মঙ্গলবার, ২৬ অক্টোবর, ২০২১

বিপ্লব বিশ্বাস'এর গল্প: জিদ

 
শরৎভোরে হনহনিয়ে হাঁটছে। কুয়াশার আবডালে। দীর্ঘচেনা ভঙ্গিমা। তবুও ঠাওর করতে পারছে না সরসিজ। আর্থ্রাইটিসের হাঁটু বাজিয়ে অনেকটা হেঁটে ধপাস বসে পড়েছে খামারের বাতাবেঞ্চে। সত্তরছোঁয়া শরীরটা আর সঙ্গ দেয় না তেমন। তবু্ও থামলে জীবন বসে যায়। তা তার না- পসন্দ। তাই...। এরমধ্যেই রাতঘুমে চলে গেল বিহান। বিহান বোস। তরতাজা সকাল নিয়েই বাঁচনমন্ত্রে দীক্ষিত। আশি পেরিয়েও চনমনে ছিল। বহুদিনের ভোর - হাঁটনের সঙ্গী। অবশ্য এভাবে যাওয়াই শ্রেষ্ঠ মানে সরসিজ। ঘুমঘোরে।

কুয়াশাজাল কেটে কেটে অনেকটাই কাছ হয়েছে। স্পষ্ট হয়েছে অবয়ব। দেহাতিঢঙের সজ্জায় সেই হাঁটুপেরনো শাড়ি। পায়ে সস্তার পলিথিন - পানাই। আরে! এ যে কণা! মর্নিং ওয়াক করছে!!
 
পাঠকের মনে হতে পারে, আর আর জনেদের মতো শরীরে স্বাস্থ্যবিধান ধারণ করে পঞ্চাশ পেরনো এই মহিলাও ভোর ভোর বেরিয়ে পড়েছে। তাতে সরসিজ সেনের চমকাবার কী? ক্যাটওয়াক তো করছে না!
 
আছে। চমক আছে। আর তাই এই...
 
ভরা ভাগীরথীর উছল পাড় বরাবর এগিয়ে রাজা শশাঙ্কর যে ভাঙড় এলাকা সেই রাঙামাটিতে বাস ছিল কানু মোড়লের। মণ্ডল থেকে গৈগাঁয়ের হাঁকডাকে ' মুণ্ডল '। মোড়ল ছিল ওর বাপ পানু। রাজাদের দাক্ষিণ্যে পাওয়া আগপুরুষের দখলি জোতজমার সুবাদে মোড়লগিরির অধিকার পেয়েছিল পানু। আবাদে - বিবাদে ভালোই ছিল। সময়ের ঘষ্টানিতে তা মুছে গিয়ে কানু পঞ্চায়েতের মেম্বর হয়েছিল বটে তবে নানান দলবাজিতে তার দাপট মরে আসছিল দিনকে দিন। গাঙ- নামুতে কিছু ধানিজমি আর পঞ্চায়েতের কামাই মিলিয়ে তিন সন্তানের সংসার ভালোই কাটছিল। এই কানুরই এক মেয়ে কণা। গাঁয়ের ফ্রি প্রাইমারিতে মোটামুটি করত। কিন্তু তা পেরিয়ে হাই ; তখনও তো হয়নি রাঙামাটিতে। কাছাকাছি বলতে পুরনো রাজার নামে যে স্কুল তাও মাইল পাঁচেকের হাঁটাপথ। কণার বড্ড ভেতর - গোঁ। জিদ ধরে দাদা - ভায়ের সঙ্গে সে পথেই যাওয়া -আসা করেছিল ছয় ক্লাস অব্দি। এরমধ্যেই ফনফনে পুঁইডগার মতো বাড়তে থাকলে কানু সদর শহরের এক ব্যবসায়ীর পেটমোছা ছেলের হালে যুতে দিল কণাকে। দু ভায়ের সংসার। মা- বাবা বর্তমান। সেকালের নিয়ম মেনে সাইকেল - ঘড়ি - রেডুয়ার বাড়তি হাতে - কানে - গলায় ভালোই ঝুলিয়ে দিয়েছিল কানু। তা যে একদিন মেয়ের গলার গাঁট হবে তা বোঝেনি কানুরা। সবকিছুই তো আগাম ধরা দেয় না!
 
খাগড়াই কাঁসার ফুলেল ব্যবসায়ী ধানু দাস। পিটনদারি, গড়নদারি করে রাজেশ্বরী, গয়েশ্বরী, শানুক থালা থেকে পাওলি বাটি মায় জামাই ঠকানো গ্লাস অব্দি হাত খুলে বানাতে পারত। ভরন মালে হাত গন্ধ করত না। আস্তে আস্তে কাঁসার দিন যেতে লাগল, এল কালিকামুক্ত ইস্পাত। তাতেই মজল সস্তা খোঁজা খদ্দের। ব্যাবসা শুকিয়ে আমচুর হল। কাঁসা গড়লেও দুই ছেলেকে তেমন আকার দিতে পারেনি ধানু। শহরের লাফাঙ্গামোড়ে খুলে দিল রেডিয়ো - দোকান। সেখানে বড়টা পাছা ঠেকিয়ে বসলেও ছোটো দুলাল দুলে দুলেই নাইরোল করতে লাগল। পাড়ার বি টি আই থেকে বড় সুলাল এগারো ক্লাসের উচ্চ মাধ্যমিক তিন দাগে পেরোলেও দুলাল সাত ক্লাসে তিনবার গোত্তা খেয়ে স্কুল ছাড়ল। ওর আবার ছিল রিকশা চালানোর হবি। ওই বয়সে কাজটি কিন্তু সহজ ছিল না। যারা জানে তারা জানে। সাইকেল চালানো সোজা হলেও রিকশা - পেডালে পা দিলেই ব্যাগড়বাই করে ঘুরে যাবে যে কোনও একদিকে। তাকে আড়পে সিধে রাখতে জুড়ি ছিল না দুলালের। ফাঁক পেলেই স্কুলের সামনে থেকে খাড়ানো কোনও একটাকে নিয়ে বাঁইবাঁই ছুটিয়ে দিত জগদম্বা গলি পেরিয়ে জোড়া শিবমন্দিরের সরু পথে। ততক্ষণে রিকশা - মালিক হয়তো চুল্লু মারতে গেছে শ্মশানগলিতে। ফিরে এসে বাহন না দেখে কাঁচা গু থেবড়ানো খিস্তিতে জম্পেশ ছেতরে দিত মালঘোর, হেডছারের ঘর অব্দি। এভাবে কতদিন যে বেতবাড়ি খেয়েছে দুলাল তার ইয়ত্তা নেই। তবুও হবি ছাড়েনি। ছাড়তে হয়েছে স্কুল। আর এই হবিই হল তার রোজগারের উপায়। সে কথায় পরে।
 
ধানুর এ হেন ছেলে দুলালের সঙ্গে কণার বিয়ে দিল কানু। তখনও কাঁসার দেখনদারি একদম ফুরিয়ে যায়নি। আর ধানুও দেখল কানুর চলনসই জোতজমা আর পঞ্চায়েতি খবরদারি। মিলে গেল গাঁ- শহরে। জুড়ে গেল চার হাত। কিন্তু সময় তো বড় মাস্টার। তাকে মাড়ায় কে! যেমন আগ-হলকা বেশিদিন বাঁচতে দেয় না কাঁসা - কারিগরকে। বিড়িশ্রমিককে শেষ করে তামাকঝাঁঝ। তেমনি ধানুও একদিন চলে গেল। সুলালের বিয়েথা আগেই দিয়েছিল। দুলালেরও দিল। তবে ওকে গ্রাস করল গেঁতোমিতে। বাপের নয়, মায়ের আদরে বাঁদর হয়েই ছিল দুলু। পেটমোছা ছেলে বলে কথা। বটগাছের ছায়া সরে যাওয়াতে খটোমটো লেগে গেল দুই ভাইয়ে। চালাকচতুর সুলাল ততোধিক সেয়ানা বউয়ের প্যাঁচপয়জারে ঠাঁইনাড়া করল সহোদর দুলালকে। সঙ্গে জুড়ে দিল মাকে। জুড়েই গেল বলা ভালো। অন্ধস্নেহে আবিষ্ট মা দুলুকে ছাড়তে চাইল না। তবে বেশিদিন জুড়ে থাকতেও পারল না। একদিন মোদো ছেলের লাঠিসাট খেয়ে মনের কষ্টে ভাড়া ঘরের বাঁশ- বরগায় নাইলন দড়ি ঝুলিয়ে চলে গেল।
 
আগেই বলছিলাম, দুলালের হবি বদলে গেল জব-ই তে। অর্থাৎ পেট দায়ের হাতিয়ার। অবশ্য হাতিয়ার না বলে পাতিয়ারও বলা যায়। কেননা রিকশাপেডালে পা দাবিয়েই তো রোজগারের মুখ দেখতে হয়। কিন্তু এ কাজের সঙ্গে সঙ্গে কর্ণকবজের মতো জুড়ে যায় যে বদখদ অভ্যেসটা তাকে এড়ায় কী করে দুলাল? তাই ধেনো, চোলাই, বাংলা। দুপুর অব্দি রিকশো ঠেলে যা আয় হয় তার বেশিটাই চলে যায় শ্মশানগলির চুল্লু-ঠেকে। সেখানে চুল্লুদর্শনের সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয় বাঁচামরার বুকনি- বর্ষণ। বর্ষাপোকার ঢঙে ফরফরিয়ে ছড়াতে থাকে আশপাশ। চুল্লিধোঁয়ার কটুবাসের সঙ্গে উবে যায় আকাশপানে। ঘোর কাটলে নিজেকে আবিষ্কার করে মা তারার চাতালে কিংবা পৌরসভার নালাতে। কোনোদিন টলতে টলতে একাই ফেরে আস্তানায় বা সাঙ্গোপাঙ্গরা পৌঁছে দেয় বোতল - বান্ধবকে। এমনই এক অশান্তির সাঁঝে মায়ের সঙ্গে জোর খটোমটো আর তার জেরেই লাঠিপেটা ও মাতৃবিসর্জন। কণা তখন ঘরে ছিল না। অন্য দু ঘরের এঁটোকাঁটা, ঝাঁটপোছ করতে গিয়েছিল আমড়াতলায়। ঘটনাক্রমে নির্বিকার হল সে। পাড়াকুন্দলি স্বভাব ছিল না তার। ছিল অন্তঃপাতী জিদ। অন্তর্দাহের সঙ্গে মিলেমিশে তা আস্তে আস্তে হয়ে উঠেছিল আগুনপাট। সে বুঝে গেল, এবার তাকেই বুঝে নিতে হবে সব। হেলাফেলা চলবে না। এরমধ্যে যথারীতি পাছায় কাছা ঝুলিয়ে, গলায় চাবি দুলিয়ে লোকদেখানো মা- কাজ সারল দুই ভাই। খরচাপাতি তেমন ঠেকাল না সুলাল। কমদামি পুরুত ডেকে মূল্যটুল্য ধরে দিয়ে মুক্ত হল ওরা। শুধু মুক্তি পেল না কণা।
আচ্ছা, এ সব তো কোনোদিন বলনি কণা?
 
অবাকপানা সরসিজ বাতাবেঞ্চে বসেই প্রশ্নটি রাখে। কণা সামনে খাড়িয়ে। সর'মাস্টারের পাশে বসতে কুণ্ঠা। একটানা বছরকয় কাজ করেছে যে তাঁর বাড়িতে। কুয়াশা কেটে পুব আকাশে রং লেগেছে। আভা ছড়াচ্ছে একটু একটু করে। স্পষ্ট করছে দিকবিদিক। কণাকেও।
না, এ সব পেছকথা কি বলার মতো মাস্টারবাবু? এ সব ছোটোলোকের ইতিবেত্তান্ত। আপনাদের শুনতে নেই।
আরে না, না, বলো, তারপর কী হল?
শুরু হল আমার লড়াই। এট্টুখানি কণার অনেক বড় লড়াই।
কী রকম?
শুনলেন তো, ভাসুর আমাকে কিছুই দেয়নি। মোদো ভাই বলে কেড়ে নিয়েছিল পরিচয়টাও। রেস্কাটেস্কা লাগলে বা গতরখাটনির দক্কার পড়লে ডাকডুক দিত। পালেপাব্বনে। যেতাম।
তাও যেতে? কেন?
সম্পক্ক তো এট্টা ছিল। আর তার বিচার তার, আমার বিচার আমার। যে দেখার সে ঠিক দেইখবে।
দেখেছিল?
শুইনতে চেয়েছেন না? আজ সব খোলসা করব,মাস্টারবাবু।
কণার গলায় সন্তোষের সুর। সে সুরের রেশ ছড়ায় পেছনপানে।
দ্যাখো, রোজ রোজ তোমার এই ঢং ভাল্লাগে না। কচলানি মেরো না। গলাপুরে মদ গিলে এসে এখন ঢ্যামনামি হচ্চে? ছাড়ো। সক্কালে বেরুতে হবে। এঁঁটো ঘাঁটতে।
 
ঘরে এলেই অ্যামন করো কেন বলো তো? ভাতার পছন্দ হয় না? নাকি অন্য কুনো নাগর জুটিয়িছ?এঁটো ঘাঁটতে ঘাঁটতে?
চোপ, একদম বাজে বকপেনা বললাম। ছেলেমেয়ে দুটি ওপাশে পড়া কইরছে। আর ঘর কাকে বলো? এই দেবোত্তর টাল-চালের খুপরিটা না জুটলে তো মুরিধারের বস্তিতে থাইকতে হত। আর দিনরাত খিস্তি গিলতে হত। অবিশ্যি ইখানেই বা কম কী! তবুও তো রাকু- কাজুর এট্টু পড়ালিখার জাগা জুটেছে। ওই নাটক - দাদার দয়ায়।
 
আদতে এই দেবোত্তর খুপরিটা কণা পেয়েছে ভানুবাবুর দয়ায়। ভানু মজুমদার। তিনপুরুষ আগে গঙ্গাবক্ষে যেতে যেতে দেবী কিরীটেশ্বরী এই মজুমদারদের দেবথানেই অধিষ্ঠিতা হন। এখন পুজোআচ্চার রমরমা গেছে। পড়ে আছে দেবোত্তর থানটি। বিক্রিতে বাধা থাকায় প্রোমোটারের থাবা পড়তে পারছে না। তাই তারই একচিলতে খুপরি কণা পেয়েছিল ভানুবাবুর বাড়ি কাজের সুবাদে। আর তারই গা লাগোয়া শহরের নাটকদল ' প্রান্তিক 'এর মহলাঘর। সেখানে মহলার ফাঁকফোকে নাটকের ভাঙা বেঞ্চ টেবিলটার দখল পায় প্রান্তিক কণার ছেলেমেয়ে। পড়তে পারে টুকুন নিরিবিলিতে। মধ্যেমাঝে নাটক - মামার হুকুম হাকাম শোনে। খারাপ তো নয়। ভালো কাজে লাগে তো খানিক।
 
এভাবেই চলছিল মোদো দুলালের সংসার। আসলে দুলালের নয়। কণার। নবাব তো দুটোর বাপ বনেই খালাস। পটাপট কণাকে মা বানিয়ে পুরুষ - কাম সেরেছে। এবারে বোঝ। হয় পাখা ঝাপটে মর, নয় পাখা মেলে মানুষ কর সন্তানদের। পাখি - মায়ের মতো। ভিতরজেদি কণা মরতে পারেনি। সন্তানের মুখ চেয়ে। নইলে মাতাল বরের রোজকার ঘিচাঘিচি, ঘষটানি সয়ে ওর সরে পড়ারই কথা। কিন্তু ও নয়, সটকেছে দুলাল। পেটে জল জমিয়ে একদিন চিৎপটাং হল। রাকুর তখন আট ক্লাস আর কাজুর সাত।
 
জানেন মাস্টারবাবু, ওর চিতে- ধোঁয়া যতই আকাশপানে উঠছিল ততই আমার বাঁধন ছিঁড়েখুঁড়ে যাচ্ছিল। শরীলডা থেকে আলগা হচ্ছিল সব ঘেন্নাপিত্তি। সে যে কী মুক্তির স্বাদ তা আপনাকে বুঝাতে পারব না।
এভাবেই স্বামীর দাহ- দিনের বর্ণনা দিয়েছিল কণা। বিচ্ছেদ সুখে বিভোর সে। নেই এতটুকু অশ্রুপাত!
 
এরপর তার পথ চলা আরও কঠিন হল। আবার সহজও হল। একমুখী হল সে। রাকু কাজুকে পড়িয়ে মানুষ করতে লেগে গেল যতটা পারে। বাড়িয়ে দিল আরও এক দু বাড়ির কামকাজ। বেড়ে গেল পা- বাজি। জোর হাঁটনের তাগিদে সেই যে কাপড় হাঁটু ছুঁয়েছে তা আর নামেনি পা - পাতায়।
 
আজ সে ছবিই দেখেছে সরসিজ। তার বাড়িতে কাজের সুবাদে কণাকে ক'বছর জেনেছে সে। কী কঠোর খাটনিই না খেটেছে। দু'বেলা ক'বাড়ির এঁটোকাঁটা, ঝাড়পোঁছের ফাঁকে ছেলেমেয়ে দুটির ইস্কুলভাত, বইপত্তর, বাজারঘাট সবই সামলেছে এক হাতে। কোন মাস্টারকে ধরে কী বই পাওয়া যাবে, কে একটু বিনেপয়সায় দেখিয়েটেখিয়ে দেবে তারও তালাশ তাকেই করতে হয়েছে। রাকু কাজুও সঙ্গ দিয়েছে মায়ের। ফাঁকি দেয়নি পড়ালেখায়। হাতহিল্লেও দিয়েছে অবরেসবরে। এভাবে রাকু মাধ্যমিক শেষে এগারোয় যখন বিজ্ঞান নিল, সরসিজ জানে, ছেলে অশোকের বইপত্র, খাতাটাতা পেয়েছিল সে। এ নিয়ে অশোকের মা কণাকে বামন ভেবে বলেছিল, কী দরকার ছিল ছেলেকে সায়ান্স দেবার? তোমাদের যা অবস্থা, ও কি পারবে? তারচে...। উত্তরে বিরূপ কণা হেসে বলেছিল, পাইরবে তো বলছে দিদি। দেকা যাক।
রাকু যে পেরেছে, এখন বিস্তারিত জানল সরসিজ। কেননা পড়াশোনার চাপে আর দূরত্বের কারণে কণা তার বাড়ির কাজ ছেড়ে কাছাকাছি ধরেছিল। অবশ্য বিপদে ফেলেনি সুমনাকে। একটি ভালো মেয়ে দিয়ে গিয়েছিল। তখন এমনটি হত। এখন হলে...!
তা তোমার রাকু এখন কী করছে?
আপনাদের আশীব্বাদে পাইমারিতে একটা জুটেছে মাস্টারবাবু। নিশ্চিন্দিপুরে।
তাই! বাঃ।
বলল বটে সরসিজ, কিন্তু ওর অবাকপানা কাটে না। তা কাটিয়ে কণা বলে, সাইঞ্চ নিয়ি তো পইড়লো। এক দাগের নিচিই থাকল। তবে খুব নিচে নয়।
তারপর?
আমি তো উসব বুজি না, কার বুদ্ধি পেইয়ি বেসিকে ঢুকে গেল। আর তাতেই... সেই যে সিবার অনেক ছোটোমাস্টার নিল না? তাতেই ওর হয়ি গেল।
 
কণার সংজ্ঞায় 'ছোটোমাস্টার' শুনে আড়ালে মুচকি হাসল বড়মাস্টার সরসিজ। কণা আরও বলে, মাইল পাঁচেক যেতে হত। সাইকেল ঠেলত। কী আর করা! তা এই মাসসাতেক হল একটা কুটি নিয়িছে। লোন নিয়ি।
 
খানিক ঢোক গিলে সরসিজ বোঝে, স্কুটি। এবারে কাজুর কথায় আসতেই কণা মরমে মরে যেন। বলে, মেয়ে তো জানেন আমার কালোপানা। চিন্তা তো এট্টা ছিলুই। কিন্তুক ও যখন বি এ পাশ দিল, খুঁজেপেতে জুটে গেল এক পাত্তর। আইসবাগে। পোনামাছের কারবার। হালদারের ছেইলি। পড়াশুনা বেশি না। তবে বিজনিসটা বুজে ভালো। পছন্দ করল কাজুকে। দিয়ি দিলাম। অ্যাখুন আমি ঝাড়া হাত-পা, মাস্টারবাবু।
সে তো দেখতেই পাচ্ছি। নইলে আর কি...!
 
কাজুর কথায় হঠাৎ পাতা উলটে একটা ঘটনা মনে পড়ছে সরসিজের। ওরা যখন সবাই মিলে দেশের বাড়ি বা অন্য কোথাও যেত তখন এই কণাই ছেলেমেয়ে নিয়ে ওর ঘর পাহারা দিত। বিশ্বাসের খামতি ছিল না। কিন্তু সেখানেও একটা চিড় ধরেছিল। সুমনার একটা ঢাকনাকাজের পলিথিন শিট ভাঁজ অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে কাজু নিয়ে গিয়েছিল বইটেবিলে পাতবে বলে। জানত না কণা। সুমনা ফিরে সেটি খুঁজে না পেয়ে ঠারেঠোরে কণাকে ইঙ্গিত করলে সে বুঝতে পারে না। ভাবতেও পারে না। কিন্তু বাড়িতে সেটা খুঁজে পেয়ে জেরার জেরবারে কাজুকে আছড়ে মারার জোগাড়। পরদিন সেটা হাতে করে সরসিজের ঘরের দোরে দাঁড়িয়ে সে কী কান্না তার। সুমনা চুপ মেরে থাকলেও সে ওকে বোঝাতে থাকে, ও ছেলেমানুষ ; অত ভেবে কি আর নিয়েছে? তোমার কিন্তু এভাবে ওকে মারা ঠিক হয়নি।
পরে কাজু ধুম জ্বরে পড়েছিল।
 
এই হল কণা। আজ মনে হচ্ছে, এই চোখের জল বিফলে যায়নি ওর। দরিদ্রতার সঙ্গে সততা মিশে গেলে আখেরে ফল এমনই হয়।
 
কিছুক্ষণ চুপ- জাবর কেটে সরসিজ খোলসা হতে চায়। রোদহলকা গা চেটে দিচ্ছে। তবুও আরও খানিক বাকি আছে বুঝে সে জানতে চায়, আচ্ছা কণা, তোমরা কি সেখানেই থাকো? বাড়ি বাড়ি কাজকাম করো?
না মাস্টারবাবু। আপনাদের আশীব্বাদে রাকু আমার কাঠাখানেক মাটি কিইনি একখান ঘর তুইলিছে। পরবাড়ির কামকাজে যেতে দেয় না আর। আমার ঘর এই কাছিই। মাছমারায়।
আর তোমার ভাসুর?
 
আছে এক রকম। ছেইলিটা পড়াশুনা তো কইরলো না। বাপের দুকানিই বসে। রেডিয়োতে চলে না আর। তাই টি ভি, কমপুটার নিয়ি বইসি থাকে। আর...
আর কী?
 
কাকার রোগটা পেয়িছে। তবে অ্যাখুন যোগাযোগ রাইখতে চায়। রাকুই যেতে চায় না। আমি গেলেও রাগ করে। তা মাস্টারবাবু, বউদি, অশোক সব ক্যামুন? কদ্দিন...!
 
সরসিজ সব বলে একে একে। এবার যাবার তাড়া দেখায় কণা, যাই মাস্টারবাবু, হাঁটা শেষ করে তাড়াতাড়ি ঘরে ফিরতে হবে। রাকুর আজ পাকা দ্যাখা। আর হ্যাঁ, আপনাদের সব্বাইকে রাকুর বিয়িতে আইসতে হবে কিন্তু। আমি নিজে গিয়ি বউদিকে বইলব। অ্যাখুন আসি।
 
এবার আর আবছায়া নয়। সরসিজ দেখে এক পরুষকার খামারের খেবড়ো পথ মাড়িয়ে দ্রুততালে এগোচ্ছে। পূর্ণ। স্বয়ংসিদ্ধ। 



লেখক পরিচিতি:
বিপ্লব বিশ্বাস
গল্পকার। অনুবাদক। প্রাবন্ধিক
কলকাতায় থাকেন।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন