ভাবনাচিন্তায় তাহলে কী করত? ছাগল দুটোর হাতে ধরা খেয়ে বাকি জীবন জেলে পচার চেয়ে মারা-পড়া যে ঢের ভালাে, এ যুক্তিটা নিশ্চয় মাথায় খেলত। তখন হয়তাে একটা কিছু ঝুঁকি নিতে সে পিছপা হতাে না। তেমন রগরগে কিছু না, আশপাশের মানুষজনকে ঠেলে এঁকেবেঁকে ছুটতাে। পুলিশটাও পিছু নিত। ফাঁকা একটা আওয়াজ নিশ্চয় করতাে মানুষ সরাতে, আর খুব সম্ভব দ্বিতীয় আওয়াজটা ফাটাতাে তার পিঠ কোমর বা পা নিশানা করে। মারা পড়াটা কিন্তু এতে হতাে না। পিঠ কোমর বা পায়ে ছররার জ্বালা-পােড়া নিয়ে কাতরানােই সার হতাে!

ভেবে দেখলে ডান হাতটা ক্ষতিকর কিছু করে নি। বিপদ কেটে গেছে ভেবে অন্যমনস্ক হয়ে পড়াটাই কাল হলাে। কিন্তু এরা এখন যা করছে, একে কী বলবে! ফাঁড়ির দুজন আর আগের দুজন মােট চারজন মিলে ঘরের মাঝখানে চওড়া টেবিলে কম্বলসমেত থ্রি পিস পেতে বেদম কসরৎ চালাচ্ছে জোড়া দিতে, কিছুতেই পারছে না। না হয় নিজেরা ব্যবহার করে নি, তাই বলে দুনিয়ার সবচে’ বিখ্যাত বন্দুককে নিয়ে এই ইতরামি তার অসহ্য লাগে। নিজেরা পারছে না, অথচ তাকে একবারও বলছে না, যেন গুলিহীন খালি বন্দুকটা তার হাতে দিতেও ভয়। 
 
বিখ্যাত বন্দুক। কথাটা তার নিজের না, যার হাত হয়ে তার কাছে এটি এসেছে, তার । অনেক ভারি ভারি আর মনে ধরার মতাে কথা বলেছিল বন্দুকটা নিয়ে। সংক্ষেপে, মানুষের মুখে মুখে একে। ভেঙে বললে এভটোমেট কালাশনিকভ, মানে অটোমেটিক কালাশনিকভ? সাতচল্লিশ সালে জন্ম বলে নামের শেষে ফর্টিসেভেন। আর কালাশনিকভ? মানুষের নাম। সামান্য ট্যাংক ড্রাইভার হয়ে রেড আর্মিতে ঢুকেছিল মিখাইল কালাশনিকভ। একচল্লিশ সালে জার্মানদের সঙ্গে যুদ্ধে গুলি খেয়ে হাসপাতালে টানা শুয়ে বসে সারাক্ষণ একটা ভাবনা নিয়েই মেতে থাকল। মনমতাে একটা বন্দুক যদি নিজে বানাতে পারত, মানে নকশা করতে পারত! রাইফেলের মতাে, তবে সনাতন রাইফেল না, সাবমেশিনগান আর রাইফেলের মিশেলে উন্নত নতুন প্রজন্ম। ব্যবহারে সহজ, ওজনে খুব ভারি নয়, স্বয়ংক্রিয়-এভটোমেট তাে বটেই, আর ম্যাগাজিন ধারণক্ষমতা, সাইটিং রেঞ্জ, কিলিং রেঞ্জে যা হবে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ মারণাস্ত্র। দিনের পর দিন একই ভাবনা, পারবে তাে! নকশার পর নকশা বদল । মাসের পর মাস, বছরের পর বছর। নানা অদলবদলে শেষমেশ নকশার একটা পাকা চেহারা দাঁড়ালাে। বন্দুকের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের মাপঝোঁক, বৈশিষ্ট্যগুলাে চোখধাধানাে। ক্যালিবার ৭.৬২ এম এম, গুলিভর্তি ওজন ৪৮৭৬ গ্রাম, গুলি ছাড়া ৪৩০০ গ্রাম, ব্যারেল ৪১৫ এম এম, ম্যাগাজিন ক্যাপাসিটি ৪০ রাউন্ড, সাইটিং রেঞ্জ ৮০০ মিটার, কিলিং রেঞ্জ ১৫০০ মিটার। তখন ১৯৪৭ সাল, বন্দুকের নামে সেই থেকে ৪৭ সংখ্যাটা অবিচ্ছিন্ন। এভটোমেট কালাশনিকভ-৪৭।

টেবিল ঘিরে পুলিশরা একসঙ্গে চেঁচিয়ে ওঠে। শেষ পর্যন্ত থ্রি পিস-কে তারা ওয়ান পিস করতে পেরেছে। নােনাধরা দেওয়ালে ঠেস দিয়ে বসে সে দেখে চারজনের চোখেমুখে দুর্দান্ত কিছু করে ফেলেছে এমন উত্তেজনা। তাকিয়ে থেকে তার নিজের এই দুর্গতির মধ্যেও হাত-পা নিশপিশ করে। টেনশুটারের মতাে খেলনা ছেড়ে এক লাফে একে-ফর্টিসেভেন হাতে পুলিশদের মুখগুলাে যেন হঠাৎই বদলে গেছে, খানিকটা রহস্যময়ও যেন লাগছে। সে জানে, আর অল্প সময়েই পুলিশদের এই হালকা মেজাজ-মর্জি বদলে যাবে। রাত বাড়ছে, টেবিলের পাশে একটা চেয়ারের ওপর ওয়াকিটোকি থেকে ভিন্ন ভিন্ন গলায় উঁচু-নিচু অস্পষ্ট কথাবার্তা ছিটকে আসছে। সে আরাে জানে, অল্পসময়েই জেরার মুখে তার পরিচয়টা বেরিয়ে পড়বে। এরা ফাঁড়ির সাধারণ পুলিশ, জেরা করবে অন্যরা, যারা তার সম্বন্ধে খবরাখবর রাখে। তারা হতে পারে সেই বাহিনী যাদের সঙ্গে একটা সরাসরি একাউন্টারে সে নেতৃত্ব দিয়েছিল। ঘটনাটা কাগজে উঠেছিল তার নাম-ধাম ছবি সহ। এমন হতে পারে, জেরা-টেরা আদৌ করবে না। যা করার রাতের মধ্যেই। নাকি থানায় কেস দেবে? যদি দেয়...

আশ্চর্য, কিছুক্ষণ আগেও সে ভেবেছিল ধরা পড়ার চেয়ে মারা পড়া ঢের ভালাে। ধরা পড়ার মানে সে করেছিল বাকি জীবন জেলে পার করা। কিন্তু ধরা পড়ার পরও যে এই রাতের মধ্যেই সে খরচ হয়ে যেতে পারে এবং সম্ভাবনাটাও বেশ উজ্জ্বল, হিসেবটা তখন মাথায় আসে নি। এ অবস্থায় তার মনে টিমটিম আশার যে ফুলকি ওড়ে-যদি কেস দেয়! জেলের রাস্তাটা অন্তত তাতে খােলা থাকে। যদি না দেয়, তার মন বলছে রাতের মধ্যেই...

সে পরিষ্কার টের পায় মাথায় তার আর কিছু না, মৃত্যুভয়। মরতে এ সময় ইচ্ছা করছে না। একে-টা হাতছাড়া হওয়াই নিশ্চয় মৃত্যুভয়ের কারণ। গত চার বছরে মৃত্যুভয় বলে কিছু মাথায় নড়াচড়ার সুযােগ পায় নি। শক্তি সাহস একে-ই জুগিয়ে এসেছে। যতটা শক্তির দরকার, যতটা সাহসের তার চেয়ে বহুগুণ বেশি।

রােকনউদ্দিন (অন্যরা তাকে দেবাশীষ দেবাশীষ করছিল, মানে সে আসলে দেবাশীষ) একে-কে পাঁজাকোলা করে তার সামনে উবু হয়ে বসে। দেখাদেখি মফিজসহ বাকি তিনজনও একটা আধাআধি বৃত্ত এঁকে তাকে ঘিরে ধীরেসুস্থে বসে। দেখে মনে হয় না এরা কিছু করবে। বন্দুক দেখা শেষ, এবার তাকে দেখছে। কিন্তু নিজে সে যা দেখে তা তাকে চমকে দেয়। চার পুলিশের চোখেমুখে, ঘিরে বসার ভঙ্গিতে ঠিকরানাে আত্মবিশ্বাস শক্তি ও সাহস ঠিক এক বিন্দুতে জড়াে হলে যেমন হওয়া কথা। গুলিহীন একে-র ছোঁয়া পেয়েই যেন এরা একেকজন রহস্যময় দানব হয়ে উঠেছে। আর সে? শক্তি-সাহসহীন একে-হীন নিঃস্ব। বুকখােলা ময়লা হলুদ শার্ট, হ্যান্ডকাফে জড়ােসড়াে দুই হাত। রােকনউদ্দিন ওরফে দেবাশীষ একে-র ব্যারেলে আলতাে হাত ঠেকায়, ঘাের ছাইরঙ ইস্পাতে আঙুলগুলাে পিছলে পিছলে যায় দেখে তার গা শিরশির করে। সে অপেক্ষা করে।

মিখাইল টিমােফেইভিচ কালাশনিকভ রাতে মাঝে মাঝে ঘুম কেটে গেলে বিছানা ছেড়ে ঘরে পায়চারি করেন। এ খবর বাইরের মানুষের জানার কথা নয়। না জেনেই তারা তাকে জিগ্যেস করে, তুমি কি ঘুমাতে পারাে শান্তিতে? নব্বই পেরুনাে কালাশনিকভ সরাসরি জবাব না দিয়ে বলেন, খারাপ লাগে, খুব খারাপ লাগে যখন দেখি আমার বন্দুকটা সন্ত্রাসীদের প্রাণের চেয়েও প্রিয়, বিন লাদেন পর্যন্ত বুকে করে রাখত, সুযােগ পেলেই টার্গেট প্র্যাকটিস করত। বন্দুকটার সাইটিং রেঞ্জ, কিলিং রেঞ্জ দুই-ই তাে আনপ্যারালাল।

জবাব সরাসরি না দিলেও মাথা থেকে প্রশ্নটা ঝেড়ে ফেলা যায় না। বন্দুকটা তাকে কী না দিয়েছে! সামান্য ট্যাংক ড্রাইভার-কাম-মেকানিক থেকে থ্রি স্টার জেনারেলের মর্যাদা, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ খেতাব। শুধু কি দেশে, সারা দুনিয়ার সেরা। সব সৈন্যবাহিনীর এক নম্বর পছন্দ এ বন্দুক। কে না একে ভালােবাসে মুক্তিকামী বিপ্লবী, সন্ত্রাসী, ডাকাত, ভাড়াটে খুনী! জনপ্রিয়তার শুরুটা হয়েছে বিপ্লবীদের হাতে। কারা না ব্যবহার করেছে! দানিয়েল ওর্তেগার এফএসএনএল, ভেলুপিল্লাই প্রভাকরণের এলটিটিই থেকে শুরু করে ল্যাটিন আমেরিকায় পেরুর শাইনিং পাথ, আর্জেন্টিনায় মন্টোনেরস-সহ প্রায় সব কটা বাম গেরিলা গ্রুপ, আলজেরিয়ায় আইএসএফ, ফিলিপাইনে এনপিএ, প্যালেস্টাইনে হামাস, তুরস্কে কুর্দিদের কেডব্লিউপি নামের শেষ আছে! নিকারাগুয়ায় এফএসএনএল বা স্যান্ডিনিস্ট গেরিলারাই প্রথম যারা এর কদর বুঝল। সময়টা ষাটের শেষ। কয়েক বছর পর এল টি টি ই-র হাতে পড়ে হয়ে উঠল পারফ্যাক্ট কিলিং মেশিন। পৃথিবীজোড়া দুর্ধর্ষ গেরিলারা তার অস্ত্র হাতে সুসজ্জিত সামরিক বাহিনীকে নাস্তানাবুদ করে নিজেদের মুক্তির পথ খুঁজছে—অনুভূতিটা মিখাইলকে একসময় আবেগাপ্লুত করতাে। সঙ্গে অন্য ব্যাপারও ছিল। সন্ত্রাসীদের ব্যাপার। দুনিয়াজুড়ে সন্ত্রাস যে এত লাগামছাড়া হতে পেরেছে তার পেছনে একে-র অবদানকেই দায়ী করা হয়। পূর্ব বা পশ্চিম আফ্রিকার জাতিগত দাঙ্গায়ও একে-র কারণে মারা পড়ছে লাখ লাখ মানুষ। ইদানিং আবার সােমালি জলদস্যুরা স্রেফ একে-র ভয় দেখিয়ে পালে পালে পাহাড়প্রমাণ জাহাজ, সুপারট্যাংকার গালফ অফ ইভেনে ভিড়িয়ে হেলিকপ্টার বােঝাই মুক্তিপণ আদায় করে ছাড়ছে।

ঘুম যে কেটে যায় রাতে, একবার কেটে গেলে শােবারঘরে পায়চারি করে করে ক্লান্ত হয়েও ঘুমটাকে ফেরৎ পাওয়া যায় না—এ তথ্য ঘরের বাইরে যাওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। লােকজন অনুমানে ধরে নেয় বালিশে ঘুমহীন মাথা অস্থিরতা করছে, মিখাইল বিছানা ছাড়ছেন, কার্পেটে স্লিপার ঘষে এক দেওয়াল থেকে দেওয়ালে যাচ্ছেন, ফিরে আসছেন, আবার যাচ্ছেন।

পায়চারি করতে করতে তার মনে হয় লােকজন আরাে কত কী তাকে জিগ্যেস করে, মনে মনে করে—জানে, তার কাছে সরাসরি জবাব পাবে না। --তুমি কি জানাে প্রতিদিন পৃথিবীতে কত মানুষ তােমার বন্দুকের কারণে, স্রেফ তােমারই কারণে মারা পড়ে? তােমার বন্দুকের লংরেঞ্জ নিশানায় ঘায়েল হয়ে মরে, আবার বন্দুকসহ বাড়িতে, গাড়িতে, রাস্তাঘাটে, বাসস্ট্যান্ডে কম্বলে পেঁচিয়ে নিতে গিয়ে ধরা পড়ে মরে? এমনই বিখ্যাত বন্দুক, কাউন্টারফিট পর্যন্ত যার যেমন খুশি বানাচ্ছে আর যত্রতত্র দেদারসে ছাড়ছে! বন্দুকটা তুমি বানালে, খ্যাতি পেলে আকাশছোঁয়া, দেশ তােমাকে মাথায় তুলে নাচলাে, আর এদিকে পৃথিবীর সর্বনাশটাও...। কবি হতে চেয়েছিলে না তুমি? লিখেও তাে ছিলে কবিতা?

অনেক। ছ’টা বই আছে আমার। সে তাে অনেক আগেকার কথা। কবিতাকে ভুলে গেলে বন্দুক বানাতে গিয়ে । মােটেও ভুলি নি। কবিতা আমাকে কখনাে ছেড়ে যায় নি। আজো লিখি । আজো!

কাল রাতেও লিখেছি, অবশ্য মাত্র এক লাইন: A rose is a radiant rose- মানে কী?

কবিতার মানে হয়! উপলব্ধি করতে হয়। আমার বন্দুককেও উপলব্ধি করতে হবে।

বন্দুকটাও কবিতার মতাে?

কবিতাই। তুমি তাহলে সেই কবি যে কবিতায় বন্দুক রচনা করে? উল্টোটা। বন্দুকে কবিতা।

তুমি কি জানাে ঠিক এ মুহূর্তে বিশ্বের একটা চিরগরিব দেশে তােমার বন্দুক নিয়ে একটা ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে? নেহায়েত ছােট ঘটনা অবশ্য।

সােমালিয়ায়?

নাইজেরিয়ায়? ইথিওপিয়ায়? আরাে বলাে? রােয়ান্ডায়? আফগানিস্তানে? বাংলা...

রাইট। বাংলাদেশে তােমার বন্দুকসহ মানে যাকে তুমি কবিতা বলছাে-ধরা পড়ে একটা লােক মৃত্যুর অপেক্ষা করছে। এমনও হতে পারে বন্দুকটা রিয়েল না, কাউন্টারফিট।

লােকটা টেরােরিস্ট না কন্ট্রাক্ট কিলার? তা জেনে লাভ! মূল ব্যাপার তােমার বন্দুক, না না কবিতা।।

জেনারেল কালাশনিকভের হতাশ লাগে। তিনি হয়তাে বলতে চান—যে আবেগ থেকে আকুল তৃষ্ণা থেকে মানুষ কবিতা লেখে, হুবহু সেই আবেগ সেই তৃষ্ণা নিয়েই বন্দুকটা আমি বানিয়েছি; এ অবশ্যই আমার কবিতা। কিন্তু তিনি যা বলতে পারেন না তা খানিকটা ঘােরালাে। তিনি তাে কবিই হতে চেয়েছিলেন, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ বন্দুকের নকশাকার হওয়ার কথা তার ছিল না। বন্দুকের ব্যাপারটা মাথায় ঢােকালাে যুদ্ধের সময় জার্মানরা। ওদের এম পি-৪০ সাবমেশিনগানের কাছে রাশান এম আই-৩৮ কী মার না খেলাে! গুলি খেয়ে হাসপাতালের বেডে ইন্দ্রিয়-জাগরণে একটা উন্নত বন্দুকের ভাবনা সেই যে মাথায় ঢুকলাে, আর ছেড়ে গেল না। এ বন্দুকের জন্য কে দায়ী? বানিয়েছি আমি, দায়ী জার্মানরা। না হলে...

হলে? ঠিক বলবাে? প্লিজ।

একটা যুগান্তকারী কৃষিযন্ত্র বানাতাম। ক্ষুধা-দারিদ্রের পৃথিবীতে যার সব চে’ বেশি প্রয়ােজন।

এখন পারা যায় না? ঠাট্টা করছাে? তা কেন? আমার বয়সটার কথা ভাবাে। একবার চেষ্টা করলে হয় না? তােমার নতুন কবিতা। নাহ। একজীবনে বন্দুক ও কৃষিযন্ত্র ——পাগল!

রােকনউদ্দিন ওরফে দেবাশীষের কোলে সলিড ওয়ানপিস একে আরামে দোল খায়। ঠাণ্ডা ঘােরছাইরঙ ব্যারেলে আঙুলগুলাে তার কেঁপে কেঁপে পিছল কাটে। পাশ থেকে আড়চোখে সঙ্গিরা দেখে। মুখােমুখি হ্যান্ডকাফ ও বােতামখােলা হলুদ শার্ট-গায়ে লােকটা দেখে। আর যার দেখার কথা, গােলাপ বিষয়ক কবিতার দ্বিতীয় পঙতিতে বিভাের মিখাইল টিমােফেইভিচ কালাশনিকভ হঠাৎ অন্যমনস্ক হয়ে ভাবেন, কষিযন্ত্র! তেজি লক্ষ্যভেদি মারণাস্ত্রের বদলে নিরীহ চাষবাসের যন্ত্র! কিন্তু লক্ষ্যভেদই যে আসল, কে কতটা মােক্ষম ভেদ করতে পারছে, এর বাইরে কিছু ছিল না আছে! কৃষির কথা ভাবতে গিয়ে এক চিমটি আগাম গােলাপের সৌরভ নাকে টোকা দেয়। প্রিয় ফুল । আস্তে, হেলে দুলে নির্যাসটুকু মাথার ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে যেতে মিখাইলের সুস্থির লাগে, আবার বুকে কোথাও শিরশিরও আসছে, হৃৎপিণ্ডের সব কটা তন্ত্রী ঝাঁকিয়ে দ্বিতীয় পঙক্তি আসছে...



কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন