সোমবার, ২৬ জুলাই, ২০২১

সাইদা হ্যাগি-দিরি হেরজি'এর গল্প: তাবিজ-কবজের সরকার





গ্রাম পর্ব
 
ওর বয়স যখন দশ তখন হালিমা জানতে পারলো যে, ওর ওপর জ্বীনের আছড় রয়েছে। গ্রামের ওয়াদাদ নামের এক কবিরাজ এটি আবিষ্কার করেছেন। কয়েক মাস ধরে হালিমা অসুস্থ ছিল। ওয়াদাদ ওর ওপরে সব রকমের ঝাড় ফুঁক চালিয়ে অবশেষে বুঝতে পারলো যে, ওর রোগের কোন আরোগ্য নেই। সাধারণ অর্থে যা বুঝায় সে- অর্থে হালিমা অসুস্থ নয়। ওর ওপর আছড় হয়েছে একটি ছোট বাচ্চার আত্মার। এক রাতে বাথরুমে যাওয়ার পথে একটি বাচ্চার প্রেতাত্মার ছায়া মাড়িয়ে ছিল সে। ভুল করে। হালিমার কপাল ভালো যে, এটি ভালো জ্বীন। এটি ওর ক্ষতি না করে বরং উপকারই করবে। কিন্তু এটি কখনও ওকে ছেড়ে যাবে না। স্বেচ্ছাই তো নয়ই। কোন তাবিজ-কবজের কাছে হার মানবে না। চিরদিনই এই শিশু জ্বীনই ওর সঙ্গে থেকে যাবে।
 
ব্যাস, হালিমা মশহুর হয়ে গেল। ওয়াদাদ ওর মাকে বলার কয়েক ঘন্টার মধ্যেই ওর জ্বীনের কথা গ্রামের এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত পর্যন্ত গালগল্পে পরিণত হলো। সবাই হালিমা আর ওর জ্বীনের গল্প করতে লাগলো; এই জ্বীন কী করতে পারে, জ্বীনকে দিয়ে হালিমার জন্য কী করানো যেতে পারে বা গ্রামের জন্য কী করানো যেতে পারে ইত্যাদি ইত্যাদি। শীঘ্রই গ্রামের সবাই বিশ্বাস করতে লাগলো যে, হালিমার ভবিষ্যত বাণী করা এবং অসুস্থকে সুস্থ করার ক্ষমতা আছে। এক সময় হালিমা নিজেও এটি বিশ্বাস করতে শুরু করলো।
 
খুব শীঘ্রই হালিমা ওর কাজে নেমে পড়লো। মাঝে মাঝে সে উদাস হয়ে শূন্যের পানে তাকিয়ে থাকে। লোকজন ধরে নেয়, সে তার জ্বীনের সঙ্গে বাতচিত করছে। অথবা সে ধ্যানের মধ্যে হারিয়ে যায়; কথা বলে যদিও সেখানে ওর সঙ্গে কথা বলার কেউ থাকে না। সে মাঝে মাঝে গলা ছেড়ে চিৎকার করে। আবার কখনও বা চিৎকার করে কাঁদে। যারা এই দৃশ্যগুলো দেখে তাদের মধ্যে এক ধরনের থমথমে ভয় কাজ করে। পাছে জ্বীন অপরাধ নেয় তাই এমন মুহূর্তে কোনভাবেই ওরা হালিমাকে বিরক্ত করে না। হালিমার প্রসঙ্গে কোন কথা বললেও লোকজন ওর পশ্চাতে ফিস ফিস করে কথা বলে।
 
হালিমা সবাইকে বিশ্বাস করিয়ে ছেড়েছে যে, ওর স্বপ্নাচ্ছন্ন থাকার সময় জ্বীনের বাচ্চার বাবা-মা ওর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে এসেছিলো। সে লোকজনকে বলল, ওরা ওদের ছেলের খোঁজ-খবর নিতে এসেছিলো। ওদের বাচ্চাটাকে সুখে রাখার কিছু টিপসও দিয়ে গেছে। হালিমা জোর দিয়ে বলল, ওরা ওকে জীবনের সকল রকম বিষয়-আশয়, গ্রামের লোকজন, অতীত, বর্তমান এবং ভবিষ্যতে কী ঘটবে তাও বলে গেছে।
 
একটা প্রশ্ন গ্রামের অনেক লোকের মনে ঘুরপাক খেতে লাগল। যখন বিবাহযোগ্যা হবে তখন হালিমাকে কে বিয়ে করবে। কারও সন্দেহ নেই যে, সে বিয়ে করবে। নারীদের তো বিয়ে করে সন্তান জন্ম দিতেই হয়। কিন্তু সমস্যা হলো ওর জ্বীনকে নিয়ে। জ্বীনের আছড় আছে যে মহিলার ওপর তাকে বিয়ে করা কি বিপজ্জনক নয়? এমন সাহসী কেউ কি আছে যে হালিমাকে বিয়ে করবে?
 
হালিমা বিবাহযোগ্যা হলে এমন এক সমস্যা তৈরি হলো যা নিয়ে কেউ ভাবেইনি। হালিমা বিয়ে করতে চায় না। সাহসী কেউ কেউ অবশ্য প্রস্তুত ছিল ওকে বিয়ে করার জন্য। কিন্তু হালিমা সবাইকে ফিরিয়ে দিলো। ওয়াদাদও তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিলো। লোকজন ভাবলো সেই হবে হালিমার যোগ্য পাত্র। কেউ যদি জ্বীনের আছড়ওয়ালা মহিলাকে সামলাতে  সক্ষম হয়ে থাকে, তবে সে-ই হবে যোগ্য লোক। কিন্তু হালিমা ওকেও ফিরিয়ে দিলো।
 
কারও ওপর জ্বীনের আছড় হওয়ার ঘটনা হালিমার গ্রামে অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। জ্বীন নিয়ে অনেক গল্প প্রচলিত আছে। অনেকের কথা লোকজন জানে যাদের উপর জ্বীনের আছড় ছিলো। কারও কারও সঙ্গে যমজ ভাইয়ের মতো জ্বীন থাকতো। কেউ কেউ জ্বীনকে গোলাম বানিয়ে রেখেছিলো। সবাই জানে, হালিমার এক পূর্বপুরুষের সঙ্গে যমজ ভাইয়ের মতো এক জ্বীন থাকতো। ওর নাম গেস আদে। ওর মা’র একজন দাদার সঙ্গেও জ্বীন ছিল। আরও তিনজন অনুগত জ‌্বীন ওর গোলাম হয়ে থাকতো। এদের নাম যথাক্রমে তুরে, গাদালে এবং তুর-ওউরমনে। কোন সমস্যা হলে হালিমার মা ওদের সাহায্য ও সুরক্ষার জন্য ডাকতো। বিশ্বাসকরা হতো, বিভিন্ন গোত্রের পূর্বপুরুষরা যমজ হিসেবে জন্ম নিলে তাদের একজন হতো জ্বীন। হালিমার দুলাভাইয়ের গোত্রেরও এরকম যমজ একটি জ্বীন ছিল যার নাম ছিলো শারহান।
 
কোন প্রাণী কোরবানী করলে এই যমজ জ্বীনকে তার ভাগ দিতে হতো। বিনিময়ে এই জ্বীনরা তাদের গোত্রের সহায়তা ও নিরাপত্তা বিধান করতো। প্রথমে প্রাণীগুলোকে জবাই করা হতো। তারপর উৎসবের গান গাওয়া হতো। জবাইকৃত প্রাণীগুলোকে চিড়ে ফেলে সেগুলোর নাড়িভুঁড়ি আলাদা করা হতো। এগুলোই জ্বীনকে দেওয়া হতো। বিড়বিড় করে সতর্ক করে দেওয়া হতো, ‘গেস আদের ভাগের কথা ভুলে না যাই; অথবা তুরে, গাদালে ওউরমনের...।’
 
যে অংশগুলো জ্বীন জন্য রাখা হতো সেগুলো দূরে পাহাড়গুলোর উপরে নিয়ে যাওয়া হতো। যেহেতু সেগুলো অবিকৃত অবস্থায় অদৃশ্য হয়ে যেত, তাই লোকজন ভাবতো যে জ্বীনেরা এগুলো খেয়ে ফেলে। জ্বীন ভাগ নিয়ে ওদের সঙ্গে প্রতারণার কথা কেউ চিন্তাই করতে পারে না। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এ প্রথা চলে আসছে। চলবেও। বাচ্চাদের উৎসবের গান মুখস্ত করানো হয় যেন প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে পূর্বপুরুষদের তিথিপর্বগুলো চলতে থাকে।
 
হালিমার ওপর যখন ওর জ্বীনেরা আছড় করে, তখন ওর যাবতীয় আবেগ অনুভূতি তীব্র ভাব ধারণ করে। ও ভেতরে ভেতরে একটি শক্তি অনুভব করে যেন সে সাধারণ মানুষের সাধ্যের বাইরের কাজও অনায়াসে করতে পারবে। ওর তখন ভালো লাগে। উপরন্তু ও যে কাজেই হাত দেয় সে কাজেই ওর জ্বীনেরা ওকে সাহায্য করে। ওর পরিবার এবং গোষ্ঠীর আয়-উন্নতি বৃদ্ধির ব্যাপারটি দেখে হালিমা এবং অন্যান্য সবাই ভাবতে লাগলো যে, এটি জ্বীন অবদান। হালিমাকে তার পরিবারের জন্য আশির্বাদ এবং গোত্রের জন্য সবাই সম্পদ ভাবতে লাগলো। জ্বীনেরা ওকে যে বিশেষ মর্যাদা দিয়েছে, তা নিয়ে ও গর্ব করতো।


রাজধানীর উদ্দেশে
 
ওর বিশেষ ক্ষমতার জন্য ওকে রাজধানীতে ডেকে পাঠানো হলো, ওর গোত্রের একটি বড় অংশের ওখানে বসবাস। ওর গোত্রের লোকেরা সরকারের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং সবচেয়ে ক্ষমতাধর অবস্থানে ওরা আছে। এর সবকিছু শুরু হয়েছিলো ওর গোত্রের একজন লোকের মাধ্যমে যে সরকারের মধ্যে খুব ক্ষমতাশালী হয়ে উঠেছিল। সে তার গোত্রের লোকদের ধরে ধরে নিয়ে এসে সরকারী চাকুরি দেয়। এভাবে একসময় হালিমার গোত্রের লোকেরাই সরকারের দায়িত্বে চলে এলো। এর ফলে সবাই খুব দ্রুত ধনী হয়ে গেল। যা চায় তা পাওয়ার জন্য খুব একটা নীতি-নৈতিকতার তোয়াক্কা করেনি এরা। এদের পথে বাঁধা হয়ে যা-ই এসেছে সেটিকেই এরা পাশে সরিয়ে দিয়েছে বা হটিয়ে দিয়েছে। যে সময়টাতে হালিমাকে ডেকে পাঠানো হলো সে-সময় তার গোত্রের লোকেরাই সরকারের কলকাঠি নাড়ছিলো। দেশের সব সম্পদ এদের হাতে কুক্ষিগত হয়েছিল। কেউ এদের চ্যালেঞ্জ করতে সাহস পেত না, এমনকি এরা খুন করে বসলেও। তবুও হালিমার অলৌকিক ক্ষমতা দিয়ে এরা নিজেদের অধিকতর সুরক্ষার ব্যবস্থা করতে চাইলো।
 
এরা চাইলো হালিমার বাবাও রাজধানীতে আসুক। তিনি মর্যাদাবান লোক। তাঁর উপস্থিতিতে তাঁর গোত্রের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। কিন্তু তিনি যেতে চাইলেন না। বুড়ো হয়ে গেছেন। পরিবর্তন পছন্দ করেন না। তাঁর গ্রামের সুখ-শান্তি আর নিরাপদ পরিবেশ ছেড়ে শহরের ক্ষ্যাপা পরিবেশে যেতে চাইলেন না। তাঁর মান-মর্যাদা নিয়েও তিনি আশঙ্কায় ছিলেন। গ্রামেই তো তার সুনাম-সুখ্যাতি যথেষ্ট। ওদের দলে যোগ দিলে এটি ভূলুণ্ঠিত হতে পারে। জীবনের শেষ প্রান্তে এসে ঝুঁকি নিতে চাইলেন না। তবে নিজে যেতে না চাইলেও তার ছেলে বা মেয়েকে সেখানে পাঠানোর ব্যাপারে তাঁর কোন ওজর-আপত্তি নেই। বরং তিনি মনে করেন, ওরা ক্ষমতার ভাগ পেলে ভালোই তো হয়। অপরপক্ষে, হালিমা ওখানে গিয়ে তার গোত্রকে সুরক্ষা দিলে তার প্রতাপও অক্ষুন্ন থাকবে। সম্ভবত এজন্য সে তার জ্বীনের সঙ্গে একটি চুক্তিতে আসতে পারে। সে ওদের বাচ্চাটিকে দেখাশুনা করবে, আর বিনিময়ে ওরা গোত্রের কল্যাণের ব্যাপারটি দেখবে।
 
হালিমা চাইলো ওকে নিয়ে যাওয়ার জন্য ওরা পিড়াপিড়ি করুক। যাওয়ার আগে সে তার জ্বীনের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা সেরে নিলো। জ্বীনরা ওকে দু’টি ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠানের কথা বলল। একটি হলো ̶ ওকে বিশেষ ধরনের জল, “তাহলিল” তৈরি করতে বলল, যার উপর নির্দিষ্ট আনুষ্ঠানিকতা পালন করতে হবে। হয় লোকজন এই জল পান করবে অথবা এতে অবগাহন করে এর ফায়দা লাভ করবে। আর দ্বিতীয়টি হলো ̶ দৈনিক গেস আদে’র উদ্দেশে পশু কোরবানী করতে হবে। এটি গোত্রের যমজ অশরীরী আত্মা। হাজার হাজার পশুর নির্ধারিত অংশ, যেমন হৃৎপিণ্ড, কিডনি, নাড়িভুঁড়ি এবং অন্যান্য অংশ প্রত্যেকদিন পূর্বের সমুদ্র সৈকতে তার উদ্দেশে অর্ঘ হিসেবে দিতে হবে।
 
হালিমা এবং ওর ভাই যখন যাবার জন্য প্রস্তুত তখন ওদের চাচাত ভাই ওদের নিয়ে যাবার জন্য এসে হাজির হলো। এই চাচাত ভাই, যে একজন গুরুত্বপূর্ণ সরকারী কর্মকর্তা, তার কাছ থেকে ওরা দু’জন অনেক কিছু জানতে পারলো। শহরের লোকজন যেসব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে, তার সম্বন্ধে ওরা জানলো। ওরা আরও জানলো যে, ওদের গোত্র ‘ক্ষমতায়’ আসার পর কী বিপুল পরিমাণ সম্পদ ওদের লোকদের হাতে জমা হয়েছে। ওরা জানতে পারলো, কিভাবে ওদের গোত্র পুরোপুরিভাবে সরকাকে নিয়ন্ত্রণ করছে। ওরা ভড়কে গেল যখন শুনলো যে, মাত্র দশ বছরের মধ্যেই এই লোকগুলো কী বিপুল পরিমাণ সম্পদের মালিক হয়েছে। অথচ এই সম্পদশালীদের বেশির ভাগই নিরক্ষর।


বিরাট শহরে 
 
শহরে এই দু’জনকে একটি বিশাল বাড়িতে থাকতে দেওয়া হলো। চাকর-বাকর আর নিরাপত্তারক্ষীতে ঠাসা। কয়েক দিনের মধ্যেই হালিমার ভাই একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে সরকারী চাকুরি পেল। সরকারের যে বিভাগ দেশ ও দেশের বাইরের সুগন্ধি বিক্রি করে, তার প্রধান বানানো হলো তাকে। এই বিভাগের দাপ্তরিক নাম সরকারী সুগন্ধি সংস্থা।
 
ওর জ্বীনদের অনুরোধ রাখতে গিয়ে হালিমা একটুও কালক্ষেপণ করলো না। গোত্রের নেতাদের কাছ থেকে সে দু’টি জিনিস চাইলো। সে তাদেরকে শহরের জলের সকল উৎসকে একটি জলাধারে মিলিয়ে দিতে বলল যাতে ‘তাহলিল’এর আনুষ্ঠানিকতা সারা যায়। এবং পূর্ব উপকূলে একটি বিশাল জবাইখানা নির্মাণ করতে বলল। নেতারা সঙ্গে সঙ্গে তার নির্দেশ কবুল করলেন, কারণ, তাঁরা বিশ্বাস করতেন, হালিমার ভাগ্যের জোরেই তাদের গোত্রের উন্নতি অব্যহত রয়েছে।
 
শহরের জল ব্যবস্থাপনাকে কেন্দ্রীয়করণ করার উদ্দেশে বিরাট বিরাট দু’টি জলাধার নির্মাণ করা হলো একটি শহরের পূর্বাংশে আর একটি শহরের পশ্চিমাংশে। ইতোমধ্যে শহরের সবগুলো কূপ গুঁড়িয়ে দেওয়া হলো, এমনকি মানুষের ব্যবহৃত ব্যক্তিগত কূপগুলোও। জলের সব ব্যবস্থাকে এই দু’টি জলাধারের সঙ্গে যুক্ত করে দেওয়া হলো। এভাবে শহরে ব্যবহৃত সকল জল একই উৎস থেকে আসতে লাগলো। হালিমা ‘তাহলিল’ এর দোয়া-কালাম পড়ে জলে ফুঁ দেওয়ার পরেই কেবলমাত্র এই জল সবার কাছে পৌঁছলো।
 
‘তাহলিল’ এর অন্যতম প্রভাব হলো, লোকজন তাদের ঔৎসুক্য বা কৌতুহল হারিয়ে ফেলল। যারা এই জল পান করল, তারা প্রশ্ন করা বন্ধ করলো। সর্বোপরি গোত্রের নেতাদের কাজকর্মের ব্যাপারে তারা বিস্ময় প্রকাশ করাও থামিয়ে দিলো। এরা প্রশ্ন না করে, অভিযোগ না করে, যেমনটি এদের বলা হয়েছিলো, একেবারে আদর্শ নাগরিকে পরিণত হলো। ‘প্রত্যেক’ দিনই পুরাতন দোয়া-কালামের প্রভাব কাটতে না কাটতেই হালিমা নতুন নতুন দোয়া-কালাম পড়ে এই জলে ফুঁ দেয়। কেউ না, শুধু সেই জানতো কী দোয়া-কালাম পড়ে সে এতে ফুঁ দেয়। এটি নিয়ে অনেক গুজব আছে। একটি গুজব এমন যে, সে প্রথমে নেতার গোসলের জলে দোয়া পড়ে ফুঁ দেয়। তারপর এই জল জলাধারে ছেড়ে দেওয়া হয়। তার এবং নেতাদের মনে কোন সন্দেহের অবকাশ নেই যে, যতদিন ‘তাহলিল’ আরোপ করা জল সবাই পান করবে ততদিন সবকিছু তাদের পরিকল্পনা মাফিক চলতে থাকবে।
 
যখন নতুন জবাইখানা চালু হলো তখন অন্য সব জবাইখানা বন্ধ হয়ে গেল। দুর্ভাগ্যবশত নতুন জবাইখানাটি শহরের সব থেকে জনপ্রিয় সমুদ্র সৈকত লিডো’র সংলগ্ন। শীঘ্রই এখানকার জলে ঝাঁকে ঝাঁকে নরখাদক হাঙ্গরের আনাগোনা শুরু হলো। এরা জবাইখানার রক্ত আর উচ্ছিষ্টাংশের গন্ধে আকৃষ্ট হয়ে এসেছে। বেশ কিছু সংখ্যক লোক এই শিকারী হাঙ্গরদের আক্রমণে মারা যাবার পর লোকজন এই লিডো সৈকতে যাওয়া বন্ধ করে দিলো। সরকারের পক্ষ থেকে কোন মন্তব্য করা হলো না। সুস্পষ্টভাবেই, সমূদ্র সৈকতের চাইতে এই জবাইখানা যেখানে গেস আদে’র উদ্দেশে পশু কোরবানী করা হয়, শাসকদের কাছে অধিকতর বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
 
জবাইখানায় ঠিক মতো পশু কোরবানী চলছে কিনা, তা দেখার জন্য হালিমা প্রায়ই এখানে আসে। প্রায়ই সে তার আনুষ্ঠানিকতা বদলায় একে আরো বেশি প্রভাবশালী করে তোলার জন্য।

যখন গোত্র এবং তার নিজের স্বার্থে এই ব্যাপারগুলো ভালোভাবে চলছিল, তখন হালিমা নিশ্চিত যে, এসব কিছুর মূলে আসলে সে নিজে। গোত্রের নেতারাও জানে যে, তারা তাদের সাফল্যের জন্য হালিমা এবং জ্বীনের কাছে ঋণী। ওরা হালিমাকে অনেক সম্মানে ভূষিত করলো। গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে ওরা হালিমার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করত এবং হালিমার পরামর্শ প্রায়ই অমূল্য প্রমাণিত হতো। উদাহরণস্বরূপ, জনগণকে অনটনের মধ্যে রেখে দমন করার বুদ্ধিটা কিন্তু হালিমারই। কৌশলে সকল মৌলিক চাহিদার সংকট তৈরি করা হয়েছে এবং তাই লোকজনও শুধু বেঁচে থাকার জন্য সংগ্রামে ব্যস্ত। সরকারের ভেতরে কী হচ্ছে না হচ্ছে সে ব্যাপার ভেবে নষ্ট করার মতো সময় তাদের নেই। গোত্রের নেতারা এখন আগের চাইতে আরও বেশি সুরক্ষিত বোধ করছে।
 
রাজধানীতে যাওয়ার পর থেকে প্রায় বিশ বছর চলে গেছে। হালিমা এখনও তার আনুষ্ঠানিকতা পালন করে চলেছে। তার গোত্রের উন্নতি অব্যাহত রয়েছে। এই গোত্রের লোকেরাই সরকারের সব গুরুত্বপূর্ণ পদ-পদবি দখল করে আছে। তারা এখনও দেশের সম্পদ নিয়ন্ত্রণ করছে। দেশের বাকি লোক কোন মতে আয়ে-ব্যয়ে কুলিয়ে টিকে আছে। তবে একাজটিও তাদের জন্য কঠিন হয়ে উঠছে। এরপরও দু’এক জনের যদি প্রশ্ন উত্থাপন করার মতো সময় ও শক্তি থাকেও, তবে তাদের দমন করার জন্য হালিমার ‘তাহলিল’ ও নানান ধরনের জাদুটোনা তো আছেই। গোত্রের লোকজন হালিমার তন্ত্রমন্ত্রের বরকতে নির্বিঘ্নে শাসনকার্য চালিয়ে যেতে থাকলো।



মূল গল্প: Government by Magic Spell by Saida Hagi Dirie Herzi



লেখক পরিচিতি:
সাইদা হ্যাগি-দিরি হেরজি(Saida Hagi Dirie Herzi) একজন সোমালি লেখক। নারীবাদী লেখিকা তিনি। সামাজিক ও রাজনৈতিক নানান বিষয় নিয়ে তিনি লেখেন। সোমালিয়ায় যারা ইংরেজি ভাষায় উপন্যাস লেখেন, তাদের অন্যতম তিনি। সোমালি ভাষাতেও লেখেন। ছোটগল্প লেখেন। লেখার পরতে পরতে তাঁর ব্যক্তি জীবনের নানান অভিজ্ঞতার বুননে তা আধা-আত্মজীবনী মূলক রচনার রূপ নিয়েছে।
 

অনুবাদক পরিচিতি:
এলহাম হোসেন
ইংরেজি সাহিত্যের শিক্ষক
আফ্রিকান সাহিত্যে পিএইচডি
প্রাবন্ধিক। অনুবাদক।
ঢাকায় থাকেন

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন